cover-image-db-25-nov-21
deshabrati-25-nov-21

historic victory

অবশেষে প্রধানমন্ত্রীকে অভূতপূর্ব কৃষক-প্রতিরোধের সামনে মাথা নোয়াতে হল, তিনটি বিতর্কিত আইনই খারিজের কথা ঘোষণা করতে হল। এবং সেটা ব্যাপক অসন্তোষ জাগানো বিলে পরিণত কৃষি অর্ডিন্যান্সকে সংসদে আইনে রূপান্তরিত করার পথ নিরঙ্কুশ করার চোদ্দ মাস পর! এই জয় এক ঐতিহাসিক নিদর্শন হিসেবে স্মরণীয় হয়ে থাকবে, কারণ জনতার সাহসী, অক্লান্ত এক আন্দোলন অত্যাচারী এক সরকারকে নতজানু হতে বাধ্য করেছে আর জনগণের ক্ষমতা রাষ্ট্রশক্তি ও ক্ষমতাগর্বী অভিজাত শাসকের দম্ভ আর নৃশংসতাকে পরাস্ত করতে সফল হয়েছে। এই চমকপ্রদ ‘ইউ-টার্ন’ ঘোষণাটির জন্য নরেন্দ্র মোদী শিখ ধর্মের প্রতিষ্ঠাতা গুরু নানকের জন্মজয়ন্তী অর্থাৎ গুরুপরবের দিনটিকে বেছে নিয়েছেন। স্পষ্টতই তার উদ্দেশ্য ক্রুদ্ধ শিখসম্প্রদায়কে শান্ত করা আর উত্তরপ্রদেশ, উত্তরাখণ্ড পাঞ্জাবের আসন্ন বিধানসভা নির্বাচনে যে বড়সড় ক্ষতির আশঙ্কা বাড়ছে তা কমানোর চেষ্টা!

গোদী মিডিয়া-র সঞ্চালক ও ভাষ্যকারেরা, যারা এতদিন কৃষি আইনকে সোল্লাসে তালি বাজিয়ে বাহবা দিয়ে এসেছেন, তারা যেন চরম ধন্দে পড়ে একেবারে চুপসে গেছেন! কেউ কেউ প্রবল সংশয়ে চিন্তাকুল হয়ে উঠলেন, এবার সরকার আবার নাগরিকত্ব সংশোধনী আইন (সিএএ) এবং ৩৭০ ধারা নিয়েও নতি স্বীকার করে বসবে নাকি! কেউ আবার এই পদক্ষেপকে একজন ‘সূক্ষ্মদর্শী’ রাষ্ট্রনেতার ‘বিচক্ষণতা’ বললেন। কেউ বলেছেন-এটা জাতীয় স্বার্থে হয়েছে; কেউ আবারএই দীর্ঘ বিলম্বিত ঘোষণায় বাজিমাত করা এক ‘মোক্ষম নির্বাচনী চাল’ আবিষ্কার করে ফেলেছেন! আবার কেউ এই ‘পিছু হটা’কে পশুরাজের দু’পা পেছোনোর সঙ্গে তুলনা করে ফেলেছেন — ‘আরে সেটা তো পালানোর জন্যে নয়, বরং প্রবল বিক্রমে শিকারের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ার জন্যে’!

সময় বলবে মোদীর ‘মাস্টারস্ট্রোক’ বিজেপি’র ক্ষতিকে আদৌ বা কতটা কমাতে পারবে, আর ঠিক কীভাবে সরকার কৃষকদের উপর ঝাঁপিয়ে পড়ার চেষ্টা করবে। কিন্তু এই মুহূর্তে এটা দিনের আলোর মতো স্পষ্ট যে সরকার কৃষকদের অসম্মানিত, হতোদ্যম করার ও ‘ভয়ঙ্কর শয়তান’ হিসেবে তুলে ধরতে ও আন্দোলনকে ভেঙে গুঁড়িয়ে দিতে সম্ভাব্য সমস্ত ছলাকলার আশ্রয় নিয়েও ব্যর্থ হয়েছে। প্রচণ্ড হতাশ, সংশয়গ্রস্ত ও ভীত হয়েই সরকার আইনগুলি বাতিলের কথা ঘোষণা করেছে। প্রতিবাদী কৃষক এবং অন্যান্য শক্তি যাঁরা ন্যায়, গণতন্ত্র এবং মানবাধিকারের জন্য লড়ছেন, তাঁদের এই মুহূর্তটা আঁকড়ে ধরে আরও বড় জয়ের জন্য দৃঢ় পায়ে এগিয়ে যেতে হবে।

কী সেই বস্তু যা এই বিরাট জয়কে সম্ভব করে তুলল? এটা আবারও প্রমাণ হল, ভারত রাষ্ট্র এবং ক্ষমতাশালী সরকারের পক্ষে একটা পর্যায়ের পর ভারতের কৃষক জনতাকে উপেক্ষা করা এবং বিরোধিতা করা সম্ভব নয়। ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রাম কয়েকটি বড় কৃষক আন্দোলন ও কৃষক বিদ্রোহের পর্বে চিহ্ণিত। ভারতীয় কৃষক সম্প্রদায়ের উদ্দীপ্ত অংশগ্রহণই স্বাধীনতা সংগ্রামকে এগিয়ে নিয়ে গেছে এবং শেষপর্যন্ত ঔপনিবেশিক শাসনের অবসান ঘটেছে। ১৯৪৭-এর পর প্রত্যেকটি বড় মাপের সামাজিক ও রাজনৈতিক অভ্যুত্থানে কৃষক এবং যুব সম্প্রদায় অবধারিতভাবেই সামনের সারিতে থেকেছেন। এমনকি বিগত তিন দশকে যখন সাধারণ প্রবণতায় হিন্দুত্বের রাজনীতির এবং বাজার আধিপত্য ও বিশ্বায়নের অর্থনীতির উত্থান হচ্ছে, কৃষক আন্দোলন সেক্ষেত্রে বেশ কয়েকটি সঙ্কট মুহূর্তে শৃঙ্খল ভাঙতে পেরেছে।

এসইজেড-বিরোধী আন্দোলন ১৮৯৪-এর জমি অধিগ্রহণ আইনের ইতি টেনেছে, আর কৃষক ও আদিবাসীরা কর্পোরেট স্বার্থে মোদীর ২০১৩-র জমি অধিগ্রহণ ও ক্ষতিপূরণ আইনকে উল্টে দেওয়ার চেষ্টা ব্যর্থ করে দিতে পেরেছেন। মোদীর সাত বছরে কৃষকরা এই দ্বিতীয় বার সরকারকে পিছু হটতে বাধ্য করতে সক্ষম হলেন।

দেশব্যাপী শত শত কৃষক সংগঠনের এক উদার-ভিত্তিক এবং সুশৃঙ্খল কার্যকরী ঐক্য গড়ে তোলা ও তাকে রক্ষা করা এবং সঙ্ঘ বাহিনীর বিভেদকামী সাম্প্রদায়িক প্রচারকে সচেতন প্রত্যাখ্যানের মধ্য দিয়েই কৃষক আন্দোলন এই বিজয় অর্জন করেছে। যখন পাঞ্জাবের কৃষকদের ‘খালিস্তানি’ তকমা দিয়ে দাগিয়ে দেওয়া ও বিচ্ছিন্ন করার চেষ্টা হল, হরিয়ানা তাদের পাশে দাঁড়ালো আর তারা একসঙ্গে ২৬ নভেম্বর দিল্লী সীমানায় প্রতিবাদী শিবিরের খুঁটি পুঁতলো। ২৬ জানুয়ারির পর সংবাদমাধ্যমের বিভ্রান্তিকর মিথ্যা প্রচার আর নিপীড়নকে তুচ্ছ করে পশ্চিম উত্তরপ্রদেশের কৃষকরা নতুন উদ্যম আর শক্তি নিয়ে আন্দোলনে যোগ দিলেন। লখিমপুর খেরিতে কৃষক-গণহত্যার পর গোটা দেশ ঐক্যবদ্ধ হয়ে গেল, দাঁড়াল আন্দোলনের পাশে।

সরকার এবং সঙ্ঘ বাহিনী প্রতিবাদী কৃষকদের যত ‘ভয়ঙ্কর দুর্বৃত্ত’ হিসেবে জনসমক্ষে তুলে ধরার ও অত্যাচার ও ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে আন্দোলনকেও ভেঙে গুঁড়িয়ে দেওয়ার চেষ্টা করল, কৃষকদের সংকল্প ও ঐক্য তত দৃঢ়তর হল, আর কৃষকদের অক্লান্ত সংকল্পবদ্ধ প্রচার, শ্রমজীবী জনতার বিভিন্ন অংশের মধ্যে সহানুভূতি ক্রমশ বাড়িয়ে তুললো। ২ নভেম্বর ঘোষিত উপ-নির্বাচনের ফলাফল যথেষ্ট পরিষ্কারভাবে দেখিয়ে দিয়েছে যে অতিরিক্ত জনরোষের উদ্গীরণ ঘটছে নির্বাচনী পরিসরে। যখন বিরোধী দলগুলো বিচ্ছিন্ন ও দুর্বল রয়ে গেছে, কৃষকদের ঐক্যবদ্ধ সংগ্রামই বিকাশমান গতিশীল বিরোধিতা হিসেবে উঠে এসেছে। বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোর আওতামুক্ত থেকে, কৃষকদের ঐক্যবদ্ধ মঞ্চ সর্বত্রই মানুষের কাছে নির্বাচনে বিজেপি'র পরাজয় নিশ্চিত করার আবেদন রেখেছে, আর এভাবেই বিজেপি বিরোধী এক বলিষ্ঠ অবস্থান নিয়েছে। কৃষক আন্দোলনের উদার ব্যাপক ঐক্য আর শক্তিশালী রাজনৈতিক কণ্ঠস্বরের সমন্বয়ই মোদী সরকারকে বাধ্য করেছে সবশুদ্ধ পৃষ্ঠপ্রদর্শন করতে — আইনগুলো খারিজ করতে; তার কাছে আর বিকল্প রাস্তা ছিল না।

মোদী কিন্তু কৃষক আন্দোলনে যে সাতশো’রও বেশি মানুষ শহীদ হয়েছেন, তাদের জন্য কৃষকদের কাছে ক্ষমা চাননি। কেউ কেউ সরাসরি মোদীর দল ও তার সরকারের হিংস্রতা ও নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। আর অন্যেরা, খোলা আকাশের নিচে যে জীবন গত এক বছর ধরে কাটাতে বাধ্য হয়েছেন কৃষকরা, তার রূঢ়তা সইতে পারেননি। মোদী সেইসব গালাগাল, কুমন্তব্যের জন্য কোনও দুঃখপ্রকাশ করেননি যেগুলো তার মন্ত্রী ও বরিষ্ঠ নেতারা ছুঁড়ে দিয়েছিলেন কৃষকদের আর তাদের আন্দোলনের উদ্দেশে, বা কৃষক আন্দোলনের পাশে দাঁড়ানো মানবাধিকার কর্মীদের উদ্দেশে তার নিজের, সংসদে দাঁড়িয়ে সেই কুখ্যাত কুমন্তব্য ‘আন্দোলনজীবী’র জন্যও তাকে লজ্জিত হতে দেখা যায় নি। তিনি বরং ক্ষমা চেয়েছেন ‘মানুষের’ কাছে, কৃষি আইনগুলির অনুমিত সুফল সম্পর্কে ‘কৃষকদের একটা অংশকে বোঝাতে’ অক্ষম হওয়ার জন্য! তিনি, বিশেষ করে ডিজেল আর সারের অবিরাম মূল্যবৃদ্ধির জন্য লাফিয়ে লাফিয়ে বেড়ে চলা চাষের খরচ কমানোর ব্যাপারে একটি শব্দও উচ্চারণ করলেন না; বরং তিনি বললেন ‘জিরো বাজেট’ কৃষির কথা, নতুন আইন তৈরির জন্য নতুন কমিটি গড়ার কথা।

কৃষকরা সঠিকভাবেই প্রতিবাদ জারি রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন, যতক্ষণ না পর্যন্ত আইনগুলি প্রকৃতপক্ষে বাতিল হচ্ছে, সমস্ত শস্যের জন্য ন্যূনতম সহায়ক মূল্যের আইনি গ্যারান্টি, নতুন বিদ্যুৎ বিল প্রত্যাহার সহ আন্দোলনের অন্য দাবিগুলি সরকার মেনে না নিচ্ছে। স্তাবক গোদী মিডিয়া মোদীর নতুন ‘মাস্টারস্ট্রোক’ আর ‘মহানুভবতা’ নিয়ে বহুল প্রচারে জীর্ণ হয়ে যাওয়া মিথ্যে গল্পগুলো ছড়ানোর চেষ্টা করতে ব্যস্ত থাক; ভারতীয় জনগণ কৃষকদের কুর্নিশ জানাবেন, সালাম জানাবেন যে সুবিশাল কাজ তাঁরা ইতিমধ্যেই সমাধা করে ফেলেছেন তার জন্য! সালাম জানাবেন এই অতিমারীর মাঝে এক শক্তিশালী আন্দোলন গড়ে তোলা, চালিয়ে যাওয়া এবং একটা ফ্যাসিবাদী সরকারের অভ্রংলিহ দম্ভ আর নিষ্ঠুর আগ্রাসনের মুখে দাঁড়িয়ে সেই আন্দোলনকে বিজয় পর্যন্ত এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য! এখনই সময় প্রতিটি চলমান গণ সংগ্রামের কৃষকদের থেকে অনুপ্রেরণা আর সাহসে উদ্দীপ্ত হওয়ার আর মোদী-শাহ-যোগী রাজের ফ্যাসিস্ট ছককে ধ্বংস করার উদ্দেশ্যে এক ব্জ্রকঠিন শক্তিশালী প্রত্যাঘাত হানার!

(লিবারেশন সম্পাদকীয়, ডিসেম্বর ২০২১)

open letter to Modi

(প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর উদ্দেশ্যে সংযুক্ত কিষাণ মোর্চার এই খোলা চিঠি প্রকাশ করা হয় গত ২১ নভেম্বর ২০২১)

মাননীয় প্রধানমন্ত্রী,

১৯ নভেম্বর ২০২১ সকালে জাতির উদ্দেশে আপনার দেওয়া বার্তা দেশের কোটি কোটি কৃষক শুনেছে। আমরা লক্ষ করেছি যে ১১ দফা আলোচনার পরে দ্বিপাক্ষিক সমাধানের পরিবর্তে আপনি একতরফা ঘোষণার পথ বেছে নিয়েছেন, তবে আমরা আনন্দিত যে আপনি তিনটি কৃষি আইন প্রত্যাহার করার ঘোষণা করেছেন। আমরা এই ঘোষণাকে স্বাগত জানাই এবং আশা করি আপনার সরকার যত তাড়াতাড়ি সম্ভব এই প্রতিশ্রুতি পূরণ করবে।

প্রধানমন্ত্রী, আপনি ভালো করেই জানেন তিনটি জনবিরোধী আইন বাতিলই এই আন্দোলনের একমাত্র দাবি নয়। প্রথম থেকেই সরকারের সঙ্গে আলোচনায় সংযুক্ত কিষাণ মোর্চা আরও তিনটি দাবি তুলে এসেছে।

১) সব কৃষককে তাদের সব কৃষিজাত পণ্যের জন্য চাষের সম্পূর্ণ খরচের উপর ভিত্তি করে (সি২+৫০%) ন্যূনতম সমর্থন মূল্য পাওয়ার একটি আইনি অধিকার দিতে হবে, যাতে দেশের প্রতিটি কৃষক তাদের সব ফসল কমপক্ষে সরকার দ্বারা ঘোষিত ন্যূনতম সমর্থন মুল্যে বিক্রি হওয়ার নিশ্চয়তা পায় (আপনারই সভাপতিত্বে গঠিত কমিটি ২০১১ সালে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রীকে এই সুপারিশ করেছিল এবং আপনার সরকারই সংসদে এটি ঘোষণা করেছিল)।

২) সরকারের প্রস্তাবিত ‘বিদ্যুৎ আইন সংশোধনী বিল, ২০২০/২০২১’র খসড়া প্রত্যাহার করুন (আলোচনার সময়, সরকার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল যে এটি প্রত্যাহার করা হবে, কিন্তু তারপরে তা অমান্য করে সংসদের কর্মসূচিতে অন্তর্ভুক্ত করা হয়)।

৩) ‘কমিশন ফর এয়ার কোয়ালিটি ম্যানেজমেন্ট ইন ন্যাশনাল ক্যাপিটাল রিজিয়ন এ্যান্ড অ্যাডজয়েনিং এরিয়াস বিল ২০২১’এ রাখা কৃষকদের জন্য শাস্তির বিধানগুলি সরান (এই বছর সরকার কিছু কৃষক-বিরোধী বিধান সরিয়ে দিয়েছে তবে ১৫ ধারার মাধ্যমে আবার কৃষকদের জন্য কিছু শাস্তির প্রস্তাবও রেখে দিয়েছে)।

আপনার বক্তব্যে এই বড় দাবিগুলির বিষয়ে সুনির্দিষ্ট কোনও ঘোষণা না থাকায় কৃষক হতাশ হয়েছে। শুধুমাত্র তিনটি আইন ঠেকানোর জন্যেই নয়, তার পরিশ্রমের মূল্যের আইনি গ্যারান্টি পাওয়ার আশা নিয়েও কৃষক এই ঐতিহাসিক আন্দোলন চালাচ্ছে।

মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, গত একবছরে এই ঐতিহাসিক আন্দোলনের সময় আরও কিছু সমস্যা দেখা দিয়েছে, অবিলম্বে যার সমাধান করাও প্রয়োজন।

