Deshabrati Lolo 13 May 2021
Deshabrati issue headBJP PFolding new folds

বিজেপি পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য বিধানসভায় বিরোধী দলনেতা বেছে নিল তৃণমূল দল ভেঙে আসা সবচেয়ে ডাকসাইটে নেতাকে। দলের সামনে এছাড়া অন্য কোনো ওজনদার কেউ নেই। পুরোনো প্রথম সারির রাজ্য নেতারা কেউ জিততে পারেননি, হেরে বসে আছেন। ফলে কেন্দ্রীয় নেতৃত্বকে বাংলার বিধায়ক নেতা বাছাইয়ে প্রাথমিকভাবে তাকাতে হয়েছে পর্যায়ক্রমে টিএমসি ছেড়ে আসা নির্বাচনে বিজয়ী দুই নেতার দিকে। তাদের একজন টিএমসি-র ভেঙে বিজেপিকে বড় করতে 'চাণক্য'-র ভূমিকা রেখেছেন, আরেকজন দেখিয়েছেন বিজেপির ফ্যসিস্ত আগ্রাসনের চাহিদা পূরণের সবচেয়ে আগ্রাসী ভূমিকা। যদিও প্রথমজন জিতেছেন দ্বিতীয়জনের তুলনায় অনেক বেশি ভোটের ব্যবধানে, তবু বিরোধী নেতা হওয়ার ভাগ্য খুলল অবশেষে শেষোক্ত জনেরই। তৃণমূল নেত্রীকে হারানোর ট্রেডমার্ককে সবার ওপরে নজীর করে রাখতে। গোটা নির্বাচন প্রচারাভিযানে বিজেপির শীর্ষ নেতাযুগল সহ প্রধানতম তারকা প্রচারক ছিলেন যে চার-পাঁচজন, তার মধ্যেও ছিলেন উপরোক্ত ডাকসাইটে নেতা। বিধায়ক নেতা নির্বাচন করার প্রস্তাবেের আনুষ্ঠানিক উত্থাপন করানো হল 'চাণক্য' নেতাকে দিয়ে। এর পিছনেও একটা চাল আছে। যাতে এনিয়ে দলের প্রাক্তন তৃণমূলীদের মধ্যে কোনো গোষ্ঠী কোন্দল মাথা তুলতে না পারে তার উৎস মুখে জল ঢেলে দেওয়া।

বিজেপির নবনির্বাচিত বিধায়ক দলনেতা প্রারম্ভে গৌরচন্দ্রিকা করেছেন, তাঁর ভূমিকা থাকবে বিধানসভার ভিতরে ও বাইরে গণতন্ত্রের জন্য লড়াইয়ে এবং যেখানে প্রয়োজন রাজ্য সরকারের প্রতি গঠনমূলক আচরণে!

এই নেতার মুখে ‘গণতন্ত্রের অতন্দ্র প্রহরী’ সাজার কথা শোনাচ্ছে প্রহসনের মতোই। নন্দীগ্রাম কেন্দ্রের এই বিজেপি প্রার্থী প্রচারে গণতন্ত্রের প্রশ্নটিকে কেমন ব্যবহার করতে মরীয়া হয়েছিলেন তার নমুনা আর কারও অজ্ঞাত নেই। ‘গণতন্ত্রের পুনঃপ্রতিষ্ঠা’র ডুগডুগি বাজিয়েছিলেন ফ্যাসিবাদী শক্তিকে এরাজ্যে ক্ষমতায় আনতে। ফ্যাসিবাদ যে সর্বদা কোনো না কোনো রূপের ‘শত্রুপক্ষ’ নিশানায় রেখে কেবলমাত্র প্রশ্নাতীত আনুগত্যের ‘গণতন্ত্র’ চায় তার পরিচয় পাওয়া মিলছে কেন্দ্রের মোদী রাজ চলার মধ্যে, উত্তরপ্রদেশের যোগী রাজের মধ্যে, অসমে হাড়হিম ধরানো হিমন্ত বিশ্বশর্মার রাজত্বে, ত্রিপুরায় বিজেপির দমন-পীড়নের রাজশাসনে। বাংলার বিধানসভায় বিরোধী নেতার আসনে যাকে নিয়ে আসা হল তিনি নির্বাচনী প্রচারে তুঙ্গে তুলেছিলেন বিদ্বেষ-বিভাজন-হিংসা-হুমকির রাজনীতিকে, রাজনীতির সাম্প্রদায়িকীকরণকে ব্যবহার করেছিলেন সমস্ত সীমা ছাড়ানো মাত্রায়। কৃষক আন্দোলনের ঐক্যের ঐতিহাসিক প্রাঙ্গনকে সামনে থেকেই বিভেদ আর হানাহানি বাধিয়ে দেওয়ার ক্ষমাহীন অপরাধ করেছেন। তাই আজ ‘গণতন্ত্রের পরিত্রাতা’ সাজতে চাইলে হয়ত বিজেপির কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের ‘গুডবুকে’ নাম তুলতে পারবেন, কিন্তু জনগণকে বোকা বানাতে পারবেন না।

নব বিরোধী বিধায়ক নেতা গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের বুলি আউরানোর আড়ালে আসল নয়া কিছু পরিবেশ তৈরি করতে চাইছেন। এটা বাস্তব যে, নির্বাচনোত্তর পরিস্থিতিতে কিছু হিংসাত্মক ঘটনা ঘটেছে, হয়ত এখনও ঘটে চলেছে। যদিও এর জন্য বিজেপিরই নির্বাচনী প্রচারে বিষোদগার সবচেয়ে দায়ী, তবু তার হিংসাত্মক প্রতিক্রিয়া ও তার মাশুল গুণতে যুযুধান দলগুলোর উভয়পক্ষেরই যে ক্ষয়ক্ষতি হচ্ছে, তা একেবারেই কাম্য নয়, রাজ্য প্রশাসনকে তা থামাতে হবে, যাদের বিশ্বাসযোগ্যতা রয়েছে তাদেরকে শান্তি-সম্প্রীতি ফেরানোর উদ্যোগ নিতে দিতে হবে। কিন্তু বিজেপি ভাঁজছে ‘একের মধ্যে তিন’ জুড়ে অশান্তি বাধানোর নয়া পরিকল্পনা। কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রকের পাঠানো টিম, রাজ্যপাল ও বিধানসভার বিরোধী দলনেতা, সবার মুখ দিয়ে বেরোচ্ছে একই গরল। যেন করোনার চেয়েও বড় ধ্বংসাত্মক পরিস্থিতি এখন টিএমসি-র সন্ত্রাসে বিজেপির শিকার হওয়া! যে প্রচারিত ‘সন্ত্রাসের’ অধিকাংশই ভূয়ো, সাজানো। যে সাজানো প্রচার এমনকি চালানো হচ্ছে করোনার মোকাবিলায় মোদী বন্দনা করে! অথচ যে প্রশ্নে মোদী সরকার চরম অমানবিক ধিক্কার কুড়োচ্ছে দেশে-বিদেশে! করোনার মোকাবিলা নিয়ে রাজ্য বিজেপির কোনো কর্মসূচী নেই, বিরোধী নেতার মুখে কোনো অগ্রাধিকার নেই। ওরা কেন্দ্রের কাছ থেকে করোনা যুদ্ধের রসদ আদায়ের রাজ্যের অধিকারের দাবিতে বিন্দুমাত্র সরব হওয়া দূরের কথা, ন্যূনতম দরবার করার নাম করছে না। এই হচ্ছে ওদের ‘গঠনমূলক আচরণের’ ফ্যসিস্ট নমুনা।

আজকের নতুন পরিস্থিতিতে, বিশেষত করোনার পরিপ্রেক্ষিতে, বিজেপির শয়তানির স্বরূপগুলো চিনতে হবে, এর রাজনৈতিক-সামাজিক মোকাবিলা করতে হবে।

BJP's defeat in Uttar Pradesh

পশ্চিমবাংলায় যখন বিধানসভা নির্বাচন চলছিল, সেই সময় যোগী আদিত্যনাথের রাজ্য উত্তরপ্রদেশে অনুষ্ঠিত হল পঞ্চায়েত নির্বাচন। ১৫ এপ্রিল শুরু হয়ে কয়েকটা পর্যায়ের মধ্যে দিয়ে নির্বাচন শেষ হয় ২৯ এপ্রিল। কোভিড সংক্রমণের দ্বিতীয় ঢেউয়ে যে রাজ্যগুলো ব্যাপক বিপর্যয়ের মুখে পড়েছে, উত্তরপ্রদেশ তার অন্যতম। সংক্রমণের এই ব্যাপকতার মধ্যে নির্বাচন অনুষ্ঠানের সিদ্ধান্ত সমীচীন হয়নি বলেই অনেকে অভিমত প্রকাশ করেছেন। কেননা, নির্বাচন অনুষ্ঠান রাজনৈতিকভাবে সক্রিয় এক কর্মকাণ্ড এবং তারমধ্যে নিহিত থাকে সংক্রমণের আরও বেশি করে ছড়িয়ে পড়ার সম্ভাবনা। প্রথম ঢেউয়ের সময় সংক্রমণকে উত্তরপ্রদেশের গ্ৰামাঞ্চলে খুব বেশি ছড়িয়ে পড়তে দেখা যায়নি। কিন্তু দ্বিতীয় ঢেউয়ের সময় সংক্রমণের হারের দিক থেকে শহর ও গ্ৰামাঞ্চল প্রায় সমান-সমান এবং এর পিছনে পঞ্চায়েত নির্বাচনের অবদান আছে বলেই ব্যাপকতর স্তরে বিশ্বাস। কোভিড নিয়ন্ত্রণে যোগী আদিত্যনাথ সরকারের ব্যর্থতা উত্তরপ্রদেশের জনগণের কাছ থেকে আড়াল করা যায়নি। এরসঙ্গে বিভিন্ন স্তরের অপশাসন যুক্ত হয়ে সরকারের বিরুদ্ধে জনগণের ক্ষোভের পারদ ঊর্ধ্বমুখী হয় এবং তার প্রতিফলন পঞ্চায়েত নির্বাচনের ফলাফলে পড়ে। পঞ্চায়েত নির্বাচনে বিজেপি একেবারে ধূলিসাৎ না হলেও একটা ধাক্কা যে খেয়েছে তা নিয়ে সন্দেহের কোনো অবকাশ থাকতে পারে না। এই কথাটাও ধর্তব্যের মধ্যে রাখতে হবে যে, গোটা প্রশাসনকে সঙ্গে নিয়েই আদিত্যনাথের দল পঞ্চায়েত নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছিল।

উত্তরপ্রদেশ পঞ্চায়েত নির্বাচনের রয়েছে চারটে স্তর – নির্বাচিত হন গ্ৰাম পঞ্চায়েত সদস্য, গ্ৰাম প্রধান, ক্ষেত্র পঞ্চায়েত (ব্লক পঞ্চায়েত) ও জেলা পঞ্চায়েত। এই চারটি স্তরে মোট পদের সংখ্যা ৮.৬৯ লক্ষ – গ্ৰাম পঞ্চায়েত সদস্য ৭.৩২ লক্ষ, গ্ৰাম প্রধান ৫৮,১৭৬, ক্ষেত্র পঞ্চায়েত ৭৫,৮৫২, জেলা পঞ্চায়েত ৩,০৫০। নির্বাচন দলীয় প্রতীকে অনুষ্ঠিত না হলেও প্রতিটি দলই তাদের প্রার্থী তালিকা প্রকাশ করে এবং নির্বাচনী ফল প্রকাশের পর সেই অনুসারেই নির্ধারিত হয় প্রতিটি দলের প্রাপ্ত আসন সংখ্যা। জেলা পঞ্চায়েতই পঞ্চায়েত স্তরে ক্ষমতার প্রধান আধার হওয়ায় এই স্তরে লাভ করা আসন দিয়ে কোন রাজনৈতিক দল কেমন ফল করল তার একটা আভাস পাওয়া যেতে পারে।

ফলাফলে দেখা গেছে, বিজেপি’র গড় বলে পরিচিত এমন অনেক জেলাতেই বিজেপি তেমন ভালো ফল করতে পারেনি। তার তুলনায় সমাজবাদী পার্টি (এসপি) এবং কোথাও বিএসপি’র ফল ভালো হয়েছে। অযোধ্যার কথা ধরা যাক। এই জেলায়, জেলা পঞ্চায়েত আসন সংখ্যা ৪০-এর মধ্যে এসপি পেয়েছে ২৪টা আসন এবং বিজেপি’র প্রাপ্ত আসন সংখ্যা মাত্র ৮। রাম মন্দির নির্মাণের তোড়জোড় নির্বাচনী ফলাফলে কোনো প্রভাব ফেলতে পারেনি বলেই দেখা যাচ্ছে। বারাণসীতে ৪০টা আসনের মধ্যে এসপি পেয়েছে ১৫টা ও বিজেপি পেয়েছে ৮টা আসন; লক্ষ্মৌয় ২৫টা আসনের মধ্যে এসপি পেয়েছে ১০টা আসন আর বিজেপি’র প্রাপ্ত আসন সংখ্যা মাত্র ৩; যোগী আদিত্যনাথের নিজের জেলা গোরক্ষপুরে জেলা পঞ্চায়েত আসন সংখ্যা ৬৮ – এরমধ্যে বিজেপি ও এসপি’র প্রাপ্ত আসন সংখ্যা যথাক্রমে ২০ ও ১৯, প্রায় সমান-সমান; বিজেপি’র প্রভাবের শক্তিশালী জেলা বলে পরিচিত মথুরায় আবার বিএসপি ভালো ফল করেছে – বিএসপি’র ১২টা আসনের তুলনায় বিজেপি পেয়েছে ৮টা আসন। জেলা পঞ্চায়েতের মোট ৩,০৫০ আসনের মধ্যে এসপি’র প্রাপ্ত আসন সংখ্যা ৭৪৭, আর বিজেপি পেয়েছে ৬৯০ আসন। এই পদে অনেক নির্দলীয় প্রার্থীও বিজয়ী হয়েছে।

সিপিআই(এমএল) পঞ্চায়েত নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে দু’টো জেলা পঞ্চায়েত আসনে জয়ী হয়েছে – আসন দু’টি হল সিতাপুর জেলার ১৪নং ওয়ার্ড এবং দেবারিয়া জেলার ২৬নং ওয়ার্ড। এছাড়া, কিছু গ্ৰাম পঞ্চায়েত ও গ্ৰাম প্রধান পদেও সিপিআই(এমএল) প্রার্থীরা জয়ী হয়েছেন।

আদিত্যনাথ সরকার রাজ্যের জনগণের কাছে সুশাসনের কোনো নজির রাখতে পারেনি। রাজনীতিবিদ-দুর্বৃত্ত গাঁটছড়া ও দুর্নীতি উত্তরপ্রদেশে এক বিস্তৃত পরিঘটনা। বিরোধীমত আদিত্যনাথ একেবারেই বরদাস্ত করেন না এবং বিরোধী মত প্রকাশকারীদের ওপর দমন নামিয়ে অনেককেই জেলে পোরা হয়। দলিত ও সংখ্যালঘু নিপীড়ন উত্তরপ্রদেশে এক জ্বলন্ত বাস্তবতা। ‘সিএএ’ বিরোধী আন্দোলনকারীদের যোগী সরকারের প্রবল পীড়নের মুখে পড়তে হয়েছে। নারীদের নিরাপত্তাও যোগীরাজ্যে খুব একটা সুরক্ষিত নয়। হাথরসের দলিত কন্যার গণধর্ষণ ও নিহত হওয়ার ঘটনায় রাজ্য প্রশাসন যেমন ব্যাপক কুখ্যাতি অর্জন করে, ঐ ঘটনা আবার দলিত উৎপীড়নের প্রশ্নাতীত বাস্তবতাকেও নির্দেশিত করে। আর কোভিড মোকাবিলায় যোগী সরকার চরম অপদার্থতার পরিচয় দিয়েছে। অক্সিজেনের জন্য চারদিকে হাহাকার রব উঠলেও অক্সিজেনের সঙ্কটকে আদিত্যনাথ শুধু অস্বীকারই করেননি, যে সমস্ত হাসপাতাল অক্সিজেন অমিলের কথা বলেছে তাদের বিরুদ্ধে শাস্তি গ্ৰহণের, সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করার ফরমানও জারি করেছেন। জীবনদায়ী ওষুধের লভ্যতা বা ঐ সমস্ত ওষুধ নিয়ে কালোবাজারি রুখতেও তিনি ব্যর্থ হয়েছেন। কোভিডে মৃতের প্রকৃত সংখ্যাকে গোপন করতে শ্মশানকে উঁচু প্লাস্টিক ও টিন দিয়ে ঘিরেছেন। সারি-সারি অনির্বাণ চিতার ছবি কেউ তুললে তাতে শাস্তিযোগ্য অপরাধের বিধান দিয়েছেন। এই সমস্ত কিছুই যোগী সরকারের বিরুদ্ধে জনগণের ক্ষোভকে তীব্র করে তুলে শাসক দলের সমর্থন ভিত্তিতে ধাক্কা দেয়।

অনেক ভাষ্যকারের অভিমত হল, উত্তরপ্রদেশের এই পঞ্চায়েত নির্বাচন ছিল ২০২২ সালে হতে চলা বিধানসভা নির্বাচনের সেমিফাইনাল। ২০২২’র ফাইনালে বিজেপি রাজ্যের শাসন ক্ষমতা থেকে অপসারিত হয় কি না তা দেখার জন্য আমাদের অপেক্ষা করতে হবে। তবে, হিন্দুত্ব দিয়ে যে আর সব সময় বাজিমাৎ করা যাচ্ছে না তা সুস্পষ্ট রুপে ধরা পড়ল – পশ্চিমবাংলা বিধানসভা এবং উত্তরপ্রদেশ পঞ্চায়েত, উভয় নির্বাচনেই।

