আজকের দেশব্রতী : ১৬ মার্চ ২০২৩ (অনলাইন সংখ্যা)
farmers

রাজ্যে ক্রমবর্ধমান কৃষি সংকটের তীব্রতা প্রকট ভাবে উঠে এসেছে আলু পিঁয়াজ প্রভৃতি অর্থকরী ফসলের চরম অভাবি বিক্রি, ঋণফাঁদে জর্জরিত চাষিদের আত্মহত্যা, আলুর সহায়ক মূল্য ঘোষণার নামে রাজ্য সরকারের প্রতারণা প্রভৃতি বিষয়গুলিকে কেন্দ্র করে। রাজ্যের গ্রামাঞ্চলে বিশেষত আলু চাষের এলাকাগুলিতে কৃষকদের স্বতস্ফূর্ত বিক্ষোভ ফেটে পড়ছে। বহু জায়গায় চাষিরা রাস্তায় ফসল ফেলে বিক্ষোভ দেখাচ্ছেন। খরচের দেড়গুণ হিসাবে ন্যূনতম সহায়ক মূল্য নির্ধারণের স্বীকৃত পদ্ধতি গ্রহণ না করে কিলো প্রতি মাত্র ৬ টাকা ৫০ পয়সা সরকারি দর ঘোষণা চাষিদের আলুর বিক্রয়মূল্য আরও কমিয়ে দিয়েছে, যা হয়ে উঠেছে চাষির সর্বনাশ ও বড় ব্যবসায়ীদের পৌষমাস। সার-বীজ-কীটনাশকের বিপুল মূল্যবৃদ্ধি চাষের খরচ দ্বিগুণেরও বেশি বাড়িয়ে দিয়েছে। সরকার প্রশাসনের চোখের সামনে চলছে এসবের কালোবাজারি, মজুতদারী। রাজ্যের নিজস্ব বীজ উৎপাদন খামারগুলোকে বন্ধ করে দেওয়া, সমবায় সমিতিগুলিকে অকার্যকর করে সেগুলিকে ব্যবসায়ীদের অবৈধ কারবারে ব্যবহার করা – ইত‍্যাদির ফলে ছোট মাঝারি চাষি ও চুক্তি চাষিরা সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত। মহাজনী ঋণের দায়ে বেশ কয়েকজন আত্মহত্যা করতে বাধ্য হয়েছেন। এখনও পর্যন্ত বিভিন্ন জেলায় ৬ জন চাষির আত্মহত্যার খবর পাওয়া গেছে।

এই পরিস্থিতিতে ৯ মার্চ এআইকেএম-এর পক্ষ থেকে কালনার বৈদ্যপুরে রাস্তায় ফসল ফেলে অবরোধ করা হয় যা ব্যপক জনসমর্থন পায়। দ্রুতই বর্ধমান ও হুগলি জেলার সংগঠন আরও কয়েকটি বিক্ষোভের পরিকল্পনা নেয়। রাজ্যে আলু চাষের অপর এলাকা বাঁকুড়া জেলাতেও একই ধরণের বিক্ষোভ কর্মসূচি নেওয়ার প্রস্তুতি চলছে।

বর্তমানে উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষা চলার কারণে বড় ধরনের প্রচার কর্মসূচি নেওয়া সম্ভব হচ্ছে না। আগামী ২০ মার্চ রাজ্য জুড়ে ব্লক কৃষি আধিকারিকের দপ্তরে বিক্ষোভ ডেপুটেশনের কর্মসূচি নেওয়া হচ্ছে (পরীক্ষা শেষ হবে বেলা ১ টা ১৫ মিঃ তারপর কর্মসূচি নিতে হবে)। বিভিন্ন দাবি সম্বলিত পোস্টার ব্যানার প্ল্যকার্ড সহ সম্ভাব্য সমস্ত উপায়ে প্রচারের মধ্য দিয়ে এই কর্মসূচি নিতে হবে। সমস্ত জেলায় একে সফল করে তোলার আহ্বান জানানো হচ্ছে। এতে রাজ্যের কৃষি বিপনন মন্ত্রীর উদ্দেশ্যে এক দাবিপত্র স্মারকলিপি দিতে হবে। এছাড়া মুখ্যমন্ত্রীর উদ্দেশে এক খোলা চিঠি প্রকাশ করা হবে। ২০ মার্চ দিল্লীতে পার্লামেন্টের সামনে সংযুক্ত কিষাণ মোর্চার মহাপঞ্চায়েত সংগঠিত হবে। এই দিন তার সমর্থনেও প্রচার করতে হবে। আয়ারলা সহ অন‍্যান‍্য সহযোগী সংগঠনগুলিকেও এই কর্মসূচিতে যুক্ত হওয়ার আহ্বান জানানো হচ্ছে।

রাজ্যে পঞ্চায়েত নির্বাচন আসন্ন। গ্রামাঞ্চলে এই গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক লড়াইয়ে আমাদের সর্বশক্তি দিয়ে নামতে হবে। বর্তমান সময়কালে জ্বলন্ত ও জীবন্ত হয়ে ওঠা কৃষি সংকট এবং সেই পরিপ্রেক্ষিতে কেন্দ্র ও রাজ্য সরকারের কৃষক-বিরোধী নীতি বা ভূমিকা নিয়ে এলাকা স্তরে তীব্র প্রচার আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে। দ্রুতই রাজ্যের কৃষি বিপনন মন্ত্রীর কাছে এক প্রতিনিধি দল সাক্ষাত করে স্মারকলিপি জমা দেবে।

দাবিসমূহ                     
১) উৎপাদন খরচের দেড়গুণ দাম সহায়ক মূল্য ঘোষণা করো। ১২০০ টাকা কুইঃ দরে সরকারকে আলু কিনতে হবে।                     
২) এই রাজ্যে ন্যূনতম সহায়ক মূল্য গ্যারান্টি আইন চালু করো।                     
৩) উৎপাদনের কমপক্ষে ২৫ শতাংশ আলু সরকারকে কিনতে হবে এবং হিমঘরে মজুত রাখতে হবে।                     
৪) ১৫০০ টাকা কুইঃ দরে পিঁয়াজ কিনতে হবে।                     
৫) সার বীজ কীটনাশক, বিদ্যুতে ভর্তুকি দিয়ে স্বল্প দামে সরবরাহ করতে হবে। এ নিয়ে কালোবাজারি মজুতদারি বন্ধ করতে হবে। রাজ্যে বীজ খামারগুলি চালু করতে হবে।                     
৬) সমবায়ের মাধ্যমে ক্ষুদ্র মাঝারি চাষিদের সার বীজ সহ কৃষি উপকরণ সরবরাহ করতে হবে। সমবায়গুলিতে গণতান্ত্রিক ও আইনি প্রক্রিয়া চালু করতে হবে।                     
৭) ঋণের দায়ে আত্মহত্যাকারী চাষিদের প্রতিটি পরিবারকে সরকারি ক্ষতিপূরণ দিতে হবে                     
৮) রাজ্য সরকারকে দায় নিয়ে ক্ষুদ্র মাঝারি ভাগচাষিদের সমবায় ঋণ মুকুব করতে হবে।                     
৯) অবিলম্বে ১০০ দিনের কাজ চালু করতে হবে, বকেয়া মজুরি দিতে হবে                     
১০) সন্ত্রাসমূক্ত পঞ্চায়েত নির্বাচন করতে হবে।

cornish_0

রাজদম্ভের বিরুদ্ধে, রাজরোষের বিরুদ্ধে, রাজ্য সরকারের চরম অগণতান্ত্রিক সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে হাজারে হাজারে রাজ্য সরকারি কর্মীরা এবার রুখে দাঁড়ালেন। তৃণমূলী জামানায় এই প্রথম রাজ্য সরকারী কর্মীদের এই প্রতিবাদ প্রতিরোধ রাজ্যের গণতান্ত্রিক শ্রমিক কর্মচারী আন্দোলনে নিঃসন্দেহে এক নতুন মাইল ফলক রচনা করল। হাজারো প্রশাসনিক হুমকি, ডায়াস নন’এর চোখ রাঙানি, ধর্মঘটে সামিল হলে কারণ দর্শানোর হুশিয়ারী — সব যেন ফুৎকারে উড়িয়ে ধর্মঘটে সকলে সামিল হয়ে, শাসকের চোখে চোখ রেখে বুঝিয়ে দিলেন এটা নতুন এক আরম্ভ! তুমি সতর্ক হও। সরকারি কর্মীরা নিজেদের হক এবার বুঝে নিতে বদ্ধপরিকর।

প্রচারের কেন্দ্রবিন্দুতে বকেয়া মহার্ঘ ভাতা প্রদানের বিষয়টা সামনে এলেও, রঙ বেরঙের ধূর্ত প্রচার মাধ্যম কিন্তু আন্দোলনকারীদের তুলে ধরা আরো দু’টো দাবি — ৬ লক্ষাধিক সরকারি শূন্যপদে নিয়োগ ও হাজার হাজার চুক্তিভিত্তিক কর্মীদের স্থায়ীকরণ — সমধিক গুরুত্বপূর্ণ এই দাবিগুলির কোনো উল্লেখই করল না। আর্থিক পাওনা-গণ্ডার মোড়কে জাগ্রত এই উত্থানকে আটকে রাখার শত শয়তানি অপচেষ্টা শেষ পর্যন্ত জোরালো এক রাজনৈতিক অভিঘাত নিয়েই আত্মপ্রকাশ করল, আর তাই, এই আন্দোলনকে দমন করার হরেক কৌশল নিতে রাজ্য প্রশাসন কোনো কসুরই করল না। এমনকি ধর্মঘটের দিনে তৃণমূল আশ্রিত গুন্ডাবাহিনীও রাজ্যের নানা প্রান্তে তান্ডব চালিয়েছে।

ভারতে ‘সর্বাধিক প্রচারিত প্রথম শ্রেণির বাংলা দৈনিক’ কর্মী ধর্মঘটের দিনই তার সম্পাদকীয় নিবন্ধে কেন্দ্র বা রাজ্য সরকারি কর্মীদের মহার্ঘ ভাতার বিষয়টিকে ‘অন্যায্যপূর্ণ’ এক ব্যবস্থা হিসাবে দাগিয়ে তা বন্ধ করে সমাজের প্রান্তিক, বিপন্ন মানুষের স্বার্থরক্ষার্থে সর্বজনীন উন্নয়ন খাতে রাষ্ট্রীয় ব্যয়ের সপক্ষে ওকালতি করেছে। কারণ, পত্রিকার ভাষায়, এরাই হলেন সমাজের ‘নিরাপদতম’ শ্রেণি। আর, দেশের সমগ্র শ্রমশক্তির মাত্র ২.২ শতাংশ সরকারি কর্মীদের জন্য মহার্ঘ ভাতার এই অন্যায্যতা কখনই বরদাস্ত করা যায় না! প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, বিশ্বে উন্নয়নশীল দেশগুলোর মধ্যে একমাত্র ভারতবর্ষ সরকারি ক্ষেত্রে সবচেয়ে কম কর্মসংস্থান করে থাকে। তারমধ্যেও বিপুল সংখ্যক সরকারি পদ বিলুপ্ত করা, বা শূন্যপদ পূরণ না করা সমস্ত ধরনের সরকারের এক সাধারণ নীতি হয়ে দাঁড়িয়েছে। দরিদ্র বিপন্ন শ্রমশক্তির আর্থিক উন্নয়নের জন্য তাঁদের ন্যায্য মজুরি বৃদ্ধির বিপরীতে দাঁড়িয়ে স্বঘোষিত জ্যেঠামশাইয়ের দল সরকারি বদান্যতায় সামাজিক আর্থিক প্রকল্পগুলোকেই উন্নয়নের সোপান হিসাবে দেখাবার চেষ্টা করেছে, যার অর্থ হল দরিদ্র শ্রমজীবীরা সরকারি কোনো অনুদানের গ্রহীতা হিসাবেই, প্রজা হিসাবেই সরকারি অনুগ্রহ-নির্ভর জীবন কাটাবেন। তাঁদের থাকবে না আইনসিদ্ধ ন্যূনতম মজুরির অধিকার। আর, মজুরির আইনত অর্থই হল মহার্ঘ ভাতার অধিকার।

উল্লিখিত পত্রিকাটি আরও অভিযোগ করেছে, “কোনো বিবেচনা ব্যতিরেকে নিয়মিত ব্যবধানে বেতন বৃদ্ধি ঘটলে উৎপাদনশীলতার ভয়ঙ্কর ক্ষতি হয়”। এই প্রসঙ্গে আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার প্রকাশিত সাম্প্রতিক সমীক্ষা ‘গ্লোবাল ওয়েজ রিপোর্ট ২০২২-২৩’ প্রণিধানযোগ্য। উক্ত সমীক্ষা জানিয়েছে, এই শতাব্দীতে এই প্রথম বৈশ্বিক প্রকৃত মজুরি ঋণাত্বক স্তরে গড়িয়ে পড়েছে — ২০২২’র প্রথম অর্ধে বৈশ্বিক প্রকৃত মজুরি সংকুচিত হয়েছে (-)০.৯ শতাংশ হারে! শুধু তাই নয়, সমীক্ষার মতে, ২০২২ দেখাল যে ১৯৯৯’র পর এই প্রথম প্রকৃত উৎপাদনশীলতা ও প্রকৃত মজুরির বৃদ্ধির হারের মধ্যে সবচেয়ে বেশি তফাত তৈরি হয়েছে। প্রকৃত মজুরি সর্বত্র কমলেও তরতর করে বেড়েছে উৎপাদন ও উৎপাদনশীলতা। আরও প্রণিধানযোগ্য, বিশ্বজুড়ে সমস্ত স্তরের শ্রমিক কর্মচারীর ক্ষেত্রেই এই সংকোচোন ঘটেছে আর উচ্চ আয় সম্পন্ন দেশগুলিতে এই তফাত সবচেয়ে বেশি। এই নির্মম তথ্যটি গোপন রাখল ‘সর্বাধিক প্রচারিত প্রথম শ্রেণির বাংলা দৈনিক’টি।

রাজ্য সরকারি কর্মীদের বৃহত্তম সাবেক বামপন্থী সংগঠনের ডাকে নয়, এই প্রথম ৫৫টি বিভিন্ন সরকারি সংগঠন ও মঞ্চ একত্রে ‘সংগ্রামী যৌথ মঞ্চ’এর পতাকাতলে ঐক্যবদ্ধ হয়ে এই নতুন অধ্যায় রচনা করলেন। নতুন সংগঠন ও সংগ্রামের রূপ হাজার হাজার সরকারি কর্মীদের ইচ্ছা-আকাঙ্ক্ষার মূর্ত প্রতীক হয়ে উঠে। এখানেই রয়েছে সংগঠনের সার্থকতা ও সাফল্যের চাবিকাঠি।

আগামীতে এই আন্দোলন কিভাবে এগিয়ে যাবে, রাজ্য সরকারের আচরণও কী হবে তা পর্যবেক্ষণ করা দরকার। তবে সরকারি কর্মী আন্দোলনে যে নতুন প্রাপ্তি, ইতিবাচক অধ্যায় সংযোজিত হল, বিপ্লবী-বাম-গণতান্ত্রিক মহল তাকে কুর্নিশ জানায়। নতুন আশায় বুক বেঁধে এগিয়ে যাবে এই হার-না-মানা জেদ।

united-kisan-morcha

২০ মার্চ দিল্লীতে সংসদের সামনে সংগঠিত হবে কিষাণ মহাপঞ্চায়েত গঠিত হবে ৩১ সদস্যের জাতীয় সমন্বয় কমিটি

এই মহাপঞ্চায়েতের মাধ্যমে ন্যূনতম সহায়ক মূল্যে (এমএসপি) (সি২ + ৫০%) সমস্ত কৃষিপণ্য কেনার জন্য আইনি গ্যারান্টি, সম্পূর্ণ ঋণমুক্তি, বিদ্যুৎ সংশোধনী বিল ২০২২ প্রত্যাহার, লখিমপুর খেরিতে কৃষক ও সাংবাদিক গণহত্যার অভিযোগে অভিযুক্ত কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী অজয় মিশ্র টেনিকে বরখাস্ত করা, প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে কৃষকদের ফসলের ক্ষতির দ্রুত ক্ষতিপূরণের জন্য ব্যাপক এবং কার্যকর ফসল বীমা প্রকল্প, সমস্ত মাঝারি, ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক কৃষক এবং কৃষি শ্রমিকদের প্রতি মাসে ৫০০০ টাকা কৃষক পেনশন, কৃষক আন্দোলনের সময় কৃষকদের বিরুদ্ধে দায়ের করা সমস্ত মিথ্যা মামলা প্রত্যাহার, কৃষক আন্দোলনে শহীদ হওয়া সকল কৃষকের পরিবারকে ক্ষতিপূরণ, কৃষি জমি অধিগ্রহণ নিষিদ্ধ করা প্রভৃতি দাবি সংযুক্ত কিষাণ মোর্চা কেন্দ্রীয় সরকারের কাছে জানাবে।

বৈঠকে, সংযুক্ত কিষাণ মোর্চার ৯ দফা দিশা নির্দেশিকা চূড়ান্ত করা হয়, যার মধ্যে সংযুক্ত কিষাণ মোর্চা পরিচালনার জন্য ৩১ সদস্যের জাতীয় সমন্বয় কমিটি গঠন করা হবে বলে সিদ্ধান্ত হয়েছে।

বৈঠকে, মহিলা কোচকে যৌন হয়রানির অভিযোগে অভিযুক্ত হরিয়ানার মন্ত্রী সন্দীপ সিংকে মন্ত্রিসভা থেকে বরখাস্ত করার দাবিতে একটি প্রস্তাব পাস করা হয়। হরিয়ানা সংযুক্ত কিষাণ মোর্চার সিদ্ধান্ত অনুসারে, নির্যাতিত মহিলার জন্য ন্যায়বিচার পাওয়ার লড়াই আরও তীব্রতর করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

