সিপিআই(এমএল) লিবারেশন কেন্দ্রীয় কমিটির বৈঠকের সিদ্ধান্ত

২৭-২৯ মে দিল্লীতে কেন্দ্রীয় কমিটির বৈঠক হয়। গত কেন্দ্রীয় কমিটির বৈঠকের পর যে সমস্ত কমরেড এবং প্রগতিবাদী ব্যক্তি প্রয়াত হয়েছেন তাঁদের স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে বৈঠক শুরু হয়। এদের মধ্যে ছিলেন মেহের ইঞ্জিনিয়ার (শিক্ষাবিদ বাম আন্দোলনের কর্মী এবং এআইপিএফ-এর প্রচার কমিটির সদস্য), ড: পায়েল তাদভি (মুম্বইয়ে স্নাতোকোত্তর স্তরে ডাক্তারি পাঠরত ছাত্রী যিনি জাতপাতবাদী অবমাননার কারণে প্রাতিষ্ঠানিক হত্যার শিকার হন), আসামে সিপিআই-এর প্রাক্তন রাজ্য সম্পাদক ধ্রুপদ বরগোহাঁই, সিপিআই(এম)-এর প্রাক্তন বিধায়ক এবং প্রবীণ লেখক ও আন্দোলনের কর্মী রামানিকা গুপ্তা, সুরাতে এক কোচিং প্রতিষ্ঠানে আগুনে পুড়ে মারা যাওয়া তরুণ ছাত্র-ছাত্রীরা, উড়িষ্যায় ঘূর্ণিঝড় ফনীর শিকার মানুষজন, ত্রিপুরায় নির্বাচনের সময় বিজেপি গুণ্ডাদের হাতে নিহত বাম আন্দোলনের কর্মী এবং সিপিআই(এমএল)-এর কমরেডরা যথাক্রমে তেলেঙ্গানার লেনিন, কাটিহারের ইমতিয়াজ আহমেদ, বিহারের ললিত মোহন (রেল), পশ্চিমবাংলার গোবিন্দ ব্যানার্জী, গিরিডির করমচাঁদ মাহাতো, পশ্চিমবাংলার অমর লোহার, উড়িষ্যার কেশব বেহরা, পাঞ্জাবের লভ সিং, উত্তরাখণ্ডর বীরেন্দ্র হালদার, পশ্চিমবাংলার ভাখরু মুণ্ডা, ডি ডি মুখার্জী, তামিলনাড়ুর শক্তিভেল, রাণী, গণেশন ও শ্রী শঙ্কর এবং কার্বি আংলং-এর খুদিরাম নামো ও অনিল ফাংচো।

২০১৯-এর নির্বাচনী ফলাফল : প্রাথমিক বিশ্লেষণ, তাৎপর্য এবং চ্যালেঞ্জ সমূহ

১। ব্যাপকতর স্তরে মনে করা হয়েছিল যে, পাঁচ বছর ধরে মোদীর বিপর্যয়কর অপশাসন এবং প্রণালীবদ্ধ ও নিরবচ্ছিন্নভাবে ফ্যাসিস্ট এজেণ্ডা এবং সংঘ বাহিনীর আগ্রাসন চলার পর বিজেপি দুর্বল হয়ে পড়েছে। কিন্তুু এই ধারণাকে মিথ্যা প্রতিপন্ন করে মোদী সরকার আরো বেশি আসন এবং প্রদত্ত ভোটের অধিকতর অংশ নিয়ে ক্ষমতায় ফিরে এসেছে। এই মাত্রায় বিজেপির বিজয় সম্পূর্ণরূপে অপ্রত্যাশিত এবং অস্বাভাবিক।

২। বিজেপি/এনডিএ উত্তর ভারতের রাজ্যগুলোতে ২০১৪ সালে যে ফল করেছিল, এবার সেই রাজ্যগুলোর প্রায় সবকটিতই ঐ ফলাফলের পুনরাবৃত্তি ঘটিয়েছে এবং এমনকি তার থেকেও উন্নতি করেছে, শুধু উত্তরপ্রদেশে অল্পকিছু আসন কম পেয়েছে, আর উল্লেখযোগ্য বৃদ্ধি ঘটিয়েছে পশ্চিমবাংলা, উড়িষ্যা, উত্তর-পূর্বাঞ্চলের রাজ্যগুলো এবং দক্ষিণে কর্ণাটক ও তেলেঙ্গানায়। যে রাজ্যগুলো অনেকটাই বিজেপির আওতার বাইরে থেকে গেছে সেগুলো হল কেরল, তামিলনাড়ু, অন্ধ্রপ্রদেশ এবং কিছুটা পাঞ্জাব। এটা তাৎপর্যপূর্ণযে, বিজেপি ১৩টা রাজ্যে ২২৪টা আসন পেয়েছে যেগুলোতে প্রদত্ত ভোটে তার প্রাপ্ত অংশ হল ৫০ শতাংশর বেশি। সমস্ত মানদণ্ডেই দেশের নির্বাচনী মানচিত্রে বিজেপিই সবথেকে প্রাধান্যকারী শক্তি হিসাবে সামনে এসেছে।

