deshabrati logo-28-10-21
deshabrati 28 oct 2021

across two Bengals

বাংলাদেশে প্রতি বছরের মতো এবারও কয়েক হাজার মণ্ডপে হচ্ছিল বারোয়ারি দুর্গা পুজো। কিন্তু সপ্তমীর মাঝরাতের পর থেকেই এই পুজোকে কেন্দ্র করে এমন কিছু ঘটনা ঘটে, যা চলে আসে আন্তর্জাতিক সংবাদ মাধ্যমের নজরে। ভারতে বিশেষত পশ্চিমবাংলার সর্বত্র তা চর্চিত হতে থাকে। বিষয়টি নিয়ে উদ্বেগ, আশঙ্কা, ক্ষোভ, প্রতিবাদ আছড়ে পড়তে থাকে দুই বাংলা জুড়েই।

কুমিল্লার একটি পূজামণ্ডপকে কেন্দ্র করে শুরু হয় দুর্ভাগ্যজনক ঘটনা পরম্পরা। পূজামণ্ডপটি ছিল কুমিল্লা শহরেই নানুয়াদীঘির পাড়ে, যে দীঘির চারপাশে অনেক হিন্দু পরিবারের বসবাস। তারা ২০ বছরের বেশি সময় ধরে অস্থায়ী মণ্ডপ তৈরি করে সেখানে দুর্গাপূজা করে আসছেন। পূজার আয়োজকরা জানিয়েছেন, সপ্তমী শেষে রাত আড়াইটা পর্যন্ত তাদের পূজা মণ্ডপে লোকজন ছিল। এরপর লোকজন চলে গেলে আয়োজকরা অস্থায়ী মঞ্চের মূল পূজামণ্ডপ পর্দা দিয়ে ঘিরে রেখেছিলেন। সেই মঞ্চের বাইরে অল্প দূরত্বে গণেশের মূর্তি ছিল, সেটি উন্মুক্ত ছিল। সেখানেই কেউ রেখে গিয়েছিল ‘কোরআন’।

একজন তরুণের ট্রিপল নাইনে ফোন করা এবং আরেকজনের ফেসবুক লাইভ করা — এই দু’টি ঘটনার মাধ্যমে অষ্টমীর ভোর থেকে বিষয়টা জানাজানি হয়। খবর পেয়ে কুমিল্লার কোতোয়ালি থানা পুলিশের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা সকাল সাড়ে সাতটার দিকে ঘটনাস্থলে আসেন। এরপর ওই পুলিশ কর্মকর্তা পূজামণ্ডপ থেকে ‘কোরআন’ সরিয়ে নিয়ে যান। এর অল্প সময়ের মধ্যেই গোটা এলাকায় উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে এবং হামলা হয় তাদের মণ্ডপে। ‘কোরআন’ পাওয়ার খবর ছড়িয়ে পড়লে অল্প সময়েই সেখানে অনেক মানুষ জড়ো হয়। তারা পূজা বন্ধ করে দেওয়ার দাবি তোলে এবং চরম উত্তেজনার সৃষ্টি হয়। এক পর্যায়ে জড়ো হওয়া লোকজন পূজামণ্ডপে হামলা চালায় এবং অস্থায়ী মঞ্চ আর প্রতিমা ভাঙচুর করে। এরপর কুমিল্লারই বিভিন্ন পূজামণ্ডপে এবং হিন্দুদের বাড়িঘরে হামলা হয়। এরপর হামলা ক্রমশ ছড়াতে থাকে এবং বাংলাদেশের নানা জায়গায় হিন্দুদের ওপর আক্রমণ সংগঠিত হয়। কুমিল্লার মণ্ডপ-মন্দিরে হামলার পর আরো ২২টি জেলায় সংখ্যালঘু হিন্দু সম্প্রদায়ের উপর হামলা হয়েছে প্রকাশ্যেই। কুমিল্লার ঘটনার পর ওই দিনই চাঁদপুরের হাজীগঞ্জে ও পরে সারাদেশে এ সহিংসতার জের ধরে পরিস্থিতি খানিকটা নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়। বেশ কয়েকজন হতাহত হন। ব্যাপক সম্পত্তি ধ্বংস করা হয়।

বাংলাদেশে অতীতে নানা ঘটনায় হিন্দু সম্প্রদায়ের লোকজনের উপর হামলা বা আক্রমণের ঘটনা যেমন ঘটেছে, কখনো কখনো মন্দির বা পূজার প্রস্তুতিকালীন সময়ে প্রতিমা ভাঙচুরের বিচ্ছিন্ন ঘটনাও ঘটেছে। কিন্তু এবার দুর্গাপূজার সময়ে যেভাবে ব্যাপক মাত্রায় হামলা ও সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে, এমনটা সাম্প্রতিককালে দেখা যায়নি।

Protests against attacks on minorities

 

সংখ্যালঘু হিন্দু সম্প্রদায়ের ওপর মৌলবাদী দুর্বৃত্ত শক্তির সহিংস সংগঠিত আক্রমণ নিয়ে বাংলাদেশের ভেতরে ও বাইরে প্রতিবাদের ঝড় ওঠে। বাংলাদেশের বামপন্থী মহল ঘটনাধারার প্রতিবাদে প্রথম থেকেই সক্রিয় থেকেছেন। লেখক, শিল্পী, সাহিত্যিক, বুদ্ধিজীবীরা সংগঠিতভাবে প্রতিবাদে সামিল হন। হিন্দুদের প্রতিমা মণ্ডপ বাড়িঘর রক্ষায় নানা জায়গায় এগিয়ে আসেন মুসলিম সম্প্রদায়ের বিবেকী মানুষজন। এই সব ঘটনাবলী ধীরে ধীরে পরিস্থিতিকে নিয়ন্ত্রণের দিকে নিয়ে আসে।

এই ঘটনায় প্রশাসনের দিক থেকে গাফিলতির অভিযোগ উঠেছে নানা মহল থেকে। কেউ কেউ হাসিনা সরকার ও শাসক আওয়ামী লীগ বা তার কোনও কোনও অংশের সঙ্গে হেফাজতে ইসলাম সহ সাম্প্রদায়িক শক্তির বোঝাপড়ার অভিযোগ তুলেছেন এবং মনে করছেন এই ধরনের আঁতাতের ফলেই দুর্বৃত্তরা এত বেপরোয়া ঘটনা ঘটানোর সুযোগ পেয়েছে। শাসক শিবির অবশ্য এই ধরনের ঘটনার জন্য জামাত শিবির ও তাদের মদতদাতা বিএনপি’র দিকে অভিযোগের তীর নিক্ষেপ করেছে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, আওয়ামী সরকার ও পুলিশ প্রশাসনের তরফে গোটা ঘটনায় সংখ্যালঘু হিন্দুদের পাশে থাকার বার্তা দেওয়া হয়েছে। মন্দির, মণ্ডপ ও সংখ্যালঘু হিন্দুদের ওপর তাণ্ডব চালানোর অভিযোগে দেশজুড়ে ব্যপক সংখ্যায় দুর্বৃত্তদের গ্রেপ্তার করা হয়েছে। কুমিল্লার পূজামণ্ডপে ‘কোরআন’ রাখার যে ঘটনা থেকে বাংলাদেশের বিভিন্ন স্থানে সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা ও হিংসা ছড়িয়ে পড়েছিল, সেই ঘটনার প্রধান সন্দেহভাজন ইকবাল হোসেনকে গ্রেফতার করা হয়েছে বলে পুলিশ জানিয়েছে। তবে ইকবালকে এই কাজে উস্কানি দেওয়া হয়েছিল বলেই মনে করা হচ্ছে এবং এর পেছনে সক্রিয় থাকা চক্রান্তকারীদের পরিচয় উন্মোচন এখনো তদন্ত সাপেক্ষ। বাংলাদেশের সরকার বলেছে মুক্তিযুদ্ধের অসাম্প্রদায়িক চেতনা ও মুক্তিযুদ্ধের মধ্যে দিয়ে তৈরি হওয়া বঙ্গবন্ধু মুজিবর রহমানের সময়ে তৈরি সংবিধানের ধর্মনিরপেক্ষ চরিত্রটিকে আবার সম্পূর্ণভাবে ফিরিয়ে আনতে সংসদে প্রস্তাব পাশ করানো হবে।

বাংলাদেশের ঘটনার প্রতিবাদে কলকাতা সহ পশ্চিমবাংলার নানা জায়গায় প্রতিবাদ কর্মসূচি পালিত হয়েছে। কলকাতায় বাংলাদেশ হাইকমিশনে গণডেপুটেশন দেওয়া হয়েছে। বুদ্ধিজীবীদের পক্ষ থেকে জারি করা হয়েছে বেশ কয়েকটি বিবৃতি। বাংলাদেশের সংখ্যালঘুদের স্বার্থরক্ষার দাবি তোলার পাশাপাশি ভারতে, বিশেষ করে পশ্চিমবঙ্গে বিজেপি-আরএসএস বাংলাদেশের ঘটনাকে ব্যবহার করে যেভাবে সাম্প্রদায়িক উস্কানি সৃষ্টি করতে চাইছে, সে বিষয়েও বিবৃতি ও প্রতিবাদ কর্মসূচিগুলির মাধ্যমে মানুষকে সতর্ক করার চেষ্টা জারী রয়েছে। গোটা উপমহাদেশ জুড়ে গণতন্ত্র রক্ষা ও প্রসারের অন্যতম প্রধান শর্ত হিসেবে সংখ্যালঘুদের স্বার্থ রক্ষায় সরকার, পুলিশ, প্রশাসন, রাজনৈতিক দল, সমস্ত শুভবুদ্ধি সম্পন্ন মানুষ ও সংগঠনগুলিকে যে আরো সক্রিয় হতে হবে — বাংলাদেশের ঘটনাবলী তা আরো একবার চোখে আঙুল দিয়ে আমাদের দেখিয়ে দিচ্ছে।

- সৌভিক ঘোষাল

Violence in Bangladesh

(১৮ অক্টোবর ২০২১ এই বিবৃতি দেওয়া হয়)

বাংলাদেশে সংখ‍্যালঘু হিন্দু সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে যে সাম্প্রদায়িক জিঘাংসা চলছে তাতে সিপিআই(এমএল) গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করছে। বাংলাদেশের হিন্দুদের সবচেয়ে বড় উৎসব দুর্গাপূজাকে সংকীর্ণ সাম্প্রদায়িক শক্তি হিংস্র আক্রমণ চালানোর উপলক্ষ‍্য বানিয়েছে এবং ইতিমধ‍্যেই অনেকগুলি জেলাতে এই হামলা ছড়িয়ে পড়েছে ও তাতে বেশ কয়েকজন মারা গেছেন। অপরাধীদের খুঁজে বার করে শাস্তি দেওয়ার যে ঘোষণা বাংলাদেশ সরকার করেছে তাকে আমরা স্বাগত জানাই। সেই সাথে আমরা দাবি জানাচ্ছি, বাংলাদেশের সংখ‍্যালঘু হিন্দু সম্প্রদায় যাতে আর নিরাপত্তাহীনতা ও প্রান্তিকীকরণের শিকার না হয় তা নিশ্চিত করতে হবে সরকারকে।

সাম্প্রদায়িক হিংসায় আক্রান্ত মানুষদের পাশে দাঁড়িয়ে এবং উপমহাদেশের সমন্বয়বাদী সংস্কৃতি রক্ষায় বাংলাদেশের বামপন্থী দলগুলি এবং বাংলাদেশের মানুষ যেভাবে সক্রিয় হয়েছেন এবং বিবিধ কর্মসূচি সংগঠিত করেছেন তাকে আমরা সংহতি ও অভিনন্দন জানাই। বাংলাদেশের সাম্প্রদায়িক হত‍্যার বিরুদ্ধে ঐক‍্যবদ্ধ প্রতিবাদ গড়ে তুলতে ভারত ও বাংলাদেশের সকল শান্তিকামী মানুষের কাছে আমরা আবেদন জানাচ্ছি, আবেদন জানাচ্ছি এই উপমহাদেশের সমস্ত সাম্প্রদায়িক শক্তিকে পরাস্ত করতে। বাংলাদেশের এই দুর্ভাগ‍্যজনক ঘটনাকে হাতিয়ার করে ভারতের সামাজিক পরিবেশকে বিষিয়ে তুলতে দেওয়া যাবে না, ভারতের সংখ‍্যালঘু মুসলমান সম্প্রদায়ের অধিকার ও নিরাপত্তাকে খর্ব করতে দেওয়া যাবে না।

- কেন্দ্রীয় কমিটি, সিপিআই(এমএল) লিবারেশন

frozen at birth

এক কন্যা সন্তানকে জন্মের চব্বিশ ঘন্টার মধ্যে শ্বাসরোধ করে মেরে ফেলা হল। মেরেছেন অন্য কেউ নয়, শিশুকন্যার জন্মদাত্রী বছর একুশের মা। এহেন সদ্যোজাতিকা হত্যার ৯৫ শতাংশই ঘটে থাকে হাসপাতাল/নার্সিং হোমের বাইরে, বাড়িতে বা অন্যত্র। সেটা এবার ঘটল নার্সিং হোমেই। অথচ আউটডোরে প্রসূতি বিভাগে বড় বড় করে বোর্ডে লেখা থাকে “কন্যাভ্রূণ হত্যা দন্ডনীয় অপরাধ”। তা সত্বেও কেন ঘটল এমনটি? চলবে তার আর্থ-সামাজিক-পারিবারিক-মনোবৈজ্ঞানিক অনুসন্ধান। স্বামী বা শ্বশুরবাড়ির দিক থেকে কোন ‘অবাঞ্ছিত’ চাপ ছিল বলে খবর নেই। বরং প্রকাশিত হিমশৈলের খবর যদি সত্যের স্বীকারোক্তি হয় তবে মৃতকন্যার মায়ের আক্ষেপ আত্মবিলাপ উড়িয়ে দেওয়ার নয়। মেয়ে হয়ে জন্মানো আর প্রতিপালিত হওয়ার কত জ্বালা সেটা তাঁদের সাত বোনের বাবা-মায়ের দুঃখ-কষ্ট-যন্ত্রণা থেকে হাড়ে হাড়ে জানা আছে। তাই কি এক কন্যেতেই পুনরাবৃত্তির ভয়াতঙ্কে শেষ করে দিলেন আত্মজাকে! চরম সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর এই মন-মানসিকতা অবশ্যই সমর্থন করার নয়। কিন্তু ‘পাষাণ’ বলে ধিক্কার জানানো বা খুনী সাব্যস্ত করে সাজা দেওয়ার মধ্যে কোনও প্রতিষেধক টোটকা নেই। বরং অনুভব করা দরকার কী গভীর শঙ্কা-ভয়ে চেপে বসলে তবে একজন মা এরকম ঘটিয়ে ফেলেন। কেন আজও এক দুঃস্বপ্ন সমান নিরাপত্তায় ও সুযোগে বাঁচার মৌলিক চাওয়া-পাওয়া কেড়ে নেয়! দুশ্চিন্তার কারণগুলি রয়েছে আমাদের সমাজ ও রাষ্ট্র ব্যবস্থার গভীরে? আজও কেন ছেলেমেয়েতে ভাগ করা, তফাত করা, বৈষম্য করা হয়, মেয়েরা কেন কেবল লিঙ্গ-ভিত্তিক একচক্ষুর শিকার হয়ে চলছে?