৪) দিল্লী, হরিয়ানা, চণ্ডীগড়, উত্তরপ্রদেশ এবং অন্যান্য অনেক রাজ্যে এই আন্দোলনের সময় (জুন ২০২০ থেকে এখন পর্যন্ত) হাজার হাজার কৃষককে শত শত মামলায় জড়ানো হয়েছে। এই মামলাগুলি অবিলম্বে প্রত্যাহার করতে হবে।

৫) লখিমপুর খেরি হত্যা মামলার নেপথ্যনায়ক এবং ১২০বি ধারার অভিযুক্ত অজয় মিশ্র টেনি এখনও অবাধে ঘুরে বেড়াচ্ছেন এবং আপনার মন্ত্রিসভায় মন্ত্রী রয়েছেন। তিনি আপনার এবং অন্যান্য সিনিয়র মন্ত্রীদের সাথেও একই মঞ্চে থাকছেন, তাকে বরখাস্ত করে গ্রেফতার করতে হবে।

৬) এই আন্দোলনে এপর্যন্ত প্রায় ৭০০ কৃষক শহীদ হয়েছেন। তাদের পরিবারকে ক্ষতিপূরণ ও পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করে দিতে হবে। শহীদ কৃষকদের স্মরণে শহীদ স্মৃতিসৌধ নির্মাণ করার জন্য সিংঘু সীমান্তে জমি দিতে হবে।

মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, আপনি কৃষকদের কাছে আবেদন করেছেন যে, আমরা যেন ঘরে ফিরে যাই। আমরা আপনাকে আশ্বস্ত করতে চাই যে আমরা এই রাস্তায় বসে থাকা পছন্দ করি না। আমরাও চাই যে যত তাড়াতাড়ি সম্ভব এই অন্যান্য সমস্যাগুলির সমাধান হয়ে যাক আর আমরা আমাদের বাড়ি, পরিবারের কাছে এবং কৃষিকাজে ফিরে যাই। আপনিও যদি তাই চান, তাহলে সরকারের উচিত অবিলম্বে সংযুক্ত কিষাণ মোর্চার সাথে উপরের ছয়টি বিষয় নিয়ে আলোচনা শুরু করা। ততদিন পর্যন্ত সংযুক্ত কিষাণ মোর্চা তাদের পূর্ব নির্ধারিত কর্মসূচি অনুযায়ী এই আন্দোলন চালিয়ে যাবে।

government is indifferent

সাতশোর কাছাকাছি মৃত্যু, সহস্রাধিকের গ্রেপ্তারী, গন্ডায় গন্ডায় ভূয়ো মামলার ফাঁস, নৃশংস হত্যাকান্ড এবং অবিশ্রান্ত নানা কুৎসার মোকাবিলা করে কৃষকশক্তি যে অটুট আন্দোলনের ধারায় তিনশ সাতান্ন দিনের মাথায় মোদী সরকারকে মাথা নোয়াতে বাধ্য করল, এক অভূতপূর্ব জয় ছিনিয়ে নিল, তার কোনও তুলনা হয় না। বিপরীতে, মোদী যতই ‘হাতজোড় করে ক্ষমাপ্রার্থী’ হোন, ওটি যে বাহানা প্রদর্শন ছাড়া অন্য কিছু নয়, সেটাই লেখা থাকবে ইতিহাসে, মানুষের ইতিহাস মোদী জমানাকে কখনই ক্ষমা করবে না।

তবে শিক্ষা যা পাওয়া গেল তার উপর্যুপরি প্রয়োগ কি কেবল বিজেপি জমানার বিরুদ্ধে সীমিত থাকবে? পশ্চিমবাংলার মতো অ-বিজেপি শাসিত রাজ্যে কোনও আঁচ নিয়ে যাওয়ার অবকাশ নেই! অবশ্যই রয়েছে। কারণ এখানেও কৃষি ও কৃষকের অবস্থা মোটেই বিপরীত মেরুর নয়। পশ্চিমবাংলার গত বিধানসভা নির্বাচনের সময়ে দিল্লী থেকে সংযুক্ত কিষাণ মোর্চার প্রচারক দল এসেছিল। বিজেপিকে রুখে দেওয়ার আহ্বান জানিয়ে রাজ্যের বিভিন্ন অংশে প্রচার করেছিল। তার সুফল সবচেয়ে বেশি পেয়েছে তৃণমূল। সমাজের সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশ কৃষকরা সবচেয়ে বেশি সংখ্যায় ভোট না দিলে তৃণমূলের আবার ক্ষমতায় ফেরা হত না। অন্যদিকে মমতা সরকার দিল্লীর কৃষকদের প্রতি মোদী সরকারের নৃশংস আচরণের নিন্দা জানিয়েছে, অভিনন্দন জানিয়েছে লড়াকু কৃষকদের। তিন আইন প্রত্যাহারের ও সংশ্লিষ্ট বাকি দাবিগুলির ফয়সালার লড়াই সড়ক থেকে সংসদে নিয়ে যাওয়ার যে সম্মিলিত দাবি উঠেছে, তাতেও সামিল থাকবে বলেছে তৃণমূল। কিন্তু পশ্চিমবাংলার ক্ষেত্রে কি করছে? অন্তত ধরা যায় যদি ধান-চালের ন্যূনতম সহায়ক মূল্য পাওয়ার প্রশ্নে?

পশ্চিমবঙ্গে ধান কেনার সরকারি সহায়ক মূল্য ২০১৮-১৯ সালে ছিল কুইন্টাল প্রতি ১৮১৮ টাকা। ২০২০-২১-এর দীর্ঘসময় ধরে যদিও অতিমারী পর্ব চলেছে, কৃষি কাজ বন্ধ ছিল না, কিছু বিধিনিয়ম মেনে চলে। ২০২০-তে ধানের সহায়ক মূল্য বেড়ে হয়েছিল ১৮৬৮ টাকা। আর ২০২১ সালে সেটা আরেকটু বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১৯৪০ টাকা, এর সাথে বোনাস আরও ২০ টাকা, মোট ১৯৬০ টাকা। সরকার সাধারণত কেনে মোটা ধান, তার উৎপাদন খরচ হয় কুইন্টাল পিছু ন্যূনতম ১৮০০ টাকা। সংযুক্ত কিষাণ মোর্চার দাবি — ফসল উৎপাদন খরচের দেড় গুণ ন্যূনতম সহায়ক মূল্য দিতে হবে। সেইমতো পশ্চিমবঙ্গে উপরোক্ত ধানের ন্যূনতম সহায়ক মূল্য নির্ধারণ হওয়ার কথা ২৭০০ টাকা। সরকার অথচ ন্যূনতম মূল্য নির্ধারণ করেছে কুইন্টাল প্রতি ৭৫০ টাকা কম। তার ওপর সরকারি সংগ্রহের প্রক্রিয়া শুরু হতেই দেরী হয়, চলে খুড়িয়ে খুড়িয়ে। ফিবছর চলে একই দুর্দশা। এবছর ঘোষণা ছিল নভেম্বরের গোড়া থেকে ধান সংগ্রহ শুরু হবে। আর, বাস্তবে নভেম্বরের তৃতীয় সপ্তাহ পর্যন্ত চলছে কেবল নাম নথিবদ্ধকরণ, সরকার এখনও ধান কিনতে নামেনি। কবে থেকে নামবে তার নিশ্চয়তা নেই। ফলে চাষিদের, যাদের চাষের ব্যয় উসুল করতে একটু অপেক্ষা করার উপায় থাকে না — তারা বাধ্য হন অভাবী বিক্রিতে। এখন বাধ্য হচ্ছেন কুইন্টাল প্রতি ১১০০-১২০০ টাকায়, খুব বেশি হলে ১৪০০-১৫০০ টাকায় ধান-চাল মান্ডির বাইরে ফড়েদের কাছে বেচে দিতে। ন্যূনতম সহায়ক মূল্য দেওয়ার প্রশ্নে মমতা সরকার আদৌ সদাশয় দাবি করতে পারে না। মোদী সরকার মান্ডি অকেজো করে দিয়ে চাপাতে চায় কর্পোরেটরাজ। মমতা সরকারের রাজত্বে মান্ডি থেকেও অধরা, গেঁড়ে রয়েছে ফড়েরাজ। এটাই যা তফাৎ। রাজ্য সরকার প্রচার করছে ‘ধান দিন, চেক নিন’, ‘মান্ডিতে আসুন, নয়তো বাড়ি বসে ধান বেচুন’। সরকার ‘খাদ্য সাথী : অন্নদাত্রী অ্যাপ’ খুলেছে। অন লাইন বুকিং করা চাই, তবে বাড়ি আসবেন সরকারের সংগ্রাহকরা। কিন্তু বাস্তবে? মান্ডিতে যাওয়ার পথে বাধা ফড়ে দাপট। আর বাড়ি বসে বেচতে হলে করতে হবে অন্তর্জালের সংস্থান, খরচের ওপর খরচ। তাই এখানেও বাড়ছে চাষ ও চাষির সংকট। সরকার নির্বিকার।

Corporate Aggression and State Repression

বিরসা মুণ্ডার জন্মজয়ন্তী ১৫ নভেম্বরকে নরেন্দ্র মোদি সরকার “জনজাতীয় গৌরব দিবস” হিসেবে ঘোষণা করেছে। ১৫ নভেম্বর দিনটি ঝাড়খণ্ড রাজ‍্যের প্রতিষ্ঠা দিবসও বটে। খেয়াল রাখতে হবে যে ভারত রাষ্ট্র, বিশেষত আরএসএস-বিজেপির পৃষ্ঠপোষকতায় চলা মোদি সরকারের আমলে, ভারতের আদি বাসিন্দাদের সর্বমান‍্য “আদিবাসী” শব্দ দিয়ে চিহ্নিত করতে রাজি নয়। আদিবাসীর বদলে আরএসএস-এর প্রিয় শব্দ হল বনবাসী বা বনে বসবাসকারী। এবং নতুন ঝাড়খণ্ড রাজ‍্য গঠনের সময় তারা রাজ‍্যের নাম ঝাড়খণ্ডের বদলে বনাঞ্চল রাখতে উঠেপড়ে লেগেছিল। ঝাড়খণ্ড রাজ‍্য গঠনের লক্ষে কয়েক দশক ধরে চলা আন্দোলনে তীব্র লড়াই লড়তে হয়েছিল ঝাড়খণ্ড নামটি পাওয়ার জন‍্য।

বিজেপি যদি ঝাড়খণ্ডে ক্ষমতায় থাকত তাহলে নিশ্চয় মোদি ঝাড়খণ্ডকেই বেছে নিত এই নতুন দিবসের উচ্চকিত ঘোষণার মঞ্চ হিসেবে। ভাগ‍্যিস ঝাড়খণ্ডের মানুষ ২০১৯ বিধানসভা নির্বাচনে হারিয়ে দিয়ে বিজেপিকে ক্ষমতা থেকে সরিয়ে দিতে সক্ষম হয়েছিল। ছত্তিশগড়, রাজস্থান, মহারাষ্ট্রও বর্তমানে বিজেপির শাসনাধীন নয়। তাই মোদি ১৫ নভেম্বর র‍্যালির জন‍্য বেছে নেয় মধ‍্যপ্রদেশ রাজ‍্যকে। র‍্যালির প্রচার, ব‍্যানার ও সাজসজ্জায় খুব স্পষ্টভাবে বুঝিয়ে দেওয়া হয়েছে যে বিরসা মুণ্ডা তথা ভারতের উপনিবেশ-বিরোধী লড়াইয়ে আদিবাসীদের গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাসকে সম্মান জানাতে নয়, বরং নরেন্দ্র মোদি ও শিবরাজ সিং চৌহানকে বড় করে তুলে ধরতেই এই র‍্যালি সংগঠিত হচ্ছে।

এই উদযাপনের আসল পরিহাস অবশ‍্য দিবসটির নামকরণ বা ঘোষণাস্থল বেছে নেওয়ার মধ‍্যে নেই, আসল পরিহাস লুকিয়ে আছে আদিবাসীরা বর্তমানে যে বাস্তবতার সম্মুখীন হচ্ছেন তার মধ‍্যে। আদিবাসী পরিচিতি ও অধিকারের ওপর ১৯৪৭ পরবর্তী সময়ের সবচেয়ে বড় হামলার যে পরিস্থিতির সম্মুখীন হতে হচ্ছে ভারতের আদিবাসী সমাজকে তার মধ‍্যে। আজকের সরকারের সমস্ত নীতি নির্ধারিত হচ্ছে ভারতের সবরকম সম্পদের ওপর কর্পোরেটের নিয়ন্ত্রণ কায়েম করার লক্ষে। ভূমি, অরণ‍্য, নদী, খনি এবং সরকারি ব‍্যয়ে ও জনতাকে বলিতে চড়িয়ে দশকের পর দশক ধরে গড়ে ওঠা সব সরকারি সম্পত্তি – সমস্ত কিছু অত‍্যন্ত ব‍্যবস্থিতভাবে তুলে দেওয়া হচ্ছে গুটিকয় কর্পোরেট কোম্পানির হাতে। ভারতের জনগণ খুব সঠিকভাবেই এই শাসনের নাম দিয়েছে “আদানি-আম্বানি কোম্পানি রাজ”।

এই কর্পোরেট লুন্ঠনের সবচেয়ে কঠোর মূল‍্য চোকাচ্ছে ভারতের আদিবাসীরা। রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় চলা কর্পোরেট আগ্রাসনে সবচেয়ে প্রত‍্যক্ষভাবে ও সবচেয়ে বেশি মাত্রায় ক্ষতিগ্রস্ত আদিবাসীরাই। আদিবাসীদের এই বিপুল ও সুব‍্যবস্থিত উচ্ছেদকে আড়াল ও বৈধ করা হচ্ছে অর্থনৈতিক উন্নয়নের কথা বলে। এবং এই উচ্ছেদের বিরুদ্ধে আদিবাসীদের যে কোনও প্রতিরোধকে উন্নয়ন বিরোধী এন্টিন‍্যাশনাল বলে দেগে দিয়ে চূর্ণ করা হচ্ছে আর তাদের সুব্যবস্থিতভাবে সাজা দেওয়া হচ্ছে।

ঝাড়খণ্ডে আদিবাসীরা সংবিধানের পঞ্চম তপশীলের আওতায় নিজস্ব গ্রামসভার সাংবিধানিক অধিকার চাইলে রঘুবর দাস সরকার তাকে রাজদ্রোহ বলে অভিযুক্ত করে নির্বিচারে জেলে পুরতে থাকে। এইসব রাজদ্রোহের অভিযোগকে চ্যালেঞ্জ জানিয়ে জেলবন্দী আদিবাসীদের মুক্তির দাবি তোলায় ফাদার স্ট‍্যান স্বামিকে ইউএপিএ মামলা দেওয়া হয় এবং শেষ পর্যন্ত মহারাষ্ট্রের কারাগারে তাঁকে মৃত‍্যুর দিকে ঠেলে দেওয়া হয়। ছত্তিশগড়ের সুকমা জেলায় আদিবাসীরা পুলিশ ক‍্যাম্প স্থাপনের বিরোধিতা করলে তাঁদের গুলি করে হত‍্যা করা হয় সিলগার গ্রামে। এবং মোদি-ঘোষিত এই জনজাতীয় গৌরব দিবসেই সংবাদ আসে ২৭ জন তথাকথিত মাওবাদীকে হত‍্যা করার যার মধ‍্যে সম্ভবত বেশিরভাগই আদিবাসী, মহারেষ্ট্রের গড়চিরোলি জেলায়।

এইসব অর্থনৈতিক উচ্ছেদ ও রাষ্ট্রীয় নিপীড়নের পাশাপাশি আদিবাসীরা এক তীব্র সাংস্কৃতিক আগ্রাসনের সম্মুখীন। আরএসএস দিনরাত কাজ করে চলেছে আদিবাসীদের ধর্মের লাইনে বিভাজিত করার। “ঘর ওয়াপসি” অভিযানের মাধ‍্যমে বহু পরিবারকে হিন্দু ধর্মে আসতে বাধ‍্য করছে এবং আদিবাসী প্রতিরোধের উপনিবেশ-বিরোধী ইতিহাসকে খ্রিস্টান মিশনারীদের বিরুদ্ধে ধর্মযুদ্ধ বলে নতুন মোড়কে পরিবেশন করছে। ১৮৫০ এ মুর্মু ভাইবোন সিধু কানু চাঁদ ভৈর ফুল ঝানোর নেতৃত্বে সাঁওতাল হুল বা তারপর বিরসা মুণ্ডার উলগুলান অন্তর্বস্তুতে ছিল ঔপনিবেশিক শাসন ও তার যুগল দোসর সামন্ত জমিদারী ও মহাজনী শোষণের বিরদ্ধে গণ অভ‍্যুত্থান। উলগুলানের রণধ্বনি “আবুয়া দিশম, আবুয়া রাজ” (আমাদের দেশ, আমাদের শাসন) — ঠিক ১৮৫৭-র আজিমুল্লা খানের “হাম হ‍্যায় ইসকে মালিক, হিন্দস্তাঁ হামারা” (এই দেশ আমাদের, আমরা তার মালিক) সংগীতের মতই — ছিল এক জনপ্রিয় সার্বভৌমত্বের ঘোষণা যা কংগ্রেসের পূর্ণ স্বরাজের সিদ্ধান্ত গ্রহণেরও ২৯ বছর আগে ঘোষিত হয়েছিল। সংঘ পরিবার এই গৌরবময় ইতিহাসকে অন্তর্ঘাত চালিয়ে আত্মসাৎ করতে চাইছে এবং তাকে হিন্দুরাষ্ট্র প্রকল্পের লেজুড়ে পরিণত করতে চাইছে।

