deshabrati logo
deshabrati-18-11-2021adivasi convention1All India Indigenous Rights Convention

আদিবাসী সংযুক্ত মোর্চা :

সর্বভারতীয় আদিবাসী অধিকার কনভেনশন থেকে গঠিত হল আদিবাসী সংঘর্ষ মোর্চা। তেরোটি রাজ্য থেকে আগত বিভিন্ন ভাষাভাষী আদিবাসী জনসমুদায়ের শতাধিক প্রতিনিধি কনভেনশনে অংশ নেন। বিভিন্ন অভিজ্ঞতা ও উপলব্ধি উঠে আসে। দেশ জুড়ে আদিবাসীদের বহুবিধ লড়াই আন্দোলনকে সমন্বিত ও ঐক্যবদ্ধ করার প্রয়োজনীয়তার কথা তুলে ধরেন সকলেই। এই লক্ষ্যে ‘আদিবাসী সংঘর্ষ মোর্চা’-র ঘোষণা গৃহীত হয়। এই কাজ এগিয়ে নিয়ে যেতে কনভেনশন থেকে জাতীয় স্তরে আহ্বায়কমণ্ডলী, জাতীয় পরিষদ, উপদেষ্টা মণ্ডলী ও সংহতি পরিষদ — এই চার স্তর বিশিষ্ট কাঠামো নির্বাচন করা হয়। এর মধ্যে একমাত্র সংহতি পরিষদেই অ-আদিবাসী সাথী-বন্ধুরা থাকতে পারবেন। জাতীয় পরিষদ মূল নীতি নির্ধারক সংস্থা যা নিজেকে উন্মুক্ত রাখবে আগামী চলার পথে নতুন নতুন সংগ্রামের আদিবাসী প্রতিনিধিদের অন্তর্ভুক্ত করে নিতে।

আদিবাসী অধিকার কনভেনশনের স্থান ও সময় দুইই ছিল বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। ১৫ নভেম্বর বিরসা মুণ্ডার জন্মজয়ন্তী এবং ঝাড়খণ্ড রাজ্যেরও প্রতিষ্ঠা দিবস। ঝাড়খণ্ড ভারতের একমাত্র রাজ্য যার সাথে আদিবাসী পরিচিতি ও সংগ্রামের গভীর ইতিহাস জড়িত। ঝাড়খন্ডের রাঁচি শহরের উপকণ্ঠে ‘বাগইচা’ ফাদার স্ট্যান স্বামীর সামাজিক প্রতিষ্ঠান। এখানেই অনুষ্ঠিত হল আদিবাসী অধিকার কনভেনশন।

কনভেনশনের পূর্বসন্ধ্যায় বাগইচার মুক্ত মঞ্চে ধামসা মাদল আর বিভিন্ন ভাষা ও ভঙ্গীর গান ও নাচ বৈচিত্র্যের মাধ্যমে ঐক্যের আবেগ তৈরি করে। ঝাড়খণ্ড জনসংস্কৃতি মঞ্চের সাঁওতালি টিম ‘অঞ্জোম’, নাগপুরি টিম ‘প্রেরণা’ ও ‘মান্দর’ ও মুণ্ডারি টিম ‘সেঙ্গেল’-এর নৃত্যগীত প্রদর্শনে ঐতিহ্য ও আধুনিকতার বৈপ্লবিক মেলবন্ধন গভীর আত্মবিশ্বাসের জন্ম দেয়। এই সন্ধ্যাতেই সভাকক্ষে স্বাগত ভাষণে মনোজ ভক্ত বলেন, ভাষার বাধার দেওয়াল হঠিয়ে দিয়ে লড়াই-সংঘর্ষ আমাদের এক করে দেয়। বিরসা মুণ্ডা থেকে শুরু করে ফাদার স্ট্যান স্বামী, ঝাড়খণ্ড রাজ্য গঠনের লড়াই থেকে শুরু করে সিএনটি-এসপিটি বাঁচানোর লড়াই বা পাথালগাঢ়ি, বিধানসভার ভেতরে বাইরে কিংবদন্তি নেতা মহেন্দ্র সিং-এর লড়াই ও শাহাদাত থেকে শুরু করে বিজেপিকে রাজ্যের ক্ষমতা থেকে অপসারন — অজস্র লড়াই, অনেক বিজয় ও শাহাদাতের ঝাড়খণ্ডে সকলকে স্বাগত জানিয়ে তিনি নতুন লড়ায়ের অঙ্গীকার ও এক বৃহত্তর প্ল্যাটফর্মের দিশা নিয়ে কনভেনশন থেকে বেরনোর আহ্বান রাখেন। উড়িষ্যার লড়াকু জননেতা তিরুপতি গোমাঙ্গ কনভেনশন পরিচালনার রূপরেখা পেশ করেন। কর্ণাটকের সাথী ক্লিফটন ডি রোজারিও কনভেনশনের বিষয়-প্রবেশ ভাষণে আদিবাসী পরিচিতির স্বীকৃতি, পঞ্চম তপশীল, বনাধিকার আইন, আদালতের ভূমিকা ও ঐক্যবদ্ধ হওয়ার বাস্তবতা তুলে ধরার সাথে সাথে কর্ণাটকের কফি বাগিচাগুলির আদিবাসীদের বঞ্চনা লাঞ্ছনা এবং এমনকি বর্তমান সময়েও কীভাবে চলতি বাসে আদিবাসীরা সীটে বসার অধিকারটাও পায় না সে বিষয়ে বর্ণনা করেন। ঝাড়খণ্ডের লড়াকু জননেত্রী দয়ামনী বারলা বলেন, দেশের লুটেরারাও বিরসা জয়ন্তিতে ‘নমন’ করবে, লুটেরাগুলো সব একজোট, আমাদেরও একজোট হতে হবে। তিনি বলেন, আরএসএস বিজেপি আদিবাসী স্বীকৃতি দিতে চায় না, ওরা ঝাড়খণ্ডের নাম দিতে চেয়েছিল বনাঞ্চল, কিন্তু আদিবাসীরা লড়াই করে ঝাড়খণ্ড আদায় করেছে। দয়ামনি বলেন, কেবল কিছু সরকারি চাল-ডাল পাওয়ার লড়াইয়ে আটকে থাকলে হবে না, কর্পোরেটদের কাছে দেশ বেচে দেওয়ার বিরুদ্ধে জোট বাঁধতে হবে, আদিবাসীদের ঘোষণা করতে হবে যে কাশ্মীর থেকে কন্যাকুমারী প্রতিটি ইঞ্চি জমির ও আমাদের প্রকৃতি পরিবেশ বাঁচানোর বাঁচানোর দায়িত্ব আমাদের, এই কনভেনশন থেকে আদিবাসী সংঘর্ষ মোর্চা প্রথম সেই বিউগল বাজানোর কাজ করুক।

adivasi convention_A

১৫ নভেম্বর সকালে বাগইচা চত্বরে বিরসা মুণ্ডার মূর্তিতে মাল্যদান করে সকলে জমায়েত হন চত্বরের অন্যপ্রান্তে “পাথাল গাঢ়ি”-র সামনে। পুঁতে রাখা এই পাথরের ফলক নিজেই পাথালগাঢ়ি আন্দোলনের দ্যোতক ও স্মারক। এই পাথরের ফলকের দুই পৃষ্ঠে লেখা আছে তিলকা মাঝি থেকে শুরু করে বর্তমান সময় পর্যন্ত বিভিন্ন শহীদ ও রাষ্ট্রীয় গণহত্যার কথা। সর্বশেষ সংযোজিত নাম ফাদার স্ট্যান স্বামীর। এই পাথালগাঢ়িকে ও তার পাশে রাখা ফাদার স্ট্যান স্বামীর প্রতিকৃতিকে কেন্দ্র করে ঘিরে দাঁড়িয়ে শ্রদ্ধা জানান হয় এবং পাথালগাঢ়ি আন্দোলনের ইতিহাস ও ঐতিহ্য সংক্ষেপে তুলে ধরা হয়। এরপর সভাকক্ষে কনভেনশনকে সম্বোধিত করেন কমরেড দীপঙ্কর ভট্টাচার্য। বিরসা মুণ্ডার “আবুয়া দিশম, আবুয়া রাজ” শ্লোগানের কথা টেনে বিরসাকে ভগৎ সিংহের আগের এক ভগৎ সিং বলে বর্ণনা করেন এবং আদিবাসী সংগ্রামকে কৃষক শ্রমিকের সংগ্রামের সাথে ঐক্যবদ্ধ হিসেবে তথা দেশ বাঁচানোর লড়াইয়ের অগ্রভাগের শক্তি হিসেবে ব্যাখ্যা করেন। কনভেনশনের প্রস্তাবনা পেশ করেন দেবকি নন্দন বেদিয়া। ঝাড়খণ্ডের প্রেমচাঁদ মুর্মু, পশ্চিমবাংলার সরস্বতী বেসরা, কার্বি আংলঙের ইংইপি, কর্ণাটকের কাব্য, গুজরাটের কমলেশ, ইউপির বেগন রাম, মহারাষ্ট্রের শ্যাম গোহেল সহ বিভিন্ন প্রতিনিধিরা নিজেদের বক্তব্য ও অভিজ্ঞতা তুলে ধরেন। পূর্বে উল্লিখিত চার স্তর বিশিষ্ট কাঠামো নির্বাচিত হয়। সম্মেলন পরিচালকমণ্ডলী হিসাবে ছিলেন, প্রতিমা ইংইপি, রবি ফাংচো, সুমন্তি ইক্কা, তিরুপতি গোমাঙ্গ, দেবকিনন্দন বেদিয়া ও জেভিয়ার কুজুর। কনভেনশনের শেষে সুমন্তি এক্কার ধন্যবাদ জ্ঞাপন ভাষনের মধ্যে দিয়ে সম্মেলন সমাপ্ত হয়।

Indigenous Declaration

আমরা আদিবাসীরা ভারতের আদি বাসিন্দা, আমরা ঔপনিবেশিক যুগ থেকে চরম নিপীড়ন এবং সুব‍্যবস্থিত উচ্ছেদ ও দমন মোকাবিলা করে নিজেদের অধিকার ও মর্যাদার জন‍্য লড়াই করে চলেছি। আদিবাসী প্রতিরোধের এই মহান ঐতিহ‍্যে আমরা গর্ব বোধ করি এবং এই লড়াইকে চূড়ান্ত বিজয়ের লক্ষ‍্যে এগিয়ে নিয়ে যেতে আমরা দৃঢ় প্রতিজ্ঞ।

আমরা আমাদের জল জঙ্গল জমি রক্ষার লড়াই চালিয়ে যাব।

রাষ্ট্র ও কর্পোরেটের আঁতাতকে আমরা ধিক্কার জানাই।

অরণ‍্য ও তার সমস্ত প্রাকৃতিক সম্পদের ওপর আমাদের ব‍্যক্তিগত ও সমষ্টিগত অধিকার প্রতিষ্ঠার লড়াই চালানোর অঙ্গীকার করছি আমরা।

আমরা ঘোষণা করছি যে আমাদের নাগরিক অধিকার, রাজনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক অধিকার ভোগ ও প্রয়োগ করার ক্ষেত্রে কোনোরকম অসাম‍্য ও বৈষম‍্য ও আমরা বরদাস্ত করব না।

আদিবাসী হিসেবে আমাদের বিশিষ্ট পরিচিতি ও সাংস্কৃতিক ঐক‍্য জোরালো ভাবে ঊর্দ্ধে তুলে ধরব আমরা, আর আমাদের সংস্কৃতিকে বলপূর্বক আত্মসাৎ ও ধ্বংস করার যে কোন অপচেষ্টাকে প্রতিরোধ করব।

আমাদের ভাষা ও সংস্কৃতির সংরক্ষণ ও বিকাশের লক্ষ‍্যে সক্রিয় থাকার অঙ্গীকার করছি আমরা।

যে প্রাকৃতিক সম্পদের ওপর নির্ভর করে আমরা বাঁচি তার ওপর আমাদের নিজস্ব নিয়ন্ত্রণ, স্বায়ত্ততা ও স্বশাসনের অধিকার ঘোষণা করছি আমরা।

আমাদের অর্থনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক উন্নয়ন এবং প্রাকৃতিক সম্পদের ব‍্যবস্থাপনার ওপর আমাদের অধিকার ঊর্দ্ধে তুলে ধরছি আমরা।

ভূমি, এলাকা ও প্রাকৃতিক সম্পদের ওপর আমাদের অধিকার ঘোষণা করছি আমরা, আর প্রকৃতি-পরিবেশ সংরক্ষণ ও সুরক্ষার অঙ্গীকার করছি।

আমরা আমাদের বিবিধতাকে স্বীকৃতি দিচ্ছি ও তাকে লালনপালন ও রক্ষা করার অঙ্গীকার করছি।

আমাদের কাছ থেকে কেড়ে নেওয়া আমাদের ভূমি, এলাকা ও সম্পদের মেরামতি ও ক্ষতিপূরণের লড়াই চালিয়ে যাওয়ার অঙ্গীকার করছি আমরা।

আদিবাসীদের ভূমিহীন অবস্থার অবসান ঘটাতে প্রয়োজনীয় ভূমিসংস্কারের সংগ্রাম এগিয়ে নিয়ে যেতে আমরা বদ্ধপরিকর এবং জমি কেড়ে নেওয়া রুখতে যা যা করা প্রয়োজন তা আমরা করব।

সম্ভাব‍্য সমস্ত এলাকাকে পঞ্চম তপশীলের আওতায় এনে সুরক্ষিত করতে এবং ‘পেশা’ ও অরণ‍্যের অধিকার আইনকে সর্বাত্মকভাবে লাগু করতে লড়ে যাব আমরা।

আদিবাসী সমাজের অভ‍্যন্তরে সবরকম লিঙ্গ বৈষম‍্য প্রতিরোধ করতে ও তার অবসান ঘটাতে এবং নারী-বিরোধী সমস্ত প্রথা প্রত‍্যাখ‍্যান করতে শপথ নিচ্ছি আমরা।

সঙ্ঘ পরিবার ও তার বিবিধ সংগঠনগুলির দ্বারা আদিবাসীদের আত্মসাৎ ও বিভাজিত করার অপচেষ্টাকে এক তিল জায়গা দেব না আমরা, এবং আমরা অঙ্গীকার করছি যে এইসব সংগঠনগুলির সাম্প্রদায়িক হামলার বিরুদ্ধে সমাজের সর্বস্তরের নিপীড়িত জনতা ও গণতান্ত্রিক অংশের পাশে আমরা থাকব।

আদিবাসী সংঘর্ষ মোর্চা আদিবাসীদের শোষণ ও নিপীড়নের বিরুদ্ধে সংগ্রামের এক সুদৃঢ় অঙ্গীকারবদ্ধ নয়া ঘোষণা চায়। নিম্নলিখিত দাবিসনদের ভিত্তিতে আন্দোলন গড়ে তুলতে আমরা দায়বদ্ধ থাকব।

Indigenous Conflict Front

আন্দোলনের দাবিসনদ

১। আদিবাসীরা যে ভারতের আদি বাসিন্দা তা জোরালোভাবে তুলে ধর এবং যে সমস্ত চরিত্রায়ন এই স্বীকৃতিকে খাটো ক'রে আদিবাসীদের মর্যাদার অবনমন ঘটাতে চায় তাকে প্রতিরোধ কর; আত্মপরিচিতি সংস্কৃতি ও নিজস্ব শাসনের স্বায়ত্ত সংস্থাগুলির সংরক্ষণের স্বাধীনতা ও অধিকার এই স্বীকৃতির অন্তর্গত।

২। তাদের ধর্মীয় ঐতিহ‍্য, প্রথা ও লায়লাকচার অনুশীলনের স্বাধীনতা ও অধিকার ঊর্দ্ধে তুলে ধর।

৩। ভাষা, সংস্কৃতি ও ইতিহাস রক্ষণাবেক্ষণ ও উদযাপনের অধিকার ঊর্ধ্বে তুলে ধর।

৪। উন্নয়ন, সংরক্ষণ ও বনরক্ষার নামে অরণ‍্য ও আদিবাসীদের জমির প্রাকৃতিক সম্পদের বেআইনি লুন্ঠন বন্ধ কর।

৫। সামাজিক বহিস্করণ, উচ্চ মাত্রার দারিদ্র, নিরাপত্তাহীন জীবনজীবিকা, জীবনধারণের সুযোগসুবিধার হতাশাজনক পরিস্থিতি, শিক্ষা ও স্বাস্থ‍্যপরিষেবার চরম সীমিত সুযোগ এবং রাষ্ট্রীয় হিংস্রতা - আদিবাসী সমাজের নিরন্তর দারিদ্রকরণ ঘটিয়ে চলা এই সবকিছুর বিরুদ্ধে লড়াই কর।

৬। “শিডিউলড ট্রাইব” সাংবিধানিক ক‍্যাটেগরিতে আদিবাসী সম্প্রদায়গুলিকে চিহ্নিত কর যা আদিবাসী সম্প্রদায়গুলির বিশিষ্টতাকে স্বীকৃতি দেবে এবং দেশজুড়ে অনেক আদিবাসী সম্প্রদায়কে বাদ দেওয়ার অন‍্যায়কে সংশোধন করবে।

৭। পঞ্চম ও ষষ্ঠ তপশীলকে যথাযথ ও পরিপূর্ণ অন্তর্বস্তুতে লাগু কর।

৮। পশ্চিমবঙ্গ, বিহার, উত্তরাখণ্ড, গোয়া, তামিলনাড়ু, কেরালা, কর্ণাটক সহ অন‍্যান‍্য যেসব রাজ‍্যে এখনও আদিবাসী জনতাকে অধিকার বঞ্চিত করে পঞ্চম তপশীল লাগু হয়নি সেসব রাজ‍্যে অবিলম্বে তপশীলভুক্ত এলাকা ঘোষণা করে পঞ্চম তপশীল বলবৎ কর।

৯। পঞ্চায়েত প্রবিধান (তপশীলভুক্ত এলাকায় সম্প্রসার) আইন, ১৯৯৬ (পেশা আইন) নিশ্চিত কর যা “আমাদের গ্রামে আমাদের শাসন” নীতি মূর্ত করে রাষ্ট্রনির্ভরতা থেকে সরে এসে আদিবাসী স্বার্থ সুরক্ষিত করার লক্ষ‍্যে প্রণয়ন করা হয়েছিল।

১০। স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ে উন্নয়ন বা সংরক্ষণ প্রকল্পের মাধ‍্যমে যে সমস্ত আদিবাসীদের উচ্ছেদ করা হয়েছে তাদের সকলের পুনর্বাসন ও ক্ষতিপূরণ নিশ্চিত কর।

