খবরা-খবর
হুগলী জেলায় কার্ল মার্কসের দ্বিশততম জন্ম বার্ষিকীতে আলোচনা সভা

বাম শক্তি যেখানে আপেক্ষিকভাবে দুর্বল সেখানেও জেগে উঠছে লাল লহর— দীপঙ্কর ভট্টাচার্য

দেশজুড়ে কার্ল মার্কসের দ্বি-শততম জন্মবার্ষিকী উদযাপিত হচ্ছে। একের পর এক স্থানে আয়োজিত হয়ে চলেছে ‘মার্কস ও আজকের সময়’ শীর্ষক আলোচনা সভা। এই পর্যায়ে পশ্চিমবঙ্গে পঞ্চম আলোচনা সভাটি অনুষ্ঠিত হল গত ৬ সেপ্টেম্বর হুগলী জেলার হিন্দমোটরে দীনেন স্মৃতি ভবনে। এই আলোচনা সভাকে সফল করে তোলার জন্য পার্টির হুগলী জেলা কমিটি, বিশেষতঃ শহরাঞ্চলের পার্টি সংগঠনগুলি চমৎকার প্রস্তুতি গড়ে তোলে। ফলশ্রুতিতে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে ব্যাপক বামপন্থী কর্মীবাহিনীর উপস্থিতিতে সভাগৃহ পরিপূর্ণ হয়ে ওঠে। পার্টির হুগলী জেলা সম্পাদক প্রবীর হালদার আলোচনা সভা সঞ্চালন করেন। আলোচনাসভার দুই বক্তাঃ দীপঙ্কর ভট্টাচার্য এবং সিপিআই(এম) পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য কমিটি সদস্য সুদর্শন রায় চৌধুরি ছাড়াও সভামঞ্চে পার্টির পলিটব্যুরো সদস্য কার্তিক পাল, রাজ্য সম্পাদক পার্থ ঘোষ ও পার্টির কেন্দ্রীয় মুখপত্র ‘লিবারেশনে’র সম্পাদক অরিন্দম সেনকে ডেকে নেওয়া হয়।

  আলোচনাসভার প্রারম্ভে প্রবীর হালদার মনে করিয়ে দেন, সুদীর্ঘ শ্রমিক আন্দোলনের সাক্ষী যে হিন্দ মোটর কারখানা তা বন্ধ করে দিয়ে বিড়লা মালিক গোষ্ঠী কারখানার জমিতে গড়ে তুলছে বহুতল আবাসন। রুটি রুজি হারিয়েও শ্রমিকরা লড়াইয়ের পথ পরিত্যাগ করেননি এবং মাথা উঁচু করে তাঁদের অনেকেই এই আলোচনাসভায় হাজির হয়েছেন। শ্রমিকদের স্বার্থকে উপেক্ষা করে মমতা ব্যানার্জী যে উন্নয়নের কথা বলেন তার দগদগে ক্ষত আর একবার ধরা পড়েছে মাঝেরহাট ব্রীজ ভেঙ্গে পড়ার মধ্য দিয়ে—যেখানে সরকারি ঔদাসীন্যের ফলে তরুণ দুই নির্মান শ্রমিক প্রণব দে (উদয়) ও গৌতম মন্ডলকে জীবন্ত উদ্ধার করা যায়নি। তিনি প্রশ্ন করেন, তারা ঠিকা শ্রমিক (মেট্রো রেলের) বলেই কি তাদের বাঁচাতে রাজ্য প্রশাসনের কোনো গরজ ছিল না? নিহত দুই নির্মাণ শ্রমিকের স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে এক মিনিট নীরবতা পালনের জন্য তিনি আহ্বান রাখেন। এর পর এই ভাবগম্ভীর পরিবেশে পশ্চিমব‌ঙ্গ গণ সংস্কৃতি পরিষদের শিল্পী বাবুনি মজুমদার ‘ভিন দেশী এক বাউল মরেও না মরে—দেখ না দুইশ বছর যায় চলে’ গানটি পরিবেশন করেন। গণসঙ্গীতের পর সুদর্শন রায় চৌধুরিকে বক্তব্য রাখার জন্য আহ্বান জানানো হয়।

