Ajker Deshabrati
Deshabrati HeadingModi's visit to Bangladesh is the beginning of a new unrestModi's visit to Bangladesh

বাংলাদেশের স্বাধীনতার স্বর্ণজয়ন্তী উদযাপিত হতে চলেছিল। দুর্ভাগ্যবশত, নরেন্দ্র মোদীর বাংলাদেশ যাত্রার সময়েই বাংলাদেশে বহু হত্যা, রক্তক্ষয়, দমন ও হিংসার ঘটনা ঘটে গেছে। বাংলাদেশের মুক্তিতে ভারতের ভূমিকার কথা মাথায় রাখলে, ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীকে এই অনুষ্ঠানে ডাকা খুব স্বাভাবিক। কিন্তু এখন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী এবং বাংলাদেশের নাগরিকদের একটি বড় অংশ মোদীর এই সফর, উপরন্তু এরকম অনুষ্ঠানে মোদীর আগমন নিয়ে কেন অস্বস্তিতে পড়েছেন তা সহজেই বোঝা যায়।

বাংলাদেশে এই নিয়ে বিক্ষোভ তৈরি হওয়াও খুব স্বাভাবিক।

বাংলাদেশের স্বৈরাচারী সরকার এবং তাদের অনুদানপ্রাপ্ত ও দোসর সংগঠনগুলি এই বিক্ষোভ দমনের চেষ্টা করেছে এবং বিক্ষোভ প্রদর্শনকারীদের ওপর হামলা করেছে। মোদীর আগমন এবং হাসিনা সরকারের দমনের প্রতিক্রিয়াস্বরূপ কিছু সংগঠন বাংলাদেশে হিন্দুদের এবং হিন্দু সংগঠনের ওপর হামলা করেছে। এই ঘটনার নিঃশর্ত নিন্দা করতে হবে। বাংলাদেশের হিন্দুদের মোদী সরকার, আরএসএস-বিজেপির সাম্প্রদায়িক রাজনীতি এবং শেখ হাসিনা সরকারের এই দমনপীড়নের সাথে কোন যোগাযোগ নেই। আমরা আশা করি বাংলাদেশের সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি ও শান্তিপ্রিয় আমজনতা এই মৌলবাদী আক্রমণের ওপরে উঠতে পারবে এবং স্বাধীনতার শতবর্ষের এই গৌরবময় অনুষ্ঠানকে কালিমালিপ্ত হতে দেবে না।

মোদী-বিরোধী বিক্ষোভকে সমগ্রভাবে ভারত-বিরোধী মনোভাব হিসেবে ধরে নিলে ভুল হবে। মোদী একেবারেই ভারতের সাথে সমার্থক নয়, এবং মোদী-বিরোধী বিক্ষোভ আজকের দিনে ট্রাম্পসহ পৃথিবীর অন্য সব স্বৈরাচারী সরকারের বিরুদ্ধে বিক্ষোভের মতোই সর্বব্যাপী। গুজরাটে ২০০২ সালের গণহত্যার পর থেকেই গুজরাটের মুখ্যমন্ত্রী ও পরবর্তীতে ভারতের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে মোদীর ভাবমূর্তি ও তার ট্র্যাক রেকর্ডই বিশ্বব্যাপী এই সব বিক্ষোভের কারণ। ২০১৪ সালে প্রধানমন্ত্রী হওয়ার আগে অবধি বহু দেশ তাকে ভিসা দিত না। এখনও তার প্রায় প্রত্যেক বিদেশ সফরেই তাকে বিক্ষোভ দিয়ে স্বাগত জানানো হয় এবং এই বিক্ষোভে অংশগ্রহণ করেন সেই সব দেশের ভারতীয় বংশোদ্ভূত বহু নাগরিক। ভারতের মধ্যেও মূলত উত্তর ও পশ্চিমের বাইরে পাড়ি দিলে বেশিরভাগ রাজ্যেই তাকে বিক্ষোভের মুখে পড়তে হয়। ‘মোদী ফেরত যাও’ বিভিন্ন ভাষায় ট্যুইটারে ট্রেন্ড হওয়ার ঘটনাও খুব সাধারণ।

মোদীর বাংলাদেশ সফর মনোযোগ পেয়েছে তার বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে ১৯৭১-এর সত্যাগ্রহে অংশ নেওয়ার দাবির জন্য। এই দাবি শুনে মনে হয় মোদী তার নিজের প্রথম সত্যাগ্রহ ও গ্রেপ্তারের স্বর্ণজয়ন্তী পালন করতেই বাংলাদেশ গেছিলেন। বেশিরভাগ মানুষই এই দাবিকে আরও একটি জুমলা বলে মেনে নিলেও কিছু মানুষ পুরোন রেকর্ডঘেঁটে বের করেছেন সত্যিই বিজেপির পূর্বসূরী ভারতীয় জনসংঘ ১ থেকে ১২ অগাস্ট একটি সত্যাগ্রহের প্রচার চালায় এবং যা পরে দিল্লীতে একটি মিছিলে পর্যবসিত হয়। মোদী নব্য জনসংঘ কর্মী হিসেবে এই সত্যাগ্রহে অংশগ্রহণ করে থাকতে পারেন, কিন্তু তিনি যাকে ‘গ্রেপ্তার’ বলছেন তা নিছকই ‘জেল ভরো’ বই কিছু নয়।

এক্ষেত্রে মনোযোগ আকর্ষণের প্রধান জায়গা এই সত্যাগ্রহের পেছনে জনসংঘের প্রেরণা যা ভারতের সাথে সোভিয়েত ইউনিয়নের বন্ধুত্ব চুক্তি স্বাক্ষরের অনুরূপ। এটা ভারতের তার আগে অবধি নিরপেক্ষতা নীতির সাথে সম্পূর্ণভাবে পরিপন্থী এবং বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে কূটনৈতিক ও সামরিক সমর্থনের প্রধান পদক্ষেপ, যা পরবর্তীতে এই মুক্তিযুদ্ধে ভারতের সরাসরি হস্তক্ষেপ হয়ে দাঁড়ায়। আরএসএস-বিজেপির এই প্রচার এই চুক্তির বিরোধ করে এবং এই চুক্তিকে ভারতের বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দেওয়ার ও পাকিস্তানের বিরূদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করার কাজে দেরি হিসেবে দেখে। আরএসএস-এর বাতলে দেওয়া পথে চললে সোজা আমেরিকার জালে পড়তে হত এবং তাতে বাংলাদেশের মুক্তির রাস্তা আরও কঠিন হত। আরএসএস-এর অবশ্যই বাংলাদেশ মুক্তিযুদ্ধের ধর্মনিরপেক্ষ, প্রগতিশীল ও সমাজতান্ত্রিক প্রকৃতির ওপর কোন আদর্শগত ভালোবাসা ছিল না।

Modi visit to Bangladesh

 

মোদীর এই ঘটনা উল্লেখ করা জরুরি কারণ তার এই সফর ও বাংলাদেশের সীমান্তের দুই রাজ্য - পশ্চিমবঙ্গ ও আসামে নির্বাচনের সময়কাল একই। মতুয়া সম্প্রদায়ের মুখ্য পুণ্যভূমি এবং মতুয়া আন্দোলনের প্রবর্তক হরিচাঁদ ঠাকুরের জন্মস্থান সাতক্ষীরার যশোরেশ্বরী কালী মন্দির ও গোপালগঞ্জ জেলার ওরাকান্দী ঠাকুরবাড়িও তার ভ্রমণসূচীতে ছিল। তার সাথে ছিলেন মতুয়া সম্প্রদায়ের কেন্দ্রীয় মন্ত্রী শান্তনু ঠাকুর এবং পশ্চিমবঙ্গের মতুয়া মহাসঙ্ঘের কর্মীরা। ওরাকান্দী তীর্থ ঘুরে মোদী ভারত ও বাংলাদেশের মতুয়া সম্প্রদায়ের জন্য বিশেষ ঘোষণা করেন। এই কাজ আদর্শ আচরণবিধিকে পুরোপুরি উল্লঙ্ঘন করে এবং এর মাধ্যমে বিদেশ সফরের জঘন্য ফায়দা তুলে দেশের ভোটারদের বিভ্রান্ত করা হয়।

মতুয়া-আন্দোলন উনবিংশ শতকের জাতপাত বিরোধী আন্দোলন যা অবিভক্ত বাংলার দলিত মানুষদের এক অংশের মধ্যে জনপ্রিয় হয়েছিল। হরিচাঁদ ঠাকুরের প্রণীত এবং তার ছেলে গুরুচাঁদ ঠাকুরের হাতে বেড়ে ওঠা এই আন্দোলন শিক্ষায় মনোনিবেশ, সামাজিক সাম্য, মহিলা অধিকারের প্রেক্ষিতে মহারাষ্ট্রে ফুলে ও আম্বেদকরের নেতৃত্বে বেড়ে ওঠা জাতি-বিরোধী আন্দোলনের মতোই ছিল। দেশভাগের পরে মতুয়া আন্দোলনের বিশেষ অনুগামী নমশূদ্র সম্প্রাদায়ের একটি বড় অংশ পশ্চিমবঙ্গে এসে উত্তর চব্বিশ পরগণায় ঠাকুরনগর নামে একটি কেন্দ্রের পত্তন করে। আজকে সঙ্ঘ-বিজেপির প্রতিষ্ঠান মতুয়া আন্দোলনের সাম্যবাদী চরিত্রকে খর্ব করে তাদের নিজেদের সামাজিক স্থিতি ও হিন্দুপ্রধান জাতীয়তাবাদের আদর্শে পরিণত করতে চায়। এই সম্প্রদায়ের স্বাধীনতা পরবর্তী নিরাপত্তাহীনতাকে কাজে লাগিয়ে ও তাদের নাগরিকতার প্রশ্নে প্রতারণা করে বিজেপি এই জাতিবিরোধী সাম্যবাদী আন্দোলনের মূল রূপকেই নষ্ট করতে চায়।

এই সফরের দ্বিপাক্ষিক আলোচনা ও উদ্যোগ বিষয়ে দুই দেশের পক্ষে স্থির হয় যে “স্বাধীনতা সড়ক” নামে একটি রাস্তা তৈরি হবে এবং ঢাকা ও জলপাইগুড়ির মধ্যে দুই দেশের তৃতীয় রেললাইন চালু হবে। কিন্তু দুই প্রতিবেশী দেশের জলের বণ্টনের অমীমাংসিত প্রশ্ন এই সফরে অবিবেচ্যই থেকেছে।

ইতিহাসের এক অদ্ভুত পরিহাসে, ১৯৭১ সালের ৬ ডিসেম্বর, যেদিন ভারত বাংলাদেশকে আনুষ্ঠানিকভাবে স্বাধীন গণতন্ত্র হিসেবে স্বীকার করেছিল, সেদিনের স্মৃতিতে এই দুই দেশ ডিসেম্বরের ৬ তারিখকে মৈত্রী দিবস হিসেবে পালন করার সিদ্ধান্ত নেয়। ঠিক একুশ বছর পরে, ১৯৯২ সালের ৬ই ডিসেম্বর, সঙ্ঘের কর্মীরা ভারতের বহুমুখী পরম্পরা ও নব্য সাংবিধানিক আইনকে সম্পূর্ণ অগ্রাহ্য করে প্রকাশ্য দিবালোকে বাবরি মসজিদ ধ্বংস করে এবং ভারতের সাম্প্রদায়িক পরিবেশ ও দুই দেশের মধ্যে মৈত্রীকে শেষ করে দেয়।

মোদীর বাংলাদেশ সফর সেখানে এক নতুন অশান্তির সূচনা করেছে এবং যার ভয়ানক প্রভাব পড়বে তার নিকট প্রতিবেশী দুই রাজ্য, পশ্চিমবঙ্গ ও আসামের আসন্ন নির্বাচনে। ভারত ও বাংলাদেশের শান্তি ও গনতন্ত্রপ্রিয় মানুষকে চূড়ান্ত পরিণত ও সংযতভাবে মোদীর রাজনৈতিক উদ্দেশ্য প্রণোদিত এই বাংলাদেশ সফরের আগামী ঘটনাগুলিকে প্রতিহত করতে হবে।

(এম এল আপডেট, সম্পাদকীয়) 

Cpiml's Election Campaign in NadiaCPI (ML) fights in Nadia district

মোদী সরকার সারের দাম লাগাতার বাড়িয়ে চলেছে। ডিজেলের উপর দফায় দফায় ট্যাক্স চাপিয়ে দিচ্ছে। অথচ চাষিরা ফসলের ন্যায্য দাম পাচ্ছে না, বাজারে নিত্য প্রয়োজনীয় জিনিসের দাম আগুন। এই বিজেপি সোনার বাংলা গড়বে? আসলে রকমারী স্লোগানের চমক দিয়ে ওরা মানুষকে ধাপ্পা দিচ্ছে। পাশাপাশি অবস্থিত লাগোয়া দুটি ব্লক তথা বিধানসভা ধুবুলিয়া (কৃষ্ণনগর দক্ষিণ) ও নাকাশীপাড়ার গ্রামে গ্রামে চাষিরা প্রবল ক্ষোভের সাথে কৃষি-সংকটের এই বাস্তব চিত্র তুলে ধরছেন। এই দুটি বিধানসভায় সিপিআই(এমএল) নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছে। এখানকার গ্রামাঞ্চলে দেখা গেলো অনেকের ঘরে ধান রয়েছে, কিন্তু হাতে পয়সা নেই, চাষের জন্য প্রয়োজনীয় পুঁজি নেই। অথচ অসহায় হয়ে ক্ষেতের ফসল অত্যন্ত কম দামে বিক্রি করা ছাড়া কোনো উপায় নেই। কেন্দ্রের নয়া কৃষি আইনের কথা তারা জানেন। দিল্লীর কৃষক আন্দোলনের খবরও গ্রামীণ মানুষের কাছে রয়েছে। এ রাজ্যে সরকারী সহায়ক মূল্য থেকে কৃষকরা বঞ্চিত, কিন্তু মোদী সরকার যে কৃষকের স্বাধীনতা কেড়ে নিতে চাইছে, কোম্পানির হাতে কৃষি বাজার তুলে দিলে চাষির কোনোরকম লাভই হবে না, এ বিষয়ে চাষিরা প্রবল ভাবেই সোচ্চার। নির্বাচনের মুখে দাঁড়িয়ে মোদী অমিত শাহ বড় গলা করে বলেছিলো যে কেন্দ্রীয় প্রকল্পে কৃষকদের নগদ আর্থিক সহায়তা দেবে। ব্লকে ব্লকে প্রচুর দরখাস্ত জমাও পড়লো। কিন্তু দেখা গেলো সেটা চরম ধাপ্পা। কৃষকের প্রাপ্য অধিকার কেড়ে নিয়ে রুটির টুকরো ছুঁড়ে দেওয়ার সেই প্রতিশ্রুতিও মোদী সরকার পালন করলো না। কৃষক ও কৃষিমজুর পরিবারের যে হাজারে হাজারে যুবকেরা লকডাউনে কাজ হারিয়ে ঘরে ফিরে এসেছে গ্রামে, তারা নিজেদের জীবনের সেই ভয়াবহ অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরছেন। কেন্দ্রীয় সরকার তাদের পাশে দাঁড়ায়নি। কোন রকম সহায়তা করেনি, বরং বিপুল আর্থিক বোঝা চাপিয়ে দিয়েছে। অনেকেই কাজ হারিয়ে ঘরে ফিরে এসে এখানে খুবই কঠিন সংকটের মধ্যে রয়েছেন, বহু সংখ্যক কাজে ফিরে গেলেও তাঁদের মজুরি কমে গেছে।

বিস্তীর্ণ গ্রাম গঞ্জে কৃষির বাইরে রয়েছে বিশাল পরিমাণ অসংগঠিত শ্রমজীবী মানুষ। নানান মেহনতি পেশায় থাকা এই মানুষেরা চরম দূরবস্থার মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন। স্থায়ী কাজ, ন্যায্য মজুরি বা সামাজিক নিরাপত্তার কোনো সরকারী ব্যাবস্থাই তাদের জন্য নেই। আছে কেবল শুকনো প্রতিশ্রুতি, হেন করেঙ্গা তেন করেঙ্গা সরকারী বোলচাল। কেন্দ্র ১০০ দিনের কাজের বরাদ্দ টাকা কমিয়ে দিয়ে কাজের জায়গাটাকেই বিলোপ করে দিতে চাইছে। অথচ গরিব মানুষের মধ্যে ধর্মের নামে বিভেদ বিভাজন সৃষ্টি করতে বিজেপি জঘন্যতম মিথ্যা প্রচারের বন্যা বইয়ে দিচ্ছে। রাস্তা ঘাটে চা দোকানে অপপ্রচারে ওরা প্রবল সোচ্চার, বাংলা নাকি পাকিস্তান হয়ে যাবে, সংখ্যালঘুদের তোষণ করে তাদের নাকি সমস্ত সুযোগ সুবিধা পাইয়ে দেওয়া হয়েছে, এনআরসি করে এদের তাড়িয়ে দিলেই নাকি উন্নয়ন আর বিকাশ হয়ে যাবে। এ ধরনের মিথ্যা গল্প ছড়িয়ে মানুষের মধ্যে ওরা অন্ধবিশ্বাস সৃষ্টি করতে চাইছে। বিজেপির পেছনে রয়েছে আরএসএস। উপর থেকে চোখে দেখা না গেলেও ওরা গোপন নেটওয়ার্ক গড়ে তুলে বিজেপি কর্মীদের ভরসা যোগাচ্ছে যে ওরা পেছনে আছে, ভয় নেই, বিদ্বেষ ও ঘৃণা ছড়িয়ে যাও, প্রয়োজনে দাঙ্গা করতে হবে, আমরা পেছনে আছি। সদ্য বিজেপিতে যোগ দেওয়া মানুষদের সাথে আলাপচারিতায় এইসব খবর উঠে আসছে। ওপার বাংলা থেকে আগত মানুষের মধ্যে ওরা বিভেদ বিভাজনের বিষাক্ত হাওয়া ছড়িয়ে দিতে চাইছে, কিন্তু এনআরসি তাদের মধ্যে আশঙ্কার এক বাতাবরণ সৃস্টি করেছে। এই দুটি দিকের টানাপোড়েনের মধ্যে বিজেপির আগ্রাসনের মুখে তৃণমূলের সংগঠন রয়েছে খুবই রক্ষণাত্মক অবস্থানে। তারা কেবল সরকারী প্রকল্পের জয়গান গেয়ে কেল্লা ফতে করতে চাইছে। কিন্তু বাস্তব অভিজ্ঞতায় মানুষ দেখছেন, যতটুকু ছিটে ফোঁটা সরকারী সুযোগ সুবিধা স্বল্প সংখ্যক মানুষেরা পেয়েছে, অপ্রাপ্তি জনিত বঞ্চনার দিকটা তার থেকে অনেকগুন বেশি। উল্টে দুর্নীতি দলবাজি, দাদাগিরি বিজেপিকে সুবিধা করে দিচ্ছে। তাই বিজেপির ফ্যাসিস্ট হামলাকে মোকাবিলা করতে পারবে একমাত্র সংগ্রামী বামপন্থা — এই প্রচারকে জোরের সাথে তুলে ধরে সিপিআই(এমএল), ধুবুলিয়া (কৃষ্ণনগর দক্ষিণ) ও নাকাশীপাড়া কেন্দ্রে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছে।