উচ্ছেদ, অত‍্যাচার ও সাংস্কৃতিক অধীনতার বাস্তব বিপদকে “জনজাতীয় গৌরব”-এর মিস্টিমাখা বুলি দিয়ে ঢেকে দেওয়া যাবে না। আদিবাসী আন্দোলনকর্মীরা, যারা তাঁদের গৌরবময় ঐতিহ‍্যের উত্তরাধিকারী এবং যারা আজকের এই কর্পোরেট-কম‍্যুনাল আগ্রাসনের বিরুদ্ধে নিজেদের সাংস্কৃতিক পরিচিতি ও সাংবিধানিক অধিকার রক্ষা করার জন‍্য দৃঢ়তার সাথে লড়ে চলেছেন, তাঁদের সকলে মিলে আজ দেশজুড়ে এক জোরালো ও প্রাণবন্ত ঐক‍্য গড়ে তুলতে হবে বিজেপির এই ধূর্ত ছককে বানচাল করে দিতে এবং কৃষক, শ্রমিক, ছাত্রযুব, মহিলা ও সমস্ত নিপীড়িত সামাজিক শক্তির সাথে সংহতি ও সহযোগিতার সম্পর্ক প্রতিষ্ঠা করতে হবে কর্পোরেট আগ্রাসন ও ফ‍্যাসিবাদী হামলাকে প্রতিহত করতে। ১৪-১৫ নভেম্বর ফাদার স্ট‍্যান স্বামির গড়ে তোলা কেন্দ্র বাগইচাতে যে আদিবাসী অধিকার কনভেনশন সংগঠিত হল এবং গঠিত হল আদিবাসী সংঘর্ষ মোর্চা তা এই সংহতি ও প্রতিরোধের লক্ষে এক উৎসাহজনক পদক্ষেপ।

(এম-এল আপডেট সম্পাদকীয় ১৬ নভেম্বর ২০২১)

Kisan Morcha's program

৫ নভেম্বর কলকাতায় জর্জ ভবনে সাধারণ সভার মধ্যে দিয়ে সংযুক্ত কিষাণ মোর্চার ১৭ জনের পশ্চিমবঙ্গ পরিচালন সমিতি গঠন হয়। তিনটি কৃষি আইন প্রত্যাহার করে নেওয়ার যে সিদ্ধান্ত প্রধানমন্ত্রী ঘোষণা করেছেন তাকে পরিচালন সমিতি স্বাগত জানিয়েছে। প্রায় ৭০০ জন কৃষকের মৃত্যু ও সরকারের চরম কুৎসা ও দমন মোকাবিলা করে একবছর ধরে চলা ঐতিহাসিক কৃষক আন্দোলন ও কৃষকদের পাশে ব্যাপক দেশবাসীর সংহতি আন্দোলনের চাপে মোদী সরকার শেষ পর্যন্ত পিছু হঠেছে। পরিচালন সমিতি সর্বসম্মতিক্রমে সিদ্ধান্ত নিয়েছে যে সংসদে এই আইন প্রত্যাহারের প্রক্রিয়া সম্পূর্ণ না হওয়া পর্যন্ত আন্দোলন চলবে। জনবিরোধী তিন কৃষি আইন প্রত্যাহারের কথা বললেও সমস্ত ফসলের ন্যূনতম সহায়ক মূল্যের গ্যারান্টি আইন প্রণয়ন, বিদ্যুৎ আইন বাতিল ও কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী অজয় মিশ্র টেনিকে বরখাস্ত করার প্রশ্নে কোনও সদুত্তর এখনও পাওয়া যায়নি। এই পরিপ্রেক্ষিতে সংযুক্ত কিষাণ মোর্চা সব দাবি না মেনে নেওয়া পর্যন্ত আন্দোলন অব্যাহত রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। তাই ২৬ নভেম্বর আন্দোলনের বর্ষপূর্তির গৃহীত কর্মসূচি সারা দেশের সাথে এরাজ্যেও। কলকাতায় ধর্মতলার জমায়েতসভা ও মিছিল। এতে অংশগ্রহণের জন্য ছাত্রছাত্রী, মহিলা ও যুব সংগঠন সহ সমস্ত গণতান্ত্রিক প্রগতিশীল শক্তিকে সক্রিয়ভাবে সামিল হয়েছে।

প্রতিটি জেলায় ব্লক ও জেলা সদরে এই প্রাথমিক জয় ও বাকি দাবিগুলি ঊর্ধ্বে তুলে ধরে সমাবেশ সংগঠিত হবে।

adopted by the Sanghis

কোনো শূন্যস্থান ফাঁকা থাকে না। আমরা ভারতের জনগণ যদি বিন্দুমাত্র উদাসীন ও প্রকৃত ইতিহাসবিস্মৃত হই, তাহলে আদ্যপান্ত সমাজতান্ত্রিক চেতনার ভগৎ সিং ও তাঁর সহযোদ্ধা বটুকেশ্বর দত্তরা কবে যে আরএসএস-এর হাতে পড়ে “হিন্দু ভারত গঠনের কারিগর” মার্কা ডাহা মিথ্যে গালগল্প হিসেবে আমাদের ভাবী প্রজন্মের পাঠ্যবইয়ে চলে আসতে বাধ্য হবেন তা ধরা যাবে না। তাই সময় থাকতে অত্যন্ত সতর্ক হয়ে ওঠা জরুরি। স্বাধীনতার ৭৫ বছরে যখন বিজেপি সরকার “আজাদী কা অমৃত মহোৎসব” পালনের ছল করছে তখন তাদের পেটোয়া অভিনেত্রী বর্বরের মতো বলছেন, “ভারত ৪৭-এ নয়, ২০১৪-তে স্বাধীন হয়েছে”! কেবল দেশের সম্পদ নয়, প্রকৃত সত্য ইতিহাসটাও ওরা লুঠ করতে যাচ্ছে। যত বেশি ‘জাতীয়তাবাদে’র চিৎকার, তত বেশি জাতীয় সম্পদ বিক্রি! কি কিউট না? এই কর্পোরেট দালালি ও সাম্প্রদায়িক লুটেরা শাসনের ঘৃণ্য দ্বিচারিতার বিরুদ্ধে ১৮ নভেম্বর বিপ্লবী যুব অ্যাসোসিয়েশন (আরওয়াইএ) ও অল ইন্ডিয়া স্টুডেন্টস্ অ্যাসোসিয়েশন (এআইএসএ)-এর ডাকে ও সিপিআই(এমএল) লিবারেশন পূর্ব বর্ধমান জেলা কমিটির উদ্যোগে জেলার খণ্ডঘোষ থানার ওঁয়াড়ী গ্রামে ভগৎ সিং এর সহযোদ্ধা বটুকেশ্বর দত্তের (পুলিশ কর্তা স্যান্ডার্স হত্যা ও সংসদে বোমা নিক্ষেপে যিনি ভগৎ সিংয়ের সঙ্গী ছিলেন) জন্মভিটায় শ্রদ্ধা জানাতে যাওয়া হয়। দিনটা বটুকেশ্বর দত্তের ১১১তম জন্মদিন।

ব্রিটিশের দেওয়া দ্বীপান্তরের সাজা শেষে যাঁকে স্বাধীন ভারতে সামাজিক বিস্মৃতির অতলে শেষ জীবন কাটাতে হয় পাটনায় বড় কষ্টকর অবস্থায়। বিপ্লবী কমিউনিস্টরা সময়ে সময়ে এই চরিত্রদের অন্বেষণ করে চলে। বর্ধমান শহরে রেলস্টেশন সংলগ্ন ভগৎ সিং মূর্তির পাদদেশে মাল্যদান ও শহীদ স্মরণের পরে এক বর্ণাঢ্য ট্যাবলো সহযোগে ছাত্র-যুবদের দীর্ঘ বাইক মিছিল ২১ কিলোমিটার পরিক্রমা করে পৌঁছায় ওঁয়াড়িতে। বটুকেশ্বর দত্তের মূল বসতবাড়িটি অনেক দেরীতে হলেও সরকারি সংস্কার সাম্প্রতিককালে কিছুটা হয়েছে। কিন্তু লাগোয়া প্রতিবেশি ঘোষ বাড়িটি (যে বাড়ির ভূগর্ভস্থ সুড়ঙ্গে স্যান্ডার্স হত্যার পরে প্রায় ১৮ দিন আত্মগোপন করেছিলেন ভগৎ সিং ও বটুকেশ্বর দত্ত, এবং এখানে থেকেই সংসদে বোমা হামলার পরিকল্পনা করেন তাঁরা। ১৮ দিনে তিনবার পুলিশ তল্লাশী চালায় দুটি বাড়িতে) এখনও অত্যন্ত ভগ্নদশায় রয়েছে নানাবিধ শরিকি টানাপোড়েনের জন্য। রাজ্য সরকারের উচিত অবিলম্বে এই জাতীয় ঐতিহ্য সংরক্ষণে যাবতীয় সমস্যা নিরসনে আন্তরিকভাবে উদ্যোগী হওয়া। গ্রামবাসীরাও অনেকে আয়োজক সংগঠনগুলির সঙ্গে বিপ্লবীদের স্মরণ কর্মসূচিতে অংশ নেন। উপস্থিত ছিলেন আরওয়াইএ-র রাজ্য নেতৃত্ব সজল দে, রণজয় সেনগুপ্ত, সমীর বসাক, আইসার রাজ্য সম্পাদক স্বর্ণেন্দু মিত্র, রাজ্য সভাপতি নিলাশিস বসু, সারা ভারত প্রগতিশীল মহিলা সমিতির সুমি মজুমদার এবং সিপিআই(এমএল) লিবারেশনের পলিটব্যুরো সদস্য কার্তিক পাল, পূর্ব বর্ধমান জেলা সম্পাদক সলিল দত্ত, জেলা নেতা কুণাল বক্সী, আনসারুল আমন মণ্ডল ও অন্নদাপ্রসাদ ভট্টাচার্য সহ প্রায় একশোজন নেতা-কর্মী।

batukeswar_0Freedom fighter Batukeshwar Dutt

হালিসহর : হালিসহর সাংস্কৃতিক সংস্থা’র আয়োজনে হালিসহর সাংস্কৃতিক সংস্থা’র মহড়া ঘরে বিপ্লবী ভগৎ সিং’এর সাথী বিপ্লবী বটুকেশ্বর দত্ত’র ১১১তম জন্মদিবসে এক মনোজ্ঞ আলোচনাসভা অনুষ্ঠিত হয়। প্রারম্ভে মনোগ্রাহী গান পরিবেশন করে হালিসহর বিজ্ঞান পরিষদ’এর সাথীরা। বিপ্লবী বটুকেশ্বর দত্ত’এর প্রতিকৃতিতে ফুল ও মালা দেওয়া এবং নীরবতা পালনের মধ্য দিয়ে শ্রদ্ধা নিবেদনের পর সভা শুরু হয়। সভার সভাপতি রবি সেন মহাশয় আলোচনা প্রসঙ্গে বলেন, বিপ্লবী বটুকেশ্বর দত্ত’র স্বপ্নের ভারতকে গড়ে তুলতে সকলকে আমাদের উৎসাহিত করতে হবে। মুখ্য আলোচক অশোক মুখোপাধ্যায় বিস্তারিত তথ্য সহযোগে বিপ্লবী বটুকেশ্বর দত্ত’র জীবন, কর্মধারা, বিপ্লবী অনুশীলন, নির্বাসন ও পরবর্তী কর্মধারা ব্যক্ত করেন। তিনি বলেন, স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাস বিকৃত করার অপচেষ্টাকে আমাদের রুখতে হবে। প্রশ্নোত্তর পর্বে প্রিয় গোপাল বিশ্বাস, ত্রিদীপ দস্তিদার, প্রদীপ ব্যানার্জী প্রমুখ বেশ কিছু সময়োপযোগী প্রশ্ন তুলে ধরেন। স্বাধীনতার ৭৫তম বর্ষে প্রাথমিক পর্যায়ে মানুষের সংকল্প, ধারাবাহিকভাবে স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসের ইতিবাচক চর্চা চালিয়ে যেতে সবাইকে আগ্রহী করে তুলতে হবে। সভাঘরের বাইরে বুকষ্টল থেকে বেশ কিছু উৎসাহী শ্রোতা বই কেনেন।

বজবজ : ভগৎ সিং’এর সহকর্মী স্বাধীনতা সংগ্রামী বটুকেশ্বর দত্ত’র ১১১তম জন্মদিবস উদযাপনের মাধ‍্যমে স্বাধীনতার ৭৫তম বর্ষ উদযাপন শুরু হল বজবজে সিপিআই(এমএল) লিবারেশন জেলা কার্যালয়ে। বটুকেশ্বর দত্তের প্রতিকৃতিতে মাল্যদান, পতাকা উত্তোলন ও সংক্ষিপ্ত বক্তব্য দিয়ে কর্মসূচি সংগঠিত হয়। উপস্থিত ছিলেন পার্টির জেলা সম্পাদক কিশোর সরকার, লক্ষীকান্ত অধিকারী, সাবির রাজা, পঞ্চু ঘোষ, স্বপন নস্কর, মদন সর্দার সহ অন্যান্যরা।

Barasat genocide

’৭০ দশকের বারাসাত গণহত্যাকাণ্ডের ৫০ বছর উপলক্ষে বারাসাত ব্যারাকপুর রোডের বড়বড়িয়া বাসস্ট্যান্ডে অবস্থিত শহীদবেদী পুনর্নির্মাণ করে স্মরণসভা অনুষ্ঠিত হয় মূলত সিপিআই(এমএল) লিবারেশন সহ বারাসাতের বিভিন্ন নকশালপন্থী সংগঠন ও মানবাধিকার সংগঠনের প্রতিনিধিদের উদ্যোগে ও উপস্থিতিতে। শুরুতে শ্রদ্ধা নিবেদন করে নীরবতা পালনের পর শহীদবেদীতে মাল্যদান করেন পার্টির রাজ্য কমিটির সদস্য অনিমেষ চক্রবর্তী, উত্তর ২৪ পরগণা জেলা কমিটির সদস্য নির্মল ঘোষ, বারাসাতের বর্ষীয়ান বামপন্থী নেতা দুলাল চ্যাটার্জী, নোটন কর এবং হুগলি জেলা থেকে আগত স্বপন মাতব্বর, কলকাতা থেকে সুপ্রিয় চৌধুরী, বন্দী মুক্তি কমিটির চন্দন সাহা, গণআন্দোলনের সংগঠক নীলকণ্ঠ আচার্য্য, মানবাধিকার কর্মী জয়ন্ত সিনহা সহ আরো অনেক। সংক্ষিপ্ত সভায় বক্তব্য রাখেন নির্মল ঘোষ, দুলাল চ্যাটার্জী, স্বপন মাতব্বর, বন্দীমুক্তি কমিটির চন্দন সাহা ও ’৭০ দশকের শহীদবেদী নির্মাণ নিয়ে ধারাবাহিক কাজ করে চলা প্রাবন্ধিক সুপ্রিয় চৌধুরী।

ফিরে দেখা রক্তে লেখা সেই ইতিহাস

ঘটনায় প্রকাশ ১৯৭০ সালের ১৯ নভেম্বর উত্তর ২৪ পরগণার বারাসাত ব্যারাকপুর রোডের ধারে বড়বড়িয়া এলাকার বাসিন্দারা ভোরবেলায় দেখতে পেয়েছিলেন রাস্তার পাশে ও ধানক্ষেতের ওপর পড়ে থাকা আটজন তরতাজা যুবকের লাশ। প্রত্যেকের শরীরেই ছিল অনেকগুলো ক্ষতচিহ্ন। কারো চোখ উপড়ে নেওয়া হয়েছিল, কারো বা চোয়াল উড়ে গিয়েছিল, (প্রত্যক্ষদর্শীদের অনেকের মতে এক জনের দেহে তখনো নাকি প্রাণ ছিল) সবার দেহেই কমপক্ষে পাঁচ-ছটি করে বুলেটের ফুটো। ভোর রাতে শুনতে পাওয়া যায় পরপর একাধিক গুলির শব্দ, পরে মাঠের ধারে গিয়ে দেখতে পাওয়া যায় শীতের ওই অত ভোরেও লাশ ঘিরে দাঁড়িয়ে বিশাল পুলিশ বাহিনী। সেই সময়ে ওই এলাকার বাসিন্দা, ইটভাটা শ্রমিক আন্দোলনের বামপন্থী নেতা প্রয়াত শুকুর আলী, তাঁর কাছ থেকেই জানতে পারা সম্ভব হয়েছিল, সব মর্মন্তুদ ঘটনার কথা। বারাসাত গণহত্যায় নিহত আটজন যুবকের নাম যথাক্রমে কানাই ভট্টাচার্য, সমীর মিত্র, স্বপন পাল, সমীরেন্দ্র দত্ত, যতীন দাস, গণেশ ঘটক, তরুণ দাস ও শংকর চট্টোপাধ্যায়। এঁদের প্রত্যেকের বাড়ি ছিল দক্ষিণেশ্বর লাগোয়া আড়িয়াদহ। ওই তরুণ-যুবকরা সবাই ছিলেন এলাকার পরিচিত নকশালপন্থী কর্মী হিসাবে।

(১) কানাই ভট্টাচার্য – আদি নিবাস পূর্ব বাংলার ফরিদপুর। একটি ছোট লন্ড্রির দোকান চালিয়ে কোনমতে নিজের এবং পরিবারের জীবিকা নির্বাহ করতেন। পরে টেক্সম্যাকো কারখানায় চাকরি পান। ১৯৫৬-তে যোগ দিয়েছিলেন কমিউনিস্ট পার্টিতে।