বক্তব্য রাখার শুরুতেই কমরেড রায় চৌধুরি মন্তব্য করেন যে এ ধরনের আলোচনাসভার খুবই প্রয়োজন এবং তিনি তাঁকে বক্তা হিসেবে সুযোগ করে দেওয়ার জন্য সিপিআই(এমএল) হুগলী জেলা কমিটিকে ধন্যবাদ জানান। এর পর তিনি বলেন, ২০১৮-তে যেমন মার্কসের দু-শততম জন্ম বার্ষিকী উদযাপিত হচ্ছে তেমনি এক বছর আগেই মহান নভেম্বর বিপ্লবের শতবার্ষিকী পালিত হয়েছে। বুর্জোয়ারা বহুবার মার্কসবাদকে মৃত বা ব্যর্থ বলে ঘোষণা করেছে। কিন্তু যতবার তারা মার্কসবাদের মৃত্যু ঘোষণা করেছে মার্কসবাদ বা সমাজতন্ত্র গড়ে তোলার সংগ্রাম ততবার দ্বিগুণ শক্তিতে ফিরে এসেছে। রুশ সমাজতন্ত্রের পতনের পর নভেম্বর বিপ্লবের শতবর্ষে মস্কোয় কমিউনিস্টদের বিশাল জমায়েত হয়েছে। সেখানে সকলে বলেছেন, শ্রমিক শ্রেণীকে আন্তর্জাতিক স্তরে উঠে দাঁড়াতে হবে। ঠিকই তো, এটাই মার্কসের শিক্ষা, সর্বহারার কোনো দেশ নেই। আবার নিজের দেশে পুঁজিবাদকে পরাস্ত করার কোনো সুযোগই সে হাত ছাড়া করবে না। আমাদের দেশে মোদি জমানায় সঙ্ঘ পরিবার ফ্যাসিবাদ কায়েম করতে চাইছে। শুধু লেনিনের মূর্তি ভাঙ্গা নয়, সমস্ত গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানকেই তারা আক্রমণ করছে। সমাজ পরিবর্তনের বৈজ্ঞানিক দিশা দেখাতে পারে কেবল কমিউনিস্টরা আর সে জন্য বামপন্থার মুন্ডপাত করা হচ্ছে। বলা হচ্ছে, সমাজতন্ত্র একটা অলীক বস্তু। আমাদের কিন্তু বুঝে নিতে হবে, সমাজতন্ত্র একটা জীবন্ত অনুশীলন। সমাজতন্ত্রকে আঁকা-বাঁকা পথ পরিক্রমা করতে হয়। নিজের নিজের দেশীয় বৈশিষ্ট্য নিয়ে কোথাও হয়ত খুব প্রাথমিক স্তরে সমাজতন্ত্রের অনুশীলন চলছে তো কোথাও সে উন্নত স্তরে পৌঁছাচ্ছে। অপর দিকে শত আস্ফালন সত্বেও পুঁজিবাদী শিবিরের সংঘাতকে চেপে রাখা যাচ্ছে না। তাদের সঙ্কট যত বাড়ছে তত তারা জনগণের ওপর ফ্যাসিবাদী হামলা নামিয়ে আনছে। এ জন্যই মোদি আজ ভারভারা রাও, সুধা ভরদ্বাজের মতো সমাজকর্মীদের মিথ্যা অভিযোগে জেলে পাঠাতে চাইছেন।

