‘জয় শ্রীরাম’ ঘরানায় মাথা তুলছে ‘জয় বাংলা’!

অনীশ সিংহ নামে রাজ্যবাসী এক হিন্দিভাষী সদ্যযুবকের বাঙালি-বিরোধী পোস্ট ইত্যাদির প্রতিবাদে ‘বাংলা পক্ষ’ নামে একটি সংগঠনের সরেজমিন সক্রিয়তার দুটি ভিডিও দেখলাম। বাংলা ও বাঙালির এই স্বঘোষিত রক্ষাকর্তাদের সাম্প্রতিক কার্যকলাপের যদি এমনই নমুনা হয় তাহলে আমি বলতে বাধ্য এঁরা আখেরে পশ্চিমবঙ্গে সঙ্ঘ পরিবারের হিন্দু-হিন্দি- হিন্দুস্তান প্রকল্প রূপায়ণের সুবিধাই করে দিচ্ছেন। ছেলেটি যা লিখেছে তা অবশ্যই ন্যক্কারজনক এবং তার জন্য পুলিশ-প্রশাসনের মাধ্যমে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া যেত। শিল্পাঞ্চলের অই আবাসনে ও আশেপাশে আরও হিন্দিভাষী পরিবার নিশ্চয়ই বাস করেন। সামাজিক ভাবে ওর আবাসনের সকল বাসিন্দাদের মধ্যে আলোচনা ডেকে ওকে ধিক্কার দেওয়া যেত। এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে ধর্মীয়-ভাষিক সাম্প্রদায়িকতা ও সংখ্যাগুরুর আধিপত্যবাদের বিপদ নিয়ে অঞ্চলে গণসচেতনতা গড়ে তোলার উদ্যোগ নেওয়া যেত। হাতে হাতে স্মার্টফোনের সুবাদে ডিজিট্যাল মাধ্যমে কীভাবে অল্পবয়সীদের মধ্যে সঙ্ঘী বাহিনী পরধর্ম ও ভাষা নিয়ে ঘৃণা ও বিকৃত যৌনতার মহামারী ছড়াচ্ছে তার বিরুদ্ধে প্রচার করা যেত। বস্তুত এটাই সময়ের দাবি।

তার বদলে যেভাবে গো-রক্ষকদের কায়দায় ওকে কান ধরে ওঠ-বোস, ওর বাবা-মায়ের ক্ষমা প্রার্থনার সঙ্গে ওকে ‘রাজপুত জানোয়ার’ বলে গাল বা ওর মাকে ‘এমন ছেলে জন্মদানের কলঙ্ক’-এর দায়ে গঞ্জনা ক্যামেরাবন্দি করে ফেসবুকে বুক বাজানো হল, তাতে তুলনায় নরম হলেও সঙ্ঘীদের অনুকরণটা স্পষ্ট। মায়, ‘জয় শ্রীরাম’ এর নকলে ‘জয় বাংলা’ দিয়ে সাইন অফ পর্যন্ত নাগপুরী শিক্ষার স্বাক্ষর। এ যে দেখছি ‘লাগ লাগ লাগ লাগিয়ে দিতে চিত্তেতে বাসনা’। এই ভিডিও দেখিয়ে সঙ্ঘী পবনপুত্ররা রাজ্যের ভেতরে বা বাইরে বাঙালির উপর হানাদারি চালালে নরক গুলজার হয়ে উঠবে।

এটা স্রেফ সস্তা জনপ্রিয়তার লোভে কিছু ভুঁইফোড় নির্বোধের দাদাগিরি বলে উড়িয়ে দেওয়া যাবে না।

পিছনে রাজ্যের শাসকীয় রাজনীতি ও সাংগঠনিক মদত আছে। ধারাভাষ্যে যে বঙ্গবীরদের তড়পানি শুনলাম তাতে কেন্দ্রীয় সরকারের মদতে হিন্দি সাম্রাজ্যবাদের পাল্টা যুক্তরাষ্ট্রীয় ভাষা-নীতির বহুত্ব উল্লেখিত। এর সঙ্গে ছিল ‘বাংলার খেয়ে পরে বাঙালির অসন্মান’ বা রাজ্যে জন্মে বাংলা ভাষা পড়তে-লিখতে না পারার অপরাধে শাস্তির প্রচ্ছন্ন শাসানি। লোকসভা ভোটে বিজেপি-র ১৮ টি আসন দখল, বিশেষ করে আসানসোল ও ভাটপাড়ার মতো শিল্পাঞ্চলে মর্যাদার লড়াইতে হারের পর মুখ্যমন্ত্রীর মুখে হিন্দিভাষীদের সম্পর্কে যা আমরা শুনেছি, বাংলা পক্ষের ভিডিওতে তারই প্রতিধ্বনি।

