Fascist attacks on journalists, lawyers
social media users

আমরা জানি বাংলাদেশে একটা সোশ্যাল মিডিয়ার পোস্টের পরিপ্রেক্ষিতে গত ১৫ অক্টোবর থেকে সপ্তাহব্যাপী বাংলাদেশের সংখালঘুদের উপর হামলা, দুর্গাপুজোর প্যান্ডেল ও মন্দির ভাঙচুরের ঘটনা ঘটে। আমরা এটাও দেখেছি যে, এই ঘটনার প্রতিবাদে বাংলাদেশ এবং পশ্চিমবাংলার সমস্ত শুভবুদ্ধি সম্পন্ন মানুষ, রাজনৈতিক দল সোচ্চার হয়েছেন — দোষীদের শাস্তি, সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তার দাবি জানিয়েছেন এবং সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি গড়ে তোলার আহ্বান জানিয়েছেন। বাংলাদেশের প্রশাসনও এ প্রশ্নে অনমনীয় মনোভাব গ্রহণ করে দ্রুত শান্তি শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে সচেষ্ট হয়েছে। কিন্তু, সম্প্রীতির বাতাবরণ যাতে গড়ে উঠতে না পারে তারজন্য বাংলাদেশের প্রতিবেশী রাজ্য ত্রিপুরায় সংখ্যালঘুদের উপর পাল্টা হামলা শুরু করা হল। যা আরও তীব্রতা পায় গত ২৬ অক্টোবর। ঐদিন ধর্মীয় সংগঠন আরএসএস, বিশ্ব হিন্দু পরিষদ, হিন্দু জাগরণ মঞ্চ এবং বজরং দল একটি মিছিল বের করে। ঐ মিছিল থেকে সংখ্যালঘু মানুষের উপর সন্ত্রাস সৃষ্টির লক্ষ্যে মুসলিম জনগণের বিরুদ্ধে বিদ্বেষপূর্ণ শ্লোগান দেওয়া, ইঁট-পাথর ছোঁড়া, বাড়ি, দোকান, মসজিদ ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ করা হয়। প্রায় ১০ দিন ধরে চলা এই হিংসা দেখে ত্রিপুরা হাইকোর্ট একটি স্বতঃপ্রণোদিত মামলা চালু করে এবং বিজেপি শাসিত ত্রিপুরা রাজ্য সরকারকে নির্দেশ দেয় অবিলম্বে হলফনামা সহ জানাতে যে রাজ্য সরকার শান্তি শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে ইতিমধ্যে কি পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে? হাইকোর্ট এও পরামর্শ দেয় রাজ্যজুড়ে শান্তি কমিটি গঠন করা হোক। একজন আরটিআই কর্মীর অভিযোগের ভিত্তিতে ২ নভেম্বর জাতীয় মানবাধিকার কমিশন, ত্রিপুরা পুলিশ প্রশাসনের কাছে লিখিতভাবে জানতে চায় ত্রিপুরায় ঘটে যাওয়া হিংসায় তারা শান্তি শৃঙ্খলা বজায় রাখতে কি ভূমিকা নিয়েছিল?

আমরা দেখলাম, ত্রিপুরা হাইকোর্টের স্বতঃপ্রণোদিত হস্তক্ষেপের পর ত্রিপুরা পুলিশ প্রশাসন তড়িঘড়ি মোট ১০২ জনের নামে এফআইআর-এর মাধ্যমে মিথ্যা মামলা চালু করল। এরমধ্যে রয়েছেন দেশের ও আন্তর্জাতিক সাংবাদিকরা, আইনজীবীরা ও সোশ্যাল মিডিয়া ব্যাবহারকারীরা যেমন, আরিফ শাহ, সিজে ওয়েরলেমান, জেহাঙ্গীর আলি, সেলিম ইঞ্জিনিয়ার, সারতজ আলম, শারজিল উসমানি, শ্যাম মীরা সিং (যিনি একটি ট্যুইট করেছিলেন ‘ত্রিপুরা জ্বলছে’), দিল্লীর সংখ্যালঘু কমিশনের প্রাক্তন চেয়ারপার্সন জাফারুল ইসলামের মতো বহু মানুষ। ত্রিপুরা প্রশাসন দাঙ্গাকারীদের বিরুদ্ধে কোন পদক্ষেপ গ্রহণ না করে ঐ সব মানুষদের বিরুদ্ধে অপরাধমূলক ষড়যন্ত্র, বেআইনি কর্মকাণ্ড, ত্রিপুরার শান্তি শৃঙ্খলা ভঙ্গ করে প্রশাসনের ভাবমূর্তি ক্ষুন্ন করা ইত্যাদির অভিযোগে ভারতীয় দণ্ডবিধির বিভিন্ন ধারায় এমনকি দানবীয় ইউএপিএ আইনেও অভিযুক্ত করল।