বৈঠক শেষ হওয়ার পর উপরোক্ত বিষয়গুলি নিয়ে সভাপতি মন্ডলী এক সাংবাদিক সম্মেলন করেন। সংযুক্ত কিষাণ মোর্চার পক্ষে সংবাদ বিবৃতি জারি করেছেন যুধবীর সিং, রাজারাম সিং এবং ডঃ সুনিলম।

farmer's-income-is-just-a-mirage

২০২২’র মধ্যে চাষির আয় দ্বিগুণ করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন প্রধানমন্ত্রী। বিরাট ঢাক ঢোল পিটিয়ে সেই ঘোষিত কাজের লক্ষ্যকে বিজ্ঞাপিত করা হয়েছিল সরকারের উচ্চাসন থেকে। ২০২৩ সাল এলো। এ’বছরের বাজেট বক্তৃতায় তার কোন প্রতিধ্বনি শোনা গেল না। ভারতীয় অর্থনীতিতে বেকারত্ব যখন এক নির্মম বাস্তব, অর্থমন্ত্রীর গোটা বাজেট ভাষণে ‘বেকারত্ব’ শব্দটি একবারের জন্যও শোনা গেল না। বরং বাজেটে দেখা গেল, চাষির ন্যূনতম আয় নিশ্চিত করার যে উদ্যোগগুলি আগে ঘোষিত হয়েছিল, এবার কার্যত তা বাতিল করা হয়েছে। যেমন, প্রধানমন্ত্রী অন্নদাতা আয় সংরক্ষণ যোজনা অভিযান (পিএম আশা)। প্রধানত তৈলবীজ ও ডাল চাষিদের জন্য ২০১৮ সালে এই প্রকল্প শুরু হয়, যাতে ফসলের দাম পড়ে গেলে সরকার সরাসরি ফসল কিনে নানা উপায়ে চাষিকে ক্ষতির হাত থেকে বাঁচাতে পারে। ২০২২-২৩ এই প্রকল্পের জন্য বরাদ্দ ছিল এক কোটি টাকা, ২০২৩-২৪’র জন্য বরাদ্দ হয়েছে মাত্র এক লক্ষ টাকা। আনাজ ও ফল চাষিদের ক্ষতি সামাল দিতে ঘোষিত মার্কেট ইন্টারভেনশন স্কিম অ্যান্ড প্রাইস সাপোর্ট স্কিমে বরাদ্দ দেড় হাজার কোটি টাকা থেকে কমে দাঁড়িয়েছে এক লক্ষ টাকা। কী করে তৈলবীজ বা আনাজ চাষিরা ফসলের ন্যায্য দাম পাবেন, তার কোনো দিশাও নেই এবারের বাজেটে। ফসল বিমা থেকে ক্ষতিপূরণ পাওয়ার কথা তাঁদের। জলবায়ু পরিবর্তনের ধাক্কা সামলাতে বিমাই ভরসা তা স্বীকার করেছে এবারের আর্থিক সমীক্ষাও। কিন্তু প্রধানমন্ত্রী ফসল বিমা যোজনায় বরাদ্দ কমেছে প্রায় দু’হাজার কোটি টাকা। পিএম কিষাণে বরাদ্দ কমেছে আট হাজার কোটি টাকা! সারে ভর্তুকির অঙ্কেও বড় কাটছাঁট হয়েছে।

যে তিনটি কৃষি আইন বাতিলের দাবিতে গোটা ভারতবর্ষ দেখল ঐতিহাসিক কৃষক আন্দোলন, যে সুসংগঠিত প্রতিবাদ প্রতিরোধের চাপে মোদী সরকার কার্যত রাজনৈতিক পরাজয় স্বীকার করতে বাধ্য হয়, সেই আন্দোলনের কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল ন্যূনতম সহায়ক মূল্য নিশ্চিত করা এবং সরকারি ক্রয় আরো বাড়ানোর দাবি। খুব সম্প্রতি, দেশের বিভিন্ন প্রান্তে পেঁয়াজ, টমেটো চাষিরা উপযুক্ত মূল্য না পেয়ে আবার উৎপাদিত ফসল নষ্ট করে সরকারের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে শুরু করেছেন। পরিহাস এটাই, এবারের বাজেট বক্তৃতায় একবারের জন্যও উচ্চারিত হল না এমএসপি শব্দটি — খাদ্যে ভর্তুকির বরাদ্দ ছাঁটা হল প্রায় ৯০ হাজার কোটি টাকা। স্বাভাবিক ভাবেই, এরফলে সরকারি ক্রয় সংকুচিত হবে।

দেশের অর্থনীতি এখনও তার বিরাট ঝিমুনিকে কাটিয়ে উঠতে পারেনি। ২০২১-২২এ প্রকৃত মাথাপিছু আয় এখনও ২০১৮-১৯’র স্তর থেকে নীচে ঘোরাফেরা করছে। ২০১৬-১৭ এবং ২০২১-২২এ সামগ্রিক বৃদ্ধির হার ৩.৭ শতাংশ রয়েছে — গত চার দশকে পাঁচ বছরের পর্যায়ে যা সর্বনিম্ন!

একথা আজ সকলেই স্বীকার করেন যে, অতিমারির প্রাদুর্ভাবের আগে থেকেই অর্থনীতি মন্থর হয়ে পড়ে, আর কোভিড অতিমারি সেই মরার উপর খাঁড়ার আঘাত নামিয়ে আনে। অর্থনীতি মন্থর হয়ে পড়ার যে সমস্ত কাঠামোগত কারণগুলো নিহিত ছিল, তা কখনই সমাধান করা হয়নি, আর গত তিন বছর ধরে সরকার কোনোক্রমে সংকট সামাল দিয়ে চলার চেষ্টা করেছে মাত্র। এর মধ্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হল চাহিদার ক্ষয় — ভোগব্যয় (কনজাম্পশন) ও বিনিয়োগের ক্ষেত্রে যা প্রতিফলিত। ব্যক্তিগত ভোগব্যয় অর্থনীতির প্রায় ৬০ শতাংশ দখল করে রাখে, কিন্তু অর্থনীতির এই গুরুত্বপূর্ণ ইঞ্জিন সচল হল না। চাহিদার অভাবে শিল্প মহল নতুন বিনিয়োগেও আগ্রহী নয়। আর গ্রামাঞ্চলে এই আর্থিক সংকট অনেক বেশি তীব্রতা নিয়ে হাজির। বিগত এক দশক ধরে গ্রামীণ মজুরি থমকে রয়েছে। চাষিদের আয় হ্রাস প্রাপ্ত হয়েছে, অথবা গত পাঁচ বছরে দাঁড়িয়ে রয়েছে একই জায়গায়। সর্বশেষ সিএমআইই তথ্য দেখাল, গ্রামীণ বেকারত্ব এক লাফে বৃদ্ধি পেয়েছে – জানুয়ারি ২০২৩-এ ৬.৪৮ শতাংশ থেকে ফেব্রুয়ারিতে তা হয়েছে ৭.২৩ শতাংশ! উচিত ছিল, ২০২৩’র বাজেটে গ্রামীণ আয় বাড়ানোর জন্য একপ্রস্থ পদক্ষেপ ঘোষণা। যা এবারও দেখা গেল না।

গ্রামীণ অর্থনীতিকে পুনরুজ্জীবিত করার জন্য যে সমস্ত পদক্ষেপগুলো নেওয়া দরকার ছিল, দেখা যাচ্ছে, প্রতিটা ক্ষেত্রেই তার উপর কোপ মারা হয়েছে। গতবছর কৃষিক্ষেত্রের জন্য যা বরাদ্দ ছিল, এবার তা কমানো হয়েছে। বাস্তব এটাই, কৃষিক্ষেত্র যখন সবচেয়ে বেশি সংকটের মধ্য দিয়ে চলছে, তখনই এই ক্ষেত্রে প্রকৃত অর্থে দশ শতাংশ কাটছাঁট করা হল বাজেটে। সারের উপর ভর্তুকি তুলে দেওয়ার ফলে চাষের ইনপুট খরচ অনেক বেড়ে যাবে। এমনকি নাম কা ওয়াস্তে পিএম কিষাণ প্রকল্পে যে নগদ হস্তান্তর করা হতো, সেই বরাদ্দও এবার ছেঁটে ফেলা হয়েছে। গত পাঁচ বছর ধরে বাজেটে কৃষিক্ষেত্রের প্রতি যে মনোভাব দেখানো হয়েছিল, এবারও সেই ধারা বজায় রয়েছে। ঠিক যে পর্যায়ে ভারতীয় কৃষি অর্থনীতি লাভজনক হওয়ার পথে সবচেয়ে বড় ধরনের সংকটে ভুগছে, সেই ২০১৬-১৭ ও ২০২০-২১-এ কৃষিতে সরকারি বিনিয়োগ প্রতিবছর কমেছে ০.৬ শতাংশ হারে!

গ্রামীণ অর্থনীতিতে এখন অ-কৃষি ক্ষেত্র অনেক বেশি অবদান রাখছে। কিন্তু, এবারের বাজেটে বরাদ্দ এই ক্ষেত্রেও সংকুচিত হয়েছে। কেন্দ্রীয় গ্রামীণ বিকাশের ১.৫৭ লক্ষ কোটি টাকা বাজেট বরাদ্দ গতবছরের সংশোধিত বরাদ্দের থেকে ১৩ শতাংশ কম! দেখা যাচ্ছে, নরেগা প্রকল্পে কমানো হয়েছে ৬০,০০০ কোটি টাকা। গত পাঁচ বছরের মধ্যে এই প্রকল্প খাতে প্রকৃত বরাদ্দের সাপেক্ষে এবারের বরাদ্দ সর্বনিম্ন! একমাত্র যে প্রকল্পে আর্থিক বরাদ্দ বাড়ানো হয়েছে, তা হল গ্রামীণ আবাস যোজনা — ৪৮,৪২২ কোটি টাকা থেকে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৫৪,৪৮৭ কোটি টাকায়। এদিকে, লাগামছাড়া মূল্যস্ফীতির পাশাপাশি বিনামূল্যে খাদ্য শস্য বন্টনের প্রকল্পটি প্রত্যাহার করে নেওয়ায় সামনের দিনগুলোতে গ্রামীণ ভারতে ঘোর দুর্দিন নেমে আসবে। ২০২৩-২৪’র জন্য পোষণ ‘মিড-ডে-মিল’এর জন্য বরাদ্দ কমানো হয়েছে ১,২০০ কোটি টাকা। আর, ২০২৩-২৪’র জন্য খাদ্যে ভর্তুকি হ্রাস করা হয়েছে ৮০,০০০ কোটি টাকা! গভীরতর সংকটের আবর্তে নিমজ্জিত ভারতের অর্থনীতি।

- অতনু চক্রবর্তী

tmcruled-west-bengal

মহারাষ্ট্রের দোল উৎসব রং-পঞ্চমী নামে খ্যাত। এই উৎসবের ঠিক পাঁচদিন আগে সেখানে হোলিকা দহন করা হয়, অনেকটা আমাদের চাঁচর বা নেড়াপোড়ার মতো। এ’বছর সেখানে হোলিকা দহনের দিন এক অভিনব ঘটনা ঘটেছে। ‘হোলিকা’র দু’দিন আগে, নাসিক জেলার ইয়েওয়ালা তালুকের মাথুলথান গ্রামের এক কৃষক কৃষ্ণ ডোংরে পার্শ্ববর্তী এলাকার কৃষকদের তাঁর খামারে বহ্ন্যুৎসব পালনের জন্য আমন্ত্রণ জানান। তাঁর আমন্ত্রণে বহু কৃষক উপস্থিত হলে, তিনি তাঁদের সকলের সামনে তাঁর দেড় একর জমির সমস্ত পেঁয়াজ আগুন জ্বালিয়ে পুড়িয়ে দেন। বিষ্মিত জনতাকে তিনি বলেন, “এটি শুধু মহারাষ্ট্রের নয়, সমগ্র জাতিরই এক কালো দিন হয়ে রইল কারণ একজন কৃষক তার সমস্ত পেঁয়াজকে জ্বালিয়ে দিয়ে ‘হোলিকা’ উদযাপন করতে বাধ্য হয়েছে।” (সূত্রঃ নিউজক্লিক, ৬ মার্চ ২০২৩)

মহারাষ্ট্রে তো ‘ডবল ইঞ্জিনের’ সরকার, তবুও ওই কৃষক এমন পথ বেছে নিলেন কেন? তাঁর দেড় একর জমিতে পেঁয়াজ ফলাতে মোট খরচ হয়েছিল দেড় লক্ষ টাকা। গড়ে প্রতি বিঘায় তাঁর আশি বস্তা (৪০ কেজি) পেঁয়াজ ফলেছিল। তিনি খবর নিয়ে জেনেছিলেন, নাসিকের কাছে লাসালগাঁও’এ (যেখানে রয়েছে এশিয়ার বৃহত্তম পেঁয়াজের পাইকারি বাজার) তাঁর সমস্ত পেঁয়াজ পৌঁছাতে পরিবহন খরচ লাগত ৩০ হাজার টাকা। আর তিনি তাঁর সমস্ত পেঁয়াজ বেচে পেতেন মাত্র ২৫ হাজার টাকা। অর্থাৎ কুইন্টাল প্রতি তাঁকে ১৭৩ টাকা দরে (এক টাকা তিয়াত্তর পয়সা কেজি) পেঁয়াজ বিক্রি করতে হত। এমন বীভৎস লোকসানে ফসল বিক্রি করতে তিনি রাজি হননি। তাই প্রতিবাদ জানাতে তিনি হোলিকা উৎসবের আবহকেই বেছে নিয়েছেন।

না, কৃষ্ণ ডোংরের ঘটনা কোনো ব্যতিক্রমী ঘটনা নয়। গত ফেব্রুয়ারি মাসে শোলাপুর জেলার এক ক্ষুদ্র কৃষক জানাচ্ছেন, ৫১২ কেজি পেঁয়াজ বিক্রি করে, চাষের সমস্ত খরচ-খরচা বাদে তিনি লাভ করেছেন ২ টাকা ৪৯ পয়সা মাত্র! তিনি ১ টাকা কেজি দরে পেঁয়াজ বিক্রি করতে বাধ্য হয়েছেন।

তাহলে মহারাষ্ট্রের কৃষকরা কি নীরবে এই যন্ত্রণা মেনে নিচ্ছেন? কখনোই না। ২৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৩ তাঁরা লাসালগাঁও’এ পেঁয়াজ নিলাম বন্ধ করে দিতে বাজার কমিটিকে বাধ্য করেন। শিরসাগাঁও’এ (নাসিক) কেন্দ্রীয় মন্ত্রী ভারতী পাওয়ারকে তাঁরা ঘেরাও করেন। তাঁরা দাবি জানান, সরকারকে ১৫০০ টাকা কুইন্টাল দরে পেঁয়াজ কিনতে হবে।

আন্দোলনের চাপে মহারাষ্ট্রের উপমুখ্যমন্ত্রী দেবেন্দ্র ফড়নবিশ বিধানসভায় ঘোষণা করেছেন, ‘নাফেড’ ৯০০ টাকা কুইন্টাল দরে পেঁয়াজ কিনতে শুরু করেছে। তা, কেন্দ্রীয় সরকারের এই প্রতিষ্ঠান মহারাষ্ট্রে কত পরিমাণ পেঁয়াজ কিনেছে? ৮ মার্চ ২০২৩ অবধি ৮ হাজার টন মাত্র! সরকারী ক্রয়ক্ষমতার কেরামতি আছে বটে!

এই প্রসঙ্গে মহারাষ্ট্রের সাথে আমাদের রাজ্যের পেঁয়াজ চাষিদের এক তুলনামূলক চিত্র তুলে ধরলে মন্দ হয়না। পশ্চিমবঙ্গে পেঁয়াজ চাষের প্রধান এলাকাগুলি হল হুগলীর বলাগড় ব্লক এবং বর্ধমানের ভাগিরথী তীরবর্তী কালনা ও নাদনঘাট থানার গ্রামাঞ্চল। এ’রাজ্যে পেঁয়াজের যা প্রয়োজন তার মাত্র ৩০ শতাংশ এ’রাজ্যে উৎপাদিত হয়। আর এর প্রায় সবটাই উৎপন্ন হয় পূর্বে উল্লিখিত এলাকাগুলিতে। বলাগড়ে খোঁজ নিয়ে জানা গেল, এক বিঘা জমিতে পেঁয়াজ চাষে খরচ হয়েছে গড়পরতা ৩৫ হাজার টাকা। বিঘেয় সর্বাধিক ৮০ বস্তা (৪০ কেজি) পর্যন্ত ফলন হয়েছে। একটা সময় ১৮০ টাকা বস্তা দরেও চাষিকে পেঁয়াজ বেচতে হয়েছে। এখন দর বেড়ে হয়েছে ৩৫০ টাকা বস্তা। এখনকার দর ধরলেও, একজন চাষি বিঘেপিছু সর্বাধিক ৩০ হাজার টাকা দাম পেয়েছেন। তাহলেও তাঁর বিঘা প্রতি লাভ দূরের কথা, ৫ হাজার টাকা লোকসান হয়েছে। এ’রাজ্যে হিমঘরে পেঁয়াজ সংরক্ষণের তেমন রেওয়াজ নেই। সুতরাং নানা বুদ্ধি খাটিয়ে কোনো চাষি (অবশ্যই তাঁকে স্বচ্ছল চাষি হতে হবে) যদি তাঁর বাড়ি বা খামারে কয়েকমাস পেঁয়াজ মজুত করে রাখতে পারেন, শেষে তিনি কিছুটা লাভের মুখ দেখলেও দেখতে পারেন। একেবারে গরিব চাষি — যিনি পারিবারিক শ্রমের ওপর নির্ভর করে চাষ করেন, তিনি ‘না লাভ, না লোকসান’ — এই অবস্থায় এ মরশুমটা পার করে দেবেন। আর গরিব যে ঠিকা চাষি, বিঘে কড়া ৫ হাজার টাকা জমি মালিককে দেওয়ার শর্তে চাষ করেছিলেন, এবার তাঁর ডাঁহা লোকসান। এ’রাজ্যের সরকার মহারাষ্ট্রের বিজেপি ও দলভাঙ্গানো শিবসেনা সরকারের মতো পেঁয়াজ কেনা বা সহায়ক মূল্য ঘোষণার সামান্য নাটকটুকুও করেনি। করবেই বা কেন? মুখ্যমন্ত্রী তো পেঁয়াজি ভাজার কথা বলেননি। তিনি বলেছেন ‘চপ শিল্পের’ কথা।

শীতের ফসল বা রবিশস্যের মধ্যে সরষে হল এক গুরুত্বপূর্ণ অর্থকরী ফসল। আর সরষে চাষে অগ্রণী রাজ্যগুলির মধ্যে হরিয়ানা অন্যতম। বিজেপি-জেজেপি’র জোট সরকার চলছে এখানে। উন্নত কৃষির এই রাজ্যে এ’বছর ৬.৫০ লাখ হেক্টর জমিতে সরষে চাষ হয়েছিল। সেখানকার কৃষি দপ্তরের আশা ছিল, রাজ্যে এবার সরষের মোট উৎপাদন হবে ১৩.৬৫ লক্ষ টন। সহজ হিসেবে, বিঘে পিছু সেখানে ২৮৪ কেজি সরষে ফলার কথা। বাস্তবে সেখানে ফলন হয়েছে অনেক কম। প্রচণ্ড শীতে এবার ফুল ঠিক ফুটতে পারেনি। কমপক্ষে ৫০ শতাংশ উৎপাদন মার খেয়েছে (কোনো কোনো ক্ষেত্রে লোকসানের পরিমাণ ৮৫ শতাংশ ছুঁয়েছে)। বিঘেতে গড়পরতা এবার সরষের ফলন হয়েছে মাত্র এক কুইন্টাল। ব্যবসাদাররা কুইন্টাল পিছু সরষে কিনছে ৪৬০০ থেকে ৫০০০ টাকায়। কেন্দ্রীয় সরকার সরষের এমএসপি বা ন্যূনতম সহায়ক মূল্য ধার্য্য করেছে ৫৪৫০ টাকা। প্রবল লোকসানের মুখে দাঁড়িয়ে ক্ষুব্ধ কৃষকরা সরষের এমএসপি বৃদ্ধির দাবি তুলেছেন। অন্যদিকে হরিয়ানা সরকার এমএসপি বাড়ানো দূরে থাক, সরকারী উদ্যোগে সরষে কেনাই শুরু করতে পারেনি। পাঁজি-পুঁথি দেখে টেখে তাঁরা স্থির করেছেন, আগামী ২৮ মার্চ ২০২৩ থেকে সরকারী উদ্যোগে সরষে কেনা শুরু হবে। ততদিনে ফড়ে-ব্যবসায়ীরা ছোট চাষিদের অভাবি বিক্রির আরও যে সুযোগ নেবে সে তো জানা কথা। তা না হলে, এই ক’দিন আগেও মানুষকে ২২০ টাকা কেজি সরষের তেল কিনতে হল কেন? সস্তায় কেনা সরষে ঘুরপথে আদানি মার্কা কোম্পানিগুলোর কাছে পৌঁছায় আর আমরা ‘হাঁ’ করে ‘ফরচুন কাচ্চি ঘানি সরষের তেলের’ বিজ্ঞাপন দেখতে থাকি।

এরাজ্যে অবশ্য জলবায়ু সরষে চাষের অনুকূল না হওয়ায় খুব কম সংখ্যক কৃষকই এখানে সরষে চাষ করেন। ফলন হয় বিঘে পিছু মোটামুটি এক কুইন্টাল, দেড় কুইন্টাল হলে তো ‘বিরাট ব্যাপার!’ দাম ওঠে ৪২০০ থেকে ৪৪০০ টাকা। কৃষকের দু’মুখ সমান হয়ে যায়। তবু তাঁরা সহ্য করে নেন কারণ ঘরে ব্যবহারের তেলটুকু তো আর কিনতে হচ্ছে না!