CPI (ML) Liberation sent a letter

পশ্চিমবঙ্গের নব নির্বাচিত মুখ্যমন্ত্রীর কাছে কোভিড মোকাবিলায় জরুরী আর্থিক ও স্বাস্থ্য প্রশাসনিক পদক্ষেপ দাবি করে গত ৭ মে একটি চিঠি পাঠানো হয়। চিঠিটি লেখেন সিপিআই(এমএল) লিবারেশনের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য শাখার সম্পাদক পার্থ ঘোষ। ঐ চিঠিতে বলা হয় — তৃতীয় বারের জন্য মুখ্যমন্ত্রী হিসাবে নির্বাচিত হওয়ায় প্রথমেই আমাদের পার্টির পক্ষ থেকে আপনাকে অভিনন্দন জানাচ্ছি।

আজ ঠিক এই সময়ে আমাদের রাজ্য অতিমারীর প্রবল সুনামিতে ক্ষতবিক্ষত। শুধু আমাদের রাজ্যই নয়, কেন্দ্রের দায়িত্বজ্ঞানহীন মোদী সরকারের অবিমৃষ্যকারিতায় আজ সারা দেশ ভয়াবহ সংকটের মুখে। মোদী সরকারের আজ্ঞাবহ কেন্দ্রীয় নির্বাচন কমিশন কোভিডের এই দ্বিতীয় ঢেউর মধ্যে যে ভাবে আট দফা নির্বাচনী নির্ঘন্টে জেদ ধরে বসে থাকলো, যেভাবে মোদী সহ কেন্দ্রীয় মন্ত্রীরা বাংলা দখলের জন্য সমস্ত স্বাস্থ্য বিধি উপেক্ষা করে বিরাট বিরাট জনসভা করল, তা কোভিড সংক্রমণকে নিয়ে গেছে বিপজ্জনক পর্যায়ে। এখনও ভারতের সাধারণ মানুষ প্রথম পর্বের লকডাউনের ক্ষয়ক্ষতি সামলে উঠতে পারেনি। দু’দিন আগে আজিম প্রেমজি বিশ্ববিদ্যালয়ের একটা গবেষণা পত্র এই তথ্য দিল যে প্রথম লকডাউনের পর ২৩ কোটি ভারতীয় নতুন করে দারিদ্র সীমার নীচে নিমজ্জিত হয়েছেন।

অতিমারী একই সাথে স্বাস্থ্য সংকটের পাশাপাশি নিয়ে এসেছে তীব্র আর্থিক সংকট। ইতিমধ্যেই রাজ্যের প্রায় আটটি চটকল বন্ধ হওয়ায় প্রায় ৪০ হাজার শ্রমিক ও তাঁদের পরিবার তীব্র আর্থিক সংকটের মুখে দিন কাটাচ্ছেন। লোকাল ট্রেন বন্ধ থাকার দরুন বিপুল সংখ্যক অসংগঠিত শ্রমজীবী মানুষ, যেমন পরিচারিকা, নির্মাণ শ্রমিক, হকার ইত্যাদি মানুষ বিরাট আর্থিক দুর্গতির মধ্যে পড়বেন। চটকলে ৫০ শতাংশ কর্মী নিয়ে কাজ চালানোর যে নির্দেশ আপনার সরকার দিয়েছে, তাতে মজুরির উপর প্রভাব ফেলবে, যা শেষ বিচারে অন্যান্য বিধিবদ্ধ পাওনাকেও প্রভাবিত করবে। মজুরি যাতে সংকুচিত না হয়, তার জন্য স্পষ্ট নির্দেশিকা দেওয়ার আবেদন রাখছি। কোভিডকে নিয়ন্ত্রিত করতে আপনার সরকারের কাছে নিম্নোক্ত দাবিগুলো পেশ করছি —

১) বিনামূল্যে সমস্ত পরিবারকে রেশন দিতে হবে। শুধু চাল-গম নয়, অন্যান্য নিত্য প্রয়োজনীয় সামগ্রী (তেল, নুন, চিনি, সাবান, স্যানিটাইজার, মাস্ক) বিনামূল্যে সরবরাহ করতে হবে।

২) প্রতিটি দারিদ্র পরিবারকে চরম দারিদ্রের হাত থেকে বাঁচাতে মাসিক ৭,৫০০ টাকা আর্থিক অনুদান দিতে হবে। কেন্দ্রীয় ও রাজ্য সরকারকে ৭৫ঃ২৫ এই অনুপাতে আর্থিক দায়িত্ব নিতে হবে। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, দিল্লি সরকার নথিভুক্ত প্রতিটি নির্মাণ শ্রমিককে মাসিক ৫,০০০ টাকা আর্থিক অনুদানের সিদ্ধান্ত নিয়েছে।

এই পর্যায়ে ব্যক্তিগত ক্ষেত্রে/সংস্থায় কোনো কর্মীর যেন চাকরিতে ছেদ বা মজুরি সংকোচন না হয়, সেই মর্মে রাজ্য সরকারকে নির্দেশিকা জারি করতে হবে।

৩) লোকাল ট্রেন বন্ধ থাকায় বাজারে খাদ্যদ্রব্য জিনিসপত্র/ওষুধ সহ চিকিৎসা সরঞ্জামের জোগানের ঘাটতি যাতে না হয়, তার উপর রাজ্য সরকারকে নজরদারি রাখতে হবে। মূল্যবৃদ্ধি রোধ, কালোবাজারি-মজুতদারীকে কঠোর হাতে নিয়ন্ত্রণ করতে হবে

৪) বিনামূল্যে সর্বজনীন টিকাকরণ, শ্রমিকদের কর্মস্থলে আর অন্যান্যদের নিকটস্থ জায়গায় এই কর্মসূচী নিতে হবে। নির্দিষ্ট সময়সীমার মধ্যেই তা শেষ করতে হবে। মনে রাখা দরকার, কেন্দ্রীয় স্বাস্থ্য মন্ত্রক অদূরে কোভিডের তৃতীয় ঢেউয়ের আগাম সতর্কতা দিয়ে রেখেছে। প্রয়োজনে বিত্তশালী ব্যক্তি/প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে করোনা ট্যাক্স আরোপ করতে হবে।

CPI (ML) demands

সিপিআই(এমএল) লিবারেশনের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য কমিটি ২৬ এপ্রিল পশ্চিমবঙ্গ সরকারের মুখ্যসচিব এবং স্বাস্থ্যসচিবের কাছে সারা দেশ জুড়ে কোভিড অতিমারির যে দ্বিতীয় ঢেউ চলছে তার জন্য কার্যকরী ও উপযুক্ত ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়ে নিম্নলিখিত দাবিসনদ পেশ করেছিল। যেহেতু তখনও পশ্চিমবঙ্গে নির্বাচনী ফলাফল ঘোষণা বাকী ছিল তাই দাবিপত্রের শুরুতেই রাজ্য প্রশাসনের মাধ্যমে একযোগে কেন্দ্রীয় সরকারের উদ্দেশ্যে জরুরি করণীয় বিষয়গুলি জানানো হয়।

১) ভারত সরকারকে তাদের সংক্রামক ব্যাধির নিয়ন্ত্রণের কর্মসূচী অনুযায়ী রাজ্য সরকারগুলিকে বিনামূল্যে কোভিড ভ্যাকসিন যোগান দেওয়া নিশ্চিত করতে হবে।

২) প্রতি ৪-৫ ঘন্টা অন্তর হাসপাতালের শয্যাসংখ্যা, অক্সিজেন যোগানের সর্বশেষ পরিস্থিতি বুলেটিন মারফত জনসাধারণকে জানাতে হবে। সরকারি হাসপাতালে অক্সিজেন প্ল্যান্ট গড়ে তোলার পরিকল্পনা ও তার অগ্রগতির রিপোর্ট জনসাধারণকে জানাতে হবে।

৩) কেন্দ্র এবং রাজ্য সরকারকে জরুরি ভিত্তিতে কোভিড সংক্রমণ প্রতিরোধ ব্যবস্থা ও ভ্যাকসিন প্রয়োগের দায়িত্ব নিতে হবে।

৪) সমস্ত সরকারী এবং বেসরকারী মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতাল, স্বাস্থ্যকেন্দ্র, বেসরকারী হাসপাতাল ও নার্সিং হোমে বিনামূল্যে কোভিড ভ্যাকিসিন অবশ্যই দিতে হবে।

৫) অক্সিজেন সিলিন্ডার, ভেন্টিলেটর, মাস্ক, জীবনদায়ী ওষুধ, হাসপাতালে শয্যার অবাধ লভ্যতার জন্য আর্থিক সংকট বা প্রশাসনিক ব্যর্থতার অজুহাত দেখানো চলবে না।

৬) কোভিড চিকিৎসা এবং নিয়ন্ত্রণের জন্য মন্ত্রক বা প্রশাসনিক স্তরের যে কোন পর্যায়ে কোনো অবহেলা বা দায়িত্বের অভাব শাস্তিযোগ্য অপরাধসম অবহেলা বলে গণ্য করতে হবে।

৭) জাতীয় এবং আন্তর্জাতিক সংস্থার কোভিড চিকিৎসার ও ভ্যাকসিনের যে বিধিনিয়ম এবং গাইডলাইন আছে তা সঠিকভাবে মানতে হবে।

৮) কোভিড সংক্রমণ নিয়ে অবৈজ্ঞানিক ধারণা, কুসংস্কার এবং অন্ধবিশ্বাস প্রচার বন্ধ করতে হবে।

৯) ভাইরাস এবং ব্যাকটিরিয়া (জীবাণু) ঘটিত সংক্রামক রোগ প্রতিরোধ এবং চিকিৎসার জন্য দীর্ঘস্থায়ী কর্মসূচী নিতে হবে।

১০) কেন্দ্রীয় বাজেটের কমপক্ষে ৬ শতাংশ স্বাস্থ্যখাতে বরাদ্দ করতে হবে।

১১) দেশের প্রতিটি নাগরিকের জন্য সর্বজনীন স্বাস্থ্য প্রকল্প চালু করতে হবে।

১২) সমস্ত ডাক্তার, স্বাস্থ্যকর্মী এবং সম্মুখসারির অন্যান্য কর্মীদের প্রত্যেকের জন্য ৫০ লক্ষ টাকার বীমা সরকারকে চালু করতে হবে।

১৩) সামাজিক সংগঠনগুলিকে অতিমারী নিয়ন্ত্রণে অংশগ্রহণ করতে হবে।

১৪) সমস্ত কর্পোরেট সংস্থাগুলিকে কোভিড ট্যাক্স দিতে হবে।

১৫) শবদেহ সত্কার বা কবরের জন্য নির্দিষ্ট গাইডলাইন জানাতে হবে।

১৬) ভ্যাকসিনের জন্য যাঁরা লাইনে দাঁড়াবেন তাদের অবশ্যই কুপন দিতে হবে অযথা ঝামেলা এড়াবার জন্য। যদি সেই দিন কেউ ভ্যাকসিন না পান, পরের দিন যেন অবশ্যই তারা সুযোগ পান।

১৭) প্রত্যেকটি শিল্পক্ষেত্রে ও সরকারী অফিসে ভ্যাকসিন প্রয়োগের ব্যবস্থা করতে হবে।

১৮) বেসরকারী হাসপাতালে কোভিড রুগীদের চিকিৎসার জন্য চড়ামূল্য নেওয়া নিয়ন্ত্রণ করতে হবে ও কড়া পদক্ষেপ নিতে হবে।

Student youth with the help of Covid victims

‘কোভিড ভলান্টিয়ার্স’ ঠিকানা ক্রিক রো, কলকাতা। অল ইন্ডিয়া স্টুডেন্টস অ্যাসোসিয়েশন (এআইএসএ) এবং বিপ্লবী যুব অ্যাসোসিয়েশন (আরওয়াইএ) করোনাকালে জীবন বাজি রেখে আর্তের কাছে ছুটে চলেছে - বিশ্বজিৎ, অয়ন, নীলাশিস, অমিতাভ, অঙ্কিত, তীর্থ, অন্বেষা, বর্ষা, রুমেলা, আমন, সুরত্ন, আবীর, তিয়াসা, শুভ, সঞ্জয়, কৌস্তভ, অনির্বাণ, পিকু, পরিচয়, জয়ন্ত, দেবাশিস, তমোস, ইন্দ্রনীল, প্রীতম, রুদ্র, বাপন, অভিজিৎ, সৌরভ, গুড্ডু, দীপ সহ আরও অনেকে। ওরা খুলেছে হোয়াটস এ্যপ গ্রুপ এবং ফেসবুক পেজ, ওখানে প্রতিদিন আপডেট দিয়ে চলেছে। কোন হাসপাতালে বেড আছে, কোথায় অক্সিজেন পাওয়া যাবে, স্বাস্থ্যদপ্তরে নাম নথিভুক্তির জন্য কোন নাম্বারে ফোন করতে হবে সব জানিয়ে দিচ্ছে। টেলিমেডিসিনে কোন ডাক্তারবাবু কখন সময় দিচ্ছেন তাও জানাচ্ছে। সরকারী ও বেসরকারী ডাক্তারদের নাম্বার সংগ্রহ করে সর্বসাধারণকে জানিয়ে দিচ্ছে। এরকম নানাবিধ কাজ করে চলেছে।

ওরা জীবনের ঝুঁকি নিয়ে সংক্রমিতের বাড়িতে সাহায্যের জন্য পৌঁছে যাচ্ছে। হন্যে হয়ে খুঁজে যদি অক্সিজেন পাওয়া যায় তো রোগীর বাড়িতে পৌঁছে দেওয়া। খবর এলো অক্সি-৯৯ ওষুধ চাই, রোগীর বাড়িতে খাবার চাই, বাড়ি স্যানিটাইজ করতে হবে, ওরা পৌঁছে গেল। এই কাজ করতে গিয়ে ওদের মধ্যেও কয়েকজন সংক্রমিত হল, অন্য ব্যাচ দায়িত্ব কাঁধে তুলে নিল।

লোকবল অর্থবলের সমস্যা নিয়েই ওরা ছুটে চলেছে - বেলঘরিয়া, আগরপাড়া, ডানলপ, বরানগর, নিউব্যারাকপুর, নৈহাটি, শ্যামনগর, বারাসাত, অশোকনগর, বালি, কোন্নগর, যাদবপুর, বেহালা সহ কলকাতার বিভিন্ন অঞ্চলে। অতিমারীর সময়ে ‘মানুষের পাশে দাঁড়াও’ এই আদর্শবোধে তারা উদীপ্ত হয়ে অসুস্থ সহনাগরিকদের পাশে আছে। তাদের নতুন ভাবনা শুরু হয়েছে আংশিক লকডাউনে কর্মচ্যুত শ্রমজীবী মানুষকে কিভাবে সাহায্য করা যায়। এরা অন লাইনে ভলেন্টিয়ার নিয়োগের আবেদন করেছে, সেখানে কিছু কিছু সাড়া পাওয়া যাচ্ছে। ওরা বুঝেছে লড়াইটা অনেক দিন চালাতে হবে, তার প্রস্তুতি নিচ্ছে। বাংলার এই নতুন প্রজন্মকে কুর্নিশ।

-- নবেন্দু দাশগুপ্ত

Stand by the side of Covid Volunteers

রাজ্য জুড়ে কোভিড আক্রান্ত সহনাগরিকদের সাহায্যর্থে পৌঁছে যাচ্ছে কোভিড ভলান্টিয়ার্সরা। এই কাজকে আরোও সুসংহত করতে এবং কোভিড ভলান্টিয়ার্সদের শারীরিক সুরক্ষা বজায় রাখতে প্রয়োজন অর্থের। কোভিড ভলান্টিয়ার্সদের পাশে সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিন। আপনার সাধ্যমত অর্থ সাহায্য করুন নীচের একাউন্টে।

SOURAV ROY
Account no. 31072403165
State Bank of India
Konnagar Branch
IFS Code: SBIN0002078
Google pay Number: 9038900672

- এআইএসএ পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য কমিটি

must be vaccinated at work place

‘অল ইন্ডিয়া সেন্ট্রাল কাউন্সিল অব ট্রেড ইউনিয়নস’-এ অন্তর্ভুক্ত ‘বেঙ্গল চটকল মজদুর ফোরাম’-এর পক্ষ থেকে ইএসআইসি-র কেন্দ্রীয় ও আঞ্চলিক অধিকর্তা এবং পশ্চিমবঙ্গ সরকারের স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা দপ্তরের সচিবকে জরুরি ভিত্তিতে এই মর্মে চিঠি দেওয়া হয়েছে। চিঠিতে বিশেষভাবে উল্লেখ করা হয়েছে --

(১) করোনা মোকাবিলায় উপরিউল্লিখিত সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলিকে নিজ নিজ দায়িত্ব পালন করতে অনুরোধ জানানো হয়েছে।

(২) ইএসআই নথিভুক্ত কর্মীদের জন্য কর্মস্থলে ভ্যাক্সিন দেওয়ার ব্যবস্থা করা। এতে অন্যান্য ভ্যক্সিন কেন্দ্রেও ভিড় কমানো সম্ভব হবে।

(৩) শ্রমিকদের কর্মক্ষেত্রে কোভিড স্বাস্থ্য বিধি যাতে ঠিক ভাবে পালন করা হয় তার কঠোর তদারকি করা

(৪) কোভিড সম্পর্কে সচেনতা বাড়াতে সমস্ত ট্রেড ইউনিয়নকে নিয়ে বিশেষ প্রচারাভিযান সংগঠিত করার ব্যবস্থা করা।

গোটা দেশ ও রাজ্য জুড়ে কল্পনাতীত গতিতে দৈনিক বিপুল সংখ্যক মানুষ অতিমারীর কবলে পড়ছেন। প্রাণ হারাচ্ছেন বহু মানুষ।

গত বছর অতিমারীর প্রথম ঢেউয়ের সময় ইএসআই কোভিড আক্রান্ত শ্রমিকদের চিকিৎসার জন্য কোন ব্যবস্থা নেয়নি। এবছর আরও ভয়ঙ্কর দ্বিতীয় ঢেউয়ের মধ্যেও ছবিটা বদলায়নি। বিশেষ করে চটকল শ্রমিকরা ঘন বসতিপূর্ণ মহল্লাগুলোতে থাকেন। তাই সেখানে সংক্রমণ দ্রুত ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা থাকে। সে জন্য প্রয়োজন অনুযায়ী হাসপাতাল বা সেফ হোমে সংক্রমিত ব্যক্তিকে দ্রুত স্থানান্তরিত করার ব্যবস্থা করা উচিত।