১১। বিপুল সংখ‍্যায় দেশের অন‍্যত্র কাজের সন্ধানে আদিবাসীদের পরিযানের নিদারুন অবস্থার বিহিত কর, নিজের রাজ‍্যে তাদের জীবনজীবিকা সুরক্ষিত কর ও পরিযায়ি শ্রমিক হিসেবে তাদের অধিকার সুরক্ষা কর।

১২। ডি-নোটিফায়েড, যাযাবর ও আধা-যাযাবর আদিবাসী সম্প্রদায় রাষ্ট্র ও সমাজের দ্বারা নৃশংস হিংসা ও বৈষম‍্যের শিকার হয়, তাদের সুবিচার দাও।

১৩। বিশেষভাবে বিপন্ন আদিবাসী গোষ্ঠি (পিভিটিজি সমূহ)-র অস্তিত্ব-সংকটের বিহিত করতে তাদের উচ্চ মৃত‍্যুহার, নিরন্তর দারিদ্র, অপুষ্টি ও অনাহার এবং স্বাস্থ‍্য পরিষেবার চরম অপ্রতুল সুযোগ ও জীবনজীবিকা রক্ষার বিপন্নতাকে আটকাও।

১৪। ছোটনাগপুর টেনান্সি অ‍্যাক্ট ১৯০৮, সাঁওতাল পরগণা টেনান্সি অ‍্যাক্ট ১৯৪৯ এবং আদাবাসীদের জমি অ-আদিবাসীদের হাতে পাচার করা আটকাতে বিভিন্ন রাজ‍্যের বা কেন্দ্রের অন‍্যান‍্য যেসব আইন আছে সেগুলি কঠোরভাবে বলবৎ কর।

১৫। অরণ‍্যের অধিকার আইন ২০০৬ কঠোরভাবে বলবৎ কর, অন‍্যান‍্য সমস্ত আইনে সংশোধনী এনে এই আইনের অধীনে সাযুজ‍্যপূর্ণ কর। বিশেষ করে

ক) ভারতের সমস্ত বনাঞ্চলে অরণ‍্যের অধিকার আইন ২০০৬ পরিপূর্ণভাবে লাগু করার পথ ঠিক করতে এবং এই আইন লাগু করার জন‍্য পর্যাপ্ত তহবিল বরাদ্দ ও মানব সম্পদ নিয়োগ করতে পার্লামেন্টের একটি বিশেষ অধিবেশন ডেকে আলোচনা হোক।

খ) আদিবাসী, অরণ‍্যচারী ও বনে কর্মরত শ্রমিকদের অরণ‍্যের অধিকার আইনের আওতায় জমির ওপর সমষ্টিগত মালিকানার দাবি অনুমোদনের ব‍্যবস্থাপনা সহজসাধ‍্য কর।

গ) অরণ‍্য অধিকার আইনের আওতায় ব‍্যক্তিগত ও সমষ্টিগত জমি মালিকানার দাবিগুলি অনুমোদন বা খারিজ করার পদ্ধতিতে স্বচ্ছতা আনো যাতে খারিজের ক্ষেত্রগুলিতে প্রয়োজনে সহজে পুনরাবেদন সম্ভবপর হয়

ঘ) অরণ‍্য অধিকারের দাবিগুলি যে অফিসারেরা খতিয়ে দেখে তাদের দায়বদ্ধতা নিশ্চিত করা হোক।

ঙ) অরণ‍্য অধিকার আইনের জন‍্য একটি জাতীয় মিশন চালু কর যা নিম্নলাখিত উদ্দেশ‍্যগুলি পূরণ করবে

  • অরণ‍্য অধিকারের যোগ‍্য সমস্ত সম্ভাব‍্য গ্রামগুলিকে তার আওতায় আনবে।
  • সমস্ত গোষ্ঠিগত অরণ‍্য সম্পদের অধিকার, সমস্ত গৌণ অরণ‍্য উৎপাদের ওপর বিশেষ বিপন্ন ট্রাইব, যাযাবর ট্রাইব ও পশুপালক ট্রাইবদের অধিকার, অন‍্যান‍্য পরম্পরাগত অরণ‍্যবাসীদের অধিকার, মহিলাদের অধিকার, উচ্ছেদ হওয়া সম্প্রদায়ের অধিকার ও সমস্ত ফরেস্টের রূপান্তরকে স্বীকৃতি দেবে, গ্রামগুলো সার্ভে করবে।
  • এসটি ও অন‍্যান‍্য অরণ‍্যবাসীর খারিজ হয়ে যাওয়া ও বকেয়া দাবিগুলি পুনরায় খতিয়ে দেখা।
  • সমষ্টিগত অরণ‍্য অধিকারের ব‍্যবস্থাপনা ও শাসনের জন‍্য গ্রামসভাগুলির ক্ষমতায়ন।
  • ক্ষতিপূরণমূলক বনসৃজন ও এমজিএনআরইজিএ ইত‍্যাদির কাজে গ্রামসভাগুলির জন‍্য অরণ‍্য বিকাশ তহবিল সুলভ করা।
  • এমজিএনআরইজিএ, গণবন্টন ব‍্যবস্থা সহ সমস্ত প্রাসঙ্গিক সরকারি প্রকল্পকে অরণ‍্যের অধিকার আইনের সাথে সংযুক্তিকরণ ও সমন্বয় নিশ্চিত করা।
  • কেন্দ্রীয় বাজেট ও আর্টিকেল-২৭৫ এর অধীনে অরণ‍্য অধিকার আইন তহবিলে অতিরিক্ত বরাদ্দ করা।
  • জলবায়ু পরিবর্তন প্রতিরোধ প্রশ্নে দায়বদ্ধতা মেনে অরণ‍্য ও ভূপ্রকৃতির পুনস্থাপনের কাজ যাতে গ্রামসভাগুলির প্রত‍্যক্ষ সমর্থনে সম্পন্ন হয় তা নিশ্চিত করা।

১৬। সাম্প্রতিক কর্পোরেট স্বার্থবাহী তিন কৃষি আইন ও চার শ্রমকোড এবং সিএএ/এনআরসি সহ জনবিরোধী আইনগুলির বিরোধ ও প্রত‍্যাহার নিশ্চিত করা যে আইনগুলি আদিবাসীদেরও, অধিক মাত্রায় না হলেও অন্তত সমান মাত্রায়, ক্ষতিগ্রস্ত করে।

১৭। গৌণ অরণ‍্য উৎপাদনের ন‍্যায‍্য মূল‍্য নিশ্চিত কর। গ্রামসভা ও অরণ‍্যবাসী ব‍্যক্তিদের দ্বারা সংগৃহীত বা আহরণ করা সমস্ত অরণ‍্য উৎপাদনের ন‍্যূনতম সহায়ক মূল‍্য নিশ্চিত কর। সমষ্টিগত অরণ‍্য সংস্থাগুলিকে সাপোর্ট দেওয়ার ব্যবস্থাপনা গড়ে তোল।

১৮। আদিবাসীদের ওপর, বিশেষত শিশু ও নারীদের ওপর পুলিশ ও সশস্ত্র বাহিনীর চালানো হেফাজতে নির্যাতন, ধর্ষণ ও ফেক এনকাউন্টার হত‍্যার বিরুদ্ধে কড়া ব‍্যবস্থা গ্রহণ কর।

১৯। বর্তমানে বিচারাধীন অবস্থায় কারাবন্দী সমস্ত আদিবাসী, দলিত ও অরণ‍্যচারী এবং গ্রামীণ ও শহুরে গরিবদের নামমাত্র আর্থিক জামিনে মুক্ত কর।

২০। মিথ‍্যা মামলা খারিজ করা এবং নির্দোষ ব‍্যক্তিদের মুক্তি ও ক্ষতিপূরণের লক্ষ‍্যে আদিবাসী ও অরণ‍্যচারীদের বকেয়া ফৌজদারি মামলাগুলি পুনরায় খতিয়ে দেখার জন‍্য প্রতিটি রাজ‍্যে সময়-নির্দিষ্ট বিচারবিভাগীয় কমিশন গঠন করতে হবে; এরকম উদ্দেশ‍্যমূলক হিংসাপরায়ন সাজাপ্রদানের জন‍্য দায়ি সব পুলিশ কর্মীদের চিহ্নিত করে শাস্তি দাও।

২১। কর্পোরেটদের লুন্ঠন ও ধ্বংসের ছাড় দিয়ে আদিবাসীদের ওপর চালানো নির্মম রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাস অবিলম্বে বন্ধ কর। অধিকারের জন‍্য লড়াই করা আদিবাসীদের বিরুদ্ধে ফৌজদারী আইনকে হাতিয়ার বানানো, বিশেষত পুলিশী হত‍্যা, বন্ধ কর।

২২। সমাজের আধিপত‍্যকারী অংশের দ্বারা এবং পুলিশ ও ফরেস্ট আধিকারিকদের দ্বারা অত‍্যাচার, বৈষম‍্য ও লাঞ্ছনা সহ নিত‍্যদিনের হিংস্রতারূপে আদিবাসীদের জীবনের ওপর চলা ‘দৈনন্দিন অত‍্যাচার’-এর অবসান ঘটাও। এসসি-এসটি (নিপীড়ন নিবরণ) আইন ১৯৮৯ শক্তিশালী করে তা কঠোরভাবে লাগু করা এর অন্তর্ভুক্ত।

২৩। আদিবাসী এলাকাগুলিতে সম্পূর্ণ বে-সামরিকীকরণ ও পুলিশ ব্যবস্থার শাসন কায়েম কর।

২৪। উত্তর পূর্বাঞ্চলের রাজ‍্যগুলিতে আদিবাসীদের বিপর্যস্ত করা সংঘাতগুলির সমাধান করতে আলাপ আলোচনা চালু কর ও সশস্ত্র সেনার বিশেষ ক্ষমতা আইন ১৯৫৮ (আফস্পা) প্রত‍্যাহার কর। সশস্ত্র সেনার দ্বারা বিচারবহির্ভূত হত‍্যা, ধর্ষণ ও হয়রানির সমস্ত ঘটনাগুলি কঠোরভাবে মোকাবিলা করতে হবে ও সেই অপরাধীদের শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে।

২৫। আদিবাসী সম্প্রদায়গুলি যাতে সংরক্ষণের সাংবিধানিক সুযোগ ঠিকমতো পায় তাতে নজর কেন্দ্রীভূত করা।

Deucha-Panchami

ডেউচা-পাঁচামীতে যেন সিঙ্গুরের পুনরাবৃত্তি না হয় — স্মৃতির স্মরণী বেয়ে আলোচনা বা তর্কটা প্রাথমিকভাবে উঠে গেছে দুই বিপরীত দৃষ্টিভঙ্গী থেকে। এটাই স্বাভাবিক। কারণ সিঙ্গুর শিক্ষা দিয়েছে দুই পরস্পর বিপরীতের মধ্যেকার সংঘাতের। একটি দৃষ্টিকোণ চায়নি শিল্পায়নের সিঙ্গুর মডেল চাপিয়ে দেওয়া, আরেকটি দৃষ্টিকোণ চায়নি সিঙ্গুর গুটিয়ে যাওয়া। একদিকে ছিল টাটা গোষ্ঠী আর তদানীন্তন বামফ্রন্ট সরকারের আঁতাতের জমিগ্রাসের আগ্রাসন, একহাতে সরকারি ক্ষতিপূরণ ও কর্মসংস্থানের প্রচার-প্যাকেজ, আর অন্যহাতে দমনপীড়ন — এভাবেই চালানো হয়েছিল কর্পোরেটের জোয়াল চাপানো শিল্পায়নের মহড়া; বিপরীতে ছিল সিঙ্গুরের ব্যাপক কৃষক জনতার স্বতঃস্ফূর্ত প্রতিরোধ, তার সাথে বিভিন্ন বিরোধী রাজনৈতিক শক্তির আপন আপন ধারায় লাগাতার লড়াই এবং ফলশ্রুতিতে অসাধ্য সাধন। অবশেষে জয় আসে মানুষের প্রতিরোধের, পরাজিত হয় কৃষি ও কৃষক বিরোধী অবস্থান নেওয়া পক্ষ। পরবর্তী নির্বাচনে শাসনক্ষমতায় আসে ‘পরিবর্তন’ — বুদ্ধদেব সরকারের পতন ও তৃণমূলের ক্ষমতায়ন। টাটাদের অপসারণ, কৃষকদের হাতে জমি প্রত্যর্পণ। তারপর থেকে সিঙ্গুর এজেন্ডা অনেক থিতিয়ে এলেও নানা কারণে পুনরুত্থাপিত হওয়া একেবারে শেষ হয়ে যায়নি। যাই হোক, সিঙ্গুরের সিঁড়ি বেয়ে তৃণমূল ক্ষমতায় আসার একদশক বাদে মমতা সরকার ডেউচি-পাঁচামীতে এমন এক খনি শিল্পের প্রকল্প খুলতে যাচ্ছে যা কিঞ্চিৎ হলেও সিঙ্গুরের মেঘকে মনে পড়াচ্ছে। এটা যদিও এখনাবধি ঘোষিত কর্পোরেটজড়িত উদ্যোগ নয়, রাজ্য সরকারের প্রকল্প, অবশ্য সরকার একথাও দিয়ে রাখছে না যে কোনও অবস্থাতেই সরকারি-বেসরকারি যৌথ উদ্যোগে যাওয়া অথবা কর্পোরেট হস্তান্তর হবে না। পশ্চিমবঙ্গ বিদ্যুৎ উন্নয়ন নিগমকে সামনে রেখে রূপায়ণে এগোনো হচ্ছে; ক্ষতিপূরণ, ঘরবাড়ির পুনর্বাসন ও কর্মসংস্থানের প্যাকেজের প্রতিশ্রুতিপত্র রাখা হচ্ছে, বলছে মোট বরাদ্দের পরিমাণ পঁয়ত্রিশ হাজার কোটি টাকা, তার মধ্যে ক্ষতিপূরণের জন্য বরাদ্দ দশ হাজার কোটি টাকা, পরিবেশগত শংসাপত্র মিলেছে, স্থানীয় নিয়োজিত খাদান শ্রমিকেরা সহ হাজার হাজার বেকার যুবশক্তি জীবিকার কাজ পাবে, আরও অন্যান্য সামাজিক শক্তি কোন কোন বিষয়ে কী কী পাবে তার এক প্রাথমিক ঘোষণাও সরকার রেখেছে, কোটি কোটি টন কয়লা মিলবে, তা দিয়ে নাকি এতো বিদ্যুৎ উৎপাদনের সম্ভাবনা খুলে যাবে যে একশো বছর বিদ্যুতের জন্য অন্যত্র নির্ভর করতে হবে না! তবু প্রশ্নমুক্ত নয়। রাজ্য সরকার বলছে, সিঙ্গুর-ধাঁচে জমি অধিগ্রহণ করবে না, কিছু জমি সরকারি, প্রকল্পের কাজ আগে শুরু হবে সেখান থেকে, তারপরে পরিব্যপ্ত হবে ব্যক্তিগত জমি এলাকার পরিসরে, সমগ্র পরিকল্পিত বিস্তীর্ণ এলাকা জুড়ে।

মুখ্যমন্ত্রী যদিও জানিয়েছেন, সরকার জোর করে জমি নেবে না, জমি স্বত্বাধিকারীদের আস্থা অর্জন করেই যা করার করা হবে। আবার তিনি এও শুনিয়ে রাখছেন যে, ‘পনেরশো লোকের’ আপত্তির কারণে প্রকল্প যেন আটকে না যায়। এই মন্তব্যের মধ্যে দিয়ে সরকার বুঝিয়ে দিচ্ছে কোনও আপত্তি গ্রাহ্য হবে না। প্রকল্প ক্ষেত্রের অধিবাসীদের আপসে নিয়ে আসার জন্য সরকারি ব্যবস্থাপনায় গঠন করা হয়েছে একটা কমিটি। কিন্তু সেটা কোনও অর্থেই কোনও বিশেষজ্ঞদের কমিটি নয়। তার মুখ করা হয়েছে একজন অভিনেতাকে, জনমোহনকরণের উদ্দেশ্যে, তিনি খনি প্রকল্প সংক্রান্ত কোনও অর্থেই বিশেষজ্ঞ নন। তাছাড়া যাবতীয় বিরোধাভাস মীমাংসার জন্য বিশেষ ভরসা করা হচ্ছে তৃণমূলের জেলা নেতা-মাথাদের উপরই। জেলায় দলতন্ত্র চালানো নেতা, দলের বিধায়ক ও পঞ্চায়েতী প্রতিনিধিবর্গ, আর তাদের সবার মাথার উপরে থাকা মাথা, যিনি গত পঞ্চায়েত নির্বাচনের সময় হুঙ্কার দিয়েছিলেন ‘বোম মেরে উড়িয়ে দাও’, ‘রাস্তায় দাঁড়িয়ে থাকবে উন্নয়ন’ — ও মাটিতে প্রকল্প উদ্ধারের ক্ষমতা তুলে দেওয়া হয়েছে সেই ঠিকেদারদের উপর। চিহ্নিত তিন হাজার চারশো একর জমির এক হাজার একর সরকারের আওতাধীন, অর্থাৎ মাত্র এক-তৃতীয়াংশ সরকারি জমি, বাকি দুই-তৃতীয়াংশ সরকারের এ্যক্তিয়ার বহির্ভূত। এলাকায় সাকুল্যে একুশ হাজারের বেশি লোকের বাস, এসসি-এসটি মিলে প্রায় তের হাজারের কাছাকাছি। সুতরাং সেক্ষেত্রে বিরোধ-সংঘাতের পরিস্থিতি উদ্ভূত হওয়ার শঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া যায় না। দেখা যাক মমতা সরকার কিভাবে এগোয়।

investigated immediately

গড়চিরোলিতে মাওবাদীদের হত‍্যা করা প্রসঙ্গে সিপিআই(এমএল)’এর বিবৃতি

মহারাষ্ট্র পুলিশ দাবি করেছে যে গত ১৩-১৪ নভেম্বর ২০২১ তারা গড়চিরোলি জেলার এক গ্রামে ২৬ জন মাওবাদীকে এনকাউন্টারে হত‍্যা করেছে।

এই ঘটনা ঠিক কোথায় ঘটেছে সে সম্পর্কে পরস্পর বিরোধী রিপোর্ট এসেছে এবং তথাকথিত এই এনকাউন্টার ও তৎপরবর্তী পরিস্থিতি সম্পর্কে বিস্তারিত তথ‍্য এখনও পর্যন্ত পাওয়া যায়নি। কিন্তু পুলিশের সর্বোচ্চ কর্তাব‍্যক্তিরা আর মন্ত্রীরা উল্লসিত বিবৃতি জারি করতে এক মুহূর্ত অপেক্ষা করেনি।

