ধান কেনায় চলছে চাষিদের বঞ্চনা সরকারী মদতপুষ্ট দুর্নীতি ও দালাল চক্রের দাপট

রাজ্য সরকারের ঘোষণা ছিল ১ নভেম্বর থেকে ধান কেনা শুরু হবে। কিন্তু বিভিন্ন জেলা থেকে পাওয়া খবরে দেখা যাচ্ছে বর্তমানে ধান বিক্রির জন্য চাষীদের নথিভূক্ত করা ও কার্ড বিলির কাজ চালু হয়েছে। যথারীতি শুরু হয়ে গেছে চাষিদের প্রতি চরম বঞ্চনা, হয়রানী ও অনিশ্চয়তার মধ্যে ঠেলে দেওয়ার নানারকম ফন্দি ফিকির। রাজ্য সরকার কর্তৃক ঘোষিত সরকারী সংগ্রহমূল্য কুইন্টাল পিছু ১৮১৫ টাকা। পরিবহন বাবদ অতিরিক্ত ২০ টাকা অর্থাৎ মোট ১৮৩৫ টাকা। অথচ বহুল চর্চিত কৃষকদের যে দাবিটা আজ দেশের বিভিন্ন মহলে মান্যতা পেয়েছে তা হলো উৎপাদন খরচের দেড়গুণ দাম। হিসাব করলে ধানের সেই দাম হওয়ার কথা ২৩৫০ টাকা কুইন্টাল। এই দাবিতে এবং সহায়ক মূল্য নির্ধারণে মোদী সরকার চাষিদের যেভাবে প্রতারণা করেছে তার বিরুদ্ধে আজ দিকে দিকে জোরালো আওয়াজ উঠেছে। পুঁজিপতিদের কোটি কোটি টাকা ভর্তুকি ও কর ছাড় দেওয়া এবং তার বিপরীতে কৃষকদের প্রতি চরম অবহেলার বিরুদ্ধে গড়ে উঠছে তীব্র ক্ষোভ। এক দিকে কেন্দ্রীয় সরকারের নীতির ফলে কৃষি উপকরণ অর্থাৎ সার-বীজ-ডিজেলের দাম হুহু করে বেড়ে চলেছে। অন্যদিকে রাজ্য সরকার দফায় দফায় বিদ্যুত মাশুল বৃদ্ধি করছে। অথচ চাষিদের ফসলের দাম বাড়ছে না। এই অবস্থায় ধানের সহায়ক মূল্য প্রদানে চাষিদের লোকসানের বোঝা খানিকটা লাঘব করার জন্য রাজ্য সরকার কেন অতিরিক্ত বোনাস ঘোষণা করলো না, এই বিষয়টাকেও সামনে এসেছে। দেশের বেশ কয়েকটি রাজ্য কেন্দ্রীয় সরকারের দেওয়া সহায়ক মূল্যের অতিরিক্ত বোনাস দিয়ে থাকে। এ রাজ্যে সেটা হলো না কেন? স্বভাবতই প্রশ্ন উঠেছে তাহলে “কৃষক বন্ধু”, “কৃষক সন্মান” কেন্দ্র বা রাজ্য সরকারের এসব গালভরা কথাবার্তার মানেটা কি? চাষিদের আয় দ্বিগুণ বা তিনগুণ করে দেওয়া হয়েছে বলে প্রচারের ঢাক পিটিয়ে আর কতকাল তাঁদের ধোঁকা দেওয়া হবে?