এই সংগঠনটির এক মাথাকেও চিনি। হার্ভার্ড বা এমআইটি যে শুধু অমর্ত্য সেন ও অভিজিৎ বিনায়ক বন্দ্যোপাধ্যায়দের ধারণ করে না, বাঙালি ডেমাগগ গাড়লেরও জন্ম দেয় তা আগে জানতাম না। সঙ্ঘী হিন্দু রাষ্ট্র ও ফ্যাসিস্ত এককেন্দ্রিক রাষ্ট্রবাদের বিরুদ্ধে প্রকৃত যুক্তরাষ্ট্রীয়তার গণতান্ত্রিক দাবি, ঐতিহাসিক বৈচিত্র্যের উদযাপন, ভারতীয়তার বহুত্ববাদী বয়ান এবং বাঙালি জাতিসত্তার ন্যায্য স্বাভিমানের পক্ষে লড়াইকে যে অবাঙালিদের বিরুদ্ধে জেহাদ, খিস্তি-খেউড়ে নামিয়ে আনা যায় তা এই পন্ডিতের পোস্টগুলো না দেখলে ভাবতে পারতাম না।

হিন্দি বলয়ের মতোই এই রাজ্যের হিন্দিভাষীদের মধ্যেও এখন বিজেপি-আরএসএসের প্রভাব প্রবল তা অনস্বীকার্য। কদিন আগে আসাম ভবনের সামনে এনআরসি নিয়ে বিক্ষোভের সময় কয়েকটি হিন্দিভাষী যুবকের বাঙালি-বিরোধী নোংরা মন্তব্য শুনে আমারও মাথা গরম হয়ে গিয়েছিল। দিল্লি, অসম বা বিহারে সাংবাদিকতা করতে গিয়ে নানা স্তরে বাঙালি হিসেবে নানা অপমানের অভিজ্ঞতা আমারও। এনআরসি আমারও শিকড় ধরে টান মেরেছে। কিন্তু তার মানে এই নয় যে ইতিহাসবোধ ও অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা ভুলে, নিদেনপক্ষে কাণ্ডজ্ঞানটা হারিয়ে আপামর হিন্দিভাষী বা অহমিয়াকেই শত্রু ঠাউরাবো। লড়াইটা সঙ্ঘী বা শিবসেনার কায়দায় করলে তা নৈতিক ও আদর্শগতভাবে তো বটেই, আশু রাজনৈতিক তথা প্র্যাগমাটিক পরিণামের প্রশ্নেও সঙ্ঘের পক্ষে যাবে।