৩। স্বৈরাচারের ছায়ায়, অঘোষিত জরুরী অবস্থা বলেই যা সাধারণত বর্ণিত হয়ে থাকে, নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার অভিজ্ঞতা ভারতের এই প্রথম হল। মোদী শাসনের প্রথম পাঁচ বছরে ভারতে প্রশাসনিক প্রতিষ্ঠানগুলোর বিপর্যয় ঘটানো হয়েছে, সেগুলোকে কব্জা করা ও কলঙ্কিত করে তোলা হয়েছে। ২০১৯-এর লোকসভা নির্বাচনে ভারতের বর্তমান নির্বাচন কমিশনের ভূমিকা বিশেষভাবে ছিল একপেশে এবং পক্ষপাতপূর্ণ, অধিকাংশ রাজ্যেই কেন্দ্রীয় বাহিনী এবং নির্বাচনী ব্যবস্থাপনা স্পষ্টতই বিজেপির দিকে ঝুঁকে ছিল এবং দেশের ব্যাপক অংশ থেকেই ইভিএম-এর ঠিকভাবে কাজ না করা এবং সেগুলি নিয়ে নিয়মের ব্যতিক্রম ঘটানোর ভুরি-ভুরি অভিযোগ এসেছে। নির্বাচন কমিশন ভোটের যে হিসাব দিয়েছে এবং ইভিএম-এর ভোট গুণে যে সংখ্যা পাওয়া গেছে, ৩০০-রও বেশি আসনে এই দুয়ের মধ্যে ভালো মাত্রায় ফারাক দেখা গেছে এবং এর কোনো ব্যাখ্যা দেওয়ার গরজ নির্বাচন কমিশন দেখায়নি। বিকৃত হয়ে ওঠা এই প্রাতিষ্ঠানিক পরিমণ্ডল নির্বাচনী ফলাফল এবং বিশেষভাবে তার মাত্রা নির্ধারণে সুস্পষ্ট ভূমিকা রেখেছে।

৪। উপনির্বাচন এবং বিধানসভা নির্বাচনগুলোতে বিজেপি-শাসিত রাজ্য সরকারগুলোর বিরুদ্ধে জনগণের ক্রমবর্ধমান ক্রোধ এবং পরিবর্তনের আকাঙ্খা প্রতিফলিত হলেও মোদী সরকারের সাপেক্ষে লোকসভা নির্বাচনে তার প্রতিফলন ঘটেনি। ২০১৪-র নির্বাচনে তাঁর প্রচারে মোদী যে উন্নয়ন ও সুশাসনের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, তার সম্পূর্ণ বিপরীতে ২০১৯-এর নির্বাচনী প্রচারে পুরো জোরটাই, বিশেষভাবে পুলওয়ামা ও বালাকোট পরবর্তী পর্যায়ে, ছিল শক্তিশালী সরকারের প্রয়োজনীয়তার ওপর। এবং সাম্প্রদায়িক মেরুকরণের ইস্যুগুলোকে কেন্দ্র করেই ঐ প্রচার চালানো হয়েছিল, তা সে এনআরসি বলবৎ করে তথাকথিত ‘বাংলাদেশী অনুপ্রবেশকারীদের’ বিতাড়িত করার ইস্যুকে তুলে ধরেই হোক, অথবা নাগরিকত্ব আইন সংশোধন করে অ-মুসলিম অ-খ্রিষ্টান শরণার্থীদের নাগরিকত্ব প্রদানের শর্তগুলোকে সহজতর করে তোলার প্রতিশ্রুতির মাধ্যমেই হোক, আর সন্ত্রাসে অভিযুক্ত বিচারাধীন প্রজ্ঞা সিং ঠাকুরকে প্রার্থী করা এবং হিন্দুরা কখনও সন্ত্রাসবাদী হতে পারে না বলে দাবি করার মধ্যে দিয়েই হোক। অন্যভাবে বললে, ২০১৯-এর নির্বাচনে মোদীর প্রচার সবটাই ছিল জনগণের মধ্যে আতঙ্ক সৃষ্টি করা এবং সন্ত্রাসবাদের বিপদ ও পাকিস্তানের সঙ্গে যুদ্ধর ইস্যুতে সুড়সুড়ি দেওয়ার ব্যাপার।

৫। সাম্প্রদায়িক মেরুকরণ, যুদ্ধজিগির এবং উগ্র জাতীয়তাবাদের এই চড়া সুর জাতি ও শ্রেণী বিষয়ের তীব্রতার ধারকে ভোঁতা করে দিয়ে অভূতপূর্বমাত্রায় হিন্দু সংহতি ও জাতীয়তাবাদী ভাবাবেগে পরিণতি লাভ করে। এই ব্যাপারটাকে আরো শক্তিশালী করে তুলেছে সামাজিক সমীকরণকে নিজের অনুকূলে নিয়ে আসার বিজেপির মডেল যা দলিত এবং অতি পশ্চাদপদ জাত/অন্যান্য পশ্চাদপদ জাতের বড় অংশের মধ্যে তার সামাজিক ভিত্তির সম্প্রসারণ ঘটিয়েছে এবং এর সাথে সরকারের কল্যাণমূলক প্রকল্পগুলো, বিশেষভাবে যেগুলোর নিশানা নারী ও কৃষকরা। আর এস এস-এর ব্যাপক বিস্তৃত সাংগঠনিক জাল এই ব্যাপারটার পরিচালনায় বড় ভূমিকা রাখছে।