দৃষ্টিভঙ্গীর দোষে দুষ্ট যেমন সমাজ, তেমনি রাষ্ট্র ব্যবস্থায়ও চলছে মূলত একই পুরুষ পক্ষপাতের দূষণ ছড়ানো ইঞ্জিন, তা সরকার ডবল ইঞ্জিনের হোক বা সিঙ্গল ইঞ্জিনের। তবে মেয়েদের অধিকার সবচেয়ে নৃশংস ও ন্যক্কারজনকভাবে কাটা পড়ছে ডবল ইঞ্জিনের তলায়। ‘ডবল ইঞ্জিন’ মানে একইসাথে কেন্দ্র-রাজ্যে ক্ষমতায় থাকা কেবলমাত্র নয়, ক্ষমতায় রয়েছে বিজেপি-আরএসএস-ও বটে। অন্যদিকে সিঙ্গল ইঞ্জিনের সরকারগুলির রাজ্যেও মেয়েদের বাঁচার অধিকার পীড়িতই হচ্ছে অধিক। বাংলায় তৃণমূল আমলেও নিরাপত্তাহীনতা থেকে নিস্তার মিলছে না।

এরাজ্যে জনসংখ্যায় প্রতি হাজার পুরুষের তুলনায় নারীর সংখ্যা ৯৫০। অন্যান্য পরিসংখ্যানগত প্রতিতুলনা পুনরুল্লেখের প্রয়োজন হয় না। সাক্ষরতা, প্রাথমি শিক্ষা-মধ্য শিক্ষা-উচ্চ শিক্ষা, জীবিকা ও অন্যান্য প্রশ্নে সবেতেই মেয়েদের বা মহিলাদের দুরবস্থা অনেক বেশি। মমতা সরকার কিছু সংস্কার কর্মসূচি নামিয়েছে। ‘কন্যাশ্রী’, ‘রূপশ্রী’, ‘স্বাস্থ্যসাথী’, ‘লক্ষীর ভান্ডার’; এর ফলে জনপ্রিয়তাও তুলনায় বেশি পাচ্ছে। কিন্তু আবার কিছু আশু জ্বলন্ত বিষয়ে এই সরকার অত্যন্ত নিস্পৃহ অসংবেদী উদাসীন আচরণ করে চলছে। যেমন আশা এবং মিড ডে মিল কর্মীদের ন্যূনতম সম্মানজনক বেতন ব্যবস্থার দাবি কানে তুলছে না। স্কুল শিক্ষাক্ষেত্রে কর্মপ্রার্থী মেয়েরা তাদের ন্যায়সঙ্গত দাবিতে দিনরাত রাস্তায় পড়ে থাকছেন, কোনও কোনও অংশ বদলির যুক্তিসঙ্গত দাবি জানিয়ে যাচ্ছে, কিন্তু সরকারের তরফ থেকে পাচ্ছেন নির্মমতা। উত্তরবঙ্গে জেলায় জেলায় একটানা ব্যাপক সংখ্যায় শিশুমৃত্যুর ঘটনা ঘটে গেল। এ তো নিছক শিশু মৃত্যুর মিছিল নয়, এক অর্থে শিশু হত্যার সিরিয়াল। সরকার একে ‘পরিবেশগত সচেতনতার অভাবের পরিণামবশত ফিবছরকার চিত্র’ বলে দায় এড়ানোর ছেঁদো কথা বলছে। তর্কের জন্য যদি ধরেই নেওয়া হয় ‘সচেতনতার অভাব’ হল এই পরিণামের পিছনে মূল কারণ। তাহলেও পাল্টা প্রশ্ন রয়ে যায়, আবশ্যিক সচেতনতা বাড়াতে কেন সরকার দুয়ারে যায় না? ভোট চাওয়ার সময় তো বেশ যায় !

শিশু সময় থেকেই সন্তানদের প্রতি দায় পরিবার, সমাজ, সরকার প্রত্যেকের রয়েছে। বিশেষ করে রয়েছে কন্যা সন্তানের প্রশ্নে হেয় করে দেখার মনোভাব দূর করার গুরুত্ব। ভাগ্য নির্ধারণের দায় সবচেয়ে বেশি সমাজ ও রাষ্ট্রের চালক-পরিচালকদের। তাই পাল্টাতে হবে কন্যা সন্তানের প্রতি বৈষম্যের দৃষ্টিভঙ্গী এবং অবহেলার অবস্থান। পরিবার যেখানে দায়িত্ব পালন করে উঠতে পারে না, সাধ্যের বাইরে চলে যায়, সেখানে কোন অজুহাতেই রাষ্ট্র দায়িত্ব দায়-দায়িত্ব অস্বীকার করতে পারে না, কাঠগড়ায় তুলতে হবে শাসকশ্রেণীকে।

Terrorists In Kashmir?

কাশ্মীর উপত্যকায় গত ২ অক্টোবর ২০২১ থেকে ছ'দিনে সাতজন সাধারণ নাগরিক খুন হয়েছেন যাদের মধ্যে চার জন হিন্দু বা শিখ সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের এবং তিনজন কাশ্মীরী মুসলমান। একটি নতুন জঙ্গি গোষ্ঠী যারা নিজেদের “রেজিস্ট্যান্স ফ্রন্ট” বলে থাকে, এই হত্যার দায় স্বীকার করেছে। ২০২১-এ জঙ্গিবাহিনীর হাতে ২৮ জন সাধারণ মানুষ খুন হয়েছেন যার মধ্যে পাঁচ জন কাশ্মীরী পণ্ডিত বা স্থানীয় শিখ সম্প্রদায়ের এবং দু’জন বিহারের হিন্দু পরিযায়ী শ্রমিক। উপত্যকায় হঠাৎ করে আবার এই সন্ত্রাসবাদী কার্যকলাপের বিপুল বিস্ফোরণ, যার নিশানায় সাধারণ নাগরিক এবং সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মানুষ, সেখানকার শান্তি ও সুস্থিতিকে ভীষণভাবে বিপর্যস্ত করে তুলছে। কেন মোদী সরকার, ২০১৯-এর আগস্টে ৩৭০ ধারা বিলোপের পর থেকে কাশ্মীর উপত্যকা যাদের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে, জঙ্গি হামলা থেকে সাধারণ মানুষ ও সংখ্যালঘুদের বাঁচাতে পারছে না? মোদী সরকার সমস্ত সুপরামর্শ নাকচ করে একগুঁয়ের মতো বলে গেছে — জোর করে ৩৭০ ধারা বাতিল করলেই নাকি উপত্যকায় সন্ত্রাসবাদ নির্মূল হবে। আর তার পরিবর্তে আমরা কী পেলাম — সাধারণ নাগরিকদের নিশানাকারী সন্ত্রাসবাদের নতুন উদ্যমে মাথাচাড়া দিয়ে ওঠা ! এখন প্রধানমন্ত্রী নিজেদের কৃতকর্মের ফল অন্যের ঘাড়ে চাপাতে পারেন না — এখন তাকে এবং তার প্রশাসনকেই জবাবদিহি করতে হবে — কেন কাশ্মীরের সাধারণ মানুষ এবং সংখ্যালঘুদের সন্ত্রাসবাদী হামলার মুখে ফেলে দেওয়া হয়েছে?

ভারতবর্ষের সর্বত্র এখন সংখ্যালঘুদের প্রতি সাম্প্রদায়িক হিংসা ও সন্ত্রাসবাদ তুঙ্গে পৌঁছেছে। নবরাত্রির সময়ে হিন্দু আধিপত্যবাদীরা মুসলিম বিক্রেতাদের ওপর হামলা করেছে; মধ্য প্রদেশে কলেজ চত্বরে “গরবা” উৎসব প্রাঙ্গণ থেকে মুসলিম ছাত্র ছাত্রীদের ঘাড় ধরে বের করে দেওয়া হয়েছে; মধ্যপ্রদেশেই হিন্দু-আধিপত্যকামীদের হাতে খ্রিস্টানরা মার খেয়েছেন; গাজিয়াবাদের দশনায় যতি নাসিনহানন্দ তার মন্দির চত্বরে ভিডিওতে মুসলিম শিশুদের হেনস্থা করেই চলেছে; ইন্দোরের কাছে পেওড়া গ্রামে একটিই মাত্র মুসলিম পরিবারের বাস-হিন্দুত্ববাদী এক জনতা তাদের ওপর হামলা চালায় এবং তাদের ভিটে থেকে উৎখাতের চেষ্টা করে; ‘শ্রীরাম সেনা হিন্দুস্তান’ নামে এক সন্ত্রাসবাদী সংগঠন আরবাজ নামে এক মুসলিম যুবককে মুণ্ডচ্ছেদ করে হত্যা করেছে; ছত্তিশগড়ের কাওয়ার্ধায় মুসলিমদের ওপর সাম্প্রদায়িক হামলা হয়েছে; উত্তরপ্রদেশের শামলীতে এক মুসলিম যুবককে পিটিয়ে মেরে ফেলা হয়েছে — প্রত্যেকদিন এই তালিকা ক্রমশ দীর্ঘতর হচ্ছে।

লখিমপুর খেরির গণহত্যা এক সন্ত্রাসবাদী হামলার থেকে কোন অংশে কম নয়, যেখানে এক স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রীর ছেলে তার ইউএসভি গাড়ি আন্দোলনরত কৃষকদের ওপর দিয়ে চালিয়ে দিয়েছে। আর ঐ অভিযুক্ত মন্ত্রীকে বরখাস্ত করার দাবিতে যে ছাত্রীরা স্বরাষ্ট্র মন্ত্রীর বাসভবনের সামনে বিক্ষোভ দেখাচ্ছিলেন, দিল্লি পুলিশের আধিকারিকরা তাদের ওপর যৌন নিপীড়ন চালায়। এই বর্বরতার জন্যে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ এবং প্রধানমন্ত্রী মোদী ছাড়া আর কে দায়ী হতে পারে?

কী বিচিত্র পরিহাস! জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের ২৮তম প্রতিষ্ঠা দিবসে ভাষণ দিতে গিয়ে প্রধানমন্ত্রী মোদী মানবাধিকার কর্মীদলেরই আক্রমণের জন্য বেছে নেন। তার অভিযোগ, তারা নাকি তাদের “পছন্দমতো কিছু কিছু নির্যাতনের” ঘটনায় সরব হন! সত্যিটা হল, তার স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ বেছে বেছে মুসলিমদের “উইপোকা” বলেন! তাদের “মনুষ্য” পদবাচ্য বলেই মনে করেন না! কাশ্মীরের কাশ্মীরী পণ্ডিত এবং হিন্দু/শিখ সংখ্যালঘু মানুষ হোন অথবা গোটা দেশের মুসলমান সংখ্যালঘু মানুষই হোন — মোদী সরকার এবং বিজেপি তাদের অধিকার লঙ্ঘন করে চলেছে। আর ভারতের পুলিশ এবং সামরিক বাহিনী তো হেফাজতে নির্যাতন, হত্যা এবং মানবাধিকার ও নাগরিক স্বাধীনতা লঙ্ঘনের জন্য ‘বিশ্বখ্যাত’ হয়ে উঠেছে!

জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের চেয়ারপার্সন জাস্টিস অরুণ মিশ্র এই উপলক্ষটা প্রধানমন্ত্রী মোদীর দরাজ প্রশস্তি গাওয়ার সুযোগ হিসেবে কাজে লাগিয়ে তার ভাষণে বলেন, “আপনারই জন্য জম্মু ও কাশ্মীরে এক নতুন যুগের সূচনা হয়েছে”। এই ভাষণ জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের মৃত্যুর ‘শোকবার্তা’ হিসেবেই মনে থাকবে। যদি মানবাধিকার সংস্থার চেয়ারপার্সন কোনও রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান নিয়ে এমন বিবৃতি দিতেন, মনে হত তিনি প্রতিবেদকের ভূমিকায় আছেন, কিন্তু এটা শুধু চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিল যে জাতীয় মানবাধিকার কমিশন একটা ‘পুতুল’, একটা ক্রীড়নকে পরিণত হয়েছে! অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল-এর মতো আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলিকে মোদী সরকার ভারত থেকে উৎখাত করেছে। শুধু তাই নয়, এই সরকার সুধা ভরদ্বাজ এবং গৌতম নওলখার মতো মানবাধিকার রক্ষার অগ্রণী ব্যক্তিত্বদের দানবীয় ইউএপিএ আইনে জেলে পুরে রেখেছে।

এই মুহূর্তে সবচেয়ে জরুরি হল, মানুষের ঐক্যবদ্ধ হওয়া ও সাম্প্রদায়িক ও বিভেদকামী শক্তিগুলিকে প্রত্যাঘাত হানা এবং সন্ত্রাসবাদ ও অধিকার লঙ্ঘনের জন্য মোদী সরকারকে দায়ী করা। উপত্যকায় এই হত্যাকে কাজে লাগিয়ে বিজেপিকে কিছুতেই মুসলিমদের বিরুদ্ধে হিংসা ও ঘৃণা ছড়াতে বা উপত্যকায় অধিকার হরণের অনুমোদন দিতে দেওয়া যাবে না।

(এম-এল আপডেট সম্পাদকীয়, ১২ অক্টোবর ২০২১)

Assault on Federalism

সারা দেশ যখন লখিমপুর খেরির কৃষক হত্যাকাণ্ডের মূল নায়ক ও সংগঠক মন্ত্রী অজয় মিশ্রর (এই অজয় মিশ্রকে কিছুদিন আগে স্বরাষ্ট্র দপ্তরের রাজ্য প্রতিমন্ত্রী তথা অমিত শাহের ডেপুটি হিসেবে মোদীর ক্যাবিনেটে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছিল) পদত্যাগ দাবি করছে তখন কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রক চুপিচুপি আরেকটি প্রবল জনবিরোধী অর্ডার পাস করল। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রক একটি নির্দেশিকা জারি করে সীমা সুরক্ষা বলের অধিক্ষেত্র বাড়িয়ে দিল। পূর্ব ও পশ্চিম সীমান্তের আসাম, পশ্চিমবঙ্গ ও পাঞ্জাব রাজ্যে ১৫ কিলোমিটার থেকে বাড়িয়ে ৫০ কিলোমিটার করা হয়েছে বিএসএফ’এর অধিক্ষেত্র। গুজরাট রাজ্যের ক্ষেত্রে আগে ছিল ৮০ কিলোমিটার, এখন কমিয়ে করা হয়েছে ৫০ কিলোমিটার। এই নির্দেশিকা অনুসারে সীমান্ত থেকে দেশের ৫০ কিলোমিটার ভেতর পর্যন্ত বিএসএফ তল্লাশি চালানো, গ্রেপ্তার করা ও বাজেয়াপ্ত করার অভিযান চালাতে পারবে সংশ্লিষ্ট রাজ্য সরকার বা স্থানীয় প্রশাসনের অনুমতি ছাড়াই।

১৯৬৫ সালে ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধের সময়ে সীমা সুরক্ষা বল গঠন করা হয়েছিল ভারতের আন্তর্জাতিক সীমা সুরক্ষিত রাখতে। গত পাঁচ দশকে এই সীমা সুরক্ষা বাহিনী প্রভূত পরিমাণে বৃদ্ধি ঘটানো হয়েছে আভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা সুরক্ষিত রাখতে, রাষ্ট্রের ভাষায় কাউন্টার-ইনসার্জেন্সি ও কাউন্টার-টেররিজমের বিরুদ্ধে অভিযান চালাতে। অন্যান্য আধাসামরিক বাহিনীর মতো বিএসএফ’ও মানবাধিকারের ব্যাপক অবমাননার অভিযোগে অভিযুক্ত। সাম্প্রতিক বছরগুলিতে বাংলাদেশের সাথে ভারতের দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক বিকাশের ক্ষেত্রে বিএসএফ বারবার সমস্যার বিষয় হয়ে উঠেছে। কিন্তু, সীমান্ত এলাকায় বসবাসকারী ভারতীয়দের যে অত্যাচার ও হয়রানি সহ্য করতে হয় তা সেভাবে নথিভুক্ত ও চর্চিত হয়নি।

সীমান্ত এলাকায় বসবাসকারী মানুষেরা কোনও অভিযোগ দায়ের করতে অত্যন্ত ভীতসন্ত্রস্ত থাকেন। কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রকের পৃষ্ঠপোষকতায় বিএসএফ এইসব এলাকায় সবরকমের ছাড় পেয়ে যায়, অনেকটা যেমন কুখ্যাত ‘আফস্পা’ আইনে সশস্ত্র সেনা ভয়ঙ্কর ‘বিশেষ ক্ষমতা’ পেয়ে থাকে। বর্তমান নির্দেশিকাটি পাঞ্জাব ও পশ্চিমবঙ্গে বিএসএফ’এর অধিক্ষেত্রকে তিনগুণের বেশি বাড়িয়ে দেবে। বিজেপির অভিবাসী-বিরোধী বিষাক্ত প্রচার এবং প্রতিবেশি দেশের সঙ্গে নাগরিকত্ব ও ভিসা সংক্রান্ত বিষয়ে হিংস্র সাম্প্রদায়িক অভিযানের কথা মাথায় রাখলে বুঝতে অসুবিধা হওয়ার কথা নয় যে বিএসএফ’এর এই বর্ধিত অধিক্ষেত্র ও ক্ষমতাবৃদ্ধি সেই অভিবাসী-বিরোধী অভিযানকেই আরও তীব্র করার কাজে ব্যবহৃত হবে এবং সীমান্ত এলাকায় এক স্থায়িরূপে বিভাজিত পরিবেশ কায়েম করবে।

বিএসএফ’এর অধিক্ষেত্র পরিবর্তন সংক্রান্ত নতুন নির্দেশিকাকে বৈধ করার চেষ্টা হচ্ছে কাজকর্ম চালানো ও অপরাধ দমনের কার্যকরী পদক্ষেপ হিসেবে। ঘটনা হল, গুজরাটে, যেখানে অধিক্ষেত্র ৮০ কিলোমিটার পর্যন্ত প্রসারিত ছিল, সেখানে মেগা স্মাগলিং ব্যবসায় রমরমা চলে। গত সেপ্টেম্বরেই তো বিপুল পরিমাণ, ৩০০০ কিলোগ্রাম, হেরোইন ধরা পড়ে গেল গুজরাটের কচ্ছে আদানি মালিকানায় চলা মুন্দ্রা বন্দরে। বিএসএফ’এর বর্ধিত অধিক্ষেত্র আসলে রাজ্যের আইনশৃঙ্খলার প্রশ্নে পেছনের দরজা দিয়ে কেন্দ্রের অবৈধ অনুপ্রবেশ। ঘটনাচক্রে, ইউপিএ সরকারের আমলে নরেন্দ্র মোদী গুজরাটের মুখ্যমন্ত্রী থাকাকালীন উচ্চকন্ঠে বিরোধিতা করেছিলেন বিএসএফ’এর ক্ষমতা বাড়ানোর প্রস্তাবকে যুক্তরাষ্ট্রীয়তার ওপর আক্রমণ হিসেবে চিহ্নিত করে। ২০১২’র এপ্রিল মাসে মনমোহন সিংকে অত্যন্ত কড়া শব্দ প্রয়োগে চিঠি লিখেছিলেন নরেন্দ্র মোদী রাজ্যের মধ্যে আরেক রাজ্য গঠন ও কেন্দ্র কর্তৃক রাজ্যের ক্ষমতা কেড়ে নেওয়ার চেষ্টা বলে বর্ণনা করে।