যুদ্ধকালীন প্রস্তুতি নিয়ে মোকাবিলা করতে হবে, এই অতিমারী সৃষ্ট স্বাস্থ্য সংকটকে। আশাকরি বিষয়টির গুরুত্ব বিচার করে ইএসআই এই ব্যপারে অবিলম্বে সঠিক পদক্ষেপ নেবে।

আমাদের সুনির্দিষ্ট দাবি

(১) অবিলম্বে ইএসআই-এর অধীনে সমস্ত শ্রমিক ও তাদের পরিবারকে নিজ নিজ কর্মস্থলে বিনামূল্যে টিকা দিতে হবে।

(২) কোভিড স্বাস্থ্য বিধিকে কঠোর ভাবে লাগু করতে হবে।

(৩) অবিলম্বে ইএসআই হাসপাতালে কোভিড-আক্রান্ত শ্রমিক ও তাদের পরিবারের চিকিৎসার ব্যবস্থা করতে হবে।

(৪) চিকিৎসা ও থাকা-খাওয়ার সুব্যবস্থা যুক্ত সেফ হোমের ব্যবস্থা করতে হবে।

ধন্যবাদান্তে
নবেন্দু দাশগুপ্ত
সভাপতি
অতনু চক্রবর্তী
সাধারণ সম্পাদক
বেঙ্গল চটকল মজদুর ফোরাম

AIKM's call

৫ মে এআইকেএম-এর জাতীয় কার্যকরী সমিতি এক অন লাইন বৈঠকে করোনা অতিমারী পরিস্থিতি, কৃষক আন্দোলনের বর্তমান অবস্থা ও পাঁচটি রাজ্যে অনুষ্ঠিত বিধানসভা নির্বাচনের পর্যালোচনা করে এবং ভবিষ্যত কর্মপন্থা ও পথনির্দেশিকা নির্ণয় করে। এআইকেএম মনে করে, চলমান কৃষক আন্দোলন বিধানসভা নির্বাচনগুলিতে প্রভাব ফেলেছে এবং এগুলি ছিল এক বিজেপি বিরোধী জনাদেশ। বিশেষত বাংলায় বিজেপি ও মোদীর পরাজয় দেশজুড়ে এবং দিল্লী সীমান্তের কৃষক আন্দোলনকে উদ্দীপনা জুগিয়েছে। নির্বাচনে জনগণের এই কণ্ঠধ্বনি শোনার পরও মোদি সরকার যদি কর্পোরেটদের স্বার্থে তিনটি (কৃষি) আইনের প্রশ্নে অনড় হয়ে থাকে, তাহলে চাষি ও কৃষকদের সংযুক্ত ও স্বাধীন আন্দোলনকে আরও দীর্ঘ সময়ের জন্য চালিয়ে যাওয়া ও গভীরতর করে তোলা অবশ্যম্ভাবী। দিল্লীর প্রতিবেশী রাজ্যসমূহের ইউনিটগুলি দিল্লীতে বিভিন্ন কিষাণ মোর্চাসমূহকে শক্তি ও সমর্থন জোগাবে। ইতিমধ্যেই কিষাাণ মহাসভার পাঞ্জাব ইউনিট ও জাতীয় সভাপতির নেতৃত্বে জাতীয় স্তরের নেতারা সমস্ত প্রতিকূলতা ও রাষ্ট্রীয় নিপীড়নের মুখে দাঁড়িয়ে খুবই কার্যকরী ও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে চলেছেন। কিষাণ মোর্চা বা এআইকেএসসিসি-র জাতীয়স্তরে গৃহীত সিদ্ধান্তগুলি কার্যকর করতে হবে। করোনা অতিমারীর সময় বাড়িতে থেকেই, কোভিড বিধিসমূহকে অনুসরণ করে এবং লকডাউনকে মেনে নিয়ে আজকের শ্লোগান : জনগণকে রক্ষা করুন, জনগণকে সাহায্য করুন। প্রয়োজনে বাড়িতে থেকেও প্রতিবাদ উঠুক। দিল্লীতে সর্বদাই যিনি তাৎপর্যপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন, পাঞ্জাবের সেই বর্ষীয়ান নেতা সুখদর্শন নাট এবং বিহার থেকে নির্বাচিত পাঁচ বারের সিপিএমের প্রাক্তন বিধায়ক যিনি সম্প্রতি আমাদের সাথে যোগ দিয়েছেন সেই প্রবীণ কৃষক নেতা রামদেও ভার্মাকে জাতীয় কার্যকরী সমিতিতে জাতীয় সহ সভাপতিরূপে যুক্ত করার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়।

এছাড়া বৈঠক থেকে বিহারের মধুবনীর কৃষক নেতা মনোজ ঝা, কলকাতা থেকে দিল্লীর কৃষক আন্দোলনে যোগ দিতে যাওয়া সমাজকর্মী মৌমিতা গুপ্ত সহ বিভিন্ন নেতা-কর্মী ও বিশিষ্টজন যারা অতি সম্প্রতি করোনা ও অন্যান্য কারণে প্রয়াত হয়েছেন তাদের প্রতি শ্রদ্ধা জানানো হয়, শোকপ্রস্তাব গ্রহণ করা হয়।

The BJP's planned attack

সিপিআই(এমএল) লিবারেশন ত্রিপুরা রাজ্য কমিটি গত ১০ মে এক প্রেস বিবৃতিতে জানিয়েছে, বিরোধী দলনেতা মানিক সরকার, উপনেতা বাদল চৌধুরী সহ এক বামপন্থী প্রতিনিধি দল ২ মে পাঁচ রাজ্যের নির্বাচনের ফল প্রকাশের পর আক্রান্ত কর্মীদের বাড়িতে খোঁজ খবর নিয়ে ফেরার পথে বিজেপি’র পরিকল্পিত আক্রমণের শিকার হন। পুলিশের সামনে এই ঘটনা ঘটেছে। মানিক সরকার ও বাদল চৌধুরীর গায়ে আঘাত লেগেছে। বিজেপি এই করোনার দ্বিতীয় ঢেউকে তোয়াক্কা না করে ভীড় জমায়েত সংগঠিত করে এই হামলা করে। প্রচলিত করোনা বিধিকে উল্লঙ্ঘন করে শাসক বিজেপি এই ঘটনা ঘটায়। দক্ষিণ ত্রিপুরা জেলার শান্তিরবাজারে এই আক্রমণের ঘটনা ঘটে। পুলিশের নির্বিকার ভূমিকাতে প্রমাণ হয় এই ঘটনা রাজ্য বিজেপি’র পৃর্ব পরিকল্পিনা প্রসূত। এপ্রিল মাসে এডিসি নির্বাচনে পরাস্ত হওয়ায় এবং পাঁচ রাজ্যের বিধানসভা নির্বাচনে বিশেষত পশ্চিমবঙ্গে ধাক্কা খাওয়ার পর হতাশাগ্রস্ত হয়ে বিজেপি এই আক্রমণের ছক তৈরি করে। সিপিএমের একের পর এক অফিসে অগ্নিসংযোগ করে। নেতা কর্মীদের শারীরিক ভাবে নির্যাতন করে। অনেকেই আহত হয়ে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় আছে। বাড়ি ঘরে হামলা হুজ্জুতি চালায় যাতে বামপন্থীরা রাজনৈতিক কার্যকলাপ করতে না পারে। বিজেপি গত তিন বছর ধরে বিরোধী বামপন্থী দলগুলোর উপরে ধারাবাহিকভাবে এই সন্ত্রাস পরিকল্পিতভাবে জারি রেখেছে। বিরোধী দলনেতার উপর, বামপন্থী বিধায়কদের উপর জেলায় জেলায় হামলার ঘটনা এর আগেও ঘটেছে। এভাবে ত্রিপুরা বিজেপির শাসনে গণতন্ত্রের বধ্যভৃমিতে পরিণত হয়েছে। সংবিধান প্রদত্ত সংসদীয় গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ, রীতিনীতি, বিরোধী দলের রাজনৈতিক অধিকার, মর্যাদা আজ বিপন্ন। আইনের শাসন ভেঙ্গে পড়েছে। জঙ্গলের রাজত্ব কায়েম হয়েছে। এই অবস্থায় পশ্চিমবঙ্গে রাজনৈতিক সন্ত্রাস নিয়ে ত্রিপুরার মুখ্যমন্ত্রী ও বিজেপি কোন মুখে প্রতিবাদ করছেন?

সিপিআই(এমএল) লিবারেশনের ত্রিপুরা রাজ্য কমিটি বিরোধী দলনেতা ও বাম প্রতিনিধি দলের ওপর বিজেপি’র দ্বারা সংগঠিত এই আক্রমণের তীব্র নিন্দা জানিয়েছে। এই ঘটনায় প্রকৃত দোষীদের অবিলম্বে গ্রেপ্তার করে তাদের বিরুদ্ধে উপযুক্ত শাস্তিমূলক পদক্ষেপ গ্রহণ করার দাবি করা হয়েছে। গণতন্ত্রের বধ্যভূমি ত্রিপুরায় বিরোধী দলের উপর ধারাবাহিক ভাবে সংগঠিত রাজনৈতিক সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে সবাইকে প্রতিবাদে ও প্রতিরোধে সামিল হওয়ার জন্য আহ্বান জানানো হয়েছে।

Death march in Covid: Modi government

আমেরিকার বিখ্যাত টাইম ম্যাগাজিনের সাংবাদিক রানা আইয়ুব-এর একটি নিবন্ধ সম্প্রতি আলোড়ন তুলেছে। সেখানে খুব যুক্তিপূর্ণ বিশ্লেষণ ও তথ্য সমাবেশের মধ্যে দিয়ে রানা দেখিয়েছেন কীভাবে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর নেতৃত্বাধীন বিজেপি সরকারের ঔদাসীন্যর কারণেই করোনা মহামারির এই দ্বিতীয় ঢেউ গোটা দেশে এক মারাত্মক পরিস্থিতি সৃষ্টি করল। রানা আইয়ুবের লেখাটি শুরু হয়েছে ভারতের এক বিখ্যাত ফুসফুস বিশেষজ্ঞ (পালমনোলজিস্ট) ডাক্তার জলিল পার্কারের কথা দিয়ে। পার্কার দীর্ঘদিন ধরেই কাজ করছেন ভারতের অন্যতম সেরা চিকিৎসা প্রতিষ্ঠান বলে পরিগণিত মুম্বাইয়ের লীলাবতী হাসপাতালে। গত বছর তিনি নিজেই করোনা আক্রান্ত হয়ে দীর্ঘদিন আইসিইউ’তে ভর্তি ছিলেন, প্রায় মৃত্যমুখ থেকে ফিরে এসেছেন। তারপরেও নিষ্ঠার সঙ্গে নিজের কাজ করে গিয়েছেন। কিন্তু করোনার এই দ্বিতীয় ঢেউ-এর সময়ে সরকারী অব্যবস্থা আর অপরিণামদর্শিতা তাঁর ধৈর্যের সব বাঁধ ভেঙে দিয়েছে। সরকারের বিরুদ্ধে তীব্র ক্ষোভে তিনি প্রশ্ন ছুঁড়ে দিয়েছেন যে হাসপাতালে যদি রোগীদের জন্য বেড না থাকে, অক্সিজেন সরবরাহ ঠিক না থাকে তাহলে ডাক্তার বা অন্যান্য স্বাস্থ্যকর্মীরা রোগীকে বাঁচাবেন কীভাবে? তাঁর আক্ষেপ যে, আমাদের স্বাস্থ্য পরিকাঠামো ভেঙে পড়ছে এবং আমরা আমাদের দেশবাসীকে একের পর এক মৃত্যুমুখে ঠেলে দিচ্ছি।

রানা এই লেখায় কোভিডের দ্বিতীয় ঢেউ নিয়ে অনেক তথ্য পরিসংখ্যান দিয়েছেন। আমাদের এই লেখার সময় তা আরো ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। ব্রাজিলকে পেছনে ফেলে মোট কোভিড আক্রান্তের সংখ্যায় ভারত এখন কেবল আমেরিকার পেছনে এবং আক্রান্ত ও মৃত্যুর ঊর্ধ্বগতি এই মুহূর্তে বিশ্বে সর্বোচ্চ। রানা বলেছেন সরকারী হিসাব মতে দেশে দৈনিক কোভিড মৃত্যুর সংখ্যা ২,০০০-র আশেপাশে বলে বলা হলেও স্বাস্থ্য দপ্তরের কর্তারা বেসরকারিভাবে তাঁকে জানিয়েছেন সংখ্যাটা অন্তত এর পাঁচগুণ, প্রায় ১০,০০০ হবে। ২৩ এপ্রিল দিল্লীর বিখ্যাত গঙ্গারাম হাসপাতাল এক বিবৃতিতে জানিয়েছিল, তাঁদের হাসপাতালেই অক্সিজেনের অভাবে একদিনে ২৫ জন রোগীর মৃত্যুর কথা।

এই ভয়াবহ পরিস্থিতিকে নানাভাবেই ডেকে এনেছে সরকারের মারাত্মক উদাসীনতা ও অসচেতনতা। লক্ষ লক্ষ মানুষকে হরিদ্বারের কুম্ভমেলায় অংশগ্রহণের অনুমতি দেওয়া হয়েছে এবং সেখান থেকে রোগ দেশের কোণে-কোণে মারাত্মকভাবে ছড়িয়েছে। গতবছর যে সরকার কোভিড ছড়ানোর দায়ে তবলিগি জমাতের একটি সমাবেশকে অপরাধীকরণের দায়ে ব্যস্ত হয়ে পড়েছিল, এবার তারা কুম্ভমেলায় লক্ষ লক্ষ মানুষের জমায়েতে যে শুধু অনুমতি দিয়েছে তাই নয়, উত্তরাখণ্ডের বিজেপি নেতারা সংবাদপত্রে পাতাজোড়া বিজ্ঞাপণ দিয়ে জানিয়েছেন যে কুম্ভমেলায় যোগদান নিরাপদ। করোনার দ্বিতীয় ঢেউ যখন দেশে আছড়ে পড়ছে সেই সময়েই ২০ মার্চ উত্তরাখণ্ডের মুখ্যমন্ত্রীর আশ্চর্য এই বিবৃতি প্রকাশিত হয়েছে যে কাউকেই কোভিডের কারণে কুম্ভমেলায় যোগদান থেকে বিরত করা হবে না। সেইসঙ্গে সেখানে তিনি এও বলেন যে ঈশ্বর বিশ্বাসের শক্তি কোভিড ভাইরাসের আতঙ্ককে মুছে দেবে। এপ্রিলের মাঝামাঝি প্রধানমন্ত্রী যখন ট্যুইট করে কুম্ভমেলায় যোগদানকে প্রতীকী করার কথা বলেছেন, তার আগেই এটা গোটা দেশে মহামারী ছড়ানোর ক্ষেত্রে ‘সুপার স্পেডার’-এর ভূমিকা গ্রহণ করেছে।

সরকার সময় থাকতে কোভিডের দ্বিতীয় ঢেউ-এর ব্যাপারে যে কোনও প্রস্তুতিই নেয়নি, অক্সিজেন সরবরাহ থেকে হাসপাতাল বেড ও অন্যান্য পরিকাঠামো তৈরি করার ব্যাপারে আশ্চর্য উদাসীনতা দেখিয়েছে তা ঠান্ডা মাথায় খুনের মতোই ভয়াবহ ব্যাপার। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ থেকে শুরু করে সরকারের তাবড় ব্যক্তিরা মূলত ব্যস্ত থেকেছেন পশ্চিমবঙ্গ সব বিভিন্ন নির্বাচন ও ক্ষমতা দখল নিয়ে। চরম উপেক্ষিত হয়েছে জনস্বাস্থ্যের দিকটি।

টাইম ম্যাগাজিনের এই নিবন্ধটির মতোই বিশ্বের আরো নানা দেশের নানা প্রখ্যাত সংবাদপত্র মোদী সরকারকে ভারতের এই মৃত্য মিছিল ও চূড়ান্ত চিকিৎসা সঙ্কটের জন্য দায়ি করেছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নামী সংবাদ সংস্থা ‘দ্য ওয়াশিংটন পোস্ট’ তীব্র ভর্ৎসনা করেছে ভারতের বেপরোয়া মনোভাবকে।

তারা লিখেছে, “এই পরিস্থিতি এড়ানো যেত। খুব দ্রুত বিধিনিষেধ শিথিল করায় ভুগতে হচ্ছে সাধারণ মানুষকে। হাজার হাজার মানুষ স্টেডিয়ামে বসে ক্রিকেট ম্যাচ দেখছেন, সিনেমাহল খুলে দেওয়া হয়েছে। একইসঙ্গে সরকার কুম্ভমেলায় ধর্মীয় জমায়েতের অনুমতি দিয়ে দিচ্ছে, ভারত নিজেই বিপদ ডেকে এনেছে।”

ব্রিটেনের ‘দ্য গার্ডিয়ান’ আবার প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীকে তুলোধোনা করেছে। সম্পাদকীয়তে প্রকাশিত হয়েছে, “ভারতের প্রধানমন্ত্রীর অতিরিক্ত আত্মবিশ্বাস দেশের এই বিপর্যয়ের জন্য দায়ী। তোষামোদকারীদের পরামর্শ শুনে আত্মবিশ্বাসে ভুগেছেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী। নিজের বোধবুদ্ধি হারিয়ে চূড়ান্ত গাফিলতি করেছেন। উনি নিজের ভুল স্বীকার করে সিদ্ধান্ত সংশোধন করুন। তাঁর উচিত বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে আলোচনা করে কীভাবে বিধিনিষেধ আরোপ করা যায় সেটা দেখা। সরকার তার প্রতিশ্রুতি রাখুক। তাঁর দলের আদর্শের বাইরে গিয়ে এখন একতার বার্তা দেওয়া, জনস্বাস্থ্য পরিকাঠামোর অবনতির জন্য ভবিষ্যতের ইতিহাসবিদরা মোদীকে তাঁর চিন্তাভাবনার অভাবের জন্য তুলোধোনা করবেন।”