এই এলাকায় বিগত দিনে যে আন্দোলনগুলি সিপিআই(এমএল) করেছে সেগুলিকেই প্রচারে সামনে নিয়ে আসা হচ্ছে। যেমন বিস্তীর্ণ এলাকায় জমির অধিকারের জন্য তথা খাস জমি দখলের আন্দোলন, বাস্তু জমি দখল করে বেশ কিছু সংখ্যক কলোনী স্থাপন, কৃষকদের নানাবিধ দাবিতে আন্দোলন যথা সরকারী দরে ফসল ক্রয় ইস্যুতে ব্লকে ব্লকে বিক্ষোভ, পথ অবরোধ, ১০০ দিনের কাজের দাবিতে লাগাতার আন্দোলন চালিয়ে যাওয়া, আমফান দূর্নীতির বিরুদ্ধে আন্দোলন করে বিজেপি ও তৃণমূল নেতাদের অন্যায়ভাবে আত্মসাৎ করা টাকা ফেরত দিতে বাধ্য করা, লকডাউনের সময়কালে রেশনের দাবিতে এবং পরিযায়ী শ্রমিকদের ন্যায্য পাওনার দাবিতে আন্দোলন প্রভৃতি। সর্বোপরি এনআরসি-র বিরুদ্ধে সংগঠন বহির্ভূত ব্যাপক মানুষকে সংগঠিত করে প্রতিরোধের বলিষ্ঠ কর্মসূচী, বড় বড় মিছিল, পথ অবরোধ, কুশপুতুল দাহ, “আমরা কাগজ দেখাবো না” এ ধরনের আক্রমণাত্মক প্রচার জনমানসে লড়াকু মেজাজ সৃস্টি করেছিলো। নির্বাচনী প্রচারে সেই দিকটাকেই সামনে নিয়ে আসা হচ্ছে। বিজেপিকে রুখতে নিজ নিজ কাজের অঞ্চলে প্রতিরোধের এলাকা গড়ে তোলা ও সংগ্রামী শক্তির বিকাশ ঘটানো – এই প্রত্যয় জাগিয়ে তুলে চলছে নির্বাচনী প্রচার। দেওয়াল লিখনের কাজ শেষ করে বেশ কিছু এলাকায় প্রার্থী সহ বাড়ি বাড়ি যাওয়া/ পাড়া/ গ্রাম পরিক্রমা শুরু হয়েছে। গত ৩০ মার্চমনোনয়ন পত্র জমা দিয়েছেন কৃষ্ণনগর(দঃ) ও নাকাশীপাড়া কেন্দ্রের প্রার্থী যথাক্রমে সন্তু ভট্টাচার্য ও কৃষ্ণপদ প্রামানিক। ঐ দিন কৃষ্ণনগর সদর মোড় থেকে এক মিছিল জেলা শাসকের দপ্তরে আসে। লাল পতাকায় সুসজ্জিত এই উদ্দীপনাময় মিছিলের সামনে থেকে পথ পরিক্রমা করে প্রার্থীরা মনোনয়নপত্র জমা দেন।

No Vote to BJpLet the resolve become Brahmastra

বিজেপিকে ক্ষমতায় আনলে তবেই আসবে ‘আসল পরিবর্তন’ — এই প্রচারে জনমত ভাসাতে মরীয়া মোদী-শাহদের দল। প্রবল অর্থবল সহযোগে রোড-শো, সভা-সমাবেশ, নিজেদের দ্বারা নিজেদের জন্য পুস্পবৃষ্টি, রাশি রাশি প্রচারপত্র-ইস্তাহার বিলোনো, ডিজিটাল ও মিডিয়ার ব্যাপক প্রচার, এই সবকিছুর দৌলতে একটা বিশাল কিছু করে দেখানোর ছাপ ফেলতে অতি সক্রিয় বিজেপি। এটা সার বিষয় যে, বিজেপি এরাজ্যে ছোট থেকে বড় হতে পেরেছে কোনো আন্দোলন করে নয়। হিন্দুত্বের এক আভ্যন্তরীণ চাপা উৎসে রাম রাজনীতির বাহ্যিক প্রভাবে এক ধীর বৃদ্ধির গতিধারা এখানে তার ছিল। বিগত লোকসভা নির্বাচনে পেয়ে যায় ৩০ শতাংশ বাম ভোট, আর এবারের নির্বাচনে জুটেছে তৃণমূল ভাঙা ডাকাবুকো একটা অংশ, এই তৃণমূল ছুট অংশের ভোট-প্রভাব ঠিক কতটা তা বুঝে ওঠা এখনই সম্ভব নয়। দলটা দুই ভিন্ন নির্বাচনী পরিস্থিতিতে দুই উপর্যুপরি সুযোগে ফায়দা তুলেছে। আর এখন বড় বাড়তে চাইছে ‘গণতন্ত্র ও উন্নয়ন পুনরুদ্ধারের’ হাতছানি আর ‘এক পার্টি’ ও ‘ডবল ইঞ্জিন সরকারের’ বোলচাল দিয়ে। এসব করে উঠতে না পারলে বিজেপির এতটা বেড়ে ওঠা সম্ভব ছিল না। যতই ফুলে ফেঁপে উঠুক মাত্র পাঁচ বছরে পাওয়া ভোট এখনও তার নিশ্চিত ভোট নয়। এখনও এই ভোটের ব্যাপক অংশে দোলাচল ভাসমান ভাব থাকবে। অতএব, যথোচিত প্রধান প্রতিপক্ষের গুরুত্ব দিয়ে বিজেপির উন্মোচন ও বিরোধিতা চালিয়ে যাওয়া প্রয়োজন। তার সাথে দরকার মানুষের জীবন-জীবিকার আন্দোলনের ঘটনাপ্রবাহকে তুলে ধরা। তাহলে তার পায়ের তলা থেকে আলগা মাটি সরিয়ে দেওয়া সম্ভব। আর এভাবে যেমন বাম শক্তি যেমন পারদর্শী হতে পারবে বাম সমর্থনের পরিধির বিস্তার ঘটাতে, তেমনি খোয়ানো বাম ভোট ফিরে আসতে পারে বাম পরিসরে। বৃহত্তর গণতান্ত্রিক ও প্রগতিশীল শক্তিগুলোও নতুন করে প্রকৃত বাম দিশায় আকর্ষিত হতে পারে। পরিস্থিতি যেমন বিজেপির দিক থেকে আগ্রাসন ধেয়ে আসার নিরীখে আগের যে কোনো সময়ের চেয়ে অনেক বেশি প্রতিকূল, তেমনি বিজেপিকে হারানোর মাধ্যমে তার থাবা থেকে বাংলাকে বাঁচানোর আহ্বানও সাড়া পাচ্ছে।

প্রচারের শেষ বেলায় পৌঁছে কর্মসংস্থান প্রশ্নে জেরবার বিজেপির চাণক্য নেতা অমিত শাহ অগত্যা বলছেন, বাংলায় ক্ষমতায় এলে রাজ্যের পাটশিল্পের পুনরুজ্জীবন ঘটানো হবে, তার জন্য নাকি আড়াই হাজার কোটিটাকা বরাদ্দের কথা ‘সংকল্প পত্রে’ রাখা হয়েছে! তাছাড়া শিল্প পার্ক, খাদ্য প্রক্রিয়াকরণ শিল্প, হিমঘর তৈরি, কৃষিসংস্কার হবে। কিন্তু এযাবত এসব প্রয়াস কেন চালানো হয়নি বা হবেই যে তার নিশ্চয়তা কি, সেইসব প্রশ্নে শাহজী আর কথা বাড়ানোয় নেই। দাবি করছেন বছরে এক-দু কোটি হাতে নতুন রোজগারের অবস্থা তৈরি হবে। তবে রোজগার মানে কোনো চাকরি নয়। মানে স্থায়ী কোনো কর্মসংস্থান হবে না। ফের সেই বছরে দু’কোটি বেকারের হাতে চাকরির ভাঙা রেকর্ডের বদলে এবার শোনানো হচ্ছে অস্থায়ী রোজগারের নতুন প্রতিশ্রুতি। শাহজী আরও শুনিয়েছেন ‘ল্যান্ড ব্যাঙ্ক’ গঠন করা হবে ‘কৃষক-কর্পোরেট-জেলাশাসক মিলে। তার মানে ‘শিল্পের নামে’ আবার হাত পড়বে কৃষি জমিতে, তার জন্য ‘কৃষক প্রতিনিধি’ হিসাবে রাখা হবে কিছু অনুগত লোকজনকে, যারা অন্যায় জমি গ্রাসের ওপর ‘সম্মতির সীলমোহর’ লাগাতে সহায়ক হবেন, ঠিক যেমন কৃষক বিরোধী তিনটি আইনের স্বীকৃতি আদায়ে অনুগত কৃষক নেতাদের ব্যবহার করা হয়েছে। রাজ্যে হাজার হাজার একর পরিত্যক্ত জমি রয়েছে বছরের পর বছর বন্ধ হয়ে থাকা কলকারখানার। এইসব জমিতে শিল্পের পুনরুজ্জীবনের নির্দিষ্ট ভাবনা থাকছে না কেন? জমি জট থাকতে পারে। সদিচ্ছা থাকলে জরুরি পদক্ষেপ করে সেইসমস্ত জটজটিলতা দূর করা যায়, কিন্তু হচ্ছে না কেন? কারণ, মোদী সরকার আর বিজেপির কাছে অনেকবেশী তাড়নার বিষয় হল, তথাকথিত বাংলাদেশী অনুপ্রবেশ এবং তৃণমূল সরকারের ‘সংখ্যালঘু তোষণ’-এর সমস্যা! এহেন নন-ইস্যুকে ‘ইস্যু’ বানানোটা উন্মাদনা সৃষ্টির রাজনৈতিক স্বার্থসিদ্ধির উদ্দেশ্যেই। তার জন্য বিজেপি অহেতুক জিগির তুলতে পারে সিএএ নিয়ে, নাগরিকত্ব প্রদানের আইন সংশোধন ও রূপায়ণ নিয়ে। কিন্তু কর্মসংস্থানের প্রশ্নে তাদের কোন সত্যিকারের মাথাব্যথা নেই, স্বচ্ছ অবস্থান নেই, শোনানো হচ্ছে কেবল ক্ষমতায় এলে ‘ল্যান্ড ব্যাঙ্ক’ তৈরির গল্প। এখানে ‘ডবল ইঞ্জিনে’র সরকার আনলে শাহজী বলছেন, গঠন করবেন সরকারি কর্মচারিদের জন্য সপ্তম বেতন কমিশন। অন্যদিকে মানুষের কাছে ধরা পড়ে যাচ্ছে সেই চাতুরি। পার্শ্ববর্তী রাজ্য ত্রিপুরায় বিজেপি সরকার ইতিমধ্যেই ঘোষণা করেছে সরকারি কর্মচারিদের পেনশন তুলে দেওয়ার প্রাথমিক লক্ষ্যমাত্রা। বোঝার অপেক্ষায় রাখছে না, বিজেপি শাসনে এসবই হল ‘আসল পরিবর্তন’! বাংলাকে মুঠোয় আনতে পারলে এসবই করবে। তাই পক্ষান্তরে, এই বিজেপিকে বাংলায় প্রতিহত করতে যা প্রয়োজন তা করতে হবেই। কথায় আছে, নির্ভুল বিচার বিশ্লেষণ থেকে জন্ম নেয় নির্ভুল প্রত্যয়, আর নির্ভুল প্রত্যয় থেকে তৈরি হয় টানটান সচেতন সংকল্প। বিজেপির বিরুদ্ধে এটাই হয়ে উঠুক ব্রহ্মাস্ত্র।

Golden Jubilee of Bangladesh's IndependenceBangladesh's Independence

ভারতের পূবের প্রতিবেশী বাংলাদেশ তার স্বাধীনতার সুবর্ণ জয়ন্তী উদযাপন করবে ২০২১-এর ২৬ মার্চ। এই সুবর্ণ জয়ন্তীর বছরই আবার বঙ্গবন্ধু সেখ মুজিবুর রহমানের জন্ম শতবার্ষিকীর বছর। সেখ মুজিবুর ছিলেন বাংলাদেশ মুক্তি যুদ্ধের নেতা এবং বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠাতা প্রেসিডেন্ট, যে রাষ্ট্রটি ১৯৭১ সালে পাকিস্তান থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যেতে সফল হয়। ১৯৪৭ সালের আগস্ট মাসে পূর্ব পাকিস্তান নাম নিয়ে ভারত থেকে আলাদা হয়ে যাওয়ার পর পাকিস্তান থেকে নতুন রাষ্ট্রটার স্বাধীনতা অর্জনে সময় লাগে ২৫ বছরেরও কম। কেননা, ভাষাগত, সাংস্কৃতিক ও ভৌগলিক বন্ধন ধর্ম এবং রাষ্ট্র নিরূপিত জাতীয়তাবাদের চেয়ে বেশি শক্তিশালী বলে প্রতিপন্ন হয়। পূর্ব পাকিস্তানের জনগণের মাতৃভাষা রূপে বাংলা ভাষার অধিকারকে কেন্দ্র করে ১৯৫২ সালে যে লড়াই শুরু হয় সেটাই দু’দশকের মধ্যে পূর্ণমাত্রার জাতীয় মুক্তি সংগ্ৰামে বিকাশ লাভ করে। এরই পরিণতিতে চাপিয়ে দেওয়া পাকিস্তান জাতিরাষ্ট্রের বাহ্য রূপকে ছুঁড়ে ফেলে বাংলাদেশ জাতিরাষ্ট্রের আত্মপ্রকাশ ঘটে। বাংলাদেশের আত্মপ্রকাশ জাতীয় পরিচিতি গঠনের ক্ষেত্রে ভাষার কেন্দ্রীয়তাকে প্রতিপাদন করে এবং জাতীয় মুক্তিসংগ্রামের ধারার কাছে এক প্রেরণা সঞ্চারী শিক্ষা হয়ে রয়েছে।

গত পাঁচ দশকে আন্তর্জাতিক বাতাবরণে অবশ্য আমূল পরিবর্তন ঘটে গেছে। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ শুধু ভারতের রণনৈতিক সমর্থনই লাভ করেনি, পেয়েছিল সোভিয়েত ইউনিয়নেরও সমর্থন, যে রাষ্ট্রটি আমেরিকার সামরিক হস্তক্ষেপের আশঙ্কাকে সফলভাবেই নাকচ করেছিল। সেই সময়টা ছিল ভিয়েতনাম যুদ্ধ এবং পৃথিবীর নানা অংশে জাতীয় মুক্তি সংগ্ৰাম ও বিপ্লবী জোয়ারের যুগ। নতুন দেশটা নিজের জন্য যে অভিমুখ বেছে নিল তারমধ্যে এই বাতাবরণের মতাদর্শগত ছাপ সুস্পষ্ট রূপে দেখা গেল – সমাজতন্ত্র, জাতীয়তাবাদ, ধর্মনিরপেক্ষতা ও গণতন্ত্র। কিন্তু সদ্য জন্ম নেওয়া প্রজাতন্ত্রের মুক্তির সুবিধাকে সংহত করা এবং অর্থনীতিকে নতুন করে গঠন করার সুবিশাল অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জকে সামলাতে পারার আগেই বাংলাদেশ বেশ কয়েকটি সামরিক অভ্যুত্থান এবং রাজনৈতিক বিপর্যয়ের কবলে পড়ল। সেখ মুজিব ও তাঁর পরিবারকে হত্যা করা হল, তাঁর মন্ত্রীসভার কয়েকজন সদস্যকে গ্ৰেপ্তার করে পরে হত্যা করা হল এবং নতুন প্রজাতন্ত্রের ধর্মনিরপেক্ষ গণতান্ত্রিক দিশা অল্প দিনের মধ্যেই ধাক্কার মুখে পড়ল।

আজ ভারতীয় রাষ্ট্র যেমন সাংবিধানিক মূল্যবোধ এবং ধর্মনিরপেক্ষতা, গণতন্ত্র, ন্যায়, স্বাধীনতা, সাম্য ও ভ্রাতৃত্ববোধের লক্ষ্য থেকে পিছু হঠছে, একইভাবে বাংলাদেশেও গণতন্ত্রের সংকট তীব্র হয়ে দেখা দিচ্ছে। দুর্নীতি, স্বজনপোষণ, চরম বিশৃঙ্খলা ও অপশাসনের ক্রমবর্ধমান পরিস্থিতিতে মৌলবাদী শক্তিসমূহ এবং স্বৈরতান্ত্রিক প্রবণতা মাথাচাড়া দিচ্ছে। নির্বাচন আর অবাধ ও বিশ্বাসযোগ্য বলে গণ্য হচ্ছে না; ভিন্ন মত প্রকাশকারী নাগরিক, লেখক ও শিল্পীরা নির্যাতনের শিকার হচ্ছেন এবং তাঁদের এমনকি হত্যা করাও হচ্ছে; এবং গণতান্ত্রিক অধিকারকে খর্ব করতে রাষ্ট্র তীব্র দমন নামাচ্ছে এবং নজরদারি চালাচ্ছে। পঞ্চাশ বছর আগে ভারতের যে গণতান্ত্রিক জনমত বাংলাদেশের মুক্তিকে সমর্থন জানিয়েছিল ও অভিনন্দিত করেছিল এবং আজ যাদের অভ্যন্তরীণ ক্ষেত্রে সমবেতভাবে পরিকল্পিত ফ্যাসিবাদী আক্রমণকে প্রতিহত করতে হচ্ছে, তাঁরা বাংলাদেশের ধর্মনিরপেক্ষ ও প্রগতিবাদী গণতান্ত্রিক শক্তিগুলোর হাতে অধিকতর ক্ষমতার আকাঙ্খা করেন যাতে মুক্তিযুদ্ধের প্রতিশ্রুত লক্ষ্যে দেশকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া যায়।

বিদেশনীতির ক্ষেত্রে ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে সম্পর্ক সাধারণভাবে বন্ধুসুলভ ও শান্তিপূর্ণই থেকেছে। দক্ষিণ এশিয়ার বৃহত্তম দেশ হিসেবে এই অঞ্চলে মৈত্রী ও সহযোগিতার পরিমণ্ডল বজায় রাখায় ভারতেরই সবচেয়ে বেশি দায়িত্ব রয়েছে, এবং এই আঞ্চলিক পরিপ্রেক্ষিতের কথা ধরলে তাতে ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের মুখ্য ভূমিকা রয়েছে। মোদী সরকারের আবির্ভাব কিন্তু এই সম্পর্কের মধ্যে এক নতুন চ্যালেঞ্জের উদ্ভব ঘটিয়েছে। দু’দেশের মধ্যে সীমান্ত নিরাপত্তা, জল বন্টন, পারস্পরিক সংযোগ ও বাণিজ্যের মত অমীমাংসিত বিষয়গুলোর সৌহার্দ্যপূর্ণ সমাধান এখনও যেমন বাকি আছে, সেরকমই ভারতের নাগরিকত্ব আইনে মোদী সরকার বৈষম্যমূলক সংশোধনী আনার ফলে তা দু’দেশের মধ্যে আস্থার সংকটের জন্ম দিয়েছে। বাংলাদেশের সীমানায় অবস্থিত ভারতের তিন রাজ্য পশ্চিম বাংলা, আসাম ও ত্রিপুরায় বিজেপি’র গোটা রাজনৈতিক আলোচনাধারাই আবর্তিত হয় ‘বাংলাদেশী অনুপ্রবেশকারীদের ঢোকার’ জুজু এবং তাদের নির্বাসিত করার তর্জনগর্জনকে কেন্দ্র করে। ভারতের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ তথাকথিত এই ‘অনুপ্রবেশকারীদের’ বোঝাতে ‘উইপোকা’ শব্দটি ব্যবহার করেন, এবং তার থেকে অপরিহার্যযে সিদ্ধান্তটা বেরিয়ে আসে তা হল, এই উইপোকাগুলোকে নির্মূল করেই দেশকে বাঁচাতে হবে।