৬। বিজেপির সবচেয়ে বড় সাফল্য এই বিষয়টার মধ্যে রয়েছে যে তারা সংসদীয় নির্বাচনকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতার ধরনে পরিণত করতে সমর্থ হয়। এবং এই ব্যাপারে মোদীর ওপর সর্বোচ্চ নেতার যে ভাবমূর্তি এবং প্রবাদপ্রতিম গোছের যে সুউচ্চ মর্যাদা আরোপিত হয়, তার মোকাবিলার যথাযথ কোন উত্তর বিরোধী পক্ষের কাছে ছিল না। রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের ঢঙে যে আগ্রাসি প্রচার বিজেপি চালায় তার বিপরীতে বিরোধী পক্ষ মোদী সরকারের বহুবিধ এবং বিশেষভাবে গণতন্ত্রের গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নে ব্যর্থতাকে ধরে তাকে চ্যালেঞ্জ জানাতে প্রয়োজনীয় ঐক্য, সমন্বয় বা রাজনৈতিক দৃঢ়তাকে তুলে ধরতে পারেনি। উত্তরপ্রদেশ এবং বিহারে গঠিত জোট শক্তিশালী সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে তুললেও প্রয়োজনীয় রাজনৈতিক প্রেরণার সঞ্চার করতে পারেনি। বিহার ও ঝাড়খণ্ডে গড়ে ওঠা জোট থেকে বামেদের বাদ দেওয়া এবং উত্তরপ্রদেশে কংগ্রেসের একা চলার সিদ্ধান্ত জোটগুলোকে দুর্বল করে তোলে এবং শুরু থেকেই বিজেপিকে কর্তৃত্ব চালানোর সুযোগ করে দেয়। একইভাবে, দিল্লীতে সমঝোতায় পৌঁছাতে কংগ্রেস ও আপ-এর ব্যর্থতা সারা দেশেই ভুল বার্তা পাঠায়। গত পাঁচ বছরে জনগণের অনেক আন্দোলনই গড়ে ওঠে এবং তার পিছনে থাকে কৃষক, ছাত্র ও বুদ্ধিজীবী, শ্রমিক, দলিত এবং ওবিসি-দের ঐক্য ও সমাবেশ। এই আন্দোলনগুলো একটা অনুকূল পরিমণ্ডল সৃষ্টি করলেও রাজনৈতিক স্তরে এর সঙ্গে এমন কোন সামঞ্জস্যপূর্ণ ঐক্য অথবা সমন্বয় গড়ে ওঠেনি যা ঐ প্রেরণাকে এগিয়ে নিয়ে যেতে পারত এবং গণতন্ত্র ও প্রজাতন্ত্রের সাংবিধানিক ভিত্তিকে রক্ষার জন্য কেন বিজেপিকে ক্ষমতাচ্যুত করা দরকার সেই আশু প্রয়োজনীয়তার বোধকেও ব্যক্ত করতে পারত।

৭। উড়িষ্যায় বিজেডি, পশ্চিমবাংলায় টিএমসি এবং তেলেঙ্গানায় টিআরএস-এর মতো যে আঞ্চলিক দলগুলো ক্ষমতায় রয়েছে, সেগুলো এবার ভালো মাত্রায় টোল খেয়েছে এবং ঐ রাজ্যগুলো থেকে বিজেপি ৩০টির মত বেশি আসন পেয়েছে। সংসদে বাম প্রতিনিধিত্ব সর্বকালের মধ্যে সবচেয়ে কম হয়ে পাঁচটা আসনে নেমে এসেছে। এই পাঁচটা আসনের মধ্যে চারটে আসনই আবার এসেছে তামিলনাড়ু থেকে এবং তার পিছনে কারণ ছিল এক অনুকূল জোট ব্যবস্থা ও পরিমণ্ডল। পশ্চিমবাংলা ও ত্রিপুরায় বাম ভোট বিপুল মাত্রায় কমে গেছে। ত্রিপুরায় সিপিআই(এম) নেমে গেছে তৃতীয় অবস্থানে এবং পশ্চিমবাংলায় বামেদের প্রাপ্ত ভোটের অংশ ১০ শতাংশেরও নিচে নেমে গেছে এবং সিপিআই(এম) মাত্র একটা আসনে জামানত রক্ষা করতে পেরেছে। হিন্দি বলয়েও বামেরা কোনো আসন লাভে ব্যর্থ হয়েছে। বিহারে আরা এবং বেগুসরাই হল একমাত্র দুটো আসন যেগুলোতে বামেরা দ্বিতীয় স্থান লাভ করেছে।