কমঃ রায়চৌধুরি এ প্রসঙ্গে ব্যঙ্গ করে বলেন, "এ রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী সব সময় অতিরিক্ত কথা বলেন কিন্তু ভারভারা রাওদের গ্রেপ্তারির ক্ষেত্রে নিশ্চুপ থাকলেন। বোঝা যাচ্ছে, মুখ্যমন্ত্রী এখন বেশ পরিপক্ক হয়েছেন।"  দিল্লীতে শ্রমিক কৃষকের সুবিশাল সমাবেশের উল্লেখ করে তিনি বামপন্থীদের আরো সংকল্পবদ্ধ হওয়ার ওপর গুরুত্ব আরোপ করেন। এরপর  দীপঙ্কর ভট্টাচার্যকে তাঁর বক্তব্য উপস্থাপনার জন্য আহ্বান জানানো হয়। “দার্শনিকের কাজ জগৎটাকে শুধু ব্যাখ্যা করা নয়, তাকে পাল্টানো’’—মার্কসের সুবিখ্যাত এই উক্তি দিয়ে দীপঙ্কর তাঁর ভাষণ শুরু করেন। তিনি বলেন, ব্যাখ্যা-বিশ্লেষন তো অবশ্যই দরকার, কিন্তু আসল কথা পাল্টানো। পাল্টানো অর্থে পরিবর্তন বা চেঞ্জ ঘটানো। এই দিক থেকে বিচার করলে চারটি ‘সি’-দিয়ে মার্কসবাদের মূল মর্মবস্তুকে সনাক্ত করা যায়। প্রথম ‘সি’ হল চেঞ্জ। এই ‘চেঞ্জ’ ঘটাতে হলে যা কিছু বিদ্যমান বিষয়ের নির্মম সমালোচনা করতে হবে। এই সমালোচনার ফলে নিজেদের অনুশীলনেরও বড় বড় ফাটলগুলো ধরা পড়বে। বিপ্লবীকে তারও দায় নিতে হবে। যেমন রুশ দেশে সমাজতন্ত্রের গৌরবগুলিরই কেবল ভাগীদার হব অথচ তার ব্যর্থতার দায় নেব না—এটা হতে পারে না। তিনি মনে করিয়ে দেন, শোষণভিত্তিক পুঁজিবাদী সমাজকে উচ্ছেদ করে সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠার সাধারণ রূপরেখা নির্মাণ করেও মার্কস কোন‍‍ো ‘শেষ কথার’ ফতোয়া জারি করেননি। মহান চিন্তানায়ক হলেও শেষ বিচারে তিনি ছিলেন এক বিপ্লবী অ্যাকটিভিস্ট। তাঁর ভাবনা অনুযায়ী, হাতের কাছে যা আছে তা দিয়েই পরিবর্তনের জন্য ঝাঁপিয়ে পড়তে হবে। জনগণের ওপর আস্থাশীল হলে, ফলাফলের জন্য দুশ্চিন্তা থাকবে না। দ্বিতীয় ‘সি’ হল কমিউনিজম। ঊনবিংশ শতকের মধ্যভাগে পুঁজিবাদী সমাজকে ভাঙ্গার জন্য ইউরোপে যে সব প্রচেষ্টা চলছিল সেগুলি প্রায়শই ছিল খুব প্রাথমিক স্তরের। সমাজতন্ত্রের নামে নানা বিচিত্র ধারার অনুশীলন চলছিল-কমিউনিজম প্রতিষ্ঠা ছিল স্বপ্নের ব্যাপার। তবু ‘কমিউনিজম’ শব্দটাতে বুর্জোয়ারা ভয় পেত। যে কোনো প্রতিবাদীকেই তারা কমিউনিস্ট মনে করত। তাই মার্কস ও এঙ্গেলস, সোস্যালিস্ট ম্যানিফেস্টো নয়, লিখলেন কমিউনিস্ট ম্যানিফেস্টো। আজও এ দেশে কমিউনিস্টদের ভূত নরেন্দ্র মোদিদের তাড়িয়ে বেড়াচ্ছে। তারা যে ‘আরবান নকশাল’ বা শহুরে নকশালদের ভয়ে আজ ভীত তা বিপ্লবী আন্দোলনের অমিত সম্ভাবনার দিককেই নির্দেশ করছে। সুতরাং শুধু একটা সরকার বদলের জন্য নয় আমাদের আন্দোলন, প্রত্যেক প্রতিবাদেরই অভিমুখ সমাজকে আমূল বদলে দেওয়ার লক্ষ্যের সঙ্গে সংযুক্ত হতে হবে। মার্কসও সেটাই শিখিয়েছেন বর্তমান আন্দোলনের মধ্যে কমিউনিস্টরা হল ভবিষ্যতের প্রতিনিধি।

তৃতীয় ‘সি’-টি হল ক্যাপিটাল বা পুঁজি। পুঁজির স্বরূপ ব্যখ্যায় তিনি সুবিস্তৃত আলোচনা করেছেন। আর শেষে সার সত্যটি তিনি তুলে ধরেছেন এই বলে যে যন্ত্রপাতি, সম্পত্তি, ব্যাঙ্ক ইত্যাদি পুঁজির মূল কথা নয়, পুঁজির মূল কথা হল ক্ষমতা। রাষ্ট্র ক্ষমতা আছে বলেই মুষ্টিমেয় শোষক বা বুর্জোয়ারা গোটা সমাজের ওপর কর্তৃত্ব করে। উৎপাদনের সঙ্গে যুক্ত আছে শ্রমিক, প্রযুক্তিবিদ, গবেষক, বিজ্ঞানী-সমাজের ব্যাপক অংশের মানুষ। এভাবে উৎপাদনের যদি সামাজিকীকরণ হয় তাহলে মালিকানারও সামাজিকীকরণ সম্ভব। আর এটা করার পূর্ব শর্ত হল মুষ্টিমেয় শাসকদের ক্ষমতা থেকে হটিয়ে দেওয়া। মার্কস এ কথাই বলেছেন। আজকের দিনেও ‘অকুপাই ওয়াল স্ট্রীট’ আন্দোলনে আমেরিকার সাধারণ জনগণ এ কথারই প্রতিধ্বনি করেছেন।