মজার ব্যাপার হল, তথাকথিত অনুপ্রবেশের এই বিষয়টা কিন্তু দু’দেশের দ্বিপাক্ষিক আলোচ্যসূচির অন্তর্গত হয়না। এনআরসি নথিপত্র না থাকা নাগরিকদের নাগরিক অধিকার থেকে বঞ্চিত করতে চায়; আর সিএএ নথিপত্র না থাকা নাগরিক ও নথিপত্র থাকা শরণার্থীদের মধ্যে ধর্মের ভিত্তিতে ফারাক করতে চায়; উভয় আইনই তৈরি হয়েছে বাংলাদেশের তথাকথিত অনুপ্রবেশ ও সংখ্যালঘু নিপীড়নের উৎস হওয়াকে ভিত্তি করে এবং আইন দুটো অনুপ্রবেশকারীদের নির্বাসিত করার পরিসংখ্যানগত লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করে দেয়। এরফলে ভারতের অভ্যন্তরে সাম্প্রদায়িক মেরুকরণ ও ভারতের নিজের সংখ্যালঘুদের ভীতি প্রদর্শনের স্থায়ী পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। প্রসঙ্গত, মোদীর আসন্ন বাংলাদেশ সফরসূচীর মধ্যে বাংলাদেশে মতুয়া সম্প্রদায়ের মন্দির পরিদর্শনও অন্তর্ভুক্ত রয়েছে, এবং তা পশ্চিম বাংলা ও আসামে ভোট শুরুর লগ্নেই। বিদেশনীতির বিষয়ের সঙ্গে দেশের রাজনৈতিক হিসেব-নিকেশকে মেশানোর প্রচেষ্টা আমাদের বিদেশনীতির কাঠামোকেই জটিল ও বিকৃত করে তুলবে।

বাংলাদেশের আত্মপ্রকাশ দ্বি’জাতি তত্ত্ব এবং ধর্মের ভিত্তিতে জাতি ও সংস্কৃতি নিরূপণের বিপজ্জনক প্রকল্পকে সংশয়হীনভাবে ভ্রান্ত প্রতিপন্ন করেছে। সেটা ছিল বৈচিত্রের এবং গণতন্ত্রের মধ্যে মর্যাদার আত্মঘোষণার এক ঐতিহাসিক মুহূর্ত। এটাকে সেই সমস্ত প্রচেষ্টার অযৌক্তিক ও সর্বনাশা তাৎপর্যের বিরুদ্ধে স্থায়ী হুঁশিয়ারি হিসেবেই বুঝতে হবে, যে প্রচেষ্টাগুলোর মধ্যে রয়েছে ভারতের বহুত্ববাদী বুনটকে অভিন্ন সত্ত্বায় নতুন রূপদান করা, বহু-ধর্মীয় বহু-সংস্কৃতির ভারতকে হিন্দু রাষ্ট্র রূপে নতুন করে চরিত্রায়িত করা এবং গণতন্ত্রকে সংখ্যাগুরুবাদী হিন্দু আধিপত্যের তুলি দিয়ে রাঙানো। সংঘ-বিজেপি প্রতিষ্ঠানের কাছে ১৯৪৭ সালের ভারত ভাগ এমন কোনো বেদনাদায়ক অতীত নয় যাকে আমাদের ছাড়িয়ে যেতে হবে এবং কখনই যার পুনরাবৃত্তি ঘটানো চলবেনা। তাদের কাছে এটা বরং এক অসম্পূর্ণ প্রকল্প যাকে আবার শুরু করে সমাপ্ত করতে হবে। আমাদের পুবের প্রতিবেশীর আত্মপ্রকাশের সুবর্ণ জয়ন্তী বছরে তার সঙ্গে আমাদের ঘনিষ্ঠ দ্বিপাক্ষিক মৈত্রী সম্পর্কের অঙ্গীকার করতে হবে এবং সুন্দরতর আগামীর জন্য ইতিহাস থেকে শিক্ষা নিতে হবে।

(এম-এল আপডেট সম্পাদকীয়, ২৩ মার্চ ২০২১)

Where women's dignity is robbed every dayUttar Pradesh: Women's dignity is robbed

উত্তরপ্রদেশে এখন জোর কদমে চলছে যোগী সরকারের চার বছর পূর্তির সাফল্যের প্রচার। বলা হচ্ছে, সরকার দুর্বৃত্তদের বিরুদ্ধে এমন ব্যবস্থা নিয়েছে যে তারা সব প্রাণভয়ে পালিয়েছে। কিন্তু প্রচার ও বিজ্ঞাপনের সঙ্গে বাস্তবের যে কোনো মিলই নেই, রাজ্যের প্রতিদিনের ঘটনা সেই সত্যকে প্রতিষ্ঠিত করছে। আইন-শৃঙ্খলার জঘন্য পরিস্থিতিতে দুর্বৃত্তরা উৎসাহিত হচ্ছে এবং এমনকি শুনানি চলার সময় আদালত কক্ষের ভেতরে সাক্ষীকে হুমকি দিতেও আইনজীবী নামধারী দুষ্কৃতির কোনো কুণ্ঠা হচ্ছে না।

গত ৫ মার্চ হাথরসের বিশেষ আদালতে গণধর্ষণের শিকার হয়ে মৃত্যুর কোলে ঢোলে পড়া হাথরসের দলিত কন্যার ন্যায়বিচারের শুনানি যখন চলছিল, সেই সময় অভিযুক্তদের আইনজীবী তরুণ হরি শর্মা আদালত কক্ষে ঢুকে (অভিযোগ, মদ্যপ অবস্থায়) দলিত কন্যার দাদা ও তাদের কৌঁসুলি সীমা কুশাহাওয়াকে হুমকি দেন। শুনানি বানচাল করা ও বাদী পক্ষকে ভয় দেখানোর জন্য ওরা লোকজন জড়ো করেছিল বলেও জানা গেছে। কিছুক্ষণ বন্ধ থাকার পর শুনানি আবার শুরু হলে এবার আদালত কক্ষে ঢুকে হুমকি দেন প্রথমে যিনি হুমকি দিয়েছিলেন সেই আইনজীবী হরি শর্মার বাবা। এরপর বিচারপতি শুনানি বন্ধ করে দিয়ে আদালতে উপস্থিত পুলিশ কর্মীদের নির্দেশ দেন, তারা যেন আদালতের নিরাপত্তা সুরক্ষিত করে এবং দলিত কন্যার দাদা ও তাদের কৌঁসুলি সীমা কুশাহাওয়াকে সুরক্ষা দিয়ে নিরাপদে আদালত থেকে বার করে নিয়ে যায়। এই ঘটনার পর মামলার শুনানি উত্তরপ্রদেশের বাইরে বা দিল্লীতে গ্ৰহণ করার দাবি জোরালো হয়।

হাথরসের দলিত যুবতীর মর্মান্তিক পরিণতিতে সমালোচনার ঝড় উঠলে সরকার ঘটনার সিবিআই তদন্তের নির্দেশ দেয়। সিবিআই ২০২০’র ১৯ ডিসেম্বর বিশেষ আদালতে চার্জশিট দাখিল করে। সিবিআই তাদের চার্জশিটে চার অভিযুক্তর বিরুদ্ধে গণধর্ষণ ও খুনের অভিযোগ এবং তফশিলি জাতি/উপজাতি নিপীড়ন নিরোধক আইনেও অভিযোগ এনেছে বলে সংবাদ বেরিয়েছে। সিবিআই-এর কৌঁসুলিও জানিয়েছেন, মামলাটি অন্যত্র সরিয়ে নিয়ে যাওয়ার আবেদন তাঁরাও জানাবেন।

হাথরসের দলিত কন্যার ওপর চালানো পৈশাচিক বর্বরতা ও তার হৃদয়বিদারক পরিণতির কথা সংক্ষেপে স্মরণ করা এখানে অপ্রাসঙ্গিক হবে না। গত বছরের ১৪ সেপ্টেম্বর মাঠে কাজ করছিলেন ১৯ বছরের দলিত যুবতী ও তাঁর মা। মেয়ের থেকে মা একটু দূরে ছিলেন। একটু পরে মেয়ের চিৎকারে ছুটে গিয়ে মা দেখেন মেয়ের শরীর রক্তে ভেসে যাচ্ছে, জিব কাটা। পরে পুলিশ মেয়েটিকে আলিগড়ের হাসপাতালে ভর্তি করে। সেখানে তার অবস্থার অবনতি হলে তাকে দিল্লীর একটি হাসপাতালে ভর্তি করা হয় এবং সেখানে ৩০ সেপ্টেম্বর তার মৃত্যু হয়। মৃত্যুকালীন জবানবন্দিতে দলিত যুবতী সন্দীপ, লবকুশ, রবি ও রামু নামে চারজনকে তার ওপর গণধর্ষণ চালানোয় অভিযুক্ত করে। এরা সবাই ঠাকুর জাতের, যে জাতেরই অন্তর্ভুক্ত হলেন মুখ্যমন্ত্রী যোগী আদিত্যনাথ। পুলিশ পরিবারের সদস্যদের অমতে দলিত যুবতীর দেহ পেট্রল ঢেলে পুড়িয়ে দেয়। মেয়েটির ওপর গণধর্ষণ, তার মৃত্যু এবং পুলিশের ভূমিকা সারা দেশকে আলোড়িত করে।

এখানে এই প্রসঙ্গের অবতারণাও অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক যে, বিজেপি বিধায়ক রাজিব সিং পাহেলওয়ান গত বছরের ৪ অক্টোবর অভিযুক্তদের সমর্থনে একটি জমায়েত করেন। ‘রাষ্ট্রীয় সাবর্ণ পরিষদ’ নামক সংগঠন অভিযুক্তদের পক্ষে সমর্থন জানায়। আরএসএস সহ বিভিন্ন দক্ষিণপন্থী সংগঠনও অভিযুক্তদের সমর্থনে নামে। এখানে এই বিষয়টিও উল্লেখের দাবি রাখে যে, ধর্ষণ কাণ্ডের ১১ দিন পর মেয়েটির যৌনাঙ্গ থেকে পদার্থ সংগ্ৰহ করার পর তার থেকে পাওয়া রিপোর্টের ওপর ভিত্তি করে জনৈক পুলিশ অফিসার ঘোষণা করেন যে, মেয়েটি গণধর্ষণের শিকার হয়নি এবং এইভাবে প্রশাসন ও অভিযুক্তদের রক্ষার চেষ্টা চালান। সেই অফিসারই আবার ‘অনবদ্য কাজ’এর জন্য রাষ্ট্রপতির পদকে ভূষিত হন।

ভয় পাওয়ার চেয়ে যোগী জমানায় দুর্বৃত্তরা যে আরো স্পর্ধিত হয়ে উঠেছে তা উপরের আখ্যান থেকে স্পষ্ট। নারী নির্যাতন ও ধর্ষণের বাড়বাড়ন্তের বিরুদ্ধে ধিক্কার-প্রতিবাদ-সমালোচনা কিন্তু নারী বিরোধী হিংসায় কোনো লাগাম পরাতে পারছে না। নারী বিদ্বেষের প্রাবল্য ও পিতৃতন্ত্রের আধিপত্যের পরিমণ্ডলে নারীকে অধিকার বর্জিত ভোগ্যবস্তু রূপে জ্ঞান করার মানসিকতা জাঁকিয়ে বসেছে। যেন এই অভিমতকেই প্রমাণ করতে সোমবার অর্থাৎ ২২ মার্চ রাত থেকে ২৩ মার্চ রাতের মধ্যে ঘটল অন্তত তিনটে নারী-বিরোধী হিংসার ঘৃণ্য ঘটনা।

প্রথম ঘটনাটি গোণ্ডা জেলার বেলসারের। ৪০ বছরের দলিত মা ও তার ১৭ বছরের মেয়ে গলায় দড়ি দিয়ে গাছ থেকে ঝুলে আত্মহত্যা করেন। কিশোরীর কাকা জানিয়েছেন, জনৈক সত্যম সিং লুকিয়ে কিশোরীর একটা ‘আপত্তিকর ভিডিও’ তোলে। সেই ভিডিওটা দিয়েও ওদের ব্ল্যাকমেইল করে “যৌন শোষণ করতে চেয়েছিল আর সেই কারণেই ওরা ওদের জীবন শেষ করে দেয়”। তিনি আরো জানান, “এর আগে আমরা বিষয়টা নিয়ে পুলিশকে তিনবার জানালেও প্রত্যেকবারই তারা পঞ্চায়েতে ব্যাপারটা মেটাতে বলে”। দ্বিতীয় ঘটনাটা সন্ত কবির নগর জেলার সিংহা গ্ৰামের। ৪২ বছরের শান্তি দেবীর মাথা গুঁড়িয়ে হত্যা করা হয় এবং তাঁর ১৭ বছরের মেয়েকে গুরুতররূপে জখম করা হয়। মেয়েটিকে গোরখপুর মেডিক্যাল কলেজে ভর্তি করা হয়েছে। তৃতীয় ঘটনাটা পিলভিটের এবং সেখানে ১৯ ও ১৬ বছরের দু’টি মেয়েকে গলা টিপে হত্যা করা হয়। হত্যার পর একটি মেয়েকে গাছ থেকে ঝুলিয়ে দেওয়া হয় আর অন্য মেয়েটি মাটিতে পড়ে থাকে। ময়না তদন্তের রিপোর্টে গলা টিপে হত্যার কথাই উল্লেখ করা হয়েছে। দু’টি মেয়েই ইটভাঁটায় কাজ করত। মেয়েদুটির মা জানিয়েছেন, ইটভাঁটার মালিক ও তার অ্যাকাউন্টেন্ট মেয়ে দুটিকে ধর্ষণ করার পর হত্যা করেছে। মায়ের আরো অভিযোগ “ইটভাঁটার মালিকের দেওয়া একটা কুঁড়ে ঘরে আমরা থাকতাম। মালিক মঙ্গলবার আমাকে হুমকি দিয়ে বলে যে, আমি পুলিশের কাছে যেন না যাই।” পিলভিটের এসপি বলেছেন, “নিহতদের পরিবারের সদস্যদের ভূমিকা সন্দেহজনক। …”

উত্তরপ্রদেশ হিন্দুত্বর এক বড় পরীক্ষাগার। রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী যোগী আদিত্যনাথ হিন্দুত্বর এক প্রভাবশালী নেতা। আরএসএস-এর আরাধ্য মনুস্মৃতিতে যে দৃষ্টিতে নারীকে দেখা হয়েছে, হিন্দুত্ববাদী নেতারা (যার মধ্যে যোগী আদিত্যনাথও রয়েছেন) নারীর জন্য যে ভূমিকা নির্দিষ্ট করেছেন, উত্তরপ্রদেশে নারী নিগ্ৰহের নিরবচ্ছিন্ন ধারা তার সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ বলেই মনে হয়। উত্তরপ্রদেশে তাই আইনজীবী নামধারী দুষ্কৃতী আদালত কক্ষে ঢুকে বিচারপতিদের কোনো তোয়াক্কা না করে সাক্ষী ও বাদী পক্ষের কৌঁসুলিকে অবাধে হুমকি দেওয়ার স্পর্ধা দেখাতে পারে, ধর্ষণ লম্পটদের কাছে অনায়াস সাধন হয়ে ওঠে, ধর্ষণের পর নারী হত্যাও অবলীলায় সংঘটিত হতে থাকে, বিজেপি ধর্ষকদের সমর্থনে রাস্তায় নামতে কুন্ঠিত হয় না, নারী নিগ্ৰহের বিরামহীন ধারা মুখ্যমন্ত্রী ও প্রশাসনের প্রশান্তিতে একটুও নাড়া দিতে পারে না!

ideology of the BJP RSSideology of the BJP

পশ্চিমবঙ্গে বিধানসভা নির্বাচনের প্রথম পর্ব অতিক্রান্ত। কেন্দ্রের বিজেপি সরকার নিজের সব শক্তি প্রয়োগ করে এই নির্বাচন জিততে বদ্ধপরিকর। নির্বাচনের কিছুদিন আগে বিজেপি নিজেদের ম্যানিফেস্টো প্রকাশ করেছে। আমাদের আজকের আলোচনা পশ্চিমবঙ্গের সেই সব মানুষের জন্য যারা মহিলাদের সহনাগরিক হিসেবে স্বীকৃতি দেন এবং মহিলাদের সমানাধিকার কামনা করেন। এই সময় দাঁড়িয়ে আমাদের আলোচনা বিজেপির মহিলাদের প্রতি মনোভাব এবং এবিষয়ে তাদের ট্র্যাক রেকর্ড নিয়ে।

ঐতিহাসিকভাবে এবং বর্তমানেও মহিলারা পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে সক্রিয় ভূমিকা নিয়েছেন, নিজেদের অধিকার সম্বন্ধে সোচ্চার থেকেছেন। বিজেপি পরাজিত হলেই শুধুমাত্র আগামীদিনেও মহিলারা স্বেচ্ছায় নিজেদের জীবনের সিদ্ধান্ত নিতে পারবেন এবং নিজেদের অধিকার রক্ষা করতে পারবেন।

বিজেপির ম্যানিফেস্টোয় “এবার বিজেপি” স্লোগানে ২০১৪ সালের প্রতিশ্রুতিই আবারো ঘুরে এসেছে। বিজেপি শাসিত রাজ্যগুলির জনতা সেই “সুশাসন”-এর ভুক্তভোগী। বিজেপির ম্যানিফেস্টোয় “এবার মহিলা, এবার বিজেপি” স্লোগানের আড়ালে বিজেপির আসল চেহারা তাদের ম্যানিফেস্টো থেকেই বুঝে নেওয়া যাক। ম্যানিফেস্টোয় বিজেপি লিখেছে তারা চাকরির ক্ষেত্রে মহিলাদের ৩৩ শতাংশ সংরক্ষণ দেবে। বিধানসভা, লোকসভা, চাকরিক্ষেত্র মিলিয়ে প্রত্যেকটি রাষ্ট্রায়ত্ত ক্ষেত্রে মহিলাদের ভাগিদারী বাড়াতে এসবক্ষেত্রে মহিলাদের জন্য সংরক্ষণের দাবি মহিলামুক্তি সংগঠনগুলি বহুদিন থেকে তুলে এসেছে। কিন্তু, বিজেপির এরকম প্রতিশ্রুতি ভাঁওতাবাজি ছাড়া আর কিছুই না। কারণ কেন্দ্র সরকার সহ উত্তরপ্রদেশ, গুজরাট, ত্রিপুরা ইত্যাদি বহু রাজ্যেই বিজেপি শাসনে রয়েছে কিন্তু কোন ক্ষেত্রেই মহিলাদের জন্য সংরক্ষণ করেনি বিজেপি। ২০১৪ সাল থেকে এই সাত বছরের শাসনে বিগত ৪৫ বছরের তুলনায় বেকারত্বের পরিমাণ সবচেয়ে বেশি হয়েছে। সরকারি তথ্য ও বিভিন্ন সার্ভেথেকে পরিষ্কার, এর মধ্যেও মহিলাদের বেকারত্বের পরিমাণ সবচেয়ে বেশি। লকডাউনে চাকরি হারিয়েছেন যারা তাদের মধ্যে ৫০ শতাংশের বেশি মহিলা। কেজি থেকে পিজি পর্যন্ত সব মহিলাকে বিনামূল্যে পড়ানোর কথাও ম্যানিফেস্টোয় লিখেছে বিজেপি। বিনামূল্যে শিক্ষার অধিকার এদেশের সব নাগরিকের। গত বছর জওহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-ছাত্রীরা ফি বৃদ্ধির বিরুদ্ধে আন্দোলন গড়ে তোলে এবং দিল্লী পুলিশ ও এবিভিপি এই ছাত্রছাত্রীদের ওপর সশস্ত্র হামলা চালায়। হামলায় ঘায়েল হন জেএনইউএসইউ-এর তৎকালীন সভাপতি কমরেড ঐশী ঘোষ সহ আরও বহু ছাত্রছাত্রী। তিনি সেই ক্ষতচিহ্ন মাথায় নিয়েই জামুড়িয়া থেকে নির্বাচনে লড়ছেন। বিজেপির নয়া শিক্ষানীতি বহাল হলে দেশের সরকারী কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়গুলিতে তালা পড়বে। সরকারী স্কুলকলেজ বন্ধ হলে ভুক্তভোগী হবেন মূলত মহিলারা কারণ সাধারণ পরিবারের মহিলাদের জন্য বেসরকারী কলেজে পড়ার খরচ বরাদ্দ থাকে না। সুতরাং, শিক্ষাক্ষেত্রে মহিলাদের প্রাধান্য দেওয়ার বিজেপির এই দাবি সম্পূর্ণ মিথ্যে। মহিলাদের রাষ্ট্রায়ত্ত যানবাহনের খরচ মুকুব করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে বিজেপি তার ম্যানিফেস্টোয়। কিন্তু দিল্লীতে কেজরিওয়াল সরকার এই কাজ করায় সোচ্চার আপত্তি জানিয়েছেন শুধুমাত্র বিজেপি নেতারাই। তাদের দাবি এর ফলে সরকারের বহু অদরকারী খরচ বেড়ে যাবে।

