নদীয়ায় ব্লকে ব্লকে বিক্ষোভ, ডেপুটেশন

gachha

একদিকে দেশের নাগরিক হিসাবে অস্তিত্ব রক্ষার আশঙ্কা,অপর দিকে কৃষিক্ষেত্রে আর্থিক সংকট — এই সব মিলিয়ে গ্রাম বাংলার মানুষের জীবন-জীবিকা আজ চরম দুরবস্থার সন্মুখীন। চারিদিকে গুজব রটছে, আতঙ্ক ছড়িয়ে দেওয়া হয়েছে এনআরসি নিয়ে। চলছে দলিল-দস্তাবেজ-নথিপত্রর সন্ধানে ব্যাপক সংখ্যক মানুষের চরম ব্যস্ততা। অপরদিকে মাঠের ফসল পাট-ধান উঠছে। অনাবৃষ্টি-খরাজনিত কারণে ফলন প্রচুর পরিমাণে কমে গেছে। গ্রামীণ গরিব মানুষের মাথায় হাত! ফসলের ন্যায্য দাম নেই। চাষের খরচ কোনোরকমে উঠছে না। পরিবারের হাড়ভাঙ্গা খাটুনি তথা শ্রমের দাম থেকে গেল শূন্য! ক্ষেতমজুরদের কাজ নেই, এক বছরের বেশি হয়ে গেল ১০০ দিনের কাজ বন্ধ। এই পরিস্থিতিতে ১৭ সেপ্টেম্বর নদীয়া জেলার ব্লকে ব্লকে অনুষ্ঠিত হল বিক্ষোভ ডেপুটেশন কর্মসূচী। কৃষি ও গ্রামীণ মজুর সমিতি ও কিষাণ মহাসভার পক্ষ থেকে ধুবুলিয়া, কালীগঞ্জ, নাকাশীপাড়া, চাপড়া ও তেহট্ট ব্লকে এই কর্মসূচী সংগঠিত হয়। ডেপুটেশনের অন্যতম প্রধান দাবি ছিল বন্ধ হয়ে থাকা ১০০ দিনের কাজ চালু করতে হবে। এপ্রসঙ্গে ধুবুলিয়া ব্লকের বিডিও বলেন, যেভাবে নতুন নতুন বিধিনিয়ম চালু করা হচ্ছে তাতে এই কাজ আগের মতো ব্যাপকভাবে করা সম্ভব হচ্ছে না। ব্যক্তিগত জলাশয় সংস্কারের কাজ বন্ধ করা হয়েছে। মাটি কাটার পরিমাণ ৫২ সিএফটি থেকে ৬২ সিএফটি করে বাড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। নপাড়া ২নং অঞ্চলের পার্টির নেত্রী সেলিমা বিবি সহ প্রতিনিধিদের থেকে পক্ষ থেকে সন্তু ভট্টাচার্য, বানের সেখ, সুব্রত রায় ও অন্যান্যরা প্রশ্ন তোলেন, রাস্তার ধারে বা যত্রতত্র প্রচুর পরিমাণে বিষাক্ত আগাছা পার্থেনিয়াম যখন এলাকার পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্যের ক্ষতি করছে তখন সেটা পরিস্কার করা, বৃক্ষরোপন করা, প্রভৃতি কাজ ১০০ দিনের প্রকল্পে কেন করা যাবে না? এভাবে পঞ্চায়েতের সদিচ্ছা থাকলে, গ্রামের মানুষের মতামত নেওয়ার জন্য সংসদ সভা করলে সরকারী নিয়মের মধ্যেও ১০০ দিনের অনেক কাজ করা সম্ভব। চাপের মুখে বিডিও তাতে সন্মতি দেন এবং ৪ক ফর্মে কাজের আবেদন করার কথা বলেন।

napara 2

 