৮। বিজেপির বৃহত্তর সংখ্যাগরিষ্ঠতা এবং প্রদত্ত ভোটের আরো বেশি অংশ লাভের মধ্যে দিয়ে মোদী সরকারের ক্ষমতায় প্রত্যাবর্তন সংঘ-বিজেপি বাহিনীকে সামগ্রিক পরিসরে তাদের ফ্যাসিস্ট এজেণ্ডাকে নামিয়ে আনতে এবং আরো আগ্রাসিভাবে সেগুলোকে চালাতে সাহস যোগাবে। মোদী সরকার তার প্রথম পর্বে ধর্মনিরপেক্ষ গণতান্ত্রিক ভারতবর্ষকে ফ্যাসিবাদী হিন্দু রাষ্ট্রে রূপান্তরিত করার আরএসএস-এর এজেণ্ডাকে তার প্রায় সামগ্রিকতাতেই রূপায়িত করছে। নাগরিকত্ব থেকে সংরক্ষণ পর্যন্ত বিস্তৃত ক্ষেত্রে সংবিধানের মূল ধারণাগুলোকে সংশোধন করতে চাওয়া হয়েছে, দেশদ্রোহ আইন, এনএসএ এবং ইউএপিএ-র মতো দানবীয় আইনগুলোকে বিরোধী মত প্রকাশের মোকাবিলার প্রতিটি ক্ষেত্রে প্রতিদিনের হাতিয়ার হিসাবে ব্যবহার করা হয়েছে এবং আরএসএস-এর আর্থ-সামাজিক এবং সাংস্কৃতিক বিধিকে বলবৎ করার সর্বশক্তিমান স্কোয়াড হিসাবে গণ পিটুনি দেওয়ার সংগঠিত বাহিনীকে বলীয়ান করে তোলা হয়েছে। ভারতীয় রাজনীতির সুনিশ্চিত এবং প্রাধান্যকারী মেরু হিসাবে আত্মপ্রকাশ করায় বিজেপি এখন অনিবার্যভাবেই তার ফ্যাসিবাদী আগ্রাসনকে তীব্রতর করে তুলবে, বিরোধী শাসনাধীনে থাকা অবশিষ্ট রাজ্যগুলোকে নিশানা বানাবে এবং চূড়ান্ত আক্রমণ হানার দিকে যাবে। খুব স্বাভাবিকভাবেই মোদী সরকারের অতি- কেন্দ্রীভবনের প্রবণতার বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলা এবং ভারতীয় রাষ্ট্র কাঠামোর যুক্তরাষ্ট্রীয় ভারসাম্যকে ঊর্ধ্বে তুলেধরাটা এই পর্যায়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ কাজ হিসাবেই গ্রহণ করতে হবে।

৯। আইনের শাসন, সামাজিক ন্যায় এবং সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির ওপর ফ্যাসিবাদী আক্রমণের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানোর বর্তমান পরিপ্রেক্ষিতে কমিউনিস্ট আন্দোলনকে যে নতুন উদ্যমে পুরোমাত্রায় সঞ্জীবিত করে তুলতে হবে তা নিয়ে সন্দেহের কোনো অবকাশ থাকতে পারে না। বুনিয়াদি ইস্যুগুলিতে এবং অধিকারের জন্য জনগণকে ঐক্যবদ্ধ করা, প্রগতিবাদী গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ এবং যুক্তিবাদী ধ্যানধারণাকে ঊর্ধ্বে তুলে ধরা এবং ফ্যাসিবাদী আগ্রাসনের বিরুদ্ধে কার্যকরী প্রতিরোধ গড়ে তোলাটাই এই চ্যালেঞ্জভরা পর্যায়ে মূল কর্তব্যকর্ম হয়ে উঠবে। সমাবেশ, আন্দোলন, প্রচার, শিক্ষা এবং সংগঠনের ধরনকে এর সঙ্গে সঙ্গতি রেখেই বিকশিত ও চালিত করতে হবে।