২৩ সেপ্টেম্বর ২০১৪-তে ‘পিইউসিএল বনাম ভারত ইউনিয়ন’ মামলার [(২০১৪) ১০ এসসিসি-৬৩৫] নির্দেশনামায় সর্বোচ্চ আদালত সুস্পষ্ট গাইডলাইন ঠিক করে দিয়েছিল যা পুলিশের দ্বারা সংঘটিত প্রতিটি এনকাউন্টারের ক্ষেত্রে মেনে চলার কথা। এই গাইডলাইন অনুসারে গড়চিরোলি এনকাউন্টারের ক্ষেত্রে হাইকোর্টের বিচারকের অধীনে তদন্ত চালানো ছাড়াও এই এনকাউন্টারে যুক্ত পুলিশকর্মীদের বিরুদ্ধে তৎক্ষণাৎ এফআইআর দায়ের করে বাইরের কোনও সংস্থা দ্বারা ফৌজদারি অনুসন্ধান চালানোর কথা। গাইডলাইনে আরও জোর দেওয়া হয়েছে, যতক্ষণ পর্যন্ত না প্রমাণ হচ্ছে যে সত‍্যিই তাঁরা আত্মরক্ষা করতে একাজ করেছে ততক্ষণ পর্যন্ত যেন সংশ্লিষ্ট অফিসারদের কোনোমতেই হঠাৎ করে প্রোমোশন দিয়ে দেওয়া না হয় বা তাদের বীর পুরস্কারে ভূষিত করা না হয়। গড়চিরোলি এনকাউন্টারে যুক্ত পুলিশকর্মীদের জন‍্য মহারাষ্ট্র সরকার কর্তৃক ৫১ লক্ষ টাকা পুরস্কার ঘোষণা তাই আইনের উল্লঙ্ঘন এবং অবিলম্বে এই ঘোষণা প্রত‍্যাহার করতে হবে।

- সিপিআই(এমএল), কেন্দ্রীয় কমিটির পক্ষে প্রভাত কুমার

3 villagers in Sitai, Cochbihar

বিএসএফ’এর অধিক্ষেত্র সম্প্রসারণের নির্দেশনামা প্রত্যাহার করতে হবে

১১ নভেম্বর কোচবিহার জেলার সিতাইয়ের বাংলাদেশ সীমান্তে নিয়োজিত বিএসএফ জওয়ানরা গুলি চালিয়ে হত্যা করেছে ৩ জন গ্রামবাসীকে। নিহত ব্যক্তিদের অপরাধ কি ছিল, সে বিষয়ে বিএসএফ আধিকারিকেরা নিশ্চুপ। তারপর যথারীতি নিহত মানুষজন ‘চোরাচালানকারী’ বলে অভিযুক্ত করা হচ্ছে। কিন্তু হত্যা করার অধিকার কাউকে দেওয়া হয়নি। ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তবর্তী অঞ্চলে মোতায়েন বিএসএফ জওয়ানদের দ্বারা সংশ্লিষ্ট এলাকায় বসবাসকারী অসহায় গ্রামবাসীদের ওপর নিরন্তর অত্যাচার, হত্যা, মহিলাদের ধর্ষনের ঘটনাগুলি বারংবার ঘটে চলেছে, অথচ কেন্দ্র বা রাজ্য সরকারের কোনো হেলদোল চোখে পড়েনা। উপরন্তু কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র দপ্তরের নতুন নির্দেশনামায় বিএসএফ’এর অধিক্ষেত্র ১৫ কিলোমিটার থেকে বাড়িয়ে ৫০ কিলোমিটার করার মধ্য দিয়ে এই খুনে বাহিনীকে রাজ্যের অভ্যন্তরে সামান্য সন্দেহের বশে যে কোনো নাগরিকের তল্লাসী নেওয়া, জিনিষপত্র বাজেয়াপ্ত করা, এমনকি গ্রেপ্তার করার অবাধ ছাড়পত্র দেওয়া হয়েছে। ফলত এই বাড়তি অধিকারের বলে কেন্দ্রের মোদী সরকার নির্বাচনের মাধ্যমে পশ্চিমবঙ্গে ক্ষমতা দখল করতে না পেরে পেছন দরজা দিয়ে একটি সমান্তরাল পুলিশী রাজ কায়েম করতে চাইছে। কিছুদিন আগে বিএসএফ’এর আধিকারিকদের সাথে বিজেপি’র বর্তমান ও প্রাক্তন রাজ্য সভাপতিদের বৈঠক যথেষ্ট সন্দেহজনক।

কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রসচিব অজয় কুমার ভাল্লা আজ সীমান্ত সুরক্ষার বিষয়গুলি নিয়ে পশ্চিমবঙ্গ সরকারের মুখ্য সচিব, স্বরাষ্ট্র সচিব, পুলিশের ডিজি ও সীমান্তবর্তী জেলাগুলির পুলিশ প্রশাসকদের সঙ্গে বৈঠক করতে কলকাতায় এসেছেন। বিএসএফ কর্তৃক সিতাই গণহত্যার দায় স্বীকার করে শ্রী ভাল্লাকে বাংলার জনসাধারণের কাছে জবাবদিহি করতে হবে এবং বিএসএফ’এর অধিক্ষেত্র সম্প্রসারণের আদেশনামা প্রত্যাহার করতে হবে।

আমরা রাজ্য সরকারের কাছ থেকে এই হত্যার বিচার বিভাগীয় তদন্ত দাবি করছি। হত্যাকান্ডে অপরাধী বিএসএফ জওয়ান ও আধিকারিকদের অবিলম্বে গ্রেপ্তার করে কঠোর শাস্তি দিতে হবে।

গত ১২ নভেম্বর এক প্রেস বিবৃতিতে এই বক্তব্য রাখেন সিপিআই(এমএল) লিবারেশনের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য সম্পাদক অভিজিৎ মজুমদার।

Kangana Ranaut

পদ্মশ্রী পুরস্কার পাওয়ার পরপরই, অভিনেত্রী এবং বিজেপি-পন্থী পরিচিত মুখ কঙ্গনা রানাওত ঘোষণা করলেন যে ১৯৪৭ সালে দেশ যা পেয়েছিল সেটা নিছক ভিক্ষা ছিল এবং সেই স্বাধীনতা প্রকৃত রূপে অর্জিত হয়েছিল ২০১৪ সালে নরেন্দ্র মোদী প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হওয়ার সাথে সাথে। টাইমস নাউ (মোদী সরকারের স্বার্থে নিবেদিত টিভি চ্যানেলগুলির মধ্যে একটি) আয়োজিত একটি আলোচনাসভায় তিনি এই বিবৃতি দিয়েছেন।

কঙ্গনা রানাওতের বিবৃতি, বেদনাদায়ক হলেও আসলে তা স্বাধীনতা আন্দোলন চলাকালীন সময়ে, স্বাধীনতার ঠিক পরে পরেই এবং তারপর থেকে আরএসএস’এর ব্যক্ত অনুভূতির সাথে অনেকটাই সঙ্গতিপূর্ণ। আরএসএস’এর প্রতিষ্ঠাতা মতাদর্শী গোলওয়ালকর ঘোষণা করেছিলেন যে স্বাধীনতা সংগ্রামের শহীদরা ‘ব্যর্থ’ এবং তাদের আদর্শ হিসাবে শ্রদ্ধা করার কোনো প্রয়োজন নেই। তিনি আরও বলেছিলেন যে স্বাধীনতা সংগ্রামের যে ব্রিটিশ বিরোধী অভিমুখ তা ছিল ‘বিপর্যয়কর’। আরএসএস ত্রিবর্ণ রঞ্জিত পতাকা এবং সংবিধানের প্রতি অবজ্ঞা প্রকাশ করেছিল, এবং জানিয়েছিল তারা জাতীয় পতাকা হিসেবে কেবল গেরুয়া পতাকা এবং সংবিধান হিসেবে মনুস্মৃতি গ্রহণ করার পক্ষপাতী।

কঙ্গনা রানাওতের মনে হয়েছে ঔপনিবেশিক ব্রিটিশ শাসন থেকে মুক্তি একটা হেলাফেলার মতো বিষয়। তাঁর কাছে স্বাধীনতার অর্থ কাউকে সংগঠিত গণপ্রহারে হত্যা করার স্বাধীনতা, ধর্মান্ধতা এবং অজ্ঞেয়বাদ প্রকাশ ও প্রচারের স্বাধীনতা তথা সমগ্র ভারতে আরএসএস’এর মতাদর্শ, খাদ্যাভ্যাস, পোশাক, ধর্ম এবং আচরণকে জবরদস্তি চাপিয়ে দেওয়ার স্বাধীনতা।

কঙ্গনা রানাওতকে দেওয়া পদ্মশ্রী সরকারকে প্রত্যাহার করতেই হবে। একদিকে সরকার স্বাধীনতার ‘অমৃত মহোৎসব’ উদযাপন করবে আর অন্যদিকে যারা ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলন এবং স্বাধীনতাকে অপমান করে তাদের সম্বর্ধনা ও সম্মান জানাবে, এই দুটো বিষয় একসাথে চলতে পারে না।

- দীপঙ্কর ভট্টাচার্য, সাধারণ সম্পাদক, সিপিআই (এম-এল) লিবারেশন

Workers-Farmers Day

শ্রমিক স্বার্থ রক্ষা কর, চাকরি বাঁচাও, সমস্ত অধিকারগুলো রক্ষা কর! কৃষি ও কৃষক বাঁচাও!
দেশের সম্পদ রক্ষা কর, রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থাগুলোকে রক্ষা কর।
শ্রমিক-কৃষক ঐক্য ঊর্ধ্বে তুলে ধর। মোদী সরকারের বিভেদমূলক, সাম্প্রদায়িক ছক বানচাল কর।
মোদীর কোম্পানিরাজকে পরাস্ত করুন। মোদীর কব্জা থেকে মুক্ত করুন ভারতকে।

১৭-২৫ নভেম্বর ২০২১ প্রচার অভিযান

দাবি

  • আকাশছোঁয়া মূল্য বৃদ্ধি, ক্রমবর্দ্ধমান বেকারত্ব ও ছাঁটাই রোধ কর।
  • গণবন্টন ব্যবস্থা ও খাদ্য সুরক্ষা মজবুত কর!
  • চাকরি ও কর্মসংস্থানের অধিকার সুনিশ্চিত কর।
  • সমস্ত অভাবী মানুষকে নারেগা প্রকল্পের কাজ দিতে হবে।
  • শহুরে গরিবদের মধ্যে এই প্রকল্পের সম্প্রসারণ ঘটাও।
  • চারটি শ্রম কোড ও কৃষি আইন বাতিল কর। ১২ ঘন্টা শ্রম দিবস মানছি না। শ্রম আইন নিশ্চিত কর। শ্রমিকদের নিয়মিতকরণ করতে হবে।
  • বেসরকারিকরণ, ১০০ শতাংশ এফডিআই অনুপ্রবেশ চলবে না। নিগমিকরণ বন্ধ কর। ন্যাশনাল মনিটাইজেশন পাইপলাইন প্রত্যাহার কর। জাতীয় সম্পত্তি বিক্রি করা চলবে না।
  • মজুরি সংকোচন ও সামাজিক সুরক্ষা ছাঁটাই করা চলবে না। কৃষি ও গ্রামীণ সহ সমস্ত অসংগঠিত শ্রমিককে মাসিক ১০,০০০ টাকা আর্থিক অনুদান ও বিনামূল্যে রেশন সরবরাহ করতে হবে।
  • সমস্ত স্কীম কর্মীদের বিধিবদ্ধ ন্যূনতম মজুরি ও সামাজিক সুরক্ষা প্রদান করতে হবে। সমস্ত সম্মুখসারির কর্মীদের বিমা ও সুরক্ষা নিশ্চিত করতে হবে।
  • দেশদ্রোহ আইন, ইউএপিএ সহ সমস্ত দানবীয় আইন রদ কর। সমস্ত রাজনৈতিক বন্দীদের মুক্তি দাও।

সংগ্রামের জন্য ঐক্যবদ্ধ হও।
বিজয় অর্জনের লক্ষ্যে লড়াই কর।

defeat of fascist BJP

ত্রিপুরায় শহর এলাকায় আগরতলা পৌর নিগম সহ ১৩টি পৌরসভা ও ৬টি নগর পঞ্চায়েতের মোট ৩৩৪টি ওয়ার্ডে আগামী ২৫ নভেম্বর নির্বাচন। রাজ্যে আইন শৃংখলা নেই, গণতন্ত্র বিপন্ন। রাজ্য নির্বাচন কমিশন একটি সাংবিধানিক সংস্থা। কিন্তু তা আজ বাস্তবে শাসক দলের কার্যালয়ে পরিণত হয়েছে। তখন অবাধ ও সুষ্ঠুভাবে নির্বাচন প্রক্রিয়া কোনোভাবেই সম্পন্ন হতে পারেনা। কারণ শাসক দল বিজেপি কোনো বিরোধী দলকে সহ্য করছে না। বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় বিজয়ী হতে আগ্রাসী। গত পঞ্চায়েত নির্বাচনে ৯৫ শতাংশ আসন বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় দখল করেছে, পৌর ও নগর সংস্থার উপনির্বাচন ও ২০১৯’র লোকসভা নির্বাচনকে প্রহসনে পরিণত করেছিল, সমবায় সমিতির নির্বাচনে যে কোনো উপায়ে জোরপূর্বক বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় কব্জা করেছে। আসন্ন পৌর ও নগর সংস্থার নির্বাচন প্রক্রিয়ার শুরু থেকেই বিজেপির বেআইনি দুর্বৃত্তবাহিনী রিটার্নিং অফিসারের অফিস দখল করে রেখেছে। যাতে বিরোধীরা মনোনয়ন জমা দিতে না পারে। যারা তা প্রতিহত করে মনোনয়ন জমা দিতে পেরেছেন, তাদের মনোনয়ন প্রত্যাহার করে নিতে চাপ দিচ্ছে; প্রার্থীর পরিবার, আত্মীয়-স্বজন, প্রস্তাবকের উপর দৈহিক আক্রমণ ও হামলা অব্যাহত। উপরতলার নির্দেশে পুলিশ নীরব দর্শকের ভূমিকা গ্রহণ করেছে। ফলে সর্বমোট ৩৩৪টির মধ্যে ১১২টি ওয়ার্ডে তথা ৩৪ শতাংশ আসন বিজেপি বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় দখল পেয়েছে। অর্থাৎ ভোট হবে ২২২টি ওয়ার্ডে। রাজ্য নির্বাচন কমিশনের এই প্রশ্নে কোনো ভূমিকা নেই। বিরোধী প্রার্থীরা প্রচার কর্মসূচিতে আক্রান্ত হচ্ছেন। তাদের বাড়িঘরে আক্রমণ সমানে চলছে। ভোটারদের হুমকি দেওয়া হচ্ছে। বিরোধী দলের প্রার্থীদের নিরাপত্তা, অবাধে প্রচার করার অধিকার, অবাধ ও শান্তিপূর্ণ পরিবেশে নির্বাচন নিশ্চিত করার প্রশ্নে দেশের সর্বোচ্চ আদালত নির্দেশ দিয়েছে। অথচ ত্রিপুরার বিজেপি সরকারের তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রী এই নির্দেশ অসত্য তথ্য নির্ভর বলে কার্যত বুড়ো আঙুল দেখাচ্ছেন। ১২ নভেম্বর মুখ্যমন্ত্রীর উপস্থিতিতে বিজেপির এক দলীয় কর্মসূচিতে বিধায়ক সুরজিৎ দত্ত সরাসরি বিরোধী দলের প্রার্থীদের প্রচার করতে দেখলেই তাড়া করার জন্য কর্মীদের নির্দেশ দিয়েছেন, ছাপ্পা ভোট দিতে নির্দেশ দিয়েছেন। মুখ্যমন্ত্রী নীরব। বিধায়কের এই বেআইনী ও অসাংবিধানিক বক্তব্য সমাজমাধ্যমে ভাইরাল হওয়ার পরেও রাজ্য নির্বাচন কমিশন এখনো কিছুই করেনি।

এমতাবস্থায় নির্বাচক মন্ডলীর কাছে সংবিধান প্রদত্ত আইনশৃঙ্খলা, গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করা সহ অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের পরিবেশ ফিরিয়ে আনতে ঐক্যবদ্ধভাবে আরো বেশি করে গণআন্দোলনে ঝাঁপিয়ে পড়ার জন্য সিপিআই(এমএল) লিবারেশন আহ্বান জানাচ্ছে। বিজেপির ফ্যাসিবাদের বিপদকে যথোচিত গুরুত্ব না দিয়ে লঘু করে দেখার ফলে ত্রিপুরার সিপিআই(এম) তথা বামফ্রন্ট ভুল রণকৌশল গ্রহণ করেছে। ফলে বামপন্থীদের উদ্যোগ সীমাবদ্ধ হয়ে পড়েছে। এই প্রশ্নে বামপন্থী দলগুলোর মধ্যে কোনো ধরনের সংকীর্ণতার স্থান থাকা উচিত নয়। প্রথমে বামপন্থীদের মধ্যে ঐক্যকে সুদৃঢ় করতে হবে এবং তারপর বিজেপি বিরোধী সমস্ত রাজনৈতিক দল, সংগঠন ও ব্যক্তিদের ঐক্যকে গুরুত্ব দিতে হবে। এখানে বামপন্থীরা যেহেতু প্রধান বিরোধী পক্ষ, তাই দায়বদ্ধতার সাথে বামপন্থীদের এগিয়ে এসে এই কাজটি করতে হবে। এর কোনো বিকল্প নেই। কারণ ফ্যাসিবাদের আক্রমণের হাত থেকে আধুনিক ভারতের সংবিধান, স্বাধীনতা, গণতন্ত্র ও আইনের পরিকাঠামো, কৃষ্টি সংস্কৃতিকে সবাইকে মিলে রক্ষা করতে হবে।