নাকাশীপাড়ার বিডিও তথ্য দিয়ে জানান যে, গত বছর এই সময়ে ব্লকে যেখানে ১২ হাজার দিন কাজ হয়েছিল, এ বছর সেই সংখ্যা মাত্র ১৭০০! তবে নদীয়া জেলায় ভূগর্ভস্থ জলস্তর রক্ষার প্রকল্পে ব্যাক্তিগত জমিতে ভালো সংখ্যক ক্ষুদ্র জলাশয় নির্মাণের কাজ হবে, যদিও সেই কাজের নির্দেশ এখনও আসেনি। কালীগঞ্জ ও চাপড়ার আধিকারিকরা কাজ কম হচ্ছে মেনে নিয়ে কাজের আবেদন করার কথা বলেন। বাস্তবে ১০০ দিনের কাজ পাওয়াকে এতটাই দলবাজি ও দুর্নীতির চক্রের মধ্যে নিয়ে যাওয়া হয়েছে যে সাধারণ মানুষকে সেখান থেকে দূরে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে, এভাবে কাজ চাওয়ার অধিকারটাই পরোক্ষে কেড়ে নেওয়া হয়েছে। বিভিন্ন ব্লকে ডেপুটেশনে অংশগ্রহণকারী কৃষি মজুর সমিতির নেতা কাজল দত্তগুপ্ত, মিঠুন সর্দার, ইনসান বিশ্বাস, দিলীপ মজুমদার সহ অন্যান্যরা আগামী সময়কালে ৪ক আবেদনের মধ্য দিয়ে কাজের অধিকারের দাবিতে আন্দোলনকে শাসক তৃণমুলের দলবাজি দুর্নীতির বিরুদ্ধে এগিয়ে নিয়ে যাবেন বলে জানান। কালীগঞ্জে কৃষিমজুর নেত্রী উমা রায় মহিলাদের সংগঠিত করে ব্লক ডেপুটেশনে আসেন এবং এই দাবিতে সোচ্চার হন।

পাটের সহায়ক মূল্য ৬০০০ টাকা কুইণ্টাল ও ধানের ক্ষেত্রে ২৩৫০ টাকা কুইণ্টাল করার দাবির ন্যায্যতা বিডিওরা স্বীকার করেন। সরকারের উচ্চস্তরে সেটা পৌঁছে দেবেন বলেও জানান। কালীগঞ্জে কিষাণ মান্ডিতে ধান কেনায় অনিয়মের উদাহরণ তুলে ধরেন কিষাণ মহাসভার নেতা কৃষ্ণ প্রামানিক, আলতাফ হোসেন, ব্লক নেতা স্বপন প্রামানিক – যিনি একজন ভূক্তভোগী চাষিও বটে। তারা বলেন, কিষাণ মান্ডিতে ফড়ে দালালরা প্রচুর পরিমাণে ধান বিক্রি করছে অথচ চাষিদের ক্ষেত্রে তাদের ধানে ভালো পরিমাণে “বাদ” দিয়ে, দিনের পর দিন ঘুরিয়ে অযথা হয়রানি করা হচ্ছে কেন? নাকাশীপাড়া ও চাপড়ায় দেখা যায় কিষাণ মান্ডিতে ফসল কেনায় শাসকদলের পঞ্চায়েতের মাতব্বররা নিয়ম বহির্ভূতভাবে হস্তক্ষেপ করছে। তাদের মদতে ফড়ে মহাজনের দালালরা কিষাণ মান্ডিগুলিকে কব্জা করেছে। একদিকে মোদী সরকার দেড়গুণ সহায়ক মূল্য না দিয়ে চাষিদের বঞ্চনা করছে, অন্যদিকে তৃণমুল মধ্যস্বত্বভোগীদের “সিন্ডিকেট-ফড়ে রাজ” তৈরি করে চাষিদের প্রতারণা করছে। এই দুই সরকারের বিরুদ্ধে নেতৃবৃন্দ সোচ্চার হন। পাশাপাশি প্রকৃত চাষি-ছোট ভাগ চাষি-চুক্তি চাষিদের ফসল কেনায় অগ্রাধিকার দিতে হবে দাবি তুলে ধরেন কিষাণ মহাসভার নেতা ধনঞ্জয় গাঙ্গুলী, জয়তু দেশমুখ প্রমূখ। যদিও খাদ্য দপ্তরকে বিষয়টি জানানোর কথা বলে বিডিও-রা নিজেদের দায় এড়িয়ে যান।

dhubulia bdo

 