আজ কেন্দ্রীয় এজেন্সিগুলিকে মোদী সরকার অত্যন্ত ব্যবস্থিতভাবে ব্যবহার করছে বিরোধী-শাসিত রাজ্য সরকারগুলির বিরুদ্ধে, রাজ্যের ক্ষমতা ও অধিকার খর্ব করতে। সিবিআই ও ইডি এবং এখন বিএসএফ — কেন্দ্রীয় এজেন্সি ও কেন্দ্রীয় বাহিনী মোদী সরকারের রাজনৈতিক অভিসন্ধি চরিতার্থ করতে বিভিন্নভাবে লাগাতার রাজ্য সরকার ও রাজ্য প্রশাসনের কর্তৃত্বকে খর্ব করে চলেছে। মোদী সরকারের অতিকেন্দ্রীকরণ অভিযান আইন প্রণয়ন ও অন্যান্য বিষয়ে ইউনিয়ন সরকার ও রাজ্য সরকারের মধ্যে ক্ষমতাভাগের সংবিধান প্রদত্ত যুক্তরাষ্ট্রীয়তার নির্দেশনাকে হাস্যকর করে তুলছে। রাজ্যের ক্ষমতাকে অন্যায়ভাবে নিজের হাতে নেওয়ার সবচেয়ে ন্যক্কারজনক উদাহরণ হল সাম্প্রতিক তিন কৃষি আইন। নয়া শিক্ষানীতি বা নীট (ডাক্তারি পড়তে একটিই কেন্দ্রীয় পরীক্ষা) থেকে শুরু করে জিএসটি ও কৃষি আইন, মোদী সরকারের প্রতিটি প্রধান উদ্যোগে রাজ্যের ক্ষমতাকে ক্ষয় করা হয়েছে। এরসাথে, সবচেয়ে মারাত্মক উদাহরণ হিসেবে আছে জম্মু ও কাশ্মীর। সেখানে রাতারাতি একটি রাজ্যের শুধু সাংবিধানিক পরিচিতি ও ক্ষমতা কেড়ে নেওয়া হয়েছে তাই নয়, রাজ্য হিসেবে অস্তিত্বই শেষ করে দিয়ে কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলে অবনমিত করা হয়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে দিল্লী ও লক্ষদ্বীপেও অনুরূপ আগ্রাসন চলেছে কেন্দ্রের। বিএসএফ তার মনযোগ কেন্দ্রীভূত করুক দেশের আন্তর্জাতিক সীমানা সুরক্ষিত রাখার কাজে। বিএসএফ’এর বর্ধিত অধিক্ষেত্র ও ক্ষমতা সীমা সুরক্ষা বল হিসেবে তার ঘোষিত কার্যকারিতাকেই দুর্বল করে তুলবে, ভারতের ইতিমধ্যে ক্ষয়ে যাওয়া মানবাধিকার পরিস্থিতি ও যুক্তরাষ্ট্রীয় কাঠামোকে দুর্বল করে তুলবে। মোদী সরকারের রাজনৈতিক অভিসন্ধি পূরণের হাতিয়ার হিসেবে বিএসএফ’কে ব্যবহার করা বন্ধ করতে হবে।

(এম-এল আপডেট সম্পাদকীয়, ১৯ অক্টোবর ২০২১)

Dalit Man

সিঙ্ঘু সীমান্তে লাখবীর সিং নামক এক দলিত ব‍্যক্তির হত‍্যাকাণ্ডকে সিপিআই(এমএল) তীব্রতম ভাষায় ধিক্কার জানাচ্ছে। নিহাঙ্গ শিখ গোষ্ঠি এই হত‍্যা সংঘটিত করেছে বলে অভিযোগ। উক্ত গোষ্ঠির পক্ষ থেকে যেভাবে এই হীন অপরাধকে বৈধতা দেওয়ার এবং নিহতের পরিবারকে দোষারোপ করার লাগাতার অপচেষ্টা চালানো হচ্ছে তারও তীব্র নিন্দা জানাচ্ছি আমরা।

শিখ ধর্মের পবিত্র গ্রন্থের অপবিত্রকরণের প্রতিক্রিয়াতেই এই হত‍্যাকাণ্ড সংঘটিত হয়েছে বলে দাবি করা হচ্ছে। শিখ সম্প্রদায়ের পবিত্র প্রতীককে অপমান করে আঘাত দেওয়ার কাজকে আমরা নিন্দা জানাই, কিন্তু ‘অপবিত্রকরণ’, ‘ধর্মদ্রোহিতা’, ‘ঈশ্বরনিন্দা’ বা ‘অপমান’এর কোনও দোহাই দিয়েই যে এই জঘন‍্য নৃশংস হত‍্যাকাণ্ডকে যুক্তিযুক্ত করা চলেনা তা সম্পূর্ণ দ্বিধাহীনভাবে জোরের সাথে তুলে ধরা দরকার। ধর্মীয় প্রতীককে রক্ষা করার নামে সাম্প্রদায়িক ও দলিত-বিরোধী সহিংসতাকে কোনও সভ‍্য সমাজে বৈধতা দেওয়া চলেনা। এই হীন অপরাধে যুক্ত সকল ব‍্যক্তিকে অবশ্যই বিচারের আওতায় এনে শাস্তি দিতে হবে।

লাখবীর সিং-এর গ্রাম থেকে যেসব খবর সাংবাদিকরা সামনে এনেছেন তা আরও অনেক গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন তুলে দিয়েছে। সমগ্র বিষয়টির পুঙ্খানুপুঙ্খ তদন্ত করেই সেসবের কোনও সদুত্তর পাওয়া যেতে পারে। চলমান কৃষক আন্দোলনের পক্ষ থেকেও এই মর্মান্তিক ঘটনাকে ধিক্কার জানান হয়েছে। এবং, এই ঘটনাকে কাজে লাগিয়ে আন্দোলনকারী কৃষকদের বদনাম করার ও লখিমপুর গণহত‍্যা থেকে নজর ঘোরানোর সমস্ত অপচেষ্টাকে দৃঢ়তার সাথে প্রতিরোধ করতে হবে।

- কেন্দ্রীয় কমিটি, সিপিআই(এমএল) লিবারেশন

APDR's state conference

গণতান্ত্রিক অধিকার রক্ষা সমিতির (এডিপিআর) ২ দিনব্যাপী ২৮তম রাজ্য সম্মেলন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা ছিল হুগলী জেলার শেওড়াফুলিতে। সম্মেলনের প্রস্তুতি কাজ চূড়ান্ত হওয়ার পর পুলিশ প্রশাসনের পক্ষ থেকে কোভিড-নিরাপত্তার অজুহাত তুলে সম্মেলনের অনুমতি খারিজ করা হয়েছে। সম্মেলনের জন্য ১ অক্টোবর পুলিশ প্রশাসনকে জানানো হয়েছিল।

বাংলার বুকে প্রাচীনতম অধিকার রক্ষা সংগঠন এপিডিআর বিগত ৫০ বছর ধরে সমস্ত রকম সরকারের স্বৈরাচারী প্রক্রিয়া ও সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে নিরন্তর লড়াই চালিয়ে গণতান্ত্রিক ও নাগরিক অধিকার রক্ষা আন্দোলনকে মান্যতায় প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হয়েছে।

এমন একটি মর্যাদাসম্পন্ন সংগঠনের গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে আয়োজিত সম্মেলনকে বিপর্যস্ত করতে মমতা সরকারের এই হীন ষড়যন্ত্রের আমরা তীব্র বিরোধিতা করি এবং প্রস্তাবিত সম্মেলনকে আনুষ্ঠানিকভাবে অনুমতি প্রদানের দাবি জানাই।

২৩ অক্টোবর এক প্রেস বিবৃতিতে উপরোক্ত বক্তব্য রেখেছেন সিপিআই(এমএল) লিবারেশনের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য সম্পাদক অভিজিৎ মজুমদার।

On Women Students

লখিমপুর খেরিতে কৃষিবিল বাতিলের দাবিতে অবস্থানরত কৃষকদের উপর কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র-দপ্তরের প্রতিমন্ত্রী অজয় মিশ্রর নেতৃত্বে হামলা চালায় বিজেপির নেতা ও কর্মীরা। অজয় মিশ্রকে স্বরাষ্ট্র-মন্ত্রক থেকে অপসারণের দাবিতে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে প্রতিবাদে নামেন ছাত্র-যুব-নারী-সাধারণ মেহনতী মানুষ। এর অংশ হিসাবে দিল্লীতে কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রী অমিত শাহের বাসভবনের সামনে বিক্ষোভ চালাচ্ছিলেন অল ইন্ডিয়া স্টুডেন্টস এ্যাসোসিয়েশনের প্রতিনিধিরা। কর্মসূচি থেকে টেনে হিঁচড়ে গ্রেপ্তার করা হয় বিক্ষোভরত ছাত্র-ছাত্রীদের। গ্রেপ্তার হওয়া অন্যান্য সাথীদের থেকে আইসার দু’জন নেত্রীকে বিচ্ছিন্ন করে নিয়ে যাওয়া হয় অন্য থানায়, তাদের ফোন কেড়ে নিয়ে পোশাক সরিয়ে যৌনাঙ্গে বারবার আঘাত করে এলোপাথারি লাথি মারা হয়।

এহেন ন্যক্কারজনক যৌন ও শারীরিক আক্রমণের বিরুদ্ধে সারা ভারত প্রগতিশীল মহিলা সমিতির পশ্চিমবঙ্গ শাখা তীব্র ধিক্কার জানায়। কলকাতায় মৌলালি মোড়ে এবং যাদবপুর ৮বি বাসস্ট্যান্ডের কাছে আইসা'র সাথে যৌথভাবে প্রতিবাদ সভা অনুষ্ঠিত করে। অমিত শাহের কুশপুতুল পোড়ানো হয়। প্রতিবাদ সভা থেকে আওয়াজ ওঠে — ছাত্রীদের যৌন নির্যাতননকারী পুলিশ আধিকারিক ও কর্মীদের অবিলম্বে গ্রেপ্তার ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দিতে হবে।

সভায় বক্তব্য রাখেন সমিতির রাজ্য সম্পাদিকা ইন্দ্রাণী দত্ত, রাজ্য নেত্রী চন্দ্রাস্মিতা চৌধুরী, সম্প্রীতি মুখার্জী, ছাত্রী বর্ষা বড়াল প্রমুখ। যাদবপুরে বক্তব্য রাখেন আইসা নেতা ঋতম মাঝি।

peasant movement

সংযুক্ত কিষাণ মোর্চার ডাকে দেশব্যাপী রেল অবরোধ কর্মসূচি এই রাজ্যের বিভিন্ন স্থানে সংগঠিত হয় গত ১৮ অক্টোবর। উত্তরপ্রদেশের লখিমপুর খেরিতে কৃষক হত্যার দায়ে কেন্দ্রীয় প্রতিমন্ত্রী অজয় মিশ্র টেনির বরখাস্ত ও গ্রেপ্তার, তিন কৃষি আইন প্রত্যাহার, বিদ্যুৎ আইন সংশোধনী বাতিল, এমএসপি আইন চালু করা প্রভৃতি দাবিতে রেল অবরোধ করা হয়। উত্তরবঙ্গের জলপাইগুড়ি জেলার ডেঙ্গুয়াঝাড় চা বাগানের পার্শ্ববর্তী রেল লাইন ও জলপাইগুড়ি রোড স্টেশন, বাঁকুড়ার ওন্দা রেল স্টেশন, বর্ধমানের শক্তিগড় স্টেশন, নদীয়ার কৃষ্ণনগর স্টেশন, উত্তর ২৪ পরগণার হৃদয়পুর সহ অন্যান্য জেলার বিভিন্ন রেল স্টেশনে অবরোধ হয়। প্রবল বৃষ্টির মধ্যেও বিভিন্ন কৃষক সংগঠন ও অন্যান্য গণসংগঠনের কর্মীরা যৌথভাবে অবরোধে অংশগ্রহণ করেন। এক ঘণ্টা বা তার কাছাকাছি সময়ব্যাপী অবরোধ চলে। রেলযাত্রী সহ ব্যাপক মানুষ অন্নদাতাদের দাবিগুলির প্রতি সহমর্মিতা জানায়। সারা ভারত কিষাণ মহাসভার পক্ষ থেকে বলা হয় মোদী সরকার যদি কৃষি আইন খারিজ না করে তাহলে দেশের কৃষক ও সর্বস্তরের মানুষ অদুর ভবিষ্যতে মোদী সরকারকেই খারিজ করে দেবে। দীর্ঘ দশ মাস পেরিয়ে যাওয়ার পর দিল্লীর কৃষক আন্দোলন আজ সারা দেশে ছড়িয়ে পড়েছে এবং দেশের কৃষি ও সরকারি ক্ষেত্রে কর্পোরেটের দখলদারীর বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলে এক রাজনৈতিক চরিত্র নিয়ে এগিয়ে চলেছে। আন্দোলনকারী কর্মীরা বেশি বেশি সংখ্যায় ও স্থানে পথে নামছেন। এরফলে একেবারে নীচুতলায় কৃষক আন্দোলনের বার্তা পৌঁছে যাচ্ছে, সেটা ব্যাপক মানুষের সমর্থন লাভ করছে। চলমান আন্দোলন বিজেপি-আরএসএস’এর ধর্মীয় বিভাজনের বিরুদ্ধে কৃষকের সংগ্রামী একতার বার্তা তুলে ধরেছে।

আগামীদিনে মোদী সরকারের দেশ বিক্রির নীতি ও মূল্যবৃদ্ধির বিরুদ্ধে, তিন কৃষি আইন ও শ্রম কোড বাতিলের দাবিতে রাজ্যের ব্লকে ব্লকে পদযাত্রা ও প্রতিটি জেলার গ্রামে গঞ্জের শতাধিক স্থানে প্রচার সভা করার কর্মসূচি ঘোষণা করেন কিষাণ মহাসভার নেতৃবৃন্দ।

Report from Lakhimpur

কৃষক গণহত্যার বর্বর ঘটনার অব্যবহিত পরেই গত ৩ অক্টোবর সিপিআই(এমএল) লিবারেশনের উত্তরপ্রদেশ ইউনিট থেকে ৬ সদস্যের এক তথ্যানুসন্ধানী দল লখিমপুর খেরির তিকোনিয়া পরিদর্শন করে। এই দলে ছিলেন সারা ভারত কিষাণ মহাসভা (এআইকেএম)-এর জাতীয় সম্পাদক ঈশ্বরী প্রসাদ কুশোয়াহা, সারা ভারত প্রগতিশীল মহিলা সমিতি (আইপোয়া)-র রাজ্য সভানেত্রী কৃষ্ণা অধিকারী, সারা ভারত কৃষি ও গ্রামীণ মজুর সমিতি (আয়ারলা)-র জাতীয় সভাপতি শ্রীরাম চৌধুরী, সিপিআই(এমএল) লিবারেশনের উত্তরপ্রদেশ রাজ্য স্ট্যান্ডিং কমিটির সদস্য ওমপ্রকাশ সিং ও আফরোজ আলম এবং রাজ্য কমিটির সদস্য রাজেশ সাহানি।

লখিমপুর জেলা হাসপাতালে ভর্তি থাকা আহত কষক নেতা তেজিন্দর সিং ভির্ক ও অন্যান্য আহত কৃষকদের সঙ্গে সাক্ষাতের পরে দলটি নিহত কৃষকদের মরদেহ নিয়ে চলতে থাকা প্রতিবাদ স্থলে যায়। দলের সদস্যরা শহীদ কৃষকদের শ্রদ্ধা জানান এবং শহীদদের পরিবারের মানুষ, প্রতিবাদরত কৃষক জনতা ও স্থানীয় মানুষের সাথে দেখা করে কথা বলে ঘটনার বিশদ তথ্য সংগ্রহ করেন।