এই রাজ্যে বিজেপির ৪০ শতাংশ ভোটপ্রাপ্তি কি শুধু হিন্দিভাষীদের অবদান? লিঙ্গুইয়স্টিক সার্ভে অব ইন্ডিয়ার ২০০১ রিপোর্ট অনুযায়ী এই রাজ্যে হিন্দিভাষীর সংখ্যা ৫৭৪৭০৯৯; গুজরাতিভাষী ৪৬৯২৬। নেপালিভাষী ১০২২৭২৫। সেখানে বাংলাভাষীর সংখ্যা ৬৮৩৬৯২৫৫ ( রাজবংশী, চাকমা ও অন্যান্য সহ)। ২০১১র আদমসুমারিতে রাজ্যের জনসংখ্যা ছিল নয় কোটির কিছু বেশি। ২০২১ সালে তা বেড়ে দশ কোটি ছাড়াবে। অনেক চাবাগান, কলকারখানা বন্ধ থাকলেও হিন্দিভাষীর সংখ্যা কিছু বেড়েছে। কিন্তু হিন্দিভাষীর সংখ্যা এক কোটিও হয় তবে প্রায় আট কোটি বাঙালির বাড়া ভাতে তাঁরা ছাই দিয়েছে? কোচবিহার থেকে মেদিনীপুর, আসানসোল-দুর্গাপুর থেকে ভাটপাড়া বিজেপির জয় নির্ধারণ করেছে? নয়ের দশকে খাল কেটে কুমীর আনার পাপ ছেড়ে দিলাম, দলবদলের আগে এই সেদিনও ভাটপাড়ার মাফিয়া ছিল নয়নের মণি। আজ ভোটের অঙ্কে হিন্দিভাষীদের দূরে ঠেলে দিলে একুশে বিজেপির পোয়া বারো। ওদের হিন্দু- হিন্দি ভোট মেরুকরণের পাল্টা ‘জয় বাংলা’ জিগির তুলে বাঙালি হিন্দু-মুসলমান এককাট্টা হয়ে চুপচাপ ঘাসফুলে ছাপ মারবে? খেলাটা কি এতোই সোজা? এটা ঘটনা, বিশ্বায়ন-পরবর্তী অর্থনীতি এবং তিন দশক ধরে ক্ষমতাসর্বস্ব বাম-রাজনীতির জেরে রাজ্যের শিল্পাঞ্চলে মিশ্র বসতিগুলোয়, বিশেষ করে উত্তর ভারতীয় শ্রমজীবীদের মধ্যে পুরনো শ্রেণী- রাজনীতির বদলে ধর্ম ও ভাষার ভিত্তিতে দাঙ্গার রাজনীতি জমি পেয়েছে। কিন্তু বর্তমান শাসক দলও সমূহ পাপের অংশীদার। সাম্প্রতিক একের পর দাঙ্গায় দেখা গেছে নেপথ্যে কারখানার জমি হাতাতে বা কাজের সুযোগ নিয়ে শ্রমিকদের মধ্যে লড়াই বাঁধিয়ে দিতে মিল-মালিক, রিয়েল এস্টেট মাফিয়াদের সঙ্গে স্থানীয় নেতা-বাহুবলীদের আঁতাত। বিশেষ করে হিন্দিভাষীদের মধ্যে এই কুনাট্যের কুশীলবরা দিনে তৃণমূল রাতে বিজেপি। এদের মোকাবিলায় ভাষা- ধর্মনির্বিশেষে গরিব মানুষকে একজোট করার কঠিন কাজটা ভুলে আজকের শাসকদের সঙ্কীর্ণ রাজনীতির তল্পি বয়ে প্রচারলিপ্সু যারা, তারা জেনে বা না জেনে বাংলা ও বাঙালির ক্ষতিই করছে।

রাজনীতির বাইরে যারা এদের বাহবা দিচ্ছেন, দয়া করে একটু ভাবুন। বাংলা ও বাঙালির অপমানের প্রতিবাদ নিশ্চয়ই করব। কিন্তু আপনি আচরি ধর্ম পরেরে শিখাই। সংস্কৃতিগর্বী আমরাই অবাঙালিদের ‘খোট্টা, মেড়ো, মাঊরা, প্যাঁইয়া’ ইত্যাদি বলে ডাকি না? অন্যেরা এখানে জন্মেও বাংলা না শিখলে আমাদের রাগ হয়। কিন্তু আমাদের মাতৃভাষাকে আমরা নিজেরা ঘরে-বাইরে কতটুকু মর্যাদা দিই? আমাদের যে বন্ধুরা সারা বছর নানা ভাবে বাংলা সংস্কৃতির উদযাপন করেন আমি তাঁদের গুণগ্রাহী। যারা বাংলায় সরকারি কাজ ও সাইনবোর্ড ইত্যাদিতে বাংলায় নির্দেশিকা চান আমি তার পক্ষে। কিন্তু নিজেরা কতটা শুদ্ধ বাংলা লিখি বা বলি? আমাদের সন্তানরা কজন বাংলা মাধ্যমে পড়ে?

বাঙালির সামনে আজ অস্তিত্বের সঙ্কট। কিন্তু এটাই প্রথম নয়। সাময়িক সংকটে দিশাহারা হয়ে আমরা যেন আমাদের ঐতিহ্য, ইতিহাস ভুলে না যাই। সার্ভে বলছে দেশের ১২২টা নথিভুক্ত ভাষার মধ্যে ১১২টিই এই বাংলায় কমবেশি শোনা যায়। এর মধ্যে সাংবিধানিক তপশিলে স্বীকৃত ২২ টি প্রধান ভাষাও আছে। বাংলার এই বহুত্ববাদের জোরেই মারী-মন্বন্তরে, দেশভাগ-দাঙ্গায় আমরা মরিনি। সঙ্ঘী আর্যামির বীভৎসাও এই অনার্যপ্রধান বাংলাকে মারতে পারবে না যদি আমরা স্বভাবে, স্বধর্মে থিতু থাকি।

খণ্ড-26
সংখ্যা-34
31-10-2019