অন্যদিকে শহর এলাকার উন্নয়নে বিজেপির ভিশন ডকুমেন্টে প্রদত্ত ১২টি প্রতিশ্রুতি নিয়ে গত চার বছরে জনগণের মধ্যে বিশ্বাসভঙ্গ হয়েছে। বর্ষার সময়ে উপযুক্ত জল নিষ্কাশনে নালা ব্যবস্থা নির্মাণ, ১০০ শতাংশ বর্জ্য নিষ্কাশন ব্যবস্থা, পানীয় জল, রাস্তাঘাট, সরকারি স্বাস্থ্য, শিক্ষা সহ অন্যান্য নাগরিক সুবিধার প্রশ্নে এবং স্বাধীনতা উত্তর ৭৫ বছরে সর্বোচ্চ ভোগ্যপণ্য মূল্যবৃদ্ধি ও কর্মহীনতায় শহরের সাধারণ নাগরিক জীবন দুর্বিষহ হয়ে উঠেছে। জনগণ এই দুরবস্থার হাত থেকে বাঁচতে চাইছেন। বিজেপি ত্রিপুরা রাজ্যকে বিভেদের ফ্যাসিবাদী হিন্দুত্বের মডেল রাজ্য বানাতে উঠে পড়ে লেগেছে।

তাই ত্রিপুরার নির্বাচকমন্ডলীর কাছে সিপিআই(এমএল) লিবারেশনের আবেদন, ফ্যাসিবাদী বিজেপিকে পরাস্ত করুন। বামপন্থী প্রার্থীদের ভোট দিয়ে জয়ী করুন। যেখানে বামপন্থী প্রার্থী নেই, সেখানে বিজেপিকে পরাস্ত করতে পারে এমন বিরোধী প্রার্থীদের ভোট দিন। গণতন্ত্র ও আইনের শাসন প্রতিষ্ঠিত করার সংগ্রামকে আরো জোরদার করুন।

against communal divisions

ভারতীয় উপমহাদেশে ধর্মীয় সাম্প্রদায়িক বিভেদের বিরুদ্ধে, “হাতে হাত রেখে পার হবো এই বিষের বিষাদ সিন্ধু, সাম্প্রদায়িক বিভেদের ঢেউ রুখবো...” শিরোনামে বজবজ মহেশতলার সাংস্কৃতিক কর্মীদের উদ্যোগে প্রতিবাদসভা অনুষ্ঠিত হয় কালিপুরে মনোরঞ্জন নস্কর ভবনে। গানে বজবজ চলার পথে গণসাংস্কৃতিক সংস্থা’র সেখ সাবির (রাজা), অভিজিৎ মন্ডল, পশ্চিমবঙ্গ গণসংস্কৃতি পরিষদের সম্পাদক নীতীশ রায়। কবিতা পাঠ করেন স্ফুলিঙ্গ’র সুবীর দত্ত, চলার পথে শ‍্যামল চক্রবর্তী ও স্বরচিত কবিতা পাঠ করেন কবি কৌনিক সেন। বক্তব‍্য রাখেন ‘দৃষ্টিপথ’ পত্রিকা’র সম্পাদক সৌম্য সেনগুপ্ত, সামাজিক রাজনৈতিক কর্মী দিলীপ পাল ও কিশোর সরকার। সভা পরিচালনা করেন অঞ্জন ঘোষ। সমগ্র কর্মসূচি সঞ্চালন করেন চলার পথে সাংস্কৃতিক সংস্থা’র সভাপতি দেবাশিস মিত্র। আগামীদিনে সাম্প্রদায়িক ফ‍্যাসিবাদের বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিবাদ-প্রতিরোধ গড়ে তোলার শপথ নেওয়া হয়।

social media users

আমরা জানি বাংলাদেশে একটা সোশ্যাল মিডিয়ার পোস্টের পরিপ্রেক্ষিতে গত ১৫ অক্টোবর থেকে সপ্তাহব্যাপী বাংলাদেশের সংখালঘুদের উপর হামলা, দুর্গাপুজোর প্যান্ডেল ও মন্দির ভাঙচুরের ঘটনা ঘটে। আমরা এটাও দেখেছি যে, এই ঘটনার প্রতিবাদে বাংলাদেশ এবং পশ্চিমবাংলার সমস্ত শুভবুদ্ধি সম্পন্ন মানুষ, রাজনৈতিক দল সোচ্চার হয়েছেন — দোষীদের শাস্তি, সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তার দাবি জানিয়েছেন এবং সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি গড়ে তোলার আহ্বান জানিয়েছেন। বাংলাদেশের প্রশাসনও এ প্রশ্নে অনমনীয় মনোভাব গ্রহণ করে দ্রুত শান্তি শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে সচেষ্ট হয়েছে। কিন্তু, সম্প্রীতির বাতাবরণ যাতে গড়ে উঠতে না পারে তারজন্য বাংলাদেশের প্রতিবেশী রাজ্য ত্রিপুরায় সংখ্যালঘুদের উপর পাল্টা হামলা শুরু করা হল। যা আরও তীব্রতা পায় গত ২৬ অক্টোবর। ঐদিন ধর্মীয় সংগঠন আরএসএস, বিশ্ব হিন্দু পরিষদ, হিন্দু জাগরণ মঞ্চ এবং বজরং দল একটি মিছিল বের করে। ঐ মিছিল থেকে সংখ্যালঘু মানুষের উপর সন্ত্রাস সৃষ্টির লক্ষ্যে মুসলিম জনগণের বিরুদ্ধে বিদ্বেষপূর্ণ শ্লোগান দেওয়া, ইঁট-পাথর ছোঁড়া, বাড়ি, দোকান, মসজিদ ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ করা হয়। প্রায় ১০ দিন ধরে চলা এই হিংসা দেখে ত্রিপুরা হাইকোর্ট একটি স্বতঃপ্রণোদিত মামলা চালু করে এবং বিজেপি শাসিত ত্রিপুরা রাজ্য সরকারকে নির্দেশ দেয় অবিলম্বে হলফনামা সহ জানাতে যে রাজ্য সরকার শান্তি শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে ইতিমধ্যে কি পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে? হাইকোর্ট এও পরামর্শ দেয় রাজ্যজুড়ে শান্তি কমিটি গঠন করা হোক। একজন আরটিআই কর্মীর অভিযোগের ভিত্তিতে ২ নভেম্বর জাতীয় মানবাধিকার কমিশন, ত্রিপুরা পুলিশ প্রশাসনের কাছে লিখিতভাবে জানতে চায় ত্রিপুরায় ঘটে যাওয়া হিংসায় তারা শান্তি শৃঙ্খলা বজায় রাখতে কি ভূমিকা নিয়েছিল?

আমরা দেখলাম, ত্রিপুরা হাইকোর্টের স্বতঃপ্রণোদিত হস্তক্ষেপের পর ত্রিপুরা পুলিশ প্রশাসন তড়িঘড়ি মোট ১০২ জনের নামে এফআইআর-এর মাধ্যমে মিথ্যা মামলা চালু করল। এরমধ্যে রয়েছেন দেশের ও আন্তর্জাতিক সাংবাদিকরা, আইনজীবীরা ও সোশ্যাল মিডিয়া ব্যাবহারকারীরা যেমন, আরিফ শাহ, সিজে ওয়েরলেমান, জেহাঙ্গীর আলি, সেলিম ইঞ্জিনিয়ার, সারতজ আলম, শারজিল উসমানি, শ্যাম মীরা সিং (যিনি একটি ট্যুইট করেছিলেন ‘ত্রিপুরা জ্বলছে’), দিল্লীর সংখ্যালঘু কমিশনের প্রাক্তন চেয়ারপার্সন জাফারুল ইসলামের মতো বহু মানুষ। ত্রিপুরা প্রশাসন দাঙ্গাকারীদের বিরুদ্ধে কোন পদক্ষেপ গ্রহণ না করে ঐ সব মানুষদের বিরুদ্ধে অপরাধমূলক ষড়যন্ত্র, বেআইনি কর্মকাণ্ড, ত্রিপুরার শান্তি শৃঙ্খলা ভঙ্গ করে প্রশাসনের ভাবমূর্তি ক্ষুন্ন করা ইত্যাদির অভিযোগে ভারতীয় দণ্ডবিধির বিভিন্ন ধারায় এমনকি দানবীয় ইউএপিএ আইনেও অভিযুক্ত করল।

গোটা দেশের মানুষ অবাক হয়ে এটাও দেখলেন যে, এই ভয়ঙ্কর হিংসার তদন্ত করতে যাওয়া চারজন আইনজীবীদের অনুসন্ধানকারী দলের বিরুদ্ধেও একই অভিযোগ দায়ের করা হল। ত্রিপুরার পশ্চিম আগরতলা থানার পুলিশ এই চারজনকে ১০ নভেম্বর থানায় হাজির হওয়ার জন্য নোটিশ পাঠালো। যদিও আইনজীবীরা কেউই ১০ তারিখ হাজিরা দিতে যাননি, তারা সুপ্রিম কোর্টে তাদের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগগুলিকে খারিজ করার আবেদন জানিয়েছেন। সুপ্রিম কোর্ট আবেদনটি গ্রহণ করেছে, যা শুনানির অপেক্ষায়।

অনুসন্ধানকারী দলের আইনজীবীরা দু’দিন ধরে তদন্ত করে ২ নভেম্বর ২০২১ দিল্লীতে প্রেস কনফারেন্সের মধ্য দিয়ে তাদের তদন্ত রিপোর্ট প্রকাশ করেন এবং তা সোশ্যাল মিডিয়ায় অনেকে ব্যবহার করেন। দেখা গেল ৩ নভেম্বর তারিখেই ত্রিপুরা পুলিশ প্রশাসন তাঁদের বিরুদ্ধে মিথ্যা এফআইআর দায়ের করল এবং দানবীয় ইউএপিএ আইন প্রয়োগ করল।

কারা ছিলেন সেই অনুসন্ধান দলে? এবং কি ছিল সেই তদন্ত রিপোর্টে ?

দিল্লীর সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী এহতেশাম হাসমির নেতৃত্বে আইনজীবী অমিত শ্রীবাস্তব (লইয়ার্স ফর ডেমোক্রেসি কো-অর্ডিনেশন কমিটির সদস্য), আইনজীবী মুকেশ (অল ইন্ডিয়া লইয়ার্স ফর জাস্টিস সংগঠনের জাতীয় কাউন্সিল সদস্য, পিপলস ইউনিয়ন ফর সিভিল লিবার্টিস-এর সদস্য এবং এআইসিসিটিইউ-এর জাতীয় কাউন্সিল সদস্য), এবং আইনজীবী আনসার ইনডোরি (ন্যাশনাল কনফেডারেশন অফ হিউম্যান রাইটস্-এর সদস্য) — এই চারজন গিয়েছিলেন ত্রিপুরায় সাম্প্রতিক ঘটে যাওয়া হিংসার ঘটনার সঠিক তথ্য অনুসন্ধান করতে।

অনুসন্ধান রিপোর্টের সারাংশ

আক্রান্তদের বক্তব্য

১) মহম্মদ ইউসুফ আলি, বয়স ৪০, রাওয়া বাজার। তিনি রাওয়া বাজারে মুদিখানার দোকান চালাতেন। তিনি জানাচ্ছেন আমিরুদ্দিনের মতো তার দোকানও তিনি চোখের সামনে পুড়ে যতে দেখেছেন। এখানে তিনি ২০ বছর ধরে ব্যবসা করে আসছেন, কোনোদিন এমনটা হতে দেখেননি। তার প্রভুত ক্ষতি হয়ে গেছে। প্রায় ৬ লক্ষ টাকা ক্ষতি হয়েছে। তিনি জানেন কারা একাজ করেছে কিন্তু কারুর নাম সে জানায়নি, কারণ পরবর্তীতে যদি তার আরও বড় কোন ক্ষতি হয় সেই ভয়ে।

২) মহম্মদ আমির হুসেন, বয়স ৩৪, দোকানদার। রাওয়া বাজার পানিসাগরে কম্পিউটার আর বৈদ্যুতিন যন্ত্রপাতির দোকান আছে। পরিবারের সদস্য সংখ্যা ৮ জন। গত দশবছর ধরে ব্যাবসা করছেন। তার দোকানের পিছন দিকে লাগোয়া বাড়িতে মানিক দেবনাথ নামে একজন হিন্দুর বাড়ি। যখন দাঙ্গাবাজরা দোকানে আগুন লাগাতে আসে তখন তিনি বাড়ি থেকে বেরিয়ে এসে বলেন, মহম্মদ আমিরের দোকানে আগুন লাগালে ওর বাড়িও পুড়ে যাবে। একথা বলাতে দাঙ্গাবাজরা আগুন লাগানো থেকে বিরত হয় বটে কিন্তু দোকানের যাবতীয় জিনিসপত্র লুঠপাঠ করে নিয়ে যায় — তার মধ্যে ল্যাপটপ, জলের মোটর ও অন্যান্য জিনিসপত্রও ছিল। প্রিন্টার বের করে তাতে আগুন ধরিয়ে দেয়, জেরক্স মেশিন পাচার করে দেয়। এই ঘটনায় তার প্রায় ১০ লক্ষ টাকার মতো ক্ষতি হলেও সরকার তাকে মাত্র ২৬,৮০০ টাকা ক্ষতিপূরণ হিসাবে দিয়েছে। প্রতিবেশী মানিক দেবনাথের কাছে হামলাকারীদের নাম জানতে চাইলে তিনি নাম জানাতে অস্বীকার করেন।

৩) আর এক দোকানদার সাব্বির আহমেদ, বয়স ২০। তিনি অনুসন্ধানকারী দলকে জানান যে তার বৃদ্ধ বাড়বার শরীরের অবস্থার অবনতির পর পরিবারের ৬ জন সদস্যের ভার এখন তার ওপর। সাব্বির মাত্র ১৫ দিন আগে স্কুলের কাছাকাছি খাবারের এবং কসমেটিক্স-এর একটা দোকান দিয়েছিল। সে জানায় হামলাকারীরা তার দোকানের সবকিছু লুঠপাট করেছে। তার প্রায় ১.৫০ লক্ষ টাকার ক্ষতি হয়েছে, কিন্তু সরকার কোনো ক্ষতিপূরণ দেয়নি।

ইউসুফ আলি, মহম্মদ আমির হুসেন, সাব্বির আহমেদ-এর মতো আমিরুদ্দিন, সানোয়ার আলি, মহম্মদ আলি, সুলতান হুসেন, জইউদ্দিন, সামিম আহমেদদের দোকানেও লুঠপাট ও অগ্নিসংযোগ করা হয়। মোট ৯টি দোকান। এইসব মানুষের কাছ থেকে তথ্য সংগ্রহ করেন অনুসন্ধান দলের সদস্যরা।

নিশানা করা হয় ১২টা মসজিদ

১) কালাম চুড়া মসজিদ — ২৩ অক্টোবর সোনামোড়ার এই মসজিদের সীমানার দেওয়াল ভেঙে দেওয়া হয়। এখানে দিনে পাঁচবার নামাজ পড়া হয়। ঘটনার পরদিন সকালে পুলিশ এবং লোকাল পঞ্চায়েতের চেয়ারম্যান সবরতি দাস হিন্দুদের সাথে কথা বলেন এবং নতুন টিন, কাঠ দিয়ে মসজিদ সারিয়ে দেওয়া হয়।

২) বেলওয়ার চার মসজিদ — ১৭ অক্টোবর রাতে হিন্দুত্ববাদীরা মসজিদের মাইক খুলে নিয়ে গেছে খবর পেয়ে মুসলিম সম্প্রদায়ের মানুষেরা জমায়েত হন। গ্রাম পঞ্চায়েতের চেয়ারম্যান সুভাষ দাস পুনরায় মাইক লাগিয়ে দেন এবং মসজিদের সামনে পুলিশের পাহারা বসানো হয়।

৩) নারাভারা পুরাব টিলা মস্ক — বিশালগড়ের এই মসজিদে ১৩ অক্টোবর রাতে হামলা হয়। মৃতদেহ বহন করার খাট, প্রায় ৩০টা নামাজ পড়ার আসন এবং সাইনবোর্ডে আগুন লাগিয়ে দেওয়া হয়। এ খবর পাওয়া মাত্র লোকাল মানুষ ছুটে গিয়ে আগুন নেভায়। মসজিদটি সম্পুর্ণ ভস্মীভূত হয়ে যেত যদি লোকাল মানুষ ঠিক সময়ে উদ্যোগ না নিত।

ঠিক এই ভাবেই চন্দ্রপুর মসজিদ, কৃষ্ণনগর মসজিদ, উদয়পুর কাকরাবান মসজিদ, চুমহানি মস্ক, ফোর্ট সিটি জমা মস্ক, কুমার ঘাট পাল বাজার মস্ক, ধর্ম নগর মস্ক, পানিসাগর সিআরপিএফ মস্ক, মসজিদ রাওয়া ছাতিমতলা পানিসাগর — মোট ১২টা মসজিদ বা মস্ককের উপর হামলা চালানো হয়।

Fascist attacks

৩টি বাড়িতে ভাঙচুর ও লুঠপাট

১) কেল শহরের আবদুল মান্নানের বাড়িতে দুবার হামলা হয়। ১৭ অক্টোবর প্রথমবার তার বাড়ি আক্রান্ত হয় এবং হিন্দুত্ববাদীরা তার বাড়িতে গেরুয়া পতাকা লাগিয়ে দিয়ে যায়। ২৬ অক্টোবর দ্বিতীয়বার তার বাড়িতে ভাঙচুর ও লুঠপাট চালানো হয়। তখন তার বাড়িতে চার বছরের বাচ্চা আর তার স্ত্রী ছিলেন। তার স্ত্রী, বাচ্চাকে নিয়ে বাড়ির পিছন দিক দিয়ে অন্ধকারে পালিয়ে যান। আবদুল মান্নান বাড়িতে ছিলেন না, আগরতলায় গিয়েছিলেন। তিনি একজন সুপরিচিত ব্যবসায়ী এবং তার একজন আত্মীয় দেশের আইনসভার সদস্য হওয়া সত্ত্বেও আক্রমণের হাত থেকে নিজেকে বাঁচাতে পারলেন না।

২) ধর্মনগরের সৈয়দ তহিদের বাড়িতে দাঙ্গাবাজরা হামলা চালায়। তার বাড়িটা একটা মস্কের দেওয়ালের লাগোয়া। দাঙ্গাবাজরা মস্কটার ক্ষতি করতে চেয়েছিল কিন্তু মস্কের দরজা ভাঙতে পারেনি। সৈয়দের বাড়ির প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র, চেয়ার সহ সমস্ত ফার্নিচার ভেঙে দিয়ে যায়।

৩) পানিসাগর অঞ্চলে সাইনা বেগমের বাড়িতে হিন্দুত্ববাদী গুন্ডারা জোর করে ঢোকে। তারসাথে অশোভন আচরণ করে এবং তার গলা থেকে চেন, হার জোর করে নিয়ে নেয়। ঘরের জিনিষপত্র লুঠপাট করে, এমনকি বাথরুমের দরজাটাও ভেঙে দিয়ে যায়।

অনুসন্ধানের পর সমস্ত দিক বিচার করে অনুসন্ধানকারী দলের পক্ষ থেকে নিম্নলিখিত ৮ দফা দাবি করা হয়।