১০। পশ্চিমবাংলায় বিজেপির কাছে সিপিআই(এম)-এর শোচনীয় আত্মসমর্পণকে আজকের এই সন্ধিক্ষণে বাম শিবিরের গুরুতর এক সংকট রূপেই দেখতে হবে। তৃণমূল কংগ্রেস জমানার সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে বাম কর্মী এবং সমর্থকদের টিকে থাকার কৌশল বলে সিপিআই (এম) এটার পক্ষে ন্যক্কারজনক যুক্তি হাজির করতে চাইছে।এটা কিন্তুু আত্মঘাতী কৌশলই হতে পারে এবং এর ফল কি হতে পারে তা সবাই দেখতে পাচ্ছেন। পশ্চিমবাংলায় বিজেপি তরতর করে বেড়ে চলেছে আর সিপিআই(এম) বিধায়করা, নেতারা ও সমর্থকরা মূলত সিপিআই(এম)-এর ক্ষতির বিনিময়েই বিজেপির প্রতি তাঁদের আনুগত্যকে পাল্টে নিচ্ছেন, এই পরিঘটনা অনিবার্যভাবেই সারা দেশের বাম আন্দোলনে এক নৈরাশ্য ও কলঙ্কজনক প্রভাব ফেলবে। আত্মসমর্পণবাদী এই প্রবণতাকে আমাদের দৃঢ়তার সঙ্গে প্রতিরোধ করতে হবে এবং ফ্যাসিবাদী আগ্রাসনের বিরুদ্ধে অগ্রণী সৈনিক হিসাবে এবং গণতন্ত্রের জন্য জনগণের প্রতিরোধের একনিষ্ঠ প্রবক্তা হিসাবে কমিউনিস্ট ভূমিকার জোরালো আত্মঘোষণা ঘটাতে হবে।

আমাদের নির্বাচনী ফলাফলের পর্যালোচনা : অনুসন্ধান, শিক্ষা এবং সংশোধনমূলক পদক্ষেপ

১১। দশম কংগ্রেসে গৃহীত প্রস্তাবনার আলোকে আমরা বেছে বেছে কয়েকটি আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার সিদ্ধান্ত নিই। শেষ পর্যন্ত আমরা ৯টি রাজ্যে এবং একটি কেন্দ্র শাসিত অঞ্চলে ২২টি আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করি। প্রত্যাশা করা গিয়েছিল যে, আসাম রাজ্য কমিটি অন্তত একটা আসনে প্রার্থী দেবে, আসামের কমরেডরা পরিশেষে প্রতিদ্বন্দ্বিতা না করার সিদ্ধান্ত নেন। কেন্দ্রীয় কমিটি মনে করে, এই গুরুত্বপূর্ণ রাজ্যে বড় ধরনের এই নির্বাচনী লড়াই থেকে সরে থাকাটা সঠিক সিদ্ধান্ত ছিল না। আমরা বিহার এবং ঝাড়খণ্ডে প্রধান বিরোধী জোটের সঙ্গে এবং পশ্চিমবাংলা ও উত্তরাখণ্ডে বামেদের সঙ্গে নির্বাচনী বোঝাপড়া গড়ে তোলার চেষ্টা করি। আমরা কেবল বিহারে বিরোধী পক্ষের সঙ্গে আংশিক বোঝাপড়া এবং উত্তরাখণ্ডে বাম ব্লকের সঙ্গে পরিপূর্ণ সমঝোতা গড়ে তুলতেই সক্ষম হই। বিহার, ঝাড়খণ্ডে আমরা সিপিআই এবং সিপিআই(এম)-এর প্রতি বেছে বেছে কয়েকটি আসনে সমর্থন জানাই। আমরা আরা কেন্দ্রে বিজয়ী হওয়ার কল্পনা করেছিলাম এবং আশা করেছিলাম যে কোডারমা ও সিওয়ান কেন্দ্রে জোরালো ত্রিমুখী প্রতিদ্বন্দ্বিতা গড়ে তুলতে পারব। আমরা আরাতে দ্বিতীয় স্থান লাভ করি এবং সিওয়ান ও কোডারমায় অনেক পিছনে থেকে তৃতীয় স্থান পাই। এনডিএ এই রাজ্যে একটা বাদে সমস্ত আসনে জয়ী হয়ে বিপুল বিজয় হাসিল করেছে, এই সামগ্রিক পরিপ্রেক্ষিতের আলোকে বিচার করলে আমাদের ফলাফল যুক্তিযুক্ত রূপেই দেখা দেয়। তবে আমাদের বুথ-ভিত্তিক পুঙ্খানুপুঙ্খ পর্যালোচনা করতে হবে এবং সেই ভিত্তিতে নির্বাচনী প্রস্তুতি এবং নির্বাচন পরিচালনার যন্ত্রকে বিকশিত করতে এবং পার্টি সংগঠনকে শক্তিশালী করে তুলতে হবে।

১২। কোডারমা আসনে ভোট ২ লক্ষর মত কমে যাওয়ায় ঐ আসনে ফল অপ্রত্যাশিতভাবে খারাপ হয়েছে। মনে হচ্ছে, এর অর্ধেকটা গেছে বিজেপি-বিরোধী জোটের পক্ষে লড়াই করা বাবুলাল মারাণ্ডির দিকে আর অর্ধেকটা গ্রাস করেছে বিজেপি। আপাতদৃষ্টিতে দেখলে, কোডারমায় ক্ষয়ের মাত্রাকে পশ্চিমবাংলায় সিপিআই(এম)-এর ভোটের চূড়ান্ত ক্ষয়ের মত বলেই মনে হবে। তবে পশ্চিমবাংলায় সিপিআই(এম)-এর রাজনৈতিক লাইন তাদের ক্ষয়কে সহজতর করে তুললেও, আমাদের আন্তরিক প্রস্তুতি এবং উদ্দীপনাময় প্রচার সত্ত্বেও কোডারমায় ভোটে ধস নেমেছে। আমাদের ভোটপ্রাপ্তি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পিছনে যে দুটি কারণ আছে বলে মনে হয় সেগুলি হল জোট থেকে আমাদের বাদ দেওয়া এবং বিজেপির গতবারের বিজয়ী প্রার্থীকে খারিজ করে আরজেডি-র পূর্বতন সভাপতিকে তাদের প্রার্থী করা। কিন্তুু আমাদের ভোট ক্ষয় চূড়ান্ত মাত্রার এবং তা সর্বাঙ্গীণ অনুসন্ধানের দাবি রাখে।