কিষাণ মহাসভার নেতা সুবিমল সেনগুপ্ত বলেন, আগামী ২৫ সেপ্টেম্বর নদীয়া জেলা শাসকের দপ্তরে এই দাবিগুলি নিয়ে জোড়ালো বিক্ষোভ আন্দোলন গড়ে তোলা হবে। সরকারী ঘোষণা সত্বেও ফসল বীমার সুবিধা ক্ষতিগ্রস্ত চাষিরা আদৌ পায়নি, ‘কৃষক বন্ধু’ নামক সহায়তা প্রকল্প সম্পর্কে গ্রামের মানুষকে জানানোই হয়নি। তাই কৃষকের অধিকারের এই দাবিগুলি তুলে ধরতে হবে। নাকাশীপাড়ায় আদিবাসী জনগণের জাতিগত সার্টিফিকেট প্রদানে গ্রামে ক্যাম্প করার দাবি জানান নদীয়ার দীর্ঘদিনের লড়াকু নেতা সন্ন্যাসী সর্দার। বিডিও বলেন, ক্যাম্প করেও নাকি কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি! এ কথার তীব্র প্রতিবাদ করে তিনি জানান, যথেষ্ট প্রচার করে সেটা আদৌ করা হয়নি। তাই দীর্ঘসূত্রিতা নয়, দ্রুত সার্টিফিকেট দিতে পুনরায় ক্যাম্প করতে হবে এবং আদিবাসী পাড়ায় রাস্তা নির্মাণ করতে হবে। এই দাবিগুলি নাকাশীপাড়া ব্লকে উপস্থিত আদিবাসীরা তুলে ধরেন। একটি রাস্তার নির্মাণের জন্য প্রায় দুই শতাধিক আদিবাসী মানুষের স্বাক্ষরিত দাবিপত্র তারা জমা দেন। প্রধানমন্ত্রী আবাস যোজনায় “কাটমানি” তথা দুর্নীতির বিরুদ্ধে দাবি তুলে ধরলে বিডিও নির্দিস্ট অভিযোগপত্র জমা দিতে বলেন। তিনি তথ্য দিয়ে বলেন, ২০১১ সালের আর্থ-সামাজিক জাতিগত সমীক্ষার পর আবাসের যে তালিকা তৈরি হয়েছিল সেটাই এখন চলছে। নতুন যুক্ত করার কোনো সরকারী আদেশনামা নেই। সেই তালিকায় ব্লকের ২৭ হাজার মানুষের নাম আছে, ঘর পেয়েছে ৮ হাজার। এর পর ব্লকের আরও ৩০ হাজার মানুষের একটি তালিকা তৈরি আছে, সেটা এখনও প্রকাশ করা হয়নি। উপস্থিত প্রতিনিধিরা স্বচ্ছতা, তালিকা প্রকাশ করা ও নতুন অন্তর্ভূক্তির দাবি তুলে ধরেন। বিডিও তালিকা দেবেন বলে জানান।

কালীগঞ্জ ব্লকের দেবগ্রামে একটি গুরুত্বপূর্ণ রাস্তা সংস্কারের দাবিতে গণস্বাক্ষর ইতিপূর্বে ব্লক দপ্তরে জমা দেওয়া হয়েছিলো। বিডিও সেটা দ্রুত কার্যকরী করবেন বলে জানান। ব্লক ভিত্তিক দাবিগুলি ছাড়াও বর্তমানে এনআরসি-র নামে মানুষকে আতঙ্কিত করা, বিভেদ বিদ্বেষ সৃষ্টি করার বিজেপির চক্রান্তের বিরুদ্ধে প্রচার করা হয়। প্রচারে বলা হয় অযথা আতঙ্কিত হবেন না, এনআরসি পঃ বাংলায় চালু হয়নি, বিজেপির চক্রান্তের বিরুদ্ধে সতর্ক থাকুন, সোচ্চার হোন। দাবি তোলা হয় ভোটারদের কার্ড যাচাই কর্মসূচী বুথে বুথে ক্যাম্প করে, বাড়ি বাড়ি গিয়ে সম্পন্ন করার কাজ নির্বাচন কমিশনকেই দায়িত্ব নিতে হবে।

খণ্ড-26
সংখ্যা-29
19-09-2019