সকলেই তাঁদের জানান যে, ৩ অক্টোবর লখিমপুরে উত্তরপ্রদেশের উপমুখ্যমন্ত্রী কেশব মৌর্য্য এবং কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী ও লখিমপুরের সাংসদ অজয় কুমার মিশ্র টেনির একটি কর্মসূচি ছিল। এরপরে কেশব মৌর্য্যের যাওয়ার কথা ছিল টেনির পৈতৃক ভিটা লখিমপুর খেরির তিকোনিয়ায়। কৃষকরা এটা জানতে পেরে টেনির কৃষক-বিরোধী বিবৃতির বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করার ও কালো পতাকা দেখানোর সিদ্ধান্ত নেন। এটা লক্ষ্যণীয় যে, টেনি হুমকির সুরে বলেছিল, “১০-১৫ জন ওখানে বসে আছে, এরপর যদি আমরাও যাই তাহলে পালানোর পথ পাবে না; আমরা তোমাদের ২ মিনিটে সোজা করে দেব, আমি নিছক একজন মন্ত্রী বা সাংসদ বা বিধায়ক নই। সাংসদ হবার আগে থেকে যারা আমাকে চেনে তারা জানে যে, আমি কোনো চ্যালেঞ্জ থেকে পালিয়ে যাই না। যেদিন আমি চ্যালেঞ্জটা নেব সেদিন তোমাদের কেবল পালিয়া নয়, ছাড়তে হবে লখিমপুরও ... এটা মনে রেখো”।

কৃষক ও স্থানীয় অধিবাসীরা তথ্যানুসন্ধানী দলকে জানান যে, অজয় কুমার মিশ্র টেনির অপরাধের ইতিহাস রয়েছে এবং তার বিরুদ্ধে এলাহাবাদ হাইকোর্টে একটি খুনের মামলা রয়েছে যার বদলা নিতে সে ‘কৃষকদেরকে একটা শিক্ষা দেওয়ার’ সিদ্ধান্ত নেয় এবং এই গণহত্যার পরিকল্পনা সেই সিদ্ধান্তেরই অংশ।

Lakhimpur Kheri

 

ঘটনার বিবরণ

বড় সংখ্যক কৃষক ঐদিন তিকোনিয়া হেলিপ্যাডে কেশব মৌর্য্য ও কেন্দ্রীয় মন্ত্রী টেনিকে কালো পতাকা দেখিয়ে প্রতিবাদের সিদ্ধান্ত নেন। ফলস্বরূপ কেশব মৌর্য্য তার যাত্রাপথ বদলাতে বাধ্য হয়। সেদিনের সফল প্রতিবাদ শেষে ফেরার সময়ে অজয় টেনির পুত্র আশীষ মিশ্র ওরফে মনু সেখানে সশস্ত্র গুণ্ডাবাহিনী বোঝাই একটি গাড়ির কনভয় নিয়ে পৌঁছায় এবং পিছন থেকে এসে নির্মমভাবে কৃষকদেরকে গাড়ি চাপা দিয়ে দেয়। সংযুক্ত কিষাণ মোর্চার নেতা তেজিন্দর সিং ভির্ক সহ প্রায় ১২ জনের বেশি কৃষক গুরুতর জখম হন। একজন তরুণ কৃষক গুরবিন্দর সিং আক্রমণকারীদের একজনকে ধরে ফেলেন, সেইজন্য আশীষ মিশ্র তাঁর মাথায় গুলি করে। মোট ৪ জন নিহত কৃষকের মধ্যে ৩ জনের মৃত্যু হয় গাড়ি চাপা পড়ে এবং ১ জন গুলিবিদ্ধ হয়ে মারা যান। তথ্যানুসন্ধানী দলের সদস্যরা গুরবিন্দর সিংয়ের মাথার ডানদিকে গুলিবিদ্ধ ক্ষতস্থানটিও দেখেন। তাঁদেরকে এটাও জানানো হয়েছে, যখন আক্রমণকারীদেরকে কৃষকরা ঘিরে ধরেন তখন একটি গাড়ি উল্টে গিয়ে ৩ জন আক্রমণকারী আহত হয়, যাদেরকে কৃষকরা ধরে পুলিশের হাতে তুলে দেয়। পরে কৃষকরা জানতে পারেন যে, ঐ আক্রমণকারীরা মারা গিয়েছে। দলের সদস্যরা এটাও জানতে পেরেছেন যে, সাংবাদিক রমন কাশ্যপও আক্রমণকারীদের গাড়ির চাকায় পিষ্ট হয়ে মারা যান।

শহীদ কৃষকদের তালিকা

দলজিৎ সিং, নানাপাড়া, বাহরাইচ (৩৫), গুরবিন্দর সিং, দোহরানিয়া খামার (১৮), লাভপ্রীত সিং চৌখড়া (২০), নছত্তর সিং ধাউহারা, খিরি (৫৫)।

তথ্যানুসন্ধানী দলের সদস্যরা সেখানে প্রতিবাদরত মানুষদের উদ্দেশ্যে তাঁদের লড়াইয়ের প্রতি সংহতি জানিয়ে বক্তব্য রাখেন। সংযুক্ত কিষাণ মোর্চার রাখা দাবিসমূহের পাশাপাশি তাঁরা মুখ্যমন্ত্রী যোগী আদিত্যনাথের অপসারণও দাবি করেন। এফআইআর দায়ের হওয়া পর্যন্ত দলের সদস্যরা সেখানে ছিলেন, এরপর শহীদ কৃষক পরিবারগুলির জন্য ৪৫ লক্ষ টাকা ক্ষতিপূরণ ঘোষণা হয় এবং শহীদ কৃষকদের মৃতদেহ ময়না তদন্তে পাঠানো হয়।

Concerns and Proposals

দুর্গাপূজাকে কেন্দ্র করে কুমিল্লা, চট্টগ্রাম, চাঁদপুর ও নোয়াখালীসহ বাংলাদেশের বিভিন্ন স্থানে যে সাম্প্রদায়িক সহিংসতা ঘটেছে, তা এক কথায় নজিরবিহীন ও নিন্দনীয়। এই ভয়াবহ অমানবিক ঘটনায় আমরা ভীষণ ক্ষুব্ধ ও মর্মাহত। কুমিল্লার একটি পূজামণ্ডপে ‘কোরআন রাখার’ ঘটনাকে কেন্দ্র করে ব্যাপক সহিংসতা ঘটার পর প্রশাসন আরও সতর্ক হলে হাজীগঞ্জসহ অন্যত্র এর পুনরাবৃত্তি ঘটত না।

‘কোরআন অবমাননার’ ঘটনাটি পূর্বপরিকল্পিত বলে আমাদের সন্দেহ। কোনো সাম্প্রদায়িক গোষ্ঠী রাজনৈতিক সুবিধা হাসিলের জন্য এই ঘটনা সাজিয়ে থাকতে পারে। ঘটনা সাজিয়ে তারা সহিংসতার ক্ষেত্র তৈরি করেছে। কিছু মানুষ ষড়যন্ত্রীদের পাতা ফাঁদে পা দিয়েছে। জনগন সচেতন হলে ষড়যন্ত্রীরা কোনোভাবেই তাদের ষড়যন্ত্র সফল করতে পারত না। জনগণকে সচেতন করা, তাদের মননকে অসাম্প্রদায়িক হিসেবে গড়ে তোলার দায় রাষ্ট্রের। কুমিল্লার ঘটনায় আমরা স্বাধীন ও নিরপেক্ষ তদন্ত দাবি করছি। তদন্তের মাধ্যমে দোষীদের চিহ্নিত করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দেওয়ার দাবি জানাচ্ছি।

এবারের দুর্গাপূজাকে কেন্দ্র করে এমন সহিংসতায় আমরা উদ্বিগ্ন। এই সাম্প্রদায়িক সহিংসতা রোধ করা আবশ্যক। এব্যাপারে আমরা রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে উদ্যোগ প্রত্যাশা করছি। সাম্প্রদায়িকতা একটি জাতীয় সমস্যা। এই সমস্যা নিরসনে ধারাবাহিক জাতীয় সংলাপের আয়োজন করা যেতে পারে। দেশের শিক্ষাবিদ, লেখক, কবি, বুদ্ধিজীবী, ছাত্র, কৃষক, শ্রমিক, আলেম, পুরোহিতসহ সব ধর্মের নেতাদের নিয়ে, সর্বস্তরের জনগণকে সম্পৃক্ত করে, আলোচনা করে এই সাম্প্রদায়িক সহিংসতার মূল চিহ্নিত করা যেতে পারে। আমরা এমন একটি জাতীয় সংলাপ কামনা করি, যার মধ্য দিয়ে যে সিদ্ধান্ত আসবে সে অনুযায়ী রাষ্ট্র ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।

বিবৃতিদাতা: ইমতিয়ার শামীম, শাহনাজ মুন্নী, আহমাদ মোস্তফা কামাল, কবির হুমায়ূন, শামীম রেজা, আলফ্রেড খোকন, চঞ্চল আশরাফ, টোকন ঠাকুর, রাজীব নূর, শাহেদ কায়েস, শোয়াইব জিবরান, ওবায়েদ আকাশ, জোবায়দা নাসরিন, রুমা মোদক, পাপড়ি রহমান, লোপা মমতাজ, ভাগ্যধন বড়ুয়া, হেনরী স্বপন, সাইমন জাকারিয়া, আফরোজা সোমা, রেজা ঘটক, মতিন রায়হান, বিধান রিবেরু, মোজাফ্ফর হোসেন, পিয়াস মজিদ, মামুন খান, মনিরুজ্জামান মিন্টু, অঞ্জন আচার্য, অরবিন্দ চক্রবর্তী, সরকার আমিন, স্বকৃত নোমান।

বাংলাদেশের কবি-সাহিত্যিক-শিল্পী-সাংবাদিকদের আট দফা দাবি

১) এবারের দুর্গাপূজাকে কেন্দ্র করে দেশের বিভিন্ন স্থানে সাম্প্রদায়িক হামলাকারীদের চিহ্নিত করে অবিলম্বে গ্রেফতার ও বিচারের মুখোমুখি করা।

২) রামু, নাসিরনগর, শাল্লা, কুমিল্লা, হাজীগঞ্জ, নোয়াখালী ও রংপুরে সংগঠিত সাম্প্রদায়িক হামলার ঘটনার প্রকৃত কারণ জনসম্মুখে প্রকাশ করা ও প্রতিটি ঘটনার বিচার করা। এবং অতীতে সাম্প্রদায়িক হামলার হোতা অভিযুক্ত অনেক ব্যক্তিকে রাজনৈতিক দলগুলোতে প্রকাশ্যে কর্মরত দেখা যায়। তাদেরকে চিহ্নিত করে বহিষ্কার ও বিচার করা।

৩) ফেসবুক, ইউটিউব সহ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে এবং ধর্মসভা তথা ওয়াজ মাহফিলে সাম্প্রদায়িক ও নারীববিদ্বেষী বক্তব্য বন্ধের উদ্যোগ নেওয়া।

৪) স্কুল-কলেজের পাঠ্যপুস্তক থেকে সাম্প্রদায়িক পাঠ বিলুপ্ত করে অসাম্প্রদায়িক পাঠ্যপুস্তক প্রণয়ন করতে হবে।

৫) বহু জাতি এবং ধর্মসম্প্রদায়ের এই দেশের সংবিধান থেকে ‘রাষ্ট্রধর্ম’ বাতিল করা।

৬) সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি প্রতিষ্ঠায় সরকারি উদ্যোগে ধর্ম মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে আন্তঃধর্মীয় সংলাপের আয়োজন করা।

৭) সরকারি পৃষ্ঠপোষকতায় সারা দেশের সংস্কৃতিচর্চার (নাটক, গান, নৃত্য, যাত্রাপালা, পালাগান, বাউলগান) প্রসার ঘটানো। পাশাপাশি স্বাধীন সাংস্কৃতিক সংগঠনগুলোকে সরকারি পৃষ্টপোষকতায় প্রাণিত করা।

৮) দেশের প্রতিটি ইউনিয়নে একটি করে পাঠাগার ও সংস্কৃতি কেন্দ্র স্থাপন করা।

- সাম্প্রদায়িক সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে কবি-সাহিত্যিক-শিল্পী-সাংবাদিকদের বিক্ষোভ সমাবেশ, ঢাকা

Bangladesh High Commission

কুমিল্লা সহ বাংলাদেশের বিভিন্ন প্রান্তে দুর্গোৎসবে মূর্তি, মন্ডপ ভেঙে সাম্প্রদায়িক সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে বাংলাদেশ হাইকমিশন দপ্তরে বিক্ষোভ দেখানো হয় গত ১৮ অক্টোবর। বিক্ষোভসভায় বক্তব্য রাখেন বাসুদেব বসু। বাংলাদেশ হাইকমিশন দপ্তরে মেল করা হয়, কড়েয়া থানার দায়িত্বপ্রাপ্ত আধিকারিক মারফত স্মারক লিপি দেওয়া হয়। স্মারকলিপিতে দাবি করা হয়, অবিলম্বে অপরাধীদের গ্রেপ্তার করে বিচার করতে হবে এবং যথোপযুক্ত শাস্তি দিতে হবে। বাংলাদেশে ইতিমধ্যেই বাম ও গণতান্ত্রিক জোট প্রতিবাদে প্রতিরোধে রাস্তায় নেমেছে, যা আশাপ্রদ। বাংলাদেশে মৌলবাদীদের এই হামলাকে কাজে লাগিয়ে আমাদের দেশে বিজেপি ও হিন্দুত্ববাদী সংগঠনগুলি মুসলিমদের বিরুদ্ধে ঘৃণা জাগিয়ে তুলছে। সিপিআই(এমএল) বিজেপি’র এই বিভেদ বিদ্বেষের রাজনীতির তীব্র বিরোধিতা করে। ভারত বাংলাদেশের মৈত্রী-ঐক্য সুদৃঢ হোক।

বিক্ষোভ ডেপুটেশন কর্মসূচিতে উপস্থিত থাকেন পার্টির রাজ্য কমিটির সদস্য দিবাকর ভট্টাচার্য ও আইসা’র রাজ্য সম্পাদক স্বর্ণেন্দু মিত্র, আরওয়াইএ রাজ্য নেতা রণজয় সেনগুপ্ত সহ ছাত্র ছাত্রীরা।

minorities in Bangladesh

(পশ্চিমবঙ্গের ৫৫ জন সংখ্যালঘু বুদ্ধিজীবী যৌথভাবে একটি বিবৃতি দিয়েছেন বাংলাদেশের সাম্প্রতিক সংখ্যালঘুদের প্রতি অত্যাচারের প্রতিবাদে।)

দুর্গাপুজোকে কেন্দ্র করে সাম্প্রদায়িক সন্ত্রাসের ঘটনা ঘটেছে বাংলাদেশের নানা প্রান্তে। বাংলাদেশের সংখ্যালঘু হিন্দুদের উপর আক্রমণ নেমে এসেছে। বহু জায়গায় মণ্ডপ ভেঙে ফেলা হয়েছে, আগুন দেওয়া হয়েছে, ভয় দেখানো হয়েছে, খুন করা হয়েছে। এই আক্রমণ শুধু ঘৃণ্য নয়; এই আক্রমণ সভ্যতার পরিপন্থী। এই আক্রমণ মানবতার বিরুদ্ধে ঘটানো অপরাধ। এখনই সময় এই আক্রমণের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানোর। এখনই সময় সাম্প্রদায়িকতার সঙ্গে যুক্ত সমস্ত ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান ও রাজনৈতিক দলের বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়ার। সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়াটা আমাদের দায় নয় – কর্তব্য।

বাংলাদেশের সংখ্যালঘুদের উপর নির্যাতনের আমরা তীব্রভাবে প্রতিবাদ করি। অবিলম্বে এই হিংস্রতা বন্ধ হোক। রাষ্ট্র ব্যবস্থা নিক। বাংলাদেশের শুভ বুদ্ধিসম্পন্ন মানুষেরা এক জোট হোন।

বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর কাছে আমাদের আবেদন, বাংলাদেশের সংখ্যালঘু মানুষরা যেন পরিপূর্ণ জীবন নিরাপত্তা ফিরে পান এবং শান্তিতে বসবাস করতে পারেন তার দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া হোক।

আসুন, আমরা সম্প্রীতির পক্ষে এক যৌথতার পথে হাঁটি।

সাক্ষর করেছেন :