প্রধান অর্থকরী ফসলের মধ্যে আর বাকি থাকল আলু। বিশেষ করে আমাদের রাজ্যে, বেশ বড় অংশ চাষি (কমপক্ষে ৩০ লক্ষ কৃষক) আলু চাষ করে থাকেন। কিন্তু আলু চাষ হল সাপ লুডোর মতো। একবছর দারুন লাভ হল, তো পর পর দু’বছর মাথায় হাত। যেমন ২০২০তে চাষিদের অনেকেই বস্তা পিছু ৭০০ টাকাও দাম পেয়েছিলেন। লাভের আশায় ২০২১এ বেশি জমিতে আলু চাষ করে সর্বনাশের এক শেষ। দাম উঠল না। গতবছর অসময়ে বৃষ্টির কারণে ডবল করে চাষ করতে হল। দাম ভালোই উঠল। কিন্তু নাবি চাষে একে ফলন হল কম তার ওপর ডবল চাষের খরচা। চাষিদের বড় লোকসান হল। কিন্তু চাষ ছেড়ে তাঁরা যাবেন কোথায়? কর্মসংস্থানের আর তো সুযোগ নেই। এবার আকাশ ভালো ছিল। গতবারের লোকসান পোষানোর আশায় এবার অধিকতর জমিতে চাষ হল। রাজ্য সরকারের কৃষিপণ্য বিপনন দপ্তর থেকে বলা হল, আলুর ব্যাপক ফলন হবে (দেশব্রতী, ২ মার্চ ২০২৩ দ্রষ্টব্য)। হয়তবা এমন রটনার পিছনে বৃহৎ ব্যবসাদারদের ছক ছিল। চাষিরা ভয় পেয়ে মাঠ থেকেই আলু বিক্রি করতে থাকলেন। দাম পেলেন ২৭০-২৮০ টাকা বস্তা (৫০ কেজি)। চাষিদের মধ্যে হাহাকার দেখা দিল। সরকার বলল, ৬৫০ টাকা কুইন্টাল দরে আলু কিনবে। কিন্তু এই সামান্য সহায়ক মূল্যে কী হবে? বিঘে পিছু আলু চাষে খরচ ২৮-২৯ হাজার টাকা। আলু মাত্রায় জমি থেকে তোলার পর দেখা গেল, বেশিরভাগ জমিতেই ফলন খুব কম হয়েছে। মেরে কেটে বিঘেয় ৬০ বস্তা। সরকারী দাম পেলে তো বিঘেয় ২০ হাজার টাকাও হচ্ছেনা। তবু কৃষকদের জন্য সামান্য স্বস্তির কথা হল, এবার রাজ্যে মোট ৩০ শতাংশ উৎপাদন কম হওয়ায় রাজ্যের হিমঘরগুলি সম্পূর্ণত ভর্তি হবেনা। হিমঘর মালিকরা স্টোর ভরাতে আলু কেনার জন্য টাকা ঢালছেন। (বৃহত্তম আলু উৎপাদক রাজ্য উত্তরপ্রদেশের ছবিটা একটু ভিন্ন। সেখানে সমস্ত হিমঘর ভর্তি হয়ে গেছে। গড়ে চাষিরা সেখানে দাম পেয়েছেন ৩০০ টাকা বস্তা। তবে ফলন বেশি হওয়ায় চাষিরা ক্ষতি অনেকটা সামলে নেবেন।) আলুর দাম সাড়ে চারশোর দিকে এগিয়ে চলেছে। তাতেও চাষির লোকসানের পরিমাণ কমলেও লাভ হওয়ার আশা নেই। আর আগেই সস্তায় ফসল বেচে দিয়েছেন যে ক্ষুদ্র কৃষকরা তাঁদের দুর্দশা তো ঢের ঢের বেশি।

কৃষি ও কৃষকের এই সঙ্কট দেখে অনেকে ভাবেন, “এ থেকে উদ্ধারের রাস্তা নেই। লড়াই করে লাভ নেই।” তবু লড়াই হচ্ছে, হবে। তবে রাস্তার লড়াইকে যুক্ত করতে হবে সরকারগুলির নীতি পরিবর্তনের দাবির সাথে। কৃষি ও গ্রামোন্নয়ন খাতে সরকারগুলি ফি বছর বরাদ্দ কমিয়েই চলেছে। এই অভিমুখের বদল ঘটানোর জন্য কৃষক সহ সমস্ত গণতান্ত্রিক সমাজকে সোচ্চার হতে হবে। বলতে হবে, “কর্পোরেটদের তৈল মর্দন করা চলবেনা। কৃষিতে ব্যয় বরাদ্দ বৃদ্ধি কর। সার, বীজ, বিদ্যুৎ, ডিজেল, কীটনাশকের দাম কমাও। কৃষককে সহজ শর্তে ঋণ দাও এবং ফসলের পর্যাপ্ত দাম পাওয়ার গ্যারান্টি সৃষ্টি কর।” 

- মুকুল কুমার

response-to-the-strike

১০ মার্চ বাঁকুড়া জেলা জুড়ে ধর্মঘটের প্রভাব ছিল চোখে পড়ার মতো। সবথেকে অবাক হতে হয় তৃণমূল কংগ্রেসের আধিপত্য থাকা ব্লকগুলিতে এবং খাতড়া মহকুমাতেও ধর্মঘটের প্রভাব দেখলে। বিভিন্ন স্কুল কলেজ ও সরকারী দফতরগুলিতে এদিন কর্মীরা খুবই অল্প সংখ্যায় উপস্থিত হন।

বাঁকুড়া শহরে এআইসিসিটিইউ-র পক্ষ থেকে সিটু, কো-অর্ডিনেসন কমিটি, ১২ই জুলাই কমিটি ও অন্যান্য কয়েকটি বাম শ্রমিক সংগঠনের যৌথ মঞ্চের সাথে একাত্ম হয়েই এই দিন সকাল থেকে মিছিল, পিকেটিং ও অবস্থানে সামিল হয়েছিলাম আমরা। এখানে সংগ্রামী যৌথ মঞ্চের পক্ষ থেকে আমাদের সাথে কোনো যোগাযোগ তেমনভাবে গড়ে ওঠেনি। বাঁকুড়ায় প্রশাসনিক দপ্তরগুলির চত্বরে ইতিপূর্বে আমরা হাতে লেখা পোষ্টারের মাধ্যমে ১০০ দিনের কাজের বকেয়া টাকা মেটানোর দাবি তুলে ধরি এবং ধর্মঘটের দিন সকাল থেকেই অস্থায়ীদের স্থায়ীকরণ ও সমস্ত শূন্যপদে স্বচ্ছতার সাথে নিয়োগ – এই দুটি দাবীতে অনর্গল স্লোগান দেওয়া হয়। ফলস্বরূপ শুধু ডিএ-র দাবিতে যে বনধ নয় তা মানুষকে কিছুটা হলেও বোঝানো গেছে। সর্বোপরি অন্যসব সংগঠনও আমাদের সাথে শেষ পর্যন্ত ঐ দুটি দাবিকে তুলে ধরে স্লোগান দিতে শুরু করে।

বিষ্ণুপুর মহকুমাতেও এইদিন ধর্মঘটের প্রভাব ভালো ছিল। পৌরসভাতে আমাদের নিজস্ব ইউনিয়নের বলে আমরা ধর্মঘট সফল করতে সক্ষম হই। সকাল থেকেই পৌরসভার গেটের সামনে এই দিন সাফাইকর্মীরা ঝুড়ি-কোদাল-ঝাঁটা রেখে শুরু করেন অবস্থান বিক্ষোভ। পিকেটিং চলে বেলা ১১ টা পর্যন্ত। ইতিমধ্যে ৭-৮ টা ওয়ার্ডে জোর করে ভয় ও হুমকি দিয়ে কাজ চালু করার চেষ্টা করে তৃণমূলের চেয়ারম্যান ও কাউন্সিলররা। তবু তাদের এই প্রচেষ্টাকে ব্যর্থ করে প্রায় দুই শতাধিক সাফাইকর্মী মিছিল করে সারা শহরজুড়ে। নিজ দাবি সম্বলিত প্ল্যাকার্ড গলায় ঝুলিয়ে সুসজ্জিত এই মিছিলে নেতৃত্ব প্রদান করেন প্রায় শ'খানেক মহিলা। প্রশ্ন করা হয় : মুখ্যমন্ত্রী ঘোষিত ৩৭৬ টাকা ন্যুনতম মজুরি চালু করতে চেয়ারম্যান সাহেব যদি ব্যর্থ হন তবে অবিলম্বে তাঁর শ্বেতপত্র প্রকাশ করে জনগণ তথা আপামর বিষ্ণুপুরবাসীর কাছে এই ‘ভাঁড়ার ফাঁকা’ হওয়ার হিসাব তুলে ধরা উচিৎ, অন্যথা পদত্যাগ করা উচিৎ। বিষ্ণুপুর পৌরসভা সংগ্রামী শ্রমিক কর্মচারী ইউনিয়নের সম্পাদক ও এআইসিসিটিইউ নেতা দিলবার খান বলেন, “আমাদের বেতন আর চেয়ারম্যানকে মেটাতে হবেক নাই, বরং বিষ্ণুপুরের পরিশ্রমী জনগণের ট্যাক্সের টাকার ফান্ড লুট হচ্ছে কি না তার হিসাব চাইছে বিষ্ণুপুরের মানুষ ও আমাদের সাফাইকর্মীরা”।

নিজেদের বলের জোরে পৌরসভাতে ধর্মঘটকে সফল করার ফলে এই দিন পঞ্চায়েত ভোট সংক্রান্ত একটি কর্মীসভা করতে বিষ্ণুপুরে সিপিএম-এর মহম্মদ সেলিম ও কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য অমিয় পাত্র এলে তাঁরা সাংবাদিকদের প্রশ্নের মুখে পড়েন এবং ধর্মঘটকে সফল করার জন্য সাফাইকর্মীদের দাবিকে সমর্থন করতে বাধ্য হন। বিষ্ণুপুরের সাফাইকর্মীদের এই সংগ্রাম মূলত মর্যাদা আদায়ের লড়াই। শুধু নিছক বেতনের দাবি নয়, সুস্থ ভাবে বেঁচে থাকার সাংবিধানিক অধিকারকে ছিনিয়ে নেওয়ার লড়াই। তায় ধর্মঘটের তেজ এতোটা চড়া ছিল যে মিছিল চলাকালীন আমরা বিষ্ণুপুর সাব-ডিভিশনাল কোর্টের কর্মচারীদের প্রশংসা পায় এবং তিনটি স্থানে ১৫ মিনিট করে অবরোধ করে বক্তব্য পেশ করা হয় ও রসিকগঞ্জ বাস স্ট্যান্ডে বাস থামিয়ে অবরোধও করা হয় বেলা ১২.৩০ টা নাগাদ।

সর্বশেষ এক মহিলা সাফাইকর্মীর বক্তব্য তুলে ধরতেই হয়, তিনি হলেন শিশু মাদ্রাজি। ইনি প্রায় ৪৫ বছরের কাছাকাছি কাজ করে হালে অবসর নিয়েছেন। দুই ছেলে সাফাই কাজ করতে করতে মারা গেছে, দুই বৌমা আছেন। তাঁদের একজন কাজ পেয়েছে মাত্র ৫-৬ হাজার টাকার। নাতনিদের টিউশনি খরচ ওঠাতে হিমশিম খাচ্ছে। উনি এখনো পেনশন পাচ্ছেন না, অথচ তিনি পার্মানেন্ট ছিলেন। তাঁর সোজা কথা, “জান আছে একটা, মরি একবার মরবো, তবু অধিকার দিবি নাই? কেনে দিবি নাই? অধিকার লিবো তবে মরবো। আন্দোলনে আছি আন্দোলনে থাকবো তবু অধিকার ছাড়বো নাই, তাতে মরতে হয় মরবো কোনো ভয় নাই।”

- ফারহান

teachers-societies-is-getting-stronger

একটি আন্দোলনের শক্তি বোঝা যায় তাতে সাধারণ মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণের মধ্যে দিয়ে। সরকারী কর্মচারী ও শিক্ষকদের যে অনশন অবস্থান চলছে কেন্দ্রীয় হারে ডিএ, দুর্নীতিমুক্ত নিয়োগ সহ কয়েকটি দাবি নিয়ে, সেখানে এই শক্তির জায়গাটি লক্ষ করা যাচ্ছে। গত ১০ মার্চ ২০২৩ যে ধর্মঘটের ডাক দেওয়া হয়েছিল, তাতে সংগঠন নিরপেক্ষভাবে যে স্বতঃস্ফূর্ততা নিয়ে সমস্ত স্তরের সরকারী কর্মচারী ও শিক্ষক শিক্ষিকারা সামিল হয়েছিলেন, তা এ’কারণেই গভীর তাৎপর্যবাহী।

ধর্মঘটের অনেক আগে থেকেই এর সমর্থনে বিভিন্ন সরকারী অফিসে, স্কুলে, এলাকায় এলাকায় হয়েছে মিছিল মিটিং, লিফলেট বিতরণ। দেওয়ালে দেওয়ালে আটকানো হয়েছে ধর্মঘটের সমর্থনে পোস্টার। প্রতিবারের মতো এবারও তৃণমূল শাসিত রাজ্য সরকার ধর্মঘট ভাঙার জন্য স্বৈরতান্ত্রিক নির্দেশিকা জারি করে। কিন্তু সেই নির্দেশিকার রক্তচক্ষুকে উপেক্ষা করেই হাজারে হাজারে সরকারী কর্মচারী ও শিক্ষক শিক্ষিকা ধর্মঘটে সামিল হন।

শহীদ মিনার চত্বর, যেখানে চলছে কেন্দ্রীয় হারে ডিএ ও স্বচ্ছ নিয়োগের দাবিতে লাগাতার অনশন অবস্থান — ১০ মার্চ কার্যত দেখল এক জনপ্লাবন। কলকাতা ও সংলগ্ন জেলাগুলি থেকেই শুধু নয়, দূরবর্তী নানা জেলা সহ গোটা রাজ্যের আন্দোলনকারীরাই সেদিন শহীদ মিনার চত্বরে হাজির হন। একদিকে যখন মূল মঞ্চে বিপুল ভিড়ের সামনে চলছে লাগাতার ভাষণ, তখন অন্যদিকে আবার এলাকা ভিত্তিক শিক্ষক শিক্ষিকারা নিজেদের মধ্যে ছোট ছোট জমায়েতে সেরে নিয়েছেন আন্দোলনের ভবিষ্যৎ রূপরেখা নিয়ে মত বিনিময়।

গোটা রাজ্যের সরকারী অফিস, স্কুল ও আদালত চত্বর সহ নানা জায়গায় সেদিন ধর্মঘটে যে অভূতপূর্ব সাড়া পড়ে, তা সরকারের কর্তাব্যক্তিদের যেমন বিব্রত করেছে তেমনি জনসমাজেও তুলেছে খানিক ঢেউ। সংবাদ মাধ্যমের পাতা তারপর থেকে নিয়মিতভাবে এই সংক্রান্ত সংবাদ পরিবেশনে বাধ্য হচ্ছে।

তবে সমস্ত আন্দোলনকারীরা এও বুঝতে পারছেন যে এই সরকার সহজে সরকারী কর্মচারী ও শিক্ষকদের দাবি মেনে নেবে না। নানাভাবে আন্দোলনকে দমন করার চেষ্টা করবে। বস্তুত সেই চেষ্টা ধর্মঘট ভাঙার নোটিশ জারি থেকে শুরু করে ধর্মঘটের পর শো কজ করা — নানাভাবে সরকার শুরুও করে দিয়েছে। বিষয়টা শুধু সরকারী নির্দেশিকা জারির মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই৷ ধর্মঘটের দিন থেকেই দলীয় নির্দেশে তৃণমূলের গুণ্ডাবাহিনী মাঠে নেমে পড়েছে। বাইক বাহিনী স্কুলে স্কুলে ঢুকছে। শিক্ষক শিক্ষিকা শিক্ষাকর্মীদের ধর্মঘটে সামিল হবার জন্য হেনস্থা করছে, বাদ থাকেনি শারীরিক নিগ্রহও। কয়েকটি স্কুলে তৃণমূলী গুণ্ডাবাহিনী তালাও ঝুলিয়ে দিয়েছে। আন্দোলনের পক্ষ থেকে চাপ বাড়ানোর পর প্রশাসনের হস্তক্ষেপে কয়েকটি জায়গায় সমাধান হলেও সার্বিকভাবে পুলিশ প্রশাসনের দলদাস চরিত্রটি এই পর্বে আরেকবার সামনে এসেছে৷ সব দেখেও তারা অন্ধ ধৃতরাষ্ট্র সেজে বসে আছে। সরকারী কর্মচারী ও শিক্ষক শিক্ষিকাদের গরিষ্ঠ অংশটি সাহসের সঙ্গেই এই দুর্বৃত্ত হামলার মোকাবিলা করছেন।