(২) সমীর মিত্র – আড়িয়াদহ কালাচাঁদ হাইস্কুলের অত্যন্ত মেধাবী ছাত্র। অত্যন্ত কৃতিত্বের সঙ্গে উচ্চমাধ্যমিক পাশ করে ভর্তি হয়েছিলেন বরানগর বিকেসি কলেজে।

(৩) স্বপন পাল – কালাচাঁদ হাইস্কুল থেকে অত্যন্ত ভালো ফল করে বরানগর বিকেসি’তে পড়তেন ফিজিক্সে অনার্স। মূলত কবি মুরারি মুখোপাধ্যায়কে দেখেই তাঁর রাজনীতিতে আসা। মৃত্যুর সময় বয়স ছিল মাত্র ২০।

(৪) সমীরেন্দ্র দত্ত – কালাচাঁদ হাইস্কুলের আরেক কৃতী ছাত্র। পরবর্তীতে বরানগর বিকেসি’তে কেমিস্ট্রি অনার্স। শহীদ হওয়ার সময় প্রথম বর্ষ। বয়স ছিল মাত্র ১৮ বছর।

(৫) যতীন দাস – আদি নিবাস পূর্ব পাকিস্তান, অধুনা বাংলাদেশের কুমিল্লা জেলা। টেক্সম্যাকো কারখানায় ইলেকট্রিক ওয়েল্ডার।

(৬) গণেশ ঘটক – নিম্নবিত্ত শ্রমিক পরিবারের সন্তান। চরম অভাবের সংসারেও অত্যন্ত কৃতিত্বের সঙ্গে উচ্চমাধ্যমিক পাশ করে ফিজিক্সে অনার্স নিয়ে ভর্তি হন উত্তরপাড়া প্যারীমোহন কলেজে। মৃত্যুর সময় তাঁর বয়স ছিল মাত্র ১৭ বছর।

(৭) তরুণ দাস – কালাচাঁদ হাইস্কুলের ক্লাস ইলেভেনের ছাত্র। লেখাপড়ার পাট চুকিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়েন দ্রোহের আগুনে। শহীদ হওয়ার সময় তাঁর বয়স ছিল মাত্র ১৫ বছর।

(৮) শংকর চট্টোপাধ্যায় – মোটা ফ্রেমের চশমার পিছনে উজ্জ্বল একজোড়া স্বপ্নদর্শী চোখ। কালাচাঁদ হাইস্কুলের অসম্ভব মেধাবী এই ছাত্রটি প্রথম বিভাগে উচ্চমাধ্যমিক পাশ করে জুলজি অনার্স নিয়ে ভর্তি হন সুরেন্দ্রনাথ কলেজে এবং অত্যন্ত কৃতিত্বের সঙ্গে গ্র্যাজুয়েশন করেছিলেন। একাধিক সায়েন্স জার্নালে সেইসময় তাঁর লেখা প্রকাশিত হত প্রায় নিয়মিত।

নকশালবাড়ির রাজনীতির আদর্শে উদ্বুদ্ধ হয়ে ওঠেন এইসব তরুণ যুবরা, সমাজবদলের লড়াইতে সেদিন তাঁরা সামিল হয়েছিলেন। এইসব সোনার টুকরো যুবকরা এই সমাজ ও দেশ থেকে হারিয়ে গেছেন আদর্শকে ভালোবেসে, শহীদের মৃত্যু বরণ করে নিয়েছিলেন ’৭০ দশকের কংগ্রেসী সন্ত্রাস আর রাষ্ট্রের বুলেটে। সেদিন কত কত মায়ের কোল খালি হয়ে গিয়েছিল, তাঁদের কথা, যারা সেদিন শাসকের সৃষ্ট সন্ত্রাসের পরিস্থিতির শিকার হয়েছিলেন, যা দ্রোহকালের ইতিহাসে স্বর্ণাক্ষরে লেখা হয়ে থাকবে। একটা গোটা প্রজন্মকে শুধুমাত্র রাষ্ট্রদ্রোহিতার অজুহাতে হত্যা করে, পুলিশের হেফাজতে বা কারান্তরালে রেখে অত্যাচার করে পঙ্গু-বিকলাঙ্গ-মৃতদেহ করে দেওয়া হয়েছিল রাষ্ট্রীয় নিপীড়নে।

১৯৭৭ পরবর্তী সময়ে বামফ্রন্ট সরকার নানা কমিশন বসিয়েছিল। ’৭০ দশকের কাশিপুর বরানগর, আরিয়াদহ, বেলাঘাটা, কোন্নগর, হাওড়া, বহরমপুর জেলের হত্যাকান্ড ইত্যাদি গণহত্যার বিচারের জন্য। কিন্তু অত্যন্ত পরিতাপের বিষয় আজো সেইসব হত্যাকাণ্ডের দোষীদের কোনো সাজা হয়নি, ন্যায়বিচার পাননি শহীদ পরিবারগুলি। অধিকাংশ দোষী পুলিশকর্তা ও গুন্ডারা নির্লজ্জের মতো ঘুরে বেরিয়েছে, কোনও কোনও কুখ্যাত পুলিশ অফিসারের পদোন্নতিও হয়েছিল। দুঃখজনক ঘটনা হলেও সত্যি, এবিষয়ে বামফ্রন্ট সরকারের প্রশাসন হিরন্ময় নিরবতা পালন করে চলে। পরে শাসনক্ষমতার পালা বদলের পরেও বিচারের দাবি উপেক্ষা আর প্রতারণার বিষয় হয়ে রয়েছে। বাংলাদেশে একাত্তরের ঘাতকদের বিচার হয়, শাস্তি হয়; কিন্তু এখানে কত রঙের সরকার গেল এল, ’৭০ দশকের ঘাতকদের বিচার করে শাস্তি হয়নি, হয় না। ইতিহাসের সেই ফয়সালা আজও বাকি রয়েছে। তাই শহীদদের ঋণ শোধ করার সংগ্রাম জারি থাকবে।

- দেবল

If the sign board changes

টিভিতে ‌দেখা গেল, মুখ্যমন্ত্রী তথা স্বাস্থ্যমন্ত্রী খুব জনমোহিনী কায়দায় জেলায় জেলায় বৈঠক করে বোঝাতে চাইছেন, রাজ্যজুড়ে সুস্বাস্থ্য কেন্দ্র গড়ে তুলে এবার গ্রাম বাংলার স্বাস্থ্য পরিষেবার ভোল পাল্টে দেওয়া হবে। কিন্তু আসলে পাল্টানো হচ্ছে শুধু নামটা — প্রাথমিক স্বাস্থ্য কেন্দ্রকে এখন থেকে সুস্বাস্থ্য কেন্দ্র বলা হবে। কিন্তু নামে কি আসে যায়? এই কেন্দ্রগুলোতে কি নিয়মিত ডাক্তার, নার্স, বেড সংখ্যা বৃদ্ধি, নিয়মিত সবরকম ওষুধের সরবরাহ, সাপ্তাহিক স্বাস্থ্য পরীক্ষার ব্যবস্থা থাকবে? না, এসবের কোনও পরিকল্পনাই সরকারের নেই। নতুন যেটুকু ব্যবস্থা হচ্ছে তা হল, সুস্বাস্থ্য কেন্দ্রগুলোতে একজন করে অভিজ্ঞ নার্সকে নিযুক্ত করা হচ্ছে। তাঁকে একটা গালভরা নাম দেওয়া হচ্ছে: কমিউনিটি হেলথ অফিসার (সিএইচও)। উনি প্রাথমিক ‌পরিষেবা দেবেন। কোনও জটিল কেসে তিনি নাকি ভিডিও কলে রোগীর সঙ্গে ডাক্তারের কথা বলিয়ে দেবেন, সেইমত ডাক্তার টেলিমেডিসিনে ওষুধ প্রেসক্রাইব করবেন। গ্রামাঞ্চলে ইন্টারনেটের যে হাল তাতে এ ব্যবস্থা কতটা কার্যকরি হবে তা সহজেই অনুমেয়। অতএব সবটাই‌ ঢক্কানিনাদ।

এহেন অবস্থায়, গত আগস্ট-অক্টোবরে ছয়টা ব্লকে জনস্বাস্থ্য বিষয়ক অনুসন্ধানের ভিত্তিতে কিছু দাবি নিয়ে বিডিও এবং ব্লক স্বাস্থ্য আধিকারিকদের কাছে ডেপুটেশন ও বিক্ষোভ প্রদর্শনের পর সারা ভারত‌ প্রগতিশীল মহিলা সমিতির হুগলি শাখা গত ২২ নভেম্বর চুঁচুড়ায় জেলা স্বাস্থ্য আধিকারিকের কাছে ডেপুটেশন দেয়, বিক্ষোভ দেখায়। মা ও সদ্যোজাতের যথাযথ চিকিৎসার ওপর জোর দিয়ে কয়েকটি দাবি রাখা হয়,

১) মগরা ও বলাগড় ব্লক হাসপাতালে‌ সিজারিয়ান ডেলিভারি ও পান্ডুয়ায় সপ্তাহে একদিন নয়, দু’দিন সিজারিয়ানের ব্যবস্থা করতে হবে। প্রত্যেক ব্লক হাসপাতালে শিশু চিকিৎসার ব্যবস্থা করতে হবে।

২) ব্লক হাসপাতালগুলোতে ডাক্তার, নার্স, বেড সংখ্যা বাড়াতে হবে এবং নিজস্ব অ্যাম্বুলেন্সের ব্যবস্থা করতে হবে।

৩) প্রাথমিক (‘সুস্বাস্থ্য’) ও উপস্বাস্থ্য কেন্দ্রগুলোতে নিয়মিত ডাক্তার আসা ও সমস্ত রকম শারীরিক পরীক্ষার ব্যবস্থা এবং সবরকম ওষুধ সুনিশ্চিত করতে হবে।

৪) হাসপাতালে ভর্তি না হলেও চিকিৎসায় স্বাস্থ্যসাথী কার্ড কার্যকরি করতে হবে।

৫) মা ও শিশুর পুষ্টির জন্য সরকার ঘোষিত যোজনার ‌বকেয়া প্রাপ্য অর্থ প্রসূতিদের মিটিয়ে দিতে হবে।

৬) গর্ভবতীদের সমস্ত পরিষেবা দেওয়া সত্ত্বেও প্রাতিষ্ঠানিক প্রসব না হলে আশা কর্মীদের প্রাপ্য অর্থ থেকে বঞ্চিত করা চলবে না।

৭) ধনিয়াখালির বাগনান প্রাথমিক স্বাস্থ্যকেন্দ্রের সার্বিক উন্নয়নের ব্যবস্থা করতে হবে।

স্বাস্থ্য পরিষেবার হাল ও এইসব দাবি নিয়ে দীর্ঘ আলোচনার সময়ে, সিএমওএইচ বলেন, আপনারা সঠিক দাবিগুলোই তুলে ধরেছেন। তিনি জানান, বর্তমানে হুগলি জেলায় ৬৭২টি উপস্বাস্থ্য কেন্দ্র আছে, আরো ১৬২টি চালু করা হবে। এই কেন্দ্রগুলোতে ডাক্তার থাকবেনা এটাই সরকারি নীতি। এখানে এএনএম (অক্সিলিয়ারি নার্স মিডওয়াইফ)-রাই পরিষেবা দেবেন। গর্ভবতীদের‌ জটিল অবস্থা হলে হাসপাতালে রেফার করবেন। তিনি আরও জানান,‌ হাসপাতালে ভর্তি না হলে স্বাস্থ্যসাথী কার্ড কার্যকরী হবেনা। তাছাড়া ‘জননী সুরক্ষা’, ‘মাতৃ বন্দনা’ যোজনা, ‘বাংলা মাতৃ প্রকল্প’ গত ফেব্রুয়ারি থেকে বন্ধ হয়ে গেছে।

ডেপুটেশনে প্রতিনিধিত্ব করেন‌ জেলা সম্পাদিকা‌ শিপ্রা চ্যাটার্জি ও চৈতালি সেন। সভা পরিচালনা করেন সভানেত্রী শোভা ব্যানার্জি ও সংগঠক অর্পিতা রায়।

আমরা বুঝলাম, সরকার একহাতে যখন সামান্য কিছু দিচ্ছে, তখন অন্য হাতে অনেক বেশি কেড়ে নিচ্ছে। কেন্দ্র ও রাজ্য উভয় সরকারের এটাই কৌশল। তাছাড়া জেলা প্রশাসনের হাতে কোনও ক্ষমতাই নেই, সুতরাং রাজ্যজুড়ে — অন্তত একসাথে কয়েকটি জেলায় — জোরালো আন্দোলন গড়ে তুলতে না পারলে প্রায় কোনও দাবিই আদায় করা যাবে না। তাই সে লক্ষ্যেই আমাদের এগোতে হবে এবং কলকাতার স্বাস্থ্যভবনে বড় ধরনের বিক্ষোভ সহ ডেপুটেশন দিতে হবে।

Year after year

স্বাধীনতার ৭৫’র দোড়গোড়ায় এসেও যেমন রাজনৈতিক বন্দীদের ধর্ষণ করা হয়, ঠিক তেমনি নারী ও শিশু সুরক্ষার নামে গড়ে ওঠা একের পর এক সরকারি-বেসরকারি হোমগুলিতে চলতে থাকে যৌন নিপীড়ন, শিশু পাচার এবং চিকিৎসার নামে মানসিক নির্যাতন। কিছু বছর আগেই লিলুয়ায় সরকারি হোম থেকে প্রাণ বাঁচিয়ে পালিয়ে গিয়েছিল এক তরুণী সেখানকার নির্যাতন নিপীড়ন সহ্য না করতে পেরে। এই ঘটনার পর জেলা প্রশাসন, সরকার সবাই ঢাকঢোল বাজিয়ে প্রচার করলেন সরকারি-বেসরকারি সমস্ত হোমগুলিতে এবার থেকে কড়া নিরাপত্তা এবং নজরদারি চলবে, কিন্তু বাস্তবে এই নজরদারি সাধারণ মানুষের নজরে আসেনি কোনোদিনই!!

গত সপ্তাহে এক ট্রাফিক গার্ডের নজরে আসে দুই নাবালিকাকে হাতে দড়ি বেঁধে হাওড়ার মালিপাঁচগড়া থানার অন্তর্গত বাবুডাঙ্গায় রাম ঢ্যাং রোডের একটি বেসরকারী হোমে নিয়ে যেতে। সাইনবোর্ডে লেখা আছে ‘করুণা উইমেন এ্যান্ড চাইল্ড ওয়েলফেয়ার সোসাইটি’। পুলিশ এবং মিডিয়া পৌঁছানোর পরে সাধারণ মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত চাপে সামগ্রিক ব্যাপারটা নজরে আসে প্রশাসনের। এলাকার শাসকদলের এক প্রভাবশালী নেতার পুত্রবধূর মালিকানাধীন এই বেসরকারি হোমটি মূলত অনাথ শিশু ও মানসিক ভারসাম্যহীন কিশোর-কিশোরীর এবং বয়স্কদের একটি আশ্রয়স্থল হিসেবে সালকিয়া-বাবুডাঙ্গায় গড়ে উঠেছে বেশ কিছু বছর ধরেই। কিন্তু বাস্তবে যখন পুলিশ সেখানে পৌঁছোয় তখন দেখা যায়, হাতে পায়ে শিকল বেঁধে মেঝেতে ফেলে রাখা হয়েছে একের পর এক রোগীকে। হোমের বাসিন্দারা পুলিশের কাছে জানায় যে দিনের পর দিন ধরে প্রশাসনিক এক কর্তার মদতে তাদের উপর লাগাতার যৌন নিপীড়ন এবং চিকিৎসার নামে নির্যাতন চলেছে। তাদের আরও অভিযোগ, বহু দুঃস্থ শিশু তাদের হোমে আসার পরে অজ্ঞাত কোনও ঠিকানায় তাদের পাঠিয়ে দেওয়া হয়। অনুমান করে নেওয়াই চলে শিশু পাচারকে কেন্দ্র করে একটি ব্যবসাও ফেঁদে বসেছিল এই হোম কর্তৃপক্ষ। অগত্যা মালিপাঁচঘড়া থানার পুলিশ ৯ জনকে গ্রেফতার করে যারমধ্যে এক প্রশাসনিক কর্তা সহ উপরোক্ত প্রভাবশালী নেতার পরিবারের সদস্যাও রয়েছেন।

২১ নভেম্বর আইসা হাওড়া জেলা কমিটির পক্ষ থেকে চারজনের এক অনুসন্ধানকারী দল গুগল ম্যাপের ভূয়ো লোকেশনের বাধা টপকিয়ে বিকেল চারটের সময় পৌঁছায় সেই বেসরকারি হোমে। স্থানীয়দের সাথে কথা বলে জানা যায় তার আগের দিন থেকে পুলিশ এই হোমটিকে সিল করে দিয়ে গিয়েছে। এখানকার বাকি আবাসিকদের পাঠানো হয়েছে বারাসাতে সরকারি হোমে। নির্যাতিত দুই শিশুকে আপাতত রাখা হয়েছে পুলিশী হেফাজতের সেফ হাউসে।

বেসরকারি হোমটির পাশেই রয়েছে সালকিয়া সবুজ সংঘ ক্লাব। সেখানকার বেশ কিছু যুবক ও স্থানীয়দের সাথে বেশ কিছুক্ষণ কথা হয় আইসার প্রতিনিধিদের। স্থানীয়রা জানান এতদিন ধরে তারা কোনও রকমের সন্দেহজনক ঘটনা লক্ষ্য করেননি এই হোমকে কেন্দ্র করে। যে দায়টা ছিল সরকারের, নারী ও শিশুকল্যাণ দপ্তরের নোডাল অফিসারদের, তারা দায়িত্ব পালন করতে সামগ্রিকভাবে ব্যর্থ। সালকিয়া হোমের এই ঘটনা কোনও বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। সরকারি-বেসরকারি রাজ্যের নানা দিকে গজিয়ে ওঠা হোমগুলিতে অনাথ ও দুঃস্থ শিশুদের, নাবালিকাদের সুরক্ষার নামে যে নিপীড়ন চালায় সেখানকার কর্তৃপক্ষ, সালকিয়ার এই চূড়ান্ত অমানবিকতার ঘটনা সেই বৃত্তের একটি অংশ। এভাবেই নীরবে-নিভৃতে কেঁদে কেঁদে গুমড়ে গুমড়ে শিশুদের জীবন এক বিভীষিকাতে পরিণত হচ্ছে প্রতিদিন। পাচার হয়ে যাওয়া কোনও নাবালিকাকে পুলিশ উদ্ধার করে নিয়ে এসে সরকারি হোমে রাখে, আর সেই সরকারি হোমে তাকে বারবার শিকার হতে হয় যৌন নিপীড়নের। এই ঘটনা ঘটছে সকলের সামনেই। খবরের পাতায় মাঝারি মাপের কিংবা ছোট হেডলাইনে প্রায়ই চোখে পড়ে আমাদের। কিন্তু তার প্রতিবাদে তার প্রতিরোধে আমরা মুখ খুলি কজন?