এখন ধান বিক্রি করার জন্য নিবন্ধীকরণ তথা তালিকা তৈরি করার যে সরকারী ব্যবস্থাপনা চলছে সেটাকে একটু খতিয়ে দেখলে বোঝা যাচ্ছে যে শুরু থেকেই ব্যপক সংখ্যক চাষিদের সরকারী ধান কেনার প্রক্রিয়া থেকে দুরে সরিয়ে রাখার বন্দোবস্ত করা হয়েছে। নদীয়া জেলার কয়েকটি ব্লকে দেখা গেলো কিষাণ মান্ডি বা কৃষ দপ্তরে কবে কোন অঞ্চলের চাষিদের নাম নথিভূক্ত করা হবে তার কোনো আগাম ঘোষণা গ্রামাঞ্চলে করা হয়নি। ফলে এক একটি অঞ্চলের চাষিদের নথীভুক্তির জন্য নির্ধারিত দিনে অত্যন্ত স্বল্প সংখ্যক চাষি ব্লকের কৃষিদপ্তরে হাজির হতে পেরেছে। শাসক দলের নেতারা কিছু মানুষকে সঙ্গে নিয়ে কৃষিদপ্তর বা মান্ডিতে গিয়ে উপস্থিত হয়েছে। ব্লক দপ্তর থেকে জানা গেলো একটি অঞ্চল থেকে সাকুল্যে শ’দেড়েক চাষির ধান কেনার “কোটা” রয়েছে। অথচ সেখানে গড়ে কমপক্ষে হাজার খানেক চাষির বসবাস রয়েছে। অর্থাৎ সরকারী পরিকল্পনায় ৯০ ভাগ চাষিকেই সরকারী ধান কেনার আওতা খেকে বাদ দিয়ে দেওয়া হয়েছে। এটাই হলো দুর্নীতি দলবাজির অন্যতম উৎস।

গত ২১ নভেম্বর নদীয়ার নাকাশীপাড়া ব্লকে জড়ো হওয়া চাষিদের বলা হয় যাদের কিষাণ ক্রেডিট কার্ড রয়েছে কিংবা যারা কৃষক বন্ধু প্রকল্পের উপভোক্তা কেবলমাত্র তারাই ধান বিক্রির কার্ড পাবে, যাদের এ সব নেই তারা কার্ড পাবে না। এই নির্দেশের বিরুদ্ধে চাষিরা যখন তীব্র প্রতিবাদ করে ওঠে, তখন তাদেরকে পুলিশের ভয় দেখানো হয়। তা সত্বেও নাছোড় চাষিরা কার্ডের দাবীতে অনড় থাকে। অগত্যা বেশ কয়েক ঘণ্টা অপেক্ষা করার পর ব্লকের আধিকারিকরা তাদের ফর্ম জমা নিতে বাধ্য হয়, কিন্তু বলা হয় তাদের কার্ড দেওয়া হবে না। একমাস পর গ্রাম পঞ্চায়েত অফিসে গিয়ে খোঁজখবর নিতে হবে! এসবের মানেটা খুবই পরিস্কার। পঞ্চায়েতে গিয়ে শাসকদলের প্রতি আনুগত্য জানাতে হবে, কেবল তাহলেই পাওয়া যেতে পারে ধান বিক্রির কার্ড। এভাবে কৃষকের অধিকার কেড়ে নেওয়ার অন্যায় নির্দেশের বিরুদ্ধে চাষিরা প্রবল ক্ষোভ বিক্ষোভ দেখায়। প্রতিবাদে একদিন পরেই কিষাণ মহাসভার পক্ষ থেকে ঐ ব্লকে ডেপুটেশন দেওয়া হয়। ধান কেনার সরকারী আদেশনামা দেখতে চাইলে বিডিও সেটা দেখাতে পারেন না। তিনি ধান সংগ্রহের জন্য নির্ধারিত স্বল্প পরিমান “কোটা” র কথা তুলে ধরলেন। কৃষক সংগঠনের পক্ষ থেকে দাবি তোলা হয় কিষাণ ক্রেডিট কার্ড বা কৃষকবন্ধু প্রকল্প উপভোক্তা আছে কি নেই  —এভাবে চাষিদের ভাগ করা যাবে না, এ বিষয়ে আদৌ কোনো সরকারী নির্দেশিকা নেই। প্রকৃত চাষিদের সকলকেই কার্ড দিতে হবে। এর পর ব্লক কৃষি আধিকারিকের কাছে গেলে তিনি কয়েকটি ছেঁদো যুক্তি হাজির করেন। সরকারী দপ্তরের কম্পিউটারে যে সমস্ত উপভোক্তা চাষিদের জমির তথ্য মজুত রয়েছে তারাই নাকি প্রকৃত চাষি! ফড়ে দালালদের ধান কেনা ঠেকাতেই নাকি এইসব বিধিনিষেধ চালু করা হয়েছে, ইত্যাদি। কিন্তু বাস্তবে চলছে সম্পূর্ণ উল্টো জিনিস! সংখ্যাগরিষ্ঠ কৃষকরা এই সব প্রকল্পের উপভোক্তা নয়। এছাড়া ধান কেনার ক্ষেত্রে কৃষকদেরকে জমির দলিলপত্র সংক্রান্ত নানা রকম শর্তাবলী আরোপ করা, ধুলো-আর্দ্রতার অজুহাতে এক কুইন্টাল ধানের মধ্যে ১২-১৫ কেজি পরিমাণ বাদ দিয়ে দেওয়া, মান্ডিতে দিনের পর দিন অপেক্ষায় রেখে অনিশ্চয়তার মধ্যে ঠেলে দেওয়া- এই সব নানারকম কলাকৌশলের মাধ্যমে প্রকৃত গরিব- মাঝারি চাষিদের ধান সংগ্রহের সরকারী ব্যবস্থা থেকে কার্যত হঠিয়ে দেওয়া হয়েছে।