১৩। অন্যান্য রাজ্যে আমরা আমাদের ভোট মোটামুটি বজায় রাখেত পেরেছি। ২০১৪-র সাপেক্ষে যে সমস্ত আসনে আমাদের ভোট বেড়েছে সেগুলো হল কোরাপুট, মির্জাপুর, জালায়ুঁ এবং নৈনিতাল। অনুরূপভাবে পাঞ্জাব, অন্ধ্রপ্রদেশ এবং উড়িষ্যায় যথেষ্ট মাত্রাতেই ভোটের ক্ষয় হয়েছে। এই ক্ষয়ের যথাযথ বিশ্লেষণ করতে হবে যাতে করে সংশোধনমূলক পদক্ষেপ গ্রহণ করে পার্টিকে শক্তিশালী করে তুলতে এবং ভবিষ্যতে নির্বাচনী ফলাফলের উন্নতি ঘটাতে পারি।

নতুন পরিস্থিতিতে সমগ্র পার্টিকে সমাবেশিত করা প্রসঙ্গে

১৪। মোদী সরকারের ফিরে আসা এবং তার পরিণামে বিভিন্ন ফ্রন্টে তীব্রতর হয়ে ওঠা ফ্যাসিবাদী আগ্রাসনের মোকাবিলা করতে গোটা পার্টিকে সমাবেশিত এবং প্রস্তুত করতে হবে। আমাদের নির্বাচনী ফলাফলের পর্যালোচনা, নির্বাচন যে ফলাফলের জন্ম দিল তার বিশ্লেষণ এবং পার্টিকে শক্তিশালী করে তোলায় তার তাৎপর্য ও তার থেকে শিক্ষা গ্রহণ—এগুলো সবই পারস্পরিকভাবে সম্পর্কযুক্ত কাজ এবং সমস্ত পার্টি কমিটিকে দ্রুতই এই কাজ হাতে নিয়ে প্রক্রিয়াটিকে শেষ করতে হবে, ২০ জুনের মধ্যে তা করলেই ভালো হয়।

১৫। বুথ স্তরের পর্যালোচনা এবং জেলা/রাজ্য স্তরের কনভেনশন দিয়ে শুরু হওয়া গোটা প্রক্রিয়াটা শেষ হবে জুলাই মাসের শেষে কলকাতায় এক কেন্দ্রীয় স্তরের কনভেনশন এবং ক্যাডার কর্মশালা অনুষ্ঠানের মধ্যে দিয়ে। যে ধরনের সভাকক্ষ পাওয়া যাবে এবং সমাবেশের মাত্রা কি হবে, তার উপর ভিত্তি করে প্রদেয় অর্থ এবং অংশগ্রহণের মাত্রা রাজ্য কমিটিগুলোকে কিছুদিনের মধ্যেই জানিয়ে দেওয়া হবে।

গৃহীত প্রস্তাবসমূহ : নির্বাচন পরবর্তী পর্যায়ে বিজেপি এবং আরএসএস-এর শুরু করা রাজনৈতিক সন্ত্রাস

২০১৯-এর লোকসভা নির্বাচনের ফলাফলে স্পর্ধিত হয়ে উঠে ক্ষমতামত্ত বিজেপি এবং আরএসএস-এর ক্যাডাররা বিরোধী দলগুলোর ভোটার ও সমর্থকদের বিরুদ্ধে অবাধ সন্ত্রাস নামিয়েছে। এই ধরনের হিংসার সবচেয়ে নিকৃষ্ট নিদর্শনগুলো দেখা যাচ্ছে বিজেপি-শাসিত ত্রিপুরায়, যেখানে বিজেপির গুণ্ডারা বাম দলগুলির এবং কংগ্রেসের ভোটার, সদস্য ও সমর্থকদের উপর শুধু দৈহিক আক্রমণ চালাচ্ছে এবং এমনকি হত্যাও করছে তাই নয়, ওরা প্রধানমন্ত্রী হিসাবে মোদীর শপথ গ্রহণের উদযাপনের উদ্দেশে সিপিআই(এম) এবং সিপিআই(এমএল) সমর্থকদের কাছ থেকে ‘‘অর্থ সংগ্রহের’’ নামে তোলা আদায়ও করছে! পশ্চিমবাংলায় বিজেপি এবং আরএসএস ক্যাডাররা রাজনৈতিক বিরোধী পক্ষের বিরুদ্ধে হিংসা এবং সন্ত্রাসকেও বাড়িয়ে তুলছে।