এই আন্দোলনের বিশেষ একটি দিক হল শিক্ষিকাদের সক্রিয় সাহসী ভূমিকা। তাঁরা নিয়মিত দলবেঁধে আন্দোলন মঞ্চে সামিল হয়েছেন। ধর্মঘটের প্রচারে ছিল তাঁদের সক্রিয় অংশগ্রহণ। বিপুল সংখ্যায় তাঁরা ১০ মার্চ ভরিয়ে দিয়েছিলেন শহীদ মিনার চত্বর। তাঁদের উৎসাহ উদ্দীপনা সাহস সমাজে সার্বিকভাবে যে মহিলা জাগরণ ঘটছে তারই এক বলিষ্ঠ প্রকাশ৷

একদিকে যখন তৃণমূলের গুণ্ডাবাহিনী ধর্মঘটীদের ওপর আক্রমণ চালাচ্ছে, রাজ্যের প্রশাসনিক প্রধানের নির্দেশে ধর্মঘটীদের শো কজ করা হচ্ছে, তখন ১২ মার্চ সকাল সাড়ে এগারোটায় আন্দোলনকারীদের সঙ্গে আলোচনায় বসেন রাজ্যের সাংবিধানিক রাজ্যপাল শ্রীযুক্ত বোস।

রাজ্যপাল স্বীকার করে নেন সরকারী কর্মচারী ও শিক্ষকদের দাবি ন্যায্য। তিনি নিজেও যে একসময় সরকারী কর্মচারী ছিলেন এবং এই বিষয় সম্পর্কে ওয়াকিবহাল তা জানিয়েছেন আলোচনায়। রাজ্যপাল জানান সরকারকে তিনি তাঁর পক্ষ থেকে যা বলার বলবেন। লেভেল বেস্ট শব্দবন্ধটি উল্লেখ করে তিনি বলেন সর্বতোভাবে তিনি চেষ্টা করবেন যাতে সরকারী কর্মচারী ও শিক্ষকেরা তাঁদের অধিকার পান। এরপর সংগ্রামী যৌথ মঞ্চ জানায় সরকারের বিবেচনার জন্য তারা অপেক্ষা করবে।

তবে সরকারের ইতিবাচক ঘোষণা না আসা পর্যন্ত অবস্থান যেমন চলছিল, চলবে। অনশন যেমন চলছিল, চলবে।

এই আন্দোলনে এখনো অবধি কেন্দ্রীয় হারে ডিএ’র ন্যায্য দাবিটি যতটা সামনে এসেছে দুর্নীতিমুক্ত স্বচ্ছ নিয়োগের দাবিটি ততটা সামনে আসেনি। আন্দোলনের সামাজিক ভিত্তিকে বাড়ানো ও শিক্ষা ও প্রশাসনের কাজকে সমৃদ্ধ ও মসৃণ করার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এই দাবিটিকে আরো বেশি বেশি করে সামনে আনতে হবে৷ অস্থায়ী কর্মীদের স্থায়ীকরণের দাবিটিও যেন অবহেলিত না থাকে সেটাও দেখা দরকার।

এই আন্দোলন রাজ্য সরকারকে যথেষ্ট ধাক্কা দিয়েছে। দুর্নীতি মামলায় যখন রাজ্য সরকারের ভাবমূর্তি ও সমর্থন প্রতিদিন দুর্বল হচ্ছে, তখন সরকারী কর্মচারী ও শিক্ষকদের সামনে সুযোগ ক্রমশ বাড়ছে তাঁদের দাবিগুলিকে জোরালো করে তোলার। সুযোগ রয়েছে নিজেদের দাবির লড়াই লড়তে লড়তেই সরকারী প্রতিষ্ঠান ও বিদ্যালয়গুলির হাল ফেরানোর বড় লড়াইয়ের প্রশ্নগুলোকে সামনে আনার। সমগ্র জনসমাজকে এই আন্দোলনের মধ্যে টেনে আনার। এই কাজ শুরু হয়েছে। দৃঢ়, ঐক্যবদ্ধ ও কৌশলী লড়াইয়ের লম্বা রাস্তা সামনে রয়েছে।

- সৌভিক ঘোষাল

ধর্মঘটী রাজ্য সরকারী কর্মচারী ও সরকার পোষিত বিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষাকর্মীদের ওপর শাসকদল আশ্রিত বাহুবলীদের হুমকি ও শারীরিকভাবে হামলার বিরুদ্ধে গণপ্রতিরোধ গড়ে তুলুন!

আন্দোলনরত যোগ্য শিক্ষক পদপ্রার্থীদের অবিলম্বে নিয়োগের দাবিতে সোচ্চার হোন

ন্যায্য মহার্ঘ ভাতা ও শূন্যপদে স্বচ্ছতার সঙ্গে কর্মী নিয়োগের দাবিতে সরকারী কর্মচারী ও সরকার পোষিত বিদ্যালয়গুলিতে কর্মরত শিক্ষক ও অশিক্ষক কর্মচারীদের আন্দোলনের সংগঠন সংগ্রামী যৌথ মঞ্চের আহ্বানে ১০ মার্চ রাজ্যজোড়া ধর্মঘট অভূতপূর্বভাবে সফল হয়েছে। মুখ্যমন্ত্রীর প্রশাসনিক রীতিনীতিকে জলাঞ্জলি দিয়ে ন্যায়সংগত দাবিকে সরাসরি নাকচ করতে অবান্তর কথামালা, সরকারী ফরমানে শাস্তিমূলক কঠোর ধারাগুলি ও শাসক দল আশ্রিত দুষ্কৃতিদের পূর্বাপর হুমকিকে সম্পূর্ণ উপেক্ষা করে হাজারে হাজারে সরকারী কর্মী- শিক্ষক - শিক্ষাকর্মীরা কোনোরকম বাধার কাছে নতিস্বীকার না করে শিরদাঁড়া সোজা রেখে ধর্মঘটে অংশগ্রহন করেছেন। পশ্চিমবঙ্গের গণআন্দোলনের ইতিহাসে এই আন্দোলন এক নতুন নজির তৈরি করেছে।

আমরা অত্যন্ত উদ্বেগের সঙ্গে লক্ষ্য করছি যে ধর্মঘটের পরের দিন উত্তর ও দক্ষিণবঙ্গের বিভিন্ন প্রান্তে ধর্মঘটে অংশগ্রহণকারী শিক্ষক-শিক্ষাকর্মীদের শাসকদলের মদতপুষ্ট স্থানীয়স্তরের বাহুবলীরা স্কুলে ঢুকতে বাধা দেওয়া, অশ্লীল গালিগালাজ করা, এমনকি শিক্ষক- শিক্ষিকাদের ওপর শারীরিক হামলা নামিয়ে এনেছে। অথচ প্রশাসনের এ ব্যাপারে কোনো হেলদোল নেই। আক্রান্তদের অনেকেই প্রাণঘাতী হামলার আশঙ্কা করছেন।

আমরা এই সামাজিক সন্ত্রাসে আক্রান্তদের সম্পূর্ণ নিরাপত্তা ও দুষ্কৃতিদের বিরুদ্ধে কঠোর পুলিশী ব্যবস্থা গ্রহনের দাবি জানাই।

দাবি পূরণে সদর্থক ভূমিকা পালনের প্রতিশ্রুতি দিয়ে অনশনরত আন্দোলনকারীদের প্রতিনিধিদের সঙ্গে আলোচনা করার উদ্যোগ নিয়েছেন মাননীয় রাজ্যপাল – আমরা এই সময়োচিত হস্তক্ষেপের জন্য তাঁকে স্বাগত জানাই।

অন্য দিকে, বিগত দু'বছরের বেশি সময় ধরে রাজ্যের শিক্ষাক্ষেত্রে ব্যাপক দুর্নীতির অবসান ও যোগ্যদের নিয়োগপত্রের দাবিতে মাটি আঁকড়ে লড়াই চালিয়ে যাওয়া শিক্ষক পদপ্রার্থীদের নাছোড় আন্দোলন সম্পর্কে রাজ্য সরকারের উপেক্ষার কৌশলকে আমরা ধিক্কার জানাই।

আদালতের উপর্যুপরি রায়দানের মাধ্যমে ভূয়ো শিক্ষক-শিক্ষাকর্মীদের চাকরি কেড়ে নেওয়া চললেও, কোনো এক অদৃশ্য কারণে যোগ্যদের নিয়োগের ক্ষেত্রে আদালতের সক্রিয়তার অভাব পরিলক্ষিত হচ্ছে।

মাননীয় রাজ্যপালের কাছে আমাদের দাবি যোগ্যদের দ্রুত নিয়োগের লক্ষ্যে              
আপনি রাজ্য প্রশাসন, শিক্ষাদপ্তর ও আন্দোলনকারীদের নিয়ে জরুরি ভিত্তিতে ত্রিপাক্ষিক বৈঠক আহ্বান করে ন্যায়সঙ্গত দাবির পক্ষে দাঁড়ান।

সিপিআই(এমএল) লিবারেশন              
পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য কমিটি              
১২ মার্চ ২০২৩

women's-day

হুগলি

শুরুতে, ৮ মার্চ বিশ্বজুড়ে পালিত হত আন্তর্জাতিক শ্রমজীবী নারী দিবস হিসেবে। ক্রমশ নারী আন্দোলনের পরিসর ব্যাপকতর হয়েছে। তাই শুধুমাত্র শ্রমজীবী নারীদের মধ্যে একে গণ্ডিবদ্ধ না রেখে এই দিনটিকে বৃহত্তর অর্থে আন্তর্জাতিক নারী দিবস বলা হয়। তবে এর মেরুদন্ড কিন্তু আজও শ্রমজীবী মেয়েরাই। হুগলি জেলায় আমরা সেটাই দেখলাম।

৮ মার্চ ২০২৩ হোলি থাকার জন্য ১২ মার্চ আন্তর্জাতিক নারী দিবস উপলক্ষ্যে ‘নারী বিদ্বেষী ফ্যাসিস্ট বিজেপির বিরুদ্ধে নারী আন্দোলন’ এই মর্মে আলোচনাসভা অনুষ্ঠিত হয় হুগলির ব্যান্ডেলের দূর্গা লজে। এখানে উপস্থিত অধিকাংশই ছিলেন স্কিম ওয়ার্কার ও কৃষি শ্রমিক। তাঁদের জীবনের আর্থিক দাবি দাওয়া জরুরি হলেও বৃহত্তর নারী আন্দোলন সম্পর্কে সচেতন করার উদ্দেশ্যেই ছিল এই সভা। এবং তাঁরাও বেশ উৎসাহ উদ্দীপনার সঙ্গে এতে অংশ নিয়েছিলেন।

শুরুতে শ্রমজীবী নারী আন্দোলনের ইতিহাস নিয়ে চর্চা করেন জেলা সম্পাদিকা শিপ্রা চ্যাটার্জী এবং ফ্যাসিস্ট বিজেপি নারীদের ওপর নামিয়ে আনা নানা রূপে হামলার ব্যাখ্যা করেন এবং তার বিরুদ্ধে আমাদের সংগ্রামকে জোরদার করার কথা বলেন জেলা সহ‌সভানেত্রী সুদীপ্তা বসু। আসন্ন পঞ্চায়েত ও ২০২৪ সালে লোকসভা নির্বাচনে মেয়েদের বঞ্চনার বিরুদ্ধে এবং অধিকারের দাবিগুলি তুলে ধরার আহ্বান রাখেন জেলা সভানেত্রী শোভা ব্যানার্জি। রিতা ব্যানার্জি বলেন, গার্হস্থ্য হিংসা ও পরিবারে মেয়েদের দাবিয়ে রাখার বিরুদ্ধে লড়াই নিজের ঘর থেকেই শুরু করতে হবে। অন্যান্য কর্মীরাও আলোচনায় উৎসাহের সঙ্গে অংশ নেন এবং নিজের নিজের কর্মক্ষেত্রের অভিজ্ঞতার কথা বলেন।

পার্টির ও জেলা এআইসিসিটিইউ’র নেতা ভিয়েত ব্যানার্জি বলেন, আন্তর্জাতিক শ্রমজীবী নারী দিবসের ইতিহাস কেউ স্বীকার করতে চায় না, পুঁজিপতি, ব্যাবসায়ীরা আন্তর্জাতিক নারী দিবসকে মেয়েদের শাড়ি গয়নার ছাড় দিয়ে বিজ্ঞাপিত করে মেয়েদের ছোট করে দেখাতে চায়। অথচ শাহিনবাগ, দিল্লীর কৃষক আন্দোলনের মতো বিভিন্ন বড় বড় আন্দোলনে মেয়েদের অসামান্য ভূমিকা উল্লেখযোগ্য। তিনি আরো বলেন, শ্রমজীবী নারীদের বিভিন্ন দাবি নিয়ে এআইসিসিটিইউ’র সাথে ঐক্যবদ্ধভাবে আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে। চৈতালি সেন বলেন, শ্রমজীবী নারীদের দাবিদাওয়া নিয়ে খন্ড খন্ড আন্দোলনের মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে সমস্ত শ্রমজীবী নারীকে একসাথে বৃহত্তর আন্দোলনে শামিল হতে হবে এবং নারী আন্দোলন ও শ্রমজীবী আন্দোলনকে সমন্বয় করে এগোতে হবে।

শেষ পর্যায়ে অঞ্জনা ভৌমিক, চন্দ্রানী ব্যানার্জি, শুক্লা ব্যানার্জি এবং ভিয়েত ব্যানার্জির মনোগ্রাহী কবিতা পাঠ এবং রিতা ব্যানার্জির সংগীত পরিবেশনায় প্রাণবন্ত হয়ে ওঠে সভা। শেষে প্রত্যেকে বৃহত্তর আন্দোলন গড়ে তোলার শপথ নেন এবং আন্তর্জাতিক সংগীত পরিবেশনা ও স্লোগানের মধ্যে দিয়ে বৈচিত্রময় সভার সমাপ্তি ঘটে।

কলকাতা

গত ১১ মার্চ, ফ্যাসিবাদী সময়ের প্রেক্ষাপটে শ্রমজীবী নারী দিবস উপলক্ষ্যে, ত্রিপুরা হিতসাধিনি সভাগৃহে আইসা'র উদ্যোগে আলোচনা সভার আয়োজন করা হয় এবং 'দ্য ওয়ার্ল্ড বিফোর হার' নামক একটি তথ্যচিত্র দেখানো হয়। আলোচক হিসেবে উপস্থিত ছিলেন এস.এস. জালান গার্লস কলেজের অধ্যাপক কমরেড মধুরিমা বক্সী।

উত্তর ২৪ পরগণা

৮ই মার্চ ২০২৩ উত্তর ২৪ পরগণা জেলায় বিভিন্ন অঞ্চলে আন্তর্জাতিক নারী দিবস পালিত হয়।

নৈহাটিতে বক্তব্যে, গানে, কবিতায় নারী দিবসকে স্মরণ করা হয়। আবৃত্তি পরিবেশন করে তনুরিমা ভট্টাচার্য ও প্রিয়াশা চক্রবর্তী। গান পরিবেশন করে মেহুলি চক্রবর্তী। বক্তব্য রাখেন আইপোয়ার জেলা সভানেত্রী অর্চনা ঘটক, তপতী চক্রবর্তী, প্রণতি নাথ প্রমুখ। উপস্থিত ছিলেন মন্দিরা মুখার্জি, সুমেলি চক্রবর্তী সহ গরিফা অঞ্চলের মহিলারা, যাদের বড় অংশ‌ই একদম নতুন মুখ। সমগ্র অনুষ্ঠানটি পরিচালনা করেন আইপোয়ার রাজ্য নেত্রী মিঠু চক্রবর্তী।

অশোকনগরে গান এবং ঘরোয়া আলাপ আলোচনার মাধ্যমে অঞ্চলের মেয়েদের নিয়ে নারী দিবস পালন করা হয়। জেলা নেত্রী রীনা মজুমদার ও মেঘনা সমগ্র অনুষ্ঠানটা পরিচালনা করেন।

বারাসাতে দে গঙ্গায় রাজ্য নেত্রী জয়শ্রী দাসের উদ্যোগে মিড-ডে-মিলের কর্মীদের নিয়ে ৮ মার্চ আন্তর্জাতিক নারী দিবস পালন হয়। উপস্থিত ছিলেন রন্ধনকর্মী আন্দোলনের ব্লক নেত্রী নিলুফার বেগম।

আন্তর্জাতিক নারী দিবস শ্রমজীবী মহিলাদের লড়াইয়ের এক মহান ঐতিহ্যকে বহন করে। যে লড়াই করে মেয়েরা ছিনিয়ে এনেছিলেন ৮ ঘন্টা কাজের অধিকার, ভোটের অধিকার। আজ ভারতবর্ষে বিজেপির শাসনে ভীষণভাবে আক্রান্ত শ্রমজীবী মহিলাদের অধিকার। তাই এই মুহূর্তে স্বাধীকার ও সমতার লড়াইয়ে জোটবদ্ধ হওয়া প্রয়োজন।

এই অঙ্গীকার নিয়েই অত্যন্ত প্রাণবন্ত পরিবেশে আন্তর্জাতিক নারী দিবস কর্মসূচি পালন হয়। যা আগামী দিনে মহিলা সংগঠনকে শক্তিশালী করার আশা জাগায়।

স্মরণ সভা সবাইকে আমন্ত্রণ। আজীবন বামপন্থী, বর্ষীয়ান সাংবাদিক, লেখক, সমালোচক, সবার আপনজন প্রয়াত শ্রদ্ধেয় শঙ্কর রায় এর স্মরণ সভা। ২৩ মার্চ২০২৩, বিএম পিইইউ হল ( জর্জ ভবন, শিয়ালদা ডেন্টাল কলেজের পাশের গলি), সময় বিকেল সাড়ে ৫টা। শ্রদ্ধা জানাবেন – দীপঙ্কর ভট্টাচার্য, শোভনলাল দত্ত গুপ্ত, অনাথবন্ধু দে, নব দত্ত প্রমুখ। আয়োজক – এআইসিসিটিইউ ,দিগন্ত বলয় পত্রিকা উই, দ্য পিপল অফ ইন্ডিয়া

culinary-workers-in-nadia

ওরা এসেছেন জেলার বিভিন্ন প্রান্ত থেকে। সাথে নিয়ে একরাশ বঞ্চনা বোধ। পরম মাতৃস্নেহে যারা বিদ্যালয়ে শিশুদের মুখে খাবার তুলে দেন, অথচ নিজের ঘরের শিশুদের খাদ্য যোগাড় করতে পারেন না। এমনই এক অসহনীয় অবস্থার মধ্যে দাঁড়িয়ে নদীয়া জেলা রন্ধন কর্মী মিড ডে মিল ইউনিয়নের সম্মেলন অনুষ্ঠিত হলো গত ১২ মার্চ ধুবুলিয়ার দেশবন্ধু স্কুলে। উপস্থিত ছিলেন প্রায় সাড়ে তিন শতাধিক মহিলা। সম্মেলনে কোহিনুর মল্লিক, সাধনা ঘোষ, ভারতী দাস, সাহেরা বিবি সহ ১৩ জন প্রতিনিধিদের বক্তব্যে উঠে এলো চরম বিপন্নতা। ওদের প্রশ্ন আমাদের মজুরি আর বাড়বে কবে? সরকার তো রন্ধনকর্মীদের দিকে ফিরেও তাকাচ্ছে না। বছরের পর বছর চলে যায়, আমাদের এক পয়সাও বেতন বাড়ে না। মাত্র ৫০০ টাকার লক্ষ্মীর ভান্ডার দিয়ে সরকার আমাদের খেয়ে পড়ে বেঁচে থাকার স্বপ্নটাকে চুরমার করে দিতে চাইছে। কিন্তু আমরা চাই কর্মচারী স্বীকৃতি। সরকার সেই অধিকারটাকে কেড়ে নিয়েছে। তাই আমাদেরও পাল্টা জবাব দিতে হবে, একসাথে জোট বেঁধে এগিয়ে যেতে হবে আন্দোলনের পথে। এভাবেই সংগ্রামী চেতনায় টানটান ছিল রন্ধনকর্মীদের অনুভব। তাঁরা বলেন, লোকের বাড়ি পরিচারিকার কাজ করলেও তো তিন হাজার টাকা বেতন দেয়। আমরা সেটুকুও পাই না। ইস্কুলে বাচ্চাদের খাওয়াতে হয়, তাঁদের হাত মুখ ধুইয়ে পরিস্কার পরিচ্ছন্ন করে দিতে হয়। শিশুরা লেখাপড়া শিখে বড় হবে এ জন্যই তো আমরা এতো পরিশ্রম করি। কিন্তু আমরা পাই দৈনিক মাত্র ৫০ টাকা! গোষ্ঠীর মাধ্যমে রান্না করে আরও কম! সরকার নির্ধারিত ন্যুনতম মজুরিটুকুও আমরা পাই না। আমাদের বছরে দশ মাসের বেতন দেওয়া হয়। শিক্ষক-শিক্ষাকর্মীরা যদি ১২ মাসের মাইনে পায় তাহলে আমরা তেমনটা পাবো না কেন?