এখানে প্রদীপের নিচেই যে অন্ধকার, সেই অন্ধকারে আলো আনার দায়িত্ব আজ আমাদের নিতেই হবে, নাহলে একের পর এক আরও নাম না জানা শিশুরা, নাবালিকারা অচিরেই হারিয়ে যাবে।

তাই শুধুমাত্র ক্যাম্পাসের ভেতরে কিংবা শিক্ষার অধিকারের আন্দোলনে সীমিত থাকা নয়, সম্মানজনক জীবনযাপনের, অধিকার অর্জনের লড়াইয়ের শিক্ষাও দেয় আইসা।

সালকিয়া হোমের সমস্ত দোষীদের সর্বোচ্চ সাজা না হওয়া অবধি এবং সরকার কর্তৃক সরকারি-বেসরকারি প্রত্যেকটি হোম, মানসিক চিকিৎসা কেন্দ্রগুলিতে যথোপযুক্ত নিয়মিত নজরদারি ব্যবস্থা না হওয়া পর্যন্ত এ লড়াই চলবে। সালকিয়ায় আইসা হাওড়া জেলা কমিটির অনুসন্ধানকারী টিমে ছিলেন দেবমাল্য, স্নেহা, অমিতাভ ও অঙ্কিত।

agricultural laws

সংযুক্ত কিষাণ মোর্চার পক্ষে নরেন্দ্র মোদী সরকারকে হুঁশিয়ারি দেওয়া হয়েছিল — ২৬ নভেম্বর কৃষি আইন বিরোধী কিষাণ আন্দোলনের একবছর পূর্তি হবে; তার আগেই সরকারকে কৃষক স্বার্থের পরিপন্থী তিন কৃষি আইন বাতিল করতে হবে, অন্যথায় কিষাণ আন্দোলনকে আরও বিস্তৃত ও তীব্রতর করা হবে। সেই সময়সীমা পার হওয়ার এক সপ্তাহ আগেই ১৯ নভেম্বর নরেন্দ্র মোদী তিন কৃষি আইন প্রত্যাহারের সরকারি সিদ্ধান্তের কথা ঘোষণা করলেন। ঘোষণা করতে গিয়ে তিনি নিজেদের ভুল স্বীকার করলেন না, আইনের সদুদ্দেশ্য বুঝতে কৃষকদের অক্ষমতার দিকেই আঙুল তুলে বললেন “বোধহয় আমারই তপস্যায় কোথাও খামতি ছিল। তাই সবাইকে বোঝাতে পারিনি।” আর কয়েক মাসের মধ্যেই হতে চলা উত্তরপ্রদেশ বিধানসভা নির্বাচনে পরিস্থিতিকে বিজেপির অনুকূল করে তোলার লক্ষ্যেই যে মোদীর এই সিদ্ধান্ত তা নিয়ে বিশেষজ্ঞ ও ভাষ্যকাররা একরকম সহমত। কিষাণ আন্দোলনের জন্যই যে অন্যান্য রাজ্যের সঙ্গে উত্তরপ্রদেশেও বিজেপি কোণঠাসা হয়ে পড়েছে, যার পরিণামে মোদী নামক চরম ঔদ্ধত্যের প্রতিমূর্তিকেও মাথা নোয়াতে হল, বিজেপিপন্থীরাও তা অস্বীকার করতে পারছেন না। কিন্তু তিন কৃষি আইনের অন্তর্বস্তুতে কী এমন ছিল যা পুরো এক বছর ধরে নিরবচ্ছিন্ন আন্দোলনের পথে কৃষকদের অবিচল রাখল! সরকারের নামানো দমন পীড়ন ও কূটকৌশল আন্দোলনে চিড় ধরাতে পারল না! ভারতীয় কৃষির রূপান্তর ঘটাতে, কৃষক স্বার্থকে বিপর্যস্ত করে কৃষিকে কর্পোরেট কব্জায় তুলে দিতেই যে তিন কৃষি আইন বানানো হয়েছিল, আইন তৈরির সময়ই সেই অভিমতের প্রকাশ ঘটেছিল, এবং আইন প্রত্যাহারের আজকের এই লগ্নে সেই অভিমতের যথার্থতা প্রশ্নহীনভাবে প্রতিষ্ঠিত হল। আরও একবার আইনগুলোর দিকে ফিরে তাকানো যাক।

তিন আইনের একটা ছিল কৃষকের উৎপাদিত পণ্যের ব্যবসা-বাণিজ্যের উন্নয়ন সম্পর্কিত। উৎপাদিত পণ্যের বিক্রির জন্য সরকারি ব্যবস্থা হল মাণ্ডি — যেখানে কৃষকরা সরকার নির্ধারিত ন্যূনতম সহায়ক মূল্যে ফসল বিক্রি করতে পারেন এবং যা পরিচালিত হয় কৃষিপণ্য বাজার কমিটির (এপিএমসি) হাতে। নতুন এই আইনে নিজেদের পছন্দের স্থানে ফসল বিক্রির স্বাধীনতা কৃষকদের দেওয়া হয়েছে বলে সরকারের পক্ষে দাবি করা হল। অর্থাৎ, ভালো দাম পেলে মাণ্ডি এলাকার বাইরে, ভিন্ন রাজ্যেও কৃষকরা তাঁদের ফসল বিক্রি করতে পারবেন। আইনে আরও বিধান দেওয়া হল, ফসল বিক্রির ওপর কোনো ফী বা সেস কোনো রাজ্য সরকার আদায় করতে পারবে না, মাণ্ডিতে বিক্রির ক্ষেত্রে যেমনটা হয়ে থাকে। সরকারের পক্ষে আরও দাবি করা হল, এই আইন আমলাতন্ত্রের নিয়ন্ত্রণ থেকে (যেটা মাণ্ডিতে চলে) কৃষকদের মুক্তি দেবে এবং ফসল বিক্রির জন্য কৃষকদের কাছে যেহেতু একাধিক ক্রেতাই থাকবে, কৃষকরা তাই দর কষাকষি করে ফসলের জন্য ভালো দামই আদায় করতে পারবেন। কিন্তু এই আইনটা যে প্রশ্নের মুখে কৃষকদের দাঁড় করিয়েছিল তা হল — মাণ্ডির বাইরে বিক্রি করলে ফসলের কি দাম তাঁরা পাবেন? ন্যূনতম সহায়ক মূল্য বা এমএসপি’র বেশি না হলেও এমএসপি’র সমান দাম কি তাঁরা পাবেন? বাস্তব পরিস্থতি বলছে, তা কখনই হওয়ার নয়। কৃষকদের উৎপাদিত সমস্ত ফসল মাণ্ডিতে বিক্রয় হয় না, সরকার ২৩টা ফসলের এমএসপি নির্ধারিত করলেও সব ফসল কৃষকদের কাছ থেকে কেনে না, অনেক ফসলই কৃষকদের বাজারে বিক্রি করতে হয়। আর বাজারের দাম মাণ্ডিতে নির্ধারিত দামের চেয়ে বেশ কিছুটা কমই হয়। উদাহরণস্বরূপ, ভুট্টার জন্য সরকার নির্ধারিত এমএসপি যেখানে হল ১,৮৫০ টাকা, বাজারে ঐ ফসলই বিক্রি হয় ৮০০ থেকে ১,০০০ টাকায়। এই আইনের প্রকৃত উদ্দেশ্য অতএব ছিল এমএসপি ব্যবস্থাকেই তুলে দেওয়া (আইনটা তাই ‘এপিএমসি বাইপাস আইন’ নামেও পরিচিত) এবং শস্য সংগ্ৰহের দায় সরকারের কাঁধ থেকে ঝেড়ে ফেলা। এছাড়া, কৃষকের স্বাধীনতার কথা যেমন বলা হয়েছে, তেমনি কৃষি বাণিজ্যের সঙ্গে যুক্ত বড়-বড় কোম্পানির ক্রয়ের স্বাধীনতারও তো বিলোপ ঘটছে না। বড়-বড় কোম্পানির ক্ষমতার সঙ্গে কতটা পাল্লা দেওয়া কৃষকদের পক্ষে সম্ভব? এই আইন চালু হলে কৃষিপণ্যের বাজারের নিয়ন্ত্রণ বড় আকারের কর্পোরেট সংস্থাগুলোর কব্জাতেই থাকত এবং কৃষকদের সেই নিয়ন্ত্রণেরই অধীনস্থ হতে হত। কৃষি সংকটের মোকাবিলায়, কৃষকদের সুরাহা করার লক্ষ্যে যেখানে বিক্রয় মূল্যকে উৎপাদন খরচের দেড়গুণ করার প্রস্তাব করা হচ্ছে, এর বিপরীতে নরেন্দ্র মোদী সরকারের আইন এমএসপি ব্যবস্থাকেই তুলে দেওয়ার, কর্পোরেটদের কৃষি বাণিজ্যের অধীশ্বর করে তোলার দুরভিসন্ধিকেই প্রকট করেছে।

দ্বিতীয় যে কৃষি আইন নরেন্দ্র মোদী সরকার বানিয়েছিল সেটা ছিল কৃষিতে চুক্তিচাষ ও ফসলের মূল্য নিশ্চিতকরণ সম্পর্কিত। এই আইন স্পনসরদের (কৃষি বাণিজ্যের সংস্থা, খাদ্য প্রক্রিয়াকরণে যুক্ত সংস্থা, পাইকারি বিক্রেতা, রপ্তানিকারী, ইত্যাদি) সঙ্গে কৃষকদের চুক্তি ভিত্তিক চাষের পথ প্রশস্ত করেছিল। পূর্ব নির্ধারিত দামে স্পনসরের নির্দিষ্ট করা ফসল তার কাছে বিক্রিই ছিল চুক্তির মূল কথা। এই চুক্তিচাষের ক্ষেত্রে স্পনসররাই উৎপন্ন হতে চলা দ্রব্যের মান নির্দিষ্ট করে দিত। এই চুক্তির ফলে কৃষকরা বড় অর্থের ক্ষমতাসম্পন্ন ও রাজনৈতিক মদতপুষ্ট কোম্পানিগুলোর নিয়ন্ত্রণাধীনই হত। এছাড়া, চুক্তিবদ্ধ কৃষক স্পনসরের নির্দিষ্ট করে দেওয়া ফসল জোগাতে না পারলে কৃষকের কাছ থেকে ক্ষতিপূরণ আদায় করার অধিকার চুক্তি আইন স্পনসরদের দিয়েছিল। এবং ক্ষতিপূরণ অনাদায়ে কৃষকের জমি স্পনসরের হাতে দখল হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনাও একেবারে অভাবনীয় ছিল না। চুক্তিচাষ কৃষিতে প্রধান ধারা হয়ে উঠলে স্পনসর তথা কর্পোরেট সংস্থাদের মুনাফার লক্ষ্যই উৎপাদনীয় দ্রব্যকে নির্দিষ্ট করত এবং অর্থকরী ফসলের চাষ প্রাধান্য লাভ করায় এফসিআই ও নাফেড’এর ভূমিকা গুরুত্বহীন হয়ে পড়ে খাদ্য নিরাপত্তা বিপন্ন হয়ে পড়ার সম্ভাবনাকেও উড়িয়ে দেওয়ার ছিল না।

তৃতীয় কৃষি আইনটা ছিল অত্যাবশ্যকীয় পণ্যের মজুতদারি সংক্রান্ত, যার পোশাকি নাম অত্যাবশ্যকীয় পণ্য (সংশোধনী) আইন। অত্যাবশ্যকীয় পণ্য আইন তৈরি হয়েছিল ১৯৫৫ সালে, মজুতদারি রোখাই আইনটার উদ্দেশ্য হওয়ায় অত্যাবশ্যকীয় পণ্যের মজুতে একটা মাত্রা বেঁধে দেওয়া হয়েছিল। সেই নিয়ন্ত্রণকে পরিহার করতে, অত্যাবশ্যকীয় পণ্যের মজুতদারিকে ঢালাও করতে মোদী সরকার ঐ আইনে সংশোধনী এনে অত্যাবশ্যকীয় পণ্যের তালিকা থেকে খাদ্যশস্য, ডাল, আলু, পিঁয়াজ, তৈলবীজ, ভোজ্যতেল ও আরো কিছু দ্রব্যকে বাদ দিয়ে দিল। অত্যাবশ্যকীয় পণ্যের মজুতকে অবাধ করার এই অনুমোদনে যেমন কালোবাজারি, খাদ্যদ্রব্যের কৃত্রিম সংকট তৈরির সুযোগ সৃষ্টি হত, তেমনি অবাধ মজুতের অধিকার কৃষকদের ওপর চাপ সৃষ্টির, কৃষকদের উৎপাদিত পণ্যের মূল্যকে কমানোর সম্ভাবনাও সৃষ্টি করত। যুদ্ধ বা দুর্ভিক্ষর মতো পরিস্থিতিতে ঐ ধরনের মজুতদারি নিষিদ্ধ হওয়ার কথা আইনে বলা হলেও তার সম্ভাবনা একেবারেই ক্ষীণ ছিল এবং মজুতদারি নিয়ম হয়ে ওঠাটাই বাস্তবে দেখা দিত। আর বড়-বড় কর্পোরেট সংস্থা ছাড়া এই বিপুল পরিমাণ মজুতদারি আর কাদের পক্ষেই বা সম্ভব হত!

কৃষিক্ষেত্রে কর্পোরেট অনুপ্রবেশকে অবাধ করা, বেসরকারি বিনিয়োগের রাস্তা প্রশস্ত করা, এইক্ষেত্রে সরকারের দায়, বিশেষভাবে খাদ্যশস্য সংগ্ৰহের দায়িত্বকে ঝেড়ে ফেলার অভিপ্রায়ই যে তিনটে কৃষি আইন তৈরির পিছনে কাজ করেছিল তা নিয়ে এখন আর প্রশ্নের কোনো অবকাশ নেই। কৃষককে ‘স্বাধীনতা’ দেওয়ার নামে তাদের কর্পোরেটদের বশ্য করে তোলার বন্দোবস্তই যে আইনগুলোর মধ্যে দিয়ে হয়েছিল তাও একেবারেই পরিষ্কার। কৃষকদের সহজাত চেতনায় এটা অনায়াসেই ধরা পড়েছিল, যেমনটা ফুটে উঠেছে বিবিসি’কে দেওয়া সাক্ষাৎকারে পাঞ্জাবের কৃষক সুখদেব সিং কোকরির মন্তব্যে “এটা (আইনগুলো) ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক কৃষকদের কাছে মৃত্যু পরোয়ানা। এর লক্ষ্য বড়-বড় কর্পোরেটদের হাতে কৃষি ও বাজারকে তুলে দিয়ে কৃষকদের ধ্বংস করা। ওরা আমাদের জমি ছিনিয়ে নিতে চায়। আমরা কিন্তু ওদের এটা করতে দেবো না”। কর্পোরেট সংস্থাগুলো, বিশেষভাবে মোদী ঘনিষ্ঠ এক শিল্পপতি যে মোদী জমানার মধ্যে কৃষিক্ষেত্রে আধিপত্য বিস্তারের সুযোগ খুঁজে পাচ্ছিল তা একটা উদাহরণ থেকেই স্পষ্ট হয়। গৌতম আদানি ২০০৫ থেকে ২০১৪ সালের মধ্যে কৃষি বাণিজ্যের কোম্পানি তৈরি করেছিলেন মাত্র দুটো। কিন্তু ২০১৪ থেকে ২০১৯ সালের মধ্যে, মোদী ক্ষমতায় বসার মাত্র ছ’বছরে ঐ ধরনের কোম্পানি তিনি তৈরি করেন একেবারে ২৯টা! মোদী জমানা যে জনস্বার্থের বিপরীতে কর্পোরেট স্বার্থের একনিষ্ঠ পৃষ্ঠপোষক ও কর্পোরেট আধিপত্যের প্রতিভু তা সাধারণ মানুষের কাছে জলজ্যান্ত বাস্তব।

