ওয়েজ কোড আইন : কর্তৃপক্ষের করুণার উপর ছেড়ে দেওয়া হল শ্রমিকদের

(পূর্ব প্রকাশিতের পর)

তুলে দেওয়া হচ্ছে আট ঘণ্টার শ্রমদিবস :

দুনিয়া জুড়ে আট ঘণ্টার শ্রম দিবস শ্রমিকশ্রেণির রণধ্বনি হিসাবে পরিচিত। এই দাবিকে আইনি বৈধতা দিতে হাজারে হাজারে শ্রমিক তাঁদের জীবন উৎস্বর্গ করেছেন। এখন বিভিন্ন জায়গায় শ্রমদিবসকে ছ’ঘণ্টায় নামিয়ে আনার দাবি ক্রমেই জনপ্রিয় হচ্ছে। কিন্তু, মোদী সরকার এই আট ঘণ্টার শ্রমদিবসকে আর বাধ্যতামূলক রাখতে ইচ্ছুক নয়। স্ট্যান্ডিং কমিটি সরকারের কাছে নির্দিষ্টভাবে ছ’ঘণ্টার শ্রমদিবসকে আইনি বৈধতা দিতে সুপারিশ করেছিল। কিন্তু সরকার এখন বলছে, “কত ঘণ্টার ভিত্তিতে একদিনের শ্রমদিবস হবে তা স্থির করবে কেন্দ্রীয় বা রাজ্য সরকারগুলো।”

শ্রম কোড তো ন্যুনতম মজুরি নির্দ্ধারণের মানদন্ড স্থির করলো না, এমনকি একটা শ্রমদিবসে কাজেরঘণ্টাকেও নির্দিষ্টভাবে উল্লেখ করলো না। গোটা দেশের শ্রমজীবী মানুষের কাছে মজুরি কোড বিরাট একটা ধোঁকা। ফি বছর আমরা মে দিবস উদযাপনের সময় শ্রমিকশ্রেণির সেই সমস্ত বীর শহিদদের স্মরণ করি যারা আটঘণ্টা শ্রমদিবসের জন্য নিজেদের জীবন উৎসর্গ করেন। কিন্তু আমাদেরই সরকার শ্রম দিবসকে আরো বাড়ানোর ষড়যন্ত্র করছে, ওভার টাইমের প্রাপ্য মজুরি থেকেও তাঁরা বঞ্চিত হবেন। এটা হল শ্রমিকদের উপর নামিয়ে আনা বহুমাত্রিক এক পরিকল্পিত আঘাত।

“ধর্মঘটের অধিকার”কে হরণ করা হল :

মজুরি কোড এটাও বলেছে যে, ১০ বা তার অধিক সংখ্যক শ্রমিক যদি কাজে অনুপস্থিত থাকেন তবে তা বিনা নোটিশে স্ট্রাইকে সামিল হওয়া বলে বিবেচিত হবে। আর, শাস্তিস্বরূপ কেটে নেওয়া হবে তাদের ৮ দিনের মজুরি। মজুরি কেটে নেওয়ার শর্তচাপিয়ে সরকার আদতে ধর্মঘটকেই বে-আইনী করছে আর আট দিনের মজুরি কেটে নেওয়াটা ও বাধ্যতামূলক করে ফেলছে মজুরি কোডের হাত ধরে। ইউনিয়ন বা শ্রমিকদের তরফ থেকে ধর্মঘটের নোটিশ না দিলেও কেটে নেওয়া হবে ৮ দিনের মজুরি। ঘটনাচক্রে যদি দশ জন শ্রমিক ভিন্ন ভিন্ন কারণে কাজে না আসে, তবে আট দিনের মজুরি কেটে নেওয়ার রাস্তা পরিষ্কার হবে। এই ধারার মাধ্যমে মোদীর সুস্পষ্ট লক্ষ্যই হল ধর্মঘটের অধিকার কেড়ে নেওয়া।

বোনাস এখন আর শ্রমিকদের অধিকার নয়, তা হয়ে উঠল নিয়োগকর্তার ইচ্ছাধীন :