ব্রিটেনের তথা বিশ্বের জনপ্রিয় সংবাদমাধ্য ‘বিবিসি’র সমালোচনাটিও প্রণিধানযোগ্য। ‘বিবিসি’র রিপোর্ট অনুযায়ী, “বেশ কয়েকটা কারণে ভারতে দ্বিতীয় ঢেউয়ের সময় আক্রান্তের সংখ্যা বেড়েছে। স্বাস্থ্যবিধির দফারফা, মাস্কহীন মানুষ, একইসঙ্গে কুম্ভমেলায় হাজার হাজার মানুষের ভিড়। এই রেকর্ড সংখ্যক রোগীর ভিড়ে হাসপাতালগুলিতে বেড ও অক্সিজেনের ঘাটতি হয়েছে। রোগীর পরিজনরা চিকিৎসার জন্য হাহাকার করছেন।”

অস্ট্রেলিয়ার ‘এবিসি নিউজ’এর রিপোর্ট অনুযায়ী, “বিপর্যয় খুব সহজে এবং পরিকল্পনামাফিক এড়ানো যেত। তিনটি কারণে এই ভয়ঙ্কর পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে - সরকারের প্রতিক্রিয়া, মানুষের ব্যবহার এবং করোনা ভ্যারিয়েন্ট।” মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ‘টাইম ম্যাগাজিন’এর কথা দিয়েই শেষ করা যাক। “শক্তি ও ক্ষমতার সঙ্গে প্রয়োজন ছিল দায়িত্ববোধের। দায়িত্ব থেকে এড়িয়ে গিয়েছে সরকার। মোসাহেবরা মন্ত্রিসভায় থেকে প্রধানমন্ত্রীকে করোনা মোকাবিলার জন্য শুধু বাহবাই দিয়ে গেছেন। এদিকে, টেস্টিং মন্থর হয়েছে, আর মানুষকে আরও বেপরোয়া হতে এবং করোনাকে পাত্তা না দেওয়ায় উৎসাহিত করেছে।”

- সৌভিক ঘোষাল 

working people of the country are in deep crisis

কোভিডের ১ম ঢেউ দেখেছিল আচমকা লকডাউনে অগণন পরিযায়ী শ্রমিকদের দুর্দশা, স্বাধীনতা উত্তর ভারতবর্ষ যা আগে কখনো দেখেনি। শুধু ভারত নয়, কোভিড আক্রান্ত দুনিয়ার কোনো দেশেই ওই অমানবিক দৃশ্যপট ফুটে ওঠেনি।

কোভিডের ২য় ঢেউ দেখালো আরও একটি সংকট। যে সংকট গোটা ভারতে এতো নিদারুন নির্মমতায় আগে কখনও আছড়ে পড়েনি, আর তা হোলো অক্সিজেনের সংকট। অক্সিজেনের অভাবে একের পর এক নাগরিক মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়লো, ভারত এই মর্মান্তিক অধ্যায়ের সাক্ষী আগে কখনো হয়নি। সমস্ত নাগরিকদের জীবনের অধিকার সুরক্ষিত রাখার বহু ঢক্কানিনাদিত রাষ্ট্রীয় ঘোষণা যে কত বড় রসিকতা, এবারের কোভিড হানায় তা প্রকট ভাবে সামনে আছড়ে পড়ল। এমনকি মৃতের প্রতি শেষ সম্মানও দেখাতে পারলোনা আমাদের সরকার বাহাদুর। সংবাদ মাধ্যমে প্রকাশ, কুকুর টেনে ছিঁড়ে খাচ্ছে কোভিড আক্রান্ত মৃতদেহ, উত্তর প্রদেশের যমুনা নদীতে, বিহারেও ভাসতে দেখা গেছে সারি সারি শব, শ্মশানে স্থানাভাবে গাড়ির পার্কিং লট হয় উঠেছে শ্মশান ভূমি, মৃতের প্রতি বিন্দুমাত্র শেষ সম্মান না দেখিয়ে ডাই করে আবর্জনার মতো ফেলে রাখা হয়েছেশবের স্তুপ।

এই আমাদের ভারতবর্ষ। মোদী জমানার ভারতবর্ষ।

চরম অসংবেদনশীল, নির্লিপ্ত, অপরাধসম উদাসীনতা নিয়ে দিব্যি দিন কাটাচ্ছেন আমাদের রাষ্ট্র নায়কেরা। আর অন্তহীন মৃতের এই হাহাকার ও কান্নার মাঝে রাজাধিরাজের ২০ হাজার কোটি টাকার সেন্ট্রাল ভিস্টার নির্মাণ কাজ চলছে উল্কার গতিতে। কুৎসিত বাহুল্য ও উৎকট প্রাচূর্যের গা ঘিন ঘিন করা এই প্রদর্শনী চলছে সর্বোচ্চ আদালতের অনুমতি সাপেক্ষে।

কোভিডের ২য় ঢেউ মোকাবিলা করার এক বিচিত্র পন্থা নিয়েছে মোদীরাজ। এবার কোভিড সামলানোর পুরো দায় চাপিয়ে দেওয়া হলো রাজ্যগুলোর উপরে। কেন্দ্রীয় স্তর থেকে লকডাউন ঘোষণা না হলেও বকলমে দেশের অধিকাংশ রাজ্যেই লকডাউন, রাত্রিকালীন কার্ফু, ১৪৪ ধারা, লোকাল ট্রেন সহ গণপরিবহন বন্ধ। হাতে গোনা লোকজন নিয়ে চলছে অফিস আদালত, বিভিন্ন বেসরকারি সংস্থা। লকডাউন-১’র প্রকোপ কাটিয়ে ওঠার আগেই নেমে এলো লকডাউন-২, কোভিড ২য় ঢেউ’র হাত ধরে।

লকডাউন শ্রমজীবী মানুষের উপর যে মারাত্মক আঘাত নামিয়েছে, তার ভুরি ভুরি তথ্য সামনে এসেছে। কয়েকদিন আগে ‘সিএমআইই’ এক রিপোর্ট প্রকাশ করে জানালো, এই এপ্রিলে ৩৪ লক্ষ বেতনভুক কর্মী কর্মচ্যুত হয়েছেন। তাঁরা সকলেই যুক্ত ছিলেন ছোট ও মাঝারি শিল্পের সাথে। প্রথম লকডাউনেই তাদের নাভিশ্বাস ওঠে। আর, কোভিডের দ্বিতীয় সুনামিতে তাদের অস্তিত্বই বিপন্ন হয়ে উঠেছে। এছাড়া, এই এপ্রিলেই ৭৩.৫ লক্ষ কাজ খোয়া গেছে, মার্চ মাসে বেকারত্বের যে হার ছিল ৬.৫ শতাংশ, তা এপ্রিলে বেড়ে দাঁড়ালো ৭.৯৭ শতাংশ! লকডাউনের পাশাপাশি চলতে থাকা আর্থিক মন্থরতার জন্য গ্রামীণ ক্ষেত্রের ছোট শিল্প ছারখার হয়ে গেছে। কিন্তু মোট যে পরিমাণ কাজ লোপাট হয়েছে, তারমধ্যে বেতনভুক কর্মীদের কাজ হারানোর অংশটা খুবই উচ্চহারে, আর, জেএনইউ’র অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক সন্তোষ মেহরোত্রার মতে এটা গভীর এক সংকটকেই প্রতিফলিত করে।

আজিম প্রেমজি বিশ্ববিদ্যালয়ের পক্ষ থেকে প্রকাশিত ‘স্টেট অফ ওয়ার্কিং ইন্ডিয়া, ২০২১ রিপোর্ট’ জানিয়েছে যে গতবছর লকডাউনের জন্য ২৩ কোটি ভারতীয় নতুন করে যুক্ত হয়েছে দারিদ্র সীমার নীচে। গতবছর আচমকা লকডাউন ঘোষিত হওয়ার পর কর্মচ্যুত শ্রমিকরা এখন এমন সমস্ত কাজের সাথে যুক্ত হয়েছেন যেগুলো আগের কাজের তুলনায় অনেক বেশী ঝুঁকিপূর্ণ, অনেক বেশি ইনফর্মাল।

সিএমআইই’র সিইও মহেশ ভ্যাস বলেছেন, সবচেয়ে আগে সরকারকে স্বীকার করতে হবে যে বিপুল সংখ্যক কাজ লোপাট হয়েছে। আর তারজন্য সরকারকে বিপুল পরিমানে ঋণ নিয়ে পরিকাঠামোর উন্নয়নে বিনিয়োগ করতে হবে, তার মাধ্যমে সৃষ্টি করতে হবে নতুন কর্মসংস্থান, শহুরে কর্মসংস্থানের প্রকল্প তৈরি করতে হবে, আর বিপন্ন জনসাধারণের ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টে সরাসরি টাকা পাঠাতে হবে। ভারতের প্রায় সমকক্ষ ব্রাজিল কোভিড ত্রাণ খাতে ঢেলেছে তাদের জিডিপির ১২ শতাংশ, এদিকে ভারত বিনিয়োগ করেছে জিডিপির মাত্র ২.২ শতাংশ। যে কোভিড অতিমারি সরকারি স্বাস্থ্য ব্যবস্থাকে উন্নত করার নির্মম শিক্ষা দিল অনেক প্রাণের বিনিময়ে, মোদী সেখান থেকেও কোন শিক্ষা নিতে প্রস্তুত নয়। ২০২১-২২’র স্বাস্থ্যখাতে এবারের বাজেট বরাদ্দ থেকে কোভিড ম্যানেজমেন্টের জন্য বরাদ্দ বাদ দিলে দেখা যাবে মোট বরাদ্দ গতবারের থেকেও কম!

পৃথিবীর মধ্যে সবচেয়ে নির্দয় ও কঠোর লকডাউন হয়েছিল ভারতে। তখন সরকার যুক্তি দিয়েছিল যে জীবিকা রক্ষা করার চেয়ে মানুষের প্রাণ বাঁচানোটাই ছিল সবচেয়ে বেশি জরুরী। কিন্তু পরবর্তী ঘটনা প্রবাহ প্রমাণ করলো, সরকারের এই সমস্ত কথাবার্তা নেহাতই অসার। ‘বিটেন অর ব্রকেন’ শিরোনামে বিশ্ব ব্যাঙ্ক এক রিপোর্ট প্রকাশ করে। সেখানে দেখানো হয়েছে, দক্ষিণ এশিয়ার সাতটি দেশের তুলনায় ভারত কোভিড মোকাবিলায় অনেক প্রশ্নে বেশ পিছিয়ে রয়েছে। কঠোর লকডাউন সত্ত্বেও সেপ্টেম্বর শেষে রিপোর্ট বলছে, ভারতে কোভিড সংক্রমণের হার বাংলাদেশের তুলনায় ১৭ গুণ বেশি। দশ লক্ষ সংক্রমিতের মধ্যে ভারতের এই হার ছিল ৪,৫৭৪ – যা বাংলাদেশ ছিল ২,২০৭, নেপালে ২,৬৭০, আর পাকিস্থানে ১,৪১৬।

এবারের নতুন কোভিড ঢেউয়ে চাকুরিরত তরুণ কর্মীরাই সবচেয়ে বেশি আক্রান্ত হচ্ছেন। কিন্তু এই সম্ভাবনাময় তরুণ মানব সম্পদকে টিকার আওতায় এনে সুরক্ষিত রাখার অগ্রাধিকার কেন্দ্রীয় সরকারের নেই। এরাজ্যে বা দেশের কোথাও শ্রমিকদের, তাদের পরিবারের সদস্যদের টিকাকরণের দায়িত্ব এখনও নেয়নি ইএসআই। হাতে গোনা মুষ্ঠিমেয় কিছু স্থায়ী চরিত্র সম্পন্ন কর্মীর চাকুরি ও বেতন প্রশ্নে নিরাপত্তা থাকলেও বিপুল সংখ্যক কর্মী স্বাস্থ্য ও আর্থিক ক্ষেত্রে চরম নিরাপত্তাহীনতার মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন। না কেন্দ্র না কোন রাজ্য সরকার কাজ হারানো শ্রমিক কর্মচারীদের জন্য বিন্দুমাত্র কোনো সুরক্ষা ব্যবস্থা, তাদের মজুরির নিরাপত্তা আজ পর্যন্ত দিতে পারলো না। এদিকে, অর্থনীতিবিদ জঁ দ্রেজ জানিয়েছেন, জীবিকার গভীর সংকটের দিকে এগোচ্ছে ভারত। আর, শ্রমিক শ্রেণির কাছে এবারের সংকট হবে আরও মারাত্মক। সেই প্রথম লকডাউনের পর থেকেই দেশ বিদেশের প্রথিতযশা অর্থশাস্ত্রীরা অর্থনীতিকে অতিমারীর কবল থেকে বার করে আনতে সাধারণ মানুষের হাতে সরাসরি নগদ দেওয়ার প্রস্তাব দিলেও মোদী সরকার তার স্বভাবজাত ঔদ্ধত্যে সেই সমস্ত কিছু প্রত্যাখ্যান করেছে।

আমাদের রাজ্যেও নতুন সরকার নির্বাচিত হওয়ার পরই কোভিড মোকাবিলায় একপ্রস্থ পদক্ষেপ ঘোষণা করেছে। লোকাল ট্রেন বন্ধ করার আশু প্রভাব পড়েছে অগনিত ইনফর্মাল শ্রমিকদের উপর। রাতারাতি কর্মহীন হয়ে পড়লেন লক্ষ লক্ষ পরিচারিকা, হকার, নির্মাণ থেকে শুরু করে সেই সমস্ত খেটে খাওয়া শ্রমজীবী জনতা যাদের উপার্জন স্থানিক নয়, রুটি রুজির জন্য বিভিন্ন স্থানে ছুটে বেড়াতে হয়। ইতিমধ্যে, কাঁচা পাটের অভাবের কারণে রাজ্যে প্রায় ন’টা চটকল বন্ধ হয়ে গেল। কর্মহীন হলেন প্রায় চল্লিশ হাজার শ্রমিক। যেগুলো চালু রয়েছে, সেগুলো আবার চলছে মাত্র দুই শিফটে, কম শ্রমিক নিয়ে। এবার নতুন কোভিড বিধি অনুযায়ী, চা এবং চট, এই দু’টি শ্রম নিবিড় শিল্পে ৩০ শতাংশ কর্মী নিয়ে কাজ চালানোর নির্দেশ জারি হয়েছে, যা বাস্তবে প্রায় অসম্ভব। এই সমস্যা নিয়ে রাজ্যের ট্রেড ইউনিয়নগুলো মুখ্যমন্ত্রী সহ কেন্দ্রীয়স্তরে বস্ত্রমন্ত্রী, কেন্দ্রীয় শ্রম কমিশনারের কাছে ডেপুটেশন দিলেও আজ পর্যন্ত কোনো ইতিবাচক পদক্ষেপ কোনো পক্ষ থেকেই গ্রহণ করা হলো না।

ডিজাস্টার ম্যানেজমেন্ট আইনবলে কর্মীদের কর্মস্থলে ঢুকতে দেওয়া না হলে কেন তাঁদের কাজ যাবে? কেনই বা কেন্দ্র বা রাজ্য এই মর্মে তাঁদের কাজ ও মজুরি নিশ্চিত করবে না? শিল্পক্ষেত্রকে দু’হাত উপুড় করে হরেক ছাড় ও সুযোগ সুবিধা দেওয়ার সময় কেনই বা কর্মীদের চাকুরি ও মজুরি নিশ্চিত করানোর শর্ত থাকবে না? সরকারের অগ্রাধিকারের তালিকায় থাকবে না কেন শ্রমিকদের কাজ ও মজুরি নিশ্চয়তার পদক্ষেপটি?

গভীর সংকটের জালে আজ গোটা দেশের শ্রমজীবী, সম্পদ সৃষ্টিকারী জনতা। তাঁদের স্বাস্থ্য, মজুরি, কাজ বাঁচিয়ে রাখার দাবি আজ সর্বসাধারণের দাবি হয়ে উঠেছে। এই দাবিতেই আগামীতে সংগঠিত করতে হবে আন্দোলন।

- অতনু চক্রবর্তী 

Why “unforgivable”?