আবুল বাশার (লেখক),
মীরাতুন নাহার (অধ্যাপক),
জাহিরুল হাসান (লেখক),
আনসারউদ্দিন (লেখক),
শাহজাদ ফিরদাউস (লেখক),
সা’আদুল ইসলাম (অধ্যাপক),
আফরোজা খাতুন (অধ্যাপক),
সাইফুল্লাহ (অধ্যাপক),
শামিম আহমেদ (অধ্যাপক),
মোশারফ হোসেন (লেখক),
সাবির আহমেদ (সমাজকর্মী),
সামিরুল ইসলাম (অধ্যাপক),
তৌসিফ হক (চিত্রশিল্পী),
হাবিবুর রহমান মল্লিক (প্রকাশক),
রোহণ কুদ্দুস (প্রকাশক),
বুলবুল ইসলাম (প্রকাশক),
আনোয়ার হোসেন (সমাজকর্মী),
তারেক কাজী (প্রকাশক),
নীলাঞ্জন সৈয়দ (সমাজকর্মী),
শেখ মুঈদুল ইসলাম (অধ্যাপক),
আনিসুর রহমান (অধ্যাপক),
মোনালিসা রেহমান (লেখক),
এন জুলফিকার (পত্রিকা সম্পাদক),
সুবিদ আবদুল্লাহ (পত্রিকা সম্পাদক),
এস হজরত আলি (কবি),
মেরিনা বানু (সাংস্কৃতিক কর্মী),
রেহানা সুলতানা (সমাজকর্মী),
আজিজুল হক (গবেষক),
মিরাজুল ইসলাম (গবেষক),
তৈমুর খান (কবি),
ফারুক আহমেদ (পত্রিকা সম্পাদক),
সাদিক হোসেন (লেখক),
মারুফ হোসেন (প্রকাশক)
প্রমুখ আরও অনেকে।

in Tripura

ত্রিপুরায় সংখ্যালঘু মুসলমানদের মসজিদ, ব্যক্তিগত দোকানপাট ও বাড়িঘরে সহিংস আক্রমণ ও ভয়ভীতি প্রদর্শন অবিলম্বে বন্ধ করতে হবে। দোষীদের চিহ্নিত করে দ্রুত গ্রেপ্তার ও আইনানুগ কঠোর শাস্তিমূলক পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি রক্ষায় সবাই এগিয়ে আসুন।

২৩ অক্টোবর এক প্রেস বিবৃতিতে উপরোক্ত বক্তব্য তুলে ধরেন সিপিআই(এমএল) লিবারেশন ত্রিপুরা রাজ্য সম্পাদক পার্থ কর্মকার।

ঐ বিবৃতিতে তিনি আরও বলেন, বাংলাদেশে সংখ্যালঘু হিন্দুদের উপর মৌলবাদী সাম্প্রদায়িক সহিংসতামূলক ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে গত কিছুদিন ধরে ত্রিপুরার বিভিন্ন জেলায় সংখ্যালঘু মুসলমানদের ধর্মীয় মসজিদ, ব্যক্তিগত বাড়িঘর ও দোকানপাটে বেশ কিছু আক্রমণের ঘটনা ঘটেছে, ভয়ভীতি প্রদর্শন করা হচ্ছে। উগ্র হিন্দুত্ববাদী সংগঠনগুলি সংখ্যালঘু মুসলমানদের ধর্মীয় নিশানা করে হিন্দু জনমানসে ঘৃণা ও বিদ্বেষ ছড়িয়ে দিতে তৎপর এবং তারাই এসমস্ত উস্কানিমূলক আক্রমণের ঘটনাবলী পরিকল্পিতভাবে সংগঠিত করছে। এই উদ্দেশ্যে তারা সামাজিক মাধ্যমকে ব্যবহার করে দেশভাগের সময়কার স্পর্শকাতর সাম্প্রদায়িক সহিংসতার ঘটনাবলী প্রচার করছে এবং এক সাম্প্রদায়িক প্রতিহিংসামূলক আবহ তৈরি করতে চাইছে। ফলে মিশ্র বসতি অঞ্চলে মুসলমানরা নির্ভয়ে বাজার হাটে যেতে পারছে না। ২১ অক্টোবর উদয়পুরে রাধাকিশোরপুর থানার মহারানী ও উত্তর মহারানী মিশ্র বসতি অঞ্চলকে সফট টার্গেট করা হয়। গত কিছুদিন ধরে উস্কানি এবং উত্তেজনা রোধে প্রশাসন শেষ মুহূর্তে ১৪৪ ধারা জারি করে। তা অমান্য করার ফলে পুলিশের সাথে উগ্র হিন্দুত্ববাদীদের সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। উত্তেজনা এখনো প্রশমিত হয়নি। থানায় মামলা হয়েছে। কিন্ত গ্রেপ্তার নেই। উস্কানি অব্যাহত। কাকড়াবনে ইচাছড়াতে রাতের অন্ধকারে মসজিদ পোড়ানো হয়। দক্ষিণ মুড়াপাড়াতে মসজিদে ও বাড়িঘরের বাউন্ডারি ভাঙচুর করা হয়। জামজুরি বাজারে দোকান ভাঙচুর করা হয়। ধর্মনগরে, পানিসাগরে, কৈলাশহরে, আগরতলায় মসজিদের উপর, ব্যক্তিগত দোকানপাটে ও বাড়িঘরে আক্রমণের ঘটনা ঘটে। ধর্মনগরে একজন আইনজীবীর বাড়ি আক্রান্ত হয়। অথচ এই প্রশ্নে সংবিধান প্রদত্ত দায় দায়িত্ব পালনে বিজেপি পরিচালিত রাজ্য সরকার দায়সারা ভূমিকা গ্রহণ করেছে। কারণ আসলে বিজেপি’র কার্যকর্তারাই উগ্র হিন্দুত্ববাদী সংগঠনের আড়ালে এই সাম্প্রদায়িক আক্রমণ, ভয়-ভীতি প্রদর্শনের ঘটনা সংগঠিত করছে। ফলে এই পরিস্থিতিতে সরকারের যে যে পদক্ষেপ গ্রহণ করা জরুরি প্রয়োজন, কার্যত সরকার তা ইচ্ছা করেই করছে না। তাই সরকারের দুর্বলতার কারণে যে কোন সময় কোনও বড় ঘটনা ঘটে যেতে পারে।

সিপিআই(এমএল) লিবারেশন ত্রিপুরা রাজ্য কমিটি এই পরিস্থিতিতে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে এবং এই সমস্ত ঘটনার তীব্র নিন্দা জানায়। দোষীদের দ্রুত গ্রেপ্তার ও আইনানুগ শাস্তিমূলক পদক্ষেপ গ্রহণ করার দাবি জানায়।

village of Mainaguri

বাংলাদেশে পুজোর মন্ডপে কোরানের অবমাননার অভিযোগকে কেন্দ্র করে মৌলবাদী সন্ত্রাসের প্রতিবাদের নামে ২৩ অক্টোবর জলপাইগুড়ি জেলার ময়নাগুড়ি ব্লকের রাজারহাটে প্রথমে দিনের বেলা বিজেপি সমর্থকেরা জড়ো হয়ে সাম্প্রদায়িক জিগির তোলার চেষ্টা করে। কিন্তু স্থানীয় তৃণমূল কর্মীরা তাড়া করলে তারা পালিয়ে যায়। এরপর সেদিনই সন্ধ্যা নাগাদ বাঁকালি বাজারে প্রায় ৫০ জনের মতো বাহিনী ‘হিন্দু বাঁচাও, মুসলিম তাড়াও’ শ্লোগান দিতে দিতে বাজারের কয়েকটি দোকান ভাঙচুর করে। তারপরে বার্ণিশ এলাকার গোলার বাড়ি গ্রামে মসজিদ ও সংলগ্ন মাদ্রাসার সামনে একটি মিছিল নিয়ে এসে আওয়াজ তোলা হয়, ‘মুসলিম তাড়াও, দেশ বাঁচাও’ ইত্যাদি। সেখানে উপস্থিত সংখ্যালঘু নমাজীদের বলা হয় যে মাইক ব্যবহার করে আজান দেওয়া যাবে না। এই কথা বলে পরিকল্পিতভাবে বচসা তৈরি করা হয় এবং মিছিল থেকে ঢিল, পাটকেল ও ধারালো অস্ত্র নিয়ে স্থানীয় মানুষজনের ওপর হামলা নামানো হয়। স্থানীয় মাদ্রাসার শিক্ষকের খোঁজ করতে থাকে। সেই সময় স্থানীয় মুসলিম জনগণ প্রতিরোধ করলে তারা পালিয়ে যায়। এবং কিছুটা দূরে গিয়ে ঢিল ছুড়তে থাকে। ঢিলের আঘাতে ঘটনাস্থলে তিনজন সংখ্যালঘু গ্রামবাসী আহত হয়। আহত দু’জনকে জলপাইগুড়িতে সুপার স্পেশ্যালিটি হাসপাতালে ভর্তি করা হয় এবং তৃতীয় ব্যক্তি উত্তরবঙ্গ মেডিক্যাল কলেজে গুরুতর আঘাত নিয়ে চিকিৎসাধীন। এলাকায় গত রাত থেকে পুলিশ ও রাফ মোতায়েন করা হয়েছে। তবুও এলাকাজুড়ে আতঙ্কের পরিবেশ রয়েছে।

সকালে সিপিআই(এমএল) জেলা নেতা শ্যামল ভৌমিক আক্রান্ত পরিবারগুলির কয়েকজন সদস্যের সঙ্গে কথা বলেছেন। রাজ্য নেতা পবিত্র সিংহ মেডিক্যাল কলেজে আহত ব্যক্তির সঙ্গে দেখা করে তাঁর সুচিকিৎসার দাবি নিয়ে তৎপর আছেন। পার্টি এলাকায় শান্তি ও সম্প্রীতির বাতাবরণ ফিরিয়ে আনতে হামলার ঘটনায় জড়িত বিজেপি- আরএসএস সন্ত্রাসীদের চিহ্নিত করে গ্রেপ্তারের দাবি জানিয়েছে এবং সেইসঙ্গে পুলিশী ব্যবস্থা জোরদার করতে এলাকায় অস্থায়ী পুলিশ ক্যাম্প স্থাপনের দাবি করেছে। ইতিমধ্যেই স্থানীয় সমস্ত স্তরের মানুষ একত্রিত হয়ে আজ সকালে ঘটনা স্থলে উপস্থিত ডিআইজি-র সাথে সাক্ষাত করে। স্থানীয় বিডিও, জেলাশাসক প্রভৃতি ক্ষেত্রে অবহিত করা হয়েছে। পুলিশ ১০/১২ জনকে চিহ্নিত করেছে। সমস্ত স্তরের মানুষদের সমবেত করে ২৬ অক্টোবর রাজারহাটে শান্তি ও সম্প্রীতির মিছিল সংগঠিত করার চেষ্টা করা হচ্ছে।

দাবি তোলা হয়েছে —

মুখ্যমন্ত্রীর উত্তরবঙ্গ সফরের প্রাকলগ্নে এমন নিকৃষ্ট সাম্প্রদায়িক সন্ত্রাসের ঘটনার দায় রাজ্য প্রশাসনকে নিতে হবে এবং মুখ্যমন্ত্রীকে রাজ্যের সর্বত্র মৌলবাদী চক্রান্তের মোকাবিলায় বিশেষ টাস্কফোর্স গঠন করতে হবে।

ময়নাগুড়ির ঘটনার পরিদর্শন করে তথ্যানুসন্ধানী রিপোর্ট

শিলিগুড়ি থেকে পিনাকী ব্যানার্জী, অঘোর ভট্টাচার্য, পুলক চক্রবর্তী, মুক্তি সরকার ও পার্থ চৌধুরী সমন্বিত এক তথ্যানুসন্ধানী দল ২৬ অক্টোবর ময়নাগুড়ি'র ধর্মপুর গ্রামের গোলারবাড়ি, হাসপাতাল পাড়া, সর্দার পাড়ায় গত ২৩ অক্টোবর রাতে ঘটে যাওয়া সাম্প্রদায়িক হামলার প্রকৃত চিত্র জানতে সেখানে হাজির হয়েছিলেন। ৩টি জায়গা ঘুরে সবকিছু দেখে এবং ওখানকার মানুষের সঙ্গে কথা বলে জানা যায় যে, গোলারবাড়ি মাদ্রাসায় আক্রমণ করে ওখানকার মৌলানাকে মারধর করা হয়। সঙ্গে আরও কয়েকজনও আক্রান্ত হয়। ৩০/৪০ জনের মিছিল “মুসলমান হটাও-দেশ বাঁচাও” জাতীয় শ্লোগান দিয়ে মাদ্রাসা ভাঙচুর করে এবং বড় বড় পাথরও ছোড়ে। সেই পাথরের আঘাতে ৩ জন গুরুতর আহত হয় এবং একজনকে ওই রাতেই প্রথমে জলপাইগুড়ি হাসপাতাল ও পরে সেখান থেকে মেডিকেল কলেজে স্থানান্তরিত করা হয়। ওই মিছিল একইভাবে হাসপাতাল পাড়া ও সর্দার পাড়াতেও তান্ডব চালায়। হাসপাতাল পাড়ার “ওয়াক্ত কি ঘর”-এর তেমন ক্ষতি না করলেও সর্দার পাড়ার মাদ্রাসায় ব্যাপক ভাঙচুর সহ মাইক ভেঙে ফেলে এবং এ্যামপ্লিফায়ার নিয়ে চলে যায়। তিন জায়গাতেই মানুষ এখনও আতঙ্কে। ঘটনার পরে পুলিশ ৪ জনকে গ্রেপ্তার করে এবং এলাকায় পুলিশ পিকেট বসায়, এলাকাবাসীকে ভয় না পাওয়ার আশ্বাস দেয়। কিন্তু ওখানকার মানুষ এখনও আতঙ্কগ্রস্ত। তথ্যানুসন্ধানী দল যাওয়াতে তাঁরা খানিকটা মনোবল ফিরে পেয়েছেন একথা বারবার বলেন। তথ্যানুসন্ধানী দল তাঁদের ভয় না পাওয়ার কথা বলে। ফোন নম্বরগুলো দিয়ে বলে আসে যেকোন প্রয়োজনে যোগাযোগ করলে অবশ্যই পাশে পাবেন। সবার সঙ্গে কথা বলে মনে হল প্রত্যক্ষভাবে গ্রাম পঞ্চায়েতের দলবদলু বিজেপি প্রধানের হাত আছে গোটা ঘটনার পেছনে। যদিও এলাকার মানুষেরা মুখ ফুটে একথা বলছেন না। এবং আমাদের বিশ্বাস বাংলাদেশের ঘটনাও ইন্ধন জুগিয়েছে। সমগ্র বিষয়টি জানিয়ে মুখ্যমন্ত্রীকে স্মারকলিপি পাঠিয়ে ওঁদের নিরাপত্তা বিষয়ে ব্যবস্থা নেওয়ার আবেদন রাখা হবে অচিরেই — এমনটাই প্রাথমিকভাবে স্থির হয়েছে।

blow to India's democracy

সিদ্দিক কাপ্পানের গ্রেপ্তার ভারতের মাটিতে সাংবিধানিক অধিকারের ক্রমবর্ধমান ক্ষয়ের একটি জ্বলন্ত উদাহরণ। দমনকারী আইনের অপব্যবহার, সংখ্যালঘুদের অধিকারের ওপর আক্রমণ এবং সংবাদ মাধ্যমের স্বাধীনতা হরণের মতো বিজেপি সরকারের একের পর এক অগণতান্ত্রিক প্রবণতা এই একটি ঘটনায় প্রকাশ পেয়েছে। সিদ্দিক কাপ্পানের ওপর আক্রমণকে মানবাধিকার ও দেশের মানুষের বুনিয়াদি স্বাধীনতার ওপর আক্রমণ হিসেবে আমাদের চিহ্নিত করতে হবে।

সিদ্দিক কাপ্পান কেরালার একজন সাংবাদিক। তিনি হাথরাসে ভয়াবহ ধর্ষণ এবং খুনের ঘটনার বিষয়ে সাংবাদিকতা সূত্রে উত্তরপ্রদেশে পৌঁছান। হাথরাসে পৌঁছানোর আগেই তাঁকে গ্রেপ্তার করে স্থানীয় পুলিশ। তাঁর বিরুদ্ধে রাজদ্রোহিতা, হিংসার উস্কানি, ধর্মীয় ভাবাবেগে আঘাত এবং সন্ত্রাসবাদী হওয়ার অভিযোগ দায়ের করে পুলিশ। তাঁর বিরুদ্ধে পেশ করা চার্জশিট উদ্ভট। কাপ্পান নাকি সাংবাদিকতার মাধ্যমে দেখাতে চান ভারতের মুসলমানরা আক্রান্ত! কিন্তু সত্যিই তো সংখ্যালঘুরা আক্রান্ত হচ্ছে। কাপ্পানের করা দাঙ্গার রিপোর্টিংগুলি নাকি সাম্প্রদায়িক! আক্রান্ত সম্প্রদায়ের কথা বললে সাম্প্রদায়িক! তাঁর লেখা নাকি পিএফআই নামক একটি সংগঠনকে সমর্থন করে! তাঁর কিছু লেখা নাকি কমিউনিস্ট এবং মাওবাদীদেরও সমর্থন করে। কিন্তু এগুলো কীভাবে অপরাধ হতে পারে?