কৃষি আইনগুলো প্রত্যাহারের কথা ঘোষণা করে কৃষকদের কাছে আর্জি জানিয়ে মোদী বলেছিলেন, “আন্দোলনরত সমস্ত কৃষকের কাছে আমি অনুরোধ জানাচ্ছি, পরিবারের কাছে এবং গ্ৰামে ফিরে যান এবং আসুন আমরা নতুন করে শুরু করি।” কিন্তু মোদীর এই আহ্বানে সাড়া না দিয়ে কৃষকরা এখনও ধর্ণা চালিয়ে যাচ্ছেন। তাঁরা বলছেন, আগে নির্দিষ্ট প্রক্রিয়া অনুসরণ করে সংসদে কৃষি আইনগুলোর প্রত্যাহার সম্পন্ন হোক, তারপর তাঁরা আন্দোলন ছেড়ে বাড়ি যাওয়ার কথা ভাববেন। মোদী কৃষক নেতাদের ‘আন্দোলনজীবী’ বলে কটাক্ষ করেছিলেন। কিন্তু কৃষকদের আন্দোলন গণতন্ত্রের রক্ষায় মহান অবলম্বন বলেই প্রতিপন্ন হল। আন্দোলনের এই অদম্য উৎসাহকে হাজারো কুর্নিশ। কৃষক আন্দোলনের এই বিজয় অবশ্যই ঐতিহাসিক, ফ্যাসিবাদের প্রতি এক বড় ধাক্কা এবং ফ্যাসিবাদ-বিরোধী আন্দোলনে গণতান্ত্রিক শক্তিগুলোর কাছে এক উদ্দীপনাময় অনুপ্রেরণা।

- জয়দীপ মিত্র

Petrol and diesel are now the 'profit'

একটা সময় ছিল যখন, পেট্রলের দাম প্রশাসনিক স্তরে নির্ধারিত হত, সরকার ভর্তুকি দিত দাম নির্দিষ্ট স্তরে বেঁধে রাখতে। প্রশাসনিক মূল্য বাড়লে মানুষজন রাস্তায় নামত, প্রতিবাদ করত। নয়া উদারনীতির প্রবক্তা মনমোহন সিং’এর দ্বিতীয় দফার প্রধানমন্ত্রীত্বে ২০১০ সালে পেট্রলের মূল্যের উপর প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ বাতিল করা হয়। তার সময়কালেই ডিজেলের দামও আন্তর্জাতিক বাজারদরের সঙ্গে মিলিয়ে নিতে বিনিয়ন্ত্রণ শুরু হয় জানুয়ারি ২০১৩ থেকে। পরে বর্তমান এনডিএ সরকার ক্ষমতায় এসে ডিজেলকে ২০১৪ সালেই বিনিয়ন্ত্রিত করে। ডিজেলের দাম একধাক্কায় সাড়ে তিন টাকার মতো কমে যায়। ফলে সেই একধাক্কায় বিনিয়ন্ত্রণের জয়জয়কার পড়ে যায়। এখন সেই বিনিয়ন্ত্রণের ধাক্কা চলছে। ভর্তুকি এখন পাপ শব্দ। এই সরকার আরো বড় বেনিয়া। বলা হয়েছিল পেট্রল-ডিজেলের দাম আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম কমলে কমবে, বাড়লে বাড়বে। অর্ধসত্যবাদী মোদীজী বাড়লে বাড়বে বজায় রাখলেও কমলে কমবেকে পাত্তা দেননি। আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম কমলে তিনি সেস, বিশেষ ডিউটি বসিয়ে তেলের দাম স্থির রাখেন। যখন তা বাড়ে তখন তাঁর সরকার ও পারিষদ টিভি চ্যানেল বলতে থাকে যে আন্তর্জাতিক বাজারে দাম বাড়ছে তো সরকার কী করবে?

যখন মোদীজীর ‘অচ্ছে দিন’এর সরকার ক্ষমতায় আসে তখন পেট্রলের উপর এক্সাইজ ডিউটি ছিল লিটার প্রতি ৯.৪৮ টাকা ও ডিজেলের উপর ৩.৫৬ টাকা। ২০১৪’র মে মাসে আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম ছিল ১০৭ ডলার প্রতি ব্যারেল। জুন মাসের পর থেকে যখন দাম কমতে থাকে ও ২০১৬’র জানুয়ারিতে দাম কমে ২৮ ডলার প্রতি ব্যারেলে নেমে আসে, সেই সময়ে ২০১৪’র নভেম্বর থেকে ২০১৬’র জানুয়ারি মাস পর্যন্ত ১৫ মাসে মোদী সরকার পেট্রলের উপর ৯ দফায় এক্সাইজ ডিউটি বাড়িয়ে দেয়। সব মিলিয়ে ওই ১৫ মাসে পেট্রলের উপর এক্সাইজ ডিউটি বাড়ে ১১.৭৭ টাকা, এবং ডিজেলের উপর ১৩.৪৭ টাকা। ২০১৭’র অক্টোবরে এক্সাইজ ডিউটি ২ টাকা কমানো হয়, ১ বছর বাদে আবার মোদী দয়াপরবশ হয়ে ১.৫০ টাকা ডিউটি কমান। ২০১৯’র জুলাইয়ে ডিউটি বাড়ানো হয় ২ টাকা করে প্রতি লিটারে; ২০২০’র মার্চে ৩ টাকা করে প্রতি লিটারে। কোভিড অতিমারীতে যখন বিশ্ববাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম তলানিতে ঠেকছে তখন পেট্রলের উপর এক্সাইজ ডিউটি বাড়ানো হয় ১০ টাকা প্রতি লিটার ও ডিজেলের উপর ১৩ টাকা প্রতি লিটার। ফলে পেট্রলের উপর এক্সাইজ ডিউটি দাঁড়িয়েছিল ৩২.৯০ টাকা প্রতি লিটার যা মোদী সরকারের ক্ষমতায় আসার সময়কালের থেকে প্রায় সাড়ে তিনগুণ। ডিজেলের ক্ষেত্রে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছিল ৩১.৮০ টাকা প্রতি লিটার, প্রায় ৮ গুণ। সাধারণভাবে কেন্দ্রীয় সরকারের চাপানো শুল্ককে এক্সাইজ ডিউটি বা উৎপাদন শুল্ক হিসেবে অভিহিত করা হয়। কিন্তু ওই শুল্ক ৪ ভাগে বিভক্ত। মূল এক্সাইজ ডিউটি, বিশেষ অতিরিক্ত এক্সাইজ ডিউটি, রাস্তা ও পরিকাঠামো সেস, কৃষি পরিকাঠামো ও উন্নয়ন সেস। ৩ নভেম্বর ‘দিওয়ালি তোফা’ ঘোষণার আগে মূল এক্সাইজ ডিউটি ছিল পেট্রলে ১.৪০ টাকা, ডিজেলে ১.৮০ টাকা। বিশেষ অতিরিক্ত এক্সাইজ ডিউটি ছিল যথাক্রমে ১১ টাকা ও ৮ টাকা, রাস্তা ও পরিকাঠামো সেস ছিল যথাক্রমে ১৮ টাকা প্রতি লিটার। কৃষি পরিকাঠামো ও উন্নয়ন সেস ছিল যথাক্রমে ২.৫০ টাকা ও ৪ টাকা প্রতি লিটার। মোট যথাক্রমে ৩২.৯০ টাকা ও ৩১.৮০ টাকা প্রতি লিটার। ২০১৭’র অক্টোবরে পেট্রল ও ডিজেলের উপরে মূল এক্সাইজ ডিউটি লিটার প্রতি ২ টাকা কমানোর আগে, ছিল যথাক্রমে ৯.৪৮ টাকা ও ১১.৩৩ টাকা প্রতি লিটার। পরে ২০১৮ সালের অক্টোবরে মূল এক্সাইজ ডিউটি প্রতি লিটারে ১.৫০ টাকা করে কমানো হয়। পরে বিশেষ এক্সাইজ ডিউটি বাড়নো হতে থাকে, মূল এক্সাইজ ডিউটি কমানো হয়। এই কমানোর পাশাপাশি বিভিন্ন সময়ে রাস্তা ও পরিকাঠামো সেস, কৃষি পরিকাঠামো ও উন্নয়ন সেস বসানো ও বাড়ানো হতে থাকে। ২০২১ সালের বাজেটে পেট্রল ও ডিজেলের উপর কৃষি পরিকাঠামো ও উন্নয়ন সেস বসানো হয়, একইসাথে এক্সাইজ ডিউটি কমানো হয় যথাক্রমে ২.৫০ টাকা ও ৪ টাকা প্রতি লিটার।

১৬ নভেম্বর, ইন্ডিয়ান অয়েলের ওয়েবসাইটের তথ্য অনুযায়ী পেট্রলের মূল দাম (বেস প্রাইস) ছিল মোটামুটি ৪৮ টাকা প্রতি লিটার, ডিজেলের ৪৯ টাকা। এটি দিল্লীর জন্য প্রদত্ত হলেও তা কলকাতার জন্য প্রায় এক। এরসঙ্গে আমরা বিভিন্ন বিষয় জুড়ে যদি কেন্দ্রীয় ও রাজ্য সরকারের তহবিলের হিসেব করা যায়, তাহলে দেখা যাবে কেবল আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম বাড়লে বা কমলে কীভাবে কেন্দ্রীয় ও রাজ্য সরকার তাদের তহবিলে টাকা ঢোকাচ্ছে। মূল এক্সাইজ ডিউটির থেকে প্রাপ্ত অর্থের ৪১% কেন্দ্রের তরফে রাজ্যকে দিতে হয় অর্থ কমিশনের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী। তাই কেন্দ্র ওই এক্সাইজ ডিউটি ক্রমাগত কমিয়েছে। কমাতে কমাতে এমন জায়গায় এনেছে যে আর কমানোর অবকাশ নেই বললেই চলে। বর্তমানে লিটারে তা পেট্রল ও ডিজেলের উপর যথাক্রমে ১.৪০ টাকা ও ১.৮০ টাকা। যা ইউপিএ সরকারের আমলে ছিল যথাক্রমে ৯.৪৮ টাকা ও ৩.৫৬ টাকা। অন্যদিকে অন্যান্য সেস ও কর বসিয়ে কেন্দ্র যথাক্রমে লিটার পিছু ৩১.৫০ ও ৩০.০০ টাকা আদায় করত সাম্প্রতিক ডিউটি কমানোর আগে।

যদি ভিত্তিমূল্যকে ৪৮ টাকা স্থির ধরে ২০১৪ সালের করের নিরিখে হিসেব করা যায়, তাহলে পেট্রলের লিটারপিছু কেন্দ্রের আয় দাঁড়াত ৫.৬০ টাকা ও রাজ্যের লিটার পিছু ২৩.৪০ টাকা। এক্সাইজ ডিউটি কমানোর অব্যবহিত আগে ওই ভিত্তিমূল্যই ছিল এবং সেইস্তরে কেন্দ্রের আয় দাঁড়িয়েছিল লিটারপিছু যথাক্রমে ৩২.৩০ টাকা ও রাজ্যের ২৬.১০ টাকা। কমানোর পরে তা দাঁড়িয়েছে যথাক্রমে ২৭.৩০ টাকা ও ২৪.৬০ টাকা।

ডিজেলের ক্ষেত্রে ভিত্তিমূল্য বর্তমান হারে ধরে হিসেব কষলে ইউপিএ’র সময়কালের হারে রাজ্যের আয় হত লিটার পিছু ১৩.২০ টাকা, নভেম্বরে শুল্ক কমানোর আগে ১৬.৭০ টাকা ও পরে ১৪.৮০ টাকা। কেন্দ্রীয় সরকারের আয় হত যথাক্রমে ৫.৬০ টাকা, ৩২.৩০ টাকা ও ২৭.৩০ টাকা।

এইসব হিসেব নিকেশ থেকে কী জানা যাচ্ছে? যদি আন্তর্জাতিক বাজারের দাম ধরে পেট্রলের দাম নির্ধারিত হত ও কেন্দ্রীয় সরকার লিটার প্রতি শুল্ক একই রাখতেন, যা তারা সরকারে আসার সময় ছিল, তাহলে পেট্রলের উপর কর থেকে কেন্দ্রীয় সরকারের আয় বর্তমানের (শুল্ক কমার পরে) ২৭.৩০ টাকার তুলনায় ২১.৭০ টাকা কম হত প্রতি লিটারে, রাজ্য (পশ্চিমবঙ্গ) সরকারের আয় কম হত ২৪.৬০ টাকা প্রতি লিটারের তুলনায় ১.২০ টাকা। ডিজেলের ক্ষেত্রে মোদীজীর আয় কমত প্রতি লিটারে ১৯.০০ টাকা, বর্তমান ২১.১০ টাকার তুলনায় আয় হত ২.১০ টাকা; আর পশ্চিমবঙ্গ সরকারের ক্ষেত্রে তা বর্তমান ১৫.৭০ টাকার তুলনায় ২.১০ টাকা কম হয়ে ১৩.৬০ টাকা হত। সামগ্রিকে কেবল কর বাড়নোর ফলে পেট্রলের দাম বর্তমানে ২২.৩০ টাকা ও ডিজেলের দাম ২০.৯০ টাকা বেশি হয়ে রয়েছে, মোদী সরকার শুল্ক কমানোর পরেও। শুল্ক কমানোর আগে ওই বর্ধিত দাম ছিল পেট্রলে লিটার পিছু ২৯.৪০ টাকা ও ডিজেলে লিটার পিছু ৩২.৯০ টাকা। যে সরকার বলেছিল বাজারদরের সঙ্গে তাল মিলিয়ে পেট্রল ডিজেলের দাম ওঠানামা করবে, সেই সরকার যদি তা না মেনে চলে তাহলে সেটি মিথ্যাবাদী হিসেবে পরিগণিত হয়, মোদী সরকার সেই দোষে দোষী।

petrol-0পেট্রল ডিজেলের দাম বৃদ্ধির ফল রাজ্য সরকার স্বয়ংক্রিয়ভাবেই ভোগ করে। কারণ রাজ্যের ভ্যাট বা বিক্রয় কর ওই বিক্রয়কর পূর্ববর্তী মূল্যের উপর নির্ভর করে। সাধারণভাবে তা পেট্রলের ক্ষেত্রে ৩০.০ শতাংশ ও ডিজেলের ক্ষেত্রে ২০.৪ শতাংশ। ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে দাম বাড়লে পেট্রলের ভিত্তিমূল্য বাড়ে, ফলে সেই অনুপাতে রাজ্য সরকারের লিটার পিছু কর বাড়ে। কেন্দ্রের অবশ্য তেমনটা ঘটেনা। কেন্দ্রের কর নির্ধারিত হয় লিটার পিছু। তবে অন্যদিকে আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম কমলে কেন্দ্রীয় সরকারের কর আয় কমে না, রাজ্যের কমার কথা। চমৎকারটা হচ্ছে আন্তর্জাতিক বাজারে দাম কমলে কেন্দ্রীয় সরকার এখন কর বাড়িয়ে দিয়ে করপরবর্তী ভিত্তিমূল্যকে প্রায় একজায়গায় রেখেছে, ফলে রাজ্যের কর আয় কমেনি। কিন্তু আন্তর্জাতিক বাজারে দাম বাড়ার পরে সেই বাড়তি শুল্ক বজায় রাখায় করপরবর্তী ভিত্তি দাম বেড়েছে ও রাজ্য সরকার বেশি কর পেয়েছে। তদর্থে কেন্দ্র ও রাজ্য উভয় সরকারই জনগণের কাছ থেকে অধিক অর্থ আদায় করেছে। তবে বিশ্লেষণ ও তালিকা অনুযায়ী কেন্দ্রীয় সরকার করের মাধ্যমে প্রভূত অর্থ নিজের তহবিলে ঢুকিয়েছে, রাজ্য সরকার সেই তুলনায় কম ‘মুনাফা’ করেছে।

- অমিত দাশগুপ্ত

Gadchiroli's murder

১৩ নভেম্বর ২৬ জন ‘মাওবাদী’ অত্যাধুনিক নিরাপত্তা বাহিনী সি-৬০’র সাথে ‘সংঘর্ষে’ নিহত হন। সংবাদের দুনিয়ায় খবরে প্রকাশ, ‘সংঘর্ষ’ হয়েছিল গড়চিরোলি জেলার মার্দিনোতোলা জঙ্গলে যা ছত্তিসগড়ের রাজনন্দনগাঁও জেলার লাগোয়া। ঘটনাস্থল নিয়ে দ্বিমত আছে। নিরাপত্তা বাহিনীর উচ্চকর্তা বলেছেন ‘বিভিন্ন জায়গায়’ (‘মাল্টিপল্ লোকেশানস’) এঁরা নিহত হয়েছেন। ২৬ জনের মধ্যে ১৬ জন ‘সন্দেহভাজন মাওবাদী’ (‘সাসপেক্টেড মাওয়িস্ট’), ১০ জনের পরিচিতি অজানা। সুতরাং এঁদেরকে নিশ্চিত ভাবে মাওবাদী বলা যাচ্ছে না। ‘সংঘর্ষ’ কীভাবে হল? একটা মত হচ্ছে, রুটিন চিরুনি তল্লাশি চলছিল, হঠাৎ জঙ্গিরা বাহিনীর ওপর গুলি চালাতে শুরু করে। আরেকটা মত হচ্ছে, খবর ছিল গভীর দুর্গম জঙ্গলে মাওবাদীদের একটা সামরিক ক্যাম্প চলছে যেখানে তাদের দলের কেন্দ্রীয় কমিটির নেতাদের থাকার সম্ভাবনা আছে। আধা-সামরিক বাহিনী সেই অঞ্চল ঘিরে ফেলাতে তাদের ওপর আক্রমণ হয়। অর্থাৎ যা সব সময় বলা হয়ে থাকে, বাহিনী আত্মরক্ষার্থে গুলি চালিয়েছে। প্রমাণ করার চেষ্টা যে এটা ভুয়ো সংঘর্ষ নয়। বলা হচ্ছে প্রচুর অস্ত্রশস্ত্র পাওয়া গেছে, ছবিও ছাপানো হয়েছে, যদিও প্রশ্ন ওঠে সেগুলো যে নিহতদের থেকেই পাওয়া গেছে তার কী প্রমাণ আছে?