মহিলাদের ক্ষুদ্র ঋণ দেওয়ার প্রতিশ্রুতিও দিয়েছে তারা। কিন্তু লকডাউন পর্বে চাকরি চলে যাওয়া, দৈনন্দিন জিনিসপত্রের মূল্যবৃদ্ধির কারণে ক্ষুদ্রঋণের বোঝায় জর্জরিত বাংলার মহিলারা। তারা বারবার এই ঋণ মুকুবের দাবি জানিয়ে বিফল হয়েছেন। এই ঋণ যে সংস্থাগুলি দিয়েছে, তাদের দালালরা এখন বাড়ি বাড়ি গিয়ে শারীরিকভাবে হেনস্থাও করছে মহিলাদের। বিজেপির ম্যানিফস্টোর ভাঁওতাবাজি সামনে আসবে যখন ঋণমুক্তি কমিটি বিজেপির প্রচারদলের কাছে জবাব চাইবে। আশা-অঙ্গনবাড়ি সহ আমাদের দেশের বেশিরভাগ স্কিম কর্মীরাই মহিলা। কিন্তু তাদের মজদুরের অধিকারটুকু দেয়নি কেন্দ্রের বিজেপি সরকার।

নির্বাচনী প্রচারে বাংলায় এসেছিলেন উত্তরপ্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী যোগী আদিত্যনাথ। আজ থেকে ৩ মাস আগে তার রাজ্যের হাথরাসে ধর্ষিতা দলিত বালিকার শরীর তার পরিবারের অনুমতি না নিয়েই পুড়িয়ে ফেলে উত্তরপ্রদেশ পুলিশ। এই ঘটনা ঘটে যোগীর নির্দেশে, ধর্ষণের প্রমাণ লোপাটের জন্য। উত্তরপ্রদেশের উন্নাওয়ে বিজেপির নেতা কূলদীপ সিং সেঙ্গারের বিরুদ্ধে ধর্ষণের অভিযোগ আনেন এক যুবতী। পরিণতিতে তাঁর বাবাকে পুলিশি হেফাজতে পিটিয়ে মেরে ফেলা হয়। জম্মুর কাঠুয়ায় আট বছরের বালিকার ধর্ষকের সপক্ষে মিছিল বের করে বিজেপি। ধর্ষকের সপক্ষে মিছিল করা, ধর্ষিতার পরিবারকে রাষ্ট্রীয় হেনস্থা ও নির্যাতনই বিজেপি শাসনের স্বরূপ। নরেন্দ্র মোদীর নিজের লোকসভা কেন্দ্রের অন্তর্গত বারানসিতে বেনারস হিন্দু ইউনিভার্সিটির এক ছাত্রী ২০১৭ সালে তার বিরুদ্ধে যৌন হেনস্থার অভিযোগ আনলে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রোক্টর জানান সন্ধ্যে ছটার সময় বাইরে গেলে এরকম ঘটনাই স্বাভাবিক। এর পরিপ্রেক্ষিতে এই বিশ্ববিদ্যালয়ে এক ব্যাপক আন্দোলন গড়ে ওঠে। পরবর্তীতে বিশ্ববিদ্যালয়ের কর্তৃপক্ষ নতুন ছাত্রীদের দিয়ে মুচলেকা লেখায় যাতে তারা পড়াশোনার বাইরে অন্য কোনো কাজ না করে, তাদের ওপর যত যৌন হেনস্থাই হোক না কেন তারা যাতে প্রতিবাদ না করে। প্রসঙ্গত উল্ল্যেখ্য, এই বিশ্ববিদ্যালয়ের শুধুমাত্র মেয়েদের হোস্টেলে সম্পূর্ণ নিরামিষ খাবার দেওয়া হয়, কারণ নরেন্দ্র মোদী সহ বিজেপি সরকার মনে করেনা মহিলারাও পুষ্টিকর খাবারের অধিকারী। আশারাম বাপুর ওপর ধর্ষণের অভিযোগ প্রমাণিত হওয়া সত্ত্বেও টুইট করে তাকে সমর্থন জানান বিজেপির কেন্দ্রীয় নেতা সুব্রমনিয়ম স্বামী। হরিয়ানার ধর্মগুরু বাবা রামরহিমের বিরুদ্ধে ধর্ষণ ও যৌন নিগ্রহের অভিযোগ এনেছেন বহু মহিলা। কিন্তু এই বাবার সাম্রাজ্য বিস্তারের পেছনে পূর্ণ মদত দিয়েছে বিজেপি। এমনকি হরিয়ানা নির্বাচনের আগে মঞ্চে উঠে তার কাছে আশীর্বাদ নিয়ে যান খোদ নরেন্দ্র মোদী।

এর পরেও কারোর মনে হতে পারে এই ঘটনাগুলি সেই রাজ্যের নেতৃত্ব ও শাসনতন্ত্রের গাফিলতি। কিন্তু বিজেপির কেন্দ্রীয় মতাদর্শ ভয়ানকভাবে মহিলাবিরোধী। যোগী আদিত্যনাথ একটি প্রবন্ধে লেখেন মহিলারা স্বাধীনভাবে সমাজে বেঁচে থাকার যোগ্য নন। কারণ মহিলারা বিয়ের আগে তার বাবার অধীন, বিয়ের পর স্বামীর অধীন এবং বৃদ্ধ বয়সে ছেলের অধীন। মনুসংহিতার বিধান। আদিত্যনাথের এই মতো বিজেপি-আরএসএসের কেন্দ্রীয় মতাদর্শ। ১৯৫০ সালে বাবাসাহেব আম্বেদকর যখন হিন্দুকোড বিলের মাধ্যমে বিবাহিত মহিলাদের পৈতৃক সম্পত্তির ওপর অধিকার দেওয়ার জন্য আইন আনার চেষ্টা করেন, তখন দেশ জুড়ে তার বিরোধিতা করেছিল আরএসএস। আজকের ধর্ষকদের নিরাপত্তা প্রদানকারী, চূড়ান্ত মহিলাবিরোধী মোদী-যোগী-দিলীপ ঘোষ এই আরএসএস-এরই বংশজ। আরএসএস-এর পূর্ব সভাপতি মোহন ভাগওয়াতের মতে হিন্দু মহিলাদের একমাত্র কাজ অজস্র সন্তানকে জন্ম দেওয়া, যাতে হিন্দুদের সংখ্যা মুসলিমদের থেকে বেশি হয়। এই মতাদর্শের সূত্রও পাওয়া যায় আজ থেকে হাজার বছর আগে লেখা মনুস্মৃতি থেকে। যেখানে লেখা আছে, শূদ্র এবং মহিলারা সমান মর্যাদাসম্পন্ন মানুষ নন, তারা পুরুষের পায়ের তলায় থাকারই যোগ্য। মনুস্মৃতিবাদী বিজেপি তাই আজকেও অনলাইনেও কোনো মহিলা নিজের অধিকারের স্বপক্ষে বক্তব্য রাখলে তাকে অশ্রাব্য গালিগালাজ করে।

বাংলার মহিলারা সরকারী স্কুলে কলেজে পড়বেন, নিজের ইচ্ছায় নিজের পেশা বাছবেন, নিজের সাথী খুঁজবেন। কোনো মোহন ভাগওয়াত, দিলীপ ঘোষ বা নরেন্দ্র মোদী মহিলাদের ভাগ্য নির্ধারণ করে দেবে না। বিজেপি নিজের ম্যানিফেস্টোর মিথ্যে প্রতিশ্রুতি নিয়ে প্রচারে এলেও বাংলার মহিলারা জবাব চাইবে, বিজেপি শাসিত রাজ্যগুলিতে মহিলাদের এই দুরবস্থা কেন। তারা সোচ্চারে ঘোষণা করবে বাংলায় মহিলা-বিরোধী বিজেপির ঠাঁই হবে না।

- সুচেতা দে 

The BJP-JDU government is turning Bihar into a police stateturning Bihar into a police state

রাজ্যব্যাপী প্রতিবাদ সত্ত্বেও নীতিশ কুমার সরকার গত ২৩ মার্চবিহার বিধানসভায় ‘বিহার স্পেশ্যাল আর্মড পুলিশ অ্যাক্ট’ বিল পাশ করাল। এই আইনের বলে পুলিশ যে কোনো স্থানে যে কোনো ব্যক্তিকে তল্লাশি করতে পারবে। বিহার মিলিটারি পুলিশকে আরো নখ-দাঁত যুগিয়ে এই আইনের মাধ্যমে নতুন রূপে যে পুলিশ বাহিনী গড়ে তোলা হবে, তাদের অধিকার থাকবে যে কোনো স্থানে আদালতের অনুমতি ছাড়াই হানাদারি চালানো এবং শুধুমাত্র সন্দেহের বশেই কাউকে গ্ৰেপ্তার করার (বিলের ধারা ৭ ও ৮)। পুলিশ অন্যায় করেছে বলে মনে করলে আদালতেরও এক্তিয়ার থাকবেনা নিজের বিবেচনায় স্ব-উদ্যোগে বিচার প্রক্রিয়া শুরু করার (বিলের ধারা ১৫)।

বিরোধীপক্ষের বিধায়করা বলেছেন, এই বিল সাংবিধানিক আইনি ব্যবস্থার লঙ্ঘন এবং সাংবিধানিক গণতান্ত্রিক রাজ্যকে পুলিশিরাজে পরিণত করার উদ্যোগ। পার্শ্ববর্তী রাজ্য উত্তরপ্রদেশেও এই ধরনের আইন তৈরি করে রাজ্যটাকে পুলিশের সংঘর্ষরাজে পরিণত করা হয়েছে এবং এই আইনকে ব্যবহার করেই সমস্ত বিরোধী ও গণতান্ত্রিক কণ্ঠকে দমন করা হচ্ছে। বিজেপি সরকারের জনবিরোধী নীতি ও পদক্ষেপের ফলে জনগণের মধ্যে যে ক্রোধের সৃষ্টি হচ্ছে, তাকে দমন করার লক্ষ্যে এই বিল একটা ফ্যাসিবাদী ষড়যন্ত্র ছাড়া অন্য কিছু নয়। সরকার প্রথমে ১৯ মার্চবিধানসভায় বিলটা পেশ করার কথা ভাবলেও বিরোধীপক্ষের বিধায়কদের তীব্র বিরোধিতার মুখে সেদিন তাদের পক্ষে তা সম্ভব হয়নি। পরে ২৩ মার্চ বিধানসভার অধিবেশন শুরু হলে বিরোধী পক্ষের বিধায়করা পুলিশিরাজ বিলের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ শুরু করেন। বিকাল ৫টার সময় সেদিনের মত অধিবেশন যখন শেষ হতে যাচ্ছে, স্পিকার বিজয় কুমার সিনহা পুলিশ ডাকেন। প্রায় ১০০ পুলিশ বিধানসভায় ঢোকে, সঙ্গে বিহারের ডিজিপি, পাটনার এসএসপি ও জেলা শাসক। পুলিশ ও প্রশাসনের এই কর্তারা বিধানসভার অভ্যন্তরে প্রতিবাদকারী বিধায়কদের নির্যাতনে নেতৃত্ব দেন। বিধায়কদের প্রহার করে, লাথি মেরে, চুলের মুঠি ধরে পুলিশ তাদের টেনে নিয়ে যায়। এসএসপি ও জেলা শাসকও বিধায়কদের নির্যাতনে হাত লাগান বলে অভিযোগ। সিপিআই(এমএল) বিধায়ক মেহবুব আলমকে মারধর করে হাত মুচড়ে দেওয়া হয়, বিধায়ক সুদামা প্রসাদকে ধাক্কা দিতে দিতে নিয়ে গেলে তিনি সিঁড়িতে পড়ে গিয়ে আঙুলে গুরুতর আঘাত পান। সিপিআই(এম)-এর এক বিধায়ককে এমন প্রহার করা হয় যে তিনি সংজ্ঞা হারান। মহিলা বিধায়করাও পুলিশি বর্বরতা থেকে রেহাই পাননি। অবশেষে বিরোধী বিধায়ক শূন্য বিধানসভায় বিল পাশ হয়।

বিল পেশ হওয়ার উদ্যোগের পরিপ্রেক্ষিতে বিরোধী দলগুলো প্রতিবাদ আন্দোলন শুরু করে। বিলের দানবীয় চরিত্র সম্পর্কে জনগণকে সতর্ক করা হয় এবং বিল বিরোধী প্রতিবাদে শামিল হওয়ার আহ্বান জানানো হয়। সিপিআই(এমএল) ২২ মার্চ বিলের বিরুদ্ধে সারা রাজ্যের ব্লকে-ব্লকে প্রতিবাদ সংগঠিত করে। আরোয়াল, সুপৌল, বক্সার, জাহানাবাদ, ভোজপুর, সিওয়ান, বেগুসরাই এবং অন্যান্য জেলার ব্লক সদরে বিলবিরোধী প্রতিবাদ সংগঠিত হয়। সেদিন রাজধানী পাটনা সহ ফতুয়া, পালিগঞ্জ, নওবতপুর এবং গ্ৰামীণ পাটনার ফুলওয়ারি ব্লকে সংগঠিত হয় প্রতিবাদ মিছিল।

বিল পাশ হওয়ার পরদিন ২৪ মার্চ বিরোধী বিধায়করা বিলের বিরুদ্ধে বিধানসভায় বিক্ষোভ দেখান, সিপিআই(এমএল) বিধায়করা কালো ব্যাণ্ড পরে বিধানসভায় ঢোকেন। দিনটি সারা রাজ্যে ধিক্কার দিবস হিসাবে পালিত হয়। সিপিআই(এমএল) সারা বিহারেই প্রতিবাদ সংগঠিত করে এবং মুখ্যমন্ত্রী নীতীশ কুমারের কুশপুতুল পোড়ানো হয়। বিক্ষোভকারীরা অসাংবিধানিক ও দানবীয় বিলটি প্রত্যাহারের দাবি জানান। সিপিআই(এমএল)-এর বিহার সম্পাদক ও পলিটব্যুরো সদস্য কমরেড কুনাল বিধানসভার অভ্যন্তরে বিধায়কদের নিগ্ৰহকে ভারতের সংসদীয় ইতিহাসে এক কালো দিন রূপে অভিহিত করেন। তিনি বলেন, এই ঘৃণ্য অপরাধ দেখিয়ে দিচ্ছে, নীতীশ-বিজেপি সরকার বিহারকে এক ফ্যাসিস্ত রাজ্যের দিকে নিয়ে যাচ্ছে। বিহার বিধানসভায় পুলিশের হাতে বিধায়কদের নিগ্ৰহের বিরুদ্ধে সারা দেশই ধিক্কার জানিয়েছে। যিনি পুলিশ ডেকেছিলেন সেই স্পিকার বিজয় কুমার সিনহার ওপরই নিগ্ৰহের দায় চাপছে সবচেয়ে বেশি। ঘরে-বাইরে চাপের মুখে পড়ে স্পিকার পুলিশ বাড়াবাড়ি করেছে কিনা তার তদন্তের নির্দেশ দিয়েছেন।

বিরোধী বিধায়করা ২৩ মার্চের ঘটনার প্রতিবাদে আরজেডি বিধায়ক ভূদেব চৌধুরীকে স্পিকার নির্বাচিত করে বিধানসভার বাইরে ছদ্মরূপের বিধানসভার অধিবেশন পরিচালনা করেন।

উল্লেখ্য, বিহার বিধানসভায় এনডিএ সরকারের অত্যন্ত সামান্য ব্যবধানের সংখ্যাগরিষ্ঠতা আছে। বিহার বিধানসভার মোট সদস্য সংখ্যা ২৪৩, আর এনডিএ-র নির্বাচিত বিধায়ক সংখ্যা হল ১২৫। এই নগণ্য সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে সমস্ত বিরোধিতাকে উপেক্ষা করে নীতীশ-বিজেপি সরকার পাশ করাল দানবীয় আইনকে। কিছুদিন আগেই গণতন্ত্র নিয়ে গবেষণা করা সুইডেনের সংস্থা ভি ডেম ইনস্টিটিউট ভারতকে ‘নির্বাচন ভিত্তিক স্বৈরতন্ত্র’ আখ্যা দিয়েছে এবং বলেছে যে, ভারতীয় রাষ্ট্র পাকিস্তানের মতোই স্বৈরাচারী এবং তার গণতান্ত্রিক অন্তর্বস্তু নেপাল ও বাংলাদেশের চেয়েও খারাপ। ‘বিরোধীদের অশ্রদ্ধা’ ভারতীয় রাষ্ট্রের অন্যতম বৈশিষ্ট্য বলেও গবেষণা সংস্থার রিপোর্টে উল্লেখ করা হয়েছে। ভারতের শাসক দলগুলো প্রতিদিনই এই পর্যবেক্ষণকে যথার্থ বলে প্রতিপন্ন করে চলেছে। গায়ের জোরে দানবীয় বিল পাশ করিয়ে এবং বিধানসভার অভ্যন্তরে বিরোধী বিধায়কদের ওপর পুলিশি নির্যাতন চালিয়ে নীতীশ-বিজেপি সরকার ভি ডেম ইনস্টিটিউটএর পর্যবেক্ষণের সঠিকতাকেই প্রমাণ করল।

Demand to apologize to Nitish Kumardemanded an apology from Nitish Kuma

মোদী সরকারের তৈরি তিনটে কৃষি আইন বাতিলের দাবিতে সংযুক্ত কিসান মোর্চার ভারত বনধের আহ্বানে শামিল হতে এবং বিহার বিধানসভায় পুলিশি পৈশাচিকতার বিরুদ্ধে প্রতিবাদে মহাগঠন্ধন ভুক্ত দলগুলো বিহার বনধ সংগঠিত করতে সক্রিয় ভূমিকা নেয়। সিপিআই(এমএল), সারা ভারত কিসান মহাসভা, এআইসিসিটিইউ ও আয়ারলার কর্মীরা বনধ সফল করতে সক্রিয় ও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেন। যে ইস্যুগুলোকে কেন্দ্র করে বনধ ডাকা হয় তার মধ্যে ছিল তিনটে কৃষি আইন বাতিল করতে হবে, বেসরকারিকরণ বন্ধ করতে হবে এবং চারটে শ্রম-বিধি বাতিল করতে হবে।

সিপিআই(এমএল) কর্মীরা ২৬ মার্চ সকাল থেকেই রাস্তায় নামেন এবং দ্বারভাঙ্গা ও জাহানাবাদে রেল লাইন অবরোধ করেন। দ্বারভাঙ্গায় সহর্ষ-জয়নগর জানকি এক্সপ্রেস আটক করা হয় এবং সিপিআই(এমএল) কর্মীরা ঘন্টার পর ঘণ্টা দাবিগুলি ও বনধের সমর্থনে শ্লোগান দিতে থাকেন। রাজ্য স্ট্যাণ্ডিং কমিটির সদস্য অভিষেক কুমার, দেবেন্দ্র কুমার ও অন্যান্য নেতাদের পরিচালনায় লহেরিয়াসরাই রেল স্টেশনেও চাক্কা জ্যাম সংগঠিত হয়। মির্জাপুর-কৌয়াহী চক অবরোধ করা হয় লাহেরিসেরাই-রোসাদা রোড। জাহানাবাদে অবরোধের ফলে আটকে পড়ে গয়া-পাটনা লাইনের বহু ট্রেন।