কোভিড১৯’র তৃতীয় ঢেউ আগতপ্রায়। আশঙ্কার কথা - এই পর্বে শিশুরাও আক্রান্ত হতে পারে। জানিয়েছেন ‘এইমস’এর অধিকর্তা রণদীপ গুলেরিয়া।

দেশে মোট আক্রান্তের সংখ্যা সোয়া দু’কোটি ছাড়িয়ে গেছে। সরকারি পরিসংখ্যান অনুযায়ী মৃতের সংখ্যা ছাড়িয়ে গেছে ২ লক্ষ ৫০ হাজার। কোভিড-১৯ ভারতে মৃত্যুর দ্বিতীয় বৃহত্তম কারণ হয়ে উঠেছে। ভারতে করোনার দ্বিতীয় ঢেউয়ের এই বিপর্যয়কে বিশেষজ্ঞরা ‘মানুষের তৈরি’ বলছেন। দেশ জুড়ে স্বাস্থ্য পরিকাঠামো ভয়ঙ্করভাবে বিপর্যস্ত।

এই প্রসঙ্গে বিশ্ববিশ্রুত মেডিক্যাল জার্নাল ‘ল্যান্সেট’ তার সাম্প্রতিক সম্পাদকীয় প্রতিবেদনে মোদী সরকারের কঠোর সমালোচনা করেছে। ‘ল্যান্সেট’ বলেছে, “ভয়ঙ্কর এই করোনা আবহেও সংক্রমণ রোখার থেকে সমালোচনার টুইট মুছতে বেশি আগ্রহ দেখিয়েছে মোদী সরকার”। বলেছে, “দ্বিতীয় ঝড়ের আভাস সত্ত্বেও সরকার কোন ব্যবস্থা নেয়নি। মার্চের গোড়ায় যখন দ্বিতীয় ঢেউ আছড়ে পড়ছে, ভারতের স্বাস্থ্যমন্ত্রী তখনও দাবি করতে থাকেন ভারত করোনা-জয়ের পথে। অথচ সেই সময় আইসিএমআর সমীক্ষায় ধরা পড়েছে দেশের মাত্র ২১% মানুষের শরীরে অ্যান্টিবডি তৈরি হয়েছে”। জানুয়ারির শেষে দাভোস বিশ্ব অর্থনৈতিক সম্মেলনে মোদী ভারতের কোভিড-সাফল্যের সাতকাহন শুনিয়ে আসেন। ‘ল্যান্সেট’এর প্রতিবেদনে ভারতের কোভিড টাস্ক ফোর্সের বহুমাস বৈঠক না করা, কেন্দ্রীয় সরকারের ভ্যাকসিন নীতি ও টিকাকরণের শ্লথগতিরও সমালোচনা করা হয়। বহুবার সতর্ক করা সত্ত্বেও সরকার ধর্মীয় উৎসবপালন ও রাজনৈতিক সমাবেশের মতো অতিসংক্রামক অনুষ্ঠানগুলিকে ছাড়পত্র দেওয়ায় সেগুলি সুপারস্প্রেডারের কাজ করেছে। আশঙ্কা প্রকাশ করা হয়েছে যে আগামী আগস্টের মধ্যে দেশের কোভিড-মৃত্যুর সংখ্যা ১০ লক্ষে পৌঁছাবে আর সে ক্ষেত্রেও ‘জাতীয় বিপর্যয়ের’ জন্য দায়ী থাকবে মোদী সরকার। এই সরকার সমালোচকদের কণ্ঠরোধের চেষ্টা করেছে এবং কোন পরামর্শ শোনেনি। এই মনোভাবকে ‘ক্ষমার অযোগ্য’ বলেও অভিহিত করা হয়েছে এই প্রতিবেদনে।

অক্সিজেনের অভাবে দেশজুড়ে গণচিতা জ্বলেছে। অথচ গত নভেম্বরেই সংসদীয় কমিটি অক্সিজেন সরবরাহ ও হাসপাতালে শয্যা সংখ্যা বাড়ানোর ব্যাপারে সরকারকে সতর্ক করেছিল। সেই অক্সিজেনের জন্য রাজ্যগুলিকে আদালতে পর্যন্ত দৌড়াতে হয়েছে। অবশেষে সুপ্রিম কোর্ট কেন্দ্রীয় সরকারের উপর আর ভরসা রাখতে না পেরে অক্সিজেনের বিলিবণ্টন ও বরাদ্দ ঠিক করার জন্য ১২ বিশেষজ্ঞের একটি টাস্ক ফোর্স গঠন করেছে।

গত বছর সেপ্টেম্বরে প্রথম ঢেউয়ের সর্বোচ্চ দৈনিক সংক্রমণ ৯৩,০০০এ পৌঁছে ক্রমশ কমতে কমতে এবছর মাঝ ফেব্রুয়ারীতে ১১,০০০এ পৌঁছায়। মার্চের গোড়ায় কেন্দ্রীয় স্বাস্থ্যমন্ত্রী হর্ষবর্ধন ‘করোনা-বিজয়ে’ হর্ষোৎফুল্ল হয়ে নরেন্দ্র মোদীর ভূয়সী প্রশংসা করে বলেন, “মোদীজীর নেতৃত্ব বিশ্বে আন্তর্জাতিক সহযোগিতার এক দৃষ্টান্ত হয়ে উঠছে।” এরপর বহু-চর্চিত টিকা-কূটনীতির রূপায়ণে একুশের জানুয়ারি থেকে বিদেশে টিকা পাঠানো শুরু হয়।

দ্বিতীয় ঢেউয়ের আগাম সতর্কতাকে অগ্রাহ্য করেই ২৬ ফেব্রুয়ারি পাঁচটি রাজ্যে নির্বাচনী নির্ঘণ্ট প্রকাশ করে নির্বাচন কমিশন। ৮২৪টি আসনে ভোটদাতার সংখ্যা ১৮৬০ লক্ষ। শুধু তাই-ই নয়, পশ্চিমবঙ্গের ২৯৪টি আসনের জন্য আট দফার নির্ঘন্ট ঘোষিত হল রাজ্য সরকারের আপত্তি অগ্রাহ্য করেই। ফেব্রুয়ারী থেকেই দিল্লীর বিজেপি নেতারা বঙ্গে আসা শুরু করেন। পূর্ণোদ্যমে প্রচার শুরু হয়। মার্চ-এপ্রিল জুড়ে প্রধানমন্ত্রী, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ভিন রাজ্যের বিজেপি মুখ্যমন্ত্রীসহ অন্যান্য শীর্ষ ও রাজ্য নেতারা অসংখ্য সভা-সমাবেশ রোড-শো করেন। অন্যান্য দলেরও সভা-সমাবেশ মিছিল চলে পাল্লা দিয়ে কোভিড-১৯ বিধিকে সম্পূর্ণ উপেক্ষা করে। নির্বাচন কমিশন তখন নিদ্রিত ছিল। এই বেলাগাম জমায়েতে নিষেধাজ্ঞা আরোপের কোন ন্যূনতম চেষ্টাও দেখা যায়নি, বিশেষজ্ঞরা বারংবার সতর্ক করা সত্ত্বেও। এর অনিবার্য পরিণতিতে সংক্রমণ ছড়ালো আগুনের মতো হু হু করে। রাজ্যের দৈনিক সংক্রমণ ও মৃত্যুর সংখ্যাটা একটু দেখে নেওয়া যাক।

১ মার্চ ২০২১ - দৈনিক সংক্রমণ ১৯৮, দৈনিক মৃত্যু ০ (কোভিড পর্বে এই প্রথম দৈনিক মৃত্যু শূন্যে পৌঁছেছিল);
৫ এপ্রিল - দৈনিক সংক্রমণ ১৯৫৭, দৈনিক মৃত্যু ৪;
১৮ এপ্রিল - দৈনিক সংক্রমণ ৮৪১৯, দৈনিক মৃত্যু ২৮;
২৬ এপ্রিল - দৈনিক সংক্রমণ ১৫৯৯২, দৈনিক মৃত্যু ৬৮;
৫ মে - দৈনিক সংক্রমণ ১৭৬৩৯, দৈনিক মৃত্যু ১০৭;
১১ মে - দৈনিক সংক্রমণ ২০১৩৬, দৈনিক মৃত্যু ১৩২

নির্বাচন পর্যায়েই চারজন প্রার্থীর মৃত্যু হয়েছে। নির্বাচন কমিশনের চূড়ান্ত অব্যবস্থায় ডিসিআরসি’তে গাদাগাদি ভিড়ে দীর্ঘক্ষণ দাঁড়িয়ে থেকে এক মহিলা ভোটকর্মী হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে মারা যান। ওখান থেকে অনেকেই সংক্রমিত হয়েছেন। সব ভোটকেন্দ্রে কোভিড বিধি ঠিকমতো মানা হয়নি।

যে রাজ্যগুলির নির্বাচন ছিল, সেখানকার করোনা পরিস্থিতির ভয়াবহতার প্রেক্ষিতে এক মামলায় মাদ্রাজ হাইকোর্টের প্রধান বিচারপতি সঞ্জীব বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বাধীন বেঞ্চ এক নজিরবিহীন পর্যবেক্ষণে জানায়, করোনার দ্বিতীয় ঢেউয়ের জন্য নির্বাচন কমিশনই দায়ী এবং কমিশনের আধিকারিকদের বিরুদ্ধে খুনের মামলা রুজু করা উচিত। কলকাতা হাইকোর্টও এক জনস্বার্থ মামলায় একদিকে যেমন রাজনৈতিক দলগুলোকে তীব্র কটাক্ষে সংক্রমণ বহুগুণ বাড়িয়ে তোলা, মিছিল-মিটিং বন্ধ করার নির্দেশ দেয়, তেমনই নির্বাচন কমিশনকে চূড়ান্ত ক্ষমতার অধিকারী হয়েও এই ভয়ানক পরিস্থিতিতে কোনো সুনির্দিষ্ট পদক্ষেপ না নিয়ে শুধু সার্কুলার জারি করে দায় এড়ানোর জন্য তিরস্কার করে।

মোদী ১৭ এপ্রিলের নির্বাচনী জনসমাবেশ দেখে আনন্দে আপ্লুত হয়েছিলেন। দেশে সেদিন কোভিড আক্রান্ত হয়েছেন ২ লক্ষ ৩৪ হাজার মানুষ, মারা গেছেন ১,৩৪১ জন! আর পরের রবিবার ২৫ এপ্রিল ‘মন কী বাত’ অনুষ্ঠানে গাঢ় গলায় বললেন, কোভিডের দ্বিতীয় ঢেউ গোটা দেশকে কাঁপিয়ে দিয়েছে, অনেকে স্বজন হারিয়েছেন; এখন দেশবাসীর ধৈর্য ধরার ও কষ্ট সহ্য করার পরীক্ষা দেওয়ার পালা! এক সপ্তাহ আগেও তাঁর এই বোধোদয় হয়নি!

দিল্লীতে গতবছর ‘তবলিগ-ই-জামাত’এর সদস্যদের হেনস্থা হয়রানি অপমানের কথা সবার মনে আছে। চল্লিশটি দেশ থেকে দু’হাজার সদস্য এসেছিলেন একশো বছরের পুরোনো মসজিদ মারকাজ নিজামুদ্দিনে ইসলামী রীতিনীতি সংস্কৃতি ঐতিহ্য সংক্রান্ত পঞ্চাশ বছরের পুরোনো এক সমাবেশে যোগ দিতে। বিভিন্ন রাজ্যে তাদের বিরুদ্ধে কোভিড বিধি লঙ্ঘন, পর্যটন ভিসায় এসে ধর্ম প্রচার, বিদেশি নাগরিক সহ বিভিন্ন আইনে এফআইআর করা হয়। বিজেপি দেশজুড়ে তাদের বিরুদ্ধে অপপ্রচার চালায়। অবশেষে বম্বে হাইকোর্ট মামলার রায়ে বলে, করোনা আবহে তাদের ‘বলির পাঁঠা’ করা হয়েছে। এ’বছর হরিদ্বারে কুম্ভমেলাকে উত্তরাখণ্ডের সরকার ছাড়পত্র দিয়েছে, কোভিড বিধি মানার শর্তে। ১ এপ্রিল থেকে শুরু হওয়া মেলায় ১২ ও ১৪ এপ্রিল শাহীস্নান করেছেন ৪৮ লক্ষ ৫১ হাজার মানুষ। মোট স্নান করেছেন প্রায় ৭০ লক্ষ মানুষ। কোভিড বিধি শিকেয় তুলে সে স্নানের দৃশ্য সবাই ছবিতে দেখেছেন। দৈনিক সংক্রমণ যখন লক্ষাধিক, দৈনিক মৃত্যু যখন হাজার ছুঁই ছুঁই, তখন এই আয়োজনে কীভাবে অনুমতি দেওয়া হল? এই পুণ্যার্থীরা ভারতের বিভিন্ন রাজ্য থেকে তো বটেই, বাইরে থেকেও আসেন। শাহীস্নানের দিন (১২ এপ্রিল) দেশে দৈনিক সংক্রমণ ছিল ১ লক্ষ ৬৮ হাজার, দৈনিক মৃত্যু ৯০৪! ঐদিন দেশে সক্রিয় রোগীর সংখ্যা বারো লক্ষ ছাড়িয়েছিল। ফল যা হবার হয়েছে। প্রথম ৫ দিনেই আক্রান্ত ১,৭০১ জন। কুম্ভমেলা থেকে মোট কতজন মৃত বা সংক্রমিত, জানা যায়নি। তবে মধ্যপ্রদেশ থেকে আগত ৬১ জনের একটি দলে ৬০ জনই স্নান থেকে ফিরে যখন ‘কোভিড পজিটিভ’ হন, তখন বোঝা যায় কী ভয়াবহ আকারে সংক্রমণ নিয়ে ফিরে গেছেন পুণ্যার্থীরা বিভিন্ন রাজ্যে!

মার্চের মাঝখানে ইন্ডিয়ান ক্রিকেট কন্ট্রোল বোর্ড ১ লক্ষ ৩০ হাজার দর্শককে দু’টি আন্তর্জাতিক ক্রিকেট ম্যাচ দেখার সুযোগ করে দেয় গুজরাটের নরেন্দ্র মোদী স্টেডিয়ামে। ক্রীড়ামোদী দর্শকদের ক’জন মাস্ক পরেছিলেন, দূরত্ববিধি মেনেছিলেন?

Why “unforgivable”?

 

সম্প্রতি ইন্ডিয়ান মেডিকেল অ্যাসোসিয়েশন ভারতে কোভিড-এর দ্বিতীয় ঢেউয়ের জন্য স্বাস্থ্যমন্ত্রকের ঔদাসীন্য ও অনুপযুক্ত পদক্ষেপকে দায়ী করেছে। এই সংস্থা তীব্র ক্ষোভে জানিয়েছে, সরকার বিশেষজ্ঞদের সতর্কীকরণ ও পরামর্শকে কার্যত ‘ডাস্টবিনে’ ফেলে দিয়েছে।

‘দ্য হিন্দু’ রয়টার সূত্রে সম্প্রতি একটি অত্যন্ত গুরুতর বিষয় সামনে এনেছে। গতবছর ডিসেম্বরের শেষে মূলত করোনা ভাইরাসের জনস্বাস্থ্যের পক্ষে বিপজ্জনক জিনোমিক প্রজাতিগুলি (ভ্যারিয়েন্ট) চিহ্নিত করার জন্য কেন্দ্রীয় সরকার ইন্ডিয়ান সার্স কোভ-২ জেনেটিক্স কনসর্টিয়াম নামে একটি উপদেষ্টা ফোরাম তৈরি করে সংক্ষেপে যা ‘ইনসাকগ’ (INSACOG) নামে পরিচিত। জাতীয় স্তরের ১০টি গবেষণা কেন্দ্র নিয়ে এই ফোরাম কাজ শুরু করে। এই সংস্থার গবেষকরা ফেব্রুয়ারিতে প্রথম বি-১.৬১৭ নামে একটি প্রজাতিকে চিহ্নিত করেন যা ইন্ডিয়ান ভ্যারিয়েন্ট বা ভারতীয় প্রজাতি হিসেবে পরিচিত। এটি অত্যন্ত দ্রুত সংক্রমণ ছড়ায় এবং ভ্যাকসিনের প্রতিরোধকে কমিয়ে দেয়। ‘ইনসাকগ’ ১০ মার্চের আগে এই গবেষণালব্ধ প্রজাতিটি স্বাস্থ্যমন্ত্রকের ন্যাশনাল সেন্টার ফর ডিজিজ কন্ট্রোলের গোচরে আনে ও সতর্ক করে। এরপর সেটিকে ‘অত্যন্ত উদ্বেগজনক প্রজাতি’ বলে উল্লেখ করে স্বাস্থ্যমন্ত্রকের কাছেও পাঠায়। স্বাস্থ্যমন্ত্রক সেই বিবৃতি দু’সপ্তাহ পর প্রকাশ্যে আনে কিন্তু সেখানে ‘হাই কনসার্ন’ কথাটির উল্লেখ ছিল না।

বিজ্ঞানীরা জানান ভারতবর্ষে এখন এই প্রজাতিটি দাপিয়ে বেড়াচ্ছে এবং এরসঙ্গে রয়েছে ব্রিটিশ প্রজাতিও। দেশের আটটি রাজ্যে এর উদ্বেগজনক উপস্থিতি টের পাওয়া গেছে। তারা জানিয়েছিলেন একে রোখার জন্য কঠোর লকডাউনের মতো নিয়ন্ত্রণমূলক ব্যবস্থা এপ্রিলের প্রথমেই নেওয়া অত্যন্ত জরুরি ছিল। সমস্ত বিষয়টি দেশের সর্বোচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন আধিকারিক, ক্যাবিনেট সেক্রেটারি রাজীব গাউবাকে পাঠানো হয়। উনি সরাসরি প্রধানমন্ত্রীকে জানানোর ক্ষমতা রাখেন। কিন্তু তিনি কি তা জানিয়েছিলেন? রয়টার তা জানে না। কারণ তাদের অনুরোধের উত্তর আসেনি। এখন অনেক রাজ্যকেই লক ডাউনের পথে হাঁটতে হচ্ছে। কিন্তু বিজ্ঞানীদের সতর্কবাণী শুনে এপ্রিলের শুরুতে মোদী সরকার কোন কঠোর নিষেধাজ্ঞা তো জারি করেইনি, উল্টে মেলা, খেলা, নির্বাচনে দেশকে ভাসিয়ে করোনা-সুনামিকে আবাহন করে এনেছে। অতি সম্প্রতি বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মুখ্য বিজ্ঞানী সৌম্যা স্বামীনাথন সংবাদ সংস্থা এএফপি’কে এক সাক্ষাৎকারে জানিয়েছেন এই বি-১.৬১৭ ‘ডাবল মিউট্যান্ট’ ভারতীয় প্রজাতিটি ক্রমশ নিজের চরিত্র পাল্টে সংক্রমণ ক্ষমতা বাড়িয়ে চলেছে এবং ব্রিটেন ও আমেরিকায় এটি ‘উদ্বেগজনক’ প্রজাতি হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। তাঁর আক্ষেপ, একে রোখার জন্য ভারতে টিকাকরণের গতিও অত্যন্ত শ্লথ, মাত্র ২% মানুষ এপর্যন্ত টিকা পেয়েছেন (উল্লেখ্য মাত্র ৯% টিকার একটি ডোজ পেয়েছেন)। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থাও প্রজাতিটিকে ‘উদ্বেগজনক’ ঘোষণা করেছে। সৌম্যাও এই বিপর্যয়ের জন্য মোদী সরকারকে দায়ী করেছেন।

কেন্দ্রীয় সরকার বিদেশে ৬ কোটির বেশি টিকা পাঠিয়েছে। কিন্তু দেশে এখন টিকার হাহাকার, গত একমাসে টিকাকরণ দৈনিক ৪০ লক্ষ থেকে ২০ লক্ষে নেমে এসেছে। টিকার দাম ও বন্টনের চূড়ান্ত বৈষম্যসহ চরম বিশৃঙ্খল পরিস্থিতিতে মোদী সরকার হাত গুটিয়ে দায় ও দায়িত্ব চাপিয়েছে রাজ্যগুলির উপর। এমনকি, প্রবল ঔদ্ধত্যে এব্যাপারে শীর্ষ আদালতের হস্তক্ষেপের বিরোধিতা করেছে। অথচ দেশের সব বয়সী নাগরিকদের ৭০% টিকা না পেলে করোনাকে রোখা অসম্ভব। বিশেষ করে ‘ডাবল মিউট্যান্ট’ প্রজাতিটি যখন এত ভয়ঙ্কর আগ্রাসী।

১৩৮ কোটি দেশবাসীর জীবন নিয়ে এত ঔদাসীন্য, এত তাচ্ছিল্যের ঔদ্ধত্য সত্যিই স্তম্ভিত করে দেয়। এই অন্যায়কে দেশবাসী ক্ষমা করবে না!