এবার থেকে কেবলমাত্র ৮.৩৩ শতাংশ হারে শ্রমিকেরা ন্যুনতম বোনাস পাবেন। কারা কারা বোনাস পাবেন এবং বোনাসের হিসাব করার সময়ে উর্দ্ধসীমা কী হবে, তা সংশ্লিষ্ট সরকার বিজ্ঞপ্তি মারফত জানাবে। ন্যুনতম বোনাসের ক্ষেত্রেও কঠোর শর্তাবলী থাকছে। প্রথম পাঁচ বছরে সংস্থাগুলোকে বোনাস প্রদান থেকে পুরোপুরি ছাড় দেওয়া হয়েছে। তারপর, সংস্থাগুলো কতটা লাভ করলো, আর তাদের হাতে বোনাস প্রদানের জন্য কিছু উদ্বৃত্ত পড়ে থাকছে কিনা তার উপরেই বোনাসের ব্যাপারটা যুক্ত হবে। শতকরা যে হারে বোনাস দেওয়ার কথা সংস্থাগুলো ঘোষণা করছে, সংস্থার ব্যালেন্স শিটে বোনাস প্রদানের জন্য কতটা উদ্বৃত্ত পড়ে থাকছে, তা যাচাই করার কোনো অধিকার শ্রমিকদের থাকবে না। কেবলমাত্র সংশ্লিষ্ট আধিকারিক তা দেখতে পারবেন, আর নিয়োগকর্তার সম্মতিক্রমে তা জানাতে পারবেন শ্রমিকদের। ‘বকেয়া মজুরি’ হিসাবে বোনাসের ধারণাকে খারিজ করা হল। বাস্তবে যা দাঁড়াচ্ছে, তা হল, বোনাস পাওয়াটা এখন আর অধিকার হিসাবে বিবেচিত হবে না। তা পুরোপুরি মালিকের ইচ্ছাধীন। এটা মজুরি কোডের আরেকটা বৈশিষ্ট্য।

সংবাদ মাধ্যম বড্ড বেশি হৈচৈ করে বলে যে বোনাস বা অন্য কোনো ভাতা প্রদানের ক্ষেত্রে নিয়োগকর্তাকেই যাবতীয় তথ্যপ্রমাণ দেওয়ার দায় সামলাতে হয়। কিন্তু ওই একই ‘দায়িত্বশীল’ মালিকপক্ষকে বেশ কিছু প্রশ্নে যে পুরোপুরি ছাড় দেওয়া হয়েছে, সে ব্যাপারে তারা মুখে কুলুপ এঁটেছে। তারা এ নিয়ে কোনো কথা বলেন না যে, ‘‘দায়িত্বশীল’’ মালিকপক্ষকে বেশ কিছু ব্যাপারে ছাড় দেওয়া হয়েছে। চুক্তি-পারস্পরিক সম্মতি-স্টার্ট আপ-স্ট্যান্ড আপ-লাভের যে অংশটা বণ্টনযোগ্য সে সব থেকে তারা মুক্তি পেয়েছে। যে কোনো ধরনের চুক্তি বা সমঝোতা এতদিন আইনবলে বিধিবদ্ধ ও বাধ্যতামূলক শর্তকে বুড়ো আঙ্গুল দেখাতে পারতো না। এখন থেকে সেই সমস্ত বাধ্যতা থেকে মালিকপক্ষ ঢালাও ছাড় পেয়ে গেল। বোনাস সহ নানা বিষয়গুলোকে যদি নিয়োগকর্তা পারস্পরিক বোঝাপড়া ও চুক্তির ভিত্তিতে করে নেয় তবে আইনকে ফাঁকি দেওয়ার সে আইনি ছাড়পত্র পেয়ে যাবে। একইভাবে, ন্যুনতম মজুরি প্রদান-ইএসআই-পিএফ-গ্রাচ্যুইটি-বোনাস সহ অনেক অধিকার ও সুযোগ সুবিধা এখন থেকে আর বাধ্যতামূলক থাকছে না। উপরন্তু, উল্লিখিত সুযোগ সুবিধার দায় এবার থেকে আর মালিকের উপর বর্তাবে না, তা শ্রমিকের দায় বলেই চিহ্নিত করা হচ্ছে। সামাজিক সুরক্ষা সংক্রান্ত কোডের খসড়া এমনটাই বলছে।

পরিদর্শনকে প্রহসনে পরিণত করে বিদ্রুপ করা হল আইনের ধারাগুলোকে :

