শ্যামাপ্রসাদ ও কাশ্মীর প্রসঙ্গ

kashmir 12

কাশ্মীর প্রশ্নে শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের আগ্রহের কারণ অনেক গভীরে নিহিত। ঊনবিংশ শতকের মধ্যভাগে জম্মুর হিন্দুত্ববাদী শাসক গুলাব সিং প্রথম ইঙ্গ-শিখ যুদ্ধে শিখদের পরাজিত করতে ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানিকে সহযোগিতা করে এবং উপঢৌকন হিসাবে কাশ্মীরকে পায়। রাজা ৭৫ লক্ষ টাকার বিনিময়ে কাশ্মীরকে কিনে নেয়। পরবর্তীতে ১৮৫৭ সালে সিপাহী বিদ্রোহের সময় যে দুই হিন্দু রাজার সহযোগিতায় ব্রিটিশরা বিদ্রোহ দমন করতে সক্ষম হয় তারা হল জম্মু ও কাশ্মীরের এই ডোগরা রাজা এবং নেপালের রাজা। বিনিময়ে তারা দুজনেই স্বাধীনভাবে থাকতে পারে ব্রিটিশ ভারতে যুক্ত না হয়ে। বেশ কিছুদিন পরে ভারতের মাধেসি অঞ্চল(উত্তর বিহার) নেপালের রাজাকে দান করে ইংরেজরা। জম্মু ও নেপালের হিন্দু রাজ্য থেকে হিন্দু রাষ্ট্র গড়ার প্রেরণা পান শ্যামাপ্রসাদ।

ভারতে স্বাধীনতা সংগ্রামের শেষ পর্যায়ে হিন্দুত্ববাদীদের যে কুলীন অংশ ব্রিটিশের সরাসরি তাঁবেদারি করত তার উজ্জ্বল নক্ষত্র ছিলেন শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়। কংগ্রেস দল ও হিন্দু সংগঠনের মধ্যে বার বার দল বদলানো এমন প্রকটভাবে আর কারো জীবনে বোধ হয় ঘটেনি। ভারতীয় সংস্কৃতির নির্মাণে, হিন্দু-মুসলমান উভয়ের মধ্যে মিলনের আদর্শকে তুলে ধরে যেমন বক্তৃতা করে গেছেন, রামকৃষ্ণ মিশন, ভারত সেবাশ্রম সঙ্ঘের সাথে সম্পর্ক রাখা, মহাবোধি সোসাইটির সম্পাদক হওয়া, আবার পাশাপাশি গোলওয়ালকার, সাভারকারের প্রতি ভক্তি ও তাদের পরামর্শে চলা পরস্পর বিরোধী মনে হতে পারে। আসলে একটা মুখ, অন্যটা মুখোশ। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলা মাধ্যম চালু করা তার হাত ধরেই। আবার স্বাধীন ভারতে হিন্দিকে রাষ্ট্রভাষা হিসাবে চাপানোর প্রবক্তা ছিলেন তিনিই। প্রভাব খাটিয়ে কাজ হাসিলের নামে হিন্দু মহাসভার পক্ষে বাংলার সুরাবর্দী সরকারে একা থাকা এবং ১৯৪৭ সালের ১৫ আগস্ট নেহেরুর ক্যাবিনেটে যোগদান করা এবং দু’ক্ষেত্রেই কয়েক বছর পদে থেকে কিছু-না-কিছু বিরোধ বাধিয়ে বের হয়ে আসা — তিনি যে কী শিখলেন মানুষকে তা খোলসা করে কোনোদিন বলেননি। ১৯৪৩ সালে বাংলার দুর্ভিক্ষের সময় অর্থমন্ত্রী থাকাকালীন ৩০ লক্ষ মানুষ মারা গেলেও সরকারী ত্রাণকার্যে সন্তোষ প্রকাশ করেন। আন্তর্জাতিক সহায়তা ফিরে গেছিল। এহেন শ্যামাপ্রসাদ কেন্দ্রীয় মন্ত্রী ও সংবিধান পরিষদে থাকাকালীন কংগ্রেসের হাতকেই শক্তিশালী করেন। সহমত হয়ে ৩৭০ ধারাও মেনে নেন। পরবর্তীতে ১৯৫০ সালে পদত্যাগের সময়ও বিরোধ করেননি এই নিয়ে। কিন্তু তারপর শেষ জীবনে কাশ্মীর নিয়ে সংবিধানের ৩৭০ ধারার বিরুদ্ধেই আত্মনিয়োগ করলেন।

কাশ্মীরের হিন্দু প্রজাপরিষদের সঙ্গে তাঁর ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল। হিন্দু পরিষদ ভারতে যুক্ত হতে চায়নি। হিন্দু প্রজা পরিষদ ধর্মনিরপেক্ষ ভারতে যোগদান করার চেয়ে স্বাধীন হিন্দু রাজত্ব কায়েম রাখা শ্রেয়তর মনে করত (বলরাজ পুরী : ট্রায়াম্ফ এন্ড ট্রাজেডি অফ ইন্ডিয়ান ফেডারেশন, ১৯৮১, দিল্লি, পৃষ্ঠা: ৫২-৫৩)।

