When will politics be responsible
When will politics be responsible_0

গোটা পৃথিবীতে, বিশেষ করে উন্নয়নশীল ও দরিদ্র দেশগুলোতে, অসংখ্য মা অজস্র কারণে সন্তানহারা হচ্ছেন। প্রতিদিন। সেই অসহায় কান্নার নদীতে মিশে গেল আরেক মায়ের বুকফাটা হাহাকার।

মালদহের মোথাবাড়ি থানার জোত অনন্তপুর গ্রামে আসোয়ানি বিবির ঘর। স্বামী সাজমুল রাজমিস্ত্রি। দু’ছেলে মেয়ে নিয়ে শাকান্নের সংসার। সাত বছরের ছেলে সাকিবুল মঙ্গলবার বিকেলে ন্যাড়া ছাদ থেকে পড়ে গুরুতর জখম হয়। মালদা সদর হাসপাতালে নিয়ে গেলে সিটি স্ক্যান করে তাকে কলকাতার এসএসকেএম’এ রেফার করা হয়। অ্যাম্বুল্যান্স ছুটছিল কলকাতার পথে। ৩৮০ কিমি রাস্তার বাকি ছিল আরও প্রায় ১৫০ কিমি পথ। গতিরোধ হল কৃষ্ণনগরের পিডব্লুডি মোড়ের কাছে অবরোধে। স্থানীয় কিছু বড় বড় ক্লাবের সদস্য ও কর্মকর্তারা ৩৪নং জাতীয় সড়কে আগুন জ্বেলে বিক্ষোভ দেখাচ্ছেন। কেন? প্রথাগত ‘ঐতিহ্য’ মেনে, জগদ্ধাত্রী ঠাকুরকে বেহারার কাঁধে (অন্তত ১০০-১৫০ জন বেহারা) চাপিয়ে রাজবাড়ি থেকে শোভাযাত্রা সহকারে বিসর্জনের অনুমতি দিতে হবে! কোভিড পরিস্থিতিতে সেটা আদালতের বারণ ছিল। তবু কেন এই আবদার?

কৃষ্ণনগরের জগদ্ধাত্রী পুজোর ‘ঐতিহ্য’ আর ‘মানুষের আবেগ’কে মর্যাদা দিতে! (তাতে কোভিড সংক্রমণে কয়েকশো মানুষ না হয় মরবে!) হাজার হাজার মানুষ রাতভর রাস্তার দু’পাশে শোভাযাত্রার জন্য অপেক্ষা করে থাকবে না!

টানা দু’ঘন্টা অবরোধে আটকে থাকল অ্যাম্বুল্যান্স। একসময় কচি দেহটা নিথর হয়ে গেল। চারপাশের গাড়ির লোকজন অনেক চেষ্টা করেছিলেন ছোট্ট সাকিবুলকে পথ করে দেওয়ার। কিন্তু অসংখ্য গাড়ির জটিল জট কাটানো সম্ভব হয়নি। মরিয়া হয়ে শেষে তারা ফেসবুকে দেওয়ার পর কোতোয়ালি থানার পুলিশ যখন আসে, তখন সব শেষ। রাত আড়াইটেয় অবরোধ ওঠে। অ্যাম্বুল্যান্স তারপর মৃত সাকিবুলকে নিয়ে পিজি’তে পৌঁছায়।

অনেকগুলো প্রশ্ন।

যে মানুষ অন্যের সাতমহলা প্রাসাদ গড়ে, তার নিজের ঘরের ছাদ ‘ন্যাড়া’ হয়ে পড়ে থাকে কেন? বাড়িতে নাবালক থাকা সত্ত্বেও? কেন এই বিপন্নতা?

মাথায় জমাট রক্ত অস্ত্রোপচার করে বার করার ব্যবস্থা কেন থাকবে না জেলা সদর হাসপাতালে? কেন তারজন্যে প্রায় ৪০০ কিমি উজিয়ে কলকাতায় আসতে হবে? তাহলে রাজ্যের স্বাস্থ্য পরিকাঠামো নিয়ে এত ঢক্কানিনাদ কেন?

মানুষ যখন নিজেদের জীবন মরণের প্রশ্নে বিক্ষোভ দেখাতে পথ অবরোধ করতে বাধ্য হয়, তখন অনেক ক্ষেত্রেই প্রশাসন অতিসক্রিয় হয়ে বলপ্রয়োগ করে অবরোধ তুলে দেয়। এক্ষেত্রে এত ধৈর্যের পরাকাষ্ঠা প্রদর্শন কেন? ভয়ে না ভক্তিতে? অবরোধে সবসময়েই অ্যাম্বুল্যান্সের ছাড় থাকে। এটাকে অবরোধকারী ও প্রশাসন উভয়েরই মান্যতা দেওয়ার কথা। এক্ষেত্রে তা হল না কেন? বিক্ষোভস্থল থেকে অনেক দূরে আটকে পড়েছিল অ্যাম্বুল্যান্স। কেন পথ করে দেওয়ার জন্য কোনও পুলিশের দেখা মেলেনি? কেন প্রশাসন বিন্দুমাত্র তৎপর ছিলনা এরকম একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সড়ক অবরুদ্ধ হয়ে যাওয়ার পরেও?