চতুর্থ ‘সি’ হল ক্লাস বা শ্রেণী। ‘আমাদের দেশে শ্রেণী নেই, আছে শুধু জাত পাত ও ধর্মভেদের প্রাচীর’—এমন বিভ্রান্তিমূলক কথা প্রায়ই শোনা যায়। জাতপাতের কাঠামোর মধ্য দিয়ে দলিত ও অনগ্রসরদের ওপর যে অর্থনৈতিক শোষণ ও সামাজিক নিপীড়ন চলে তার বিরুদ্ধে নিত্যনতুন আন্দোলন গড়ে উঠছে। এই আন্দোলনগুলি শাসকদের আধিপত্যকে চ্যালেঞ্জ জানায় বলেই এগুলি হল শ্রেণী সংগ্রামের অবিচ্ছেদ্য উপাদান। ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের ওপর নামিয়ে আনা হামলাও চালানো হয় গণতন্ত্রের লেশমাত্র না রেখে ফ্যাসিবাদ কায়েমের জন্য। তাই আজকের দিনে ফ্যাসিবাদ বিরোধী সংগ্রামে আক্রান্ত ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের পাশে দাঁড়ানো বিপ্লবী বামপন্থার গুরুত্বপূর্ণ কর্তব্য। এই প্রসঙ্গে দীপঙ্কর ব্যাঙ্গ করে বলেন, "মোদি জমানায় শুধু ব্যাঙ্ক, বীমা, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য ক্ষেত্রেরই বেসরকারিকরণ হচ্ছে না এমনকি রাষ্ট্রের কাজও বেসরকরিকরণের পিপিপি মডেলে চালিত হচ্ছে। রাষ্ট্রের মদতে পুলিশের সাথে গেরুয়া বাহিনীকে জনতাকে দমনের কাজে নামানো হচ্ছে।''

সবশেষে তিনি এদেশে আজকের পরিস্থিতিতে বামপন্থীদের কর্তব্য সম্পর্কে বলতে গিয়ে জরুরি অবস্থার পরবর্তী সময়ের কিছু দিককে তুলে ধরেন। তিনি বলেন, জনগণ ইন্দিরা গান্ধীকে মসনদ থেকে হটিয়ে দিতে যেখানে যাকে পেয়েছিলেন তাকেই ভোট দিয়ে জিতিয়ে এনেছিলেন। কিন্তু জনগণ ইন্দিরা স্বৈরতন্ত্রের পরিবর্তে গণতন্ত্রকে সম্প্রসারিত করতে চেয়েছিলেন—যদিও পরবর্তী সময়গুলিতে সেই লক্ষ্য অর্জনে বহু কিছুই অসম্পূর্ণ থেকে যায়। আজও জনগণ শুধু মোদিকে হটিয়েই ক্ষান্ত হতে পারে না। তাদের প্রকৃত আকাঙ্খাকে আমাদের বুঝতে হবে—যা হল নতুন যে কোনো ছদ্মবেশে ফ্যাসিবাদের প্রত্যাবর্তনকে দৃঢ় ভাবে প্রত্যাখ্যান করা।

জনগণের এই আকাঙ্খা পূরণে বামপন্থীরাই অগ্রণী ভূমিকা নিতে পারে। পশ্চিমবঙ্গ বা ত্রিপুরার মতো দীর্ঘ বাম প্রভাবিত রাজ্যে বামপন্থীরা ধাক্কা খেয়েছেন। কিন্তু পরিস্থিতির মধ্যে রয়েছে যে গতিময়তা তা থেকে এটাও স্পষ্ট হয়ে উঠছে যে, যেসব অঞ্চলে বামপন্থার কোনোদিনই তেমন প্রভাব ছিল না সেসব স্থানও লাল লহরে প্লাবিত হবে। ৪২-এর আন্দোলন থেকে নিজেদের সরিয়ে রেখে কমিউনিস্টরা ভুল করেছিলেন। কিন্তু সেই সাময়িক বিচ্ছেদ কাটিয়ে কমিউনিস্টরা ঐতিহাসিক নৌ বিদ্রোহে, দুর্ভিক্ষ পীড়িত মানুষের খাদ্যের দাবিতে, তেভাগার সংগ্রামে ও সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি রক্ষায় নেতৃত্ব দিয়েছিলেন। আজকের দিনেও প্রতিকূলতাকে কাটিয়ে ঐক্যবদ্ধ বামশক্তি ব্যাপক জনগণের আশা ভরসার কেন্দ্র হয়ে দাঁড়াবে।

উজ্জীবিত সভাগৃহের সমস্ত শ্রোতার সমবেত কণ্ঠে আন্তর্জাতিক সঙ্গীতের মধ্যদিয়ে আলোচনাসভার পরিসমাপ্তি ঘটে।

 

খণ্ড-25
সংখ্যা-29