১) সরকারের উচিত হাইকোর্টের অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতির নেতৃত্বে একটি তদন্ত কমিটি তৈরি করা যা পুরো ঘটনার তদন্ত করবে।

২) যারা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন তাঁদের অভিযোগের ভিত্তিতে আলাদা এফআইআর দায়ের করা।

৩) এই ঘটনায় যারা আর্থিক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন তাদের সরকারের পক্ষ থেকে আর্থিক ক্ষতিপূরণ দেওয়া, যাতে এই নিরীহ মানুষেরা স্বাভাবিক জীবন অতিবাহিত করতে পারেন।

৪) সরকারের উচিত যে সকল ধর্মীয় স্থান ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে তা সরকারি টাকায় নতুন করে বানিয়ে দেওয়া।

৫)) এই হিংসাকে ঠেকানোর সুযোগ থাকতেও যেসব পুলিশ তার দায়িত্ব পালন করেনি তাদেরকে পদ থেকে বরখাস্ত করা এবং নতুন পুলিশ অফিসার নিয়োগ করা।

৬) যে ব্যক্তি বা সংগঠন প্রফেট মহম্মদকে অসম্মান করে শ্লোগান তুলেছিল তাদের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান গ্রহণ করা যাতে দেশের সৌহার্দ্যপূর্ণ পরিবেশ বিনষ্ট না হয়।

৭) যারা মিথ্যা এবং উত্তেজক খবর তৈরি করেছে বা সোশ্যাল মিডিয়ার মাধ্যমে ছড়িয়েছে সেই সব ব্যক্তি বা সংগঠনের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা এবং তাদের বিরুদ্ধে মামলা রুজু করা।

৮) যেসব দোষীরা এই দাঙ্গা, ভাঙচুর, লুঠপাট এবং অগ্নি সংযোগে যুক্ত হিসাবে চিহ্নিত হবে তাদের ফাস্ট ট্র্যাক কোর্টে বিচার করতে হবে কোনো রকম পক্ষপাতিত্ব ছাড়াই।

খুবই সংক্ষিপ্ত আকারে রিপোর্টটা এখানে দেওয়া হল যার মধ্য দিয়ে ঘটনার ভয়ঙ্করতা সম্পর্কে সহজেই অনুমান করা যেতে পারে। এই রিপোর্ট বা আইনজীবীদের অনুসন্ধানকারী দলের ৮টি দাবির প্রতি ত্রিপুরার বিজেপি সরকার বিন্দুমাত্র গুরুত্ব না দিয়ে আইনজীবীদের বিরুদ্ধেই মিথ্যা অভিযোগ দায়ের করল। “পরবর্তীতে দেখা গেল আরও দুজন মহিলা সাংবাদিক সমৃদ্ধি সাকুনিয়া ও স্বর্ণা ঝাকে একই ঘটনার রিপোর্ট তৈরি করার অপরাধে হেনস্থা করা হল এবং মিথ্যা মামলায় গ্রেফতার করা হল।”

ইতিমধ্যে এই ঘটনাকে নিন্দা জানিয়ে দেশের বিভিন্ন রাজ্যে আইনজীবী, ছাত্র-যুব, সামাজিক সংগঠনগুলি প্রতিবাদে সামিল হয়েছেন। এই সংগঠনগুলি হল, অল ইন্ডিয়া লইয়ার্স এ্যাসোসিয়েশন ফর জাস্টিস (আইলাজ), এআইএসএ, লইয়ার্স ফর সোশ্যাল জাস্টিস অ্যান্ড হিউম্যান রাইটস্ (পশ্চিমবঙ্গ), এআইএসএফ, এআইসিসিটিইউ, এসএফআই, এপিসিআর, এপিডিআর, বিসিএম, ভীম আর্মি, দিশা, কর্ণাটক, জনশক্তি, এনএপিএম, এনবিসি, এনটিইউআই, রেহাই মঞ্চ, অল ইন্ডিয়া লইয়ার্স ইউনিয়ন (আইলু) এবং এনসিএইচআরও।

‘লইয়ার্স ফর সোশ্যাল জাস্টিস অ্যান্ড হিউম্যান রাইটস্’এর মুখপত্র ‘সোশ্যাল জাস্টিস’ পত্রিকার সম্পাদক এবং ‘অল ইন্ডিয়া লইয়ার্স এ্যাসোসিয়েশন ফর জাস্টিস’এর উপদেষ্টা বরিষ্ঠ আইনজীবী সুজয় ভট্টাচার্য তাঁর প্রতিক্রিয়ায় জানান, “দিল্লীর কয়েকজন আইনজীবী, যাঁরা বিভিন্ন মানবাধিকার রক্ষা কর্মোদ্যগের সঙ্গে যুক্ত, তাঁরা ত্রিপুরা গিয়েছিলেন তথ্যানুসন্ধানের জন্য। তথ্যানুসন্ধানের পর তাঁরা দিল্লীতে প্রেস কনফারেন্স আহ্বান করে একটি রিপোর্ট পেশ করেন। রিপোর্টে দেখা যায় যে বিশ্ব হিন্দু পরিষদ ও আরো কয়েকটি সংগঠন ত্রিপুরার কিছু এলাকায় সাম্প্রদায়িক হিংসার ঘটনা ঘটিয়েছে। প্রায় সঙ্গেসঙ্গেই ত্রিপুরা পুলিশ ঐ আইনজীবীদের বিরুদ্ধে পেনাল কোড ও ইউএপিএ আইনের একাধিক ধারায় মামলা রুজু করে দেয় ও সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহারকারী বহু মানুষের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে উদ্যোগ নেয়। আইনজীবীরা সুপ্রিম কোর্টে মামলা খারিজের জন্য দরখাস্ত করেছেন। সুপ্রিম কোর্টের রায়ের জন্য আমরা অপেক্ষা নিশ্চয়ই করব। কিন্ত‍ু এটা লক্ষ্যনীয় যে বিজেপি পরিচালিত কেন্দ্রীয় ও বিভিন্ন রাজ্য সরকার দেশ বা রাজ্য চালানোর জন্য ক্রমশ কালাকানুনগুলির ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ছেন এবং সাধারণ মানুষের বাকস্বাধীনতা ও মত প্রকাশের অধিকারকে দমন করার জন্য কালাকানুনগুলির ব্যবহার হচ্ছে। আমরা আশা করি যে শুভবুদ্ধিসম্পন্ন সকল মানুষ এর প্রতিবাদে এগিয়ে আসবেন।”

ঠিকই, আজ যখন ফ্যাসিস্ট ধর্মীয় উন্মাদরা দেশের সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতিকে ধ্বংস করতে মরিয়া হামলা নামাচ্ছে, দেশের ধর্মনিরপেক্ষ সাংবাদিক, আন্তর্জাতিক সাংবাদিক, আইনজীবী, সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহারকারীদের মিথ্যা মামলায় ফাঁসিয়ে চুপ করাতে চাইছে তখন দেশের সমস্ত শুভবুদ্ধি সম্পন্ন মানুষের ঐক্যবদ্ধ হওয়া এবং প্রতিবাদে সামিল হওয়া সময়ের দাবি।

- লইয়ার্স ফর সোশ্যাল জাস্টিস অ্যান্ড হিউম্যান রাইটস্ এবং অল ইন্ডিয়া লইয়ার্স এ্যাসোসিয়েশন ফর জাস্টিস’এর পক্ষ থেকে
আইনজীবী মালা সেন এবং আইনজীবী দিবাকর ভট্টাচার্য।

path of development

ক্ষতিপূরণ ও পুনর্বাসনের মাধ্যমে যে জমি উদ্ধার করা যাইবে না, তাহা উদ্ধারের জন্য দরকার হইলে রাষ্ট্রক্ষমতা ব্যবহার করিতে হইবে। এইখানে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের বিশেষ দায়। তাঁহার “জোর করিয়া জমি লওয়া হইবে না নীতি শুনিতে মধুর হইতে পারে, কিন্তু রোগীর স্বাস্থ্য উদ্ধারে অনেক সময় তিক্ত ঔষধ অপরিহার্য হইয়া ওঠে। ... সিঙ্গুরে সেই কালান্তক ব্যাধি হইয়াছিল। ডেউচা-পাঁচামি যেন সিঙ্গুর না হয়।”

ভারতে সর্বাধিক প্রচারিত প্রথম শ্রেণীর বাংলা দৈনিক হিসাবে নিজেকে প্রত্যহ বিজ্ঞাপিত করে চলা আনন্দবাজার পত্রিকা ১৫ নভেম্বরের প্রথম সম্পাদকীয় স্তম্ভে ‘পায়ে ঠেলার ব্যাধি’ শিরোনামে খোলাখুলি ‘উন্নয়নের’ বাহানায় রাষ্ট্রীয় দমনের ওকালতি করেছে। সিঙ্গুর-নন্দীগ্রামে হাড়-হিম করা রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাস, ও “টাটার কেশাগ্র স্পর্শ করতে দেব না” গোছের নির্লজ্জ দমনের হুমকি সত্ত্বেও সিঙ্গুরের ‘কালান্তক’ ব্যাধির উপশম ঘটল না। আরও ঠিক কোন মোক্ষম তিক্ত ঔষধ প্রয়োগ করা গেলে সিঙ্গুরে ন্যানো কারখানার বোধন হত তা চতুরভাবে অনুচ্চারিত রেখে কার্যত আরও তীব্র রাষ্ট্রীয় হিংসার পথ অনুসরণ করার সপক্ষে পত্রিকাটি ওকালতি করেছে। সর্বাধিক প্রচারিত বাংলা দৈনিকটি এক্ষেত্রে এই কথা উচ্চারণ করতে ভুলে গেল যে এরাজ্য থেকে গুজরাটের সানন্দে একলাখি ন্যানো প্রকল্পকে সরিয়ে নিয়ে যাওয়া সত্ত্বেও তা মুখ থুবড়ে পড়ে শিল্পক্ষেত্রে শ্রমিক অশান্তির জন্য নয়, খোদ টাটাই বলেছিলেন ওই প্রকল্পটাই ছিল তাদের এক ‘ক্রিটিকাল মিস্টেক’ (বিরাট মাপের ভুল)।

কিন্তু আজও কত বড় মাশুল গুনে যেতে হচ্ছে সিঙ্গুরকে। শিল্পের সাধনায় তছনছ করে ফেলা হল বহুফসলি উর্বর কৃষি জমিকে, নাভিশ্বাস ওঠা রাজ্যের কোষাগারকে প্রায় নিঙড়ে কর্পোরেট স্বার্থবাহী এই শিল্প প্রকল্প যে রাজ্যের পক্ষে ভালো হবেনা তা বামপন্থী অর্থশাস্ত্রী ডাঃ অশোক মিত্র সহ বেশ অনেকেই বলেছিলেন। যে নব্য উদার অর্থনীতির পৃষ্টপোষকেরা সমস্ত ব্যবসা-বাণিজ্য থেকে সরকার ও রাষ্ট্রকে বহুযোজন দূরে থাকার পরামর্শ দেন, তারাই আবার নতুন নতুন শিল্পস্থাপনে সরকারি কোষাগার থেকে উদার হস্তে আর্থিক সাহায্যের (ইন্সেনটিভের জামা পরিয়ে) পাশাপাশি তাদের শিল্পস্থাপনে দানবীয় পন্থা অবলম্বনের জন্য নানা যুক্তি হাজির করেন — সবটাই উন্নয়নের বস্তাপচা স্লোগানের আড়ালে।

বীরভূমের ডেউচা-পাঁচামি কয়লাখনি প্রকল্পের রূপায়ণে রাজ্য সরকারের উদ্যোগ প্রসঙ্গেই আনন্দবাজার পত্রিকা এই পরামর্শ দিয়েছে। সম্প্রতি শিল্পতালুক নির্মাণে গোটা রাজ্যজুড়েই মমতা সরকার জমি ব্যবহারের ঊর্ধ্বসীমা শিথিল করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে, যা ধাপে ধাপে পুরোপুরি তুলে দেওয়ার পথেই এগোবে। রাজ্যে ‘শিল্পায়ন ও উন্নয়নের নতুন জোয়ার, কর্মসংস্থানের বদ্ধদশা’ ঘোচাতে এই প্রকল্প বাস্তবায়িত হওয়ার পথে আনন্দবাজার ‘ঈশান কোণে’ উৎখাত হয়ে যাওয়া স্থানীয় অধিবাসীদের প্রতিবাদ-প্রতিরোধের আশঙ্কা দেখতে পাচ্ছে। ‘যথাসাধ্য ও ন্যায্য ক্ষতিপূরণ ও পুনর্বাসন’এর পক্ষে কথা বললেও ‘জনস্বার্থের অজুহাতে’ এই প্রকল্প যাতে বানচাল না হয়ে যায়, সেই মর্মেই সম্পাদকীয় নিবন্ধে বলা হয়েছে, “গণতান্ত্রিক দেশে তর্কবিতর্ক, আলাপ-আলোচনা, প্রতিবাদ ইত্যাদি সকলই চলিতে পারে, কিন্তু কাজে বাধা নহে। রাজ্য সরকারকে তাহা নিশ্চিত করিতে হইবে। প্রয়োজনে কঠোর হতে হবে।” আর, সেজন্য রাষ্ট্রক্ষমতা (পড়ুন রাষ্ট্রীয় দমন) ব্যবহারের নিদান দিয়েছে সম্পাদকীয় নিবন্ধ। অর্থাৎ, উচ্ছেদের পূর্বে ন্যায্য ক্ষতিপূরণ ও পুনর্বাসনের পূর্বশর্ত সুনিশ্চিত না করে আলাপ আলোচনার গণতান্ত্রিক প্রসাধনীর পাশাপাশি প্রকল্প রূপায়ণের কাজকে সর্বাধিক অগ্রাধিকারে রাখার চরম অন্যায্য অগণতান্ত্রিক কুমন্ত্রণা দিয়েছে আনন্দবাজার পত্রিকা। আজ পর্যন্ত সমস্ত প্রকল্পের ক্ষেত্রেই দেখা গেছে, ক্ষতিগ্রস্ত অধিবাসীদের আস্থা-বিশ্বাস আদায় ও জনগণকে সঙ্গে নিয়ে চলার গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজটি না করে, সরকার ও রাষ্ট্র নাম-কা-ওয়াস্তে পুনর্বাসন ও ক্ষতিপূরণের প্যাকেজ ঘোষণা করেই প্রকল্প রূপায়ণের কাজে রক্তচোখ দেখিয়েই তা বাস্তবায়নের পথে পা বাড়িয়েছে, যা ডেকে এনেছে বিক্ষোভ, সামাজিক উত্তেজনা ও অশান্তি।

এদিকে, ঐদিনেরই আনন্দবাজার পত্রিকা আর একটি প্রতিবেদনে ‘কয়লা আছে, তাই আমলারা আসছেন!’ পাঁচামির বিস্তীর্ণ অঞ্চলে অধিবাসীদের চরম বঞ্চনা, অনুন্নয়নের কাহিনী তুলে ধরেছে। যেখানে নেই কোনও উচ্চমাধ্যমিক স্কুল, পানীয় জলের তীব্র সংকটকে নিত্য সঙ্গী করে চলে সেখানকার দিন যাপন, বেহাল রাস্তা ঘাট, সরকারি আবাস যোজনার আওতায় না-আসা পাকা বাড়ি থেকে বঞ্চিত অসংখ্য মানুষ! জনজাতি অধ্যুষিত গ্রামগুলির মাটির নিচে কয়লার বিরাট ভান্ডার খুঁজে পাওয়ার পর হোমড়া-চোমরা আধিকারিকদের আনাগোনা আজ বহুগুণ বেড়েছে, কিন্তু তাঁরা যে তিমিরে ছিলেন, রয়েছেন সেই তিমিরেই।

আর, বহু চিন্তাশীল বুদ্ধিজীবী এই ‘সম্পদের অভিশাপ’ (রিসোর্স কার্স)-র এই বিচিত্র পরিঘটনার ব্যাখ্যা দিয়েছেন। নোবেল জয়ী অর্থশাস্ত্রী যোশেফ স্টিগলিটজ তার বিখ্যাত প্রবন্ধ — ‘মেকিং ন্যাচারাল রিসোর্সেস্ ইন্টু আ ব্লেসিং র‍্যাদার দ্যান এ কার্স’এ দেখিয়েছেন অনেক দেশ বা খনিজ সম্পদে অত্যন্ত সমৃদ্ধশালী অঞ্চলগুলো মানব বিকাশের নিরিখে বিভিন্ন সূচকে কী নিদারুণভাবে পিছিয়ে রয়েছে। চূড়ান্ত দারিদ্র, ভগ্নপ্রায় স্বাস্থ্যব্যবস্থা, শিশু মৃত্যুর উচ্চহার, শিক্ষার মান তলানিতে, জনগোষ্ঠীর সিংহভাগ মানুষ অপুষ্টিতে আক্রান্ত। একটা উদাহরণ দেওয়া যাক। ভারতের ২৩ শতাংশ লৌহ আকরিকের ভান্ডার আছে ছত্তিশগড়ে, আর সেখানে মাটির নিচে রয়েছে কয়লার বিরাট ভান্ডার। কিন্তু মানব বিকাশের সমস্ত সূচকে তার রেকর্ড রীতিমতো করুণ। অথচ সেখানে লক্ষ লক্ষ কোটি টাকার মৌ স্বাক্ষরিত হয়েছে টাটা স্টিল ও আরসেলার মিত্তল, ডি বিয়ার্স কনসোলিডেটেড মাইন্স, রিও টিন্টো অ্যান্ড বিএইচপি বিলিয়নের সাথে, বিনিয়োগ হয়েছে বিপুল পরিমাণে এফডিআই। যোজনা পর্ষদের (মোদী যার বিলুপ্তি ঘটিয়ে নীতি আয়োগ বানিয়েছে) এক বিশেষজ্ঞ গোষ্ঠী ২০০৮ সালে পেশ করা এক রিপোর্টে দেখিয়েছে, ১৯৫১ আর ১৯৯০’র মাঝে ৮০ লক্ষ ৫০ হাজার তপসিলি জাতির মানুষ উৎখাত হয়েছেন নানা উন্নয়ন মূলক কর্মকান্ডের দরুণ (এরপর সম্ভবত আর কোন সরকারি রিপোর্ট বেরোয়নি)। আর, বিভিন্ন প্রকল্পের ফলে উচ্ছেদ হওয়া মানুষের মধ্যে পুনর্বাসিত হতে পেরেছেন মাত্র ২৫ শতাংশ। ওই রিপোর্ট উল্লেখ করেছে, “ভারতের বিকাশের গতিপথ স্থায়ীভাবে বসবাসকারী নাগরিকদের জীবন যাত্রায় চূড়ান্ত অস্থিরতা তৈরি করেছে। কয়েক দশক ধরে ভারতীয় রাষ্ট্র এই সমস্ত উচ্ছেদ হওয়া মানুষদের রুটিরুজির বিকল্প কোনও পথ দেখাতে পারলো না।”