আরাতে সিপিআই(এমএল) সমর্থকরা সকাল ৮টা থেকে আরা-পাটনা হাইওয়ে ৩০নং জাতীয় সড়ক অবরোধ করেন। বনধের ফলে আরা বাস স্ট্যাণ্ড জনশূন্য থাকে। সিপিআই(এমএল) কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য রাজু যাদব, কয়ামুদ্দিন আনসারি, দিলরাজ প্রীতমের নেতৃত্বে, এআইএসএ-আরওয়াইএ নেতা সুবির কুমার, শিব প্রকাশ রঞ্জন ও অন্যান্যদের নেতৃত্বে সিপিআই(এমএল) কর্মীরা দাবি সম্বলিত প্ল্যাকার্ড হাতে নিয়ে শ্লোগান দিতে-দিতে লাগাতার প্রতিবাদ চালিয়ে যান। আরার পিরোতেও রাস্তা অবরোধ করা হয়।

ভোজপুরের আগিয়াঁও-এর দুর্গা মন্দিরের কাছেও চাক্কা জ্যাম সংগঠিত হয়। সিপিআই(এমএল) ও এআইএসএ নেতৃবৃন্দ নারায়নপুরে ১২নং জাতীয় সড়ক অবরোধে নেতৃত্ব দেন। কোলিভার ও বাধারা ব্লকের নেতৃবৃন্দ কোলিভারে আরা-ছাপরা হাইওয়ে অবরোধে সক্রিয় ভূমিকা নেন। সাহার ও গাধানিতেও বনধ ব্যাপকভাবে সফল হয়। এখানে সিপিআই(এমএল) ও আর জেডি কর্মীরা একসাথে আরা-সাসারাম হাইওয়ে অবরোধ করেন। জাহানাবাদের কোকা মোড়ে অবরোধ সংগঠিত হয় সিপিআই(এমএল)-এর জেলা সম্পাদক শ্রীনিবাস শর্মা ও অন্যান্য নেতাদের পরিচালনায়, এই অবরোধের ফলে পাটনা-গয়া সড়কে যান চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। নালন্দার হিলসায় ইসলামপুর-ফতুয়া সড়কে যান চলাচল সম্পূর্ণ রূপে ব্যাহত হয়। একানগড়সেরাইতে সকাল থেকেই পাটনা-গয়া সড়ক অবরোধ করা হয়। হিলসা বনধে নেতৃত্ব দেন জেলা সম্পাদক সুরেন্দ্র রাম ও অন্যান্য নেতৃবৃন্দ আর একানগড়সেরাই-এর অবরোধে নেতৃত্ব দেন প্রমোদ যাদব। চান্দিতেও বনধের ব্যাপক প্রভাব পড়ে।

বক্সারের ডুমরাওতে বনধ বিস্তীর্ণভাবে সফল হয়। এখানে কয়ক শত সিপিআই(এমএল) কর্মী রাস্তায় নেমে সকাল থেকেই ১২০নং জাতীয় সড়ক অবরোধ করেন। সোনভদ্রতেও বনধের ব্যাপক প্রভাব চোখে পড়ে। গয়া জেলার কোচ ব্লকে রাস্তা অবরোধ করা হয়। টিকারিতে দোকানপাট ও সমস্ত প্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকে। পূর্ণিয়ার রূপাউলিতেও বনধ ভালোভাবে সফল হয়। সমস্তিপুরের তাজপুরে গান্ধী চেকপোস্টের কাছে সিপিআই(এমএল) কর্মীরা জাতীয় সড়কে যান চলাচল রুখে দেন।

গত ২৩ মার্চ বিহার বিধানসভায় জেলা শাসক ও এসপির উপস্থিতিতে বিরোধী পক্ষের বিধায়কদের ওপর নির্মম নিপীড়নের ঘটনা ভারতের সংসদীয় ইতিহাসে নজিরবিহীন। এই ঘটনা নিয়ে সারা দেশে নিন্দার ঝড় উঠলে যিনি বিধানসভায় পুলিশ ডেকেছিলেন সেই স্পিকার তদন্তের নির্দেশ দিয়েছেন, পুলিশ সেদিন বাড়াবাড়ি করেছিল কি না তা দেখার। সিপিআই(এমএল) এই অভিমত ব্যক্ত করেছে যে কোনো বিল নিয়ে বিরোধী পক্ষের আপত্তি থাকলে তা নিয়ে বিস্তৃত বিতর্ক ও আলোচনা চালানোটাই প্রথা। এর বিপরীতে নীতীশ কুমার পুলিশ ডেকে জোরজবরদস্তি বিল পাশ করিয়েছেন। সেদিন কিছু উর্দিবিহীন ব্যক্তিও বিধানসভায় ঢুকে বিরোধী বিধায়কদের নিগ্ৰহে হাত লাগায়, যারা বিজেপির গুণ্ডা বলেই ব্যাপকতর স্তরে অনুমান। বিহারের মুখ্যমন্ত্রী, স্পিকার এবং পুলিশ ও প্রশাসনের বড় কর্তারা বিহারকে গণতন্ত্রের বধ্যভূমিতে পরিণত করেছেন। এর প্রতিক্রিয়ায় জনগণের ক্রোধ প্রতিফলিত হয়েছে ২৬ মার্চের বিহার বনধকে সর্বাত্মক করে তোলার মধ্যে, মুখ্যমন্ত্রী, এসপি ও জেলা শাসকের বিহারের জনগণের কাছে ক্ষমা চাওয়ার দাবি জোরদার ভাবে তুলে ধরার মধ্যে।

26 March Bharat BandhBharat Bandh

মোদী সরকারের তৈরি তিনটে কৃষি আইন বাতিলের দাবিতে সংযুক্ত কিসান মোর্চার ডাকা ২৬ মার্চের ভারত বনধ অভূতপূর্ব মাত্রায় সফল হয়। সংযুক্ত কিসান মোর্চার ডাকা বনধে বিহারের মহাগাঠবন্ধন ভুক্ত দলগুলো সমর্থন জানায়। বিহার বিধানসভায় স্পিকারের নির্দেশে ২৩ মার্চ পুলিশ বিধানসভায় ঢুকে বিধায়কদের প্রহার সহ যে বর্বরতা চালায় তার বিরুদ্ধে প্রতিবাদে সিপিআই(এমএল) সহ বাম দলগুলো ২৬ মার্চ স্বতন্ত্র ভাবে বিহার বনধ ডাকে যা বিপুলভাবে সফল হয়।

দিল্লী-গাজিপুর সীমানায় ২৪নং জাতীয় সড়ক অবরোধ করেন। জাতীয় সড়কের অপর প্রান্তেও অবরোধ করা হয়। কৃষকরা জাতীয় সড়কের ওপর অবস্থান করে ড্রাম বাজিয়ে হোলির গান গাইতে থাকেন। বনধ সফল হয় মধ্যপ্রদেশের ভিন্দ শহরে। এখানে সংযুক্ত কিসান মোর্চা ভুক্ত সংগঠন সারা ভারত কিসান মহাসভা এবং কিসান সভা এবং তার সাথে এআইসিসিটিইউ, সিটু এবং যুব সংগঠনগুলো রাষ্ট্রপতির উদ্দেশ্যে লেখা একটা স্মারকলিপি ভিন্দ-এর কালেক্টরের কাছে জমা দেন। ঐ স্মারকলিপিতে তিনটে কালা কৃষি আইন বাতিল করা, বিদ্যুৎ সংশোধনী বিল-২০২০ প্রত্যাহার করে নেওয়া, ন্যূনতম সহায়ক মূল্যকে আইনি মর্যাদা প্রদান, গ্ৰেপ্তার হওয়া কৃষকদের মুক্তি দান এবং প্রতিবাদকারী কৃষকদের ওপর চাপানো সমস্ত মামলা প্রত্যাহারের দাবি জানানো হয়। ভারত বনধ উপলক্ষে ২৬ মার্চ উত্তরপ্রদেশের লক্ষ্ণৌ, বালিয়া, মাউ, গাজিপুর, লখিমপুর খেরি, প্রয়াগরাজ, চান্দৌলি, বারানসি, সোনভদ্র, মোরাদাবাদ ও অন্যান্য জেলায় প্রতিবাদী মিছিল ও জনসভা সংগঠিত হয়। ভারত বনধের সমর্থনে উত্তরপ্রদেশের বালিয়া জেলার সিকান্দারপুরে সিপিআই(এমএল) ও সারা ভারত কিসান মহাসভার কর্মীরা রাস্তায় নামলে পুলিশ তাদের গ্ৰেপ্তার করে থানায় নিয়ে যায়। সিপিআই(এমএল) যোগী সরকারের এই অগণতান্ত্রিক পদক্ষেপকে ধিক্কার জানায়।

এআইকেএম এবং এআইকেএমএস যৌথভাবে উড়িষ্যার রায়গড়ায় বনধ সফল করে। ঝাড়খণ্ডের ডালটনগঞ্জ ও পালামৌতে বনধ সফল হয়। মুম্বইয়ের কুরলা স্টেশনের বাইরে এআইসিসিটিইউ ও সিটু এক প্রতিবাদ কর্মসূচি সংগঠিত করে। গুজরাটের আমদাবাদ এবং মধ্যপ্রদেশের গোয়ালিয়রেও ভারত বনধের সমর্থনে প্রতিবাদী মিছিল ও জনসভা সংগঠিত হয়।

তিনটে কালা কৃষি আইন বাতিলের দাবিতে সংযুক্ত কিসান মোর্চার ডাকা ভারত বনধে বাম দলগুলো সমর্থন জানায়। কৃষকদের আন্দোলনে সমর্থন জানানো এবং ভারত বনধকে ঐতিহাসিকভাবে সফল করার জন্য সিপিআই(এমএল) জনগণকে ধন্যবাদ জানিয়েছে। সিপিআই(এমএল) আরও দাবি করেছে, কৃষকদের দাবি মেনে মোদী সরকারকে এবার কৃষি আইন তিনটে প্রত্যাহার করে নিতে হবে।

In the context of the Nandigram movemenIn the context of the Nandigram movement

চোদ্দ বছর আগে ঘটে যাওয়া নন্দীগ্রাম গণহত্যায় অধিকারী পরিবারের ভূমিকা সম্পর্কে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের মন্তব্য অনেক প্রশ্ন তুলে দিয়েছে। শুরু হয়েছে অনেক জল্পনা কল্পনা।

রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী ও দলনেত্রী হিসেবে মমতা যদি শুরু থেকেই বা দীর্ঘদিন ধরেই এ ব্যাপারে অবহিত হয়ে থাকেন তাহলে এখন নির্বাচনে অধিকারী পরিবার দলবদল করে বিজেপিতে চলে গেল বলেই মমতা কেন এই কথা প্রকাশ্যে বলছেন? এতদিন ‘ভদ্রতা’ দেখিয়েছি, ছেড়ে দিয়েছি, ‘ফেয়ার এনাফ’, ইত্যাদি বলে অবশ্যই মমতা আজ দায় এড়িয়ে যেতে পারেন না।

কিন্তু মমতা ও অধিকারীদের মধ্যে যাই অভিযোগ আদানপ্রদান হোক তাতে কিছু বুনিয়াদী সত্য বদলে যাবে না।

নন্দীগ্রামে জমি অধিগ্রহণের পরিকল্পনাটা ছিল ঘোষিত সত্য। তার বিরুদ্ধে ব্যাপক মানুষের বিক্ষোভ, আন্দোলন, জাগরণটা ছিল খাঁটি। নন্দীগ্রাম গণহত্যা ছিল একটা নির্মম বাস্তব। আর মনে রাখতে হবে, নন্দীগ্রামের ঠিক আগে সিঙ্গুর ঘটে গিয়েছিল। সেখানে পুলিশী নিপীড়ন সহযোগে জোর করে জমি নেওয়া হয়েছিল। আর এই সিঙ্গুরের সূত্র ধরেই নন্দীগ্রাম হয়ে উঠেছিল নন্দীগ্রাম।

নন্দীগ্রামে প্রয়াত কমরেড শংকর মিত্র, বিপ্রদাস চ্যাটার্জি এবং বর্তমানে আমাদের রাজ্য কমিটির সদস্য আইনজীবী দিবাকর ভট্টাচার্য ও ছাত্রনেতা মলয় তেওয়ারিরা যখন তথ্য অনুসন্ধানে গিয়েছিলেন তখন তাঁদের গ্রেপ্তার করা হয়েছিল। সিঙ্গুরে আমাদের রাজ্য নেতা তপন বটব্যাল স্থানীয় কৃষকদের সাথে পুলিশের হাতে নির্যাতিত হয়ে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ছিলেন। সাধারণ মানুষের সাথে কী হয়েছিল এবং সাধারণ মানুষের বিক্ষোভ ও প্রতিক্রিয়া কী ছিল আমরা জানি। সিঙ্গুর ও নন্দীগ্রামে মানুষ এমনি বিক্ষোভে ফেটে পড়েনি।

এই বিক্ষোভ শুধু সিঙ্গুর, নন্দীগ্রাম, পশ্চিমবঙ্গ দেখেনি, কর্পোরেটের হাতে শিল্প, উন্নয়ন বা শহরের সৌন্দর্যকরণের নামে মানুষকে উচ্ছেদ করে জমি তুলে দেওয়ার বিরুদ্ধে জমি ও জীবিকা বাঁচানোর তীব্র আন্দোলন তখন গোটা দেশ জুড়েই ছড়িয়ে পড়েছিল। এই আন্দোলনের ফলশ্রুতিতেই ১৮৯৪ এর ঔপনিবেশিক জমি অধিগ্রহণ আইন বাতিল হয়। ২০১৩ সালের নতুন আইনে জমি ও জীবিকা রক্ষার প্রশ্নে মানুষ কিছু আইনী রক্ষাকবচের অধিকার পায়। ২০১৪ সালে ক্ষমতায় এসেই নরেন্দ্র মোদী এই আইন সংশোধন করতে গেলে বিরাট বিরোধিতা ও বিক্ষোভের ফলে মোদী সরকারকে পিছু হটতে হয়।

অধিকারী পরিবার সম্পর্কে মমতার অভিযোগে সিঙ্গুর নন্দীগ্রামের শক্তিশালী গণ আন্দোলন নাকচ হয়ে যায় না। একথা ঠিক যে সেই আন্দোলনের সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক ফসল মমতা ও তাঁর দলের ঘরে উঠেছিল। কিন্তু সে কারণে এই আন্দোলনকে সরকার বিরোধী রাজনৈতিক ষড়যন্ত্র বলে অভিহিত করা যায় না। ঠিক যেমন আজকের কৃষক আন্দোলনকে মোদী সরকারের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র বলে দেগে দেওয়া যাবে না।

- দীপঙ্কর ভট্টাচার্য 

Nandigram anecdote

বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য আদ্যোপান্ত উদারিকরণের রাজনীতিতে বিশ্বাসী ছিলেন। তিনি ২০০৩ সালে বাইপাসের ধারে বেসরকারী চিকিৎসা কেন্দ্র গড়ে তোলার জন্য কয়েক একর জমি স্বল্প মূল্যের বিনিময়ে বেসরকারী স্বাস্থ্য প্রতিষ্ঠানগুলোকে দিয়েছিলেন। এর ফলে সরকারী চিকিৎসা ব্যবস্থা লাটে ওঠার রাস্তা পাকা হল। মানুষ ন্যূনতম চিকিৎসা থেকে বঞ্চিত হয়েছেন।

বাম জমানাতেই সুতাকল, ইঞ্জিনিয়ারিং শিল্প, অটো মোবাইল প্রভৃতি কারখানা বন্ধ হতে থাকলো এবং এর সাথে যুক্ত কয়েক হাজার সহযোগী প্রতিষ্ঠান চিরতরে বন্ধ হয়ে গেছে। চটকলগুলি টিমটিম করে চলছিল। এই সময় রাজ্য সরকার লগ্নি টানতে ফলতায় দেশের মধ্যে প্রথম এসইজেড অঞ্চল গড়ে তোলে।

এরপর সিঙ্গুরের বহুফসলী জমিতে ব্যক্তি মালিকানায় শিল্প গড়ে তোলার জন্য জমি অধিগ্রহণ, এর বিরুদ্ধে আন্দোলন, প্রতিবাদ, অত্যাচার এবং প্রতিরোধে সরকারের পিছু হটা।

তখন দেশে দেশে শ্রমিকদের অধিকারের দাবিতে এসইজেড-এর বিরুদ্ধে ব্যাপক আন্দোলন শুরু হয়েছে। আমাদের দেশেও বিশেষ করে উড়িষ্যায় পস্কো’র জমি অধিগ্রহণ তথা এসইজেড-এর বিরুদ্ধে বামেরা আন্দোলনে সামনের সারিতে। পশ্চিমবঙ্গে বাম সরকার তখন ইন্দোনেশিয়ার কুখ্যাত সালেম গোষ্ঠীকে নন্দীগ্রামে ২৫ হাজার একর জমিতে কেমিক্যাল হাব গড়ার জন্যে অনুমোদন দিয়েছে। এই সময় লক্ষ্মণ শেঠের অতি সক্রিয়তা সর্বজন বিদিত। এরপরের ঘটনা জমি অধিগ্রহণের বিরুদ্ধে গণবিস্ফোরণ, গণহত্যা, মানুষের প্রতিরোধ এবং সরকারের পিছু হটা। মমতা ব্যানার্জি বা শুভেন্দু অধিকারীরা এই আন্দোলনের কুশীলব ছিলেন না, এই আন্দোলনের কুশীলবরা হলেন নন্দীগ্রামের সংগ্রামী মানুষ। যতই চেষ্টা করুন বুদ্ধদেব, লক্ষ্মণ শেঠ, মমতা এবং শুভেন্দুরা নন্দীগ্রামের সংগ্রামের ইতিহাসকে পাল্টাতে পারবেন না। ২০০৬ সালের ২৮ ডিসেম্বর লক্ষ্মণ শেঠের নিয়ন্ত্রণাধীন ‘হলদিয়া উন্নয়ন পর্ষদ’ জমি অধিগ্রহণ সংক্রান্ত নোটিশ জারি করে। সেখানে উল্লেখ করা হয় নন্দীগ্রাম ও খেজুরি দুটো ব্লকে ২৫ হাজার একর জমি সরকার অধিগ্রহণ করবে।

৩ জানুয়ারি ২০০৭ অধিগ্রহণের নোটিশ পঞ্চায়েতে টাঙিয়ে দেওয়া মাত্রই নন্দীগ্রাম জেগে ওঠে। এই নোটিশের বিরুদ্ধে গ্রামবাসীরা কালীচরণ পঞ্চায়েতে জমা হন। গ্রামবাসীদের ছত্রভঙ্গ করতে পুলিশ নির্মমভাবে লাঠিচার্জ করে। পুলিশের জীপের তলায় একজন কিশোরের মৃত্যু হয়। জনতা উত্তেজিত হয়ে পুলিশ জীপ পুড়িয়ে দেয় এবং বেশ কিছু রাস্তা কেটে দেয়।

৪ জানুয়ারী ২০০৭ সিপিআই(এমএল) লিবারেশন এক তথ্য অনুসন্ধাকারী দল পাঠায়। এই দলে ছিলেন দিবাকর ভট্টাচার্য, মলয় তেওয়ারি, নিতাই মণ্ডল, জিতু প্রসাদ, বিপ্রদাস চ্যাটার্জি (প্রয়াত) এবং শঙ্কর মিত্র (প্রয়াত)। ৬ জনের টিম প্রশাসনের অনুমতি নিয়েই কলকাতা থেকে রওনা দেয়। নন্দীগ্রামে ঢোকার আগেই তেখালি ব্রীজের উপর সিপিএমের বাহিনী এদের উপর চড়াও হয়, ঘিরে ধরে শাসাতে থাকে। পুলিশ এসে ৬ জনকে প্রথমে “উদ্ধার” করে, তারপর সারাদিন “ডিটেনশন” এবং শেষে “গ্রেপ্তার” করে। ২১টি মারাত্মক ধারা চাপানো হয়। বেশ কিছু দিন জেল-জীবন কাটিয়ে জামিনে তাঁরা ছাড়া পান। যে মামলা এখনও চলছে।

৫ জানুয়ারী ২০০৭ গ্রামবাসীরা ভূমি উচ্ছেদ প্রতিরোধ কমিটি গড়ে তোলে। এই কমিটিকে তৃণমূল, কংগ্রেস, সিপিআই, এসইউসিআই(সি) সমর্থন করে।