ইউনিয়নের প্রসঙ্গে তারা বলেন, যখন আমরা দেখি ইউনিয়নের মধ্য দিয়ে অনেক বোনেরা এগিয়ে চলেছে তখন আমাদের একসাথে চলার মনোভাব বেড়ে যায়। দাবি আদায় করতে গেলে সরকারের কানে জল ঢোকাতে হবে। সম্মেলন থেকে নির্বাচিত সম্পাদিকা চায়না সেখ বলেন, আমাদের পায়ের তলার মাটিকে শক্ত করতে হবে, এ জন্যই ইউনিয়নকে ধরে রাখতে হবে। এক দিন না এক দিন ন্যায্য দাবি আদায় হবেই হবে।

শুরুতে এআইসিসিটিইউ রাজ্য সম্পাদক বাসুদেব বসু বলেন, দেশে প্রকল্প কর্মীরা শ্রমিক শ্রেণীর একটা বড় অংশ। এদের অধিকারের লড়াই সারা দেশ জুড়ে এগিয়ে চলেছে, সামনের সারিতে রয়েছে। প্রতিবেদন পেশ করে সংগঠনের সভাপতি কৃষ্ণ গোপাল দাস বলেন লকডাউনের সময় বেতন আদায় করা, কেন্দ্রীয় সরকারের কারসাজিতে মিড-ডে মিল প্রকল্পকে এনজিওদের হাতে তুলে দেওয়ার চক্রান্তকে আমরা আন্দোলনের চাপে বন্ধ করতে পেরেছি। এ রাজ্যের সরকার চরম মিথ্যাচার করে চলেছে। পশ্চিমবঙ্গ সংগ্রামী রন্ধনকর্মী ইউনিয়নের রাজ্য সম্পাদিকা জয়শ্রী দাস বলেন, ইউনিয়ন আমাদের মান সম্মান দিয়েছে। এখন কাউকে কাজ থেকে বসিয়ে দেওয়া যাবে না। আমাদের লড়াইয়ের ফলে সরকার এই নির্দেশিকা জারি করেছে। জীবনের সর্বক্ষেত্রেই আমরা আশা নিয়ে বেঁচে থাকি। না পারলে আবারও চেষ্টা করি। তাই নিরাশার কোনও জায়গা নেই। হরিনঘাটা এলাকায় কাজের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে এই সংগঠনের নেতা অমিতাভ রায় বলেন, মাসের বেতন মাসে দেওয়া চালু এবং কর্মীদের রান্নার কাজ ছাড়া স্কুলের অন্যান্য কাজে লাগানোকে আমরা ইউনিয়নের পক্ষ থেকে বন্ধ করতে পেরেছি। তাই ইউনিয়নকে শক্তিশালী করতেই হবে। অ্যাপোয়ার নেত্রী বেলা নন্দী বলেন মেয়েরা তাঁদের সমস্ত কর্মক্ষেত্রেই বঞ্চিত। শ্রমজীবী মহিলাদের এক হয়ে লড়তে হবে। সম্মেলন থেকে ১৫ জনের কার্যকরী কমিটি নির্বাচিত হয়। বিগত সভাপতি ও সম্পাদিকা অপরিবর্তিত থাকেন। সহ সভাপতি হন বিজয় সাহা। সম্মেলনে সঞ্চালনা করেন অমল তরফদার। সম্মেলনের শেষে রন্ধনকর্মীরা এবং অ্যাপোয়ার কর্মী ও নেতৃবৃন্দ এক মিছিল সহকারে পার্শ্ববর্তী নেতাজি পার্কে সমবেত হন। আন্তর্জাতিক নারী দিবস উপলক্ষে শ্রমজীবী মহিলাদের আন্দোলনকে ঐক্যবদ্ধভাবে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার বার্তা তুলে ধরেন। অংশগ্রহণ করেন এ্যাপোয়ার রাজ্য নেত্রী ইন্দ্রানী দত্ত, জেলা সম্পাদিকা অপু কবিরাজ প্রমুখ।

pratibidhan-magazine

আড়াই বছর বিরতির পর নতুনভাবে প্রকাশিত হল নারী আন্দোলনের মুখপত্র প্রতিবিধান পত্রিকা। ১৫ মার্চ কলকাতার বিএমপিইএইউ সভাঘরে আয়োজন করা হয়েছিল “নারী আন্দোলনে পত্রিকার ভূমিকা” শীর্ষক আলোচনাসভা। পত্রিকার অন‍্যতম সম্পাদক চন্দ্রাস্মিতা চৌধুরি সকলকে স্বাগত জানিয়ে পত্রিকা প্রকাশে দীর্ঘ ছেদ ও বর্তমান পরিস্থিতিতে পুনরায় প্রকাশনা সংগঠিত করার প্রেক্ষাপট সংক্ষেপে জানিয়ে আলোচনাসভা পরিচালনার জন‍্য সম্প্রীতি মুখার্জী ও মধুরিমা বক্সীকে ডেকে নেন।

শুরুতে বাবুনি মজুমদারের গাওয়া সলিল চৌধুরির “অধিকার কে কাকে দেয়? পৃথিবীর ইতিহাসে কবে কোন অধিকার বিনা সংগ্রামে শুধু চেয়ে পাওয়া যায়? অধিকার কেড়ে নিতে হয়, লড়ে নিতে হয়। মুক্তির অধিকার, মানুষের মতো করে বাঁচবার অধিকার। শিক্ষার অধিকার। হক কথা সোচ্চারে বলবার অধিকার। শান্তির অধিকার। শিশু শিশু কুঁড়িদের ফুটবার অধিকার”। গানটি আলোচনাসভার সুর বেঁধে দেয়।

সম্প্রীতি মুখার্জী বর্তমান সময়ে তীব্র ফ‍্যাসিস্ট হামলার পরিস্থিতি ও লিঙ্গযৌন রাজনীতির প্রেক্ষিতে পত্রিকার উপদেষ্টামণ্ডলীর উপস্থিত সদস‍্যদের পরিচিতি জানান এবং তাঁদের হাতে সদ‍্য প্রকাশিত পত্রিকা তুলে দেওয়ার মাধ্যমে আনুষ্ঠানিক উন্মোচন সম্পন্ন হয়। মধুরিমা বক্সী একে একে বক্তাদের ডেকে নেন।

১৯৮০ দশক থেকে দীর্ঘ পথ চলা প্রতিবিধান পত্রিকার প্রাক্তন সম্পাদক চৈতালি সেন পুরনো অভিজ্ঞতা তুলে ধরেন এবং নতুন তারুণ‍্যপূর্ণ সম্পাদনা ও উপদেষ্টা মণ্ডলির প্রতি বিশেষ প্রত‍্যাশা ব‍্যক্ত করেন। নতুন উপাদান, নতুন চিন্তাচেতনা নতুন সময়ের আন্দোলনের অভিব‍্যক্তি হয়ে উঠবে। স্মৃতিচারণা করে তিনি বলেন, তৎকালীন সিপিআই(এমএল) জেনেরাল সেক্রেটারি বিনোদ মিশ্র এই পত্রিকার নামকরণ করেছিলেন এবং মৈত্রেয়ী চট্টোপাধ্যায়, মহাশ্বেতা দেবী, সুকুমারী ভট্টাচার্য, মধুছন্দা কার্লেকার, নবনীতা দেবসেনদের মতো ব‍্যক্তিত্বরা পত্রিকার উপদেষ্টামণ্ডলী হিসেবে বরাবর ছিলেন, এবং তাঁরা নিছক দূর থেকে পরামর্শ দেওয়া নয়, বহুরকমভাবে পত্রিকা ও আন্দোলনের সাথে ওতপ্রোতভাবে যুক্ত ছিলেন। নতুন সম্পাদনা ও উপদেষ্টা মণ্ডলীও আন্দোলন ও চিন্তন জগতে সক্রিয় ভূমিকায় থাকা তরুণ প্রজন্ম, তাঁদের নেতৃত্বে আমরা কাজ করব।

উপদেষ্টামণ্ডলীর অন‍্যতম জিনত রেহানা ইসলাম। ইতিহাস শিক্ষিকা। মুর্শিদাবাদ জেলায় তিনি গড়ে তুলেছেন পরিত্যক্ত প্রতারিত সাধারণ মহিলাদের এক দৃষ্টান্ত স্থাপনকারী আন্দোলন। জিনাত মুর্শিদাবাদ থেকে এসেছেন এই আলোচনাসভায় যোগ দিতে। তিনি বলেন, পত্রিকার যে ইতিহাস আমরা শুনলাম এই লড়াই একটা চলমান প্রক্রিয়া। সাময়িক ছেদ আসে। কিন্তু আমরা আবার ঝাঁপিয়ে পড়ি। জিনাত তাঁর গ্রামজীবনের আন্দোলন সংগঠনের কাজে কাছ থেকে দেখা অভিজ্ঞতা তুলে ধরেন। কিভাবে চরম প্রান্তিক অবস্থানে থাকা মহিলা রুখে দাঁড়ান, “স্বামীর কাছে আর মেয়ের দুধের পয়সা চাইব না, নিজে কাজ করে চলব”, কীভাবে একজন নিরক্ষর দিনমজুর মহিলা আর পিএইচডি ছাত্রীর লড়াই মিলে যেতে পারে তা থিওরির বাইরে বাস্তব পরিসরে ভাবার কথা বলেন জিনাত। তিনি বলেন, আইনে থাক বা না থাক সাধারণত মুসলিম পুরুষ মনে করে যে বহুবিবাহ তার অধিকার। আদালতে লইয়াররা অভিযোগকারী মেয়েদেরকেই উল্টে দোষারোপ করে, মেয়েদের অসহায়ত্বকেই দোষ বা অপরাধ হিসেবে দেগে দেয়। অফিসে আদালতে যে পরিভাষা ব‍্যবহৃত হয় তা মেয়েদের দমিয়ে দেয়। তবু মেয়েরা রুখে দাঁড়ায়। আবার দেখা যায় অধিকাংশ ক্ষেত্রে বিয়ের পর মেয়েদের আন্দোলন বন্ধ হয়ে যায়। এই সীমাবদ্ধতা অতিক্রমের কাজ ঘর থেকেই শুরু করতে হবে। ঘরে ২৪ ঘন্টা থাকা মেয়েদের লড়াই পর্যন্ত পৌঁছতে হবে নারী আন্দোলনকে। জিনাত সমাজে বিদ‍্যমান পাওয়ার স্ট্রাকচার বা ক্ষমতাতন্ত্রের উল্লেখ করে বলেন যে ঊর্ধতন ক্ষমতার অবস্থানে থাকা মহিলা অধস্তন বা সাধারণ মহিলাদের ওপর বিভিন্ন চোটপাট করে। কিন্তু এগুলো নারীর বিরুদ্ধে নারীর বিষয় নয়, এটা আসলে বিদ‍্যমান ক্ষমতাতন্ত্রের প্রকাশ। ফলত “মেয়েরাই তো মেয়েদের শত্রু” – এক কৌশলি প্রচার। শাহিনবাগ আন্দোলন দেখিয়েছে, মেয়েরা কিচেন থেকে বেরিয়ে এসে পার্লামেন্টকে চ‍্যালেঞ্জ করছে। প্রান্তিক ও সুবিধাপ্রাপ্ত অগ্রণী – এই দুইয়ের মধ‍্যে ব্রিজ তৈরি করতে হবে। অনেক পথ পেরিয়ে, অনেকটা এগিয়ে প্রতিবিধান পত্রিকা এই সেঁতু নির্মাণে বিশেষ ভূমিকা রাখুক।

মহাশ্বেতা সমাজদার ‘পেশাপ্রবেশ’ ও ‘ভ্রমণ’ পত্রিকা সম্পাদনার অন‍্যতম প্রধান, প্রতিবিধান পত্রিকার উপদেষ্টামণ্ডলীর আরেকজন সদস‍্য, এনআরসি-সিএএ বিরোধী আলোড়নের সময় থেকে গণ আন্দোলনে সক্রিয়। তিনি বলেন ‘উচ্চবর্ণ’ মধ‍্যবিত্ত মানুষের মধ‍্যে এই বোধ খুব দুর্বল যে মেয়েরা সমাজে দমন ও অধীনতার মধ‍্যে আছে। ফেমিনিজম অর্থাৎ নারীবাদকে ‘টক্সিক ম‍্যাসকুলিনিটি’ অর্থাৎ পৌরুষের উগ্র আস্ফালনের মতোই মহিলাদের এক পাল্টা আস্ফালনের রূপ বলে মনে করে। আসলে নারীবাদ তো সমতা, সহযোগ ও সংহতির লড়াই। সমাজের এই সুবিধাপ্রাপ্ত অগ্রণী অংশের নারীদের মধ‍্যে বঞ্চনা ও পরাধীনতা সম্পর্কে সচেতনতা সবল হলে প্রান্তিকের লড়াইয়ের সাথে তাঁরা সংযুক্ত হতে পারে। মহাশ্বেতা পত্রিকা বিষয়ক কিছু পরামর্শ দিয়ে বলেন, খুব ছোট ছোট তথ‍্যমূলক কথা দিয়ে পাতার ছোট ছোট ফাঁকা জায়গাগুলো সাজিয়ে দিতে হবে। উদাহরণ দিতে গিয়ে তিনি বলেন, জানেন কী, অধিকাংশ ক‍্যান্সার চিহ্নিত শিশুই ছেলে, কারণ আসলে কন‍্যাশিশুদের হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার হার পুত্রশিশুদের চেয়ে অনেক কম। অথবা, বিভিন্ন সরকারি ফর্ম ফিলাপে সেক্স লেখার সময় আগে ‘এম’ তারপর ‘এফ’ থাকে কেন? অ‍্যালফ‍্যাবেটিকালি তো আগে ‘এফ’ থাকার কথা। এটা কি পুরুষের অগ্রাধিকার ঘোষণা! এরকম ছোট ছোট প্রশ্ন ও তথ‍্য ছুঁড়ে দেওয়ার পরামর্শ দেন মহাশ্বেতা।

দেবলীনা একজন চলচ্চিত্র নির্মাতা। সম্প্রতি সমপ্রেম বিষয়ে তাঁর একটি স্বল্প দৈর্ঘ‍্যের চলচ্চিত্র ফ‍্যাসিস্ট হামলার শিকার হয় উড়িষ‍্যায় চলা এক প্রদর্শনীতে। দেবলীনা প্রতিবিধান পত্রিকার উপদেষ্টামণ্ডলীর সদস‍্য। তিনি বলেন, সমগ্র পৃথিবী এখন খারাপ সময়ের মধ‍্যে দিয়ে যাচ্ছে। পরক্ষণেই তিনি প্রশ্ন তোলেন, কখনও কী ভালো সময় ছিল? দেবলীনার প্রশ্নকে জোরালো করে সভাঘর থেকে স্বতস্ফূর্ত ভেসে আসে, “বিশেষত মেয়েদের জন‍্য?” দেবলীনা বলেন, লড়াইটাও তাই বরাবর আছে, থাকবে। ইরাণের ঘটনা সারা পৃথিবীতে আলোড়ন ফেলল। কত মেয়ে চুল কেটে ফেলল, মরল, কিন্তু ছাড়ল না। ফ‍্যাসিস্টরা যতই বাড়ুক, আমরাও কম যাই না। দেবলীনা বলেন যে তাঁর বানানো ছবির একটা স্ক্রিনিং বন্ধ করে দিলেও উল্টে বহু বহু জায়গায় আরও ব‍্যাপকভাবে তা ছড়িয়ে পড়ল, “আমাদের দাবায়ে রাখতে পারবা না”।

শতাব্দী দাশ শিক্ষিকা, উপদেষ্টামণ্ডলীর অন‍্যতম। সাম্প্রতিক সময়ে নারীবাদী অবস্থানে তাঁর লেখালেখি বিশিষ্ট পরিচয়ে সামনে এসেছে। তিনি সরাসরি বলেন, ব‍্যক্তি জীবনে বিভিন্ন ধরনের পিতৃতন্ত্র দেখার ‘সৌভাগ‍্য’ তাঁর হয়েছে। শৈশবে গোঁড়া ব্রাহ্মণ‍্য পরিবারের পিতৃতন্ত্র বা পরবর্তীতে বামপন্থী ঘরানার পিতৃতন্ত্র। বিভিন্ন শ্রেণী ও কাস্টের নারী আন্দোলনকে একত্রিত করার প্রয়োজনীয়তার কথা বলেন শতাব্দী। বলেন, ইনক্লুসিভ হতে হবে। বিভন্ন স্তরের অভিজ্ঞতা ধারণ করতে হবে পত্রিকাকে। আমাদের পরিসরে পুরুষরাও আছেন। শুধু মেয়েদের মধ‍্যেই নয়, পুরুষদের মধ‍্যে সচেতনতা তৈরি বিশেষ দরকার। আর সেটা কেবল সংগঠনের পরিধির মধ‍্যেই না, বিস্তৃত পরিসরে। এখন ফ‍্যাসিস্ট প্রচার ও প্রসার তীব্র চলছে। মুসলিম ও দলিত মেয়েরা ধর্ষিতা হলে অপরাধিরা কোনও না কোনোভাবে ছাড়া পেয়ে যায়। রাষ্ট্রীয় মদতে দেহ জ্বালিয়ে প্রমাণ লোপাট করে দেওয়া হয়। খারাপ সময় সর্বদাই ছিল, কিন্তু এমন প্রকাশ‍্য প্রাতিষ্ঠানিক রূপে বোধহয় কখনই প্রত‍্যক্ষ করি নি আমরা। লিখে যাওয়া ও বলে যাওয়াটাও আন্দোলনের অঙ্গ। এই লড়াই চালিয়ে যেতে হবে।

