ঢাক পেটানোর কি আছে?

তৃণমূল রাজত্বের আপন ঢাক পেটানোর সুযোগ যেন শেষ হতে বসেছিল। মুখ্যমন্ত্রী প্রবল ব্যস্ত কাটমানির প্রতিক্রিয়া থেকে দলকে বাঁচাতে, সংস্কারের সুফল-কুফল বুঝে উঠতে। সারদা-নারদে’র অভিযোগ থেকে নিষ্কৃতি মিলবে কিনা তা আর রাজ্যের  হাতে নেই। আপাতত জেরবার হতে হচ্ছে কাটমানির মাশুল থেকে পরিত্রাণের উপায় পেতে। দুর্নীতির এই সংক্রমণের খবর যে অজানা ছিল তা নয়, কিন্তু অনুমানে ছিল না দলকে রাজ্যশাসনের মাঝদরিয়ায় এমন ডুবন্ত অবস্থায় এনে ফেলবে। লোকসভা নির্বাচনে দলের আসনসংখ্যা ব্যাপক কমে যাওয়াতেই ঘুম ছুটেছে। কাটমানি ফেরতের কবুল করতে ডাক দিতে হয়েছে, আর তা নিয়েই ছুটতে হচ্ছে জেলা সফরের রাজনীতিতে। পেশাদার সংস্থাকে দিয়ে শ্লোগান বানাতে হয়েছে ‘দিদিকে বলো’। যাতে ড্যামেজ কন্ট্রোলের উপায় মেলে।