জেডিইউ-বিজেপি শাসিত বিহারের যে দুটি কেন্দ্রে বাম প্রার্থীরা বিজয়ী বিজেপি প্রার্থীদের বিরুদ্ধে দ্বিতীয় স্থান লাভ করেছে, সেই বেগুসরাই এবং আরাতে বিজেপি সমর্থিত সামন্ততান্ত্রিক গুণ্ডারা রাজনৈতিক সন্ত্রাস নামিয়েছে। বেগুসরাইয়ে নির্বাচনের ফল ঘোষণার আগে সিপিআই নেতা ফাগো তাঁতিকে হত্যা করা হয় এবং ফল বেরনোর পর আর এক সিপিআই নেতা পৃথ্বী চন্দ্র চৌধুরীকে গুলি করে মারা হয়। আরাতেও পশ্চাদপদ এবং নিপীড়িত জাতগুলোর সিপিআই(এমএল) ভোটারদের বিরুদ্ধে বিজেপি-মদতপুষ্ট সামন্ততান্ত্রিক শক্তিগুলো রাজনৈতিক হিংসা চালাচ্ছে।

এই আক্রমণগুলো দেখিয়ে দিচ্ছে যে, বিজেপি শুধু এমন একটা রাজনৈতিক দল নয় যারা একটা নির্বাচনে জিতেছে : এটা এমন একটা শক্তি যা গণতন্ত্রকে দমন করতে এবং বিরোধীপক্ষকে প্রাণেও মেরে ফেলতে চায়। এই ধরনের রাজনৈতিক সন্ত্রাস এবং হুমকিবাজিকে প্রতিরোধ করতে এবং গণতন্ত্রের রক্ষায় সমস্ত গণতান্ত্রিক শক্তিগুলোর সঙ্গে ঐক্যবদ্ধ হতে সিপিআই(এমএল) অঙ্গীকারবদ্ধ।

পায়েল তদভির জন্য ন্যায় বিচার

আদিবাসী মুসলিম তাদভি ভিল তপশিলি উপজাতি সম্প্রদায়ের সম্ভাবনাময় তরুণী ডাক্তার পায়েল তাদভি মুম্বাইয়ের বিওয়াইএল নায়ার হাসপাতালে তাঁর সিনিয়রদের হাতে জাতপাতবাদী নিগ্রহের শিকার হয়ে আত্মহত্যা করেন। এটা রোহিত ভেমুলার মতোই প্রাতিষ্ঠানিক হত্যা।

ড: পায়েল তদভির পরিবার ন্যায় বিচার লাভের যে প্রচেষ্টা চালাচ্ছেন, তাতে সিপিআই(এমএল) তাঁদের পাশে দাঁড়াচ্ছে। সিপিআই(এমএল) এটা সুনিশ্চিত করতে চায় যে, যারা ঐ নিগ্রহ চালাল এবং যারা ঐ নিগ্রহকে উপেক্ষা করল — যে নিগ্রহ তাকে মৃত্যুর পথে ঠেলে দিল — তাদের যেন নিপীড়ন নিরোধক আইনের অধীনে বিচার ও শাস্তি হয়। আমরা এই দাবিও জানাচ্ছি যে, মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতালগুলি সহ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলিতে জাতভিত্তিক নিগ্রহকে স্বীকার, প্রতিহত এবং মোকাবিলা করার প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা নিতে হবে। এই ধরনের জাতপাতবাদের অস্তিত্বকে অস্বীকার করার প্রবণতা এবং জাত-ভিত্তিক সংরক্ষণের বিরুদ্ধে কলঙ্ক লেপন জাতপাতবাদের লক্ষণ ছাড়া অন্য কিছু নয়।

মোদীর বিজয়ের পরপরই ঘটে চলল একের পর এক ঘৃণা জাত অপরাধ

মোদী তাঁর বিজয় ভাষণে সংখ্যালঘুদের আশ্বস্ত করার কথা বলা সত্ত্বেও তিনি পুনরায় নির্বাচিত হওয়ার পর থেকে প্রায় প্রতিদিনই মুসলিম, দলিত, আদিবাসী এবং নারীদের অরাজক জনতার আক্রমণের মুখে পড়তে হচ্ছে। বেগুসরাইতে তরুণ মহম্মদ কাসিমকে তার নাম জিগ্যেস করা হয়, ‘পাকিস্তানে চলে যাও’ বলে বলা হয় এবং তারপর গুলি করা হয়। মধ্যপ্রদেশের সিওনিতে বিজেপির বিজয়ের আগের দিন ‘গো-রক্ষকদের’ একটা দল গোমাংস নিয়ে যাওয়ার অছিলায় এক মহিলা সহ তিন জনকে প্রহার করে এবং ‘জয় শ্রীরাম’ বলার নির্দেশ দেয়। গুরুগ্রামে এক দল লোক মহম্মদ বরকতকে ডাকে, ওকে তার স্কাল ক্যাপ খুলতে এবং ‘ভারত মাতা কি জয়’ ও ‘জয় শ্রীরাম’ বলতে বলে, তারপর ওকে চড় মারে এবং জোর করে শুয়োরের মাংস খাওয়াবে বলে হুমকি দেয়। পুনে থেকে দিল্লীতে যাওয়া এক ডাক্তারকে একইভাবে নাম জিগ্যেস করার পর ‘জয় শ্রীরাম’ বলতে বলা হয়। দিল্লীর বাসে মুসলিম শ্রমিকদের ‘জয় শ্রীরাম’ শ্লোগান দিয়ে ব্যঙ্গ করার একাধিক ঘটনার খবর প্রকাশিত হয়েছে।