সারা ভারত প্রগতিশীল মহিলা সমিতির রাজ‍্য সম্পাদক ইন্দ্রানী দত্ত বলেন, ছোট বেলায় সমাজ জীবনেই প্রতিবাদী বলে হয়তো আমরা চিহ্নিত ছিলাম, সেখান থেকেই রাজনৈতিক প্রতিবাদে এসেছি আমরা। প্রতিবিধান পত্রিকার আদি সম্পাদক প্রয়াত গীতা দাসের উদাহরণ টেনে ইন্দ্রানী বলেন, বস্তিজীবনের প্রান্তিক নারীদের নিয়ে লড়াই ও লেখালেখি – দুদিককে মিলিয়েছিলেন। সাবিত্রীবাই ফুলেরা ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন একই লড়াইয়ে। মেয়েরা লড়বে ও পড়বে। প্রতিবিধান পত্রিকাটি যেন বিশেষ কোনও সংগঠনের না হয়ে নারী আন্দোলনের মুখপত্র হয়ে বরাবরের মতো চলতে পারে সেই আকাঙ্খা ব‍্যক্ত করেন ইন্দ্রানী, সদর্থক দৃষ্টিভঙ্গী নিয়ে এগিয়ে যাওয়ার কথা বলেন।

পূর্বতন সম্পাদকমণ্ডলীর অন‍্যতম সদস‍্য মলীনা বক্সী নতুনদের অভিনন্দন জানিয়ে বলেন যে শুরুতে মহিলাদের বিষয়ে জানাবোঝার পত্রিকা হিসেবেই প্রতিবিধান প্রকাশিত হত। ১৯৭৯ সালে মহারাষ্ট্রে পুলিশ লকাপে আদিবাসী মেয়েকে ধর্ষণের “মথুরা রেপ কেস” তথা ধর্ষিতাকেই দোষারোপ করে সুপ্রিম কোর্টের রায় আলোড়ন ফেলেছিল। পরবর্তীতে কলকাতায় গৃহবধু দেবযানী বণিকের হত‍্যা গার্হস্থ‍্য হিংসার দিকটি বড়ো ভাবে সামনে আনে। নারী আন্দোলনের বিভিন্ন দিক দ্রুত বিকশিত ও প্রসারিত হওয়ার পরিস্থিতিতে প্রতিবাধান নারী আন্দোলনের মুখপত্র হিসেবে সামনে আসে। মলিনা স্মরণ করিয়ে দেন যে স্নিগ্ধা বসুর নামে পত্রিকা রেজিস্ট্রেশন আছে। তিনি বলেন, চার দশকের দীর্ঘ পথ চলায় কখনও কখনও সাময়িক ছেদ এসেছে, কিন্তু নতুনরা এগিয়ে এসে নতুন আশা ও ভরসা জাগিয়ে নতুন উদ‍্যমে আবার এগিয়ে গেছে।

আমন্ত্রিত বক্তাদের বক্তব‍্যের পর্ব শেষ করে সভাঘরে উপস্থিত সকলের কাছে মতামত আহ্বান করা হয়। প্রবীণ সাথী মৈত্রী বলেন, অনেক খেটে খাওয়া মেয়েরা সংকোচ বশত নিজেদের কথা বলে উঠতে পারেন না। তাঁদের কথা তুলে ধরার জন‍্য কিছু জায়গা পত্রিকাতে রাখা দরকার, যাতে সকলে বুঝতে পারে ‘দিদিদের নয়, এটা আমাদের জিনিস’। আইপোয়ার রাজ‍্য নেত্রী অর্চনা ঘটক বলেন, একসময় ট্রেনে প্রতিবিধান হকিং করা হত। এর মাধ‍্যমে যোগসূত্র তৈরি হয়। সবরকমভাবে পত্রিকা পৌঁছে দেওয়ার চেষ্টা সকলকে করতে হবে। পত্রিকাকে সংগঠকের ভূমিকা নিতে হবে।

আলোচনাসভার পরিসমাপ্তি করেন অন‍্যতম প্রধান সম্পাদক মিতালি বিশ্বাস। প্রবীণ ও নবীনের এই সমাবেশকে অভিনন্দন জানিয়ে তিনি আলোচনায় আসা মূল কথাগুলি আরেকবার তুলে ধরেন। উপদেষ্টামণ্ডলীর অন‍্যান‍্য সদস্যদের মধ‍্যে আছেন মেরুনা মুর্মু, শাশ্বতী ঘোষ, প্রতিভা সরকার, কল‍্যাণী ঠাকুর চাঁড়াল, অরুন্ধতী ঘোষ। মিতালি বলেন, পত্রিকায় বিভিন্ন দিক রাখার চেষ্টা হয়েছে। গৌরি লঙ্কেশের মতো জোরালো আঘাত হানতে হবে লেখায়। সভাঘরে উপস্থিত সম্পাদকমণ্ডলীর সমস্ত সদস‍্যদের সামনে ডেকে নেন মিতালি। সভায় রন্ধনকর্মী ইউনিয়নের লড়াকু নেত্রী জয়শ্রী দাস ও গ্রামীণ শ্রমিক আন্দোলনের নেত্রী কাজল দত্ত সহ বিভিন্ন জেলা থেকে মহিলা নেত্রীরা এসেছিলেন। ছাত্রী ও ছাত্র কর্মীরা, দেশব্রতী সম্পাদকমণ্ডলীর সদস‍্যরা এবং সিপিআই(এমএল) পলিটব‍্যুরো সদস‍্য কার্তিক পাল অংশগ্রহণ করেছিলেন। স্বল্প সময়ে নানা দিক থেকে অত‍্যন্ত জোরালো অভিঘাত রেখে প্রতিবিধান পুনঃপ্রকাশ অনুষ্ঠান সমাপ্ত হয়।

- মলয় তেওয়ারি

Tarai-Duars

উত্তরবঙ্গ-দক্ষিণবঙ্গ নিয়ে যাই বিতর্ক চলুক এত বড় শ্রমনিবিড় চা শিল্পে শ্রমিকদের আন্দোলনের খবর সংবাদপত্রগুলিতে জায়গা পায় না। এটাই সত্য।

চলতি বছরের ১৩ জানুয়ারি চা শিল্পে শ্রমিকদের ট্রেড ইউনিয়নের যুক্ত মঞ্চ বৈঠক করে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে চা বাগানে শ্রমিকদের আবাসস্থল লিজ হোল্ডের বদলে ফ্রি হোল্ড জমির নামে রাজ্য সরকার কর্পোরেটদের স্বার্থে লুঠেরাতে পরিণত হচ্ছে। টি-ট্যুরিজম আইনের বলে সরকারের জমি হরণের অপচেষ্টাকে সর্বশক্তি দিয়ে প্রতিরোধ করা হবে। গত ২৯ জানুয়ারি ২০২৩ দার্জিলিঙে, ১১ ফেব্রুয়ারি তরাইয়ের বাগডোগরায় ও ১২ ফেব্রুয়ারি চালসায় চা শ্রমিকদের কনভেনশন অনুষ্ঠিত হয়। এই কনভেনশনগুলিতে জমি অধিগ্রহণের বিরুদ্ধে, ন্যুনতম মজুরি চালু, চা শ্রমিকদের বসত জমির পাট্টার দীর্ঘস্থায়ী কর্মসূচি ঘোষিত হয়। এই সফল কনভেনশনগুলির ফোরামের নেতৃত্ব সিদ্ধান্ত নেন ২ মার্চ ২০২৩ শিলিগুড়িতে মিত্র সম্মিলনী হলে পাহাড়-তরাই-ডুয়ার্স মিলিয়ে কনভেনশন অনুষ্ঠিত হবে। গত ২ মার্চ কনভেনশন থেকে সিদ্ধান্ত হয় ১৪ মার্চ ২০২৩ সমস্ত বাগানের গেটে সভা ও ডেপুটেশন প্রদান হবে। ১৪ মার্চ ২০২৩ পাহাড়-তরাই-ডুয়ার্সে বাগানগুলির গেট মিটিং ও ডেপুটেশন প্রদান হয়।

বর্তমান রাজ্য সরকার চা সুন্দরী প্রকল্পের নামে শ্রমিকদেরকে বিচ্ছিন্ন করে বা উৎখাত করে কর্পোরেটদের হাতে জমি তুলে দিতে চায়। ২০১৪ সাল থেকে ন্যুনতম মজুরি নিয়ে বহু বৈঠকের পরও রাজ্য সরকার মালিকপক্ষের সাথে আঁতাত করে ন্যুনতম মজুরি কার্যকরী করতে অনিচ্ছুক। ট্রেড ইউনিয়নের সমস্ত ত্রি-পাক্ষিক বৈঠক এড়িয়ে গিয়ে মুখ্যমন্ত্রী মালিকদের কাছে অবনত হয়ে মাত্র ১০ টাকা মজুরি বৃদ্ধির কথা একতরফা ঘোষণা করেন।

চা শ্রমিকদের মধ্যে সম্প্রদায়গত ভাগাভাগির বিরুদ্ধে পাহাড় থেকে সমতল রাজ্য সরকারের ঘৃণ্য ষড়যন্ত্রের বিরুদ্ধে শ্রমিকরা আজ এককাট্টা। আগামী ১৪ এপ্রিল ২০২৩ জয়েন্ট ফোরামের নেতৃত্বে চা বাগান অধ্যুষিত সমস্ত ব্লকে জমির পাট্টার দাবিতে বিএলআরও দপ্তর ঘেরাও করা হবে। এই প্রস্তুতিতেই উত্তরবঙ্গ জুড়ে চা শ্রমিকদের একটাই আওয়াজ “চা মজদুরকো ন্যুনতম মজুরি দেনা হোগা, জমিন কা পাট্টা দেনা হোগা, সরকার আউর বাগান মালিক হোশ মে আও, কালা সাজিস বন্ধ করো”।

stubbornness-of-the-people

১১ মার্চ ২০২৩, বিষ্ণুপুর, বাঁকুড়া : লকডাউনের পর থেকেই মোদী সরকার লোকাল ট্রেনের ভাড়া বাড়িয়ে দেয় কোভিড স্পেশাল নাম দিয়ে, লোকাল ট্রেনের সংখ্যা কমিয়ে দেওয়া হয় এবং রাতের দিকে একমাত্র ট্রেন হাওড়া থেকে পুরুলিয়া গামী চক্রধরপুর ট্রেনটির স্টপেজ বিষ্ণুপুর স্টেশনে বন্ধ হয়ে যায়। বিষ্ণুপুর স্টেশনে আবার স্টপেজ চালু করতে আইসাকে সামনে রেখে একটি প্রতিবাদ বিক্ষোভ প্রদর্শন ও মেমোরেন্ডাম জমা করা হয় ২১ জুলাই ২০২১-এ। এরপর ধীরে ধীরে বিভিন্ন সংগঠন এই একই দাবিতে লড়াই আন্দোলন করে আসছিলেন।

গত ১০ তারিখ দুপুরের পর থেকে শুরু হয় প্রতিবাদী বিষ্ণুপুর নাগরিক মঞ্চের পক্ষ থেকে অনশন ও ধর্ণা কর্মসূচি। যোগ দেন রাজনৈতিক পরিচয় থাকা এবং না থাকা প্রায় ১২০০ সাধারণ মানুষ। দুইজন ব্যাক্তি টানা অনশন চালিয়ে যান। রেলের পক্ষ থেকে তাঁদের মিনিমাম হেল্থ চেকআপের ব্যবস্থাও হয়নি। ২৪ ঘন্টা অতিক্রান্ত হওয়ার পরে মঞ্চ থেকে জনপ্রতিনিধিদেরও যুক্ত হয়ে বক্তব্যের মাধ্যমে কেন্দ্রীয় সরকারকে আবেদন করার ঘোষণাও করা হয়। অবশেষে ১১ তারিখ সন্ধ্যায়, রেল কর্তৃপক্ষ লিখিত ভাবে আশ্বাস দেয় আগামী দু’মাসের মধ্যে বিষ্ণুপুর স্টেশনে চক্রধরপুর ট্রেনটির স্টপেজ চালু করার। এই ঘোষণার পর অনশন ও ধর্ণা প্রত্যাহার করা হয়।

“আগামীতে রেলের বেসরকারিকরণ থেকে শুরু করে সমস্ত রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থাগুলির বেসরকারিকরণের বিরুদ্ধে জনগণ এইভাবেই একত্রিত হয়ে আন্দোলনে যুক্ত হবেন বলে আশা রাখি”, বলে মন্তব্য করেন সারা ভারত প্রগতিশীল মহিলা সমিতির নেত্রী কমরেড তিতাস গুপ্ত। এআইসিসিটিইউ নেতা ফারহান খান বলেন, “৩৬ ঘন্টার অধিক সময় ধরে অনশন করে মরে গেলেও এই কেন্দ্রীয় সরকার জনগণের গণ-সেন্টিমেন্টাল ইস্যুতে নুন্যতম দাবি একটি ট্রেনের একটি স্টপেজ চালুর দাবিতেও অনড়, তাদের ব্যাবহার নিষ্ঠুর ও অমানবিক। আজ এই আন্দোলন, কৃষক আন্দোলনের মতোই একমাত্র দিশা দেখাচ্ছে যে, সর্বদল ও জনগণের ঐক্যবদ্ধ লাগাতার আন্দোলন এই ফ্যাসিবাদী সরকারকেও টলাতে সক্ষম।”

এই আন্দোলনের মেজাজ শেষ অবধি বিজেপির বিরুদ্ধে গেল। এই আন্দোলনে অল পার্টি ইউনিটিরও একটা পরিবেশ তৈরি হয়। সকলে মিলে লাগাতার জনগণের দাবীতে আন্দোলন করতে পারলে ফ্যাসিবাদী শক্তিকে পরাজিত করা সম্ভব। আরো বড় কথা, একটা মামুলী দাবিও কিন্তু সেন্টিমেন্টাল হয়ে যায়। এখান থেকে শুরু করে সামগ্রিকভাবে রেলকে বাঁচানোর লড়াই যদি নাগরিক মঞ্চের মাধ্যমে হয়, তবে সেটারও প্রয়োজনীয়তা আছে।

সর্বোপরি এর আগে এই ধরনের কিছু বিশিষ্ট ব্যাক্তিরা বা এই মঞ্চের আয়োজকের একাংশ যা কিছু করেছে সেটা আখেরে বিজেপির লাভ হয়েছিল এবং এই প্রথম এই নতুন নামের মঞ্চে আমাদের সাথে আগেভাগেই যোগাযোগ রেখে শুরু করায় শেষ পর্যন্ত কিছুটা আশার আলো দেখা গেছে। ভবিষ্যতে এই মঞ্চকে কাঠামো প্রদানের চেষ্টাও করা হবে বলে আহ্বায়করা ঠিক করেছেন।

- ফারহান

political-terrorism

নির্বাচনোত্তর সন্ত্রাস কবলিত এলাকা পরিদর্শন করতে গেলে প্রথম দিনে আক্রমণের মুখে পড়ে বাম-কংগ্রেস সংসদীয় প্রতিনিধি দল। গত ১০ মার্চ ২০২৩, বিশালগড় বিধানসভা কেন্দ্রের নেহালচন্দ্র নগর বাজারে নাশকতা মূলক অগ্নিকান্ডে ভষ্মীভূত ১৯টি দোকানঘর দেখতে যান। ভষ্মীভূত দোকানের সামনে পৌঁছানো মাত্র বাম-কংগ্রেসের যৌথ সংসদীয় প্রতিনিধি দলের উপর আক্রমণ সংগঠিত করে বিজেপি আশ্রিত দুর্বৃত্ত বাহিনী। দু’টি গাড়ি ভাঙচুর করে। তখন পুলিশ সম্পূর্ণ নিষ্ক্রিয় ভূমিকা গ্রহণ করার ফলে প্রতিনিধি দলের সদস্যরা দ্রুত স্থান ত্যাগ করে আত্মরক্ষা করতে বাধ্য হয়। মোহনপুর বিধানসভা কেন্দ্রের কলকলিয়া গ্রামে সংসদীয় প্রতিনিধি দলের উপরেও আক্রমণের চেষ্টা করে দুর্বৃত্ত বাহিনী। এতে প্রমাণিত হয় যে, রাজ্যে সাংসদদের পর্যন্ত নিরাপত্তা নেই। সাধারণ জনগণ তো দূরের কথা। ২ মার্চ ২০২৩ ভোট গণনা ও ফল প্রকাশের পরে রাজ্যজুড়ে বিজয় উল্লাসের নামে বহ্নিউৎসব চলছে। বিরোধী দলের কর্মী সমর্থকদের বাড়িঘর লুটপাট করে আগুনে পুড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে। পুড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে রাবার বাগান। জলাশয়ে বিষাক্ত ঔষধ দিয়ে জীবন জীবিকার উৎসকে ধ্বংস করা হচ্ছে নির্বিচারে। গোয়ালঘরে আগুন দিয়ে গাভী, ছাগল, হাঁস মুরগি জীবন্ত পুড়িয়ে মারা হচ্ছে। শারীরিক আক্রমণের শিকার বৃদ্ধ, বৃদ্ধা, শিশু, নারী সবাই। মাধ্যমিক, উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষার্থীদের বই, খাতা সব পুড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে। বিরোধী দলের পার্টি অফিস, কার্যালয় আগুনে জ্বালিয়ে দেয়া হচ্ছে। ৬০টি বিধানসভা কেন্দ্রে এখনো পর্যন্ত এক হাজারের উপর এধরনের অপরাধ সংঘটিত করা হয়েছে। কিন্তু বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই এফআইআর নেই। জীবন যেখানে বিপন্ন সেখানে আক্রান্ত জনগণ থানায় যেতে ভয় পাচ্ছে। পুলিশ স্বতঃপ্রণোদিতভাবে কোন মামলা নিচ্ছে না। অদৃশ্য শক্তির অঙ্গুলি হেলনে পুলিশ নিষ্ক্রিয় ও নীরব ভূমিকায়। যেমনটা আমরা গত পাঁচটি বছর ধরে দেখেছি। অথচ নির্বাচন কমিশনের তত্ত্বাবধানে নির্বাচন চলাকালীন সময়ে ২ মার্চ ২০২৩ গণনা পর্যন্ত পুলিশ অনেক সক্রিয় ভূমিকায় ছিল। আইনের শাসন বিপন্ন হয়ে পড়েছে। গুন্ডা রাজ, দুবৃত্ত রাজ কায়েম হয়েছে।