- জয়ন্তী দাশগুপ্ত 

Terrible Covid situation

“রোগী উপচেপড়া হাসপাতালগুলোর গেটে অ্যাম্বুলেন্সের সারি, কোভিড সংক্রমিত রোগীদের পরিজনদের অক্সিজেনের জন্য কাতর আবেদন জানিয়েও বিফল হওয়া এবং গণদাহ - এই দৃশ্য মিথ্যা বলতে পারে না। শহর-নগর থেকে গ্ৰামাঞ্চল, ধনী থেকে দরিদ্র, চলমান হত্যালীলা কাউকেই রেহাই দিচ্ছে না। ... নরেন্দ্র মোদীর দূরদর্শিতার অভাব, ঔদ্ধত্য এবং জনপ্রিয়তা আদায়ের চেষ্টাই স্পষ্টত এমন পরিস্থিতির পিছনে কারণ যা এখন নিয়ন্ত্রণের বাইরে এবং যার জন্য বিদেশী সাহায্যের প্রয়োজন। ২০২০ সালে দেশের জন্য নির্মম বন্দিত্বর আদেশ জারি করে, লক্ষ-লক্ষ পরিযায়ী শ্রমিকদের উপেক্ষা করার মধ্যে দিয়ে দেশকে পঙ্গু করে তুলে ও মর্মান্তিক যন্ত্রণার মধ্যে ঠেলে দিয়ে প্রধানমন্ত্রী ২০২১’র গোড়ায় তাঁর প্রহরাকে শিথিল করে তোলেন। … স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের পরামর্শর চেয়ে জাতীয়তাবাদী বুলির ওপর ভর করে, জনগণের সুরক্ষার চেয়ে আত্মগৌরবের দিকে ঝুঁকে শ্রীযুক্ত মোদী পরিস্থিতিকে সংকটাপন্ন করেই তুলেছেন।” এখানে যা উদ্ধৃত হল তা ভারতের কোনো মোদী-সমালোচক ভাষ্যকারের কথা নয়। ফ্রান্সের সংবাদপত্র ‘ল্য মঁদ’এর ২৭ এপ্রিলের সম্পাদকীয়তে এমনই মন্তব্য করা হয়েছে। যে মোদী আন্তর্জাতিক মঞ্চে ভারতের কোভিডকে পরাস্ত করার বড়াই করেছিলেন, কোভিড চিকিৎসার জন্য ভারতকে টিকা সহ বিশ্বের ওষুধের ভাণ্ডার বলে বর্ণনা করেছিলেন, বিশ্বের দরবারে কোভিড ত্রাতা সেজেছিলেন, সেই আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রেই আজ ভারতের সঙ্কটজনক কোভিড পরিস্থিতির জন্য সরাসরি মোদীকেই দায়ী করা হচ্ছে। দৈনন্দিন সংক্রমণে ভারত আমেরিকাকে ছাড়িয়ে বিশ্বে আজ প্রথম - গত ৭ মে দৈনিক সংক্রমণ চার লক্ষর গণ্ডি পেরিয়ে দাঁড়ায় ৪,১৪,১৮৮। আজ আসমুদ্র হিমাচলে অক্সিজেনের জন্য হাহাকার, জীবনদায়ী ওষুধের অমিল, রয়টারের হিসেব অনুসারে দিল্লী রাজ্যে প্রতি চার মিনিটে একজনের কোভিডে মারা যাওয়া, অক্সিজেন ও জীবনদায়ী ওষুধের ব্যাপক কালোবাজারি, কোভিডে মৃত্যুর সংখ্যাকে গোপন করার মরিয়া প্রচেষ্টা - এমনই কোভিড পরিস্থিতির মুখে আজ ভারতবাসী। সঙ্কটের কয়েকটা দিকে তাকানো যাক।

শয্যা সঙ্কট: কোভিডে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা বিপুল আকার নেওয়ায় হাসপাতালগুলোতে শয্যার চাহিদাও বেড়ে চলেছে। আক্রান্তদের সংখ্যা এতই বিশাল যে তাদের একটা ক্ষুদ্র অংশেরও ভর্তির প্রয়োজনের তুলনায় লভ্য শয্যার সংখ্যা একেবারেই অপ্রতুল বলে প্রতিপন্ন হচ্ছে। একটা পরিসংখ্যান থেকে বোঝা যেতে পারে সঙ্কটের মাত্রা। দিল্লীর এক কেন্দ্রীয় হাসপাতালে শয্যার মোট সংখ্যা ১০,০০০, তার মধ্যে কোভিড রোগীর জন্য সংরক্ষিত শয্যার সংখ্যা ১,৮০০। ঐ সংরক্ষিত সংখ্যাকে বাড়িয়ে ৭,০০০ করার জন্য দিল্লীর মুখ্যমন্ত্রী অরবিন্দ কেজরীবাল চিঠি লিখেছেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর কাছে।

অক্সিজেনের আকাল: এপ্রিল মাসের তৃতীয়-চতুর্থ সপ্তাহে দেখা গেল, অক্সিজেনের অভাবে কোভিড চিকিৎসা বিপর্যয়ের মুখে। একের পর এক রাজ্যে (দিল্লী, উত্তরপ্রদেশ, মধ্যপ্রদেশ, কর্ণাটক যার কয়েকটি) অক্সিজেনের অভাবে বহু রোগীর মৃত্যু ঘটল, রোগীদের অবস্থা ক্রমেই আরও সঙ্কটজনক হয়ে আসছে দেখার পরও তাদের নাকের নলে অক্সিজেন জোগান দেওয়া গেল না। অক্সিজেনের সাহায্যে বেঁচে থাকা রোগীদের পরিজনদের উদ্দেশ্যে একাধিক হাসপাতালে নোটিস ঝোলানো হল - রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী, কেন্দ্রীয় সরকারকে অনুরোধ করা সত্ত্বেও অক্সিজেনের ব্যবস্থা করা যাচ্ছে না, তাঁরা যেন রোগীদের অন্যত্র সরিয়ে নেন।

মে মাসের গোড়াতেও অক্সিজেন সঙ্কটের সুরাহার কোনো লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না। কেন্দ্রের কাছ থেকে প্রয়োজনমতো অক্সিজেন না পেয়ে বেশ কিছু রাজ্যকে আদালতের দ্বারস্থ হতে হয়েছে। গত ৭ মে সুপ্রিম কোর্ট তাদের রায়ে বলেছে - কর্ণাটক হাইকোর্ট এবং দিল্লী হাইকোর্ট সংশ্লিষ্ট রাজ্য দু’টির জন্য প্রতিদিন যথাক্রমে ১,২০০ টন ও ৭০০ টন অক্সিজেন সরবরাহের যে নির্দেশ কেন্দ্রকে দিয়েছে তা একেবারেই যথাযথ এবং কেন্দ্রীয় সরকারকে তা সুনিশ্চিত করতে হবে। অক্সিজেন সরবরাহকে স্বচ্ছভাবে চালনা করতে সুপ্রিম কোর্টকে এমনকি ডাক্তার ও আমলাদের নিয়ে ১২ সদস্যের এক টাস্কফোর্স গঠন করতে হয়েছে।

টিকা: জনমুখী নীতির অভাব ও কোম্পানিকে মুনাফাবাজি করতে দেওয়া কোভিড টিকা বাজারে আসার সাথে-সাথে অনেক দেশই, বিশেষভাবে উন্নত দেশগুলো গণটিকাকরণের নীতি নেয় এবং এতে সুফলও মেলে। ভারত কিন্তু একদিকে টিকা কর্মসূচী শুরু করে এবং অন্যদিকে টিকা কূটনীতি চালিয়ে ভারতে উৎপন্ন টিকা বিভিন্ন দেশে রফতানি করতে থাকে। এই দ্বিমুখী নীতি টিকা ক্ষেত্রেও মোদী সরকারের দূরদর্শিতার অভাবকে প্রকট করে তোলে। দেশের কোভিড সংক্রমণ লাগামছাড়া হয়ে উঠে টিকার চাহিদাকে ঊর্ধ্বমুখী করায় ঘাটতিও চূড়ান্ত আকার নেয়। কোথাও টিকা নেওয়ার জন্য ভোর থেকেই লম্বা লাইন পড়ে, লাইনে অনেক ঘন্টা দাঁড়ানোর পরও মজুত ফুরিয়ে যাওয়ায় টিকা মেলে না, অনেক টিকা দান কেন্দ্রেই নোটিস ঝোলাতে হয় - সরবরাহ নেই, তাই টিকা দান বন্ধ আছে ও কিছুদিন থাকবে। যাঁরা টিকার প্রথম ডোজ নিয়েছেন, তাঁদের অনেকেরই দ্বিতীয় ডোজ নেওয়াটা প্রশ্নের মুখে পড়ে।

চারটে রাজ্য ও একটা কেন্দ্র শাসিত অঞ্চলে নির্বাচনের মরশুমে কেন্দ্র ১৯ এপ্রিল টিকা নীতিতে পরিবর্তনের কথা ঘোষণা করে। এতদিন চালানো শুধুই ডাক্তার-নার্স, স্বাস্থ্যকর্মী, ফ্রন্টলাইন ওয়ার্কার্স ও ৪৫ বছরের বেশি বয়সীদের টিকাদান নীতি থেকে সরে এসে কেন্দ্র ঘোষণা করল, ১ মে থেকে টিকা সব প্রাপ্তবয়স্কই পাবে - অর্থাৎ, ১৮ থেকে ৪৫ বছর বয়সীদেরও টিকা দানের আওতায় আনা হল। তবে এদের টিকাদানের দায়িত্ব নিতে অস্বীকার করে সেই দায়িত্ব কেন্দ্র ঠেলে দিল রাজ্যগুলোর ঘাড়ে। সমস্ত প্রাপ্ত বয়স্ক টিকা কর্মসূচীর আওতায় আসায় টিকার চাহিদাও তরতর করে বেড়ে চলল এবং এর সাথেই জোরালো হয়ে উঠল নিখরচায় গণটিকাকরণের দাবি।

টিকার দাম নির্ধারণ নিয়ে সংশ্লিষ্ট কোম্পানি দুটোকে (সিরাম ইনস্টিটিউট, যাদের টিকা কোভিশিল্ড এবং ভারত বায়োটেক, যাদের টিকা কোভ্যাক্সিন) বিপুল মুনাফাবাজি করতে দেওয়ার অভিযোগ উঠল মোদী সরকারের বিরুদ্ধে। কেন্দ্র টিকা প্রস্তুতকারক কোম্পানি দুটোর কাছ থেকে প্রতি ডোজ টিকা কেনে ১৫০ টাকা দরে। টিকা নীতিতে পরিবর্তনের সাথেই কেন্দ্র টিকা প্রস্তুতকারক সংস্থা দুটোকে স্বেচ্ছাচারীভাবে টিকার দাম নির্ধারণ করতে দিল। সিরাম ইনস্টিটিউট জানাল, যে টিকা তারা কেন্দ্রীয় সরকারকে ১৫০ টাকায় বিক্রি করছে, রাজ্য সরকারকে তা কিনতে হবে ৪০০ টাকায় ও বেসরকারী হাসপাতালকে কিনতে হবে ৬০০ টাকায়। আর ভারত বায়োটেক রাজ্য সরকার ও বেসরকারী হাসপাতালগুলোর জন্য টিকার দাম নির্ধারণ করল যথাক্রমে ৬০০ ও ১,২০০ টাকা। তাদের বিরুদ্ধে মুনাফাবাজির অভিযোগ ওঠায় দুই সংস্থাই রাজ্য সরকারগুলোকে বিক্রির দাম কমানোর কথা ঘোষণা করে জানিয়েছে, সিরাম ইনস্টিটিউট রাজ্য সরকারকে তাদের টিকা বিক্রি করবে প্রতি ডোজ ৩০০ টাকা ও ভারত বায়োটেক বিক্রি করবে প্রতি ডোজ ৪০০ টাকায়। বেসরকারী হাসপাতালগুলোকে বিক্রির দাম অপরিবর্তিতই থাকবে।

কথায় বলে, সংকট অনেকের কাছেই মওকা হয়ে ওঠে। ভারতে লাগামছাড়া কোভিড সংক্রমণের পরিস্থিতিতে টিকার চাহিদা প্রবল আকার নেওয়ায় দুই টিকা প্রস্তুতকারক সংস্থাই এই পরিস্থিতিতে মুনাফার বিরাট সুযোগ দেখছে। তারা যখন কেন্দ্রীয় সরকারকে প্রতি ডোজ টিকা ১৫০ টাকায় বিক্রি করে, তখন তারা নিজেদের ক্ষতি করে বিক্রি করে না, ঐ দামে তাদের লাভও থাকে। উৎপাদন বাড়ানোর জন্য কেন্দ্র সরকার সিরাম ইনস্টিটিউটকে যে ৩,০০০ কোটি টাকা এবং ভারত বায়োটেককে ১,৫০০ কোটি টাকা দিয়েছে, সেই বিষয়টাকেও হিসেবের মধ্যে নিতে হবে। অতএব, রাজ্য সরকারগুলোকে এবং বেসরকারী হাসপাতালগুলোকে কেন্দ্রীয় সরকারের দামের দ্বিগুণ থেকে আটগুণ দামে বিক্রির সিদ্ধান্ত তাদের বিপুল মুনাফাবাজিকেই দেখিয়ে দেয়। আর গোটা ব্যাপারটায় মোদী সরকারের নীরবতা তাদের কোম্পানিদ্বয়ের পৃষ্ঠপোষক রূপেই প্রতিপন্ন করছে।

কিন্তু ভারতবাসীকে কেন এই বিপর্যয়ের মধ্যে পড়তে হল? এটা কি অনিবার্যই ছিল? ২০২০ সালের সেপ্টেম্বর মাস থেকেই বিশ্বের বিভিন্ন দেশের বিজ্ঞানীরা ভাইরাসের নিজেকে রূপান্তরিত করা, সংক্রমণের দ্বিতীয় ঢেউয়ের আসন্নতার কথা বলে আসছিলেন। এই সতর্কবার্তাকে উপেক্ষা তো করাই হল, বিপরীতে প্রধানমন্ত্রী সহ বিজেপি নেতারা এমন কিছু কর্মসূচীতে নিজেদের এবং জনগণকে সমাবেশিত করলেন যা কোভিড সংক্রমণকে বিস্তৃতভাবে ছড়াতে যথেষ্ট অবদান রাখল।

পশ্চিম বাংলায় নির্বাচনকে প্রলম্বিত করা হল আট দফায় (নরেন্দ্র মোদী, অমিত শাহ সহ বিজেপি নেতৃবৃন্দের প্রচারে সুবিধা করে দিতেই এমন নির্ঘন্ট নির্ধারিত হয়েছিল বলে নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠেছে যাকে একেবারে ভিত্তিহীন বলা যাবে না)। সব বড় দলই বড়-বড় জনসমাবেশ ঘটিয়ে কোভিড সংক্রমণের পালে হাওয়া দিল। এছাড়া, নির্দিষ্ট সময়কালের এক বছর আগে হরিদ্বারে কুম্ভমেলা অনুষ্ঠানের গেরুয়া ক্যাডারদের দাবিতে সম্মতি দিয়ে নরেন্দ্র মোদী লক্ষ-লক্ষ মানুষের সমাবেশকে অনিবার্য করে তুলে ব্যাপক হারে কোভিড সংক্রমণের পথ প্রশস্ত করে দিলেন।

আজ মোদীকে কেউ যখন ‘সুপার স্প্রেডার’ বলছেন তাকে একেবারে অমূলক বলা যাবে না। কিন্তু প্রধানমন্ত্রী কি তাঁর দায় স্বীকার করবেন? আসুন, আমরা একেবারে ঘোড়ার মুখের কথা শুনি। কেন্দ্রীয় অর্থমন্ত্রী নির্মলা সীতারামনের স্বামী পি প্রভাকর বলছেন, “প্রধানমন্ত্রী তাঁর জনপ্রিয়তা, রাজনৈতিক পুঁজি, বাকপটুতা দিয়ে তাঁর ক্ষমতাকে ও সরকারের হৃদয়হীন আচরণকে আড়াল করছেন।” দিল্লীর জনৈক আইনজীবীর আত্মীয়র মৃত্যুতে উদ্বিগ্ন হয়ে দিল্লী হাইকোর্টের বিপিন সাঙ্ঘি ও রেখা পল্লির বেঞ্চ বলে – “সমস্যা হল এখানে না আছে ডাক্তার, না আছে নার্স, না আছে ওষুধ, না আছে অক্সিজেন। এটা সম্পূর্ণ রাষ্ট্রের ব্যর্থতা। পরিস্থিতি ক্রমশ কঠিন হয়ে উঠছে।”

কিন্তু এই ব্যর্থতাকেই কি আমরা আমাদের নিয়তি বলে মেনে নেব? রাষ্ট্রটাকে পাল্টানোই কি আমাদের অভীষ্ট হবে না?