এই সময়ে সরকার ও দলের ভাবমূর্তি উদ্ধারে সরব হয়েছেন রাজ্যের অর্থমন্ত্রী। এসজিডিপি’তে বাংলা এখন শীর্ষে উল্লেখ করে। রাজ্যওয়ারি মোট অভ্যন্তরীণ বৃদ্ধিতে বাংলা এখন সবসেরা। এই চিত্র মিলেছে কেন্দ্রীয় সমীক্ষায় পর্যবেক্ষণে। রাজ্যের বৃদ্ধির অঙ্ক পৌঁছেছে ১২.৫৮ শতাংশে। ২০১৮-১৯ আর্থিক বছরের শেষ ত্রৈমাসিকে সর্বভারতীয় মোট আভ্যন্তরীণ উৎপাদন ছিল ৫.৮ শতাংশ মাত্র, ২০১৪-১৫ থেকে ২০১৮-১৯, পাঁচ বছরে পৌঁছেছে সবচেয়ে নীচে। সেই তুলনায় মোট উৎপাদনে বাংলার শ্রীবৃদ্ধির কথা শোনাতে পেরে রাজ্যের কোষাগারমন্ত্রী ভাব দেখাচ্ছেন যেন অক্সিজেন দিলেন। তার উপর তিনি যা নয় তাই বলে চলছেন। দেশে তীব্রতর হওয়া মন্দায় যেখানে কাজ হারাচ্ছেন অসংখ্য মানুষ, মোদীরাজ প্রদর্শন করছে নীতিপঙ্গুত্ব, পক্ষান্তরে রাজ্যের অর্থমন্ত্রীর দাবি, বাংলায় মন্দার কোনো প্রভাব পড়তে দেওয়া হয়নি, রুখে দেওয়া গেছে। প্রশ্ন হল, তবে কি পশ্চিমবাংলায় কোনও বিকল্প নীতিগুচ্ছ অনুসৃত হচ্ছে! বিকল্প কর্মসংস্থান নীতি, বিকল্প উৎপাদন ও পরিষেবা ক্ষেত্রের দিগন্ত উন্মোচন, কর্মসংস্থান নিবিড় নিয়োগ নীতি অনুসৃত হয়!  কোন বিকল্প শ্রম নীতি, কৃষি নীতি, সমবায় নীতি, পঞ্চায়েত পলিসি আদৌ চলে! প্রতিটি ক্ষেত্রেই প্রত্যুত্তর মিলবে, না,অনুসৃত নীতিতে কোনও আলাদা গুরুত্বের কিছু নেই। সিএমআইই-র তথ্য অনুসারে বিমুদ্রাকরণের পরে ২০১৭-তে দাঁড়িয়েছিল ৭.৩ শতাংশ, ২০১৮-র ফেব্রুয়ারীতে বেড়ে হয় ৮.৮ শতাংশ, ২০১৯-এর ফেব্রুয়ারীতে দাবি করা হয়েছে বেকারি চিত্রটা ৬.১ শতাংশ। বেকারি পরপর দুবছর বৃদ্ধির পর এবছরে  চিত্রটা না বেড়ে গিয়ে কিছুটা কমা অর্থে মন্দের ভালো। কিন্তু এ থেকে মন্দা রুখে দিতে পারার যুক্তি মোটেই খাটে না। বেকারি  এখানে  রয়েছে ওঠানামার মধ্যে। এবং প্রায় উনিশ-বিশ অবস্থায়। গ্রাম ও শহর মিলে কাজ পেতে হন্যে হওয়া অদক্ষ, দক্ষ শ্রমজীবীর সংখ্যা লক্ষ লক্ষ। কর্মরত শ্রমজীবীদের ৯০ শতাংশই রয়েছে অসংগঠিত ক্ষেত্রে। উৎপাদন সংকট চলছে কৃষি, শিল্প সর্বত্র। আয় কমছে ব্যাপক জনসংখ্যার। বাড়ছে গরিবী। চাহিদা কমে যাওয়ার মূল কারণ আয় সংকোচন। অর্থের অভাবে ক্রমেই সংকুচিত হয়ে চলেছে জীবনধারণের আবশ্যিক মাপকাঠিগুলো। পশ্চিমবঙ্গ দেশের মধ্যে ষষ্ঠ বৃহত্তম অর্থনীতির রাজ্য। ২০১৭-১৮-র সমীক্ষায় উল্লেখ ছিল ১৫ থেকে ১৬ বছর বয়সী শ্রমজীবীদের সংখ্যাটা ছিল ১৭০ লক্ষ ৮ হাজার। কৃষিতে জীবিকার উপায় নির্ধারণের অবস্থা আরও শোচনীয়। মজুরি মান ও উদ্বৃত্ত আচরণের বহর অতি অনুল্লেখ্য গোছের। তৃণমূল সরকার যে কাঙ্খিত অর্থনীতির অনুগামী সেটা নয়া উদারবাদী, সেটা বিনিয়োগ আকর্ষণের মোচ্ছব আয়োজন বা বিদেশ সফরে ধরা পড়ে।  কিন্তু সেই অর্থে বিনিয়োগ ধরতে না পেরে বাধ্য হয়ে চলছে দান-খয়রাতির সস্তা জনপ্রিয়তাবাদী অর্থনীতির পথে। একবার ‘এই’ উপলক্ষে, একবার ‘ঐ’ উপলক্ষে বা একবার এক অংশকে, একবার অন্য অংশকে দিয়ে থাকে ডোল বা অনুদান। এতে না হয় কোনো স্থায়ী কর্মসংস্থান, না হয় কোনো স্থায়ী সম্পদ। এই নামমাত্র অর্থবৃত্তির অবস্থায় উপরন্তু চলে কাজ ও কাজের মজুরি পাওয়া নিয়ে সবকিছুর পরিচালন ব্যবস্থায় চলে আমলাতন্ত্র ও দুর্নীতি, তথ্যের কারচুপি ও প্রতারণা। যেমন, একশ দিনের কাজ, চাষের পরিকাঠামো ও কৃষিপণ্যের বেচাকেনা বা পঞ্চায়েতরাজের ভূমিকার প্রশ্নে। যে দায়িত্ব পালনের কথা রাজ্য প্রশাসনের, সে দায় চালান করে দেওয়া হয় কোনও পরিকাঠামো ও ধ্যানধারণা না থাকা পঞ্চায়েতের ওপর। যেমন, ‘সজলধারা প্রকল্প’ রূপায়ণ। লাটে উঠেছে পঞ্চায়েতের হিসাব পরীক্ষা ব্যবস্থা। কেন্দ্র করে চার বছর অন্তর, রাজ্যের করার  কথা বছর প্রতি, গড়ায় দুই-তিন-চার বছর নিয়ম রীতির মানামানি নেই। আর, গ্রামজনতা-গ্রামসভা-গ্রামসংসদ বসিয়ে সামাজিক হিসাব-নিকাশ করার ব্যাপার, সে পাঠও তুলে দেওয়াই দস্তুর। এইসব নিয়েই চলছে বাংলার ‘শ্রীবৃদ্ধি’।

তাই, রাজ্যের জিডিপি বৃদ্ধির আহামরিতে আত্মহারা না হয়ে তাকানো যাক জনজীবনে তার ফলিত প্রভাব কি পড়ছে সেদিকে। কারণ  জিডিপি বৃদ্ধি মানেই তা জনগণের মানোন্নয়নের পরিচয় নয়। জনজীবনের সর্বস্তরে পৌঁছাচ্ছে কিনা সেটাই আসল বিচার্য। সে প্রশ্নে রাজ্যের অর্থমন্ত্রী নিজেদের পাশ নম্বর দেবেন কোন্ আক্কেলে!

খণ্ড-26
সংখ্যা-28
12-09-2019