২০১১ সালের ৫ জুলাই সুপ্রিম কোর্ট এক জনস্বার্থ মামলায় ঐতিহাসিক রায় দেয়। মাওবাদীদের মোকাবিলা করতে ছত্তিসগড় সরকার গড়ে তোলে সালওয়া জুদুম ঘাতক বাহিনী। এর বৈধ্যতাকে চ্যালেঞ্জ জানিয়ে নলিনী সুন্দর সহ বেশ কিছু প্রথিতযশা বুদ্ধিজীবী (যাদের মধ্যে কয়েকজন ভীমা কোরেগাঁও মিথ্যা মামলায় কারান্তরালে) মামলা করেন। সেই মামলায় সালওয়া জুদুমকে বেআইনী ঘোষণা করেই শীর্ষ আদালত ক্ষান্ত থাকেনি, বিকাশের গতিকে ও ‘সামাজিক সুস্থিতিকে বজায় রাখতে’ রাষ্ট্রকে বজ্রমুষ্ঠিতে শাসন করার দমনমূলক ন্যারেটিভ পরিত্যাগ করে সাংবিধানিক শাসনকে ফিরিয়ে আনতে আদেশ দেয়। শুধু তাই নয়, বিরল এই রায়দানে ছত্রে ছত্রে আর্থিক বিকাশের চরম জনবিরোধী দমনমূলক গতিপথকে তীব্র সমালোচনা করেছে শীর্ষ আদালত।

গণতন্ত্রের ধ্বজা ওড়ানো, বঙ্গ সমাজের স্বঘোষিত নীতিবাগীশ আনন্দবাজার তার আসল চেহারা নিজেই উন্মোচিত করল।

- অতনু চক্রবর্তী

When will politics be responsible_0

গোটা পৃথিবীতে, বিশেষ করে উন্নয়নশীল ও দরিদ্র দেশগুলোতে, অসংখ্য মা অজস্র কারণে সন্তানহারা হচ্ছেন। প্রতিদিন। সেই অসহায় কান্নার নদীতে মিশে গেল আরেক মায়ের বুকফাটা হাহাকার।

মালদহের মোথাবাড়ি থানার জোত অনন্তপুর গ্রামে আসোয়ানি বিবির ঘর। স্বামী সাজমুল রাজমিস্ত্রি। দু’ছেলে মেয়ে নিয়ে শাকান্নের সংসার। সাত বছরের ছেলে সাকিবুল মঙ্গলবার বিকেলে ন্যাড়া ছাদ থেকে পড়ে গুরুতর জখম হয়। মালদা সদর হাসপাতালে নিয়ে গেলে সিটি স্ক্যান করে তাকে কলকাতার এসএসকেএম’এ রেফার করা হয়। অ্যাম্বুল্যান্স ছুটছিল কলকাতার পথে। ৩৮০ কিমি রাস্তার বাকি ছিল আরও প্রায় ১৫০ কিমি পথ। গতিরোধ হল কৃষ্ণনগরের পিডব্লুডি মোড়ের কাছে অবরোধে। স্থানীয় কিছু বড় বড় ক্লাবের সদস্য ও কর্মকর্তারা ৩৪নং জাতীয় সড়কে আগুন জ্বেলে বিক্ষোভ দেখাচ্ছেন। কেন? প্রথাগত ‘ঐতিহ্য’ মেনে, জগদ্ধাত্রী ঠাকুরকে বেহারার কাঁধে (অন্তত ১০০-১৫০ জন বেহারা) চাপিয়ে রাজবাড়ি থেকে শোভাযাত্রা সহকারে বিসর্জনের অনুমতি দিতে হবে! কোভিড পরিস্থিতিতে সেটা আদালতের বারণ ছিল। তবু কেন এই আবদার?

কৃষ্ণনগরের জগদ্ধাত্রী পুজোর ‘ঐতিহ্য’ আর ‘মানুষের আবেগ’কে মর্যাদা দিতে! (তাতে কোভিড সংক্রমণে কয়েকশো মানুষ না হয় মরবে!) হাজার হাজার মানুষ রাতভর রাস্তার দু’পাশে শোভাযাত্রার জন্য অপেক্ষা করে থাকবে না!

টানা দু’ঘন্টা অবরোধে আটকে থাকল অ্যাম্বুল্যান্স। একসময় কচি দেহটা নিথর হয়ে গেল। চারপাশের গাড়ির লোকজন অনেক চেষ্টা করেছিলেন ছোট্ট সাকিবুলকে পথ করে দেওয়ার। কিন্তু অসংখ্য গাড়ির জটিল জট কাটানো সম্ভব হয়নি। মরিয়া হয়ে শেষে তারা ফেসবুকে দেওয়ার পর কোতোয়ালি থানার পুলিশ যখন আসে, তখন সব শেষ। রাত আড়াইটেয় অবরোধ ওঠে। অ্যাম্বুল্যান্স তারপর মৃত সাকিবুলকে নিয়ে পিজি’তে পৌঁছায়।

অনেকগুলো প্রশ্ন।

যে মানুষ অন্যের সাতমহলা প্রাসাদ গড়ে, তার নিজের ঘরের ছাদ ‘ন্যাড়া’ হয়ে পড়ে থাকে কেন? বাড়িতে নাবালক থাকা সত্ত্বেও? কেন এই বিপন্নতা?

মাথায় জমাট রক্ত অস্ত্রোপচার করে বার করার ব্যবস্থা কেন থাকবে না জেলা সদর হাসপাতালে? কেন তারজন্যে প্রায় ৪০০ কিমি উজিয়ে কলকাতায় আসতে হবে? তাহলে রাজ্যের স্বাস্থ্য পরিকাঠামো নিয়ে এত ঢক্কানিনাদ কেন?

মানুষ যখন নিজেদের জীবন মরণের প্রশ্নে বিক্ষোভ দেখাতে পথ অবরোধ করতে বাধ্য হয়, তখন অনেক ক্ষেত্রেই প্রশাসন অতিসক্রিয় হয়ে বলপ্রয়োগ করে অবরোধ তুলে দেয়। এক্ষেত্রে এত ধৈর্যের পরাকাষ্ঠা প্রদর্শন কেন? ভয়ে না ভক্তিতে? অবরোধে সবসময়েই অ্যাম্বুল্যান্সের ছাড় থাকে। এটাকে অবরোধকারী ও প্রশাসন উভয়েরই মান্যতা দেওয়ার কথা। এক্ষেত্রে তা হল না কেন? বিক্ষোভস্থল থেকে অনেক দূরে আটকে পড়েছিল অ্যাম্বুল্যান্স। কেন পথ করে দেওয়ার জন্য কোনও পুলিশের দেখা মেলেনি? কেন প্রশাসন বিন্দুমাত্র তৎপর ছিলনা এরকম একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সড়ক অবরুদ্ধ হয়ে যাওয়ার পরেও?

ক্লাব কর্মকর্তাদের বেশিরভাগই শহরের বা অঞ্চলের মান্যগণ্য প্রভাবশালী রাজনৈতিক ব্যক্তিবর্গ। তারা নির্বোধ বা অদূরদর্শী নন। তবে কোভিড-এর তৃতীয় ঢেউয়ের মুখে দাঁড়িয়ে কেন আদালত ও প্রশাসনের বিরোধিতা করছেন? সেই ভয়ঙ্কর দিনগুলোর কথা ভুলে গেছেন যখন হাসপাতালের দরজায় অ্যাম্বুল্যান্সের সারি, শ্মশানে দিন-রাত শ’য়ে শ’য়ে লেলিহান চিতা জ্বলছে, গঙ্গায় ভেসে যাচ্ছে শ’য়ে শ’য়ে লাশ? নির্বান্ধব নিঃসঙ্গ একাকী সেই ভয়ঙ্কর মৃত্যু; সৎকারহীন চরম অমর্যাদার সেই মৃত্যুর কথা ভুলে গেছেন? প্রায় দু’বছর ধরে ঘরবন্দি ছেলে মেয়েরা অনাহার অপুষ্টি অশিক্ষায় ধুঁকছে। কাজ হারিয়ে রাতারাতি বেকার অসংখ্য মানুষ আজ দিশাহারা, কেউ বা সপরিবারে আত্মহত্যার পথ বেছে নিয়েছেন। সংক্রমণ আবার বাড়ছে, মৃত্যু বাড়ছে, তারা খোঁজ রাখেন না? ইউরোপে চতুর্থ ঢেউ আছড়ে পড়েছে। জার্মানিতে দৈনিক সংক্রমণ ৫০,০০০ ছাড়িয়েছে। চিকিৎসকরা সেখানে লক্ষাধিক মৃত্যুর আশঙ্কা করছেন, অত্যাধুনিক চিকিৎসা পরিষেবা, পরিকাঠামো থাকা সত্ত্বেও। সেসব তারা জানেন না? আসলে এই সব মেলা খেলা পুজোয় কার স্বার্থ কোথায় কোন সূক্ষ্ম তন্ত্রীতে বাঁধা আছে — সেসব নিগূঢ় হিসেব সাধারণের অগোচরেই থেকে যায়। রাজনীতি চলে ভোটের অঙ্কে। আর সে অঙ্ক কষা হয় জাত-পাত-ধর্মের সমীকরণ দিয়ে।

রাজনীতি তার নিজের স্বার্থে ‘মানুষ’কে, তার ‘আবেগ’কে প্রয়োজনমতো নিয়ন্ত্রণ করে, ব্যবহার করে। গতবছর প্রশাসন অক্ষরে অক্ষরে আদালতের রায় মেনেছিল, সব ধর্মের মানুষ প্রতিটি উৎসবে তাকে মান্যতা দিয়ে সংযত থেকেছে। এটা আমরা সবাই দেখেছি। আজ সাধারণ মানুষের মধ্যে চোরা আতঙ্ক ‘আবার পয়সা দিয়ে রেশন তুলতে হবে?’ কারণ কেন্দ্রীয় সরকার বিনামূল্যের রেশন প্রত্যাহার করে নিয়েছে। তাই উৎসব নিয়ে উচ্ছ্বসিত হওয়ার সুযোগ নেই। কথায় কথায় ‘অশিক্ষিত অজ্ঞ মানুষের’ ঘাড়ে দোষ চাপানোটা আমলা, মন্ত্রী প্রশাসনের অভ্যাস হয়ে গেছে। তারা ভুলে যান, ইউরোপ আমেরিকার উন্নত দেশের সুশিক্ষিত মানুষ মাস্ক পরা, ভ্যাকসিন নেওয়ার ব্যাপারে প্রশাসনের নির্দেশকে ‘গণতন্ত্র হরণ’ বলে রাস্তায় নেমে বিক্ষোভ দেখায়!

সমাজের দেহে আবহমান ধর্মান্ধতা কুসংস্কার নারী বিদ্বেষের বিষাক্ত প্রভাব সক্রিয়। এরফলে কিছু মানুষ খুব সহজেই ভীড় হিংসায় সামিল হয়ে যায়। কখনও মোবাইল চোর সন্দেহে সংখ্যালঘু তরুণকে পিটিয়ে মারা, কখনও উচ্চবর্ণের মেয়েকে বিয়ে করার অপরাধে দলিত যুবককে খুন করা, কখনও আদিবাসী যুবতীকে ‘অবৈধ প্রণয়ের’ অভিযোগে চুল কেটে, বিবস্ত্র করে পাড়া ঘোরানো বা ধর্ষণ করা — এসব বোধহীন কাজের নির্বোধ উল্লাসে সতত সহজেই পাওয়া যায় এদের। উপযুক্ত শিক্ষার মাধ্যমে সেই বিষক্রিয়া কাটানোর পরিবর্তে রাজনীতি বরং তাদের কাজে লাগায়।

কর্মসংস্থানহীন অর্থনীতি। অনুদাননির্ভর সমাজ। স্কুলে ছাতা জুতো ব্যাগ সবুজসাথী কন্যাশ্রী, এমনকি এখন মোবাইল পর্যন্ত পাওয়া যাচ্ছে। অভাব শুধু শিক্ষক আর ক্লাসরুমের সুষ্ঠু সুশৃঙ্খল শিক্ষা পরিবেশের। ফলে শিক্ষার হাল যা হবার হয়েছে। ড্রপ আউট বেড়েছে। স্কুলের চৌহদ্দির বাইরে এসে ছেলেরা অনেকেই আজকাল জিমে যায়। যদি বাউন্সার বা নিদেন পক্ষে সিকিউরিটি গার্ডের চাকরি পাওয়া যায়। কিন্তু কোথায় কারখানা, কোথায় অফিস, কোথায় ব্যাঙ্ক! বড়জোর বহুতলের দারোয়ানি জোটে। তবে রাজনৈতিক ‘দাদারা’ সস্নেহে ডেকে নেন। সপ্রতিভ, পেশল সুঠামদেহীদের রাজনীতিতে বহু কাজ! ভোট বৈতরণী পার করা থেকে তোলাবাজি, সিন্ডিকেট — ‘রণে বনে জঙ্গলে’র মত কয়লা খনি, বালি খাদান, কারখানার গেট থেকে হাসপাতালে টিকিটের লাইন পর্যন্ত সর্বত্র যাদের উপস্থিতি! থানা পঞ্চায়েত মন্ত্রী আমলার ঘরে যাদের অবাধ গতি! রাজনীতির কেষ্টু-বিষ্টুদের ‘সহজ’ পথে অর্থাগমের রাস্তা সুগম করা এদের কাজ। এদের আওতায় আছে বাপে তাড়ানো মায়ে খেদানো আশৈশব ক্ষুধা লাঞ্ছনা প্রহার নিগ্রহ আর অনিশ্চয়তাকে ছায়াসঙ্গী করে বেড়ে ওঠা ছন্নছাড়ার দল। সমাজ ওদের প্রতি দায় দূরে থাক, দয়াও দেখায়নি কখনও। ওদেরও সমাজের প্রতি কোনও দায় নেই। দল নির্বিশেষে ‘দাদা’দের স্নেহের প্রশ্রয়ে এরা ক্রমশ ‘ভীষণ’ এবং এলাকার ‘ত্রাস’ হয়ে ওঠে। প্রয়োজন মিটে গেলে ‘দাদা’দের রিমোট কন্ট্রোলে এরা গোষ্ঠী সংঘর্ষে বা এনকাউন্টারে হাপিশ হয়ে যায়।

এরাই গত কালীপুজোর রাতে মহেশতলায় কুকুরের গায়ে দোদমা ছুঁড়ে মেরে বেচারাকে জখম করেছিল। একজন তার প্রতিবাদ করায় তাকে মারধর করেই ক্ষান্ত থাকে না, মাঝরাতে আগ্নেয়াস্ত্র হাতে তরুণ সহ দলবল নিয়ে তার বাড়িতে ঢোকার চেষ্টা করে, তাকে প্রাণে মারার ও তার মাকে ধর্ষণের হুমকি দেয়। মা স্বপ্না অধিকারী আতঙ্ক ঘৃণা হতাশায় গত শুক্রবার গলায় শাড়ির ফাঁস লাগিয়ে আত্মহত্যা করেন।

এরাই সেদিন নরেন্দ্রপুরের গড়িয়ায় মদের ঠেক বসিয়ে রোজকার মতো মদ জুয়ার আসর চালাচ্ছিল। এলাকার মহিলারা প্রতিবাদ করায় তাদের ঘরে ঘরে ঢুকে তাণ্ডব চালায়, যথেচ্ছ মারধর ও শ্লীলতাহানি করে। মারের হাত থেকে বৃদ্ধ, বালিকা এবং অন্তঃসত্ত্বাও রেহাই পাননি। দীর্ঘদিন ধরে চলা এই অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রশাসনকে বার বার জানানো সত্ত্বেও কোনও ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। তবে সেদিনের ঘটনার পর নড়ে চড়ে বসেছে থানা।

এই দুষ্কৃতী-দাপট রাজ্যে ক্রমশ বাড়ছে। প্রশাসন ধৃতরাষ্ট্র।

নাগরিকদের একই সঙ্গে অধিকার ও কর্তব্য সম্পর্কে সচেতন করাটা রাজনীতির দায় নয়? ছট পুজোয় নিষেধাজ্ঞা সত্ত্বেও দেদার বাজি পুড়ল, বায়ুদূষণ হল। পুজোর নানা উপচারে গঙ্গার জল দূষিত হল ভীষণভাবে। বছরের পর বছর এই দূষণ চলতেই থাকবে? রাজনীতি মগ্ন থাকবে ভোটের অঙ্কে?