গোটা দেশের মানুষ অবাক হয়ে এটাও দেখলেন যে, এই ভয়ঙ্কর হিংসার তদন্ত করতে যাওয়া চারজন আইনজীবীদের অনুসন্ধানকারী দলের বিরুদ্ধেও একই অভিযোগ দায়ের করা হল। ত্রিপুরার পশ্চিম আগরতলা থানার পুলিশ এই চারজনকে ১০ নভেম্বর থানায় হাজির হওয়ার জন্য নোটিশ পাঠালো। যদিও আইনজীবীরা কেউই ১০ তারিখ হাজিরা দিতে যাননি, তারা সুপ্রিম কোর্টে তাদের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগগুলিকে খারিজ করার আবেদন জানিয়েছেন। সুপ্রিম কোর্ট আবেদনটি গ্রহণ করেছে, যা শুনানির অপেক্ষায়।

অনুসন্ধানকারী দলের আইনজীবীরা দু’দিন ধরে তদন্ত করে ২ নভেম্বর ২০২১ দিল্লীতে প্রেস কনফারেন্সের মধ্য দিয়ে তাদের তদন্ত রিপোর্ট প্রকাশ করেন এবং তা সোশ্যাল মিডিয়ায় অনেকে ব্যবহার করেন। দেখা গেল ৩ নভেম্বর তারিখেই ত্রিপুরা পুলিশ প্রশাসন তাঁদের বিরুদ্ধে মিথ্যা এফআইআর দায়ের করল এবং দানবীয় ইউএপিএ আইন প্রয়োগ করল।

কারা ছিলেন সেই অনুসন্ধান দলে? এবং কি ছিল সেই তদন্ত রিপোর্টে ?

দিল্লীর সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী এহতেশাম হাসমির নেতৃত্বে আইনজীবী অমিত শ্রীবাস্তব (লইয়ার্স ফর ডেমোক্রেসি কো-অর্ডিনেশন কমিটির সদস্য), আইনজীবী মুকেশ (অল ইন্ডিয়া লইয়ার্স ফর জাস্টিস সংগঠনের জাতীয় কাউন্সিল সদস্য, পিপলস ইউনিয়ন ফর সিভিল লিবার্টিস-এর সদস্য এবং এআইসিসিটিইউ-এর জাতীয় কাউন্সিল সদস্য), এবং আইনজীবী আনসার ইনডোরি (ন্যাশনাল কনফেডারেশন অফ হিউম্যান রাইটস্-এর সদস্য) — এই চারজন গিয়েছিলেন ত্রিপুরায় সাম্প্রতিক ঘটে যাওয়া হিংসার ঘটনার সঠিক তথ্য অনুসন্ধান করতে।