Vaccination

 

দেশের পরিস্থিতির দাবি - সেন্ট্রাল ভিস্টা নয়, চাই গণটিকাকরণ।

ভারতে আজ পর্যন্ত যতজন প্রধানমন্ত্রীর চেয়ারে বসেছেন, নরেন্দ্র মোদী তাদের মধ্যে সবচেয়ে অসংবেদী রূপে প্রতীয়মান হচ্ছেন। বারবারই তাঁকে এমন সব কর্মসূচী হাতে নিতে দেখা গেছে যেগুলিতে নাগরিকের কল্যাণের চেয়ে তাঁর সংকীর্ণ অভিপ্রায়ই প্রকট হয়েছে। আজ সারা দেশ যখন ভয়াবহ অতিমারীর কবলে, সুপ্রিম কোর্টও যখন পরিস্থিতিকে জাতীয় জরুরি অবস্থা বলে অভিহিত করছে, তখন বিভিন্ন মহলের সমালোচনাকে উপেক্ষা করে নরেন্দ্র মোদী সেন্ট্রাল ভিস্টা প্রকল্পকে চালিয়ে নিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্তে অনড় থাকছেন। দেশের জাতীয় রাজধানী আজ অভূতপূর্ব মাত্রার স্বাস্থ্য সঙ্কটে নিমজ্জিত, সমস্ত হাসপাতালে শয্যা-অক্সিজেন-জীবনদায়ী ওষুধের হাহাকার, বিনা চিকিৎসায় রোগীদের মারা যাওয়া সেখানে এক সাধারণ ঘটনা, শ্মশানগুলোতে গণচিতা সদাজ্বলন্ত। এই পরিস্থিতিতে স্বাস্থ্যক্ষেত্রে সার্বিক নজর না দিয়ে বিশালাকায় এই নির্মাণযজ্ঞের ওপর অগ্ৰাধিকার প্রদান নাগরিকদের প্রতি কোন দায়িত্ববোধের পরিচয় বহন করে?

সেন্ট্রাল ভিস্টা হল জাতীয় রাজধানী নয়া দিল্লীর রাষ্ট্রপতি ভবন থেকে ইণ্ডিয়া গেট পর্যন্ত বিস্তৃত সাড়ে তিন কিলোমিটার দীর্ঘ রাজপথ। এরই দু’পাশের পরিবেশকে ঢেলে সাজানো, অনেক ভবন ভেঙ্গে নতুন করে গড়ে তোলা, এক নতুন সংসদ ভবন নির্মাণ, বিভিন্ন মন্ত্রকের অফিস নির্মাণ এবং প্রধানমন্ত্রীর নতুন বিলাসবহুল বাসভবন নির্মাণের পরিকল্পনাই হল সেন্ট্রাল ভিস্টা প্রকল্প। এই প্রকল্পের আনুমানিক খরচ ধরা হয়েছে ২০,০০০ কোটি টাকা। বিশেষজ্ঞদের যদিও অনুমান, শেষমেষ খরচ হবে আরও অনেক বেশি। বর্তমান পরিস্থিতিকে বিবেচনায় রাখলে এই বিপুল ব্যয়কে কি ন্যায়সঙ্গত বলা চলে? অবহেলিত স্বাস্থ্যক্ষেত্রের বিভিন্ন প্রয়োজন মেটাতে, নাগরিকদের চিকিৎসা পরিষেবা লাভকে আর একটু অনায়াস করার লক্ষ্যে এই অর্থ ব্যয়িত হলে রাষ্ট্রের মানবতাবাদী মুখ হয়ত একটু উজ্জ্বল হত।

সম্প্রতি ব্রিটেনের দ্য মেইল সংবাদপত্রে সেন্ট্রাল ভিস্টা প্রকল্প নিয়ে একটা নিবন্ধ প্রকাশিত হয়েছে। ঐ নিবন্ধে বলা হয়েছে, “নরেন্দ্র মোদীর অহমিকার কলঙ্কজনক স্মৃতিসৌধ: লক্ষ-লক্ষ মানুষ যখন অতিমারীতে আক্রান্ত, ভারতের আত্মম্ভরী প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী তখন এমন মূল্যে এক সুবিশাল প্রকল্প নির্মাণ করছেন যে অর্থ দিয়ে ৪০টা হাসপাতাল তৈরি করা যেত। এখন তাঁর দেশ প্রতিবাদে নেমেছে।” সেন্ট্রাল ভিস্টা প্রকল্পে ব্যয়কে অপচয় রূপে গণ্য করে ঐ নিবন্ধে আরও বলা হয়েছে, “তাঁর চারপাশে মৃত্যু এবং নৈরাশ্য বিরাজ করলেও এই বেশরম বক্তৃতাবাজ … এই বিষয়ে অনড় রয়েছেন যে নতুন ভবন নির্মাণের অভিযান, বিদ্রুপ করে যেটাকে ‘মোদীর স্বপ্ন’ বলে অভিহিত করা হচ্ছে, দ্রুতগতিতে চলতে থাকবে।” সেন্ট্রাল ভিস্টা প্রকল্পের অবিমৃশ্যকারিতা এইভাবে শুধু দেশে নয়, বিদেশেও প্রবলভাবে সমালোচিত হচ্ছে।

ওপরে আমরা এই অভিমত ব্যক্ত হতে দেখলাম যে, সেন্ট্রাল ভিস্টা প্রকল্পে ব্যয়িত অর্থ হাসপাতাল সহ স্বাস্থ্যক্ষেত্রের পরিকাঠামো নির্মাণে ব্যয়িত হলেই তা ন্যায্য, নগরিক স্বার্থের অনুকূল বলে পরিগণিত হত। এই অভিমতও আবার জোরালো হয়ে সামনে আসছে যে, সেন্ট্রাল ভিস্টা প্রকল্পে নির্ধারিত অর্থে ১৮ থেকে ৪৫ বছর বয়সীদের ৮০ শতাংশের বিনামূল্যে টিকা দানের ব্যবস্থা করা যায়। উল্লেখ্য, কেন্দ্র সরকার প্রথমে ডাক্তার-নার্স, স্বাস্থ্যকর্মী, ফ্রন্টলাইন কর্মী ও ৪৫ বছর ঊর্ধ্বদের বিনামূল্যে কোভিড টিকা দেওয়ার কর্মসূচী নিয়েছিল। পরে টিকানীতিতে পরিবর্তন এনে তারা ঘোষণা করে যে, সমস্ত প্রাপ্ত বয়স্কই, অর্থাৎ, ১৮ থেকে ৪৫ বছর বয়স্করাও কোভিড টিকা নিতে পারবে। কেন্দ্র এই নীতি ঘোষণা করলেও এই নতুন বয়স্ক গোষ্ঠীর, ১৮ থেকে ৪৫ বছর বয়সীদের টিকাদানের দায় তারা নিজেদের ঘাড় থেকে ঝেড়ে ফেলে রাজ্যগুলোর ঘাড়ে ঠেলে দেয়। ফলে, টিকা প্রস্তুতকারী কোম্পানিগুলোর কাছ থেকে টিকা কিনে এদের টিকাদানের ব্যবস্থা রাজ্যগুলোকেই করতে হবে। এই নীতির বিরোধিতা করে দেশের সর্বত্র এখন দাবি উঠছে - কেন্দ্রীয় সরকারকে নিখরচায় সর্বজনীন টিকাকরণের নীতি গ্ৰহণ করতে হবে। এটাই হবে কোভিডের প্রকোপ প্রশমণের লক্ষ্যে যথার্থ নীতি, এটাই হবে দেশের নাগরিকদের প্রতি দায়িত্বশীলতার যথাযোগ্য পরিচয়। সংক্রমণের দ্বিতীয় ঢেউ চলার মাঝে বিশেষজ্ঞরা আবার শোনাচ্ছেন আরও এক আশঙ্কার কথা - এ বছরেরই শীতে হানা দিতে পারে কোভিড সংক্রমণের তৃতীয় ঢেউ। বেশি সংখ্যক মানুষকে টিকা দিতে পারলে সেই তৃতীয় ঢেউয়ের মোকাবিলায় অনেকটা পথ এগিয়ে থাকা যাবে। অতএব, করদাতাদের দেওয়া অর্থের প্রতি সুবিচার করতে হলে সেন্ট্রাল ভিস্টা প্রকল্পের জন্য নির্ধারিত অর্থকে গণটিকাকরণ কর্মসূচীতে ব্যয়িত করাই বিধেয়।

কিন্তু নরেন্দ্র মোদীর দম্ভ যেমন সীমাহীন, আবার জনগণের বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে এমন কর্মকাণ্ডেও তিনি অবলীলায় মেতে ওঠেন। নোটবন্দি, অসংখ্য পরিযায়ী শ্রমিক এবং প্রান্তিক জনগণের চরম দুরবস্থায় পড়ার কথা বিবেচনা না করে দীর্ঘ পর্যায়ের কঠোর লকডাউন নামানো, কোভিডের দ্বিতীয় ঢেউয়ের মাঝে হরিদ্বারে কুম্ভমেলায় লক্ষ লক্ষ জনসমাবেশে সম্মতি দেওয়া, কোভিড সংক্রমণের সম্ভাবনাকে উপেক্ষা করে নির্বাচন কমিশনের বকলমে পশ্চিম বাংলায় নির্বাচনী প্রক্রিয়াকে অস্বাভাবিক সময়কাল ধরে প্রলম্বিত করা - এই সমস্ত কিছুই সাধারণ জনগণের কাছে সর্বনাশা হয়ে দেখা দিয়েছে। সেন্ট্রাল ভিস্টা প্রকল্পের কাজকে অব্যাহত রাখতে এবং দ্রুতগতিতে চালিয়ে নিয়ে যেতে এই প্রকল্পকে নরেন্দ্র মোদী ‘অত্যাবশ্যক পরিষেবা’র তকমা দিয়েছেন। করোনা পরিস্থিতির ভয়াভয়তার পরিপ্রেক্ষিতে দিল্লীতে এখন লকডাউন চলছে, আর তারমধ্যে ভিস্টা প্রকল্পের কাজের জন্য ১৮০টা গাড়ির অবাধ চলাচলের অনুমতি দেওয়া হয়েছে, তিন শিফটে প্রকল্পের কাজ চলছে। নতুন সংসদ ভবন নির্মাণের কাজ নভেম্বরের মধ্যে শেষ করার ফরমান দেওয়া হয়েছে। স্বাধীনতার ৭৫ বছর পূর্তিতে মোদী জাতিকে উপহার দিতে চান অত্যাধুনিক সংসদ ভবন এবং নয়া দিল্লীর সৌন্দর্যায়ন। এবং অনেকেই যেমন বলছেন, এরমধ্যে দিয়ে ইতিহাসে নাম খোদাই করাও তাঁর অভিলাষ। কিন্তু ইতিহাস কোনটাকে মনে রাখবে - নরেন্দ্র মোদীর বানানো সেন্ট্রাল ভিস্টার নির্মাণকে, না কি স্বাস্থ্যক্ষেত্রের অভূতপূর্ব মাত্রার সঙ্কটে সরকারের দেখানো হৃদয়হীনতাকে? চারদিকে ওঠা হাহাকারে আমল না দিয়ে কোভিডে মৃত হাজার-হাজার মানুষের লাশের ওপর দিয়েই মোদীর সাধের নির্মাণ যজ্ঞের সমাধা হয়েছে, ইতিহাসে বড়-বড় কালো অক্ষরে তার উল্লেখকে কিছুতেই মুছে দেওয়া যাবে না।

– জয়দীপ মিত্র 

Did women become the savior

শেষ পর্যন্ত সর্বশক্তি দিয়ে লড়াই করেও পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভা নির্বাচনে পর্যদুস্ত হল বিজেপি। মোদী-শাহ-নাড্ডা-আদিত্যনাথ জেলায় জেলায় গেলেন, নেতা-নেত্রী কেনা হল, জাতীয় সংবাদ মাধ্যম বিজেপি’কে বাংলার ত্রাতা হিসেবে প্রচারও করল লাগাতার। তবু শেষ বিচারে জনতা রায় দিল প্রাক্তন শাসক দলের পক্ষে। সকলেই, এমনকি বামেরাও স্বীকার করলেন, এবার ভোট হয়েছে বিজেপির পক্ষে/বিপক্ষে।

দীর্ঘ দশ বছর শাসনকালের পরও কোনো রাজ্যে শাসকবিরোধী ধারা গড়ে উঠবে না, এ প্রায় অসম্ভব। এ রাজ্যেও দুর্নীতি, বেকারত্ব ইত্যাদি কারণে শাসকদলের প্রতি ক্ষোভ ছিল। বিজেপি চেষ্টার কসুর করেনি নিজেদের যোগ্য বিকল্প হিসেবে প্রচার করতে। কংগ্রেস ও বাম শাসন পূর্বে দেখা গেছে, তৃণমূল শাসনও দেখা গেল, এবার তাদের সুযোগ দেওয়া হোক ‘সোনার বাংলা’ গড়ার, এই ছিল তাদের বক্তব্য৷ তা সত্ত্বেও তৃণমূল প্রায় ৪৮% ভোট, আর ৭৩% আসন জিতল। এই সামগ্রিক ফলাফলে নারী-ভোটারদের ভূমিকা কী? কেনই বা তাঁরা সে ভূমিকা নিলেন?

রাজ্যে ৭.৩২ কোটি ভোটারের মধ্যে ৩.৫৯ কোটি নারী৷ তাঁরা ভোটে সক্রিয় অংশগ্রহণ করে থাকেন। প্রত্যন্ত গ্রামাঞ্চলেও মহিলা মতদানকারীর সংখ্যা প্রতি ভোটেই বাড়ে। মমতা ব্যানার্জির মুসলিম ভোট ব্যাংক নিয়ে আলোচনা হয়। অথচ মুসলমানরা জনসংখ্যার প্রায় এক চতুর্থাংশ হন যদি, তবে মহিলারা জনসংখ্যার প্রায় অর্ধেক। তাই এই নির্দিষ্ট লিঙ্গপরিচয়ের মানুষের ভোটের অভিমুখ ও তার কারণও পর্যালোচনা করা দরকার৷

২০১৯ সালে সেন্টার ফর স্টাডি অফ ডেভলপিং সোসাইটিজ’এর তত্ত্বাবধানে লোকনীতি সংস্থা এক ভোট পরবর্তী সমীক্ষা করে জানায়, ভারতবর্ষের মধ্যে তৃণমূলই একমাত্র দল যা পুরুষদের চেয়ে মহিলাদের ভোট পেয়েছে বেশি। তাদের প্রাপ্ত মোট ভোটের ৫১% এসেছে মহিলাদের থেকে। আর পশ্চিমবঙ্গের মহিলা ভোটারের ৪৭% তাদের ভোট দিয়েছেন, যেখানে বিজেপিকে দিয়েছেন ৩৭% মহিলা। ২০১৬ সালের বিধানসভা ভোটে তাদের প্রাপ্ত ভোটের ৫২% ছিল মহিলা ভোট, আর তখন পশ্চিমবঙ্গের ৪৮% মহিলা ভোটার তাঁদের ভোট দেন। তৃণমূলের মহিলা প্রার্থীর সংখ্যাও ক্রবর্ধমান। এবারেই প্রার্থী তালিকায় ছিলেন ৫০ জন মহিলা। ২০১৯ সালের লোকসভা ভোটে মহিলা প্রার্থী ছিলেন ৪১% সিটে।

আপাতভাবে, এসবই আশার কথা। একথাও অনস্বীকার্য যে তৃণমূল মহিলা ভোট টানার চেষ্টা করে নানা জনকল্যাণমূলক ক্যাশ টাকা বা সামগ্রী প্রদানের স্কিমের মাধ্যমে। ‘কন্যাশ্রী’ আর ‘রূপশ্রী’ প্রকল্প যথাক্রমে মেয়েদের পড়াশোনা আর বিয়ের জন্য প্রদেয়। ‘সবুজ সাথী’র মাধ্যমে গ্রামের মেয়েরা পায় সাইকেল এবং কিছু শিক্ষাঋণের ব্যবস্থাও আছে। ২০১৩ সালে ‘কন্যাশ্রী’ প্রকল্প চালু হয়েছিল মেয়েদের স্কুল-ড্রপ আউট ও বাল্যবিবাহ রোখার জন্য। তা ২০১৭ সালে ইউনাইটেড নেশনস-এর পাব্লিক সার্ভিস পুরস্কারেও ভূষিত হয়ছে। সাম্প্রতিক কালে যে ‘স্বাস্থ্য সাথী’ নামক বীমা প্রকল্প চালু হল, তাতেও কার্ডটি দেওয়া হচ্ছে বাড়ির বয়ঃজ্যোষ্ঠ মহিলার নামে, এতে তাঁর অস্তিত্বকে স্বীকৃতিই দেওয়া হয়। এবছরের ম্যানিফেস্টোয় তৃণমুল লিখেছে পরিবারের বয়োবৃদ্ধ মহিলাটিকে ৫০০-১০০০ টাকা মাসিক ভাতা দেওয়ার কথাও। প্রতিপক্ষ এসবকে ‘ঘুষ’ বা ‘ভিক্ষা’ বললেও দরিদ্র বা প্রত্যন্ত অঞ্চলের মহিলাদের জীবনে এসব আশ্বাসের গুরুত্ব আছে।

বিজেপিও আপাতভাবে এবারের ম্যানিফেস্টোয় মেয়েদের ভোট ব্যাংকে বিশেষ জোর দিয়েছিল। নারীদের জন্য ছিল বিনামূল্যে সরকারী পরিবহণ ব্যবহারের প্রতিশ্রুতি, সরকারী চকরিতে ৩৩% সংরক্ষণের আশ্বাস ও স্নাতকোত্তর পর্যন্ত বিনামূল্যে লেখাপড়ার ব্যবস্থার কথা। কিন্তু মনে হয় সরকারী চাকরি, শিক্ষা বা পরিবহণ সংক্রান্ত প্রতিশ্রুতি নারীদের আশ্বস্ত করতে ব্যর্থ হয়েছে, কারণ সকল সরকারি পরিষেবারই বেসরকারীকরণে বিজেপি সারা দেশ জুড়েই তৎপর।