- জয়ন্তী দাশগুপ্ত

Kangana

“আমরা আসল স্বাধীনতা পেয়েছি ২০১৪য়, মোদীজী ক্ষমতায় আসার পর।” গত ১১ নভেম্বর অভিনেত্রী কঙ্গনা রানাওতের মন্তব্য বিজেপির ধামাধরা ‘টাইমস-নাও’ চ্যানেলে।

কঙ্গনা রানাওত প্রকাশ্যে ধর্মীয় বিদ্বেষ ছড়ানোর জন্য কুপরিচিত বটে। আরএসএস-বিজেপির হিন্দুরাষ্ট্রের প্রচারকে ঊর্ধ্বে তুলে ধরতে তার অধ্যাবসায় ও প্যাশন লক্ষণীয়। বিজেপি শাসিত কেন্দ্রীয় সরকারের জনবিরোধী প্রতিটি পদক্ষেপ — নাগরিকত্ব সংশোধনী আইন, কৃষি আইন, শ্রম কোড লাগু করার কুন্ঠাহীন সমর্থন জানিয়ে, বিদ্বেষেভরা উস্কানিমূলক বক্তব্য রেখে, পেয়েছেন পদ্মশ্রী পুরস্কার। কঙ্গনার সাম্প্রতিক মন্তব্যের পর জনপরিসরে সমালোচনার ঝড় উঠেছে। রাজনৈতিক মহলে ও নেট দুনিয়ায় কঙ্গনার পদ্মশ্রী খেতাব ফিরিয়ে নেওয়ার দাবিও উঠেছে।

কঙ্গনা রানাওত যিনি নারী স্বাধীনতা, বলিউড ইন্ড্রাস্ট্রির নেপোটিজম (স্বজনপ্রীতির) বিষয়ে মুখ খুলে নেট দুনিয়ায় সুপরিচিত হয়েছিলেন, তার বিজেপি-সংঘের রাজনীতির সাথে ঘনিষ্ঠতা ও উগ্র-জাতিয়তাবাদী, ধর্মীয়-বিদ্বেষী চেহারার প্রকট হওয়া সমাপতন নয়, বরং আরএসএস’এর লিঙ্গ রাজনীতির পরিচায়ক বটে।

ইতিহাসবিদ তনিকা সরকার আরএসএস’এর মহিলা সংগঠন নিয়ে গবেষণায় দেখিয়েছেন, কীভাবে নারীর আওয়াজকে হিন্দুরাষ্ট্রের গ্রহণযোগ্যতার জন্য প্রচার প্রোপাগান্ডায় ব্যবহার করে আরএসএস।

ভারতের স্বাধীনতা অর্জনের লড়াই থেকে শুরু করে স্বাধীনতাত্তোর ভারতে, ঔপনিবেশিকতাবাদ ও সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে মেয়েরা সক্রিয় ভূমিকা রেখেছেন। জল-জঙ্গল-জমির অধিকারের লড়াই থেকে মজদুরদের ন্যায্য মজুরির লড়াইতে আদিবাসী, দলিত ও শ্রমিক শ্রেণীর নারীদের উল্লেখযোগ্য অবদান রয়েছে। অন্যদিকে, শুধুমাত্র পুরুষদের নিয়ে উগ্র হিন্দুত্ববাদী রাজনীতির পৃষ্ঠপোষক রাষ্ট্রীয় স্বয়ং সেবক সঙ্ঘ ১৯২৫ সালে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার ১১ বছর পর ১৯৩৬ সালে আরএসএস’এর নারী সংগঠন রাষ্ট্রীয় সেবিকা সঙ্ঘের নির্মাণ হয়। রাষ্ট্রীয় সেবিকা সঙ্ঘের প্রতিষ্ঠাতা লক্ষ্মীবাই কেলকার আরএসএস’এর প্রতিষ্ঠাতা হেডগেওয়ারের কাছে আরএসএস’এর সদস্যপদের আর্জি নিয়ে গেলে প্রত্যাখ্যাত হন। প্রতিষ্ঠানের প্রায় ১০০ বছর পরেও আরএসএস’এর সদস্যপদের অধিকার একমাত্র পুরুষদের।

হিন্দুরাষ্ট্রের প্রবক্তা গোলওয়ালকার ‘বাঞ্চ অফ থটস্’এ লিখছেন, সমাজে পারিবারিক ও হিন্দুরাষ্ট্রের মূল্যবোধ টিঁকিয়ে রাখা মেয়েদের প্রধান কর্তব্য। সমসাময়িক কালে ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে মেয়েরা সক্রিয় রাজনীতিতে অংশ নিলেও, আরএসএস’এর মহিলা শাখার কর্মীদের দায়িত্ব দেওয়া হয় বাড়ির চারকোণের মধ্যে ভবিষ্যতের স্বয়ংসেবকদের শৃঙ্খলা ও সংস্কার শেখানোর। সেবিকা সংগঠন শুরু হওয়ার বহু বছর পরেও, শুধুমাত্র উচ্চবর্ণ, শহুরে, উচ্চ-মধ্যবিত্ত, মধ্যবিত্ত পরিসরেই সদস্য বিস্তারের কাজ চলে।

পরবর্তীতে ১৯৯০’র দশকে, ভারতে নয়া-উদারবাদের প্রাক্কালে, মেয়েদের রাজনৈতিক পরিচিতিকে ব্যবহারের পথ নেয় আরএসএস। ‘নারী-শক্তি’কে ঊর্ধ্বে তুলে ধরার নামে হিন্দু মেয়েদের উপর চাপানো হয় ধর্মীয় হানাহানির আগুনকে জাগিয়ে তোলার দায়িত্ব। বিদ্বেষের উদ্দ্যেশ্যে উচ্চবর্ণ হিন্দু-নারীর গৈরিক-জাগরণের রাশ থাকে পুরুষ চালিত আরএসএস’এর হাতেই। এই নিয়ন্ত্রণ এমনই যে, গুজরাটে মুসলিম মেয়েদের উপর পুরুষতান্ত্রিকতার নিষ্ঠুরতম নিদর্শন চলাকালীন গৈরিক নারীশক্তির মধ্যে থেকে কোনো প্রতিবাদ উঠে আসে না বরং নির্মম হিংসায় সহায়ক শক্তি হিসাবে কাজ করে গৈরিক নারী।

রাম-জন্মভূমির প্রচারাভিযানে দুর্গা বাহিনীর সাধ্বী ঋতম্বরা, বিজেপির উমা ভারতী, বিশ্ব হিন্দু পরিষদের সাধ্বী প্রাচীরা মুসলিমদের বিরুদ্ধে প্রোগ্রাম সংগঠিত করার কাজে, বহু মানুষ, বিশেষ করে মহিলাদের সংগঠিত করতে সফল হয়। হিন্দু-রাষ্ট্র তৈরির কাজে প্রাণপাত করার পরেও এই হিন্দুত্ববাদী দক্ষিণপন্থী সংগঠনগুলির তাত্ত্বিক ও প্রায়োগিক নেতৃত্ব, আরএসএস’এর কোনও কমিটি কাঠামোতে মহিলাদের স্থান হয়নি। অগুনতি সংখ্যালঘু মানুষের রক্ত ঝরিয়ে, অসংখ্য মসজিদ গুঁড়িয়ে, গণধর্ষণ সংগঠিত করা সফল হলে, এই মেয়েদের আবার ফিরে যেতে বলা হয় অন্দরমহলে। নাৎসি জার্মানিতে ইহুদিদের জেনোসাইড সমাধায় সফল হিটলার একইভাবে তার সমর্থক মহিলাদের নির্দেশ দিয়েছিল, “গো ব্যাক টু ইয়োর কিচেনস”। সংক্ষেপে নারীর জন্য হিন্দুত্ববাদী ফ্যাসিস্টরা দুটি ভূমিকা নির্দিষ্ট করেছে, একটি হিন্দু-রাষ্ট্রের স্নেহশীলা জননী, অন্যটি দ্বেষের বার্তাবাহক।

একবিংশ শতাব্দীতে, সোশ্যাল মিডিয়ার ইনফ্লুয়েন্সরদের যুগে কঙ্গনা — সাভারকার, গোলওয়ালকারদের বার্তাবাহক মাত্র। ‘বাঞ্চ অফ থটস্’ বইয়ের ‘শহীদরা মহান কিন্তু আদর্শ নয়’ চ্যাপ্টারে, গোলওয়ালকার, ভারতের স্বাধীনতার জন্য মৃত্যুবরণ করা শহীদদের বর্ণিত করেছেন ‘ব্যর্থতা' হিসাবে। পরাধীন ভারতে, ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের আগ্রাসন যখন তুঙ্গে, আরএসএস’এর প্রবক্তা গোলওয়ালকার নিজেদের শত্রু হিসাবে চিহ্নিত করছেন ভারতীয় মুসলিমদের। আন্দামানের সেলুলার জেলে, ব্রিটিশ-রাজের প্রতি নিঃশর্ত আনুগত্য জানিয়ে ‘বীর’ সাভারকারের লেখা মুচলেকা, স্বাধীনতা আন্দোলন চলাকালীন আরএসএস’এর ব্রিটিশ-আনুগত্যের অন্যতম সাক্ষ্য।। কঙ্গনা রানাওতের বক্তব্য আসলে দেশের স্বাধীনতা আন্দোলনের প্রতি আরএসএস’এর বিশ্বাসঘাতকতার পুনরুচ্চারণও বটে। যে বিশ্বাসঘাতকতার ইতিহাসকে মেকী দেশপ্রেমের নামে ভুলিয়ে দিতে চায় আজকের মোদী-যোগী নেক্সাস।

একদিকে স্বাধীনতা অর্জনের জন্য ধর্ম-লিঙ্গ নির্বিশেষে সংগ্রামী মানুষদের আত্মত্যাগ, অন্যদিকে হিন্দুরাষ্ট্রের লক্ষ্যে ব্রিটিশরাজের প্রতি আনুগত্য, একদিকে গনতান্ত্রিক মূল্যবোধ, অন্যদিকে মৌলবাদের দাপট — এই দুই পরস্পরবিরোধী ধারার সংঘাতের মধ্যে দিয়ে স্বাধীন ভারতের নির্মাণ। আজ, আরএসএস চালিত বিজেপি সরকার দেশের মানুষের সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করে, নিজেদের পকেট ভরতে কর্পোরেট পুঁজিপতিদের হাতে তুলে দিচ্ছে দেশের জনসম্পদ। লক্ষ-কোটি টাকার বিনিময়ে কর্পোরেট মিডিয়া হাউসগুলিতে প্রচার করা হচ্ছে মিথ্যা ইতিহাস। সত্য সন্ধানের চেষ্টা করলে, তকমা মিলছে দেশদ্রোহীর।

আজ স্বাধীনতার ৭৫ বছর পর, আমরা আবারও সেই সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে, যখন নয়া ভারতকে দিশা দেখানোর জন্য সঠিক ‘পক্ষ’ বেছে নেওয়া জরুরী হয়ে পড়েছে।

- সম্প্রীতি মুখার্জি 

stand by as a human

ওরা কারা? রাজধানী কলকাতার বুকে নিত্য চলমান প্রত্যেকটি মানুষের মনে এ প্রশ্ন উঁকি দিয়ে চলেছে অবিরত। প্রশ্নের উত্তর খোঁজার জন্য কেউ অবাক হয়ে তাকিয়ে দেখে, কেউ ব্যস্ততার মাঝে এক পলক তাদের দিকে তাকিয়ে আবার নিজের গতিতে ফিরে যায়। আর যাদের মনে ওদের নিয়ে অজস্র প্রশ্ন তারা কেউ কেউ সামনে এগিয়ে আসে বিষয়টি সম্পর্কে অবগত হওয়ার জন্য। ওরা কারা? এ প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার জন্যই আজ আমি কলম ধরেছি। আমিও ওদেরই একজন।

আমাদের পরিচয়? আমরা সাধারণ নিম্ন মধ্যবিত্ত ঘরের খেটে খাওয়া কৃষক, শ্রমিক দিন আনতে পান্তা ফুরোনো দিনমজুরের সন্তান। কিন্তু আমাদের বর্তমান পরিচয় ‘আন্দোলনকারী’। এই সাধারণ ছেলে-মেয়েরা কেন আন্দোলনকারী হয়ে উঠল সে সম্পর্কে অনেকের মনে অজস্র প্রশ্ন, কৌতুহল রয়েছে।

আজ থেকে পাঁচ বছর আগের কথা। কারো বয়স শেষের দিকে, কেউ মাঝামাঝি বয়সের,কেউ বা সদ্য এমএ, বিএড পাস করা। সকলের চোখে, সকলের বুকে বাসা বেঁধেছে শিক্ষক হওয়ার স্বপ্ন। হ্যাঁ, ঠিকই শুনেছেন! শিক্ষক। যে শিক্ষক সমাজ গড়ার কারিগর। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত আজ সেই হবু শিক্ষকরা দিনের পর দিন, রাতের পর রাত পড়ে থাকে রাস্তায়। বিদ্যালয় নয়, রাস্তাই যেন ওদের স্থায়ী ঠিকানা হয়ে উঠেছে। জীবিকার তাগিদে, দু’মুঠো অন্নসংস্থানের সন্ধানে রাস্তায় পড়ে থাকতে থাকতে তারা হারিয়েছে তাদের প্রিয়জনদের। কেউ হারিয়েছে তাদের বৃদ্ধ বাবা-মা, কেউ বা হারিয়েছে গর্ভে তিলে তিলে বেড়ে ওঠা সন্তানকে। আজ তারা হতাশ হয়ে ভাবে শিক্ষকতার স্বপ্ন দেখাই যেন তাদের জীবনের সবচেয়ে বড় ভুল।

২০১২ সালের পর দীর্ঘ চার বছর অতিক্রান্ত হয়ে অবশেষে এলো সেই স্বপ্নের ২০১৬। হবু শিক্ষকদের পরম প্রাপ্তি। সরকারের তরফে ঘোষণা করা হল বিদ্যালয়ে শিক্ষক নিয়োগের সংবাদ। ২০১৬ সালে যথানিয়মে পরীক্ষা হল। এরপর এখানেই যেন ধীরে ধীরে সবকিছু থমকে যেতে লাগলো। কিন্তু হবু শিক্ষকরা নাছোড়বান্দা। শুরু হল আন্দোলন। পরীক্ষার ফলাফল প্রকাশিত হল আন্দোলনের মাধ্যমে। এরপর শুরু হল নিয়োগ প্রক্রিয়া। নিয়োগ প্রক্রিয়ায় দেখা গেল অজস্র অসঙ্গতি, দুর্নীতি। গেজেট অমান্য থেকে শুরু করে, কখনো রাঙ্ক জাম্প, কখনো বা মেধা তালিকায় নাম না থাকা প্রার্থীদের নিয়োগ দিয়ে, মেধা তালিকায় নাম থাকা যোগ্য প্রার্থীদের নানাভাবে বঞ্চিত করা হল।

stand by as a human being_0

 

বঞ্চনার প্রতিবাদে ২০১৯ সালে কলকাতার মেয়ো রোডে প্রেসক্লাবের সামনে যুব ছাত্র অধিকার মঞ্চের ব্যানারে শুরু হল অনশন আন্দোলন। ২৯ দিনের লড়াই’এর প্রত্যেকটি দিন ছিল আন্দোলনকারীদের জীবনে অপরিহার্য। প্রতিদিন নিত্য নতুন অভিজ্ঞতা। হবু শিক্ষক-শিক্ষিকারা জেনেছে লড়াই কত কঠিন। অথচ এ লড়াই তাদের কাম্য ছিলো না। প্রায় এক মাস খোলা আকাশের নীচে, কখনো তারা ভরা আকাশ, কখনো মেঘলা আকাশ, কখনো বা বজ্রবিদ্যুৎ যুক্ত বৃষ্টিস্নাত আকাশের নীচে কাটিয়েছে রাতের পর রাত। আবার দিনের বেলায় গ্রীষ্মের প্রচন্ড দাবদাহ। প্রশাসনের তরফ থেকে ছিলনা কোনো সহায়তা। মাথার উপরের ত্রিপলের ছায়ার আশ্রয় টুকু কেড়ে নেওয়া হয়। কিন্তু তবুও তারা প্রাকৃতিক দুর্যোগ বিপর্যয়কে হার মানিয়ে নিজেদের হকের দাবিতে অনড় থেকেছে। মহিলাদের জন্য ছিল না কোনো শৌচালয়, ছিলনা পানীয় জলের ব্যবস্থা। কেউ কেউ তাদের দুধের শিশুকে নিয়ে রাস্তায় নর্দমার পাশে রাত কাটায়। হবু শিক্ষকদের প্রতিটি মুহূর্ত কাটছিল চরম উৎকন্ঠায়।

সমাজের সুধীজন, বুদ্ধিজীবী থেকে শুরু করে বাংলার আপামর জনসাধারণ সেদিন আমাদের পাশে দাঁড়িয়ে ছিলেন। অবশেষে দীর্ঘ প্রতিক্ষার অবসান। দীর্ঘ ২৯ দিনের আন্দোলনে স্বয়ং মুখ্যমন্ত্রী বঞ্চিত প্রার্থীদের বঞ্চনার কথা স্বীকার করে স্কুল সার্ভিস কমিশনকে ঘুঘুর বাসা আখ্যা দিয়ে, সমস্যার সমাধানের আশ্বাস দিয়ে কমিশন এবং আন্দোলনকারীদের মধ্যে পাঁচজন প্রতিনিধি দল গঠন করার নির্দেশ দেন। কিছুদিন যেতে না যেতেই লকডাউনের অন্ধকারে কমিশনের তরফ থেকে সেই পাঁচ প্রতিনিধি দলকে অবৈধভাবে নিয়োগ দেওয়া হয়। বঞ্চিত প্রার্থীরা হতাশ হয়নি, তারা তাদের যোগ্য দাবী নিয়ে আবার ঘুড়ে দাঁড়ায়। সল্টলেক সেন্ট্রাল পার্কের ৫নং গেটের সামনে ১৮৭ দিনের আন্দোলন শুরু হয়। আন্দোলন ১৮৭ দিনের কেন? কারণ মহামান্য আদালতের নির্দেশ থাকা সত্বেও ১৮৭ দিনের মাথায় এক দুর্যোগের রাত্রে পুলিশ-প্রশাসন আন্দোলনকারীদের উপর চালায় অকথ্য অত্যাচার, মহিলাদের উপর শুরু হয় নির্যাতন। তাদের পোশাক আশাক, ব্যাগপত্র খাবার-দাবার সবকিছু রাস্তায় বৃষ্টির জলের মধ্যে ছুঁড়ে ফেলে দেওয়া হয়। এর কিছুদিন পর ১০ আগস্ট বঞ্চিত প্রার্থীরা অবৈধ নিয়োগের অজস্র তথ্য কমিশনের চেয়ারম্যান’এর সামনে তুলে ধরেন। চেয়ারম্যান শিক্ষামন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠকের পর প্রেস কনফারেন্সে তাদের বঞ্চনার কথা স্বীকার করে ৪০ দিন সময় চেয়ে নেন। কিন্তু আবারও সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের কথায় “কেউ কথা রাখেনি, কেউ কথা রাখে না”। চেয়ারম্যান কথা দিয়ে কথা না রাখার প্রতিবাদে আবার শুরু হয় আন্দোলন। বঞ্চিত প্রার্থীরা মহামান্য আদালতের নির্দেশ অনুযায়ী আবার ৮ অক্টোবর থেকে মেয়ো রোডের সামনে গান্ধী মূর্তির পাদদেশে আন্দোলনরত। রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে বঞ্চিত প্রার্থীরা ছুটে এসেছেন কলকাতার বুকে। এখানেও মহিলাদের জন্য নেই কোনো শৌচাগার, নেই পানীয় জলের ব্যবস্থা। রোদ-ঝড়-জল-বৃষ্টি এছাড়াও বিভিন্ন প্রাকৃতিক দুর্যোগ মাথায় নিয়ে তারা তাদের দাবিতে অনড়। দীর্ঘ আড়াই বছর তারা রাস্তায় রাস্তায় ঘুরছে, কখনো বা গারদের পিছনে। রাস্তা থেকে কবে রাজ্যের অভিভাবিকা তথা মাননীয়া তাদের বিদ্যালয়ে পাঠাবেন সেই আশায় তারা দিন গোনে। দিন যায়, মাস যায়, বছর যায় কিন্তু তাদের স্বপ্ন অধরাই থেকে যায়। সমাজ গড়ার কারিগররা, সমাজের কাছে প্রশ্ন রাখে, শিক্ষকতার স্বপ্ন দেখা কি তাদের অপরাধ?