অনুসন্ধান রিপোর্টের সারাংশ

আক্রান্তদের বক্তব্য

১) মহম্মদ ইউসুফ আলি, বয়স ৪০, রাওয়া বাজার। তিনি রাওয়া বাজারে মুদিখানার দোকান চালাতেন। তিনি জানাচ্ছেন আমিরুদ্দিনের মতো তার দোকানও তিনি চোখের সামনে পুড়ে যতে দেখেছেন। এখানে তিনি ২০ বছর ধরে ব্যবসা করে আসছেন, কোনোদিন এমনটা হতে দেখেননি। তার প্রভুত ক্ষতি হয়ে গেছে। প্রায় ৬ লক্ষ টাকা ক্ষতি হয়েছে। তিনি জানেন কারা একাজ করেছে কিন্তু কারুর নাম সে জানায়নি, কারণ পরবর্তীতে যদি তার আরও বড় কোন ক্ষতি হয় সেই ভয়ে।

২) মহম্মদ আমির হুসেন, বয়স ৩৪, দোকানদার। রাওয়া বাজার পানিসাগরে কম্পিউটার আর বৈদ্যুতিন যন্ত্রপাতির দোকান আছে। পরিবারের সদস্য সংখ্যা ৮ জন। গত দশবছর ধরে ব্যাবসা করছেন। তার দোকানের পিছন দিকে লাগোয়া বাড়িতে মানিক দেবনাথ নামে একজন হিন্দুর বাড়ি। যখন দাঙ্গাবাজরা দোকানে আগুন লাগাতে আসে তখন তিনি বাড়ি থেকে বেরিয়ে এসে বলেন, মহম্মদ আমিরের দোকানে আগুন লাগালে ওর বাড়িও পুড়ে যাবে। একথা বলাতে দাঙ্গাবাজরা আগুন লাগানো থেকে বিরত হয় বটে কিন্তু দোকানের যাবতীয় জিনিসপত্র লুঠপাঠ করে নিয়ে যায় — তার মধ্যে ল্যাপটপ, জলের মোটর ও অন্যান্য জিনিসপত্রও ছিল। প্রিন্টার বের করে তাতে আগুন ধরিয়ে দেয়, জেরক্স মেশিন পাচার করে দেয়। এই ঘটনায় তার প্রায় ১০ লক্ষ টাকার মতো ক্ষতি হলেও সরকার তাকে মাত্র ২৬,৮০০ টাকা ক্ষতিপূরণ হিসাবে দিয়েছে। প্রতিবেশী মানিক দেবনাথের কাছে হামলাকারীদের নাম জানতে চাইলে তিনি নাম জানাতে অস্বীকার করেন।

৩) আর এক দোকানদার সাব্বির আহমেদ, বয়স ২০। তিনি অনুসন্ধানকারী দলকে জানান যে তার বৃদ্ধ বাড়বার শরীরের অবস্থার অবনতির পর পরিবারের ৬ জন সদস্যের ভার এখন তার ওপর। সাব্বির মাত্র ১৫ দিন আগে স্কুলের কাছাকাছি খাবারের এবং কসমেটিক্স-এর একটা দোকান দিয়েছিল। সে জানায় হামলাকারীরা তার দোকানের সবকিছু লুঠপাট করেছে। তার প্রায় ১.৫০ লক্ষ টাকার ক্ষতি হয়েছে, কিন্তু সরকার কোনো ক্ষতিপূরণ দেয়নি।

ইউসুফ আলি, মহম্মদ আমির হুসেন, সাব্বির আহমেদ-এর মতো আমিরুদ্দিন, সানোয়ার আলি, মহম্মদ আলি, সুলতান হুসেন, জইউদ্দিন, সামিম আহমেদদের দোকানেও লুঠপাট ও অগ্নিসংযোগ করা হয়। মোট ৯টি দোকান। এইসব মানুষের কাছ থেকে তথ্য সংগ্রহ করেন অনুসন্ধান দলের সদস্যরা।

নিশানা করা হয় ১২টা মসজিদ

১) কালাম চুড়া মসজিদ — ২৩ অক্টোবর সোনামোড়ার এই মসজিদের সীমানার দেওয়াল ভেঙে দেওয়া হয়। এখানে দিনে পাঁচবার নামাজ পড়া হয়। ঘটনার পরদিন সকালে পুলিশ এবং লোকাল পঞ্চায়েতের চেয়ারম্যান সবরতি দাস হিন্দুদের সাথে কথা বলেন এবং নতুন টিন, কাঠ দিয়ে মসজিদ সারিয়ে দেওয়া হয়।