এতো সব প্রশ্ন উঠছে কারণ অতীতে এরকম ঘটনা ঘটেছে যেখানে তথাকথিত মাওবাদীদের ওপর বড়সড় অপারেশনের পর নিরাপত্তা বাহিনী উল্লাস করেছে, নেতা-মন্ত্রীরা একে অপরের পিঠ চাপড়িয়েছে, তারপর তদন্তে দেখা গেছে যে যাঁরা নিহত হয়েছেন তাঁরা ছিলেন সাধারণ গ্রামবাসী। ২০১২ সালে ২৭-২৮ জুন ছত্তিসগড়ে একটি ঘটনায় ৩ জন শিশু সহ ১৭ জন মারা যান। প্রায় একবছর বাদে ১৭-১৮ মে, ২০১৩-তে আরেকটি ঘটনায় ৮ জন মারা যান। দুটি ঘটনা নিয়ে এতো হৈচৈ হয় যে দাপুটে রমণ সিংয়ের বিজেপি সরকারও তদন্ত কমিশন গঠন করতে বাধ্য হয়। ২০১৯এ কংগ্রেস সরকার রাজ্যে ক্ষমতায় আসার পর এই দুটি রিপোর্ট প্রকাশিত হয়। তদন্তে প্রমাণিত হয় যে নিহতরা কেউ মাওবাদী ছিলেন না, সবাই ছিলেন সাধারণ গ্রামবাসী। কিন্তু আজ অবধি নিহতদের পরিবার কোনও ক্ষতিপূরণ পাননি এবং যাদের হাতে এতোগুলো মানুষ বেঘোরে প্রাণ হারালেন সেই দোষী অফিসারদের কোনও শাস্তি হয়নি।

২০১৮ সালের ২২ এপ্রিল এই গড়চিরোলি জেলায় একটি তথাকথিত সংঘর্ষ হয় এবং নিরাপত্তা বাহিনী সি-৬০ দাবি করে ১৬ জন মাওবাদী নিহত; কয়েকদিনের মধ্যে তারা দাবি করে যে আরও ২৪টি দেহ পাওয়া গেছে এবং মোট মৃতের সংখ্যা অন্তত ৪০। তিনটি মানবাধিকার সংগঠন, ‘কো-অর্ডিনেশন অফ ডেমোক্রেটিক রাইটস অর্গানাইজেশন’ (সিডিআরও), ‘ইন্ডিয়ান এ্যাসোসিয়েশন অফ পিপলস লইয়ার্স’ (আইএপিএল), ‘উইমেন এগেন্সট স্টেট রিপ্রেশন এন্ড সেক্স্যুয়াল ভায়োলেন্স’ (ডব্লিউএসএস) ঐ ঘটনার ওপর তথ্যানুসন্ধান করে একটি রিপোর্ট পেশ করে ‘ম্যাসাকারস্ মাস্কড্ এজ এনকাউন্টারস্ঃ দ্য নিউ স্টেট পলিসি ফর ডেভেলপমেন্ট ইন গড়চিরোলি’। ঐ রিপোর্টে লিখছে সি-৬০ বাহিনী এবং সিআরপিএফ চারিদিক থেকে মাওবাদীদের ঘিরে ফেলে এবং হত্যা করার উদ্দেশ্য নিয়ে অত্যাধুনিক ‘আন্ডার ব্যারেল গ্রেনেড লঞ্চার্স’ (ইউবিজিএল) থেকে এলোপাথাড়ি গুলি চালায়। রিপোর্ট পরিস্কার জানায় যে সেটা ছিল ঠাণ্ডা মাথায় খুন (নিউজক্লিক, ৮ মে ২০১৮)। বিস্ময় প্রকাশ করা হয় যে এতোবড়ো একটি ‘সংঘর্ষে’ বাহিনীর কেউ আহতও হয়নি! ঘটনাস্থল বা নিহতদের কোনও ছবি পাওয়া যায়নি (তাৎপর্যপূর্ণ ভাবে ১৩ নভেম্বরের মৃতদেরও কোনও ছবি কোথাও দেখা যায়নি)। তথ্যানুসন্ধান দলটিকে গ্রামবাসীদের সাথে কথা বলতে দেওয়া হয়নি; নিরাপত্তা বাহিনী তাঁদের সর্বত্র অনুসরণ করেছে। নিহতদের কয়েকজনের শরীরে গুলির চিহ্ন পাওয়া যায়নি, কিন্তু অন্য ক্ষত পাওয়া গেছে, যার থেকে সন্দেহ হয় যে তাঁরা পুলিশী টর্চারের শিকার।

আসলে গড়চিরোলি জেলা বহুদিন ধরেই মাইনিংয়ের লীলাক্ষেত্র হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিস্তীর্ণ অঞ্চলের জমি থেকে আদিবাসীদের উচ্ছেদ করে মাইনিং কোম্পানিগুলির হাতে তুলে দেওয়া হচ্ছে। এই কোম্পানিগুলিকে নিরাপত্তা দেওয়ার জন্য বিশাল বাহিনী মোতায়েন করা হয়েছে। আদিবাসীরা প্রতিবাদ করছেন এবং প্রতিবাদ করলেই তাঁদের ‘মাওবাদী’ বলে দেগে দেওয়া হচ্ছে। বিনা কারণে সাধারণ মানুষকে হেনস্থা করা হয়, শুধুমাত্র ‘মাওবাদী’ সন্দেহে তাঁদের গ্রেপ্তার করা হয় ও মাসের পর মাস কারাগারে ফেলে রাখা হয়। তাই ঐ তথ্যানুসন্ধান দল মনে করে এই ধরণের হত্যাকান্ডগুলি কোনও বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়।

এই প্রসঙ্গে ভীমা কোরেগাঁও মামলায় গ্রেপ্তার মহেশ রাউতের কথা উল্লেখ করতে হয়। মাত্র ৩৩ বছরের এই তরুণ ‘টাটা ইন্সটিটিউট অফ সোশ্যাল সায়েন্স’ এর প্রাক্তনী ও ‘প্রাইম মিনিস্টার রুরাল ডেভেলপমেন্ট’এর ফেলো ছিলেন। তিনি ঐ অঞ্চলে জমি অধিগ্রহণের বিরুদ্ধে মানুষকে সংগঠিত করতেন, তেন্ডুপাতার ভালো দাম পাওয়ার জন্য আদিবাসীদের হয়ে সওয়াল করতেন। ব্যস, শাসকের চোখে তিনি হয়ে গেলেন ‘মাওবাদী’! তিনি গ্রেপ্তার হওয়ার পর জেলার প্রায় ৩০০টি গ্রামসভা তাঁর মুক্তির দাবি জানিয়ে প্রস্তাব নেয়। উক্ত রিপোর্ট থেকে জানা যায় বেশ কয়েক বছর ধরেই মানবাধিকার কর্মী বা সমাজকর্মীরা জমি অধিগ্রহণ, পুলিশী অত্যাচার, ভুয়ো সংঘর্ষ ইত্যাদির বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করলেই তাঁদের নানা মামলায় ফাঁসিয়ে দেওয়া হয়, গ্রেপ্তার করা হয়; আর এখন তো লাগামছাড়া ভাবে ইউএপিএ প্রয়োগ করা হয়। মাইনিং কোম্পানিগুলোর সুবিধা করে দেওয়ার জন্য রাষ্ট্র এখানে চরম দমনমূলক পদক্ষেপ নিতেও দ্বিধা করেনা। সন্ত্রাস এখন এমন পর্যায়ে যে কোনও মানবাধিকার গোষ্ঠিকে সেখানে গিয়ে তদন্ত করতেও দেওয়া হবেনা। যারাই যাবে তাঁদের ‘মাওবাদী সংগঠন’ বলে ছাপ্পা মেরে দেওয়া হবে। ২০০৬ সালের ‘জাতীয় অরণ্য আইন’ আদিবাসীদের জমির অধিকার প্রদান করেছে, কিন্তু ঝাড়খণ্ড, ছত্তিসগড়ের মতো গড়চিরোলির বহু আদিবাসী মানুষ পাট্টা পাননি। ‘পেসা’ (পঞ্চায়েত এক্সটেনশন টু শিডিউল্ড এরিয়াস অ্যাক্ট) ১৯৯৬ সংশোধন করার চেষ্টা হচ্ছে যাতে গ্রামসভা না করেই জমি অধিগ্রহণ করা যায়। কর্পোরেট মাইনিং কোম্পানিদের জমি লুঠ এবং তার বিরুদ্ধে গ্রামবাসীদের প্রতিরোধ এটাই হচ্ছে এইসব হত্যাকান্ডের মধ্যে নিহিত মূল কাহিনী।

- সোমনাথ গুহ

Fyodor Dostoevsky

বিশ্বসাহিত্যের সর্বকালের অন্যতম শ্রেষ্ঠ কথাকার দস্তয়েভস্কির (১৮২১-১৮৮১) ২০০ বছর পূর্ণ হল। যাঁরা সাহিত্য পড়তে ভালোবাসেন, ইতিহাস, সমাজতত্ত্ব, রাজনীতিতে যাঁদের আগ্রহ আছে, তাঁরা অনেকেই নিয়মিতভাবে দস্তয়েভস্কির রচনাবলীতে অবগাহন করেন। প্রতিটি পাঠে খুঁজে পান চিন্তার নতুন নতুন দিক।

দস্তয়েভস্কির বিখ্যাত উপন্যাসগুলি — যারমধ্যে আছে ‘নোটস ফ্রম আন্ডারগ্রাউন্ড’ (১৮৬৪), ‘ইডিয়ট’ (১৮৬৯), ‘ডেভিলস্’ (১৮৭২), ‘ব্রাদার্স কারমাজোভ’ (১৮৮০) — সারা বিশ্বজুড়ে একইসঙ্গে সাধারণ পাঠক আর নোবেলজয়ী কথাকারবর্গ সবাইকে গত দেড়শ বছর ধরে মাতিয়ে রেখেছে। তাঁর সবচেয়ে বিখ্যাত উপন্যাস ‘ক্রাইম অ্যান্ড পানিশমেন্ট’কে (১৮৬৬) অনেক সাহিত্য সমালোচকই পৃথিবীর সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ উপন্যাসের মর্যাদা দিয়ে থাকেন।

১৮৪৮’র ইউরোপ জোড়া বিপ্লবের ঢেউ যখন রাশিয়ায় এসে পৌঁছোয়, তখন অন্যান্য অনেকের মতো তা স্পর্শ করেছিল সাতাশ বছরের তরুণ দস্তয়েভস্কিকেও। এর তিনবছর আগে, মাত্র চব্বিশেই দস্তয়েভস্কির প্রথম প্রকাশিত উপন্যাস ‘পুওর পিপল’ প্রকাশের পরেই সাড়া ফেলেছিল। সেই সময়কার বিখ্যাত সমালোচক বেলিনস্কি, তরুণ প্রগতিশীল ও পশ্চিমী মনোভাবাপন্ন লোকেদের মধ্যে যার খ্যাতি তখন তুঙ্গস্পর্শী — দস্তয়েভস্কির এই উপন্যাসটির ভূয়সী প্রশংসা করেন। এই উপন্যাসটির সূত্র ধরেই তরুণ দস্তয়েভস্কির খ্যাতি ছড়িয়ে পড়ে। দস্তয়েভস্কি ১৮৪৮’র আলোড়ন তোলা সময়ে রুশ বিপ্লবী মিখাইল পেট্রাশেভস্কি চক্রের সঙ্গে জড়িয়ে পড়েন ও পেট্রাশেভস্কিকে ঘিরে বিপ্লবীদের যে আলোচনাচক্র বসত সেখানে নিয়মিত যাতায়াত শুরু করেন। সেখানে আলোচনা হত ভূমিদাসপ্রথার অবসান বা রুশ সেন্সরশিপের কঠোরতা থেকে মুক্তির প্রয়োজনীয়তা ও পদ্ধতির ওপর। সমকালীন ইউরোপীয় বিপ্লবের প্রেক্ষাপটে জার প্রথম নিকোলাস রুশ তরুণদের এইসব প্রগতিশীল উদ্যোগকে শুরুতেই ধ্বংস করার চেষ্টা করেন। আরো অনেকের সঙ্গে গ্রেপ্তার হন দস্তয়েভস্কিও। প্রথমে তাঁর প্রাণদণ্ডেরই আদেশ হয়েছিল, পরে শাস্তি খানিকটা লঘু করে তাঁকে পাঠানো হয় সাইবেরিয়ায় সশ্রম কারাদণ্ডে। এই কারাজীবন দস্তয়েভস্কির দর্শন ও চিন্তায় মৌলিক বদল আনে। সামাজিক প্রগতিচিন্তার চেয়েও তিনি ব্যক্তির স্বাধীনতাকে বেশি গুরুত্ব দিতে আরম্ভ করেন। এই ভাবনা ক্রমশ ব্যাপ্ত ও গভীর হয়। দস্তয়েভস্কি সোশ্যালিজম, নিহিলিজম ইত্যাদি ধারণাকে ব্যক্তি স্বাধীনতার পরিপন্থী বলে মনে করতে থাকেন এবং এগুলিকে রুশী ঐতিহ্যে ঢুকে পড়া পশ্চিম ইউরোপের প্রভাব বলে মনে করেন। চল্লিশের দশকের বেলিনস্কি ও পেট্রাশেভস্কি চক্রের চিন্তার উত্তরসূরী বলা যায় ষাটের দশকের চেরনিশেভস্কিদের। কিন্তু পেট্রাশেভস্কি চক্রের উৎসাহী তরুণ থেকে বদলে যাওয়া মধ্যবয়স্ক দস্তয়েভস্কি চেরনিশেভস্কির চিন্তা ও দর্শনকে মানতে তো পারলেনই না, তাকে ব্যঙ্গে সমালোচনায় বিঁধতে চাইলেন ‘নোটস ফ্রম আন্ডারগ্রাউন্ড’ নামের নভেলেট’এ। চেরনিশেভস্কির ‘হোয়াট ইজ টু বি ডান’ এবং তার পরের বছর প্রকাশিত দস্তয়েভস্কির ‘নোটস ফ্রম আন্ডারগ্রাউন্ড’কে পাশাপাশি রেখে পড়লে স্পষ্ট বোঝা যায় কীভাবে দস্তয়েভস্কি সরাসরি চেরনিশেভস্কির দর্শন ও চিন্তার বিরুদ্ধ অবস্থান নিয়েছেন। চেরনিশেভস্কি মনে করেছিলেন যে মানুষ স্বাভাবিকভাবেই যুক্তিবাদী এবং অধ্যয়ন ও প্রগতিশীল চিন্তাভাবনার মধ্যে দিয়ে এই যুক্তিবাদকে ছড়িয়ে দিতে পারলে সামাজিক মুক্তি সম্ভব। বিজ্ঞানচিন্তাই প্রগতিচিন্তার সারাৎসার — এটাই ছিল চেরনিশেভস্কি সহ নিহিলিস্ট বা সোশ্যালিস্টদের মত। উপযোগিতাবাদ, যুক্তিবাদ ও সমাজবাদের দর্শনটিকে দস্তয়েভস্কি নির্ধারণবাদ বলে মনে করলেন এবং ‘নোটস ফ্রম আন্ডারগ্রাউন্ড’ থেকে তাকে খারিজ করা শুরু করলেন। মনে রাখতে হবে দস্তয়েভস্কির সমালোচনা ইংরেজ উপযোগিতাবাদী চিন্তাবিদ জেমস স্টুয়ার্ট মিল ও তাঁর গুরু জেরেমি বেন্থামের দর্শনের দিকেও ধাবিত হয়, কারণ চেরনিশেভস্কি যে সব চিন্তাধারা তাঁর লেখায় হাজির করেছিলেন তার অনেকগুলিরই উৎস রয়েছে মিল, বেন্থামের রচনায়।

১৮৬০’র রাশিয়ায় বিপ্লবী আদর্শ হিসেবে জনপ্রিয় হয়ে ওঠে এক নতুন ধরনের চিন্তাধারা — নিহিলিজম। এই মতবাদের পক্ষে-বিপক্ষে কলম ধরেন তুর্গেনিভ, চেরনিশেভস্কি, দস্তয়েভস্কির মত সেকালের শ্রেষ্ঠ সাহিত্য প্রতিভারা। পরপর তিন বছরে প্রকাশিত তিনটি ক্লাসিকে নিহিলিজমকে তিনটি আলাদা আলাদা দৃষ্টিকোণে দেখা হয়। ১৮৬২তে তুর্গেনিভের ‘পিতা-পুত্র’ উপন্যাসটি প্রকাশিত হয়। ১৮৬৩তে তার জবাব হিসেবে চেরনিশেভস্কি লেখেন ‘হোয়াট ইজ টু বি ডান’ এবং পরের বছর, ১৮৬৪ সালে তার প্রতিক্রিয়া লক্ষ করা যায় দস্তয়েভস্কির বিখ্যাত উপন্যাস ‘নোটস ফ্রম দ্য আন্ডারগ্রাউন্ড’এর মধ্যে। আখ্যানের বাইরে সাহিত্য সমালোচনার জগতেও বিষয়টিকে কেন্দ্র করে বিতর্কের ঝড় বইতে থাকে।