এই ধরনের ভিত্তিহীন অভিযোগ ও তারসাথে দমনকারী আইনগুলোর প্রয়োগ করে বিজেপি সরকারের পুলিশ দেশের গণতন্ত্রপ্রিয় মানুষকে ভয় দেখিয়ে দমিয়ে রাখতে চাইছে। তারা চায় সরকারের নীতির বিরুদ্ধে মানুষ যাতে একটিও কথা না বলে। দেশের বড় মিডিয়া তো ওদেরই দোসর, বাকি সকলকে ভয়ের মাধ্যমে নিয়ন্ত্রণ করা বিজেপি’র দেশের মসনদে টিকে থাকার এক অন্যতম অস্ত্র। সিদ্দিক কাপ্পানকে গ্রেপ্তার করে দেশের মিডিয়া এবং সংখ্যালঘু মানুষকে বিজেপি সরকার হুমকি দিতে চাইছে।

সিদ্দিক কাপ্পানের গ্রেপ্তারের এক বছর পূর্ণ হওয়ায় ‘দিল্লী ইউনিয়ন অফ জার্নালিস্টস’, ‘প্রেস ক্লাব অফ ইন্ডিয়া’ এবং ‘কেরালা ইউনিয়ন অফ ওয়ার্কিং জার্নালিস্টস’ নামক সংগঠনগুলি দিল্লীর বুকে প্রতিবাদ প্রদর্শন করে। প্রেস ক্লাব অফ ইণ্ডিয়ার সভাপতি উমাকান্ত লাখেরা জানান, “সিদ্দিক হাথরাসে পৌঁছানোর আগেই তাকে গ্রপ্তার করা হয়। অভিযোগ ভিত্তিহীন হওয়ার পরেও এবং গ্রেপ্তারের ৯০ দিনের মধ্যে চার্জশিট পেশ না করা হলেও তাঁকে কোর্ট জামিন দেয়নি”। আমাদের বিচার ব্যবস্থাও বিজেপি সরকারের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে গণতন্ত্রের রক্ষা করতে পারছে না। দেশের বিচার ব্যবস্থার দেউলিয়াপনা আমাদের দেশের গণতন্ত্রের পক্ষে সবচেয়ে বিপজ্জনক।

‘দিল্লী ইউনিয়ন অফ জার্নালিস্ট’এর সুজাতা মাধক জানান যে, সিদ্দিক কাপ্পানের কেস সংবাদ মাধ্যমের ওপর আক্রমণ। তিনি বলেন, পরিকল্পনা করে প্রত্যন্ত এলাকায় কেস ফাইল করা হয় দিল্লীর সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে এবং অন্য রাজ্যের পুলিশ আসে প্রেপ্তার করতে, যেমন বিনোদ দুয়ার কেসে হয়েছিল। টুইটের জন্য সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে কেস ফাইল করা হচ্ছে, যেমন রাজদীপ সারদেশাই, মৃণাল পান্ডে এবং অন্যান্যদের ক্ষেত্রে হয়েছে। স্ক্রোলের সুপ্রিয়া শর্মার ওপর কেস করা হয়েছে কারণ তিনি বেনারসের ক্ষুধার্ত মানুষদের ওপর একটি আর্টিক্ল প্রকাশ করেছিলেন। নেহা দীক্ষিতের ওপর অনেকগুলি কেস চলছে কারণ তিনি শিশু পাচার নিয়ে প্রতিবেদন লিখেছিলেন, রানা আয়ুবের ওপর কেস করা হয়েছে কারণ তিনি কোভিড পীড়িতদের ত্রাণ সরবরাহ করছিলেন। ইউএপিএ, এনএসএ এবং রাজদ্রোহ ইত্যাদি অপ-আইন সাংবাদিকদের বাকস্বাধীনতা রোধ করার জন্য যথেচ্ছভাবে ব্যবহার করছে বিজেপি সরকার।

দেশের সংবাদ মাধ্যমকে এই ভয়ের বাতাবরণ থেকে বের করে আনার জন্যে মানুষের প্রতিরোধ প্রয়োজন। বিচারব্যবস্থার দ্বারা সরকারের পদলেহনের বিরুদ্ধে সমস্ত স্তরের মানুষকে সোচ্চার হতে হবে। সিদ্দিক কাপ্পানের মুক্তির লড়াই এই দেশের গণতন্ত্রকে বাঁচানোর লড়াই।

- প্রত্যুষ নন্দী

Double Engine Government

সাড়ে চার বছরে উত্তরাখন্ডে বিজেপি’র ডবল ইঞ্জিনের সরকারের তৃতীয় মুখ্যমন্ত্রী পুষ্কর সিং ধামি একটি কীর্তিকে বেশ উচ্চতায় নিয়ে গেছেন — সারা উত্তরাখন্ডকে নিজের হোর্ডিং ও ব্যানারে মুড়ে দিয়েছেন। এরমধ্যে একটি হোর্ডিং-এ বেশ ফলাও করে বলা হয়েছে নীতি আয়োগের বিচারে উত্তরাখন্ড স্থায়ী উন্নতির সূচকে আইন শৃঙ্খলা রক্ষায় সর্বপ্রথম নম্বরে আছে। ৪ অক্টোবরে যখন রাজ্যে জাতীয় সুরক্ষা আইন ৩ মাসের জন্য অর্থাৎ ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত লাগু হলো তখন আমাদের ঐ হোর্ডিং-এর কথা স্মরণে এল। এটা অভাবনীয় এই কারণে যে, কোন রাজ্যের আইন শৃঙ্খলার পরিস্থিতি খারাপ হলেও এই আইন লাগু হয় না।

আদেশনামায় বলা হয়েছে রাজ্যের বিভিন্ন জায়গায় হিংসাত্মক ঘটনার সম্ভাবনার জন্যই জাতীয় সুরক্ষা আইন চালু হল। তাই যদি হয় তাহলে আইন শৃঙ্খলা রক্ষায় রাজ্য কিভাবে এক নম্বরে স্থান পেল। দু’টোই তো সত্যি হতে পারে না।

কারা তাহলে হিংসাত্মক ঘটনা ঘটানোর চেষ্টা করছে, যার জন্য এনএসএ লাগু হলো। সত্যি এটাই যে বিজেপির লোকেরা সাম্প্রদায়িক আবেগকে উস্কানি দিতে মগ্ন। যেদিন এনএসএ লাগু হলো সেদিনই বিজেপির দুষ্কৃতিরা ভাঙচুর চালায় ও হিংসাত্মক ঘটনা ঘটায় রুড়কির একটি গীর্জায়। দুষ্কৃতিদের বিরুদ্ধে কোন পদক্ষেপ নেওয়া তো দূরের কথা বরং গীর্জার পরিচালকদের বিরুদ্ধে কঠিন ধারায় মামলা দায়ের করা হয়। গীর্জার সিসিটিভি ক্যামেরা কেন বিজেপির লোকেরা ভাঙ্গলো এটা হলো প্রথম প্রশ্ন। আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার অধিকার কে তাদের দিয়েছে? গীর্জার মধ্যে যারা এই হিংসা ঘটালো তাদের বিরুদ্ধে কি মুখ্যমন্ত্রী এনএসএ লাগু করবেন?

সরকারি আদেশনামায় এনএসএ ১৯৮০ মোতাবেক ধারা-৩ এর উপধারা ৩ লাগু করার নিম্নলিখিত আদেশ দেওয়া হয়েছে।

১) যদি কোনও ব্যক্তি আইন অথবা প্রয়োজনীয় সামগ্রী অথবা পরিষেবায় বাধা দেয় তবে তাকে কেন্দ্র অথবা রাজ্য সরকার গ্রেপ্তার করতে পারে।

২) রাজ্য সরকার যদি মনে করে এই ধরণের পরিস্থিতি রাজ্যের কোনও জেলায় ঘটতে পারে তাহলে সরকার ঐ জেলার জেলাশাসক বা পুলিশ কমিশনারকে এই ধারা প্রয়োগের অধিকার দিতে পারে।

উত্তরাখন্ডে এটাই ঘটেছে। সমস্ত জেলা শাসকদের তিনমাসের জন্য এই ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে কারণ প্রাথমিকভাবে ঐ রাজ্যে তিনমাসের জন্য এনএসএ লাগু হয়েছে।

প্রয়োজনীয় পরিষেবা আইনের অধীনে কালোবাজারি আটকানোর লক্ষ্যেই এনএসএ লাগু করা হয় কিন্তু মোদী সরকার কালোবাজারিদের ব্যাপক ছাড় দিয়েছে এবং তাদের বিরুদ্ধে কোনও ব্যবস্থা নেওয়ার প্রশ্নই নেই।

এনএসএ’র অধীনে গ্রেপ্তার এবং অন্যান্য আইনে গ্রেপ্তারের পার্থক্য কোথায়? সাধারণভাবে গ্রেপ্তার হওয়া ব্যক্তিকে বাধ্যতামূলকভাবে গ্রেপ্তারের কারণ জানানো হয়। কিন্তু এনএসএ’র অধীনে পাঁচ দিনের মধ্যে গ্রেপ্তারীর কারণ জানানো হতে পারে এবং ব্যতিক্রমীভাবে পনের দিনের মধ্যে কারণ জানাতে হবে। এনএসএ’র ৫নং ধারা অনুযায়ী কোনও গ্রেপ্তারি পরোয়ানা বেআইনি, মেয়াদ উত্তীর্ণ হবে না, যদি পরোয়ানাটি অস্পষ্ট বা অস্তিত্বহীন অথবা অপ্রাসঙ্গিক হয়। অর্থাৎ সরকার যে কোনও ব্যক্তিকে ভিত্তিহীন কারণ ছাড়াই গ্রেপ্তার করতে পারে।

সাধারণত সরকার কোনও ঘটনায় বা প্রতিবাদের বিরুদ্ধে ১৪৪ ধারা লাগু করে যার অধীনে পাঁচজন বা ততোধিক ব্যক্তি কোনও একটি জায়গায় সমাবেশিত হতে না পারে। কিন্তু ১৪৪ ধারার বদলে এনএসএ লাগু করার অর্থ হলো ছুরির বদলে কামান দাগার মতো। উত্তরাখন্ডের মুখ্যমন্ত্রীকে কে বোঝাবে ১৪৪ ধারা আর এনএসএ’র পার্থক্য !

এনএসএ লাগু যে অজ্ঞানতাপ্রসূত নয় এটা পরিষ্কার। জনগণের প্রতিবাদকে নির্মমভাবে দমন করার লক্ষ্যেই উত্তরাখন্ডের সরকার এই আইন লাগু করেছে। উত্তরাখন্ডের জনগণের ওপর উৎপীড়ন দ্বিগুণ করার জন্য ডবল ইঞ্জিন তৈরি।

- ইন্দ্রেশ মৈখুরী

UP State Conference

সিপিআই(এমএল) লিবারেশন উত্তরপ্রদেশ ১৩তম রাজ্য সম্মেলন অনুষ্ঠিত হল ৪-৫ অক্টোবর সিতাপুরের হরগাঁওয়ে। সম্মেলনে ৫১ সদস্যের রাজ্য কমিটি নির্বাচিত হয়েছে। রাজ্য সম্পাদক পদে সুধাকর যাদব পুনর্নির্বাচিত হন।

সম্মেলনের প্রথম দিন শুরু হয় লখিমপুর খেরির চার কৃষককে নির্মমভাবে গাড়ি চাপা দিয়ে হত্যার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ এবং অনশনের মাধ্যমে। উদ্বোধনের প্রাক্কালে সাধারণ সম্পাদক দীপঙ্কর ভট্টাচার্য বলেন, শহীদ কৃষকদের শ্রদ্ধা জানিয়ে এবং তাঁদের উদ্দেশ্যে সম্মেলনকে উৎসর্গ করে আমরা এই হত্যাকারি সরকারকে উৎখাত করার সংকল্পকে আরও দৃঢ় করব। সরকারের একের পর এক ফন্দি কৃষক আন্দোলনকে ভাঙ্গার চেষ্টায় লিপ্ত, কিন্তু তা ব্যর্থ হচ্ছে, উল্টে কৃষক আন্দোলন আরও জোরদার হচ্ছে। জনগণ মোদী সরকারকে ছুঁড়ে ফেলবেন ও যোগী সরকারের উৎখাতের মাধ্যমে উত্তরপ্রদেশ তাতে নেতৃত্ব দেবে। বক্তব্য রাখেন সুধাকর যাদব সহ পার্টির এবং অন্যান্য বাম দলের নেতৃবৃন্দ।

সম্মেলন থেকে আন্দোলনের একপ্রস্থ আশু প্রস্তাব গৃহীত হয়

১) রাষ্ট্রমন্ত্রী অজয় মিশ্রকে বরখাস্ত কর এবং তার হত্যাকারি পুত্র আশিস মিশ্রকে গ্রেপ্তার কর, লখিমপুর খেরির কৃষকদের হত্যার বিচার চাই,
২) তিন কৃষি কালা কানুন, বিদ্যুৎ বিল ২০২০ এবং চার লেবার কোডের প্রত্যাহার চাই,
৩) মহিলা, দলিত এবং সংখ্যালঘুদের বিরুদ্ধে হিংসা বন্ধ কর,
৪) মইনুল হকের মতো জঘন্য হত্যাকান্ড যেন আর না হয় তা নিশ্চিত করতে হবে,
৫) পুলিশ হেফাজতে মৃত্যু এবং পুলিশ-রাজ বন্ধ কর,
৬) মুদ্রাকরণের নামে জাতীয় সম্পত্তি বেচা বন্ধ কর,
৭) রাজ্যে এবং দেশে যুবকদের সম্মানজনক চাকরির নিশ্চয়তা চাই,
৮) আক্ষরিক ও প্রকৃত অর্থে সংরক্ষণকে প্রয়োগ কর,
৯) বঞ্চিত শ্রেণীর শিক্ষার অধিকার হরণকারী ‘নয়া শিক্ষানীতি’ প্রত্যাহার কর,
১০) লাভ-জিহাদ এবং ধর্মান্তরকরণ বিরোধের নামে হিংসা বন্ধ কর,
১১) জন্ম-নিয়ন্ত্রণ আইন বাতিল কর,
১২) শোনভদ্রের দুধিকে আলাদা জেলা ঘোষণা করতে হবে,
১৩) কোভিডে মৃতদের পরিবারকে ক্ষতিপূরণ দিতে হবে,
১৪) রাজ্যের স্বাস্থ্য ব্যবস্থাকে উন্নত কর,
১৫) কোল, বিয়ারসহ অন্যান্য আদিবাসীদের তফশিলী জাতি হিসাবে গণ্য করতে হবে,
১৬) ঋণদানকারী কোম্পানিদের থেকে নেওয়া সমস্ত ঋণ মকুব কর,
১৭) দলিত এবং দরিদ্রদের ফাজিল ভূমির পাট্টা দিতে হবে,
১৮) আখচাষিদের বকেয়া ১৮ কোটি টাকা মিটিয়ে দাও এবং ৪৫০ টাকা কুইন্ট্যাল দরে আখের মূল্য দিতে হবে,
১৯) ২০২১-এর প্রস্তাবিত জনগণনা জাত ভিত্তিক করতে হবে,
২০) হাথরাস পীড়িতদের বিচার দাও এবং দোষীদের শাস্তি চাই,
২১) আফগানিস্তানের পরিস্থিতির নামে বিজেপি’র সাম্প্রদায়িক ঘৃণার রাজনীতির আমরা নিন্দা করি,
২২) শোনভদ্রের এবং অন্যান্য অঞ্চলের আদিবাসীদের বলপূর্বক হিন্দুত্বকরণ বন্ধ কর,
২৩) অযোধ্যার পর কাশী এবং মথুরার নামে সাম্প্রদায়িক বিষ ছড়ানোর আমরা নিন্দা করি।

রন্ধনকর্মীদের সংগঠনগুলি ‘মিড-ডে-মিল প্রকল্প’ নামের পরিবর্তে ‘প্রধানমন্ত্রী পোষণ যোজনা’ নামকরণের বিরোধিতা করেন।

Jharkhand Sixth State Conference

রামগড়ে সিপিআই(এমএল) লিবারেশনের ষষ্ঠ ঝাড়খণ্ড রাজ‍্য সম্মেলন সংগঠিত হল ২-৪ অক্টোবর। সম্মেলনের উদ্বোধন করেন সাধারণ সম্পাদক দীপঙ্কর ভট্টাচার্য। পার্টির কেন্দ্রীয় নেতারা ছাড়াও আমন্ত্রিত অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন মার্কসবাদী কো-অর্ডিনেশন সেন্টার (এমসিসি)’র নেতা অরূপ চ‍্যাটার্জি এবং আদিবাসী অধিকার আন্দোলনের নেত্রী দয়ামনি বারলা ও নেতা প্রেমচন্দ্র মুর্মু। উপস্থিত ছিলেন সিপিআই ও সিপিআই(এম)’এর রাজ‍্য প্রতিনিধি। মনোজ ভক্ত রাজ‍্য সম্পাদক হিসেবে নির্বাচিত হয়েছেন। সম্মেলন ৫৩ জনের রাজ‍্য কমিটি গঠন করে যারমধ‍্যে ১৯ জন নতুন। নবাগত রাজ‍্য সদস‍্যদের অর্ধেক অংশই তরুণ প্রজন্ম যারা ছাত্র-যুব ফ্রন্ট, প্রকল্প শ্রমিক ফ্রন্ট বা অরণ‍্যের অধিকার ফ্রন্টে সক্রিয়।