২) বেলওয়ার চার মসজিদ — ১৭ অক্টোবর রাতে হিন্দুত্ববাদীরা মসজিদের মাইক খুলে নিয়ে গেছে খবর পেয়ে মুসলিম সম্প্রদায়ের মানুষেরা জমায়েত হন। গ্রাম পঞ্চায়েতের চেয়ারম্যান সুভাষ দাস পুনরায় মাইক লাগিয়ে দেন এবং মসজিদের সামনে পুলিশের পাহারা বসানো হয়।

৩) নারাভারা পুরাব টিলা মস্ক — বিশালগড়ের এই মসজিদে ১৩ অক্টোবর রাতে হামলা হয়। মৃতদেহ বহন করার খাট, প্রায় ৩০টা নামাজ পড়ার আসন এবং সাইনবোর্ডে আগুন লাগিয়ে দেওয়া হয়। এ খবর পাওয়া মাত্র লোকাল মানুষ ছুটে গিয়ে আগুন নেভায়। মসজিদটি সম্পুর্ণ ভস্মীভূত হয়ে যেত যদি লোকাল মানুষ ঠিক সময়ে উদ্যোগ না নিত।

ঠিক এই ভাবেই চন্দ্রপুর মসজিদ, কৃষ্ণনগর মসজিদ, উদয়পুর কাকরাবান মসজিদ, চুমহানি মস্ক, ফোর্ট সিটি জমা মস্ক, কুমার ঘাট পাল বাজার মস্ক, ধর্ম নগর মস্ক, পানিসাগর সিআরপিএফ মস্ক, মসজিদ রাওয়া ছাতিমতলা পানিসাগর — মোট ১২টা মসজিদ বা মস্ককের উপর হামলা চালানো হয়।

Fascist attacks

৩টি বাড়িতে ভাঙচুর ও লুঠপাট

১) কেল শহরের আবদুল মান্নানের বাড়িতে দুবার হামলা হয়। ১৭ অক্টোবর প্রথমবার তার বাড়ি আক্রান্ত হয় এবং হিন্দুত্ববাদীরা তার বাড়িতে গেরুয়া পতাকা লাগিয়ে দিয়ে যায়। ২৬ অক্টোবর দ্বিতীয়বার তার বাড়িতে ভাঙচুর ও লুঠপাট চালানো হয়। তখন তার বাড়িতে চার বছরের বাচ্চা আর তার স্ত্রী ছিলেন। তার স্ত্রী, বাচ্চাকে নিয়ে বাড়ির পিছন দিক দিয়ে অন্ধকারে পালিয়ে যান। আবদুল মান্নান বাড়িতে ছিলেন না, আগরতলায় গিয়েছিলেন। তিনি একজন সুপরিচিত ব্যবসায়ী এবং তার একজন আত্মীয় দেশের আইনসভার সদস্য হওয়া সত্ত্বেও আক্রমণের হাত থেকে নিজেকে বাঁচাতে পারলেন না।

২) ধর্মনগরের সৈয়দ তহিদের বাড়িতে দাঙ্গাবাজরা হামলা চালায়। তার বাড়িটা একটা মস্কের দেওয়ালের লাগোয়া। দাঙ্গাবাজরা মস্কটার ক্ষতি করতে চেয়েছিল কিন্তু মস্কের দরজা ভাঙতে পারেনি। সৈয়দের বাড়ির প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র, চেয়ার সহ সমস্ত ফার্নিচার ভেঙে দিয়ে যায়।

৩) পানিসাগর অঞ্চলে সাইনা বেগমের বাড়িতে হিন্দুত্ববাদী গুন্ডারা জোর করে ঢোকে। তারসাথে অশোভন আচরণ করে এবং তার গলা থেকে চেন, হার জোর করে নিয়ে নেয়। ঘরের জিনিষপত্র লুঠপাট করে, এমনকি বাথরুমের দরজাটাও ভেঙে দিয়ে যায়।