দেরাদুনে এক ম্যারেজ রেজিস্টারের অফিসে একটি হিন্দুমেয়ে যখন এক মুসলিম পুরুষকে বিয়ে করার পরিকল্পনা করছিল, বিশ্ব হিন্দু পরিষদের একটি দল তার ওপর চড়াও হয়ে তাকে প্রহার করে। তেলেঙ্গানার নিজামাবাদ জেলার বালাকোণ্ডায় গ্রামীণ উন্নয়ন কমিটি মুসলিমদের সামাজিক ও বাণিজ্যিক ক্ষেত্রে বয়কট করার কথা ঘোষণা করে এবং যারা ঐ বয়কটকে অগ্রাহ্য করবে তাদের ওপর ভালো পরিমাণ জরিমানা চাপানোর হুমকি দেয়। কিছু হিন্দু বেআইনিভাবে মুসলিমদের কবর স্থান দখল করে রয়েছে এবং ঐ কবর স্থানের ওপর দাবি পরিত্যাগে মুসলিমদের বাধ্য করতেই ঐ বয়কটের ডাক দেওয়া হয়েছে। পশ্চিমবাংলায় এক স্বেচ্ছাচারী জনতা এক বয়স্ক মুসলিম পুরুষকে চড় মারে, কান ধরে উঠবোস করতে এবং ‘জয় শ্রীরাম’ বলতে বাধ্য করে। মধ্যপ্রদেশের রায়গড়ে এক মুসলিম তরুণ ফোনের দোকানে মোবাইল ফোন কিনতে গেলে এক দল লোক তাকে রড দিয়ে প্রহার করে এবং টাকা পয়সা কেড়ে নেয়।

ঝাড়খণ্ডের সাকচিতে নারীদের জন্য সরকারি স্কুল ও কলেজের আদিবাসী অধ্যাপক জিতরাই হাঁসদাকে এই অজুহাতে গ্রেপ্তার করা হয় যে, গোমাংস খাওয়া এবং উৎসবে গরু বলিদানের আদিবাসী সম্প্রদায়ের প্রথাকে তিনি নথি সহযোগে তুলে ধরে ফেসবুকে একটি পোস্ট করেছিলেন।

গুজরাটের ভদোদরা জেলার মাহুভাদ গ্রামে উচ্চবর্ণের প্রায় ৩০০ লোকের এক জনতা এক দলিত দম্পতিকে প্রহার করে, অপরাধ ঐ দম্পতির মধ্য যিনি স্বামী তিনি গ্রামের মন্দিরে জাত-ভিত্তিক বৈষম্য নিয়ে ফেসবুকে একটি পোস্ট করেছিলেন।

অন্ধ্রপ্রদেশের পূর্ব গোদাবরি জেলার সিঙ্গামাপল্লি গ্রামে বিক্কি শ্রীনিবাস নামে এক দলিত পুরুষ আধিপত্যকারী জাতের এক জমিদারের বাগান থেকে কয়েকটা আম পাড়ায় তাকে এক উচ্ছৃঙ্খল জনতা পিটিয়ে মেরে ফেলে।

যে সমস্ত মুসলিম, দলিত, আদিবাসী এবং নারী সংঘের মারকুটে জনতার হাতে আক্রান্ত, গণপিটুনির শিকার এবং গ্রেপ্তার হচ্ছে, সিপিআই(এমএল) তাদের প্রতি সংহতি জানাচ্ছে।

মোদীর ‘রাষ্ট্রনায়ক’-এর হাবভাব আসলে তাঁর নিজের জন্য ছলাকলার এক চাল এবং নীচে থাকা তাঁর সমর্থক বাহিনীর জন্য এক ফিকির। এই সমর্থকরা তাঁর বিজয়ে স্পর্ধিত হয়ে উঠে যাদেরই বিজেপি-বিরোধী বলে মনে করছে তাদের ওপর প্রতিদিনই চড়াও হচ্ছে। গণতান্ত্রিক ভারত সম্পর্কেযাঁরা ভাবনাচিন্তা করেন, তাঁদের সবাইকেই এই ফ্যাসিবাদী আক্রমণগুলোর বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়িয়ে সেগুলোকে প্রতিরোধ করতে হবে।

খণ্ড-26
সংখ্যা-15
06-06-2019