ধান বিক্রি করে টাকা কবে পাওয়া যাবে সেটা নিয়েও থাকে দুঃশ্চিন্তা। ফলে সরকারের কাছে ধান বিক্রি করতে চাষিদের মধ্যে তৈরি হয়েছে প্রবল অনীহা। বরং ঘরে নগদ টাকায় বিক্রি করতে অভাবী চাষিদের এক রকম বাধ্যতার মধ্যে ঠেলে দেওয়া হয়েছে। অপরদিকে ফড়ে দালাল-শাসক দলের নেতা-পঞ্চায়েতের মাতব্বরদের এক অশুভ চক্র অসাধু উপায়ে সংগ্রহ করা কাগজপত্র জমা দিয়ে মান্ডিগুলিকে প্রায় দখল করে নিয়েছে। তারা চাষিদের কাছ থেকে কম দামে কেনা ধান মান্ডিতে বিক্রি করে সরকারি দরের সুবিধা আত্মসাৎ করছে। চলছে নানা রকমের “কাটমানি”র খেলা। এই ভাবে সরকারী মদতপুষ্ট এক “ফড়ে রাজ” উৎপাদকদের ঘাড়ে চেপে বসেছে। এটাই হয়ে দাঁড়িয়েছে কৃষি সংকটের অন্যতম কারণ।

নদীয়ার কালিগঞ্জ ব্লক, বাঁকুড়ার ওন্দা ব্লকেও ধান কেনায় গরিব চাষিদের অগ্রাধিকারের দাবিতে অনুরূপ ডেপুটেশন কর্মসূচী সংগঠিত হয়েছে। নাকাশীপাড়ায় কৃষি দপ্তরে চাপ সৃষ্টি করার পর আধিকারিকরা জানায় যে, ইতিপূর্বে যারা ফর্ম জমা দিয়েছিলো সেই চাষিদের কার্ডদেওয়া হবে। এই বার্তা তুলে ধরে ব্লকের বিভিন্ন এলাকায় প্রচার চলছে যে চাষিদের মধ্যে ভাগাভাগি করার কোনো সরকারী নির্দেশনামা নেই। কত সংখ্যক চাষির থেকে মাথা পিছু কত পরিমাণ ধান কেনা হবে — এ বিষয়েও নির্দিষ্ট কোনো নিয়মবিধি করা হয়নি,পরিবার পিছু সর্বোচ্চ ৪৫ কুইন্টাল নেওয়া হবে —এটাই সরকারী ঘোষণা। এই সমস্ত দাবিতে এবং ফসলের ন্যায্য দাম পাওয়ার অধিকারের দাবিতে কৃষকদের সংগ্রামী ঐক্য গড়ে তোলার জন্য প্রচেষ্টা জারী আছে।

খণ্ড-26
সংখ্যা-38
28-11-2019