রাধাকিশোরপুর কেন্দ্রে উদয়পুর পৌর পরিষদ এলাকায় টাউন সোনামুড়া ক্যানাল সংলগ্ন এলাকায় সিপিআই(এমএল) পার্টি সদস্য কমরেড মহরম আলীর গাভী পালন ফার্মে একটি খড়ের কুজো আগুনে পুড়িয়ে দেয়। গত ৪ মার্চ ২০২৩, রাত্রি ১ টার সময় এঘটনা ঘটে। প্রতিবেশি জনগণের সহায়তায় অল্পেতে তাঁর ৩৮টি গরু রক্ষা পায়। পার্টি সদস্য কমরেড বিমল চক্রবর্তীকে কাঠের মিল থেকে তাড়িয়ে দেয়। কমরেড নুরুল ইসলাম খাদিমকে নির্মাণ কাজ থেকে তাড়িয়ে দেয়। ৩৫-বিলোনীয়া বিধানসভা কেন্দ্রে চিত্তামারা বাজারে রাজ্য কমিটির সদস্য কমরেড বাবুল পালের মুদি দোকান ৩ মার্চ সকালে বন্ধ করে দেয়। ৮ মার্চ রাতে কমরেড বাবুল পালের রাবার বাগান পুড়িয়ে দেয়। তাতে তাঁর ২৫০টি রাবার গাছ পুড়ে ছাই হয়ে যায়। ৫০-পাবিয়াছড়া (তপঃ জাতি সংরক্ষিত) আসনে কাঞ্চনবাড়ি রোড এলাকায় রাজ্য কমিটির সদস্য কমরেড লক্ষিন্দর দাসের দোকান ঘর সহ আরো ৮টি দোকান ঘর আগুনে পুড়িয়ে দেওয়া হয়েছে।

এদিকে ত্রয়োদশ বিধানসভা নির্বাচনে বিজেপি-আইপিএফটি জোট ৪০ শতাংশ ভোট পেয়েছে। ২০১৮’র তুলনায় তাদের ১১ শতাংশ ভোট কমেছে। আসন সংখ্যা কমেছে ১১টি। মাত্র দু’টি আসন বেশি পেয়ে ক্ষমতাসীন হয়েছে। রাজ্য সভাপতি, উপমুখ্যমন্ত্রী হেরেছে। অন্যদিকে বিরোধীরা সবাই মিলে ৬০ শতাংশ ভোট পেয়েছে। বিরোধী ভোট বিভাজনের ফলেই বিজেপি কোনোরকমে ক্ষমতায় ফিরে এসেছে। তিপ্রা মথা দলের বিরাটভাবে উত্থান হয়েছে। সামনের লোকসভা নির্বাচনে তিপ্রা মথা দল বিজেপির সামনে চ্যালেঞ্জ। তাই তিপ্রা মথাকে সরকারে সামিল করার কৌশল গ্রহণ করেছে। নতুন রাজ্য সরকারের সংকট ও হতাশা থেকেই শুরুতেই বিরোধীদের উপর আক্রমণ নামিয়ে আনা হয়েছে। যাতে বিরোধী দলগুলো কোনো রাজনৈতিক কার্যকলাপ চালাতে না পারে। এই লক্ষ্যে এইরকম ফ্যাসিবাদী আক্রমণ নামিয়ে আনা হয়েছে। সংসদীয় প্রতিনিধি দলের উপর আক্রমণ এরই অঙ্গ।

তাই রাজ্য সরকারকে অবিলম্বে রাজনৈতিক সন্ত্রাস বন্ধ করতে হবে। জনগণের জীবন-সম্পত্তি নিরাপত্তা সুনিশ্চিত করার জন্য সাংবিধানিক দায় দায়িত্ব পালনে রাজ্য সরকার ও মুখ্যমন্ত্রীকে এগিয়ে আসতে আহ্বান জানায় সিপিআই(এমএল) রাজ্য কমিটি। প্রতিটি সন্ত্রাসের ঘটনায় যুক্ত প্রকৃত অপরাধীদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করে এদের অবিলম্বে গ্রেফতার করতে হবে। রাজ্যে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করে শান্তি সম্প্রীতি ও উন্নয়ন ত্বরান্বিত করতে হবে। সিপিআই(এমএল), ত্রিপুরা রাজ্য কমিটি বাম-কংগ্রেস সংসদীয় প্রতিনিধি দলের উপর আক্রমণের ঘটনার তীব্র নিন্দা জানায়। অপরাধীদের দ্রুত গ্রেপ্তার করার দাবি জানায়।

- সিপিআই(এমএল), ত্রিপুরা রাজ্য কমিটি

102-percent-higher-rate

৪ মার্চ ২০২৩, গুজরাট সরকার বিধানসভায় এক মারাত্মক তথ্য প্রকাশ করতে বাধ্য হল। ২০২১-২২ সালে গুজরাট সরকার আদানি পাওয়ার’এর কাছ থেকে বিদ্যুৎ কিনেছে গড় দামের থেকে ১০২ শতাংশ বেশি হারে! এক লিখিত প্রশ্নের ভিত্তিতে রাজ্য বিধানসভায় জানানো হয়েছে, উল্লিখিত ওই দু’বছরে আদানি পাওয়ার জানুয়ারি ২০২১ থেকে ডিসেম্বর ২০২২ পর্যন্ত প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের দাম ২ টাকা ৮৩ পয়সা থেকে বাড়িয়ে ৮ টাকা ৮৩ পয়সা করেছে। ২০২১ ও ২০২২’র মধ্যে আদানি পাওয়ার এর কাছ থেকে ক্রয় করা বিদ্যুতের দাম গড়ে ১০২ শতাংশ বেশি হারে গুজরাত সরকার কিনেছে।

আদানি পাওয়ার বিদ্যুতের দাম বাড়ানো সত্ত্বেও গুজরাট সরকার ২০২২ সালে ৭.৫ শতাংশ বেশি বিদ্যুৎ কিনেছে। এই দু’বছরে গুজরাট সরকার ২০২১-তে কিনেছিল ৫,৫৮৭ মিলিয়ন ইউনিট আর ২০২২-এ ৬,০০৭ মিলিয়ন ইউনিট। ২০২১-২২’র মধ্যে গুজরাট সরকার আদানি পাওয়ারকে বিদ্যুত বাবদ যে টাকা প্রদান করেছে তা হল ৮,১৬০ কোটি টাকা যার মধ্যে স্থায়ী বা ফিক্সড চার্জের পাশাপাশি প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের দাম রয়েছে।

গুজরাট সরকার জানিয়েছে, আদানি পাওয়ার প্রকল্পটি ইন্দোনেশিয়া থেকে আমদানিকৃত কয়লার উপর নির্ভরশীল, আর ২০১১’র পর আদানির এই সংস্থাটি তার পুরো উৎপাদন ক্ষমতা অনুযায়ী বিদ্যুৎ উৎপাদন করতে পারেনি কয়লার দামে অস্বাভাবিক বৃদ্ধি ঘটার জন্য।

এই ঘটনাই দেখিয়ে দেয়, আদানির সাথে সরকারি ক্ষমতার কি গভীর যোগসাজশ, আর রাষ্ট্রীয় ক্ষমতাকে কাজে লাগিয়ে আদানির উল্কা গতিতে শ্রীবৃদ্ধি আজ দিনের আলোর মতো পরিষ্কার

- ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস

the-problem-of-migrant-workers

বিজেপির ছড়ানো মিথ্যা, ভুয়ো খবর, গুজব ও শ্রমিক-বিরোধী নীতিকে প্রতিরোধ করুন!       
পরিযায়ী শ্রমিকদের নিরাপত্তা, মর্যাদা ও জীবনধারণের মজুরির নিশ্চয়তার জন্য কেন্দ্রীয় আইন তৈরি করতে হবে!       
স্থানীয় স্তরে কাজের সুযোগ বৃদ্ধিকে নিশ্চিত করতে এমএনআরইজিএ’কে শক্তিশালী করতে হবে!

গত এক সপ্তাহ ধরে সমাজ মাধ্যমে বিহার ও উত্তরাঞ্চলের অন্যান্য রাজ্য থেকে যাওয়া পরিযায়ী শ্রমিকদের ওপর আক্রমণ নিয়ে ভুয়ো খবরের বন্যা বইল। হোলির জন্য পরিযায়ী শ্রমিকদের বাড়ি যাওয়ার তাড়াহুড়োকে তাদের ওপর আক্রমণের পরিণামে তামিলনাড়ু ছেড়ে চলে যাওয়া বলে অসৎ উদ্দেশ্যে অভিহিত করা হতে লাগল। এরপর এই ভুয়ো খবরের সত্যতাকে যাচাই না করেই বিভিন্ন মিডিয়া চ্যানেল ও সংবাদপত্র সেগুলোকে ধরে প্রচার করতে লাগল। উদাহরণস্বরূপ উল্লেখ করা যায় ‘দৈনন্দিন ভাস্কর’ সংবাদপত্রে প্রকাশিত রিপোর্টের কথা যাতে জানানো হলো তামিলনাড়ুতে ১৫ জন বিহারি পরিযায়ী শ্রমিক নিহত হয়েছে এবং বিহার থেকে আসা অন্যান্য পরিযায়ী শ্রমিকদের তালিবান ধরনের আক্রমণের মুখে পড়তে হচ্ছে। আমরা দাবি জানাচ্ছি, যেসব সংবাদ মাধ্যম পরিযায়ী শ্রমিকদের মধ্যে ত্রাস ও আতঙ্ক সৃষ্টি এবং জনগণের মধ্যে ভাষাভিত্তিক বিবাদ ও বিভেদ উস্কিয়ে তোলার উদ্দেশ্যে শ্রমিকদের ওপর আক্রমণের জাল ভিডিও পোস্ট করছে, তাদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নিতে হবে।

যে সংঘ পরিবার তামিলনাড়ুর অধিবাসীদের বিরুদ্ধে ঘৃণা ছড়িয়ে রাজনৈতিক ফায়দা তুলতে চাইছে, তাদের ভ্রষ্টাচারকে আমরা ধিক্কার জানাই। কোভিড সংকট কালে পরিযায়ী শ্রমিকদের এক নির্মম লকডাউনের মধ্যে ঠেলে দেওয়া হয়েছিল, হাজার হাজার পরিযায়ী শ্রমিক ও তাদের পরিবারদের পায়ে হেঁটে শত শত কিলোমিটার পথ অতিক্রম করে বাড়ি পৌঁছোতে হয়েছিল। সংঘ বাহিনী আরও একবার তাদের রাজনৈতিক অভিসন্ধিতে পরিযায়ী শ্রমিকদের ব্যবহার করে নিতে চাইছে।

মোদী সরকার দেশের শ্রমজীবী জনগণের বিরুদ্ধে নিরবচ্ছিন্ন আক্রমণ হানছে, তাদের চালিত নয়া উদারবাদী অর্থনৈতিক নীতি শ্রমিক শ্রেণীর জন্য বিপর্যয় ডেকে আনছে। তীব্র খরা/বন্যা, কৃষিতে অব্যাহত দুরবস্থা, কাজের সুযোগের সংকোচনের ফলে গ্রামীণ ভারত কর্মসংস্থানের তীব্র সংকটে জর্জরিত। এরফলে প্রচুর সংখ্যক শ্রমজীবী জনগণ পরিযায়ী হচ্ছেন। নারী ও বয়স্করা কর্মহীন হয়ে পড়ছেন। এই পরিস্থিতিতে এমএনআরইজিএ প্রকল্পই গ্রামীণ কর্মসংস্থানের একমাত্র উৎস হয়ে উঠেছে। কিন্তু, মোদী সরকার ক্ষমতায় আসার পর থেকে কাজের এই প্রকল্পে বিপর্যয় ঘটিয়ে চলেছে। বাজেটে ১০০ দিনের কাজের প্রকল্পে বরাদ্দ ৩৩ শতাংশ হ্রাস করা হয়েছে যার ফলে কোটি কোটি শ্রমিক কাজ চাইলেও তাদের ফিরিয়ে দেওয়া হচ্ছে। কাজ শেষ করা সত্ত্বেও শ্রমিকদের যথা সময়ে মজুরি না দিয়ে এমএনআরইজিএ’র উদ্দেশ্যকে সচেতনভাবে ব্যর্থ করা হচ্ছে। কর্ম নিশ্চয়তার এই প্রকল্পের অধীনে ‘জীবনধারণের পক্ষে নিতান্তই স্বল্প মজুরি’ দিয়ে জনগণকে উপযুক্ত জীবিকা থেকে বঞ্চিত করা হচ্ছে। শহরগুলোতে শ্রমিকদের এমন পরিস্থিতিতে কাজ করতে হচ্ছে যেখানে শ্রম হলো অবিধিবদ্ধ, কাজের সময়কাল ১২ ঘন্টা ছাড়িয়ে যায়, কোনো সচেতন ছুটির দিন থাকে না, পিএফ/ইএসআই’এর সুবিধা অনুপস্থিত, জীবনধারণের পরিস্থিতি নিকৃষ্ট, অবাধে মজুরি চুরি হয়, শ্রম আইনে সুরক্ষার কোনো ব্যবস্থা থাকেনা। পরিযায়ী শ্রমিকদের বিপদ সংকুল জীবনের এই সমস্যাগুলো সমাধান না করে মোদী সরকার এখন তাদের রাজনীতির নীল নকশায় ঐ শ্রমিকদের ব্যবহার করে নিতে চাইছে।

আয়ারলা ও এআইসিসিটিইউ ভিনরাজ্যের শ্রমিকদের থেকে আতঙ্ক ও বিভেদ সৃষ্টির এই কৌশলকে প্রত্যাখান করার আবেদন শ্রমজীবী জনগণের কাছে রাখছে এবং দাবি জানাচ্ছে,

১) পরিযায়ী শ্রমিকদের নিরাপত্তা, মর্যাদা ও জীবনধারণের উপযুক্ত মজুরি নিশ্চিত করতে একটা কেন্দ্রীয় আইন তৈরি করতে হবে। নিজেদের রাজ্যের পরিযায়ী শ্রমিকদের এই সমস্ত সুরক্ষা প্রদানে রাজ্যগুলোকেও প্রকল্প তৈরি করতে হবে।

২) এমএনআরইজিএ’তে কাজের দিনের সংখ্যাকে বাড়িয়ে ২০০ দিন করে কাজের এই প্রকল্পকে শক্তিশালী করতে হবে। দৈনিক মজুরি বাড়িয়ে ৬০০ টাকা করতে হবে এবং এই প্রকল্পে বকেয়া মজুরি অবিলম্বে মিটিয়ে দিতে হবে। স্থানীয় স্তরে কাজের কার্যকরী সুযোগ সুনিশ্চিত করতে হবে।

৩) শহরাঞ্চল কর্ম নিশ্চয়তা আইন তৈরি করতে হবে।

– আয়ারলা-এআইসিসিটিইউ

aisa-di-deputation-at-howrah

গত ১৩ মার্চ আইসা হাওড়া জেলা কমিটির পক্ষ থেকে জেলা মূখ্য শিক্ষা পরিদর্শক (ডিআই মাধ্যমিক)কে তার দপ্তর জেলা শিক্ষা ভবনে স্মারকলিপি জমা দেওয়া হল।

অতি সম্প্রতি রাজ্যজুড়ে প্রায় ৮ হাজারের অধিক সরকারী বিদ্যালয়ের একটি তালিকা প্রকাশিত হয়েছে যাতে শিক্ষার্থী সংখ্যা ৩০’র নীচে। সেই তালিকায় হাওড়া জেলার ২০০’র বেশি স্কুলের নাম রয়েছে। এই স্কুলগুলোর ভবিষ্যৎ কি এবং সরকারের অবস্থান জানার জন্যে আইসা হাওড়া জেলা সম্পাদক কমরেড সৌভিক সহ তিনজনের প্রতিনিধি জেলা শিক্ষা ভবনে ডেপুটেশনে যান।

জেলার ডিআই জানান যে সংশ্লিষ্ট ৮ হাজার স্কুল কিংবা জেলার ২০০টা স্কুলের ভবিষ্যৎ নিয়ে তিনি কোনও মন্তব্য করবেন না! রাজ্য শিক্ষা দপ্তর যা নির্দেশিকা পাঠাবেন তিনি সেই মতো কাজ করবেন!

অথচ আমরা যখন জানতে চাইলাম যে ইতিমধ্যে কোনও সরকারী নির্দেশিকা এসেছে কিনা এই তালিকাভুক্ত স্কুলের জন্যে, তখন তিনি “নো কমেন্টস্” বলে নিজের দায়িত্ব ও নৈতিকতাকে এড়িয়ে গেলেন!