Biography of a Revolutionary

বলিউডের মূলধারায় স্বাধীনতা ও দেশাত্মবোধকেন্দ্রীক সিনেমার অভাব নেই। ২০০২-এ মুক্তিপ্রাপ্ত লেজেণ্ড অফ ভগত সিং থেকে শুরু করে হালের শেরশাহ বা উরি, এই প্রত্যেকটি সিনেমার সারবস্তু দেশাত্মবোধ। লেজেন্ড অফ ভগত সিং-এর মতো ঐতিহাসিক ফিকশনে ভগত সিং, রাজগুরুকে দেখা গেছে অতিরঞ্জিত, ইতিহাসের থেকে সম্পূর্ণ আলাদা চরিত্র হিসেবে। আর ২০১৪’র পরের সাত বছরের সিনেমায় দেশপ্রেম ঘুরপাক খেয়েছে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে ভারতীয় সেনাবাহিনীর সাহসের অতিরঞ্জনকে কেন্দ্র করে। সুজিত সরকারের নির্দেশনায় উধম সিং এই প্রচলিত দেশপ্রেমের সংজ্ঞার বাইরে থেকে বলেছে ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের ক্রান্তিকারী ইতিহাস। উগ্র দেশপ্রেমের চিরাচরিত আখ্যানের বাইরে এই সিনেমায় উধম সিং-এর চরিত্রের কেন্দ্র হয়ে উঠেছে তার সমাজবাদী আদর্শ।

সিনেমাটিকে ঘটনাক্রমে ভাগ করলে তিনটি প্রধান পর্ব পাওয়া যায়। জালিয়ানওয়ালাবাগ হত্যাকান্ডের পূর্ববর্তী উধম সিং-এর জীবন, যেখানে তার ব্যক্তিজীবনের চাওয়াপাওয়া দিয়ে এক-একটি দৃশ্য সাজানো। জালিয়ানওয়ালাবাগের ঘটনা প্রত্যক্ষ করার মাধ্যমে শুরু হওয়া ব্যক্তির ঊর্ধ্বে উঠে দেশের জন্য লড়াইয়ের প্রত্যয় এবং সেই সূত্রে হিন্দুস্তান সোশ্যালিস্ট রিপাবলিকান অ্যাসোসিয়েশনে যোগ দেওয়া। সব শেষে এই হত্যাকাণ্ডের আয়োজক জেনেরাল ও’ডয়্যারকে লণ্ডনে হত্যা। রীতেশ শাহ ও শুভেন্দু ভট্টাচার্যের স্ক্রিনপ্লে এই তিনটি পর্বকে অদ্ভুত নৈপুণ্যের সাথে অরৈখিক সময়ক্রমে তুলে ধরেছে।

এই ধারার হিন্দী সিনেমায় আমরা বারবার দেশপ্রেমকে মহিমান্বিত হতে দেখেছি, দেশকে মায়ের সাথে তুলনায় যেতে দেখেছি সংলাপ বা গানের মাধ্যমে। কিন্তু এক্ষেত্রে ভগত সিং ও ঊধম সিং-এর কথায় বারবার উঠে এসেছে এমন এক দেশের কথা, যেখানে ভেদাভেদের কোন জায়গা নেই। ক্রান্তিকারীর পরিচয়েও সেই একই আদর্শ প্রতিধ্বনিত হয়েছে, “ক্রান্তিকারীরা পক্ষপাতদুষ্ট, সাম্প্রদায়িক বা জাতিবাদী হতে পারে না। সামাজিক বা অর্থনৈতিক কোনও ভেদাভেদ থাকতে পারে না। সমতাই একমাত্র সত্য।” এমনকি স্বাধীনতার স্বরূপ নিয়েও এই আদর্শ অনুরণিত হয়েছে, সাম্যবাদী আদর্শ ছাড়া স্বাধীনতা দাসত্বের থেকেও খারাপ হতে পারে। উধম নিজের নাম বলেছে ‘রাম মহম্মদ সিং আজাদ’, যা ভারতীয় স্বাধীনতা-ক্রান্তির ধর্মনিরপেক্ষতার প্রতীক। এই সিনেমায় ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদী শাসকের বিরুদ্ধে ভগত, উধমরা বন্ধু হিসেবে পেয়েছে কমিউনিস্ট রাশিয়াকে এবং ক্রাউনের দাসত্ব থেকে মুক্তিকামী আয়ারল্যাণ্ড রিপাবলিকান আর্মীকে। ভগত-উধমদের ভারতের মুক্তিযুদ্ধের আদর্শের কেন্দ্রেও থেকেছে শ্রমিক-মজদুর-কৃষক-ছাত্র ঐক্যের কথা।

এই ধারার চিরাচরিত সিনেমায় মহিলাদের ভূমিকা থাকে মা, প্রেমিকা বা বোন হিসেবে। ক্রান্তিকারীর ভূমিকায় সামান্য কিছু চরিত্র থাকলেও, সেই চরিত্র খুব ছোট ও অপ্রাসঙ্গিক। কিন্তু এই সিনেমার মহিলারা এইচএসআরএ’র দপ্তরে ভগত-উধমদের সাথে লিফলেট লেখায় ব্যস্ত থাকেন। লণ্ডনে আইআরএ’র তরফে উধমের প্রধান সহকারী হন ঈলিন পামার। এমনকি উধমের প্রেমিকা, যে এক সাধারণ গ্রাম্য কিশোরী, সে ঊধমকে বলে জালিয়ানওয়ালাবাগে রাওলাট অ্যাক্ট-বিরোধী জমায়েতে যাওয়ার কথা।

এই সিনেমায় ব্রিটিশ শাসকের দমনপীড়ন প্রতিনিয়ত মনে করিয়ে দিতে থাকে আজকের ভারতের শাসকের ভূমিকা। যেখানে জেনেরাল ও’ডয়্যার রাওলাট অ্যাক্ট বিরোধী পাঞ্জাবের শান্তিপূর্ণ আন্দোলনকে যেকোন উপায়ে দমন করার নির্দেশ দেয়, কারণ এই আন্দোলন শান্তিপূর্ণ হলেও রাজনৈতিক। জাতীয় নেতাদের ও ছাত্রদের এর আগেই গ্রেপ্তার করা হয়। আর, জালিয়ানওলাবাগে গুলি চালানোর নির্দেশ শুধুমাত্র এই বিদ্রোহ দমনের জন্য নয়, মুক্তিকামীদের মনে আতঙ্ক তৈরির জন্য দেওয়া হয়। লণ্ডনে ও’ডয়্যারের হত্যার পরেও উধম সিংকে আতঙ্কবাদী, সামান্য হত্যাকারী বলা হয়, ক্রান্তিকারী নয়। ও’ডয়্যারের সংলাপে অনুরণিত হয় আজকের শাসকের উক্তি — ভারতীয়রা নিজের ভালো বোঝে না, তাদের ভালোর জন্যই ব্রিটিশ শাসন প্রয়োজন। এই হত্যার মামলা চলাকালীন ব্রিটিশ বিচারক সাংবাদিকদের নির্দেশ দেয় এর খবর না ছাপতে। ঊধম নিজের পছন্দের বইকে শপথ নেওয়ার জন্য চাইলে জাজ প্রশ্ন করেন সেই বই রাজদ্রোহী ধরনের কিনা। এমনকি জেলে বন্দী থাকার সময় উধম অনশন শুরু করলে ব্রিটিশ কর্তারা চিন্তিত হয়ে পড়েন, যাতে ঊধম শহীদের মর্যাদা না পায়।

অভীক মুখোপাধ্যায়ের ক্যামেরায় যখন জালিয়ানওয়ালাবাগের বিদ্রোহ ধরা পড়ে, তারসাথে সরাসরি মিল খুঁজে পাওয়া যায় আজকের রাজধানীতে কৃষক বিদ্রোহের। এই সমাবেশের আগে ও পরের ১৪৪ ধারা পরিবেষ্টিত, সেনা-পুলিশ-ব্যারিকেডে ছয়লাপ জালিয়ানওয়ালাবাগের রাস্তার দৃশ্য মনে করিয়ে দেয় আজকের কাশ্মীরের কথা। বিদ্রোহ তো দূর কথা, হতাহত পরিজনদের চিকিৎসা বা অন্ত্যেষ্টির কাজও হয়ে ওঠে দেশদ্রোহ।

এই সিনেমায় উধম ভারতের ঐতিহাসিক কালের ও সাম্প্রতিক সময়ের হাজার হাজার ক্রান্তিকারীর এক মূর্ত প্রতিবিম্ব হয়ে ধরা পড়ে। যে তার ইন্টারোগেটিং অফিসারের সাথে ব্যক্তিগত্য বৈরিতা দেখায় না, কারণ সে তার নিজের চাকরি করছে। অন্যদিকে আবার উধম এমন ভারতীয়দের মেরে নাক ফাটিয়ে দেয় যারা ব্রিটিশের গোলামীতেই অভ্যস্ত। সে মদ খেয়েও ফ্রী স্পীচের স্বপ্ন দেখে। আবার এই আদর্শের জোরেই একা লণ্ডনের অন্ধ কারাগারেও নিজের সহকর্মীদের নাম নেয়না, দাঁতে দাঁত চেপে শেষ অবধি লড়ে যায়। সে পুলিশী জেরার প্রচণ্ড চাপে শান্ত থাকে, কিন্তু কারখানায় কাজ করার সময় মালিকের জোর জবরদস্তির প্রতিবাদে গর্জে ওঠে।

সব মিলিয়ে সর্দার উধম এমন একটি সিনেমা যা মূল ইতিহাসকে বিকৃত না করে, উধম সিং-এর একক ব্যক্তি থেকে ক্রান্তিকারী হয়ে ওঠার গল্প বলে সৃজনশীল কল্পনার আশ্রয়ে। তাঁর মূলগত সাম্যবাদী আদর্শ, তাঁর আন্তর্জাতিক শোষিত-ঐক্যের স্বপ্নের একটি দলিল পেশ করে। কিন্তু দুঃখের বিষয় এই যে, এমন একটি সিনেমা ভারতের সর্বসাধারণের নাগালের বাইরে, আন্তর্জাতিক কর্পোরেট ‘আমাজন’ প্ল্যাটফর্মে মুক্তিপ্রাপ্ত হয়। ভগত সিং, উধম সিং-এর ভারতের স্বপ্নও তাই আপামর ভারতবাসীর নাগালের বাইরেই থেকে যায়।

- কৌশিকি ভট্টাচার্য

Commemoration of  anniversary

কমরেড গীতা দাস বলতেন, “আমাকে কেউ কেউ নারীবাদী বলেন। ঠিকই তো আমি অবশ্যই একজন নারীবাদী ! যতদিন নারীদের উপর অবিচার এক জীবন্ত বাস্তব হয়ে থাকছে, ততদিন আমাদের সকলের কী তাই হওয়া উচিত নয়?”

সারা ভারত প্রগতিশীল মহিলা সমিতির প্রথম সর্ব ভারতীয় সভানেত্রী, সিপিআই(এমএল) লিবারেশনের কন্ট্রোল কমিশনের সদস্যা, আশির দশকে আইপিএফ, নারী নির্যাতন প্রতিরোধ মঞ্চের রাজ্য ও জাতীয় স্তরের নেত্রী, গীতা দাসের জীবন ভারতের বামপন্থী নারীবাদী ইতিহাসের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ।

গত ২৪ অক্টোবর, সিপিআই(এমএল) লিবারেশনের রাজ্য কমিটির অফিসে গীতা দাসের অষ্টম স্মরণ সভায় কমরেডদের স্মৃতিকথায় উঠে এল সত্তরের দশকে নকশালপন্থী রাজনীতির সাথে যুক্ত হওয়া গীতা দাসের অদম্য জেদ আর অফুরান স্নেহে ভরা বিপ্লবী জীবনের ছবি। গীতা দাসকে কেউ মনে রেখেছেন জননেত্রী হিসাবে, কেউ মুশকিল-আসান হিসাবে, আবার কারো কাছে তিনি রাজনীতিতে আসার অনুপ্রেরণা। তাঁর ভাষণ সম্মোহিতের মতো শুনতেন পথচলতি জনতা। মাইলের পর মাইল হেঁটে প্রত্যন্ত এলাকায় অক্লান্ত বলে চলতেন শাসক শ্রেণীর দুরাচারের বিরুদ্ধে। পিতৃতান্ত্রিক আচারের ঘোর বিরোধী গীতা মানুষের সাথে মিশে কাজ করার জন্য বিবাহের চিহ্ন বহন করার বাধ্যতাকে আমল দেননি কোনো দিনই। সংগঠনে যুক্ত হয়া নবীন সদস্যাদের পোশাক, বিধির সামন্ততান্ত্রিক বাঁধন ভেঙ্গে ফেলতে উৎসাহিত করতেন। সংসারের লক্ষণরেখা ভেঙ্গে বহু মেয়েকে সক্রিয় রাজনীতির আঙিনায় নিয়ে এসেছিলেন। রাষ্ট্রের দালাল পুলিশ থেকে শুরু করে ব্রাহ্মণ্যবাদী পিতৃতন্ত্রের দালাল শঙ্করাচার্য, ক্ষমতার সাথে চোখে চোখ রেখে লড়াই করার সাহসের নাম গীতা দাস। একইসাথে কমরেডদের জন্য স্নেহ আর ভরসার নীড়ের নামও গীতা দাস। মার্কসবাদ আর নারীবাদের ওতপ্রোত আন্তঃসম্পর্ককে নিজের জীবন দিয়ে উদযাপন করেছেন।

একদা পূর্ববঙ্গের (বাংলাদেশ) ফরিদপুর জেলার কোটালী পাড়ায় জন্ম, দেশভাগের পর কলকাতায় চলে আসা গীতার পরিবার উদ্বুদ্ধ হয়েছিল বামপন্থী আদর্শে। বামপন্থী সাহচর্যে বেড়ে ওঠায় সাম্যবাদের প্রতি তাঁর ঝোঁক ছিল সহজাত। অসম্ভব দারিদ্র্যের মধ্যে পড়াশোনা চালানো কিশোরী গীতার স্কুল-জীবনেই এক সিপিআই কর্মীর সাথে বিবাহ হয়। এক সন্তানের জন্ম দেওয়ার পরেও ম্যাট্রিকুলেশন পাশ করেন। বেহালা সরিষা রামকৃষ্ণ মিশনে সন্তানকে নিয়ে হোস্টেলে থেকে প্রাইমারি টিচার বেসিক ট্রেনিং কোর্স করেন এবং ফার্স্ট ক্লাস ফার্স্ট হন। এরপরে তিনি কলকাতা কর্পোরেশন স্কুলে শিক্ষকতার কাজে যুক্ত হন। স্বামী ও শ্বশুরবাড়ির বিপরীতে গিয়ে নকশালপন্থী কমরেডদের নিজের বাড়িতে সুরক্ষিত আশ্রয়ের ব্যবস্থা করতেন। পরিবারের সাথে লড়াই করে বিপ্লবী আন্দোলন চলাকালীন সংবাদবাহকের কাজ করে গেছেন। পার্টির প্রতি তাঁর ভালোবাসা ও অঙ্গীকার ছিল অটল। মানুষের মাঝে কাজ করার জন্য বিবাহ ভেঙ্গে সন্তানদের নিয়ে বেরিয়ে আসেন। বর্জন করেন স্বামীর পদবি আর বিবাহের সমস্ত চিহ্ন। শিক্ষকতা করে সন্তানদের বড়ো করার পাশাপাশি জীবনের শেষ সময় পর্যন্ত নকশালবাড়ির চেতনায় ভর করে সমাজ বদলানোর কাজে ব্রতী থেকেছেন। গীতা মনে করতেন, নারীমুক্তির প্রাথমিক ধাপ হল রোজকারের লিঙ্গ-ভিত্তিক বঞ্চনার বিরুদ্ধে লড়তে শেখা।

১৯৮২ সালে মথুরা ধর্ষণকাণ্ডে যখন সারা দেশ উত্তাল, আন্তর্জাতিক শ্রমজীবী নারী দিবসে, ভারতে নারীদের প্রতি রাষ্ট্রীয় ও সামাজিক হিংসার বিরুদ্ধে বিভিন্ন নারী সংগঠনকে সংঘবদ্ধ করে, কলকাতায় ব্যপক প্রতিবাদ কর্মসূচি গড়ে তুলেছিলেন। ১৯৮০-র দশকে পার্টির গোপন অবস্থায় রাজ্য ও জাতীয় স্তরে ইন্ডিয়ান পিপলস ফোরামের জাতীয় ও রাজ্যস্তরের নেতৃত্বের অন্যতম ছিলেন গীতা দাস। পশ্চিমবঙ্গে প্রগতিশীল মহিলা সমিতি (PWA) গড়ে তোলার পিছনে মুখ্য ভূমিকা ছিল তাঁর। ১৯৯৪ সালে জাতীয় স্তরে সারা ভারত প্রগতিশীল মহিলা সমিতি গড়ে তোলা হয় এবং গীতা দাস প্রথম সর্বভারতীয় সভাপতি নির্বাচিত হন। বন্দীমুক্তি আন্দোলনের অন্যতম মুখ ছিলেন তিনি। পাশাপাশি, বানতলা ধর্ষণকাণ্ড, সিঙ্গুরে জমিগ্রাস সহ প্রতিটি রাষ্ট্রীয় হামলার বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলতে অগ্রণী ভূমিকা রেখেছিলেন। আদর্শগত ফারাক সত্ত্বেও, লিঙ্গ-ভিত্তিক নিপীড়নের মোকাবিলায় বিভিন্ন সংগঠন ও ব্যাক্তিবর্গকে একত্রিত করতে উদ্যোগী থাকতেন বরাবর। তাঁর দৃঢ় ব্যাক্তিত্ব ও মধুর আচরণে রাজনৈতিক কর্মী ও বুদ্ধিজীবীদের মধ্যে শ্রদ্ধা ও ভালোবাসার পাত্রী হয়ে উঠেছিলেন। তাঁর আহ্বানে পশ্চিমবঙ্গে আইপোয়া প্রকাশিত “প্রতিবিধান” পত্রিকার সাথে যুক্ত হয়েছিলেন নবনীতা দেবসেন, মৈত্রেয়ী চট্টোপাধ্যায়, মধুছন্দা কার্লেকর, সুদেষ্ণা চক্রবর্তীর মতো বিশিষ্টজনেরা। নারী আন্দোলনের স্বার্থে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে উঠেছিল আরতি গাঙ্গুলি, ঝর্ণা ভৌমিক, যশোধরা বাগচীদের মতো প্রতিনিধিদের সাথে।