মুখার্জি-নেহরু-আব্দুল্লাহ পত্র বিনিময়গুলিতে (ইন্টিগ্রেট কাশ্মীর, পৃষ্ঠা-৭) দেখতে পাই কাশ্মীরে গণভোটের কথা তিনি অস্বীকার করছেন। তিনি বলেন, “জনগণের মতামত জানবার জন্য সাধারণ গণভোটের প্রশ্নই ওঠা উচিত নয়। জম্মু কাশ্মীর রাজ্যে যে বিধানসভা তৈরি হয়েছে তা প্রাপ্তবয়স্কদের ভোটাধিকারের ওপর ভিত্তি করেই গড়ে উঠেছে।... এটাই ভারতের অন্তর্ভুক্তির সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে পারে এবং এটাই জনগণের মতামত যাচাই করার জন্য যথেষ্ট বলে গণ্য করা যেতে পারে। এটাই রাজ্যটির চূড়ান্ত ভারতভুক্তির অনিশ্চয়তার অবসান ঘটাতে পারে। ... গণভোট হোক আর না হোক, জম্মুর মানুষ ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক ছাড়বে না”।

৩৭১(এ) ধারায় অন্যান্য রাজ্যে যে বিশেষ ব্যবস্থা রাখা হয়েছে শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জী তার বিরোধ করেননি কোনো দিনও। এর কারণ নিহিত রয়েছে হিন্দু ও হিন্দুত্ব সম্পর্কেতাদের পরিকল্পনার মধ্যে এবং ইসলাম-ভীতির মধ্যে। কাশ্মীরের বিষয়ে কাশ্মীরের জনগণ নিজেরাই ঠিক করবে, এই নৈতিক গণতান্ত্রিক রাজনীতিতে তিনি বিশ্বাস করতেন না। জনগণের গণতন্ত্রের প্রতি এই অনাস্থা ফ্যাসিস্ট হিটলারের লেখা “আমার সংগ্রাম”-এর কথা মনে করিয়ে দেয়, নাগরিক এবং প্রজার পার্থক্যকে উড়িয়ে দিয়ে যিনি দেখাচ্ছেন, কেন্দ্রে কতিপয় মুষ্টিমেয় চিন্তাশীল লোক ও বাকি প্রায় সমস্ত অংশটাই অন্ধ অনুসরণকারী — এরকমটাই সফল জাতীয়তাবাদের ভিত্তি হতে পারে। অর্থাৎ গণতন্ত্রের মূলে কুঠারাঘাত। কাশ্মীরে ভূমি সংস্কার কর্মসূচী শ্যামাপ্রসাদের মাথা ব্যথার কারণ ছিল, যেটা অন্যান্য বিশেষ অধিকারপ্রাপ্ত রাজ্যগুলোতে দেখা যায়নি।

ভাবা যায় না একজন শুভবুদ্ধি সম্পন্ন মানুষ কি করে এই ধরনের সংকীর্ণ কথা বলতে পারেন? — “আমরা কি কাশ্মীরে জনগণের শুধু ভারত থেকে তারা যা পাবে তা নেওয়ার অধিকারের কথা ভাবছি, তারা কিছু দেবে না? অর্থ, সম্পদ, রাস্তা, ব্রিজ সবই খালি নেবে? এটা দেওয়া-নেওয়ার বিষয়, না কেবল পেয়ে কিছুই না দেওয়া? (ইন্টিগ্রেট ইন্ডিয়া, ২৬ জুন, ১৯৫২ বক্তৃতা, পৃষ্ঠা-৮, ভারতীয় জনসংঘের কেন্দ্রীয় প্রকাশনা)

শ্যামাপ্রসাদ স্বাধীনতা সংগ্রামী ছিলেন না, বরং ইংরেজ ভারত ছাড়ো আন্দোলনের কর্মীদের যাতে দমন করা যায় তার চেষ্টাও তিনি করতেন। আজকের দিনে মিস্টার হাইডকে একজন ডঃ জেকিল হিসেবে প্রতিপন্ন করার চেষ্টা চলছে কেননা তিনি যে বর্তমান কেন্দ্রীয় শাসক দলের প্রতিষ্ঠাতা।

সারা ভারত হিন্দু মহাসভার ২৫তম বার্ষিক সম্মেলনে বক্তৃতায় (অমৃতসর, ২৬ ডিসেম্বর, ১৯৪৩) বলেছিলেন, “যুদ্ধের পরিস্থিতিতে ভারতের পরাধীনতার কথা ভেবে বাস্তবোচিত সিদ্ধান্ত হিন্দু মহাসভা গ্রহণ করেছে।” স্বাধীনতার সংগ্রামকে কটাক্ষ করে বলেছিলেন “এই বিশ্বযুদ্ধের সময় স্বাধীনতা পেলেও তা একদিনও ধরে রাখা যাবে না। বরং এই সময় সরকারী নীতিকে কাজে লাগিয়ে বেশি করে হিন্দু ও শিখকে সেনাবাহিনীতে ঢোকালে লাভ আছে। সৈন্যবাহিনীতে হিন্দু এবং শিখদের সংখ্যা যুদ্ধের আগে এক-তৃতীয়াংশ থেকে এখন তিন-চতুর্থাংশ পরিণত হয়েছে।” শেখ আব্দুল্লার ধর্মনিরপেক্ষ নেতৃত্বে জম্মু ও কাশ্মীর থেকে হিন্দি উঠে গেছে, আজ আর কেউ হিন্দি পড়ে না বলে আক্ষেপ করেছেন। নারীর অধিকারের প্রশ্নে অনেক এগিয়ে ছিল কাশ্মীর, আধুনিক লিভ-টুগেদারের আইনি অধিকার কাশ্মীরে দেওয়া হয়েছিল, তাকেও কটাক্ষ করেছেন শ্যামাপ্রসাদ।

খণ্ড-26
সংখ্যা-26
29-08-2019