স্কুলছুটদের বিদ্যালয়ে ফেরানোর প্রশ্নে তিনি কিছুমাত্রায় সদর্থকতা দেখিয়েছেন ও অর্থনৈতিক কিংবা অন্যান্য কারণে পড়াশোনা ছেড়ে দেওয়া বিদ্যার্থীদের ফ্রী স্কুলিং’এর ব্যবস্থা করবেন বলে আশ্বাস দিয়েছেন।

আমরা আইসা জেলা কমিটি মনে করছি জেলার ডিআই’এর এই দায়সাড়া মনোভাব আসলে রাজ্য সরকারের তালিকাভুক্ত আট হাজার স্কুল অচিরেই বন্ধ করে দেওয়ার দিকে দিকনির্দেশ করছে।

তাই আমরা হাওড়া জেলা জুড়ে ‘স্কুল বাঁচাও, শিক্ষা বাঁচাও’ শিরোনামে লাগাতার ছাত্র আন্দোলনের ডাক দিচ্ছি।

এই আন্দোলনে অভিভাবক, শিক্ষার্থী, শিক্ষক সহ সমস্ত সাধারণ মানুষকে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার আহ্বান জানাচ্ছি।

meta-laid-off-10000-workers-in-the-second-round

ফেসবুকের মূল ‘মেটা’ প্ল্যাটফর্ম ঘোষণা করল যে তারা ১০,০০০ কর্মীকে ছাঁটাই করবে। ঠিক চার মাস আগে এই সংস্থাটি ১১,০০০ কর্মীকে ছাঁটাই করে। স্বল্প সময়ের ব্যবধানে এটা হল তাদের দ্বিতীয় দফার গণছাঁটাইয়ের পদক্ষেপ।

জুকেরবার্গ ঘোষণা করেছে, ২০২৩ সাল তার কাছে ‘কর্মদক্ষতার বছর’ বলেই গণ্য হবে। এই লক্ষ্যে $৫ বিলিয়ন ব্যয় সংকোচ করবে তার সংস্থা।

বিপর্যস্থ অর্থনীতি ইতিমধ্যেই কর্পোরেট আমেরিকায় বিপুল পরিমাণে কর্মী ছাঁটাই করেছে। ওয়াল স্ট্রিট ব্যাঙ্ক যেমন গোল্ডম্যান স্যাক্স থেকে মর্গান স্ট্যানলে, অ্যামাজন থেকে শুরু করে মাইক্রোসফটের মতো সমস্ত রাঘববোয়াল বিগ টেক সংস্থা ২০২২’র শুরুতেই ২,৮০,০০০ কর্মীকে ছাঁটাই করেছে।

নিয়ম করে প্রায় প্রতিদিন চলছে গণছাঁটাইয়ের এই নির্মম খেলা।    
(ইকনমিক টাইমস, ১৪ মার্চ ২০২৩)

millions-of-people

ইজরায়েলে নতুন সরকার গঠিত হয় গতবছরের ডিসেম্বর মাসে। ভাষ্যকারদের মতে ইজরায়েলের ইতিহাসে এটা ‘সবচেয়ে দক্ষিণপন্থী’ সরকার। কিন্তু নেতানিয়াহু সরকার ক্ষমতায় বসার কিছুদিন পর থেকেই সরকার প্রস্তাবিত এক আইনি সংস্কারকে কেন্দ্র করে সরকারের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জোরালো হতে থাকে, এবং গত দশ সপ্তাহ ধরে প্রতিবাদ অব্যাহত রয়েছে। তবে, এই প্রতিবাদ সবচেয়ে প্রবল আকার নেয় গত শনিবার ১২ মার্চ। সেদিন ইজরায়েলের বিভিন্ন শহরে লাখ লাখ মানুষ পথে নেমে প্রস্তাবিত আইন বাতিলের দাবিতে বিক্ষোভ দেখাতে থাকেন এবং অন্তত পাঁচ লাখ মানুষ প্রতিবাদে অংশ নেন। শুধু রাজধানী টেল আভিভেই সমাবেশিত হন এক লক্ষের বেশি মানুষ এবং উত্তরের হাইফা শহরেও ৫০,০০০’র বেশি মানুষ প্রতিবাদ কর্মসূচিতে অংশ নেন। তাঁরা রাস্তা অবরোধ করে প্রস্তাবিত সংস্কারের এবং সরকারের বিরুদ্ধে শ্লোগান দিতে থাকেন। শ্লোগানগুলোর অন্যতম ছিল “একনায়কতন্ত্র চলবে না”। প্রতিরোধ আন্দোলন চলার সময় রোম সফরে যাবার জন্য নেতানিয়াহুর বিমানবন্দরে যাওয়ার প্রয়োজন ছিল, কিন্তু তাঁর যাত্রাকে আটকাতে বিক্ষোভকারীরা বিমানবন্দর যাওয়ার মূল রাস্তা অবরোধ করেন। সে সময় আবার ইজরায়েল সফরে এসেছিলেন মার্কিন প্রতিরক্ষা সচিব লয়েড অস্টিন। টেল আভিভের কেন্দ্রস্থলে প্রতিরক্ষা দপ্তরে নেতানিয়াহু ও ইজরায়েলের প্রতিরক্ষা মন্ত্রী ইয়োভা গ্যালান্টের সঙ্গে অস্টিনের আলোচনার কথা ছিল। কিন্তু প্রতিবাদ তীব্র হতে থাকায় নিরাপত্তার কারণে অস্টিনের পক্ষে বিমানবন্দর অঞ্চল ছেড়ে যাওয়া সম্ভব হয়নি। নেতানিয়াহু হেলিকপ্টারে গিয়ে বিমানবন্দর সংলগ্ন স্থানে অস্টিনের সঙ্গে আলোচনায় অংশ নেন। ইজরায়েলে এই প্রতিবাদ আন্দোলন ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করেছে। প্রতিবাদের ইস্যুর প্রতি পুলিশ ও সামরিক বাহিনীর এক অংশের সমর্থন রয়েছে বলে দেখা গেছে। টেল আভিভের পুলিশ প্রধান আমিচাই এশেদকেও উর্দি পরিহিত অবস্থায় মিছিলকারীদের সঙ্গে হাঁটতে দেখা গেছে। গেরেপ্তার, জলকামান, স্টান গেরেনেড, কোনো কিছুই প্রতিবাদ আন্দোলনের তীব্রতাকে প্রশমিত করতে পারেনি। ইজরায়েলি সংবাদপত্র হারটেজ’এর মতে, এই বিক্ষোভ কর্মসূচি “দেশের ইতিহাসে বৃহত্তম প্রতিবাদ সমাবেশ”।

নেতানিয়াহু সরকারের আইনি সংস্কারের উদ্দেশ্য হল সুপ্রিম কোর্টে বিচারপতি নিয়োগে সরকারের ভূমিকাকে নির্ধারক করা। সরকারের প্রস্তাবিত সংশোধনী সংসদে পেশ হয়েছে এবং তা নিয়ে সংসদে প্রচুর প্রতিবাদ ও বিতর্ক চলছে, এবং সরকারের বিপক্ষে ও পক্ষে মতামত পেশ হচ্ছে। ইজরায়েলের সুপ্রিম কোর্টে এখন বিচারপতি নিয়োগ হয় পেশাদার ব্যক্তি, বিচারক ও সংসদ সদস্যদের নিয়ে গঠিত এক কমিটির মাধ্যমে। কিন্তু সরকার চাইছে সর্বোচ্চ আদালতে বিচারপতি নিয়োগে শেষ কথা বলবে আইনসভা। প্রস্তাবিত নতুন কমিটিতে সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকবে আইনসভার সদস্যদের, এবং ইজরায়েলে এখন দক্ষিণপন্থী জোট সরকার থাকায় এই সদস্যদের অধিকাংশই আসবে দক্ষিণপন্থী ও ধর্মীয় রক্ষণশীল সংগঠনগুলো থেকে। আর এটা সম্ভব করতে পারলে দক্ষিণপন্থী মনোভাবাপন্ন ও সরকার অনুগত বিচারপতি দিয়ে সুপ্রিম কোর্ট ভরিয়ে ফেলতে অসুবিধা হবে না। এছাড়া, পেশ করা সংস্কারে আরও প্রস্তাব করা হয়েছে, সংসদ সুপ্রিম কোর্টের কোনো সিদ্ধান্ত ও রায়ে আপত্তি জানালে সুপ্রিম কোর্টের সিদ্ধান্ত খারিজ হয়ে গিয়ে সংসদের অবস্থানই গ্ৰহণীয় হবে। সুপ্রিম কোর্ট যে কিছু প্রশাসন বিরোধী রায় দেয়, সরকারের কোনো কোনো সিদ্ধান্তকে নাকচ করে, সেটা নেতানিয়াহু ও তাঁর দক্ষিণপন্থী অনুগামীদের কাছে অনর্থক ও অনাবশ্যক প্রতিবন্ধক। সরকারের ধারণায়, সুপ্রিম কোর্ট এখন অনেক ক্ষমতা ভোগ করে এবং সেই ক্ষমতায় লাগাম পরাতে হবে।

ইজরায়েলের সংসদে সদস্য সংখ্যা ১২০, আর নেতানিয়াহুর জোট সরকারের সাংসদ সংখ্যা ৬৪। অর্থাৎ, জোট সরকারের সংখ্যাগরিষ্ঠতা একেবারেই কানঘেঁষা। প্রস্তাবিত আইন পাশ হলে সংসদের ৬১ জন সাংসদই সুপ্রিম কোর্টের কোনো সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে আপত্তি জানালে তা খারিজ হয়ে যাবে। এইভাবে, বিচার বিভাগের স্বাধীনতাতেই শুধু বিপর্যয় ঘটানো হবে না, ন্যূনতম সংখ্যাগরিষ্ঠতার বলেই সরকার দেশের জনগণকে তাদের স্বৈরাচারী সিদ্ধান্তের অধীন করতে পারবে। এই আইনি সংস্কারের পরিকল্পনার পিছনে আরো যে উদ্দেশ্য কাজ করছে বলে বিশেষজ্ঞরা জানিয়েছেন তার একটি হল, “প্যালেস্তিনীয় জমিতে ইজরায়েলের পুলিশ ফাঁড়িকে অবৈধ” বলে সুপ্রিম কোর্টের বিধান। এই নির্দেশ নেতানিয়াহুদের কাছে এক কাঁটা হয়ে দেখা দেয়। এছাড়া, প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহুর বিরুদ্ধে চলছে দুর্নীতির মামলা। এই আইন পাশ হলে সংসদীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতার জোরে নেতানিয়াহু দোষী সাব্যস্ত হওয়া থেকে রেহাই পেতে পারেন এবং তাঁর বিরুদ্ধে চলা মামলা খারিজ পর্যন্ত হয়ে যেতে পারে। বিজ্ঞানি এবং প্রতিবাদের অন্যতম সংগঠক শিকমা ব্রেসলার জানিয়েছেন, “নতুন সরকার এমন আইন আনতে চাইছে যার ফলে বিচার ব্যবস্থা সহ সবকিছুতেই সরকারই হবে সর্বোচ্চ, আর তাই আমরা এখানে সমবেত হয়েছি এই আইন যাতে পাশ হতে না পারে তা সুনিশ্চিত করতে।” দ্য টাইমস অব ইজরায়েল পত্রিকাও ব্যক্ত করেছে এই অভিমত, “এই আইন পাশ হলে রাষ্ট্রের জীবনে গণতান্ত্রিক অধ্যায়ের সমাপ্তি ঘটবে।”

নেতানিয়াহুর নেতৃত্বাধীন জোট সরকার আজ ইজরায়েলে যা করছে, আমাদের কাছে তা একেবারেই অপরিচিত ঠেকছে না। আমাদের দেশেও নরেন্দ্র মোদী সরকার সুপ্রিম কোর্টে বিচারপতি নিয়োগে সুপ্রিম কোর্ট চালিত কলেজিয়াম ব্যবস্থাকে গুরুত্বহীন করে তুলে সরকারের ভূমিকাকে কর্তৃত্বময় করে তুলতে চাইছে। নরেন্দ্র মোদী সরকারের অভিপ্রায় প্রকাশ করে আইন মন্ত্রী কিরেন রিজিজু বলেছেন, আইন মন্ত্রকের মাধ্যমেই সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতিদের মনোনয়ন হওয়াটা বাঞ্ছনীয়। আর ইজরায়েলের চরম দক্ষিণপন্থী ধর্মীয় জায়নবাদ দলের সাংসদ সিমচে রথমান বলেছেন, “১ নভেম্বর জনগণ বাড়ি থেকে গিয়ে ভোট দেন। আর তাঁরা এই ইস্যুতে ভোট দিয়েছেন।” দেশ ভিন্ন হলেও স্বৈরাচারী সরকার ও দক্ষিণপন্থার প্রতিনিধিদের মধ্যে কি ভয়ঙ্কর সাদৃশ্যকে আমরা দেখতে পাচ্ছি। স্বাধীনতাকে খর্ব করে স্বৈর অভিপ্রায়কে জনগণের ওপর চাপিয়ে দিতে সংসদীয় গরিষ্ঠতা সর্বত্রই দক্ষিণপন্থী সরকারের কাছে এক সুবিধাজনক কৌশল হয়ে উঠেছে ও উঠছে।

- জয়দীপ মিত্র

sandeep-dutta

একজন ব্যক্তি তাঁর কাজের মধ্যে দিয়ে নিজেই হয়ে উঠছেন এক প্রতিষ্ঠান – এমন খুব বেশি দেখা যায় না। আমাদের সৌভাগ্য আমাদের মধ্যে ছিলেন এরকমই একজন – সন্দীপ দত্ত।

সন্দীপ দত্তকে বাংলার সাংস্কৃতিক মহল একডাকে চেনে যে প্রতিষ্ঠানটির জন্য সেটা হল লিটল ম্যাগাজিন লাইব্রেরী। লিটল ম্যাগাজিন দীর্ঘদিন ধরেই বাংলা সংস্কৃতির এক অনন্য ও বিশিষ্ট সম্পদ। কিন্তু দীর্ঘদিন অবধি তা ছিল ক্ষণিক আলো ছড়িয়ে চিরতরে হারিয়ে যাওয়ার এক আবেগদীপ্ত প্রয়াস। এই হারিয়ে যাওয়া আটকাতে যিনি এক প্রতিষ্ঠানের জন্ম দিলেন তিনিই সন্দীপ দত্ত।

কীভাবে লিটল ম্যাগাজিনের সংরক্ষণ ও চর্চার অসামান্য প্রতিষ্ঠান লিটল ম্যাগাজিন লাইব্রেরী গড়ে উঠেছিল সে কাহিনী আমরা অনেকেই সন্দীপদার মুখে স্বকর্ণে শুনেছি। একদিন ন্যাশানাল লাইব্রেরীতে গিয়ে তিনি দেখেন অনেক লিটল ম্যাগাজিন, যা লাইব্রেরীতে দান হিসেবে এসেছিল, তা স্থান সঙ্কুলানের জন্য ফেলে দেওয়া হচ্ছে। লিটল ম্যাগাজিনকে স্থান দিতে গেলে মহার্ঘ পুস্তকাবলীর নাকি জায়গা জুটবে না। সন্দীপ দত্ত সেই বইগুলি চেয়েচিন্তে নিয়ে এসে শুরু করলেন লিটল ম্যাগাজিন লাইব্রেরী তৈরির কাজ।

এমন নানা কাজ আমরা অনেকেই শুরু করি উৎসাহ নিয়ে। তারপর সেই কাজ থেমে যায়। আমরা আবার অন্য কাজে নেমে পড়ি। ফেলে আসা কাজটির খোঁজও রাখি না। সন্দীপ দত্ত এই নিরিখে ছিলেন এক ব্যতিক্রমী মানুষ। তিনি কাজটি শুরু করলেন এবং তারপর দশকের পর দশক ধরে সেই কাজটি নিয়ে লেগে রইলেন। ছোট্ট চারা থেকে ক্রমশ মহীরূহ হল লিটল ম্যগাজিন লাইব্রেরী।

শুধু লিটল ম্যাগাজিনের সংগ্রহশালা গড়ে তোলা নয়। একে কীভাবে পাঠকের জন্য, গবেষকদের জন্য উন্মুক্ত করে দেওয়া যায় সেই নিয়েও তিনি নিরন্তর কাজ করে গিয়েছেন। সীমিত সাধ্য নিয়েই এই বিরাট লাইব্রেরীর ডিজিটাইজেশনের কাজ একটু একটু করে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছিলেন। কতটা সাহায্যই বা এই কাজে তিনি সরকার, বিখ্যাত সব প্রতিষ্ঠান বা গ্রন্থাগারগুলির থেকে পেয়েছেন! দু-চারজন সাথীকে নিয়ে প্রায় একক সংগ্রাম করে যেতে হয়েছে তাঁকে।

সন্দীপদাকে সবাই জানেন একজন সংগ্রাহক হিসেবে। তুলনায় কম জানা তাঁর লেখক ও গবেষক সত্তাটি। বিভিন্ন ব্যক্তি বা বিষয়ের ওপর যখন বিশেষ সংখ্যা প্রকাশ করেছে পত্রিকা বা প্রতিষ্ঠান, সেখানে প্রায়শই স্থান পেয়েছে সন্দীপ দত্তের প্রবন্ধ। সন্দীপদা মূলত লিখতেন সেই ব্যক্তি বা বিষয়ের ওপর কোন লিটল ম্যাগাজিনে কে কী লিখেছেন তার এক ইতিবৃত্ত। এই কাজটি কতখানি পড়াশুনো থাকলে করা সম্ভব – তা অভিজ্ঞ যে কোনও ব্যক্তিই জানেন।

যাঁরা ১৮ নম্বর টোমার লেন, কলেজ স্ট্রিটের গা-ঘেঁষা এই ঠিকানায় গেছেন, তারাই জানেন লিটল ম্যাগাজিন লাইব্রেরীর সংগ্রহ কী বিশাল। নিজের বাড়ির একটি বিরাট অংশই এই লাইব্রেরীর জন্য ছেড়ে দিয়েছিলেন তিনি, যার বার্ষিক ভাড়াই ঐ অঞ্চলে হত বেশ কয়েক লক্ষ টাকা। সন্দীপদা অবশ্য একে আর্থিক কৃচ্ছসাধন হিসেবে কোনওদিন ভাবেননি। বাংলা ভাষা সাহিত্য পড়াতেন সিটি স্কুলে। ভাষা, সাহিত্য, সংস্কৃতির প্রতি ভালোবাসার টানেই নিজের সবটুকু তিনি উজাড় করে দিয়েছিলেন এই লাইব্রেরীর জন্য।

সন্দীপদার কী কোনও আক্ষেপ ছিল না? ছিল। কিন্তু সে আর্থিক নয়। একটা দুর্ভাবনা তাঁকে কুড়ে কুঁড়ে খেত। অনেকবার মুখোমুখি আলাপে তিনি দুর্ভাবনা ব্যক্ত করে বলেছেন – তিনি চলে গেলে এই লাইব্রেরীর কী হবে? এত অমূল্য সম্পদ কী এমন যত্নে রক্ষিত হবে? এই বিরাট সম্পদ ডিজিটাইজেশন ও অন্যান্য প্রক্রিয়ায় কী সঠিকভাবে পাঠক গবেষকদের জন্য উন্মুক্ত হবে? ছড়িয়ে পড়বে?

আজ সন্দীপদার প্রয়াণের পর এই প্রশ্নটা আমাদের সকলেরই। বাংলা সংস্কৃতির কাছে একটা সামগ্রিক চ্যালেঞ্জও এটা। এই চ্যালেঞ্জটা নেওয়া ও আন্তরিকতার সঙ্গে তা সম্পন্ন করার দায়িত্ব আমাদের সকলের। এই কাজটা করতে পারলে সেটাই হবে এই আশ্চর্য মানুষটির প্রতি আমাদের যথার্থ শ্রদ্ধার্ঘ্য।

- সৌভিক ঘোষাল

gita bhakta
gita bhakta_0

গত ৭ মার্চ ২০১৩ বিকাল ৪টা নাগাদ ৮৯ বছর বয়সে প্রয়াত হন পার্টি দরদী গীতা ভক্ত। তিনি প্রায় দু’বছর ধরে বাড়িতেই বার্ধক্যজনিত রোগে শয্যাশায়ী ছিলেন। তাঁর ছেলে দেবব্রত ভক্ত পার্টির হাওড়া জেলা সম্পাদক। রাত বিরেতে যখনই কোনও অসুবিধায় পড়েছেন কমরেডরা, মাসীমার ওই বাড়ি হয়ে উঠেছিল সবার নিরাপদ আশ্রয়স্থল। মাসীমা সেই অর্থে প্রত্যক্ষ রাজনীতির সঙ্গে জড়িত না থাকলেও, কমরেডদের প্রতি ছিল তাঁর অসীম স্নেহ। সবাইকে খাওয়াতে ভালোবাসতেন মাসীমা। তাই যেকোনো সংকটকালে কেউ অভুক্ত থাকতেন না তাঁর বাড়িতে।

তিনি রেখে গেলেন তিন কন্যা ও দুই পুত্রকে। 

কমরেড গীতা ভক্ত লাল সেলাম।   
কমরেড গীতা ভক্ত অমর রহে।

=== 000 ===

খণ্ড-30
সংখ্যা-6