অনুসন্ধানের পর সমস্ত দিক বিচার করে অনুসন্ধানকারী দলের পক্ষ থেকে নিম্নলিখিত ৮ দফা দাবি করা হয়।

১) সরকারের উচিত হাইকোর্টের অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতির নেতৃত্বে একটি তদন্ত কমিটি তৈরি করা যা পুরো ঘটনার তদন্ত করবে।

২) যারা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন তাঁদের অভিযোগের ভিত্তিতে আলাদা এফআইআর দায়ের করা।

৩) এই ঘটনায় যারা আর্থিক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন তাদের সরকারের পক্ষ থেকে আর্থিক ক্ষতিপূরণ দেওয়া, যাতে এই নিরীহ মানুষেরা স্বাভাবিক জীবন অতিবাহিত করতে পারেন।

৪) সরকারের উচিত যে সকল ধর্মীয় স্থান ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে তা সরকারি টাকায় নতুন করে বানিয়ে দেওয়া।

৫)) এই হিংসাকে ঠেকানোর সুযোগ থাকতেও যেসব পুলিশ তার দায়িত্ব পালন করেনি তাদেরকে পদ থেকে বরখাস্ত করা এবং নতুন পুলিশ অফিসার নিয়োগ করা।

৬) যে ব্যক্তি বা সংগঠন প্রফেট মহম্মদকে অসম্মান করে শ্লোগান তুলেছিল তাদের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান গ্রহণ করা যাতে দেশের সৌহার্দ্যপূর্ণ পরিবেশ বিনষ্ট না হয়।

৭) যারা মিথ্যা এবং উত্তেজক খবর তৈরি করেছে বা সোশ্যাল মিডিয়ার মাধ্যমে ছড়িয়েছে সেই সব ব্যক্তি বা সংগঠনের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা এবং তাদের বিরুদ্ধে মামলা রুজু করা।

৮) যেসব দোষীরা এই দাঙ্গা, ভাঙচুর, লুঠপাট এবং অগ্নি সংযোগে যুক্ত হিসাবে চিহ্নিত হবে তাদের ফাস্ট ট্র্যাক কোর্টে বিচার করতে হবে কোনো রকম পক্ষপাতিত্ব ছাড়াই।

খুবই সংক্ষিপ্ত আকারে রিপোর্টটা এখানে দেওয়া হল যার মধ্য দিয়ে ঘটনার ভয়ঙ্করতা সম্পর্কে সহজেই অনুমান করা যেতে পারে। এই রিপোর্ট বা আইনজীবীদের অনুসন্ধানকারী দলের ৮টি দাবির প্রতি ত্রিপুরার বিজেপি সরকার বিন্দুমাত্র গুরুত্ব না দিয়ে আইনজীবীদের বিরুদ্ধেই মিথ্যা অভিযোগ দায়ের করল। “পরবর্তীতে দেখা গেল আরও দুজন মহিলা সাংবাদিক সমৃদ্ধি সাকুনিয়া ও স্বর্ণা ঝাকে একই ঘটনার রিপোর্ট তৈরি করার অপরাধে হেনস্থা করা হল এবং মিথ্যা মামলায় গ্রেফতার করা হল।”

ইতিমধ্যে এই ঘটনাকে নিন্দা জানিয়ে দেশের বিভিন্ন রাজ্যে আইনজীবী, ছাত্র-যুব, সামাজিক সংগঠনগুলি প্রতিবাদে সামিল হয়েছেন। এই সংগঠনগুলি হল, অল ইন্ডিয়া লইয়ার্স এ্যাসোসিয়েশন ফর জাস্টিস (আইলাজ), এআইএসএ, লইয়ার্স ফর সোশ্যাল জাস্টিস অ্যান্ড হিউম্যান রাইটস্ (পশ্চিমবঙ্গ), এআইএসএফ, এআইসিসিটিইউ, এসএফআই, এপিসিআর, এপিডিআর, বিসিএম, ভীম আর্মি, দিশা, কর্ণাটক, জনশক্তি, এনএপিএম, এনবিসি, এনটিইউআই, রেহাই মঞ্চ, অল ইন্ডিয়া লইয়ার্স ইউনিয়ন (আইলু) এবং এনসিএইচআরও।