উপরন্তু বিজেপি যে নারীবিদ্বেষী-বর্ণবিদ্বেষী-ব্রাহ্মণ্য-পিতৃতান্ত্রিক আরএসএস ভাবধারার বাহক, তা বাংলা তথা সারা ভারতে অজানা নয়। দিল্লী ও ইউপি’র অচেনা হিন্দুত্ববাদী পুরুষেরা যখন বারবার আসছিলেন, অচেনা ভাষায় বলছিলেন, বাংলায় মেয়েরা সুরক্ষিত নয়, তখন তা স্বস্তির চেয়ে ভয়ের সঞ্চার করছিল বেশি৷ মধ্যবিত্ত শহুরে নারী বিরক্ত হচ্ছিলেন, কারণ তিনি জানেন উত্তর প্রদেশের ধর্ষণ পরিসংখ্যান। জানেন ওই দলের হাথরসের ধর্ষিতাকে পুড়িয়ে দেওয়ার ঘটনা বা কাঠুয়ার ধর্ষকের সমর্থনে মিছিলের কথা। কিন্তু এরাজ্যের খেটে খাওয়া নারীদের মনেও সংশয় তীব্র হচ্ছিল। নারী সুরক্ষা নামে এরা নারীদের আবার চার দেওয়ালে আবদ্ধ করতে চায় না তো? পশ্চিমবঙ্গের নারী শ্রেণি নির্বিশেষে তার যাতায়াতের, মেলামেশার স্বাধীনতা নিয়ে সচেতন। আদিত্যনাথের এখানে অ্যান্টি রোমিও স্কোয়াড গঠনের ‘আশ্বাস’ তাদের কানে ‘হুমকি’ হিসেবেই পৌঁছোয়।

অতঃপর প্রধানমন্ত্রী যখন হিসহিসে স্বরে মুখ্যমন্ত্রীকে ‘দিদি, ওওও দিদি’ বলে মস্করা করেন, তখন তা তাঁর দলের নারীবিদ্বেষেরই দ্যোতক হয়ে ওঠে। যখন দিলীপ ঘোষ মুখ্যমন্ত্রীর শাড়ির দৈর্ঘ্য স্থির করে দেন, তাঁকে বারমুডা পরতে বলেন, তা নিন্দিত হয় সেইসব নারী অধিকার কর্মীদের দ্বারাও, যারা হয়ত তৃণমূল সমর্থক নন। ‘নো ভোট টু বিজেপি’ আন্দোলনও পায় প্রচুর কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রীদের অংশগ্রহণ, যারা হয়ত মুখ্যমন্ত্রীর গুণমুগ্ধ নয়। কিন্তু তারা ভাবে, “যদি মুখ্যমন্ত্রীকেই এমনতরো বলা যায়, তবে আমরা কতটা নিরাপদ?” অন্যদিকে তৃণমূল তৈরি করে ‘হুইলচেয়ারে আহত একাকী নারী’র এক আকর্ষক রূপকল্প, যা ভোটারদের সহমর্মিতা পেতে সক্ষম হয়।

একথা স্বীকার করা ভাল যে এবারের ভোটে জয় পরাজয়ের খতিয়ানে নারীদের ভূমিকা ছিল অবিসংবাদিত। নারীরাই নিশ্চিত করেছে যে তারা বিজেপিকে চায়না৷ নারীরাই অতএব হয়েছে শাসকদলের ত্রাতা। অথচ পাড়ায় পাড়ায় রাজনৈতিক প্রচারের সময় প্রচারকারীদের সঙ্গে বিদগ্ধ আদানপ্রদান হয় সচরাচর পরিবারের পুরুষটির। নারীরা থাকেন মৌন, বিশেষত গ্রামে-গঞ্জে। ধরেই নেওয়া হয়, স্বামী বা পিতা যে চিহ্ন ভোট দেবেন, তিনিও সে চিহ্নেই দেবেন৷ কিন্তু অনুমান, অনেক ক্ষেত্রে পরিবারের পুরুষটি হিন্দুত্ববাদীদের ভোট দিলেও, নারীরা ভোট দিয়েছেন, আস্থা রেখেছেন অন্যত্র। নতুন সরকারের উচিত সেই অবদানকে স্বীকৃতি দেওয়া। কী কারণে, কীসের আশায় তাঁরা ভোট দিলেন, তা অনুধাবন করা ও সেই কর্মসূচিগুলি, সেই আশ্বাসগুলি আশু বাস্তবায়িত করা৷

তাঁদের আরও অনুধাবন করা উচিত, কামদুনি কাণ্ডের সুরাহা এখনও হয়নি বা পার্ক সার্কাসের ধর্ষণকে সাজানো ঘটনা বলা ভুল হয়েছিল৷ নারী প্রার্থী নির্বাচনের ক্ষেত্রেও তাঁরা হয়ত আরেকটু চিন্তাশীল হতে পারেন। সেলিব্রিটি নারী নয়, তাঁরা এমন নারী প্রার্থীদের মনোনয়ন দেওয়ার কথা ভাবতে পারেন যাঁরা প্রকৃতই নারীদের উন্নতির কথা ভাববেন, ক্যাশ অর্থ প্রদানের স্কিমগুলির বাইরেও সার্বিক উন্নতির কথা ভাববেন। বেকারত্ব কিন্তু নারীরও সমস্যা, শুধু পুরুষের না৷ তারও আশু সমাধান প্রয়োজন।

আর নাগরিক সমাজের আরও গভীর অন্বেষণ করা প্রয়োজন, কীভাবে ফ্যাসিবিরোধী শক্তি হিসেবে নারীদের সঙ্ঘবদ্ধ করা যায়৷

- শতাব্দী দাশ 

Doctor Smarjit Jana

সানাউল্লাহ নামক এক ডাকাতের নাম থেকে হয়ে গেল সোনাগাছি। কথিত আছে যে ডাকাত হলেও মৃত্যুর পর সানাউল্লাহ গাজি হিসাবে সম্মানিত ও বন্দিত হয় এবং এলাকার নাম হয়ে যায় সানা গাজি লেন। একজন ডাকাত বা গাজির হারেম কখন থেকে যে দেহব্যবসার কেন্দ্র হয়ে গেলো এটা নিয়ে ইতিহাসে স্পষ্ট কিছু লেখা নেই। ১৮৬৮র ‘ইন্ডিয়ান কন্টাজিয়াস ডিজিজ অ্যাক্ট’ চালু করার সময় এলাকাটি প্রথম প্রশাসনের নজরে আসে। তারপর গঙ্গা দিয়ে অনেক জল বয়ে গেছে। ১৯৯২ সালে এলাকায় ভিন্ন ধরনের কর্মচাঞ্চল্য দেখা যায়। এক উজ্জ্বল ও উদ্যমী ডাক্তারের নেতৃত্বে কিছু তরুণ তরুণী সোনাগাছিতে এইচআইভি-এসটিডির ওপর সমীক্ষা শুরু করে। তাঁর নাম ডক্টর স্মরজিত জানা; তিনি তখন ‘অল ইন্ডিয়া ইন্সটিটিউট অফ হাইজিন এন্ড পাবলিক হেলথ’এর সাথে যুক্ত। শুরুর দিনগুলি ছিল কঠিন। এলাকার দাদা, দালালদের হুমকি, পুলিসের হুজ্জুতি তো ছিলই, সর্বোপরি খোদ যৌনকর্মীরা, যাদের স্বার্থে সমীক্ষাটা করা হচ্ছিলো, তাঁরাই অসহযোগিতা করছিলেন। তাঁদের ধারণা মানুষ যদি জেনে যায় যে তাঁরা যৌনরোগে আক্রান্ত তাহলে তাঁদের ব্যবসা ক্ষতিগ্রস্ত হবে।

ততদিনে চেন্নাইয়ের (তৎকালীন মাদ্রাজ) রেড লাইট অঞ্চলে এইডসের প্রকোপ শুরু হয়ে গেছে। ডঃ জানা দেখলেন এই প্রাণনাশক ব্যাধি যাতে কলকাতার নিষিদ্ধপল্লিগুলিতে ছড়িয়ে না পড়ে সেটার জন্য অবিলম্বে ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন। তিনি STD-HIV Intervention Program (SHIP) শুরু করলেন। ধীরে ধীরে যৌনকর্মীদের দৃষ্টিভঙ্গি পালটাতে লাগল। তাঁরা বুঝলেন তাঁদের নিজেদের স্বার্থেই এই স্বেচ্ছাসেবকদের কথা শোনা প্রয়োজন। প্রাথমিকভাবে সমীক্ষায় দেখা গেল প্রায় ৮০% কর্মী কোনও না কোনও যৌনরোগে আক্রান্ত। অল্প সংখ্যক এইডসে আক্রান্ত। ডঃ জানা মনে করলেন একমাত্র নিরাপদ যৌনসংসর্গ অনুশীলন করলেই রোগের এই সুনামি আটকানো সম্ভব। এরজন্য অতি আবশ্যিক হচ্ছে কন্ডোম ব্যবহার। আবারও প্রবল বাধা আসে। যৌনকর্মীরা নিজেরাই দ্বিধান্বিত কারণ তাঁদের মক্কেলদের চূড়ান্ত অনীহা। তাঁরা ব্যবসার ক্ষতি হওয়ার ভয় করে। এক দীর্ঘ ও কঠিন লড়াই শুরু হয়। এতে এই ব্যবসায় সমস্ত অংশীদার যেমন ম্যাডাম, দালাল, পুলিশ, এলাকার গুন্ডা, ক্লাব এবং অবশ্যই ক্লায়েন্টদের চেতনা বৃদ্ধির প্রকল্প নেওয়া হয়। প্রায় একবছর বাদে দেখা যায় নিরাপদ যৌনসংসর্গ অনুশীলন করছেন এরকম কর্মীর সংখ্যা ন্যূনতম থেকে বেড়ে হয় ৫৫%। এই প্রকল্প যৌনকর্মীদের ক্ষমতায়নের এক প্রমাণস্বরুপ যেটির সাফল্য ডঃ জানাকে দেশে বিদেশে বিখ্যাত করে দেয়।

যৌনকাজকে একটা অপরাধমূলক কাজ হিসাবে গণ্য করা হয়। এরফলে পুলিশের হাতে যত্রতত্র হেনস্থা হতে হয়। এলাকার দাদারা জুলুম করে, ম্যাডামরা বঞ্চনা করে এবং মক্কেলরা তাঁদের অসহয়াতা এবং নিরাপত্তাহীনতার সুযোগ নেয়। ডঃ জানা মনে করতেন এই অবস্থা থেকে কর্মীদের মুক্তি দিতে হবে এবং সেটার জন্য এই কাজকে একটি পেশা হিসাবে স্বীকৃতি দিতে হবে। সাধারণ মানুষ যেমন রুটিরুজির জন্য নানা পেশায় যুক্ত হয় এই কাজও সেরকমই একটি পেশা। তিনি মনে করতেন এখানে নৈতিকতা বা অনৈতিকতার কোনও স্থান নেই। কেউ যদি স্বেচ্ছায় এই পেশায় আসে তাহলে তাঁকে আটকানোর কারো অধিকার নেই। তবে নাবালিকা এবং জোর করে কাউকে এই পেশায় নিযুক্ত করার তিনি সবসময় বিরোধিতা করেছেন। নব্বইয়ের দশকে তিনি সোনাগাছিতে ‘দুর্বার মহিলা সমন্বয় কমিটি’ নামক সংগঠনটি প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। প্রথমেই তিনি এই কর্মীদের পরিচয় পত্র, যেমন ভোটার কার্ড, রেশন কার্ড, তৈরি করার ওপর জোর দিয়েছেন। তিনি এঁদের ব্যাংকে খাতা খুলতে উৎসাহিত করেছেন, কোওপারেটিভ শুরু করেছেন। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ তাঁর নেতৃত্বে এই সংগঠন যৌনকর্মীদের অধিকার সম্পর্কে সর্বদা সোচ্চার থেকেছে। তাঁরা সামাজিক নিরাপত্তার দাবি তুলেছেন - বৃদ্ধাদের পেনশন, অন্তঃসত্বা মহিলাদের ভাতা, শিশুকন্যাদের সামাজিক সুরক্ষা ইত্যাদি। সর্বোপরি তাঁরা তাঁদের পেশার আইনি স্বীকৃতি দাবি করেছেন। এই দাবি এখনো অধরা, সুপ্রিম কোর্টে কেস চলছে। এই সব দাবিতে এক সময় তাঁরা মে দিবসে নিয়মিত মিছিল করতেন। তাঁদের শ্লোগান, ‘গতর খাটিয়ে খাই, শ্রমিকের অধিকার চাই’ সমাজে সাড়া ফেলে দিয়েছিল।

আমাদের সমাজে এনজিও’দের কাজকে সন্দেহের চোখে দেখা হয়। মনে করা হয় এঁরা বিদেশ থেকে টাকা পায় এবং নয়ছয় করে। সত্যি মিথ্যা যাই হোক দুর্বারের নামেও একই অভিযোগ রটেছে এবং সেটার ছিটে ডঃ জানার গায়েও পড়েছে, যার ফলে তিনি সবসময়ই বিতর্কিত থেকেছেন। কিন্তু যৌনকর্মী এবং যৌনপেশাকে সম্মানপ্রদান ও স্বীকৃতির জন্য তিনি যে অত্যন্ত উল্লেখযোগ্য কাজ করেছেন একথা অনস্বীকার্য। গত ৯ মে তিনি কোভিডে আক্রান্ত হয়ে প্রয়াত হলেন। তাঁর মৃত্যুতে যৌনকর্মীরা অভিভাবকহীন হয়ে পড়লেন।

 - সোমনাথ গুহ  

The late Braj Roy

সুপরিচিত বিশিষ্ট সমাজকর্মী ব্রজ রায় গত ১৩ মে প্রয়াত হয়েছেন। তাঁকে স্মরণ করে সিপিআই (এম এল) লিবারেশনের পক্ষ থেকে এক শোকবার্তায় বলা হয়েছে — ব্রজ রায়ের প্রয়াণে আমরা গভীর শোকাহত। রাজনৈতিক আন্দোলনের কারণে ব্রজ রায় জরুরী অবস্থার সময় দীর্ঘদিন কারাগারের অন্তরালে ছিলেন। মুক্তি পাবার পর রাজনৈতিক বন্দীদের নিঃশর্ত মুক্তির দাবিতে আন্দোলনে সামনের সারির নেতা ছিলেন। পরবর্তীতে গণ দর্পণ সংস্থা প্রতিষ্ঠা করে দেহদান ও অঙ্গদান আন্দোলনকে রাজ্য জুড়ে ছড়িয়ে দেওয়ার ক্ষেত্রে পথিকৃৎ ছিলেন। আজকের অন্ধকার সময়ে ব্রজ রায়ের প্রয়াণে সামাজিক আন্দোলনের বিরাট ক্ষতি হল।

আমরা পার্টির পক্ষ থেকে তাঁর প্রয়াণে গভীর শোক জ্ঞাপন করছি। তাঁর স্মৃতি ও কর্মধারা চির স্মরণীয় হয়ে থাকবে।

Comrade Bachchu Das

বেলঘরিয়া কমরেড বাচ্চু(সুখময়) দাস করোনা আক্রান্ত হয়ে চলে গেল। বাচ্চু বরানগর স্টেট জেনারেল হাসপাতালে ভর্তি ছিল এবং খবর ছিল ক্রমশ সুস্থতার দিকে এগোচ্ছে। গতকাল হাসপাতাল থেকে খবর দেয়, রোগীর অবস্থা ভালো না, অন্যত্র ট্রেন্সফার করুন। বাড়ির লোক অন্যত্র ভর্তির চেষ্টা করছিল এবং পার্টি পক্ষ থেকে আই ডি হাসপাতালে চেষ্টা করছিল আজ ভর্তির সম্ভবনা ছিল। কিন্তু সকালেই সব শেষ হয়ে গেল। বাচ্চু ৮০ দশক থেকে পার্টির সাথে যুক্ত হয়েছেন। গণফ্রন্ট, আইপিএফ ও পার্টির লোকাল কমিটি, জেলা কমিটির সদস্য ছিলেন। বাচ্চু পেশায় ছিল গৃহশিক্ষক এবং পড়াবার বিষয় ছিল ইংরেজি। বাচ্চু ছিলেন অকৃতদার। তিনি রেখে গেছেন ভ্রাতুষ্পুত্র, ভ্রাতুষ্পুত্রী এবং অসংখ্য গুণমুগ্ধ ছাত্র-ছাত্রী। বাচ্চু ব্যক্তিগত জীবনে নিয়মানুবর্তিতা ও বিনয় ছিল ওঁর বিশেষ চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য। নিজের সাধ্যমতো পার্টির দায় দায়িত্ব পালন করেছে। বেশ কয়েকবার কামারহাটি পৌরসভা ভোটে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছে এবং এক সময়ে খুব ভালো বক্তব্য রাখতেন। সবটাই স্মৃতি হয়ে গেল। কমরেড বাচ্চু দাস লাল সেলাম।

সিপিআই(এমএল) লিবারেশন, বেলঘরিয়া আঞ্চলিক কমিটি

Aunty Amalabala Saha passed away

চাকদহের শ্রদ্ধেয় মাসিমা অমলাবালা সাহা (কমরেড বিজয় সাহার মা) ১২ মে ২০২১ প্রয়াত হয়েছেন। তিনি সেরিব্রাল এ্যাটাকে দীর্ঘ কয়েকমাস ধরে রোগশয্যায় ছিলেন, মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিলো ৮৭ বৎসর। সত্তর দশকের শেষ দিকে সিপিআই(এমএল)-এর পুনর্গঠনের সময়কাল থেকে নদীয়া জেলার চাকদহ ছিল পার্টির কাজের এক গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চল এবং মাসীমার বাড়ি ছিল পার্টি কমরেডদের নির্ভরযোগ্য ও নিশ্চিত আশ্রয়স্থল। দিনের পর দিন নীরবে নিভৃতে মাসীমা পার্টি নেতৃত্ব ও কর্মীদের বাড়িতে আশ্রয় দিয়ে পার্টিকে এগিয়ে নিয়ে যেতে সহায়তা করে গেছেন, পার্টি দরদী হিসাবে দায়দায়িত্ব পালন করতেন।

পার্টির নদীয়া জেলা কমিটির পক্ষ থেকে প্রয়াত মাসীমাকে অন্তিম শ্রদ্ধা জ্ঞাপন করা হয়।

 

- সমাপ্ত -

খণ্ড-28
সংখ্যা-17
13-05-2021