ক্লাব কর্মকর্তাদের বেশিরভাগই শহরের বা অঞ্চলের মান্যগণ্য প্রভাবশালী রাজনৈতিক ব্যক্তিবর্গ। তারা নির্বোধ বা অদূরদর্শী নন। তবে কোভিড-এর তৃতীয় ঢেউয়ের মুখে দাঁড়িয়ে কেন আদালত ও প্রশাসনের বিরোধিতা করছেন? সেই ভয়ঙ্কর দিনগুলোর কথা ভুলে গেছেন যখন হাসপাতালের দরজায় অ্যাম্বুল্যান্সের সারি, শ্মশানে দিন-রাত শ’য়ে শ’য়ে লেলিহান চিতা জ্বলছে, গঙ্গায় ভেসে যাচ্ছে শ’য়ে শ’য়ে লাশ? নির্বান্ধব নিঃসঙ্গ একাকী সেই ভয়ঙ্কর মৃত্যু; সৎকারহীন চরম অমর্যাদার সেই মৃত্যুর কথা ভুলে গেছেন? প্রায় দু’বছর ধরে ঘরবন্দি ছেলে মেয়েরা অনাহার অপুষ্টি অশিক্ষায় ধুঁকছে। কাজ হারিয়ে রাতারাতি বেকার অসংখ্য মানুষ আজ দিশাহারা, কেউ বা সপরিবারে আত্মহত্যার পথ বেছে নিয়েছেন। সংক্রমণ আবার বাড়ছে, মৃত্যু বাড়ছে, তারা খোঁজ রাখেন না? ইউরোপে চতুর্থ ঢেউ আছড়ে পড়েছে। জার্মানিতে দৈনিক সংক্রমণ ৫০,০০০ ছাড়িয়েছে। চিকিৎসকরা সেখানে লক্ষাধিক মৃত্যুর আশঙ্কা করছেন, অত্যাধুনিক চিকিৎসা পরিষেবা, পরিকাঠামো থাকা সত্ত্বেও। সেসব তারা জানেন না? আসলে এই সব মেলা খেলা পুজোয় কার স্বার্থ কোথায় কোন সূক্ষ্ম তন্ত্রীতে বাঁধা আছে — সেসব নিগূঢ় হিসেব সাধারণের অগোচরেই থেকে যায়। রাজনীতি চলে ভোটের অঙ্কে। আর সে অঙ্ক কষা হয় জাত-পাত-ধর্মের সমীকরণ দিয়ে।

রাজনীতি তার নিজের স্বার্থে ‘মানুষ’কে, তার ‘আবেগ’কে প্রয়োজনমতো নিয়ন্ত্রণ করে, ব্যবহার করে। গতবছর প্রশাসন অক্ষরে অক্ষরে আদালতের রায় মেনেছিল, সব ধর্মের মানুষ প্রতিটি উৎসবে তাকে মান্যতা দিয়ে সংযত থেকেছে। এটা আমরা সবাই দেখেছি। আজ সাধারণ মানুষের মধ্যে চোরা আতঙ্ক ‘আবার পয়সা দিয়ে রেশন তুলতে হবে?’ কারণ কেন্দ্রীয় সরকার বিনামূল্যের রেশন প্রত্যাহার করে নিয়েছে। তাই উৎসব নিয়ে উচ্ছ্বসিত হওয়ার সুযোগ নেই। কথায় কথায় ‘অশিক্ষিত অজ্ঞ মানুষের’ ঘাড়ে দোষ চাপানোটা আমলা, মন্ত্রী প্রশাসনের অভ্যাস হয়ে গেছে। তারা ভুলে যান, ইউরোপ আমেরিকার উন্নত দেশের সুশিক্ষিত মানুষ মাস্ক পরা, ভ্যাকসিন নেওয়ার ব্যাপারে প্রশাসনের নির্দেশকে ‘গণতন্ত্র হরণ’ বলে রাস্তায় নেমে বিক্ষোভ দেখায়!

সমাজের দেহে আবহমান ধর্মান্ধতা কুসংস্কার নারী বিদ্বেষের বিষাক্ত প্রভাব সক্রিয়। এরফলে কিছু মানুষ খুব সহজেই ভীড় হিংসায় সামিল হয়ে যায়। কখনও মোবাইল চোর সন্দেহে সংখ্যালঘু তরুণকে পিটিয়ে মারা, কখনও উচ্চবর্ণের মেয়েকে বিয়ে করার অপরাধে দলিত যুবককে খুন করা, কখনও আদিবাসী যুবতীকে ‘অবৈধ প্রণয়ের’ অভিযোগে চুল কেটে, বিবস্ত্র করে পাড়া ঘোরানো বা ধর্ষণ করা — এসব বোধহীন কাজের নির্বোধ উল্লাসে সতত সহজেই পাওয়া যায় এদের। উপযুক্ত শিক্ষার মাধ্যমে সেই বিষক্রিয়া কাটানোর পরিবর্তে রাজনীতি বরং তাদের কাজে লাগায়।