৭ জানুয়ারী ফের গুলি চলে, তাতে ভরত মণ্ডল সহ ৫ জন শহীদ হন। অভিযোগ ওঠে সিপিএম নেতা শঙ্কর সামন্তের বাড়ি থেকে গুলি চলেছে। উত্তেজিত জনতা শঙ্করের বাড়িতে আগুন লাগিয়ে দেয়, সেই আগুনেই শঙ্কর সামন্তের মৃত্যু হয়।

এরপর সেই ভয়ঙ্কর সূর্যোদয়ের ঘটনা -- ১৪ ই মার্চ ২০০৭ সাল। কাশীপুর-বরানগরের মতো আর এক নৃশংস গণহত্যার সাক্ষী থাকল রাজ্য। এরপর বহুবার নন্দীগ্রামে সিপিআই(এমএল) লিবারেশন পার্টির পক্ষ থেকে আন্দোলনে সংহতি জানাতে যাওয়া হয়েছে। তার পরেরটা সবই ইতিহাস।

- নবেন্দু দাশগুপ্ত  

Letter to Election CommissionLetter to the Election Commission

প্রতি,
প্রধান নির্বাচন কমিশনার,
ভারতের নির্বাচন কমিশন

বিষয়: বিজেপি প্রার্থী শুভেন্দু অধিকারীর চরম সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষপূর্ণ বক্তব্য

মহাশয়,
আমরা নিশ্চিত যে মিডিয়ায় বহুল প্রচারিত রিপোর্ট থেকে আপনি নন্দীগ্রাম বিধানসভা কেন্দ্রের বিজেপি প্রার্থী শুভেন্দু অধিকারীর চরম সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষপূর্ণ বক্তব্য সম্পর্কে ইতিমধ্যেই অবগত।

একের পর এক বক্তব্যে শুভেন্দু অধিকারী তাঁর প্রতিদ্বন্দ্বী মমতা ব্যানার্জিকে মুসলিম হিসেবে প্রতিপন্ন করতে ‘বেগম’ সম্বোধন করেছেন, যেন হিন্দুভোট পেতে মুসলিমদের ঘৃণা করা আবশ্যিক।

২৯ মার্চ ২০২১ নন্দীগ্রামে একটি প্রকাশ্য জনসভায় শুভেন্দু অধিকারীর বক্তব্য সমস্ত সীমা অতিক্রম করে গেছে।

তিনি বলেছেন : “যদি বেগম ক্ষমতায় ফিরে আসে তাহলে রাজ্য মিনি পাকিস্তানে পরিণত হবে। নিয়মিত ‘ঈদ মুবারক’ বলা মমতার স্বভাব। এমনকি দোল উৎসবের শুভেচ্ছা জানাতেও তিনি ‘হোলি মুবারক’ বলেন ... ওনারা বিভিন্ন গ্রাম পঞ্চায়েতগুলোতে মিনি পাকিস্তান বানিয়ে রেখেছেন। পাকিস্তান ক্রিকেট ম্যাচ জিতলে সেখানে বাজি ফাটানো, মিষ্টি বিতরণ আর মাংস খাওয়া হয়। আপনারা কি এদের হাতে নন্দীগ্রামকে তুলে দিতে চান? ভেবে দেখুন ...।”

এখানে শুভেন্দু সরাসরি একটি বহুল প্রচলিত উর্দু শব্দ ‘মুবারক’-এর বিরুদ্ধে ঘৃণা ওগড়াচ্ছেন আর মিথ্যা ভয় ছড়াচ্ছেন যে মমতা ব্যানার্জিজিতলে মুসলিমরা রাজ্য দখল করে মিনি পাকিস্তানে পরিণত করবে। ভারতীয় মুসলিমদের পাকিস্তানের সাথে গুলিয়ে দিয়ে তারা ক্রিকেট ম্যাচে পাকিস্তানকে সমর্থন করে এই ভুয়ো প্রচার মুসলিমদের বিরুদ্ধে ঘৃণা ও হিংসা ছড়ানোর একটি বহুল ব্যবহৃত হাতিয়ার। বিরোধী দল তৃণমূলের বেশ কিছু মুসলিম নেতার নাম করেও শুভেন্দু ঘৃণা উসকে দেওয়ার কাজ করেছেন। তৃণমূল নেতা শেখ সুফিয়ানের নাম নিয়ে শুভেন্দু বলেছেন “ম্যাডাম জিতলেও, তারপরেই এখান থেকে হাওয়া হয়ে যাবে। আপনাদের সব কাগজ পত্রের কাজ করতে তখন যেতে হবে সুফিয়ানের বাড়ি। মহিলাদের পক্ষে সুফিয়ানের বাড়ি যাওয়া কি আদৌ নিরাপদ? কারোর পক্ষেই কি নিরাপদ?” শুধুমাত্র মুসলিম হওয়ার কারণে একজন রাজনৈতিক নেতাকে মহিলাদের জন্য বিপজ্জনক বলে দাগিয়ে দেওয়া চরম সাম্প্রদায়িক।

৭ মার্চ, ২০২১-এ দেওয়া একটি বক্তব্যে শুভেন্দু অধিকারী আবারো উর্দু ঘেঁষা শব্দ ব্যবহার করে বোঝাতে চান যে মুসলিমদের ঘনিষ্ঠ হওয়ার কারণে তাঁর প্রতিদ্বন্দ্বীর ভোট পাওয়া উচিত নয়। মুসলিমদের ‘অনুপ্রবেশকারী’ তকমা দিয়ে বলেন, “এখানে কেউ মমতাকে বাংলার মেয়ে হিসেবে স্বীকার করে না। মমতা হল অনুপ্রবেশকারীদের ‘ফুফু’ আর রোহিঙ্গাদের খালা।” রোহিঙ্গা শরণার্থীদের বিরুদ্ধে বিদ্বেষ ও ঘৃণা ছড়িয়ে ভোট কুড়োনোর চেষ্টাও এখানে লক্ষ্যণীয়।

আমরা দাবি জানাচ্ছি, প্রকাশ্য দিবালোকে খোলাখুলি এহেন বিদ্বেষপূর্ণ ভাষণের বিরুদ্ধে নির্বাচন কমিশন অবিলম্বে ব্যবস্থা নিক।

নির্বাচন কমিশন উপযুক্ত ব্যবস্থা নিতে ব্যর্থ হলে বোঝা যাবে এই ধরনের সাম্প্রদায়িক ঘৃণা ছড়ানোর বক্তব্যে তাদের অনুমোদন আছে। ভারতের নির্বাচনী গণতন্ত্রের প্রহরী যারা তাদের দ্বারাই এধরণের ঘৃণাপূর্ণ বক্তব্যে সায় দেওয়া ইতিহাস কখনো ক্ষমা করবে না।

কবিতা কৃষ্ণাণ সিপিআই(এমএল)
কেন্দ্রীয় কমিটির পক্ষে

The new labor code created unprotected, insecure slave workersunprotected, insecure slave labor

১ এপ্রিল থেকে দেশব্যাপী যে শ্রম কোড লাগু হওয়ার কথা ছিল, তা সাময়িকভাবে স্থগিত থাকছে। বেশ কিছু রাজ্য কোডগুলোর নিয়ম বিধি বা রুলস এখনো তৈরি করেনি। সংবিধানে শ্রম বা লেবার যুগ্ম তালিকাভুক্ত থাকায় তাই এখন তা রূপায়ন করা যাচ্ছে না। বিগত যে বছরটি আমরা প্রত্যক্ষ করি নজিরবিহীন বেকারত্ব ও পরিযায়ী শ্রমিকদের হৃদয়বিদারক অমানবিক দুর্দশা, সেই অভিশপ্ত বছরেই মোদী সরকার সংসদে পাশ করালো তিনটি শ্রম বিল – শ্রম সম্পর্ক বা ইন্ডাস্ট্রিয়াল রিলেশনস, পেশাগত সুরক্ষা, স্বাস্থ্য ও কর্মস্থলের অবস্থা (অকুপেশনাল সেফটি, হেলথ অ্যান্ড ওয়ার্কিং কন্ডিশন্স) এবং সামাজিক সুরক্ষা বা সোশ্যাল সিকিউরিটি। দেশের বর্তমান ‘সেকেলে ও জটিল শ্রম কানুন’গুলোকে আরও আধুনিক ও সহজ সরল করার শয়তানি যুক্তির আড়ালে। তার আগে, ২০১৯-এ পাশ করানো হয় বেতন বিধি বা কোড অন ওয়েজেস। মোট ৪৪টি কেন্দ্রীয় শ্রম আইনকে চারটি শ্রম কোডে মিশিয়ে যে নয়া শ্রম আইন তৈরি হলো, কেন্দ্রীয় শ্রমমন্ত্রক মনে করছে এটাই হয়ে উঠবে আগামীদিনের গেম চেঞ্জার।

২০১৯ সালে আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা (আইএলও) শতবার্ষিকীতে পা দিল। গোটা দুনিয়া জুড়ে শ্রমিকদের আর্থিক, সামাজিক, পেশাগত ক্ষেত্রে ক্রমাবনতি ও বিশ্বজোড়া বেড়ে চলা কুৎসিত আর্থিক বৈষম্যকে ঠেকাতে আইএলও তার শতবার্ষিকীর প্রধান স্লোগান রাখে শ্রমিকদের স্বার্থবাহী ‘মানবকেন্দ্রীক’ বিকাশ বা হিউমান সেন্ট্রিক ডেভেলপমেন্ট। শ্রমিক ইউনিয়নগুলোকে আরো বেশি দরকষাকষির অধিকার সুনিশ্চিত করা, তাঁদের ন্যূনতম মজুরির লক্ষনীয় বৃদ্ধি, শ্রম আইনকে আরও বেশি শ্রম স্বার্থবাহী করা, সামাজিক সুরক্ষা মজবুত করা, প্রভৃতি বেশ কিছু অবহেলিত ক্ষেত্রে স্বাক্ষরকারী দেশগুলো যাতে রীতিমতো নজর দেয় তা একের পর এক পলিসি ঘোষণার মাধ্যমে তারা জানায়। কিন্তু, স্বাক্ষরকারী দেশ হিসাবে মোদীর ভারত করলো ঠিক তার উল্টো।

তখনও কিন্তু দুনিয়া জুড়ে কোভিড১৯ হানা দেয়নি। আমাদের দেশ কোভিড হানার ঢের আগে থেকেই আর্থিক সংকটে জেরবার হতে শুরু করে। শ্রমিকশ্রেণী সহ আম জনতার সংকুচিত ক্রয় ক্ষমতা ভোগব্যয়ের সংকট ডেকে আনে। ভারতের কর্মহীনতা ৪৫ বছরের মধ্যে পৌঁছে গেল সর্বোচ্চ সীমায়। আর, প্যান্ডেমিকের আক্রমণের পর ভারতে এই প্রথম নেমে আসে ‘টেকনিক্যাল রিসেশন’, কোটি কোটি শ্রমজীবী মানুষ রুটি রুজি খোয়ালেন, শুধুমাত্র গতবছর এপ্রিলেই ১২.২ কোটি শ্রমজীবী মানুষ কাজ হারালেন, আর সেন্টার ফর মনিটারিং ইন্ডিয়ান ইকনমির হিসাব অনুযায়ী ২০১৯-২০’র সাপেক্ষে এপ্রিলে কর্মসংস্থান হ্রাস পায় ৩০ শতাংশ। গোটা দেশ জুড়ে গতবছর লকডাউন ঘোষিত হলো ২৪ মার্চ। তারপর তিন তিন বার তার মেয়াদ বাড়ানো হয়। গোটা দুনিয়ায় এরকম নির্মম লকডাউন আর কোথায় দেখা যায়নি। আর, ঠিক এই পৃষ্ঠভূমির উপর দাঁড়িয়ে, অতিমারির সুযোগকে কাজে লাগিয়ে, মোদীর ফ্যাসিস্ট রাষ্ট্র পাশ করালো তিনটি শ্রম কোড – নতুন কাজের সুযোগ তৈরি ও বিনিয়োগ বৃদ্ধির যুক্তিকে সামনে খাঁড়া করে। লকডাউনে বিধ্বস্থ বিপর্যস্থ অগণন মানুষকে আর্থিক সুরাহা দেওয়া তো দুরস্থান, তাঁদের আরো বড় সর্বনাশ ডেকে আনতে হরণ করা হলো এতদিনকার অর্জিত যাবতীয় আইনি অধিকার ও সুযোগ সুবিধা।

কাজের নতুন সুযোগ খুলে দেওয়ার লক্ষ্যে যে শ্রমকোড আনার কথা মোদী সরকার বলছে, বাস্তব চিত্রটা ঠিক কি?

ভারতের আর্থিক বৃদ্ধি হয়েছে ইনফর্মাল ক্ষেত্রের বিপুল বিকাশ ঘটিয়ে। ১৯৯১’র পর থেকে নব্য উদার অর্থনীতি বিগত ২২ বছর যাবৎ মাত্র ২.২ কোটি কাজ তৈরি করেছে, যার মধ্যে ৯২ শতাংশই ইনফর্মাল। ২০১৮-১৯’র আর্থিক সমীক্ষা অনুযায়ী ভারতের সমগ্র শ্রমশক্তির ৯০ শতাংশই ইনফর্মাল। এরমধ্যে ৭৫ শতাংশ ইনফর্মাল শ্রমিকের রুটি রুজি কেড়ে নেয় অতিমারী। অ্যাকশন এইড একটি সমীক্ষায় এই তথ্য প্রকাশ করেছে। আর, বিশ্বব্যাঙ্ক এক রিপোর্টে দেখিয়েছে, এপ্রিলে ১.২ কোটি ভারতবাসী নতুন করে যুক্ত হয়েছেন দারিদ্র সীমার তালিকায়। অক্টোবরের আরেকটা রিপোর্টে বিশ্ব ব্যাঙ্ক দেখিয়েছে, যে কোভিড১৯ কী মারাত্মকভাবে ইনফর্মাল সেক্টরের শ্রমিকদের উপর আঘাত নামিয়েছে। সেই রিপোর্টে বলা হয়েছে, “ইনফর্মাল সেক্টরের শ্রমিকরাই বিপুল সংখ্যায় কাজ হারিয়েছেন। আর যে সমস্ত পরিবারগুলো চরম দারিদ্রে নিক্ষিপ্ত হয়েছে, সেই পরিবারগুলো বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই নির্ভরশীল ছিল ওই ইনফর্মাল অর্থনীতির উপরে। ইনফর্মাল সেক্টরের তুলনায় সংগঠিত বা ফর্মাল ক্ষেত্রগুলো কিছু মুনাফা অর্জন করলেও তা এসেছে কর্মীদের সংখ্যা কমিয়ে, বেতন হ্রাস করে, যা আখেরে বাড়িয়ে তুলেছে আর্থিক বৈষম্য”। আর, সমস্ত মহলই এখন এটা মেনে নিয়েছে যে প্যান্ডেমিক পরবর্তী অর্থনীতি আরও বেশি ইনফর্মাল নির্ভর হয়ে পড়বে।

জেএনইউ’র অধ্যাপক মেহরোত্রা একটি হিসাব কষে দেখিয়েছেন, ২০১২ সালের পর থেকেই কর্মসংস্থানের হার কমতে শুরু করেছে আর বিগত সাত বছর ধরে গ্রামীণ ও শহুরে ক্ষেত্রে প্রকৃত মজুরি হয় স্থিতাবস্থায় রয়েছে বা কমেছে। ২০২০ সালে এই প্রবণতা আরও নেতিবাচক হয়েছে, যা ২০২১ পর্যন্ত কমতেই থাকবে। ২০১৯’র আগে থেকেই অকৃষি ক্ষেত্রে অর্থনীতি যে মন্থরতার মুখ দেখতে শুরু করে, ২০১৯’র পর তা আরও নিম্নগামী হবে।

এরই পাশাপাশি, আইএলও’র ২০২০-২১’র বিশ্ব মজুরি রিপোর্ট (গ্লোবাল ওয়েজ রিপোর্ট) দেখিয়েছে, ২০১৫ থেকে ২০১৮ পর্যন্ত প্রতিবেশী দেশগুলোর তুলনায় (অর্থাৎ, বাংলাদেশ-নেপালপাকিস্থান-শ্রীলঙ্কা) ভারতের প্রকৃত মজুরি সবচেয়ে কম বৃদ্ধি পেয়েছে। আর, ভারতই হচ্ছে একমাত্র দেশ, ২০১৮ সালে মজুরির ক্ষেত্রে যার কোনো বৃদ্ধিই হয়নি। ২০১৯’র পরিসংখ্যান এখনও পাওয়া যায়নি।

লকডাউনের মাশুল ভারতের শ্রমিকশ্রেণিকে বিরাট মাত্রায় দিতে হয়। ২০১৭-১৮’র সাপেক্ষে এই লকডাউনের সময়ে ক্যাজুয়াল, স্থায়ী ও বেতনভুক কর্মীদের মাসিক মজুরি হ্রাস প্রাপ্ত হয় মোট ৩৩,৮০০ কোটি টাকা (ইন্দিরা গান্ধী ইনস্টিটিউট অফ ডেভেলপমেন্ট রিসার্চ-এর সমীক্ষা অনুযায়ী)। ক্যাজুয়াল ও নিয়মিত/ বেতনভুক কর্মীরা এই সময় মোট বেতন থেকে যে পরিমাণ খুইয়েছেন তা যথাক্রমে ২৩.৪ ও ১৬.৮ শতাংশ।

এরকম এক পরিস্থিতিতে শ্রমজীবী মানুষের বেতন/মজুরির নিরাপত্তা বা সুরক্ষা দেওয়াটাই মোদী সরকারের অগ্রাধিকারের রাখার বদলে এই বিপুল শ্রমজীবী মানুষের রোজগারই আরো বিপন্ন হয়ে গেল সংসদে পাশ হওয়া বেতন বিধিতে। গোটা দুনিয়া জুড়ে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান যখন অর্থনীতিকে পুনরুদ্ধারের জন্য মজুরির সুরক্ষার পাশাপাশি মজুরি বৃদ্ধির পরামর্শ দিচ্ছে, মোদী সরকার ঠিক সেই সময়ে এতোদিন শ্রমিকদের যা ছিঁটেফোটা অধিকার ও সুরক্ষা ছিল তা বেমালুম লোপাট করে চরম অরক্ষিত অবস্থায় ঠেলে দিল কর্পোরেট দানবদের কবলে।

বিন্দুমাত্র সুরক্ষার বদলে পয়লা এপ্রিল থেকে যে শ্রম কোড লাগু হতে চলেছে, তা নিয়োগকর্তাকে দিল যখন তখন ছাঁটাই করার অবাধ অধিকার। এই কোডের সুবাদে গড়ে উঠতে চলেছে নব্য দাস শ্রমিকদের বিপুল এক বাহিনী ভারতীয় রাষ্ট্র যাদের দেবে না কোনো সুরক্ষা, নিরাপত্তা। শ্রম কোড পাশ হওয়ার আগেই দেশের ৪০ শতাংশ শ্রমিক বিধিবদ্ধ ন্যূনতম মজুরি থেকে বঞ্চিত। এরপর পরিস্থতি কোথায় গিয়ে ঠেকবে তা একমাত্র ভবিষ্যৎই বলবে।