সমাজের সর্বস্তরের মানুষের কাছে বঞ্চিত হবু শিক্ষকদের আবেদন আপনারা আমাদের লড়াইয়ে পাশে থাকুন। পরিশেষে তাই কবি জীবনানন্দ দাশের ভাষায় বলা যায় –

“মানুষ বড়ো কাঁদছে,
তুমি মানুষ হয়ে পাশে দাঁড়াও
মানুষ বড়ো একলা, তুমি তাহার পাশে এসে দাঁড়াও।”

- পিয়া, (আন্দোলনকারী, যুব-ছাত্র অধিকার মঞ্চ)

 power of BSF

সম্প্রতি ভারতের কেন্দ্রীয় সরকার সীমান্ত সুরক্ষিত করার জন্য কয়েকটি রাজ্যে বিএসএফ’এর ক্ষমতা ১৫ কিলোমিটার থেকে বাড়িয়ে ৫০ কিলোমিটার করেছে, তারমধ্যে পশ্চিমবাংলা অন্যতম। ইতিমধ্যে প্রশ্ন উঠে গেছে যুক্তরাষ্ট্রীয় কাঠামোয় এই ধরনের সিদ্ধান্ত কেন্দ্রীয় সরকার একতরফাভাবে করে ঠিক করেছে কি? বিজেপি এরাজ্যে নির্বাচনে পরাজিত হয়ে যাওয়ার পরে রাজ্যশাসনে কেন্দ্রীয় সরকারের আধিপত্য বিস্তার করবার জন্য কি এই কৌশলের সিদ্ধান্ত? প্রশ্ন যাই থাকুক, এরফলে রাজ্য সরকারগুলোর প্রশাসনিক ব্যবস্থা, জনগণের দ্বারা নির্বাচিত পঞ্চায়েত, পৌরসভাগুলো তাদের স্বাধীন সত্তা হারিয়ে যাবে না তো? এটাই এখন লাখ টাকার প্রশ্ন? সীমান্ত সুরক্ষিত থাকুক এটা ভারতের নাগরিক হিসেবে সকলেই চায়। পনেরো কিলোমিটারের অভিজ্ঞতা তো চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিচ্ছে ভয়ঙ্কর দৃশ্যগুলি।

সারা ভারত কিষাণ মহাসভার একজন কর্মী হিসেবে নদীয়া জেলার ভয়ঙ্কর একটা দৃশ্যের কথা আজও ভুলতে পারিনি। নদীয়া জেলার তেহট্ট থানার দেবনাথপুর গ্রামটি একদম বাংলাদেশ সীমানা লাগোয়া। এরকম বহু গ্রাম সীমান্ত লাগোয়া। এখানকার কৃষকরা তাদের চাষের বলদ সুরক্ষিত রাখার জন্য শাটার লাগানো পাকা ঘর ব্যবহার করে, আর নিজেরা টালি অথবা টিনের ঘরে বসবাস করেন। প্রায় সারা রাতে সজাগ থাকতে হয় কবে কখন তাদের গরু লুট করে নিয়ে যাবে! যদিও সীমান্তে বিএসএফ পাহারা দিয়ে চলেছে। ১৯৯১ সালের ১৭ মার্চ দেবনাথপুর গ্রামে অর্ধেক রাত্রে একজন কৃষকের দুটো বলদ শাটার খুলে জোর করে তুলে নিয়ে যাচ্ছে একদল দুষ্কৃতী। আততায়ীরা অস্ত্রে সজ্জিত তাই চিৎকার ছাড়া কৃষকের আর কিছুই করার নেই। ঘরের কাছেই বিএসএফ। কৃষকরা বিএসএফকে বলছে, সর্বনাশ হয়ে গেল আমার গরু নিয়ে যাচ্ছে, ওই দেখুন, আপনি ধরুন না হলে ওদের গুলি করুন। সীমান্তরক্ষী নিশ্চুপ, কিছুই করলেন না। এবার কৃষকের রাগ গিয়ে পরল ওই বিএসএফ’এর উপর। কৃষকরা ঘিরে ধরল, ধাক্কাধাক্কি দুই চড় চাপড় দিল সেই বিএসএফ’কে। তারপর কৃষকরা তাকে আটক করে থানার পুলিশকে জানাল, ব্লক উন্নয়ন আধিকারিককে জানাল। বিএসএফ’কে সুরক্ষিত রাখার জন্য ব্লক উন্নয়ন আধিকারিক পুলিশি ব্যবস্থা করলেন। খবর পেয়ে বিএসএফ ব্যাটেলিয়ানের পক্ষ থেকে এক গাড়ি বাহিনী এসে পাহারাদার থানার পুলিশকে লাথি মেরে সরিয়ে দিয়ে ঘর থেকে সেই বিএসএফ’কে উদ্ধার করল। তারপর পাকা রাস্তার পাশে বাজারের দোকানগুলোতে কেনাবেচা ব্যস্ত লোকজনকে অতর্কিতে নির্দ্বিধায় বিএসএফ’এর ব্যাটেলিয়ান গুলি চালায়। সঙ্গে সঙ্গে ১৭ জন কৃষক গ্রামবাসী মাটিতে লুটিয়ে পড়ে। তারমধ্যে ১১ জনের মৃত্যু হয়, ৬ জন গুরুতর আহত হয় হাসপাতালে ভর্তি হয়। খবর পেয়ে আশেপাশের গ্রাম থেকে অসংখ্য মানুষ ছুটি আসেন, প্রতিবাদে সামিল হয়ে রাস্তা অবরোধ করেন। অবশেষে জেলার পুলিশসুপার বাহিনী নিয়ে ঘটনা পরিদর্শন করেন। জনগণের দাবি ছিল হত্যাকারী বিএসএফ’এর শাস্তি চাই। নিহত ও আহত পরিবারগুলোকে ক্ষতিপূরণ দিতে হবে ইত্যাদি। পুলিশসুপার সমস্ত কিছু দেখে মর্মাহত হন। দায়িত্ব নিয়ে বিএসএফ ব্যাটেলিয়নের কর্মকর্তাকে ডাকেন। জনগণের সামনে অপরাধী বিএসএফের বিচার হবে, শাস্তি হবে, ক্ষতিপূরণ দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। পরে অপরাধীদের কি হল জনগণ জানেনা। তবে কয়েকটা পরিবারের যুবককে চাকরির ব্যবস্থা করা হয়েছিল বলে জানা যায়। এই ঘটনা শিক্ষা দেয় যারাই রক্ষক, তারাই ভক্ষক। আর রক্ষকদের বিচার করার ব্যবস্থা থাকলেও বিচার করা হবে না।

উত্তর ২৪ পরগণা জেলার বাগদা সীমান্ত এলাকা। বহু বছর আগের ঘটনা। বনগাঁ থেকে সীমান্ত পর্যন্ত বাস চলাচল করে। বিএসএফ সন্দেহজনক হলে বাসে খানাতল্লাশি করে। তল্লাশির সময় বিএসএফ’এর অমানবিক অসামাজিক আচরণগুলো অনেকের কাছেই খারাপ লাগে কিন্তু বলার উপায় নেই। একদিন একজন কৃষক বাসের মধ্যে বিএসএফ’এর এই ধরনের খানাতল্লাশির প্রতিবাদ জানালে তাকে বাস থেকে নামিয়ে সরাসরি বুকে রাইফেল দিয়ে গুলি করে হত্যা করে। তীব্র প্রতিবাদ হয়। রাজ্যের পুলিশ থানা থেকে আসে। অভিযোগ শুনে ব্যবস্থা নেওয়ার কথা বলে। প্রতিবাদী মানুষ সেই ভরসায় তাদের প্রতিবাদকে সেই সময়ের জন্য তুলে নেয়। অবশেষে কিছুই হয়নি। সবাই বলে দেশের সুরক্ষা বাহিনীর বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগই ধোপে টেঁকে না। কারণ তারা যা করেন তা দেশকে সুরক্ষিত রাখার জন্য! সুরক্ষার নামে দেশের সাধারণ নাগরিককে হত্যা করার অধিকার সংবিধানে নেই। অথচ ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দল ক্ষমতার স্বার্থে জনগণের সাংবিধানিক অধিকারকে জলাঞ্জলি দিতে কুণ্ঠাবোধ করে না। ৫০ কিলোমিটারের আইন যারা পাস করেছে তারা জনগণের সুরক্ষার নামে নিজেদের ক্ষমতার সুরক্ষা করবেন, সে কথা নির্দ্বিধায় মানুষ তাদের অভিজ্ঞতা থেকে বুঝতে পারছেন।

বিদেশে গরুর মাংস বিক্রি করার জন্য কয়েক বছর আগে বাংলাদেশে ভারতের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে এই বাংলার সীমানা দিয়ে গরু পাচার হতে দেখেছেন অনেকেই। ভারতের তাবড় তাবড় এই মাংস ব্যবসায়ীদের চোখে না দেখলেও, খবরের কাগজে তাদের নাম বেরিয়েছে। আধুনিক চাষে বলদ’এর ব্যবহার প্রায় উঠে গেছে। ঘাস বিচালি দিয়ে এই বলদ পুষে কৃষির এই দুর্দিনে কৃষকরা বাজারে বলদ বিক্রি করে দিচ্ছে। কিনছে সেই মাংস ব্যবসায়ী। উত্তরপ্রদেশ হরিয়ানা থেকে বড় বড় লরিতে গরু পাচার হয়েছে পশ্চিমবাংলার সমস্ত সীমান্ত এলাকা দিয়ে। এই গরু পাচারের ফলে সীমান্ত এলাকায় কৃষকের ফসল ধ্বংস করে দেওয়া হয়েছে। এই কাজে গ্রামীণ কৃষি মজুরদের ব্যবহার করা হতো। থানার পুলিশ, বিএসএফ উভয়ের নাকের ডগা দিয়ে একাজ হতো। এলাকায় এলাকায় কৃষকের প্রতিবাদ শুরু হয়েছে। দেখা গেছে কৃষকরা এই সমস্ত বলদ আটকে রেখে বিএসএফ’কে খবর দিয়েছে। বিএসএফ আটক করেছে। গ্রামের মানুষ আপাতত স্বস্তি পেল। কিন্তু সেই পাচার করা আটক বলদগুলো বিএসএফ’এর কাছ থেকে ছাড়া পেয়ে গন্তব্যস্থলে পৌঁছে গেছে। আমরা কৃষকসভার পক্ষ থেকে জেলাশাসক দপ্তরের কাছে অভিযোগ জানিয়েছি। তাদের বক্তব্য বিএসএফ সীমান্তে কেন আটকাচ্ছে না? সরূপনগর সীমান্তে গিয়ে দেখা গেছে কাঁটাতারের বেড়া প্রায় খানিকটা জায়গা থেকে উঠে গেছে। ওইখান দিয়ে গরু পাচার হয়। প্রতিবাদ করতে ভয় লাগে, যদি গুলি চালিয়ে হত্যা করে দেয় তাহলে কি হবে? এখানে সেই রক্ষক, ভক্ষক হিসাবে অবতীর্ণ হয়ে আছে। যত সমস্ত অপরাধী আছে তাদের সাথে এই রক্ষকদের গোপন আঁতাত আছে। একথা মানুষের মুখে মুখে ফেরে কিন্তু কোনো প্রমাণ নেই। গরু পাচারের এই ব্যবস্থাটাকে পাল্টানোর জন্য প্রকৃত বড় বড় ব্যবসায়ীদের কেন্দ্রীয় সরকার আজও গ্রেপ্তার করতে পারেনি তাদের বিচার হয়নি। অথচ সীমান্তে মজুর খাটা পাচারকারী সীমান্তরক্ষীর গুলিতে মারা গেছে।

সীমান্তে কাঁটাতারের বেড়ার ওপাশে চূড়ান্ত সীমান্তের মাঝে যে কৃষি জমি আছে সেখানে কৃষকের চাষ, কোথাও বসবাসের ছোট গ্রাম আছে। স্বাধীন ভারতের নাগরিক হয়েও অন্নদাতা এই কৃষকরা অর্ধেক স্বাধীনতা ভোগ করেন বললে ভুল হবে না। সীমান্তরক্ষীর কথায় উঠতে হয়, বসতে হয়।

সীমান্ত পার হয়ে ওপার থেকে শ্রমজীবী মানুষ বউ-বাচ্চা সঙ্গে নিয়ে কাজের তাগিদে বিনা পাসপোর্টে হাঁটাপথে কোথাও নদী পার হয়ে ভারতে কাজ করতে আসে। কখনো বিএসএফ সঠিকভাবে তাদের আটক করে আবার কোথাও কোথাও তারা উৎকোচ গ্রহণ করে ছেড়ে দেয়। এই ঘটনা শুধু যাবার বেলায় নয়, বছর ভর কাজ করে ফিরে এসে সীমান্ত পারে বিএসএফ’এর হাতে ধরা পড়ে আর জেলখানায় তাদের আস্তানা হয়। এক, দুই বছর জেল খেটে ছাড়া পেলেও তাদের দেশে ফেরা হয়না। মাসের পর মাস বছরের পর বছর কাটে তাদের বিনা কারণে জেলের গারদে। বিএসএফ তাদের পুশ ব্যাক করে দেওয়ার কাজটা ঠিকমতো করতে পারে না।

দেশের সংবিধান সম্মতভাবে আইনকে কার্যকরী রূপ দেওয়ার জন্য শুধুমাত্র বিএসএফ নয়, নির্বাচিত গ্রাম শহরের সংস্থাগুলো জনগণের কাছে দায়বদ্ধ, তেমনি থানার পুলিশ। কিন্তু বাস্তবে এই সুরক্ষা বাহিনী যেমন জনগণের চোখের মনি, তাই বলে সুরক্ষা বাহিনী সংবিধানের ঊর্ধ্বে, আইনের ঊর্ধ্বে হতে পারে না। আজকে মোদী সরকার ‘আইনের ঊর্ধ্বে’ এই ব্যবস্থাকে পাকাপোক্ত করে নিজের পরাজিত হবার ক্ষোভকে প্রশমিত করার জন্য করে ১৫ থেকে ৫০ কিলোমিটার করছেন কি?

- কৃষ্ণপদ প্রামানিক

Death of a veteran communist activist

গত ৯ নভেম্বর পুর্ব বর্ধমান জেলার মন্তেশ্বর ব্লকের আটাশপুর গ্রামে নিজের বাড়ীতে কমরেড তিনকড়ি ভট্টাচার্য প্রয়াত হন। মৃত্যুকালে বয়স হয়েছিল ৭৯ বছর। কিছুদিন থেকেই অসুস্থ ছিলেন। রেখে গেলেন স্ত্রী, দুই পুত্র ও পরিবারের অন্যান্য লোকজনদের। যুবক বয়স থেকেই কমিউনিস্ট আন্দোলনের সাথে যুক্ত হয়েছিলেন। তিনি ভাল স্টেনোগ্রাফার ছিলেন। চাকরি ছেড়ে গ্রামে কৃষক আন্দোলন সংগঠিত করার জন্য পুর্ব বর্ধমান জেলার মন্তেশ্বর ব্লকের গ্রামাঞ্চলে সর্বক্ষণের কর্মী হয়ে সংগঠন গড়ে তোলার কাজে আত্মনিয়োগ করেন। ১৯৭২ সালের শ্বেত সন্ত্রাস ও কংগ্রেসের মস্তানদের অত্যাচারে এলাকা ছাড়তে বাধ্য হন। আবার চাকরিতে যুক্ত হতে বাধ্য হন। ১৯৭৭ সালের পর আবার চাকরি ছেড়ে দিয়ে গ্রামাঞ্চলে পার্টির কাজে যুক্ত হন। সর্বক্ষণের কর্মী হয়ে মন্তেশ্বর ব্লকের কৃষকদের সংগঠিত করে আন্দোলনের নেতৃত্ব দিতে থাকেন। এলাকার কৃষক সভার ও পার্টির দায়িত্বশীল ভুমিকা পালন করতে থাকেন। মন্তেশ্বর পঞ্চায়েত সমিতির সহসভাপতি নির্বাচিত হন। কিন্ত অল্পদিনের মধ্যেই সিপিআই(এম) নেতাদের দুর্নীতি, দলবাজী ও আমলাতান্ত্রিক আচরণের প্রতিবাদ করতে গিয়েই ঐ দল ছাড়তে বাধ্য হন। ১৯৯৩ সালের করন্দার গণহত্যার পর বর্ধমান জেলাজুড়ে সিপিআই(এম) তথা বামফ্রন্টের বিরুদ্ধে ব্যাপক বাম-গণতান্ত্রিক মানুষের প্রতিবাদ বিক্ষোভের প্রভাবে কমরেড তিনকড়ি ভট্টাচার্য সিপিআই(এমএল) লিবারেশনের সাথে সম্পর্ক স্থাপন করেন এবং সদস্যপদ গ্রহণ করেন। তারপর থেকে মন্তেশ্বর ব্লকে পার্টির কাজে আত্মনিয়োগ করেন। সারা ভারত কিষাণ মহাসভার পুর্ব বর্ধমান জেলার সভাপতির দায়িত্ব নেন। পার্টির বিভিন্ন জেলা সম্মেলন ও রাজ্য সম্মেলনে প্রতিনিধিত্ব করেন। বয়সের ভারকে উপেক্ষা করেই মন্তেশ্বর বিধানসভার উপনির্বাচনের প্রচারে কমরেড অংশগ্রহণ করেছেন। এইভাবে জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত পার্টির সদস্য ছিলেন এবং লাল পতাকাকে উর্দ্ধে তুলে ধরে রাখতেন। পার্টির পুর্ব বর্ধমান জেলা কমিটি কমরেড তিনকড়ি ভট্টাচার্যের মৃত্যুতে শোক জ্ঞাপন করেছে এবং তাঁর পরিবারের সদস্যদের ও শুভানুধ্যায়ীদের প্রতি সমবেদনা জানাচ্ছে। এই আজীবন বামপন্থী কর্মীর সংগ্রামী জীবন থেকে শিক্ষা নিয়ে ফ্যাসিবাদের মোকাবিলায় সমস্ত কমরেডদের লাল পতাকাকে ঊর্ধ্বে তুলে এগিয়ে যাওয়ার আহ্বান রাখছে। কমরেড তিনকড়ি ভট্টাচার্য লালসেলাম। তাঁর স্মৃতি অবিনশ্বর হোক।

খণ্ড-28
সংখ্যা-40
18-11-2021