কর্মসংস্থানহীন অর্থনীতি। অনুদাননির্ভর সমাজ। স্কুলে ছাতা জুতো ব্যাগ সবুজসাথী কন্যাশ্রী, এমনকি এখন মোবাইল পর্যন্ত পাওয়া যাচ্ছে। অভাব শুধু শিক্ষক আর ক্লাসরুমের সুষ্ঠু সুশৃঙ্খল শিক্ষা পরিবেশের। ফলে শিক্ষার হাল যা হবার হয়েছে। ড্রপ আউট বেড়েছে। স্কুলের চৌহদ্দির বাইরে এসে ছেলেরা অনেকেই আজকাল জিমে যায়। যদি বাউন্সার বা নিদেন পক্ষে সিকিউরিটি গার্ডের চাকরি পাওয়া যায়। কিন্তু কোথায় কারখানা, কোথায় অফিস, কোথায় ব্যাঙ্ক! বড়জোর বহুতলের দারোয়ানি জোটে। তবে রাজনৈতিক ‘দাদারা’ সস্নেহে ডেকে নেন। সপ্রতিভ, পেশল সুঠামদেহীদের রাজনীতিতে বহু কাজ! ভোট বৈতরণী পার করা থেকে তোলাবাজি, সিন্ডিকেট — ‘রণে বনে জঙ্গলে’র মত কয়লা খনি, বালি খাদান, কারখানার গেট থেকে হাসপাতালে টিকিটের লাইন পর্যন্ত সর্বত্র যাদের উপস্থিতি! থানা পঞ্চায়েত মন্ত্রী আমলার ঘরে যাদের অবাধ গতি! রাজনীতির কেষ্টু-বিষ্টুদের ‘সহজ’ পথে অর্থাগমের রাস্তা সুগম করা এদের কাজ। এদের আওতায় আছে বাপে তাড়ানো মায়ে খেদানো আশৈশব ক্ষুধা লাঞ্ছনা প্রহার নিগ্রহ আর অনিশ্চয়তাকে ছায়াসঙ্গী করে বেড়ে ওঠা ছন্নছাড়ার দল। সমাজ ওদের প্রতি দায় দূরে থাক, দয়াও দেখায়নি কখনও। ওদেরও সমাজের প্রতি কোনও দায় নেই। দল নির্বিশেষে ‘দাদা’দের স্নেহের প্রশ্রয়ে এরা ক্রমশ ‘ভীষণ’ এবং এলাকার ‘ত্রাস’ হয়ে ওঠে। প্রয়োজন মিটে গেলে ‘দাদা’দের রিমোট কন্ট্রোলে এরা গোষ্ঠী সংঘর্ষে বা এনকাউন্টারে হাপিশ হয়ে যায়।

এরাই গত কালীপুজোর রাতে মহেশতলায় কুকুরের গায়ে দোদমা ছুঁড়ে মেরে বেচারাকে জখম করেছিল। একজন তার প্রতিবাদ করায় তাকে মারধর করেই ক্ষান্ত থাকে না, মাঝরাতে আগ্নেয়াস্ত্র হাতে তরুণ সহ দলবল নিয়ে তার বাড়িতে ঢোকার চেষ্টা করে, তাকে প্রাণে মারার ও তার মাকে ধর্ষণের হুমকি দেয়। মা স্বপ্না অধিকারী আতঙ্ক ঘৃণা হতাশায় গত শুক্রবার গলায় শাড়ির ফাঁস লাগিয়ে আত্মহত্যা করেন।

এরাই সেদিন নরেন্দ্রপুরের গড়িয়ায় মদের ঠেক বসিয়ে রোজকার মতো মদ জুয়ার আসর চালাচ্ছিল। এলাকার মহিলারা প্রতিবাদ করায় তাদের ঘরে ঘরে ঢুকে তাণ্ডব চালায়, যথেচ্ছ মারধর ও শ্লীলতাহানি করে। মারের হাত থেকে বৃদ্ধ, বালিকা এবং অন্তঃসত্ত্বাও রেহাই পাননি। দীর্ঘদিন ধরে চলা এই অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রশাসনকে বার বার জানানো সত্ত্বেও কোনও ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। তবে সেদিনের ঘটনার পর নড়ে চড়ে বসেছে থানা।

এই দুষ্কৃতী-দাপট রাজ্যে ক্রমশ বাড়ছে। প্রশাসন ধৃতরাষ্ট্র।

নাগরিকদের একই সঙ্গে অধিকার ও কর্তব্য সম্পর্কে সচেতন করাটা রাজনীতির দায় নয়? ছট পুজোয় নিষেধাজ্ঞা সত্ত্বেও দেদার বাজি পুড়ল, বায়ুদূষণ হল। পুজোর নানা উপচারে গঙ্গার জল দূষিত হল ভীষণভাবে। বছরের পর বছর এই দূষণ চলতেই থাকবে? রাজনীতি মগ্ন থাকবে ভোটের অঙ্কে?

- জয়ন্তী দাশগুপ্ত

খণ্ড-28
সংখ্যা-40
18-11-2021