‘নোটস ফ্রম আন্ডারগ্রাউন্ড’এ যে অনামা ‘আন্ডারগ্রাউন্ড ম্যান’কে দস্তয়েভস্কি হাজির করলেন, তিনি প্রথম তারুণ্যে বিজ্ঞান ও যুক্তিবাদকেই মুক্তির পথ ভেবেছিলেন, কিন্তু চল্লিশে পৌঁছে এর সীমাবদ্ধতাগুলি তার কাছে স্পষ্ট হয়ে ওঠে। তিনি সামাজিক ইউটোপিয়াবাদকে খারিজ করেন এবং দেখান যে মানুষ মোটেই মূলগতভাবে যুক্তিবাদী নয়, যুক্তির বাঁধনে মানুষের জীবন, চিন্তা ও কাজ বাঁধা থাকেনা, সে যুক্তি ও অযুক্তির মিশ্রণে স্বাধীনভাবে নিজের ইচ্ছানুযায়ী পথ চলতে চায়। দস্তয়েভস্কির এই ‘আন্ডারগ্রাউন্ড ম্যান’এর কাছে জীবনের স্বাধীনতাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার এবং যুক্তিবাদ, সমাজবাদ প্রভৃতি তার মতে স্বাধীনতার জন্য প্রতিবন্ধক। তার মতে যুক্তিবাদ মানুষকে যান্ত্রিক করে দিতে বাধ্য।

নিরাপত্তা ও সুখই যে মানুষের জীবনের জন্য যথেষ্ট নয়, বরং ক্ষেত্রবিশেষে তা তার স্বাধীনতার হন্তারক — এই ধারণাকে দস্তয়েভস্কি ফিরিয়ে আনেন তাঁর শেষ উপন্যাস ‘দ্য ব্রাদার্স কারমাজোভ’এ। ‘দ্য গ্রান্ড ইনকুইজিটর’এর মধ্যে দিয়ে তিনি দেখান নিরাপত্তা ও সুখ শেষপর্যন্ত কীভাবে মানুষের মহত্তম আকাঙ্ক্ষা স্বাধীনতার প্রতিবন্ধক হয়ে দাঁড়াচ্ছে। ‘ক্রাইম অ্যান্ড পানিশমেন্ট’এর মূলকথা একজন মানুষের তীব্র মনস্তাত্ত্বিক লড়াই, সেখানে সে মূলত নিজের সঙ্গে লড়ে। লড়ে নিজের এই অতীত বিশ্বাসের সঙ্গে যে ভাবত একজন সুপারম্যান সমাজের বৃহত্তর প্রয়োজনে একজন ঘৃণিত নিকৃষ্ট মানুষকে খুনও করতে পারে। তাতে সমস্যার কিছুই নেই, বরং তা প্রয়োজনবাদী দিক থেকে যুক্তিগ্রাহ্যই। কিন্তু বাস্তবে এরকম একজনকে খুন করে ফেলার পর ‘ক্রাইম অ্যান্ড পানিশমেন্ট’এর নায়ক রাসকলনিকভ তীব্র মানসিক সমস্যার মুখোমুখি হয়। একসময়ে সে যে ভেবেছিল এই খুন করার আইনি ন্যায্যতা থাকুক বা নাই থাকুক, নৈতিক ন্যায্যতা আছে — সেই ভাবনা সৌধটির ধূলিস্যাৎ হয়ে যাওয়ার কথাই ‘ক্রাইম অ্যান্ড পানিশমেন্ট’এ দস্তয়েভস্কি সবিস্তারে বলেছেন।

সামাজিক দার্শনিক মতবাদের প্রগতি প্রতিক্রিয়ার ছকে দস্তয়েভস্কির মহত্ত্বকে যে বিচার করা যায় না, বিখ্যাত মার্কসবাদী নন্দনতাত্ত্বিক ও উপন্যাসব্যাখ্যাতা গেয়র্গ লুকাচ আমাদের তা মনে করিয়ে দিয়েছেন। দস্তয়েভস্কি সম্পর্কে আলোচনা করতে গিয়ে লুকাচ আমাদের মনে করিয়ে দেন চেকভের একটি গুরুত্বপূর্ণ সাহিত্যসূত্র। চেকভ বলেছিলেন একজন শিল্পী সাহিত্যিকের কাজ সঠিক প্রশ্ন তোলা, সেই প্রশ্নের সঠিক উত্তর তিনি দিতে পারলেন কিনা, সেটা আদৌ ততটা গুরুত্বপূর্ণ নয়। চেকভ এই প্রসঙ্গে পুশকিনের ‘ইউজিন ওনেজিন’ আর তলস্তয়ের ‘আনা কারেনিনা’র কথা তুলেছিলেন। পুশকিন বা তলস্তয় এখানে কোনও সমস্যারই নিরসন করতে পারেননি, কিন্তু সঠিক সমস্যাকে তাঁরা অসামান্যভাবে হাজির করেছিলেন বলেই এগুলি কালজয়ী সাহিত্য হিসেবে গণ্য হয়েছে। দস্তয়েভস্কির সাহিত্য বিশ্লেষণ প্রসঙ্গে লুকাচ এই সূত্রটিকেই অনুসরণ করেছেন। তাঁর মতে দস্তয়েভস্কি সমস্যার যে সমাধানগুলি দেখান সেগুলি যে শুধু পরবর্তীকালের নিরিখেই শুধু ভ্রান্ত ঠেকবে তা নয়, সেকালেও এগুলি ছিল যথেষ্ট প্রতিক্রিয়াশীল চরিত্রের। কিন্তু তাতে দস্তয়েভস্কির অসামান্যতা বাতিল হয়ে যায় না। তিনি বিশিষ্টতার আসনে বসে আছেন সমস্যাগুলিকে সঠিকভাবে হাজির করতে পারার জন্য, সঠিক প্রশ্নগুলিকে অসামান্যভাবে সামনে নিয়ে আসতে পারার জন্য।

দস্তয়েভস্কির সাহিত্যের অনন্যতা কোথায় তা ধরিয়ে দেওয়ার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন রুশ উপন্যাসতাত্ত্বিক মিখাইল বাখতিন। তাঁর ‘প্রবলেমস অব দস্তয়েভস্কিস পোয়েটিক্স’ বইটির কাছে বারবার আমাদের ফিরে যেতে হয় দস্তয়েভস্কিকে নিবিড়ভাবে বোঝার জন্য। বাখতিন দেখান উপন্যাস শিল্পের মৌলিক বিষয় যে বহুস্বরিকতা, পলিফনি —সেই বহুস্বরকে দস্তয়েভস্কি কীভাবে ধারণ করেন। এক সর্বগ ও সর্বজ্ঞ অথর কর্তৃত্ব করেননা দস্তয়েভস্কির উপন্যাসে — বরং চরিত্ররা নিজস্ব চিন্তা ও কাজের সূত্রে স্বাধীনভাবে বিকশিত হয়। বিভিন্ন চরিত্রের সংলাপ একটি প্রসঙ্গকে নানাভাবে তুলে ধরে। উদাহরণ হিসেবে ধরা যায় অপরাধ ও শাস্তি উপন্যাসে অপরাধ সংগঠনের সীমা নৈতিকতা নিয়ে রাসকেলনিকভ, তার বন্ধু রাজুমিখিন আর গোয়েন্দা পরফিরি কথাবার্তা বলে, বিতর্ক করে। দস্তয়েভস্কি নিজস্ব দর্শন বিশ্বাসে কোথাও বেশি কম জোর দেননা। সমস্ত দৃষ্টিকোণগুলি পাশাপাশি রাখেন। এখান থেকেই শুরু হতে পারে উপন্যাসের ও জীবনের এক খোলা পাঠ।

দস্তয়েভস্কি জীবনের এই খোলা পাঠে সব সময়েই নান্দনিক বিচরণের পরিসর তৈরি করে রাখেন সব দেশকালের পাঠকের জন্য। এখানেই তাঁর অনন্যতা।

- সৌভিক ঘোষাল

Covid's earnings are low

‘বার্ষিক শিক্ষাব্যবস্থা রিপোর্ট ২০২১’ থেকে দেখা যাচ্ছে ৬ থেকে ১৪ বছর পর্যন্ত শিশুদের মধ্যে বেসরকারী স্কুলে ভর্তির হার ৮ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে।

২০১৮ সাল থেকে বেসরকারী স্কুলে ভর্তির হার দ্রুত কমেছে এবং অ-অনুমোদিত স্কুলে শিশুদের অনুপাত প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে। সমীক্ষায় দেখা গেছে যে এই প্রবণতার জন্য দায়ী প্রধাণত পরিবারের আয়ের উপর মহামারীর প্রভাব৷

‘প্রথম’ এনজিও (NGO) দ্বারা ‘বার্ষিক শিক্ষাব্যবস্থা রিপোর্ট ২০২১’ (Annual Status of Education Report), সম্প্রতি প্রকাশিত হয়। রিপোর্ট বলছে, সরকারি স্কুলে ভর্তির হার ৬ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে এবং ভর্তি না হওয়া শিশুদের অনুপাত হয়েছে ২.৫ থেকে ৪.৬ শতাংশ। এই সময় সরকারি স্কুলে ভর্তি হওয়া মেয়েদের অনুপাত ছেলেদের তুলনায় বেশি ছিল।

কোভিডের আগে এবং পরে উভয়ক্ষেত্রেই, ৫৮১টি জেলার ৭৫,০০০টিরও বেশি পরিবারের মধ্যে টেলিফোন সমীক্ষার ভিত্তিতে এই রিপোর্ট তৈরি হয়।

প্রথমের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা রুক্মিণী ব্যানার্জি বলেছেন যে ফোন সমীক্ষাটি ২০১৮ সালে ঘরে ঘরে সমীক্ষার যে নমুনার ৯০ শতাংশ কভার করেছিল।

২০১৮ সালে দেখা গেছিলো প্রায় ১০ শতাংশ পরিবারের কাছে টেলিফোন নেই। সুতরাং, সেসময় তাদের এই সমীক্ষায় কভার করা যায়নি। রিপোর্ট বলেছে, তাদের কভার করা হলে অবস্থাটা আরও খারাপ দেখাতো, কারণ এই পরিবারগুলি আরও দরিদ্র।

পরিবারের আর্থিক সমস্যাগুলি ছাড়াও, সরকারি স্কুলে নথিভুক্তি বাড়ার প্রবণতার কারণগুলি হল, সরকারি স্কুলে দেওয়া প্রণোদনা এবং কিছু রাজ্য সরকার কর্তৃক ইংরেজি-মাধ্যম স্কুল খোলা। সরকারি স্কুলগুলি বিনামূল্যে ইউনিফর্ম এবং পাঠ্যপুস্তকের মতো প্রণোদনা প্রদান করে — এমনকি কিছু রাজ্যে বিনামূল্যে সাইকেল এবং গ্যাজেট (যেমন ট্যাবলেট) দেয় ছাত্রছাত্রীদের।

রিপোর্টে বলা হয়েছে যে ২০০৬ থেকে ২০১৪ সালের মধ্যে বেসরকারী স্কুলে ভর্তির হার দ্রুত বেড়ে ৩০ শতাংশে পৌঁছেছিলো। এই সময় কম খরচের প্রাইভেট স্কুলগুলির বৃদ্ধির কারণ অর্থনীতির উন্নতি, জীবনধারার পরিবর্তন এবং সন্তানদের জন্য পিতামাতার আকাঙ্ক্ষা।

table2অসংগঠিত ক্ষেত্রে কর্মরত লোকেরা মহামারী দ্বারা অর্থনৈতিকভাবে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এদের বেশিরভাগই তাদের বাচ্চাদের কম খরচের প্রাইভেট স্কুলে পাঠায়, যারমধ্যে অনেকগুলি গত দু’বছরে বন্ধ হয়ে গেছে। এসবই সরকারি স্কুলে ইতিবাচক প্রভাব এনে দিয়েছে। এখন চ্যালেঞ্জ এই শিশুদের ধরে রাখা। সরকারি স্কুলগুলিকে মানসম্পন্ন শিক্ষা প্রদান করতে হবে এবং কার্যকর শিক্ষার জন্য তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তির সুবিধা দিতে হবে।

স্কুল বন্ধের কারণে, ২০১৮ সালে ৩০ শতাংশ থেকে, প্রাইভেট টিউশন নেওয়া শিশুদের অনুপাত ৪০ শতাংশে উন্নীত হয়েছে। স্মার্টফোনের লভ্যতা ২০১৮ সালে ৩৬.৫ শতাংশ থেকে ২০২১ সালে ৬৭.৬ শতাংশে উন্নীত হয়েছে, স্কুলগুলি অনলাইন শিক্ষার আশ্রয় নিয়েছে৷ প্রায় ৭৯ শতাংশ প্রাইভেট স্কুল ছাত্রদের বাড়িতে একটি স্মার্টফোন রয়েছে, যেখানে সরকারি স্কুল ছাত্রদের বাড়িতে রয়েছে ৬৩.৭ শতাংশ।

বাড়িতে পরিবারের সদস্যদের কাছ থেকে শেখার সহায়তা পাওয়া স্কুলছাত্রীদের অনুপাত ২০২০ সালে ৭৫ শতাংশ থেকে ২০২১ সালে ৬৬ শতাংশে নেমে এসেছে।

সরকারি স্কুলে ভর্তির সামগ্রিক বৃদ্ধি উত্তরপ্রদেশ, রাজস্থান, পাঞ্জাব, হরিয়ানা, মহারাষ্ট্র, তামিলনাড়ু, কেরালা এবং অন্ধ্রপ্রদেশের মতো রাজ্যগুলিতে বেশি হয়েছে৷

- দি টেলিগ্রাফ, ২০ নভেম্বর ২০২১

Sentenced to life

উত্তরপ্রদেশের প্রাক্তন মন্ত্রী গায়ত্রী প্রজাপতি এবং অন্য দু’জনকে একটি বিশেষ আদালত এক মহিলা এবং তার নাবালিকা কন্যাকে গণধর্ষণ করার জন্য যাবজ্জীবন কারাদণ্ডে দণ্ডিত করেছে। আইনপ্রণেতাদের বিশেষ আদালতের নেতৃত্বে অতিরিক্ত দায়রা জজ পিকে রাই প্রত্যেক দোষীকে ২ লক্ষ টাকা জরিমানাও করেছেন।
অভিযোগকারী মহিলা দাবি করেছিলেন, “মন্ত্রী এবং তার সহযোগীরা অক্টোবর ২০১৪ থেকে তাকে ধর্ষণ করছে এবং জুলাই ২০১৬ সালে তার নাবালিকা মেয়েকেও টার্গেট করার পরে তিনি তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ করার সিদ্ধান্ত নেন”।

লোকাল থানা প্রথমে অভিযোগ নিতে অস্বীকার করে। পরে, সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশে ১৮ ফেব্রুয়ারী ২০১৭ গৌতমপল্লি থানায় মন্ত্রীর বিরুদ্ধে এফআইআর নথিভুক্ত করা হয়েছিল।

প্রজাপতি এবং অন্য দুই দোষী অশোক তিওয়ারি এবং আশিস শুক্লা তাদের বিরুদ্ধে সাজা ঘোষণা করার সময় আদালতে উপস্থিত ছিলেন।

আদালত তিনজনকেই ইপিসি ধারা ৩৭৬(ডি)-এর অধীনে গণধর্ষণ করার জন্য দোষী সাব্যস্ত করেছে এবং পস্কো আইনের ধারা ৬-এর সাথে একত্রে ৫(জি)-এর অধীনে “একটি শিশুর উপর গ্যাং পেনিট্রেটিভ যৌন আক্রমণ” করার জন্য দোষী সাব্যস্ত করেছে। পস্কো আইনের ৬ ধারায় একটি নাবালিকা মেয়েকে গণধর্ষণ করার শাস্তির বিধান রয়েছে। শাস্তি কমপক্ষে ১০ বছরের জেল থেকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড পর্যন্ত।

প্রজাপতি, অখিলেশ যাদব মন্ত্রীসভায় পরিবহণ ও খনি দপ্তরের মন্ত্রী ছিলেন এবং মার্চ ২০১৭ সালে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল। তখন থেকে তিনি জেলেই ছিলেন।

সাজার পরিমাণের উপর শুনানির সময়, প্রজাপতি এবং অন্যদের পক্ষে আইনজীবী সাজা প্রদানে নম্রতার জন্য আদালতের কাছে আবেদন করেছিলেন। কিন্তু প্রসিকিউশনের কৌঁসুলি তীব্রভাবে এর বিরোধিতা করে যুক্তি দিয়েছিলেন যে প্রজাপতি সরকারের একজন মন্ত্রী ছিলেন এবং দায়িত্বশীল পদে থেকে একজন ব্যক্তি তার ক্ষমতা ও পদের অপব্যবহার করে এই ধরনের অপরাধ করেছেন। আদালতের উচিত সমাজকে বার্তা দিতে তারসাথে কঠোর আচরণ করা।

তিনজনকে দোষী সাব্যস্ত করার সময়, বিচারক রাই প্রমাণের অভাবে অন্য চারজনকে — বিকাশ ভার্মা, রূপেশ্বর, অমরেন্দ্র সিং, ওরফে পিন্টু এবং চন্দ্রপালকে খালাস দিয়েছেন।

আদালতে জবানবন্দি দেওয়ার সময়, দোষীরা প্রাথমিকভাবে এফআইআর’এ তাদের গণধর্ষণের অভিযোগকে মেনে নিয়েছিলেন, কিন্তু জেরার সময় তা থেকে পিছু হটেন।

আদালত অবশ্য তিনজনকে দোষী সাব্যস্ত করার সময় তাদের প্রাথমিক জবানবন্দির উপর নির্ভর করেছিল।

- দ্য ওয়্যার, ১২ নভেম্বর ২০২১

rya st conf

 

খণ্ড-28
সংখ্যা-41
25-11-2021