সংস্থাগুলোকে আইন লঙ্ঘনের জন্য মজুরি কোড উৎসাহ দিচ্ছে। কাগজে কলমে হলেও আইন লঙ্ঘনের মাত্রা অনুযায়ী, আগের আইনে অন্তত কয়েক মাস গ্রেপ্তারের বন্দোবস্ত ছিল। এখন, পরিদর্শনের ব্যবস্থাকেই পরিকল্পিতভাবে গুটিয়ে নেওয়া হচ্ছে। চোরকেই লুঠ ও তান্ডব চালাবার জন্য চাবিটা তুলে দেওয়া হচ্ছে, রাষ্ট্র বা জনগণের প্রতি তাদের আর কোনো দায়বদ্ধতা থাকছে না। অপরাধে লিপ্ত সংস্থাগুলোই এবার থেকে নিজের জন্য “ভালো আচার-আচরণের’’ শংসাপত্র দিয়েই পার পেয়ে যাবে। ‘ইন্সপেক্টর’ একজন ‘ফ্যাসিলিটেটার’ ছাড়া আর কিছুই নয়। কোম্পানি যদি আইন লঙ্ঘন করে তবে তাকে ‘ফ্যাসিলিটেটার’ প্রথমবারের জন্য কেবলমাত্র সুপরামর্শ দিতে পারে। সেই সংস্থা যদি ফ্যাসিলিটেটার এর পরামর্শ অনুযায়ী কাজ না করে তবে প্রথমবারের জন্য তাকে জরিমানা দিতে হবে ৫০,০০০ টাকা। পরের পাঁচ বছরের মধ্যে ফের লঙ্ঘন করলে দিতে হবে এক লক্ষ টাকা। তবে, কোনো অবস্থাতেই গ্রেপ্তারি নয়। আইন লঙ্ঘনের প্রথম পাঁচ বছর পরেও ফের যদি আইন অমান্য করা হয়, তবে বৃত্তাকারে জরিমানা দেওয়ার পরামর্শ তাকে দেওয়া হবে।

স্বাধীনতা দিবসের ভাষণে মোদী ‘সম্পদ সৃষ্টিকারীদের’ উপর বিশেষ গুরুত্ব আরোপ করেন। মোদী বলছেন, বিনিয়োগকারীরাই হলেন সম্পদ সৃষ্টিকারী, তাদের প্রতি সম্মান প্রদর্শন করতে হবে, ব্যবসা করার জন্য তাদের দিতে হবে “সহজে ব্যবসা করার’’ পরিমন্ডল। আমরা জানি, এই বিনিয়োগকারী ও সম্পদ সৃষ্টিকারীরাই হলেন কর্পোরেট ও বহুজাতিক সংস্থা। মোদী ও সংঘ পরিবার ওই সমস্ত বিনিয়োগকারীদের প্রশংসায় কত কথাই না খরচ করেছে। মোদী বলেছেন, তিনি ইতিমধ্যেই ১৪৫০টিরও বেশি আইন বাতিল করে দিয়েছেন। তিনি তাঁর ভাষণে স্পষ্ট করেই বলেছেন যে বেসরকারিকরণ এবং কর্পোরেট ও বহুজাতিক সংস্থাগুলোর তরফ থেকে বিনিয়োগ সমস্ত ধরনের “বেকারত্ব”, ‘বৈষম্য’ এবং দারিদ্র নির্মূলীকরণের জন্য মহৌষধের কাজ করবে। বলাই বাহুল্য, মজুরি কোড পুঁজিকে দিয়েছে অবাধ স্বাধীনতা। শ্রমকে আরো তীব্র ও অমানবিক লুন্ঠনের লক্ষ্যেই এই কোড “সম্পদ সৃষ্টিকারীদের” স্বার্থেই পরিচালিত, যারা আসলে লুঠেরা, ধ্বংসকারী। নয়া উদারবাদের যুগে পুঁজির যুপকাষ্ঠে শ্রমকে সঁপে দেওয়ার জন্যই এই কোড তৈরি হয়েছে। এটা শ্রম দাসত্বের এক আধুনিক সংস্করণ ছাড়া আর কিছুই নয়। (সমাপ্ত)

- ভি শংকর (লিবারেশন সেপ্টেম্বর ২০১৯ থেকে)

খণ্ড-26
সংখ্যা-35
07-11-2019