১৮ বছর আগে ভারতের দ্বিতীয় জাতীয় শ্রম কমিশন শ্রম আইনগুলোকে এক ছাতার তলায় আনার যে সুপারিশ করে, মোদী সরকার সেটাই রূপায়িত করার সিদ্ধান্ত নেয় পাঁচ বছর পর। মজার ব্যাপার হলো, যে জাতীয় শ্রম কমিশনের সুপারিশগুলোকে বাস্তবায়িত করতে মোদী সরকার এতো তৎপরতা দেখালো, প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পর আজ পর্যন্ত এই সর্বোচ্চ ত্রিপক্ষীয় মঞ্চের একটি বৈঠকও ডাকার তিনি সময় পেলেন না। নতুন শ্রম কোডে শিল্প সম্পর্কে আমূল বদল আনবে ফিক্সড টার্ম এমপ্লয়মেন্ট। এটা হলো এমনই এক ধরন যা স্থায়ী কাজ বা স্থায়ী কর্মীর এযাবৎ বর্গটাকেই বাতিল করে দিল। নিয়োগকর্তা কোনো দালাল বা কন্ট্রাক্টর ছাড়াই সরাসরি যে কোনো শ্রমিকের সাথে পারস্পরিক চুক্তির ভিত্তিতে নির্দিষ্ট এক সময়সীমার জন্য তাঁকে নিয়োগ করতে পারবেন আর সেই সময় উত্তীর্ণ হলে তাকে বিদায় জানানোর পুরো আইনি অধিকার থাকবে। তারজন্য নিয়োগ কর্তাকে দিতে হবে না এক কানা কড়িও ক্ষতিপূরণ, যা আগের আইনে ছিল। দুটো অত্যন্ত অসম পক্ষের মধ্যে এই চুক্তির ক্ষেত্রে নিয়োগকর্তাই যে থাকবে প্রাধান্যমূলক অবস্থানে, তা বলাই বাহুল্য। এই অসুরক্ষিত অবস্থায় যে কোনো পারস্পরিক বোঝাপড়া অনেক ধরনের অন্যায্য শ্রম শর্তের ভিত্তি তৈরি করে রাখে। যেমন, নিয়োগকর্তা শ্রমিককে বেশিক্ষণ কাজ করিয়ে নিতে বাধ্য করতে পারে, তার মজুরি, ছুটি নিয়ে অন্যায় বা অন্যায্য আচরণ করতে পারে। তাঁকে দিয়ে স্থায়ী কর্মীর কাজ করানোর সবুজ সংকেত এবার আইনি বৈধতা পেল।

ভিত্তিতে মোদী সরকার শ্রম আইনগুলোকে চারটে শ্রম কোডে মিশিয়ে দেয়, সেই শ্রম কমিশনই ২০০২ সালে জানিয়েছিল যে, কোনো স্থায়ী কাজের জন্য একজন শ্রমিককে দু’বছরের বেশি অস্থায়ী বা ক্যাজুয়াল হিসাবে নিয়োগ করে রাখা যাবে না।

এই আইআর বিলটি যখন স্ট্যান্ডিং কমিটির কাছে ২০১৯ সালে যায় তখন ওই কমিটি স্পষ্ট করে জানায় যে কোন কোন শর্তে, কোন কোন কাজের ধরনে, ন্যূনতম ও সর্বাধিক কত সময়সীমার জন্য এই ফিক্সড টার্ম কর্মীদের নিয়োগ করা হবে, তা যেন স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা থাকে। কিন্তু দেখা গেল, আইআর কোড এই সমস্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোকে পুরোপুরি এড়িয়ে গেল।

প্রসঙ্গতঃ উল্লেখ্য, আইএলও তার এক রিপোর্টে (২০১৬) জানিয়েছে বিভিন্ন দেশ কিভাবে এই ফিক্সড টার্ম ধরনকে নিয়ন্ত্রণ করতে শুরু করেছে। ভিয়েতনাম, ব্রাজিল এবং চীন পরপর দু’বারের বেশি এই ফিক্সড টার্ম কন্ট্রাক্টকে নবীকরণ করতে দিচ্ছে না। ফিলিপাইন্স, বৎসোয়ানা ফিক্সড টার্ম কাজকে ছাড়পত্র দিচ্ছে মাত্র এক বছরের জন্য। আর, গোটা কর্মী সংখ্যার মাত্র ২০ শতাংশের অধিক ফিক্সড টার্ম ও এজেন্সি শ্রমিকদের নিয়োগ করার ছাড়পত্র দেয়নি ইতালি।

সামাজিক সুরক্ষা কোড

কোড অন সোশ্যাল সিকিউরিটি বা সামাজিক সুরক্ষা কোড লোকসভায় পেশ হয় ১৯ সেপ্টেম্বর ২০২০-তে। মোট ৯টি কেন্দ্রীয় আইনের অবলুপ্তি ঘটিয়ে তৈরি হলো এই কোড। সমস্ত অসংগঠিত শ্রমিকদের সামাজিক সুরক্ষা নিশ্চিত করার যে দাবি এই কোডে করা হয়েছে তা পুরোপুরি এক ভাওতা। যে জাতীয় শ্রম কমিশনের সুপারিশের ভিত্তিতে তৈরি হলো এই কোড, সেই কমিশনই খুব জোরালোভাবে সর্বজনীন, সর্বাঙ্গীণ সামাজিক সুরক্ষার বন্দোবস্ত করার সুপারিশ করে। সেখানে এটাও বলা হয়, কোনো ধরনের শ্রমিককেই সামাজিক সুরক্ষা থেকে বঞ্চিত করা যাবে না। জাতীয় শ্রম কমিশনের সুপারিশ ছিল, (১) সমস্ত ধরনের সংস্থার ক্ষেত্রে সামাজিক সুরক্ষার সুযোগ সম্প্রসারিত করতে হবে, (২) এই সুযোগ পেতে গেলে মজুরির যে ঊর্দ্ধসীমা বর্তমানে রয়েছে, তা বাতিল করা, (৩) সামাজিক সুরক্ষা প্রকল্পের যে সমস্ত বন্দোবস্ত রয়েছে সেগুলোকে একটার অধীনে নিয়ে আসা। এ ছাড়াও, সমস্ত ধরনের সুযোগ সুবিধা পাওয়ার জন্য কর্মী ও নিয়োগকর্তার কাছ থেকে একটাই কন্ট্রিবিউশান নেওয়া হোক আর সেটার ঊর্দ্ধসীমাও বেঁধে দেওয়া হোক। কিন্তু এই সমস্ত সুপারিশের একটাও স্থান হলো না নতুন শ্রম কোডে।

এবার সংস্থার আয়তন অনুযায়ী অর্থাৎ কর্মী সংখ্যা অনুযায়ী কিছু সুযোগ সুবিধাকে নতুন কোড বাধ্যতামূলক করেছে। যেমন, পেনশন বা চিকিৎসা সুবিধা সেই সংস্থাগুলোতে বাধ্যতামূলক যেখানে কর্মীর সংখ্যা ১০ অথবা ২০। কিন্তু, বাদবাকি সমস্ত অসংগঠিত ক্ষেত্রের শ্রমিকেরা, যেমন যে সংস্থায় কর্মীর সংখ্যা ১০-এর কম, বা স্বনিযুক্ত, তারা বাদ চলে গেলেন। তারা একমাত্র সংশ্লিষ্ট সরকারের কোনো একটি সামাজিক সুরক্ষা প্রকল্পের অধীনে আসতে পারেন, যদি সরকার তেমন কোনো প্রকল্প ঘোষণা করে। এইভাবে, বিশাল সংখ্যক এই সমস্ত শ্রমিকদের নির্ভর করে থাকতে হবে সরকারী ঘোষণার বা তার দয়ার উপর। এই প্রসঙ্গে উল্লেখ করা দরকার যে, কেন্দ্রীয় সরকারের পিরিয়ডিক লেবার ফোর্স সার্ভে রিপোর্টে (২০১৮-১৯) বলা হয়েছে অকৃষি ক্ষেত্রে ৭০ শতাংশ নিয়মিত মজুরি প্রাপক বা বেতনভুক কর্মীদের কোনো ধরনের লিখিত কন্ট্রাক্ট নেই, আর, ৫২ শতাংশ কর্মীর নেই কোনো ধরনের সামাজিক সুরক্ষা। সংসদের স্ট্যান্ডিং কমিটি অন লেবার (২০২০)-র সুনির্দিষ্ট প্রস্তাব ছিল সর্বজনীন সামাজিক সুরক্ষা অর্জনের লক্ষ্যে এই কোড যেন একটা নির্দিষ্ট সময়সীমা বেঁধে দেয়। আরও বেশি বেশি সংস্থাওগুলোকে এর আওতায় নিয়ে আসা এবং সুযোগ সুবিধাগুলোকে নির্দিষ্ট করা, সংস্থাগুলোর কর্মী সংস্থা বেঁধে না দেওয়া এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, গোটা কৃষিক্ষেত্রকে এর আওতায় নিয়ে আসার সুপারিশ ছিল। ‘কর্মী’র পরিভাষাকে সম্প্রসারিত করে আশা, অঙ্গনওয়াড়ী, অসংগঠিত শ্রমিক ও তার আওতায় কৃষি শ্রমিকদেরও যুক্ত করার প্রস্তাব ছিল, আন্তঃরাজ্য পরিযায়ী শ্রমিকদের জন্য আলাদা এক তহবিল গঠন, অসংগঠিত শ্রমিকদের হাতে যখন কাজ থাকবে না তখন তাঁদের স্বার্থে এক বিমার ব্যবস্থা করা এবং কয়েকটি ক্ষেত্র, যেমন, লৌহ আকরিক খনি, বিড়ি শ্রমিকদের জন্য শ্রমিক কল্যাণ তহবিল ফের চালু করার প্রস্তাব ছিল। কিন্তু সেই সমস্ত সুপারিশগুলো আজ পর্যন্ত কার্যকর করা গেল না।

১০-এর অধিক নির্মাণ শ্রমিক যে সংস্থার সাথে যুক্ত, তাঁরা সামাজিক সুরক্ষার অধীনে আসবেন, কিন্তু বাড়ি বাড়ি নির্মাণ কাজের সাথে যুক্ত বিপুল সংখ্যক শ্রমিকেরা নির্মাণ বোর্ডের সুযোগ সুবিধা থেকে বঞ্চিত হবেন। ৫০ লক্ষ টাকার উপর খরচ হয়নি এমন নির্মাণ কাজের সাথে যুক্ত শ্রমিকেরা এই বোর্ডের সুযোগ পাবেন না। প্রসঙ্গত আরও উল্লেখ্য, আইএলও শ্রমিকদের সামাজিক সুরক্ষার দিকটিকে নিছক কোনো আর্থিক সাহায্য হিসাবে না দেখে, তাদের আন্তর্জাতিক সনদে এটাকে মানবাধিকার হিসাবে স্বীকৃতি দিয়েছে।

ফিক্সড টার্ম কর্মীদের গ্রাচুইটি

২০২০-র কোড অনুযায়ী, যে সমস্ত কর্মীরা লাগাতার ৫ বছর কাজ করেছেন, তাঁরা গ্রাচুইটি পাবেন। কিন্তু, ফিক্সড টার্ম কর্মীর কাজের চুক্তি যদি আগেই শেষ হয়ে যায়, তবে ওই সময় সীমা এক্ষেত্রে প্রযোজ্য হবে না। নতুন কোড জানাচ্ছে, ফিক্সড টার্ম কর্মীর ক্ষেত্রে গ্রাচুইটি তাঁর নিয়োগকর্তা দেবেন প্রো-রাটা ভিত্তিতে, অর্থাৎ, গোটা ফিক্সড টার্ম পর্যায়ে প্রাপ্য মজুরির অনুপাতে। কিন্তু, আইআর কোড জানিয়েছে যে সমস্ত ফিক্সড টার্ম কর্মীরা এক বছর পূর্ণ করেছে তারাই গ্রাচুইটির আওতায় আসবেন। সামাজিক সুরক্ষা কোড ও আইআর কোডে ফিক্সড টার্ম কর্মীর গ্রাচুইটির ক্ষেত্রে দুধরনের কথা বলা আছে। এ কথা স্পষ্ট নয় যে, এক বছরের কম হলে ফিক্সড টার্ম কর্মী সামাজিক সুরক্ষা কোডের শর্ত অনুযায়ী গ্রাচুইটি পাবেন কি পাবেন না।

মহিলাদের ক্ষেত্রে কি বলেছে এই শ্রম কোড

মহিলাদের আরও কাজের সুযোগ দেওয়ার বাহানায় সমস্ত ধরনের কাজেই মহিলাদের যুক্ত করার অবাধ অধিকার দিয়ে দেওয়া হলো সকাল ৭.০০-র আগে ও রাত ৭.০০-র পরেও। এতোদিন, রাতের শিফটে মহিলাদের নিয়োগ করা যেতো না। যেখানে ঝুঁকিপূর্ণ কাজ থাকবে, সেখানে সরকার নিয়োগকর্তাকে মহিলাদের ‘যথাযথ সুরক্ষা ব্যবস্থা’ বজায় রাখার জন্য আবেদন জানাবে। কিন্তু, সেই সমস্ত সুরক্ষা ব্যবস্থা (বিধি নয়) লঙ্ঘন করলে কি ধরনের শাস্তি মূলক পদক্ষেপ সরকার নেবে তার কোন উল্লেখ কোডে নেই। ফলে, সমস্ত ধরনের ঝুঁকিপূর্ণ কাজে মহিলাদের নিয়োগ করার ক্ষেত্রে এখন আর কোনো বাধা রইল না।

মাতৃত্বকালীন ছুটির ক্ষেত্রে আগেও নানান কন্টকিত শর্তেসেটাকে অকেজো করে দিয়েছিল মালিকপক্ষ। এবরও এমন সব শর্ত বহাল থাকলো যে সন্তান সম্ভবা মহিলাদের কর্মচ্যুতির সংখ্যা অনেক বেড়ে যাবে।

এদিকে, শ্রম কোড ১৮ বছরের কম বয়সীদের খনিতে নিয়োজিত করা নিষিদ্ধ করেছে। আবার, ১৬ বছরের ঊর্দ্ধে যাদের বয়স, তাদের অ্যাপ্রেন্টিস হিসাবে নিয়োগ করার ছাড়পত্র দিয়েছে।

সর্বজনীন সামাজিক সুরক্ষার লক্ষ্যে এর আগে জাতীয় শ্রম কমিশনগুলো বিভিন্ন সময়ে নানা সুপারিশ ও প্রস্তাব সরকারের কাছে দেয়। যেমন, ৪৪-৪৫তম জাতীয় শ্রম কমিশন নির্দিষ্টভাবে স্কীম কর্মীদের ‘কর্মচারি’ হিসাবে সরকারী স্বীকৃতি, তাঁদের জন্য ন্যূনতম মজুরি এবং ইএসআই, পিএফ’র মতো সামাজিক সুরক্ষা চালু করার প্রস্তাব দিয়েছিল। দ্বিতীয় জাতীয় শ্রম কমিশন ২০০২ সালে ক্ষুদ্র সংস্থার (যখানে ২০-র কম শ্রমিক কর্মরত) জন্য পৃথক এক আইন রচনার কথা বলে। সেখানে তাদের প্রস্তাব ছিল, ক্ষুদ্র সংস্থাগুলোকে পুরোপুরি আইনের আওতা থেকে মুকুব না করে বরং মজুরি প্রদান–কল্যাণমূলক কাজ–সামাজিক সুরক্ষা প্রবর্তন, ছাঁটাই ও ক্লোজারের ক্ষেত্রে কিছু নমনীয় শর্ত আরোপ করা হোক। অর্জুন সেনগুপ্তের নেতৃত্বাধীন ন্যাশনাল কমিশন ফর এন্টারপ্রাইজেস ইন দ্য আন অরগানাইসড সেক্টর (এনসিইইউএস) কৃষি ও কৃষি বহির্ভূত শ্রমজীবী মানুষদের জন্য বেশ কয়েকটি সুপারিশ করে সামাজিক সুরক্ষা এবং কাজের ন্যূনতম শর্তাবলি নির্ধারণ করার লক্ষ্যে। প্রস্তাব ছিল উল্লিখিত দুটি ক্ষেত্রের জন্য আলাদা আলাদা বিল আনা হোক।

এটা জেনে রাখা ভালো যে, বেশিরভাগ দেশই ছোট, ক্ষুদ্র ক্ষেত্রগুলোকে পুরোপুরি আইনের বাইরে রাখে না। আইএলও তার রিপোর্টে জানিয়েছে যে তার মাত্র দশ শতাংশ সদস্য দেশ ক্ষুদ্র ও ছোট শিল্পগুলোকে সমস্ত আইনের বাইরে রেখেছে। বেশিরভাগ দেশ এপ্রশ্নে একটা মিশ্র বা মাঝামাঝি পন্থা অনুসরণ করে চলেছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, সংযুক্ত রাষ্ট্র (ইউকে), দক্ষিণ আফ্রিকা ও ফিলিপাইন্স সর্বজনীন সামাজিক সুরক্ষার নীতি অনুসরণ করে চলে, যদিও প্রথম দু’টি দেশে গৃহ পরিচারিকারা এর আওতায় নেই।

একদিকে, আমজনতার উপর দমন তীব্র থেকে তীব্রতর করা, সমস্ত আইনি সুরক্ষা – সুযোগ সুবিধা কেড়ে নেওয়া, গোটা দেশকে কারাগার বানানো আর বিপরীতে মুষ্ঠিমেয় কর্পোরেটদের স্বার্থেদেশ ও রাষ্ট্রকে দাঁড় করিয়ে দেওয়া – এই হলো মোদী সরকারের ফ্যাসিস্ট রাজের অন্যতম আরেকটা দিক। এর বিরুদ্ধে ক্রমেই সোচ্চার হয়ে উঠেছে নানা স্তরের মানুষ – কৃষক, শ্রমিক ছাত্র যুব সম্প্রদায়। সামনের দিন বিরাট বিরাট আন্দোলনের ক্ষেত্রগুলো তৈরি হয়ে উঠছে।

- অতনু চক্রবর্তী 

Amit Shah's false promise about CAAAmit Shah's false promises

গত ৩০ মার্চ আনন্দবাজারে প্রকাশিত সাক্ষাৎকারে অমিত শাহ এনআরসি এবং সিএএ নিয়ে আবার একরাশ বাজে কথা বলেছে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বক্তব্য, করোনার জন্য এখন সিএএ ২০১৯-এর মাধ্যমে নাগরিকত্ব দেওয়া সম্ভব নয়। অথচ এই করোনাকালেই সেপ্টেম্বর ২০২০-তে যে তিনটি কৃষি আইন পাশ হয় তার রুলস বা নিয়মাবলী প্রকাশিত হয় ২০২০-র অক্টোবর, অর্থাৎ এক মাসের মধ্যেই। তাহলে ২০১৯-এর ডিসেম্বরে পাশ হওয়া সিএএ আইনের রুলস ১৪ মাস কেটে যাওয়ার পরেও প্রকাশিত হল না কেন? এই প্রশ্নের কোনো সদুত্তর নেই।

অমিত শাহ্ আরও বলেছে, “যখন এনআরসি আসবে, তখন বিরোধ করবেন। সিএএ-কে কেন আটকাচ্ছেন? সিএএ-তে নাগরিকত্ব না নিলে, না নিতে পারেন। অসমে সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশে এনআরসি হচ্ছে।” অর্থাৎ স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বোঝাতে চাইছে এনআরসি আর সিএএ-র মধ্যে কোনো যোগসূত্র নেই, এগুলো আলাদা। অথচ এই স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীই কিন্তু এপ্রিল ২০১৯-এ গোটা দেশকে “ক্রোনলজি” বুঝিয়েছিলেন, যে আগে সিএএ হবে তারপর দেশজুড়ে এনআরসি হবে।

অসমের নির্বাচনী ইস্তেহারেও বিজেপি নতুন করে আরেকটা এনআরসি করার কথা বলেছে। ওরা অসমে ১৯ লক্ষ মানুষের নাম বাদ দিয়েও খুশী নয়, আরও কয়েক লক্ষ বাঙালিকে বেনাগরিক করতে চাইছে ওরা। সিএএ ২০১৯ যদি সত্যি উদ্বাস্তুদের নিঃশর্ত নাগরিকত্ব দেওয়ার আইন হয় তাহলে সেই আইনে ২০১৪ বা ২০১৯-এর ভোটার লিস্টে নাম থাকা সকলকে ভারতের নাগরিক হিসেবে মান্যতা দেওয়া হল না কেন?