কমরেড গীতা দাসের অষ্টম স্মরণ সভায় সারা ভারত প্রগতিশীল মহিলা সমিতির সদস্যরা ছাড়াও উপস্থিত ছিলেন সিপিআই(এমএল) লিবারেশনের জাতীয় ও রাজ্য স্তরের নেতৃত্ব। সভা থেকে প্রস্তাব ওঠে, বামপন্থী ও নারীবাদী ইতিহাসের সাক্ষ্য হিসাবে ও মনুবাদী-কর্পোরেট রাজকে প্রতিহত করতে কমরেড গীতা দাসের জীবনকে পুনরায় আবিষ্কাবর জরুরি। সমাজের প্রতিটি অসাম্য ও বঞ্চনার বিরুদ্ধে অকুতোভয় যোদ্ধা গীতা দাসের জীবন বামপন্থা ও নারীবাদের যৌথ সংগ্রামের পাথেয় হোক।

- সম্প্রীতি মুখার্জী

construction of a martyr

“তিনি ছিলেন বলেই গোটা এলাকা সেদিন রক্ষা পেয়েছিল। দাঙ্গাবাজরা জলঙ্গি নদী পেরিয়ে আমাদের এলাকায় ঢোকার সাহস পায়নি। তাঁর বলিষ্ঠ নেতৃত্বে কয়েকশো গ্রামবাসী সারা রাত জেগে কাটিয়েছিল। মানুষ রুখে দাঁড়িয়েছিল বলেই সাম্প্রদায়িক হামলাবাজরা পিছু হঠে যেতে বাধ্য হয়েছিল।” একথা জানালেন কালীনগর গ্রামের নুরউদ্দিন সেখ। এধরনের আরও বহু ধরনের বার্তালাপে ৮০’র দশকের সেই উজ্জ্বল অধ্যায় যেন জীবন্ত হয়ে উঠলো। ইতিহাসের সেই আখ্যান আজও নদীয়ার ধুবুলিয়া ব্লকের কালীনগর ও পার্শ্ববর্তী গ্রামাঞ্চলের মানুষের মুখে মুখে ফেরে। এভাবেই বেঁচে আছেন এই গ্রাম তথা এলাকার ভূমিপুত্র বিমান বিশ্বাস। তখন ছিল কংগ্রেসী দাঙ্গাকারী বাহিনী আর আজ সামনে এসেছে ফ্যাসিষ্ট বিজেপির আগ্রাসন। তাই গণপ্রতিরোধ গড়ে তোলার সেই কর্মকাণ্ড আজকের সময়কালেও হয়ে রয়েছে ফ্যাসিবাদ মোকাবিলার অন্যতম কার্যকরী পন্থা। সংশ্লিষ্ট এলাকায় মানুষের চেতনার বিকাশ ঘটেছিল গ্রামীণ গরিবদের জমি, মজুরি ও মর্যাদার সংগ্রামের মধ্য দিয়ে। ৮০-৯০’র দশক জুড়ে নদীয়ার ধুবুলিয়া, চাপড়া ব্লক সহ পার্শ্ববর্তী বিরাট এলাকা জুড়ে কয়েক হাজার একর খাস বেনামী জমি উদ্ধারের মধ্য দিয়ে সফল হয়েছিল ভূমি সংস্কারের আন্দোলন। প্রতিষ্ঠা পেয়েছিল নিপীড়িত মানুষের অধিকার। গড়ে উঠেছিল প্রতিরোধ সংগ্রামের এলাকা। সে সময়কালে জলঙ্গী নদীর আকবাঁকা স্রোতে ভেজা সবুজ ক্ষেতে শহীদের মৃত্যু বরণ করেন বিমান বিশ্বাসের সহযোদ্ধা ফজলু ও আমির। তারও আগে ৭০ দশকে সমাজ বদলের বিপ্লবী অভিযানে সামিল হয়ে এই এলাকায় রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসের বলি হন আহাদ-হাকিম-ধনঞ্জয় হালদার। ২৪ পরগণার শহরতলি থেকে নদীয়ার গ্রামে কৃষককে সংগঠিত করতে চলে আসা বিপ্লবী যুবক পুলক রায়।

এই সমস্ত শহীদদের স্মরণে কমরেড বিমান বিশ্বাসের তৃতীয় প্রয়াণ দিবস উপলক্ষে গত ১২ অক্টোবর কালীনগর গ্রামে নবনির্মীত শহীদ বেদীর উদ্বোধন হয়। লাল পতাকা উত্তোলন, নীরবতা পালন, মাল্যদানের পর কালীনগর গ্রামের সমবায় সমিতির মাঠে অনুষ্ঠিত হল স্মরণসভা। কেবল স্মৃতিচারণ নয়, শহীদ ও প্রয়াত সাথীদের স্মরণ অনুষ্ঠানে উঠে এল আজকের সময়কালে কৃষকের সংকটের কথা। যথা নদীর তীরবর্তী উর্বরা তিন ফসলি জমি থাকলেও তীব্রতর হয়ে উঠেছে সেচের অপ্রতুলতা, ফসলের অভাবী বিক্রি, কৃষি উপকরণের সীমাহীন মূল্যবৃদ্ধি, চরম গ্রামীণ বেকারত্ব। গ্রামীণ মজুরদের শ্রমের কোনও মর্যাদা নেই, সম্মানজনক মজুরি নেই। ১০০ দিনের প্রকল্পে বছরে মাত্র ৬ দিন কাজ করে দু’মাস হয়ে গেলেও মজুরি পাওয়া যায় না। সরকারি প্রতারণা আর বঞ্চনাকে ধামাচাপা দিয়ে চলছে কেবল কিছু প্রতীকী অনুদান প্রকল্প।

সভায় দিল্লী ও সারা দেশে চলমান কৃষক আন্দোলনের বার্তা গ্রামে গ্রামে নিয়ে যাওয়ার আহ্বান জানানো হয়। এরাজ্যের কৃষকের দাবিগুলিকে যুক্ত করে আন্দোলন গড়ে তোলার ডাক দিলেন নেতৃবৃন্দ। আজ যখন গাড়ি চাপা দিয়ে পিষে মারা হচ্ছে কৃষকদের তখন ঘাতক আর রংবেরং-এর বিশ্বাসঘাতকদের বিরুদ্ধে কৃষক ও গ্রামীণ মজুরদের আন্দোলন গড়ে তোলার শপথ নিলেন সম্মিলিত কর্মী ও নেতৃবৃন্দ। সমগ্র কর্মসূচি সঞ্চালনা করেন ধনঞ্জয় গাঙ্গুলী। উপস্থিত ছিলেন জেলা নেতৃবৃন্দ কাজল দত্তগুপ্ত, কৃষ্ণ প্রামানিক, আলতাফ হোসেন, অমল তরফদার, ইনসান সেখ, সন্তু ভট্টাচার্য, নীহার ব্যানার্জী প্রমুখ সহ এলাকার আনসারুল হক, ঠান্ডু সেখ, মিনাজ বিশ্বাস, সুব্রত রায়, হবিবুর রহমান ও প্রয়াতদের পরিবারের সদস্যরা, ছিলেন রাজ্য নেতা বাসুদেব বসু ও জয়তু দেশমুখ।

Roy passed away

Comrade Shyamapadaগত ১৩ অক্টোবর পূর্ব বর্ধমান জেলায় আমাদের সকলের প্রিয় কমরেড শ্যামাপদ রায় প্রয়াত হয়েছেন। কষ্টকর দীর্ঘ রোগভোগের মধ্যেই হৃদরোগে আক্রান্ত হয়েছিলেন। সিপিআই(এমএল) বর্ধমান জেলা কমিটির পক্ষ থেকে কুনাল বক্সী ও শ্রীকান্ত রাণা মরদেহে মাল্য অর্পণ করে শ্রদ্ধা নিবেদন করেন। আমরা হারালাম এক একনিষ্ঠ কমিউনিস্ট ক্যাডারকে। ১৯৭০ সাল থেকে স্কুল জীবনে কমরেড সুনীল বসুর সাথেই পার্টি রাজনীতিতে যোগ দেন। রায়না থানা এলাকায় পার্টির সংগঠন গড়ে তুলতে অনেক অত্যাচার ও দমন-পীড়ন সহ্য করেন। সমস্ত জেলা ও রাজ্য কর্মসূচিতে সক্রিয়ভাবে অংশ নিতেন। তাঁর বাড়ি পার্টির সেল্টার ও প্রয়োজনে অফিসে পরিণত করেন। একসময় ছোট ছোট গ্রুপগুলোকে জেলায় যোগাযোগ করার এক যোগসূত্রের কাজ করেন। আমরা তাঁকে রায়না থানা এলাকার পার্টি নেতা হিসেবে চিনতাম। কৃষক সংগঠন গড়ে তোলার প্রথম পর্যায়ে পশ্চিমবঙ্গ কৃষক সমিতির জেলা সভাপতি ছিলেন। বেশ কিছুদিন পার্টির জেলা কমিটির সদস্য ছিলেন। পার্টির যে কোনও দায়িত্ব হাসিমুখে সামলেছেন। জনগনের প্রতি ছিল গভীর মমত্ববোধ। একনামে তাঁকে রায়নায় সকলেই চিনতেন। বাম আন্দোলনের এক অগ্রণী যোদ্ধা হিসেবে তার নাম স্মরণীয় হয়ে থাকবে।

তাঁর স্ত্রী, মেয়ে, জামাই ও ভাই-এর প্রতি পার্টির পক্ষ থেকে সমবেদনা জানানো হয়েছে।

কমরেড শ্যামাপদ রায় অমর রহে, লাল সেলাম।

Comrade Mukul Chatterjee

Chatterjee passed awayনদীয়া জেলায় নকশালবাড়ি আন্দোলনের প্রথম সর্বক্ষণের কর্মী ছিলেন তিনি। প্রয়াত কমরেড মুকুল চট্টোপাধ্যায় পলাশীপাড়ায় এক সুশিক্ষিত বামপন্থী পরিবারে এবং পরিমন্ডলে বড় হয়ে কৈশোর জীবনেই বিপ্লবী আদর্শে উদ্বুদ্ধ হয়েছিলেন। বহু বিশিষ্ট ধরনের গুণাবলীর অধিকারী ছিলেন তিনি। নদীয়া জেলার বুকে খেলাধুলায় তাঁর বিরাট নামডাক ছিল। এছাড়া ছবি আঁকা, সঙ্গীত, তবলা বাদন প্রভৃতিতে ছিলেন খুবই পারদর্শী। তাঁর ছিল বহুসংখ্যক ছাত্রছাত্রী অনুগামী। উজ্জ্বল ব্যক্তিত্ববান ও শিক্ষিত যুবক মুকুল চট্টোপাধ্যায় তাঁর রাজনৈতিক জীবনের শুরুতে সংশোধনবাদের সাথে রাজনৈতিক সংগ্রাম চালিয়ে নদীয়া জেলায় বিপ্লবী মতাদর্শের ভিত্তিতে গঠিত ‘বলশেভিক কোর’এর সদস্য হন। তারপর সিপিআই(এমএল)-এর গঠনকাল থেকেই তারসাথে যুক্ত হন। ঘরবাড়ি ক্যারিয়ার ত্যাগ করে ভূমিহীন দরিদ্র কৃষকদের সাথে একাত্ম হওয়ার প্রক্রিয়ায় গ্রামে চলে যান। শোনা যায় সে সময় কৃষকদের সাথে মাঠে কৃষিকাজ করতে গিয়ে অনভ্যস্ত চেহারায় ক্ষতচিহ্ন বহন করেও তিনি নাকাশীপাড়া-চাপড়ার গ্রামাঞ্চলে সর্দার পাড়া বা সংখ্যালঘুদের মধ্যে বিপ্লবী সংগ্রাম গড়ে তোলার কাজ করেছিলেন। অচিরেই তিনি গ্রামের জোতদারদের নজরে পড়ে যান, পুলিশ তাকে গ্রেপ্তার করে। ১৯৭২ সালে জেল থেকে ছাড়া পান। পরবর্তীতে তিনি এলাকার একটি উচ্চবিদ্যালয়ে শিক্ষকতার কাজে যোগ দেন। এবিষয়ে তৎকালীন রাজ্য সরকার প্রবল বাধা সৃষ্টি করেছিলো, কিন্তু এলাকার ব্যাপক মানুষ তাঁর পক্ষে দাঁড়ায়। ১৯৭৯ সালে গণফ্রন্টের নদীয়া জেলা সভাপতি হন তার দাদা মনু চ্যাটার্জী। সেই সূত্রে সিপিআই(এমএল)-এর গণকার্যকলাপের প্রতি তাঁর নৈতিক সমর্থন ছিল। পরবর্তী জীবনে তিনি বামপন্থী সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে যুক্ত থাকতেন। আজীবন সংস্কারমুক্ত মনন সম্পন্ন এক ব্যতিক্রমী চরিত্রের মানুষ ছিলেন তিনি। গত ১৭ অক্টোবর তিনি নিজ বাসভবনে প্রয়াত হন। নদীয়া জেলায় নকশালবাড়ি আন্দোলনের বিশিষ্ট ব্যক্তিত্ব মুকুল চট্টোপাধ্যায় লাল সেলাম।

Commemoration meeting

কমরেড সুভাষ রাজবংশী গত ২৪ সেপ্টেম্বর প্রয়াত হন। দৃঢ়চেতা আজীবন কমিউনিস্ট সুভাষ রাজবংশীর স্মরণসভা ২৪ অক্টোবর হুগলি জেলার বলাগড় ব্লক কমিটির পক্ষ থেকে অনুষ্ঠিত হয়।

কিশোর বয়সে ছয়ের দশকের খাদ্য আন্দোলনে যোগদানের মধ্যে দিয়ে তিনি বাম আন্দোলনে যুক্ত হন। এরপর দীর্ঘ ৫০ বছর তিনি কমিউনিস্ট তথা বাম গণতান্ত্রিক আন্দোলন থেকে কখনও বিচ্যুত হননি। জরুরি অবস্থার সময় কংগ্রেসী গুন্ডারা তুলে নিয়ে গিয়ে শারীরিক অত্যাচার চালায় এবং মারা গেছে মনে করে স্থানীয় মেদগাছি বাজারে ফেলে দিয়ে চলে যায়। এলাকায় সকল মানুষের শ্রদ্ধা ও ভালোবাসার জন ছিলেন সমাজসেবী ও জন দরদী সুভাষ রাজবংশী। ১৯৯৮ সালে তিনি একঝাঁক সহযোদ্ধাকে নিয়ে সিপিআই(এম) ছেড়ে সিপিআই(এমএল)-এ যোগদান করেন এবং জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত তিনি ছিলেন সিপিআই(এমএল)-এর একনিষ্ঠ কর্মী। তাঁর স্মরণ সভায় সুভাষদার সংগ্রামী জীবনের নানা কথা উঠে আসে, তাঁর দুই পুত্র শুভেন্দু ও সুখেন্দু, পার্টির জেলা সম্পাদক প্রবীর হালদার, কৃষক সংগঠক তপন বটব্যাল, ব্যান্ডেল কাটোয়া সংগ্রামী হকার্স ইউনিয়নের সংগঠক নারায়ণ দেবনাথ ও অন্যান্য বক্তাদের কণ্ঠে। শোকপ্রস্তাব পাঠ করেন শোভা ব্যানার্জি। ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে লড়াইকে জোরদার করা ও কমরেড সুভাষ রাজবংশীর অসমাপ্ত কাজকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার শপথ গ্রহণের মধ্যে দিয়ে বলাগড় ব্লক সম্পাদক তথা সভার সঞ্চালক শেখ আনারুল সভার কাজের সমাপ্তি ঘোষণা করেন।

= = সমাপ্ত ==

খণ্ড-28
সংখ্যা-37
28-10-2021