‘লইয়ার্স ফর সোশ্যাল জাস্টিস অ্যান্ড হিউম্যান রাইটস্’এর মুখপত্র ‘সোশ্যাল জাস্টিস’ পত্রিকার সম্পাদক এবং ‘অল ইন্ডিয়া লইয়ার্স এ্যাসোসিয়েশন ফর জাস্টিস’এর উপদেষ্টা বরিষ্ঠ আইনজীবী সুজয় ভট্টাচার্য তাঁর প্রতিক্রিয়ায় জানান, “দিল্লীর কয়েকজন আইনজীবী, যাঁরা বিভিন্ন মানবাধিকার রক্ষা কর্মোদ্যগের সঙ্গে যুক্ত, তাঁরা ত্রিপুরা গিয়েছিলেন তথ্যানুসন্ধানের জন্য। তথ্যানুসন্ধানের পর তাঁরা দিল্লীতে প্রেস কনফারেন্স আহ্বান করে একটি রিপোর্ট পেশ করেন। রিপোর্টে দেখা যায় যে বিশ্ব হিন্দু পরিষদ ও আরো কয়েকটি সংগঠন ত্রিপুরার কিছু এলাকায় সাম্প্রদায়িক হিংসার ঘটনা ঘটিয়েছে। প্রায় সঙ্গেসঙ্গেই ত্রিপুরা পুলিশ ঐ আইনজীবীদের বিরুদ্ধে পেনাল কোড ও ইউএপিএ আইনের একাধিক ধারায় মামলা রুজু করে দেয় ও সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহারকারী বহু মানুষের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে উদ্যোগ নেয়। আইনজীবীরা সুপ্রিম কোর্টে মামলা খারিজের জন্য দরখাস্ত করেছেন। সুপ্রিম কোর্টের রায়ের জন্য আমরা অপেক্ষা নিশ্চয়ই করব। কিন্ত‍ু এটা লক্ষ্যনীয় যে বিজেপি পরিচালিত কেন্দ্রীয় ও বিভিন্ন রাজ্য সরকার দেশ বা রাজ্য চালানোর জন্য ক্রমশ কালাকানুনগুলির ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ছেন এবং সাধারণ মানুষের বাকস্বাধীনতা ও মত প্রকাশের অধিকারকে দমন করার জন্য কালাকানুনগুলির ব্যবহার হচ্ছে। আমরা আশা করি যে শুভবুদ্ধিসম্পন্ন সকল মানুষ এর প্রতিবাদে এগিয়ে আসবেন।”

ঠিকই, আজ যখন ফ্যাসিস্ট ধর্মীয় উন্মাদরা দেশের সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতিকে ধ্বংস করতে মরিয়া হামলা নামাচ্ছে, দেশের ধর্মনিরপেক্ষ সাংবাদিক, আন্তর্জাতিক সাংবাদিক, আইনজীবী, সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহারকারীদের মিথ্যা মামলায় ফাঁসিয়ে চুপ করাতে চাইছে তখন দেশের সমস্ত শুভবুদ্ধি সম্পন্ন মানুষের ঐক্যবদ্ধ হওয়া এবং প্রতিবাদে সামিল হওয়া সময়ের দাবি।

- লইয়ার্স ফর সোশ্যাল জাস্টিস অ্যান্ড হিউম্যান রাইটস্ এবং অল ইন্ডিয়া লইয়ার্স এ্যাসোসিয়েশন ফর জাস্টিস’এর পক্ষ থেকে
আইনজীবী মালা সেন এবং আইনজীবী দিবাকর ভট্টাচার্য।

খণ্ড-28
সংখ্যা-40
18-11-2021