সিএএ ২০১৯ আইনের ২ নম্বর ধারা অনুযায়ী আফগানিস্তান, বাংলাদেশ অথবা পাকিস্তান থেকে হিন্দু, শিখ, বৌদ্ধ, জৈন, পার্সি বা খ্রিষ্টান ধর্মাবলম্বী কেউ ৩১ ডিসেম্বর ২০১৪-র আগে ভারতে প্রবেশ করে থাকলে এবং কেন্দ্রীয় সরকার তাকে পাসপোর্ট অ্যাক্ট ১৯২০ এবং ফরেনার্স অ্যাক্ট ১৯৪৬-এর আওতায় অব্যাহতি দিয়ে থাকলে তাকে “ইললিগাল মাইগ্রান্ট” অর্থাৎ ‘অনুপ্রবেশকারী’ হিসেবে গণ্য করা হবে না। অর্থাৎ এই আইনের মাধ্যমে পূর্ব বঙ্গের উদ্বাস্তুদের ‘অনুপ্রবেশকারী’ তকমা থেকে মুক্ত হতেই বেশ কিছু শর্ত পূরণ করতে হবে, যেমন ভারতে প্রবেশের তারিখ হতে হবে ২০১৪-র ৩১ ডিসেম্বরের মধ্যে। এছাড়া পাসপোর্ট অ্যাক্ট ১৯২০ এবং ফরেনার্স অ্যাক্ট ১৯৪৬-এর আওতায় অব্যাহতি পাবে কেবল তারাই যারা ধর্মীয় উৎপীড়নের কারণে বা আশঙ্কায় ভারতে আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়েছে।

এই শর্তাবলি পূরণ হলেও কিন্তু উদ্বাস্তুরা নাগরিকত্ব পাবেন না, কেবল মাত্র ভারতের নাগরিকত্বের জন্য আবেদন করার যোগ্যতা অর্জন করবেন। নাগরিকত্ব পাওয়ার বিষয়ে সিএএ ২০১৯-র ৩ নম্বর ধারায় পরিষ্কার বলা হয়েছে যে “রেজিস্ট্রেশন সার্টিফিকেট” অথবা “ন্যাচারালাইজেশন সার্টিফিকেট” পাওয়ার জন্য আবেদন করতে হবে এবং কিছু শর্তমেনেই এইরকম সার্টিফিকেট দেওয়া হবে। তদুপরি, সিএএ ২০১৯-এর ৬ নম্বর ধারা অনুযায়ী নাগরিকত্বের আবেদন করার আগে আবেদনকারীকে ন্যূনতম ৬ বছর ভারতে বসবাসকারী অথবা ভারত সরকারের অধীনে কর্মরত হতে হবে। সিএএ ২০১৯-এর রুলসে এই সমস্ত শর্ত সমেত নাগরিকত্বের জন্য আবেদন করার প্রক্রিয়ার বিস্তারিত বিবরণ থাকবে। মতুয়া বা নমঃশূদ্র উদ্বাস্তুদের দাবি অনুযায়ী শর্তহীন নাগরিকত্ব দেওয়া সিএএ ২০১৯ আইনের আওতায় কখনোই সম্ভব নয়। কেন্দ্রের মোদী সরকার ইচ্ছাকৃতভাবেই এই রুলস নির্বাচনের আগে প্রকাশ করেনি যাতে নাগরিকত্ব-র মুলো ঝুলিয়ে দলিত উদ্বাস্তুদের ঝুটি ধরে সমর্থন আদায় করতে পারে। মোদী সরকারের এই আচরণ প্রতারণা ছাড়া কিছুই নয়।

সাক্ষাৎকারে অমিত শাহ বলেন যে এনআরসি সংক্রান্ত কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি, তাই “মুসলিম ভাইদের ... ভয়ের কিছু নেই”! একথা বলে তিনি আসলে সত্যকে আড়াল করেছেন। দেশজুড়ে এনআরসি হবে ২০০৩-এর রুলস-এর আওতায়। এই রুলস অনুযায়ী এনআরসি-র প্রথম ধাপ এনপিআর (ন্যাশনাল পপুলেশন রেজিস্টার)। ১ এপ্রিল ২০২০ থেকে এই এনপিআর জনগণনার সাথে শুরু হওয়ার কথা ছিল, করোনার জন্য পিছিয়েছে। এই এনপিআর প্রক্রিয়া স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী যে কোনো দিন আবার চালু করে দিতে পারে। এই এনপিআর করে তারপর এনআরসি তৈরি করতে গেলে শুধু মুসলিম সংখ্যালঘুরাই নন, বাদ পড়বেন লক্ষ লক্ষ দলিত, আদিবাসী, ভূমিহীন প্রান্তিক মানুষজন, বিবাহিত মহিলা, অসংগঠিত ক্ষেত্রের পরিযায়ী শ্রমিক, বস্তিবাসী এবং পথ-বাসীরা।

অমিত শাহ ভোটের আগে‌ আজে বাজে কথা বলে এদের সকলকে বিভ্রান্ত করছে। বিজেপি পশ্চিমবঙ্গে ক্ষমতায় এলেই এনপিআর-এনআরসি করবে, এবং তাতে বাংলার লক্ষ লক্ষ মানুষ বিপদে পড়বেন, এটাই বাস্তব।

- প্রসেনজিত বোস 

Standing Committee ReportReport of the Standing Committee

অত্যাবশ্যকীয় পণ্য (সংশোধনী) আইন, ২০২০ সম্পর্কে খাদ্য, উপভোক্তা বিষয়ক ও গণবন্টন সম্পর্কিত মন্ত্রকের স্থায়ী কমিটির রিপোর্ট সংসদে পেশ হওয়ার পর অস্বস্তিতে পড়েছে প্রধান বিরোধী দলগুলো। কারণ, এই আইনটা নিয়ে তারা সংসদে ও সর্বসাধারণের সামনে যে অবস্থান নিয়েছে, নিজেরা স্থায়ী কমিটির সদস্য হওয়া সত্ত্বেও কমিটির রিপোর্টে তার উল্টো কথাই বলা হয়েছে। প্রসঙ্গত, অত্যাবশ্যকীয় পণ্য (সংশোধনী) আইন, ২০২০ হল মোদী সরকারের পাশ করা তিনটে কৃষি আইনের অন্যতম, যে তিনটে আইনের বিরুদ্ধে কৃষকরা গত চার মাস ধরে প্রতিরোধ চালিয়ে যাচ্ছেন। এই স্থায়ী কমিটির চেয়ারম্যান তৃণমূল কংগ্রেসের (টিএমসি) সুদীপ বন্দ্যোপাধ্যায়। টিএমসি ছাড়াও কমিটিতে রয়েছে কংগ্ৰেস, আপ, এসপি, শিবসেনা, এনসিপি’র মতো বিরোধী দলের সদস্যরা। অন্যান্য দলের মধ্যে টিএমসি ও কংগ্রেস আলোচ্য আইনটার বিরোধিতা করেছে, কৃষকদের কৃষি আইন বিরোধী আন্দোলনে সমর্থন দিয়েছে, টিএমসি এমনকি পশ্চিমবাংলা বিধানসভায় তিনটে কৃষি আইনের বিরুদ্ধে প্রস্তাবও পাশ করিয়েছে। কিন্তু পেশ করা স্থায়ী কমিটির রিপোর্টে বলা হয়েছে, এই আইনের রূপায়ণ হলে কৃষিক্ষেত্রে লগ্নি বাড়বে, হিমঘর নির্মাণ, গুদামঘর তৈরি, প্রক্রিয়াকরণ শিল্প ও রপ্তানিতে বিনিয়োগ হবে, কৃষিপণ্য বিপণনে প্রতিযোগিতা বাড়বে এবং এই প্রক্রিয়ায় কৃষকের আয়ের বৃদ্ধি ঘটবে। আর তাই আইনটাকে সর্বাঙ্গীণভাবে কার্যকর করতে হবে। আইনটা নিয়ে বিরোধী দলগুলোর প্রকাশ্য অবস্থান আর স্থায়ী কমিটির রিপোর্টেতার বিপরীত বিষয়ের সুপারিশ সবচেয়ে বিপদে ফেলেছে টিএমসি’কে। এবং তা এই জন্য যে, কমিটির রিপোর্টে আইনটাকে কল্যাণকর রূপে অভিহিত করে সম্পূর্ণ রূপে রূপায়িত করার সুপারিশ মোদী সরকারের অবস্থানকে শক্তিশালী করায় চেয়ারম্যান সুদীপ বন্দ্যোপাধ্যায়ের দল টিএমসি’কেই কাঠগড়ায় দাঁড়াতে হচ্ছে। পশ্চিম বাংলায় নির্বাচনের মুখে সজ্ঞানে এই ধরনের অবস্থান গ্ৰহণ যে তাদের পক্ষে আত্মঘাতী হবে এবং তারা কখনই এই পথে যাবে না – এই যুক্তিধারাকে মেনে নিয়েও বলতে হবে, কৃষকদের আন্দোলন এবং রিপোর্টের কথা মাথায় রেখে স্থায়ী কমিটির চেয়ারম্যানের দলকে আরো সক্রিয় ও হুঁশিয়ার হওয়া উচিৎ ছিল।

তবে, তারা যে এই রিপোর্টের জন্য দায়ী নয়, কৃষকদের সঙ্গে, নিজেদের ঘোষিত অবস্থানের সঙ্গে তারা যে বেইমানি করেনি তার প্রমাণস্বরূপ টিএমসি বলছে যে, রিপোর্টনিয়ে যেদিন কমিটির শেষ বৈঠক হয় সেদিন সুদীপ বন্দ্যোপাধ্যায় নির্বাচনী প্রচারে কলকাতায় ছিলেন, ফলে বৈঠকে যোগ দিতে পারেননি। কাজেই, তাঁকে ও তাঁর দলকে খলনায়ক রূপে প্রতিপন্ন করাটা যুক্তিযুক্ত নয়। টিএমসি’র রাজ্যসভা সাংসদ ও দলনেতা ডেরেক ও’ব্রায়েন বলেছেন, “পিছনের দরজা দিয়ে এই রিপোর্ট তৈরি করা হয়েছে। কমিটির চেয়ারম্যান যখন নির্বাচনের জন্য কলকাতায় ব্যস্ত, তখন সংসদীয় প্রক্রিয়ার সঙ্গে প্রতারণা করে এই রিপোর্ট গৃহীত হয়েছে”। কংগ্ৰেসের ওপরও রিপোর্টের দায় খানিকটা এসে পড়ায় তারাও রিপোর্ট থেকে নিজেদের দূরত্ব তৈরির চেষ্টা করেছে। এই স্থায়ী কমিটিতে কংগ্ৰেসের তিনজন সদস্য রয়েছেন – সপ্তগিরি শঙ্কর উল্কা, রাজমোহন উন্নিথান ও ভৈথিলিঙ্গম ভে। তিনজনই লোকসভার স্পিকার ওম বিড়লাকে চিঠি লিখে জানিয়েছেন, “আমি রিপোর্টের সুপারিশ থেকে সম্পূর্ণরূপে নিজেকে বিচ্ছিন্ন করছি, এবং রিপোর্টের প্রতি বিরোধিতা প্রকাশ করছি।” রিপোর্ট “সমস্ত রীতি ও প্রথাকে অগ্ৰাহ্য করে গ্ৰহণ করা হয়েছে” বলেও তাঁরা অভিযোগ করেছেন। কংগ্ৰেস নেতা জয়রাম রমেশও বলেছেন, “চেয়ারম্যানের অনুপস্থিতিতে রিপোর্ট গ্ৰহণ অভূতপূর্ব ব্যাপার”।

রিপোর্ট গ্ৰহণ ও পেশের ক্ষেত্রে তারা এক অপ্রস্তুত পরিস্থিতির মধ্যেই পড়ে গিয়েছিল বলে টিএমসি ও কংগ্রেস বোঝাতে চেয়েছে। তবে, রিপোর্ট তৈরি ও গ্ৰহণের ক্ষেত্রে বিজেপি’র পরিকল্পনা ও কৌশল নিয়ে অভিযোগের ক্ষেত্রে যথার্থতা যদি থেকেও থাকে, রিপোর্ট যে মোদী সরকারকে কিছুটা সুবিধা যোগাচ্ছে এবং কৃষকদের আন্দোলনের সামনে কিছুটা প্রতিকূলতা খাড়া করছে তা প্রশ্নের ঊর্ধ্বে। সংযুক্ত কিসান মোর্চা তাদের এক বিবৃতিতে তাই বলেছে, “আমরা কমিটির এই পদক্ষেপের তীব্র নিন্দা ও বিরোধিতা করছি। সরকারের সঙ্গে আলোচনায় ও অন্যান্য মঞ্চে আমরা ব্যাখ্যা করে বারবারই বলেছি যে, তিনটে আইনই ক্ষতিকারক এবং আইনগুলো কৃষক ও সাধারণ নাগরিকদের শোষণ করবে”। মোর্চা স্থায়ী কমিটির কাছে আবেদন জানিয়েছে, তারা যেন তাদের সুপারিশ প্রত্যাহার করে নেয়।

তিনটে কৃষি আইনই কৃষক স্বার্থের পরিপন্থী এবং কর্পোরেট স্বার্থের মদতকারী বলে সমালোচিত হয়েছে। আলোচ্য আইনটা রূপায়িত হলে কর্পোরেট সংস্থাগুলো চাল, ডাল, আলু, পিঁয়াজ, গম, ভোজ্য তেল, ইত্যাদির মতো অত্যাবশ্যকীয় পণ্য যত ইচ্ছে মজুত করে মুনফাবাজি চালাতে পারবে। আইন কালো বাজারিকেও উৎসাহিত করবে। কর্পোরেট স্বার্থের পাহারাদার বিজেপি যে এই আইনের সপক্ষে রিপোর্ট তৈরিতে যথেষ্ট আগ্ৰহী হবে তা বুঝতে একটুও অসুবিধা হওয়ার নয়। বৈঠক ডাকা হয় অত্যন্ত কম সময় দিয়ে। কংগ্রেস সাংসদ সপ্তগিরি উল্কা জানিয়েছেন, “১৮ তারিখের বৈঠক অত্যন্ত কম সময়ে ডাকা হয়। সকাল ৯টা নাগাদ (১৭ মার্চ) ফোন করে আমাকে বৈঠকের কথা জানানো হয়। প্রায় ১০০ পাতার খসড়া রিপোর্টও এই সময় আসে”। শুধু এই নয়, ১৮ মার্চের বৈঠকে সভাপতিত্ব করেন বিজেপি’র অজয় মিশ্র। বৈঠক ডাকা থেকে রিপোর্ট তৈরি ও গ্ৰহণ – গোটা প্রক্রিয়াটা বিবেচন করার পর মনে হয় অত্যাবশ্যকীয় পণ্য (সংশোধনী) আইনের সপক্ষে রিপোর্ট গ্ৰহণের লক্ষ্যে বিজেপি পরিকল্পনা ও কৌশলকে খুব ভালোভাবেই সাজিয়েছিল। পাঁচটা রাজ্যে নির্বাচনী পরিস্থিতিকে মাথায় রেখে ওদের কৌশলের কেন্দ্রে ছিল বৈঠকে উপস্থিত হওয়া ও প্রস্তুতি নেওয়ার জন্য বিরোধী সদস্যদের যথেষ্ট সময় না দেওয়া, প্রায় ১০০ পাতার খসড়া রিপোর্ট পড়ে উঠে নির্দিষ্ট প্রস্তাব পেশের জন্য বিরোধী সদস্যরা যাতে যথেষ্ট সময় না পায় তা সুনিশ্চিত করা। সিপিআই(এমএল)-এর কৃষক সংগঠন সারা ভারত কিসান মহাসভাও স্থায়ী কমিটির রিপোর্টের নিন্দা করে বলেছে, পাঁচটা রাজ্যের নির্বাচনী পরিস্থিতির পরিপ্রেক্ষিতে অত্যন্ত কম সময় দিয়ে বৈঠক ডাকা হয় যাতে বিরোধী সদস্যরা বৈঠকে উপস্থিত হতে না পারেন। স্থায়ী কমিটির রিপোর্ট তৈরি হয়েছে কর্পোরেট কোম্পানিসমূহ ও মজুতদারদের স্বার্থে, যাদের বড় পুঁজি রয়েছে। এই আইনের লক্ষ্য হল গণবন্টন ব্যবস্থাকে নিকেশ করা, দরিদ্রের থালা থেকে খাবার কেড়ে নেওয়া এবং খাদ্য দ্রব্যগুলোকে বিপুল মুনাফা অর্জনের ভোগ্যপণ্যে পরিণত করা।

বারবারই দেখা গেছে, নিজেদের স্বার্থ হাসিলে বিজেপি কুটিল ও নৃশংস পথ অনুসরণে একটুও পিছপা হয় না। স্থায়ী কমিটির রিপোর্টও বিজেপি’র ধড়িবাজির সাক্ষ্য বহন করছে। এই রিপোর্ট আরো একবার জানিয়ে দিল, বিজেপি’র মোকাবিলা করতে গেলে তার প্রতারণাময় কৌশল ক্ষমতার সঙ্গেও টক্কর দিতে হবে।

23 BankrahatShaheed-i-Azam Bhagat Singh

আইসা-আরওয়াইএ-সিপিআই(এমএল) লিবারেশনের নেতৃত্বে গত ২৩ মার্চ শহীদঈ-আজম ভগৎ সিং-এর শহীদ দিবস উদযাপিত হল বাখরাহাটে। সভা পরিচালনা করে সংক্ষিপ্ত বক্তব্য রাখেন আরওয়াইএ নেতা শুভদীপ পাল, সংক্ষিপ্ত বক্তব্য রাখেন সিপিআই(এমএল) লিবারেশনের দক্ষিণ ২৪ পরগণা জেলা নেতা দিলীপ পাল। উপস্থিত ছিলেন আইসা নেতা আরফি, আরওয়াইএ নেতা সন্দীপ ধাড়া, সিপিআই(এমএল) বিষ্ণুপুর-সাতগাছিয়া লোকাল কমিটির সম্পাদক নিখিলেশ পাল সহ আরো অনেকে।

ভগৎ সিং-এর স্বপ্নের ভারত গড়ে তোলার অঙ্গীকারকে সফল করে ফ্যাসিবাদকে পরাস্ত করার আহ্বান করা হয়। স্লোগান ওঠে আগামী বিধানসভা নির্বাচনে বিজেপিকে একটিও ভোট নয়।

ঐদিন বজবজে জেলা অফিসে শহীদ-ঈ-আজম ভগৎ সিং-এর শহীদ দিবস উদযাপিত হয়। উপস্থিত ছিলেন জেলা সম্পাদক কিশোর সরকার, বজবজ শহর লোকাল কমিটির সম্পাদক অঞ্জন ঘোষ, দেবাশিস মিত্র, জেলা নেত্রী দেবযানী গোস্বামী, জেলা নেতা লক্ষীকান্ত অধিকারী সহ আরো অনেকে। জেলা সম্পাদক তাঁর সংক্ষিপ্ত বক্তব্যে বলেন ব্রিটিশ সাম্রাজ্যেবাদের দালাল স্বাধীনতা আন্দোলনে বিশ্বাসঘাতকরা আজ মসনদে বসে আছে। সমগ্র দেশকে কোম্পানিরাজে পরিণত করতে চলেছে। তাই দেশের সাথে সাথে বাংলাকেও ফ্যাসিবাদী বিজেপির হাত থেকে রক্ষা করতে হবে। বাংলায় আসন্ন নির্বাচনে বিজেপিকে পর্যুদস্ত করেই ভগৎ সিং-এর শিক্ষাকে ঊর্দ্ধে তুলে ধরা হবে।

ঐদিন সকালে বজবজের রণজিৎ ফুটবল মাঠে শহীদ-ঈ-আজম ভগৎ সিং-এর শহীদ দিবস উদযাপিত হয় আইসা ও আরওয়াইএ বজবজ লোকাল কমিটির উদ্যোগে। উপস্থিত ছিলেন আইসা নেত্রী অনিন্দিতা, আইসা নেতা দীপ, আরওয়াইএ নেতা সেখ সাবির, আশুতোষ মালিক সহ আরো অনেকে।

 

Read Deshabrati

 

খণ্ড-28
সংখ্যা-12
01-04-2021